Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৯


নতুনপ্রেমেরগান (১৯)

“প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার।”

র‌ওনক চৌধুরী কপালে চোখ তুলে হতভম্ব গলায় বলেন– “ সিয়াদাত শাহারিয়ার?”

সুপ্রভা দৃঢ় কণ্ঠে বলে– “ হ্যাঁ বাবা।আপনি ঠিকই শুনেছেন। প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার যবে থেকে আমার জীবনে এসেছে, তবে থেকেই আমার সুন্দর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।
আমার ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্টের জন্য আমি যেমন প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, ঠিক তেমন‌ই পরোক্ষভাবে দায়ী ওই ভন্ড প্রফে…” সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই সেখানে নোরা উপস্থিত হয়। সুপ্রভাকে দেখামাত্রই নোরার মুখের বর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।মনে হয় যেন শরতের মেঘ হঠাৎ কালবোশেখীর রূপ নিয়েছে। সে ক্ষিপ্রগতিতে ধেয়ে আসে সুপ্রভার দিকে ।তার বাহু চেপে ধরে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে— “তুমি? আবার কোন সাহসে ফিরে এসেছ এখানে?”

মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঈশিতা চৌধুরী আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি দ্রত পায়ে এগিয়ে এসে নোরাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেন। কুঞ্চিত ভ্রু পল্লবে ক্ষোভ মিশিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন—

“ এটা কোন ধরনের প্রশ্ন নোরা? সৌরভের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।এটা জানার পরেও সুভাকে লুকিয়ে থাকতে বলছো তুমি?বোন হয়ে ভাইয়ের বিপদে ছুটে আসবে না? আর সুভা লুকিয়ে কেন থাকবে বলো তো? লুকিয়ে কারা থাকে জানো? যারা অপরাধ করে। কিন্তু সুভা তো কোনো অপরাধ করেনি।তবে কেন সে নিজের ঘর-সংসার ত্যাগ করে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াবে? আমার আগেও মনে হয়েছে, এখন‌ও মনে হয়েছে সুভার ঘর ছাড়ার পেছনে তোমার হাত রয়েছে। হয়তো তোমার বিষাক্ত বাক্যবাণই তাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল।”

নোরার ফ্যাকাশে মুখশ্রীতে তখন আষাঢ়ের মেঘ জমেছে। ঈশিতা চৌধুরীর তপ্ত বাক্যগুলো তীরের মতো তার হৃদয়ে বিঁধছে। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়, গলার কাছে এক দলা অভিমান কিংবা অপরাধবোধ আটকে থাকে।

রওনক চৌধুরী এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর করিডোরের নিস্তব্ধতা চুরমার করে দেয়—

“যথেষ্ট হয়েছে! এখন কাদা ছোড়াছুড়ির সময় নয়। সুপ্রভা যখন ফিরেছে, তখন সব সত্যই উদঘাটিত হবে। তবে এখন আমাদের প্রথম কাজ সৌরভকে সুস্থ করে তোলা।”

রওনক চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই আইসিইউ-এর ভারী দরজাটা শব্দ করে খুলে যায়। ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে ডক্টর আরিয়ান। সবার উৎসুক এবং আতঙ্কিত দৃষ্টির কেন্দ্রে এখন তিনি। মাস্কটা নিচে নামিয়ে আরিয়ান এক চিলতে হাসে ।যা এই বিষণ্ন করিডোরে এক পশলা বৃষ্টির মতো প্রশান্তি বয়ে আনে।সে খুশি খুশি গলায় বলে–

“আপনাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। সৌরভ এখন বিপদমুক্ত। আমরা ওকে কড়া অবজারভেশনে রেখেছিলাম কারণ ওর ইন্টারনাল ইনজুরি নিয়ে আমরা চিন্তিত ছিলাম । কিন্তু মিরাকলি ও খুব দ্রুত রিকভার করছে। ওর জ্ঞান ফিরেছে।”

সুপ্রভার বুকের উপর থেকে যেন ভারী পাথর সরে গেল।সে এতক্ষণে ফুসফুস ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারল। আলেয়া বেগম খুশিতে কান্না করে দিলেন।
সিজদায় পড়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।

ঈশিতা চৌধুরী ডুকরে কেঁদে উঠে রওনক চৌধুরীর কাঁধে মাথা রাখলেন। রওনক চৌধুরী ডক্টরকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন– “আমরা কি সৌরভের সাথে দেখ করতে পারি?”

আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল, “জি, তবে একজন একজন করে। খুব বেশি উত্তেজনা তৈরি করা যাবে না।”

আরিয়ান অনুমতি দিতেই সুপ্রভা সবার আগে পা বাড়ায়। কেবিনে ঢুকে দেখে সাদা ধবধবে বিছানায় সৌরভ শুয়ে আছে। নাকে অক্সিজেন মাস্ক নেই, তবে শরীরটা বড্ড ফ্যাকাশে। সুপ্রভাকে দেখামাত্রই সৌরভের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। সে খুব অস্পষ্ট স্বরে ডাকে – “বনু…!”

সুপ্রভা সৌরভের শিয়রে বসে সৌরভের হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে।”

সৌরভ জীর্ণ কণ্ঠে বলে– “ পাগলী মেয়ে! কান্না করছিস কেন? আমি কি ম’রে গেছি?”

সুপ্রভার বুকটা ধক করে উঠে।সে সৌরভের ঠোঁটের উপর তর্জনী আঙ্গুল রেখে শক্ত গলায় বলে– “ ম’রার কথা ভুলেও মুখে আনবে না তুমি?”

সৌরভ অভিমানী গলায় বলে– “ ভাইয়ের জন্য যদি এতোই চিন্তা থাকতো তোর, তাহলে এই দীর্ঘ সময় আমাদের সবাইকে এভাবে কাঁদিয়ে দূরে ছিলি কেন? একবারও কি মনে পড়েনি এই অপদার্থ ভাইটার কথা?”

সুপ্রভা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তার চোখের কার্নিশ বেয়ে আবারও এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে সৌরভের হাতের ওপর। সে কোনো উত্তর দিতে পারে না। তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে। যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির শিকার হয়ে সে ঘর ছেড়েছিল, তা এই মুহূর্তে সৌরভকে বলা অসম্ভব।

সে সৌরভের কপালে আলতো করে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে –“সব বলব ভাইয়া, সময় হলে সব বলব। এখন শুধু এটুকু জেনে রাখো, তোমার এই বোনটা এক মুহূর্তের জন্যও তোমাকে ভুলে থাকেনি। পরিস্থিতির শিকল আমায় বেঁধে ফেলেছিল ।”

সৌরভ আর কথা বাড়ায় না। বোনের চোখের ক্লান্তি আর বিষণ্ণতা সে পড়তে পারছে। সে সুপ্রভার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখ বন্ধ করে। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ধকল আর ওষুধের প্রভাবে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।


পরের দিন সকালে ডক্টর আরিয়ান কেবিনে ঢুকে সৌরভের পালস চেক করে স্মিত হেসে বলে–

“সৌরভ এখন অনেকটাই স্থিতিশীল।হাসপাতালের পরিবেশের চেয়ে ঘরের পরিবেশ ওকে দ্রুত সারিয়ে তুলবে। আমরা ডিসচার্জ পেপার রেডি করছি, আপনারা আজই ওকে নিয়ে বাড়ি যেতে পারেন।”

আলেয়া বেগম যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। রওনক চৌধুরী আরিয়ানকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাইরের আনুষ্ঠানিকতা সারতে গেলেন।

বিকেলের রক্তিম সূর্য যখন দিগন্তে ডুবছে, ঠিক তখন চৌধুরী বাড়ির গাড়ি এসে থামে ফটকের সামনে। সৌরভকে অতি সাবধানে গাড়ি থেকে বের করা হয়।

রওনক চৌধুরী সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আজ মনে হচ্ছে অশুভ ছায়াটা বিদায় নিল। চলো মা ঘরের লক্ষ্মী ঘরে ফিরে চল।”

ঈশিতা চৌধুরী পরম মমতায় সৌরভের এক হাত এবং সুপ্রভার অন্য হাত ধরে বাড়ির ভেতর পা রাখলেন। ঈশিতা চৌধুরী সৌরভকে দোতলায় নিয়ে যেতে চান, কিন্তু সৌরভ যায় না।সে টলটলায়মান পায়ে সোফায় গিয়ে বসে।তার কথা বলতে কষ্ট হয়।তবুও সে দূর্বল গলায় বলে– “ মাওইমা! বনু যখন ফিরে এসেছে, তখন আমার মনে হয় সত্যিটা সবার সামনে আসা দরকার।”

সৌরভের কথা শুনে শুকনো ঢোক গিলে নোরা।ভয়ের এক শীতল স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়।ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও তার তেজ কমে না।সে চড়া গলায় বলে – “ মম, ড্যাড তোমরা আবার‌ও ভুল করছো একটা চোরকে এই বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে।”

নোরার এই নির্লজ্জ আস্ফালন সুপ্রভার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়।সে তেড়ে আসে নোরার দিকে। ক্রুদ্ধ গলায় বলে– “ তুমি কি মানুষ নোরা? তোমার মধ্যে কি মনুষ্যত্বের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই?আমার ভাই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে।এখনো ক্ষত তাজা ,যন্ত্রণায় তার প্রতিটি নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। আর এই মুহূর্তেও তুমি তাকে চোর অপবাদ দিতে কুণ্ঠাবোধ করছো না?”

নোরা বাঁকা হাসে। কটাক্ষ করে বলে – “ আরে না না।তোমার ভাইয়া চোর নয়। আসল চোর হচ্ছো তুমি।তোমার ভাইয়া শুধু তোমাকে মদত দিয়েছে।”

সুপ্রভা স্তম্ভিত হয়ে যায়‌।তার কণ্ঠনালী কাঁপছে।
সে নিজেকে ধাতস্থ করে কিছু বলতে উদ্যত হয়,
ঠিক তখনই পেছন থেকে পুরুষালি কণ্ঠে ভেসে আসে — “ সুপ্রভা চোর নয়।তার সাক্ষী আমি নিজে।”

চলবে ???

[ গল্পটা অনেকেই পড়া বাদ দিয়েছেন। অর্ধেক পাঠক‌ও পড়ছেন না।এর দায় অবশ্য আমর‌ই।আপনাও পড়ছেন না, আমার‌ও আর আগাতে হচ্ছে করতে না। সম্ভবত আর দুই একটা পর্বে শেষ করে দিব। আপনাদের কি অভিমত? পড়তে চান? নাকি শেষ করে দিব?]

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply