Golpo romantic golpo তোমার হাসিতে

তোমার হাসিতে পর্ব ৩০


তোমার_হাসিতে

ফারহানাকবীরমানাল

৩০.
ঘড়িতে রাত নয়টা বেজে বায়ান্ন মিনিট। রাতের খাবার খেতে বসেছে সবাই। খাবারের আয়োজন ভালো না। পাতলা ডালের সাথে এক টুকরো লেবু। বাবা মাথা নিচু করে খাচ্ছেন। দাদি বাবার পাশে বসে মুখ শুকনো।করে রেখেছেন। তার মন মেজাজ ভালো নেই। চার দিন ধরে তার ছোট ছেলে জে’লখানায়। কিছু খাচ্ছে না খাচ্ছে– সে ব্যাপারে কোন কিছু জানা নেই তার। ছেলেকে অভুক্ত রেখে কী কোন মা ভাত খেতে পারে? পারে না। দাদিও পারছেন না। বাবার খাওয়ার প্রায় শেষ। সেই সময়ে মা উকিলের প্রসঙ্গ তুলল। তরল গলায় বলল, “বাড়িতে উকিল এসেছিল। আম্মা তামিমকে ছাড়ানোর ব্যাপারে উকিলের সাথে কথা বলেছেন।”

বাবা শুধু শুনলেন। কথার জবাব দিলেন না। মা বলল, “যে আমার ছেলেকে মা’র’তে চাইল, তাকে বাঁচানোর জন্য বাড়িতে উকিল এসেছে। আবার আমাকে সেই উকিলের জন্য চা বানিয়ে দিতে হয়েছে। এরপরও কী চুপ করে থাকা যায়?”

বাবা শান্ত চোখে মায়ের দিকে তাকালেন। সহজ গলায় বললেন, “তুমি চা বানাতে গিয়েছিলে কেন? না বানালেই তো পারতে।”

মা রেগে গেল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “প্রথমে বুঝতে পারিনি। বুঝলে কখনো এই কাজ করতাম না।”

দাদি বললেন, “খেতে বসেও দুই দন্ড শান্তি নেই। বড় বউ, সোয়ামীর সাথে তোমার এই রঙের আলাপ ঘরে গিয়ে করতে পারো না?”

মা কিছু বলতে যাচ্ছিল। ফুফু তাকে থামিয়ে দিলো। অল্প হেসে বলল, “আহা! তোমাদের এসব কথা রাখো। আমার কথা শোনো। বাবুইয়ের আব্বা আজকে কল দিয়েছিল।”

ফুফু কথায় কেউ তেমন আগ্রহ দেখালো না। শুধু তিমু বাদে। সে ভাতের থালায় হাত দিয়ে মুখ উঁচিয়ে রইল। ফুফু বলল, “ওর আব্বা চাইছে সাজ্জাদের বাবুইয়ের বাগদান সেরে রাখতে। যে দিনকাল পড়েছে। কোন কিছুই বলা যায় না।”

আমার দাদির বিয়ের হয়েছিল তেরো বছর বয়সে। শুনেছি বিয়ের পরে বছর তিনেক তিনি তার শাশুড়ির সাথে ঘুমতেন। দাদার আশেপাশেও ঘেঁষতেন না। সেই দাদি আজ চিৎকার করে উঠলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “মোটে পড়ে যাচ্ছে নাকি? তোর মেয়ের বয়স কত? এই বয়সে বিয়ে পড়ে যাচ্ছে। ছোট ভাইটা জে’লে সে ব্যাপারে কোন হুশ নেই।”

“হুশ থাকবে কেন মা? ছোট ভাইটা বিনাদোষে জে’ল হাজতে যায়নি। অপরাধ করে গিয়েছে। যেন-তেন অপরাধ করেনি। নিজের ভাইপোকে মে’রে ফেলতে চেয়েছিল। এর পরেও তার জন্য মায়া মহব্বত কাজ করবে এই আশা করা বোকামি।”

“হ্যাঁ, তাই। এই কথাই তো এখন বলবি। ভাই এখন জে’লে। মাসের শেষে তার বেতনের দুই এক টাকা তোর একাউন্টে ঢুকবে না। তুই তো এই কথা বলবি।”

“বাজে কথা বলো না মা। আমি তোমার ছোট ছেলের টাকার জন্য বসে থাকি না। বাবুইয়ের আব্বা যথেষ্ট টাকা রোজগার করে। মাসে মাসে আলাদা করে হাত খরচের জন্য আমাকেও কিছু দেয়।”

“হ্যাঁ এখন তো এই কথাই বলবি! তোরা হলি দুমুখো সাপ। সবাই দুমুখো সাপ।”

“বাজে কথা বলো না মা। তোমার ছোট ছেলে যা করেছে তারপরেও তুমি কী করে আশা করো যে বড় ভাবি তোমার ছেলেকে জে’ল থেকে বের করতে চাইবি। ফাঁ’সি চাইলেও তো দোষের কিছু দেখি না।”

“তোর কথায় শুনে আমি খুব হাসি পাচ্ছে। আজ বড় ভাবির কোন দোষ নেই। তার ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছিস, অথচ এই বাড়িতে ঢুকে প্রথম দিনই বড় ভাবির নামে আমার কান ভাঙানি দিয়েছিলি। সে নাকি তোর কাছে গহনার কথা নালিশ করেছে। বড় ভাবি ছোটলোক। কোথায় ছোট দেবরের বিয়ে, নিজে থেকে হাসিমুখে সব গহনা দিয়ে দেবে। তা না, উল্টো ঝামেলা করছে। এসব কথা কী ভুলে গেছিস?”

ভেবেছিলাম ফুফু মাথা নিচু করে ফেলবে। কিন্তু না তেমন কিছু হলো না। সে উল্টো তীব্র এবং তীক্ষ্ণ গলায় ঝগড়া আরম্ভ করল।

তিমুর খাওয়া প্রায় শেষ। বড়জোর দুই গ্রাস ভাত অবশিষ্ট আছে। সে ভাতের মধ্যে হাত ধুয়ে ফেলল। সহজ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার ঘুম পাচ্ছে।”

বলেই সে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। ঝগড়াঝাটি আমার কোন কালে পছন্দ না। বিরক্তিকর লাগে। একবার ফুফুকে শান্ত হয়ে বললাম। সে মিনিট পাঁচেকের জন্য চুপ করল। ঠিক সেই সময়েই দাদি বললেন, “তামিমের বিয়ের জন্য এসেছিলি, সেই তামিম এখন জে’লে। বিয়ে হচ্ছে না। তাই কাল সকালে তোরা নিজেদের বাড়ি চলে যাস। এ বাড়িতে হুটোপুটি ভালো লাগছে না।”

ফুফু কথার জবাব দিলো না, কঠিন মুখে তাকিয়ে রইল।

মা বাবার উপর রেগে আছে। যেনতেন রাগ না। ভীষণ রকমের রাগ। দাদির উকিল ডাকার ব্যাপারে আব্বা কিছু বলেননি– এ কথা আমার মা মানতে পারছে না। মুখ কালো করে ঘুরছে। সে কোন কথা শুনছে না। বারবার করে বললেও শুনছে না।

কোথাও শুনেছিলাম– যে একবার তলপিতলপা গুটিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়, সে আর কখনো বাড়ির সদস্য হিসাবে ফেরত আসে না। আমাদের বাড়িতে হয়েছে– যে বাড়িতে একবার ঝগড়া অশান্তি শুরু হয়, সে বাড়িতে আর কখনো শান্তি ফেরে না। একটার পর একটা সমস্যা লেগে থাকে।

বিছানা গুছিয়ে শুয়ে পড়ব। তিমু ঘরে ঢুকল। ডান হাতে চায়ের কাপ ধরে রেখেছে। আমি বললাম, “এত রাতে চায়ের কাপ হাতে কী করছিস?”

সে হাসল।

“তোমার জন্য এনেছি। সবটুকু খেতে হবে। এক্ষুনি।”

“মশকরা করিস না তিমু। রাত দুপুরে চা খেয়ে ঘুমের বারোটা বাজানোর ইচ্ছে নেই। তোর চা তুই গিয়ে খা।”

“উঁহু! একটা তোমার জন্য এনেছি। আমি খাব না।”

“বিরক্ত করিস না তিমু।”

“সাজ্জাদ ভাই, কাপের ভেতরে চা নেই। নিমপাতার রস আছে। নিমপাতার রস র’ক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। তাই বড় মামানি বানিয়ে দিতে বলল।”

“কিহ! মাত্রই ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে এলাম। এখন এতো বড় কাপের এক কাপ নিমপাতার রস! আমি খেতে পারব না তিমু। ভাই, তুই আমাকে মাফ কর। নিজের ঘরে যা।”

“তাহলে এই রস কী করব?”

“ফেলে দে। না থাক ফেলতে হবে না। তুই খেয়ে ফেল। তোর র’ক্ত পরিষ্কার হয়ে যাবে।”

“ঠিক আছে। বড় মামানিকে খেতে বলছি।”

“মাকে কেন টানছিস? মায়ের মেজাজ এমনিতেই বিগড়ে আছে।”

“অস্বাভাবিক কিছু?”

“অস্বাভাবিক সে কথা বলিনি তিমু। বিগড়ে আছে সে কথা বলেছি।”

“কথা এক না। অর্থ এক।”

“থাক ভাই। এবার সত্যিই আমাকে মাফ কর।”

“পারলাম না। এটা না খেলে আমি কিছুই এই ঘর থেকে যাব না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে বড় মামাকে ডেকে নিয়ে আসব।”

তিমু হাত থেকে কাপটা নিয়ে বিছানায় বসে পড়লাম। বেশ অনেক রাত হয়েছে। ঘুম পাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে এক ঢোক গিলে ফেললাম। ভীষণ তেঁতো। তেঁতোর কারণে বমি এসে যায়।

তিমু বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছে। তার মুখ হাসিহাসি। মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে খুব মজায় আছে। তিমু বলল, “কী? স্বাদ কেমন?”

“খেয়ে দেখবি? আয় আয়। এখনও বেশ অনেকখানি অবশিষ্ট আছে।”

“বাহানা না করে চুপচাপ খেয়ে নাও। আর একটা গল্প শোনো–

ভ্যানে করে বাড়ি ফিরছি। আমার সাথে আরও দু’জন মহিলা। তারা খুব কথা বলছে। আলোচনার বিষয় সবুজ এবং তার বউ। সেদিন নাকি সবুজের বউয়ের জ্বর উঠেছে। নামমাত্র জ্বর। গায়ে হাত দিলে বোঝা যায় না। সেই জ্বরের নাম করে সারা সকাল শুয়ে। একটা কাজে হাত দিলো না। সেই সবুজ সব কাজ করল। নিজে ভাত তরকারি রান্না করে, তারপর কাজে গেছে। যাওয়ার আগে আবার বউকে গালে উঠিয়ে খাইয়ে দিয়ে গেছে। ওই মেয়েটা এমনই। কিছু হওয়ার আগেই গলে পড়ে। সারাদিনে একটা কাজও করল না। অসুস্থ, গায়ে বল নেই। অথচ সবুজ বাড়ি ফেরার সাথে সাথে ঘুরতে চলে গেছে। গায়ে জ্বর উঠলে ওমন মাঞ্জা মে’রে ঘুরতে যাওয়ার শখ থাকে? আবার দেখি আইসক্রিম খেতে খেতে বাড়িতে ঢুকছে।

ঠিকই! সবুজ তো বলদ। মেয়ে মানুষকে অমন আহ্লাদ দিতে হয় নাকি? একটুও শাসন করে না। সেদিনের কথা শোনো- আমি ওদের ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। ফ্যান চলছে। পর্দা সরিয়ে যা দেখলাম রে ভাই! বউ শাড়ি পরছে, আর সে কুঁচি ধরে আছে। পুরুষ মানুষ এমন রাম ছাগল হয়? আমরা কী শাড়ি পরি না? দুটির মধ্যে তেমন ঝগড়াঝাটি হয় না দেখছ? হবেই বা কি করে? বলদ ছলদ বউকে শাসন করতে জানে নাকি!

নিজের অসম্ভব ধৈর্য নিয়ে সারা রাস্তা পাড়ি দিয়ে নামার সময় জিজ্ঞেস করলাম, “সবুজ আপনাদের কে হয়?”

এক মহিলা বলল, “আমাদের কেউ হয়, বাড়ির পাশে থাকে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাড়া মিটিয়ে সামনে দিকে হাঁটা শুরু করলাম। দাম্পত্য জীবনে অসুখী মহিলাদের সাথে চল্লিশ মিনিট সময় পার কথা বেশ ক্লান্তির। হতাশ আমি হতাশ!”

কথা শেষে তিমু হো হো করে হেসে উঠল। আমি বললাম, “মাকে দেখেছিস? মা কী করে?”

“বড় মামার সাথে কথা বলছে।”

“ওহ! ভালো কথা, ভ্যানে করে কোথায় গিয়েছিলি?”

তিমু কিছু বলল না। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। তারপরই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। কাল সকালে একবার জে’লখানায় যাব। ছোট চাচার সাথে দেখা করতে হবে। আমি সরাসরি তার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই– সে কেন আমায় মা’র’তে চাইল? একটা মানুষের জীবনের টাকার প্রয়োজন এত বেশি হয় কীভাবে? টাকার জন্য আপন পরও দেখে না।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। ফিসফিস আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। বসার ঘর থেকে মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। যেন কেউ খুব সাবধানে কথা বলছে। নিঃশব্দে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

দাদি সোফার উপর পা তুলে বসে আছেন। তার সামনে বাবা। ডিম লাইটের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যায় বাবার চোখ-মুখ শান্ত। সে খুব ঠান্ডা মেজাজে আছে। অন্যদিন এমন দৃশ্য চোখে পড়লে এড়িয়ে যেতাম। আজ গেলাম না। আড়ি পেতে রইলাম।

বাবা বললেন, “দেখো মা, তামিম তোমার ছোট ছেলে। সে ছাড়া তোমার আরও দুটো সন্তান আছে। তবুও তামিম জে’লে যাওয়ার পর থেকে তুমি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে পারছ না। সাজ্জাদ আমার একমাত্র ছেলে। যে ওকে মা’র’তে চেয়েছিল তাকে তুমি ক্ষমা করে দিতে বলছ? আজ যদি তোমার ছোট ছেলেকে আমি মা’র’তে চাই, কাল কী তুমি আমার জামিনের জন্য উকিল ধরবে?”

দাদি চুপ করে রইলেন। বাবা জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন। নরম গলায় বললেন, “অপরাধীর কোন ধর্ম পরিচয় হয় না। না মানে বলতে চাইছি তামিম যদি আমার সাথে এমন কাজ করত। তখনও কী তুমি আমার জন্য এমন অস্থির হতে? তুমি তোমার ছেলেকে ক্ষমা করতে পারতে?

দাদি এবারও কিছু বললেন নয়। শুকনো মুখে তাকালেন যেন খুব আহত হয়েছেন।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply