অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৪৫
রাতের নীরবতা আরও তীব্র হলো। যেন আশেপাশের সবাই বিশ্রামে মগ্ন। নিশাচর পাখি আর দূরপাল্লার বাসের শব্দ ভেসে আসে দীর্ঘ সময় পর পর। বেডের উপর বসে আছে দুজনে। দরজাটা ভেতর থেকে লক করা, চারপাশে মৃদু আলো। আর সেই আলোয় একে অপরের চোখে ডুবে যাচ্ছে অনিকেত আর সায়না।
কিছুক্ষণ পর অনিকেত ধীরে ধীরে সায়নাকে নিজের একদম কাছাকাছি এগিয়ে গেলো। এরপর আলতো করে সায়নার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। মাতাল কণ্ঠে বলল, “এত ভালোবাসো কেন আমাকে?”
সায়না মুচকি হেসে বলল, “কারণ তুমি আমাকে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসো। তুমি যতই দূরে থাকো, তোমার ভালোবাসা আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে সবসময় মনে হয় তুমি আমার মধ্যে মিশে আছো। যদিও শারীরিকভাবে অনেক সময় থাকো না, তবুও মনে হয় তুমি আমার সাথেই আছো সবসময়। বলতে পারো, তোমাকে ভালোবাসি কারণ নিজের সত্তাকে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না। তুমি আছো মানেই সায়না আছে। তোমার আর আমার জীবন একই সুতোয় বাঁধা।”
অনিকেত আরও একটু গভীরভাবে জড়িয়ে নিল সায়নাকে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল দু’জনেই। যেন নীরবে একে অপরকে অনুভব করছে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে একে অপরের হৃদয়ের স্পন্দন কানে আসছে।
নীরবতা ভেঙে অনিকেত বলল, “ডাক্তারদের জীবনটা খুব কঠিন, জানো তো। অনেক সময় তোমাকে সময় দিতে পারি না। নিজের কাছেই খারাপ লাগে। কিন্তু কী করব, ওটাও তো আমার দায়িত্ব। ডাক্তার হয়েছি, মানবসেবা করা আমার ধর্ম।”
সায়না মাথা নাড়িয়ে বলল, “আমি তো জানতাম কাকে বিয়ে করছি। তুমি শুধু আমার নও, অনেক মানুষেরও। তাই তোমাকে ভাগ করে নিতে শিখেছি। তাদের কাছে তুমি সেবক, আর আমার কাছে তুমি আমার পৃথিবী।”
অনিকেত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে।
“তুমি না থাকলে আমি এত সহজে এগিয়ে যেতে পারতাম না, সায়না।”
সায়না মুচকি হেসে বলল, “আর তুমি না থাকলে আমি এতটা ভালোবাসা পেতাম না। তাই দেনা-পাওনার হিসেব বাদ দাও, ডাক্তার সাহেব। ভালোবাসায় দেনা-পাওনার জায়গা নেই। আমরা দুই দেহ এক প্রাণ। সারাজীবন একে অপরের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে, হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দেব এই ছোট্ট জীবন।”
অনিকেত আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে দিতে লাগল সায়নাকে। পবিত্র ভালোবাসায় ডুবে যেতে লাগল একে অপরের মাঝে। দেহের ভালোবাসা যখন হৃদয় স্পর্শ করে, তখন পৃথিবীটা এক টুকরো স্বর্গ হয়ে ওঠে।
🌿
নয়না ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারছে, শরীরের প্রতিটা কোণে যেন এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর সুখ ছড়িয়ে আছে। জিয়ানের কথা মনে পড়তেই তার গাল লাল হয়ে উঠল। লজ্জায় ভরে গেল নয়নার দেহ-মন। দু’হাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ বসে রইল। ধীরে ধীরে উঠতে গিয়ে—
“উফ!” কোমরে হাত দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল।
জিয়ান চোখ না খুলেই হেসে বলল, “কী হলো, বাটার মাশরুম? উঠতে কষ্ট হচ্ছে?”
নয়না লজ্জা পেয়ে বলল, “চুপ! তোমার জন্যই এই অবস্থা।”
জিয়ান এবার চোখ খুলে নয়নার দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমি।
“আমার জন্য নাকি? আমাদের জন্য, মিসেস চৌধুরী?”
নয়না বালিশ ছুড়ে মারল জিয়ানের দিকে। “একদম কথা বলবে না আমার সাথে! একটুও লজ্জা নেই তোমার, নির্লজ্জ লোক!”
জিয়ান হেসে নয়নাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
“কাল রাতে তো চুপ ছিলে না, বেবি। আর এখন সব দোষ জিয়ান ঘোষের!”
“জিয়ান!” বলে নয়না চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“আচ্ছা আচ্ছা, আর বলব না। আমি কোনো কথাই বলব না, বাটার মাশরুম।” বলেই নয়নার কপালে আলতো চুমু খেল সে। “আজ কোথাও বেরোব না। পুরো দিনটা শুধু তোমার সাথে কাটাব।”
“বেরোব না মানে! ঘুরব সারাদিন। এখন ক’টা বাজে?”
“এই তো একটা বাজবে।”
“তাহলে আমরা চারটার পর বের হব, রাত বারোটায় ফিরব।”
“উফ, আমার জান!”
নয়না একটু থেমে বলল, “জানো, আমি ভয় পাচ্ছি।”
“আবার ভয়?” জিয়ান ভ্রু কুঁচকে নয়নার দিকে তাকাল।
“না, আগের মতো না। এখন ভয় হচ্ছে—এই সুখটা যদি হারিয়ে যায়? যদি আবার কোনো ঝড় এসে সব এলোমেলো করে দিয়ে যায়?”
জিয়ান এবার সিরিয়াস হয়ে গেল। নয়নার হাত শক্ত করে ধরে বলল, “শোনো, যা হারিয়ে যাওয়ার ছিল, সব আগেই হারিয়েছে। এবার যা আছে, তা শুধু আমাদের। কেউ এবার আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
নয়নার চোখ ভিজে উঠল, “প্রমিস?”
জিয়ান নয়নার কপালে চুমু দিয়ে বলল, “প্রমিস।”
দু’জনের হাত একসাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল একে অপরকে।
🌿
ফ্রেশ হয়ে দুপুরে খাবার খেয়ে রেস্ট করে নিল দু’জনেই।
নয়না আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। আজ সে হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছে। চুলগুলো খোলা, চোখে সামান্য কাজল। সিম্পল সাজ, অথচ অপূর্ব দেখাচ্ছে নয়নাকে।
পেছন থেকে জিয়ান এসে নয়নাকে আয়নায় দেখেই থমকে দাঁড়াল।
“তুমি কি প্রতিদিন এমন সুন্দর হয়ে যাও কী করে? নাকি আজ একটু বেশি সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করেছ?”
নয়না হেসে বলল, “তোমার চোখটাই সমস্যা। সবসময় বাড়িয়ে দেখো। মোটেই আমাকে অত সুন্দর লাগছে না।”
জিয়ান এগিয়ে এসে নয়নার কাঁধে থুতনি রাখল। “না, আমার চোখ ঠিকই দেখেছে। আজকে আমার বউকে নিয়ে ঘুরতে বের হব, তাই একটু বেশি ভালো করে দেখছি। আজকে আমার অর্ধাঙ্গিনী কি আসমানের পরী লাগছে! নীল পরি।”
নয়নার গাল লাল হয়ে উঠল।
“চলবে? নাকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু প্রশংসাই করবে?”
“চলব তো অবশ্যই, তবে একটা শর্ত আছে।”
“কীসের শর্ত?”
জিয়ান নয়নার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আজ সারাদিন আমার হাত ছাড়বে না।”
নয়না জিয়ানের দিকে এক নজর তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে তার হাতটা জিয়ানের হাতে রেখে দিল। এরপর মুচকি হেসে বলল, “ছাড়ব না।”
🌿
সমুদ্রের ধারে এসে দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে। পায়ের নিচে নরম বালি, সামনে অসীম নীল জলরাশি। ঢেউ এসে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের পা।
নয়না হঠাৎ জিয়ানের হাত ছেড়ে দৌড়ে একটু সামনে চলে গেল।
“জিয়ান! ধরতে পারো তো ধরো!”
জিয়ান হেসে বলল, “এই চ্যালেঞ্জ কিন্তু বিপজ্জনক হবে, মিসেস!”
নয়না সমুদ্রের পাড়ে দৌড়াচ্ছে। জিয়ান তার পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে আর বলছে, “তুমি কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করেছ। এর শাস্তি কিন্তু রাতে পাবে।”
জিয়ান দৌড়ে গিয়ে নয়নাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
নয়না চমকে উঠল, “এই, ছেড়ে দাও!”
“না, ধরেছি যখন, এখন আর ছাড়ছি না, জান।”
নয়না হাসতে হাসতে বলল, “মানুষ দেখছে! কী ভাববে সবাই?”
জিয়ান নয়নার কানের কাছে মুখ এনে বলল,
“দেখুক। আমার বউকে আমি ভালোবাসছি, এতে লজ্জার কী? পুরো পৃথিবীর মানুষ জানুক—আমি আমার অর্ধাঙ্গিনীকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি।”
নয়না চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শুধু তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ পর দু’জন বালির ওপর বসে পড়ল।
নয়না নিজের আঙুল দিয়ে বালিতে কিছু লিখছে।
জিয়ান তাকিয়ে বলল, “কী লিখছ?”
নয়না একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “দেখবে না।”
জিয়ান জোর করে তাকিয়ে দেখল—ভেজা বালুর ওপর লেখা,
“জিয়ানের অর্ধাঙ্গিনী সুনয়না”
জিয়ান মুচকি হেসে বলল, “এটা বিলবোর্ডে লিখে শহরের অলিতে-গলিতে টাঙিয়ে দিলে কেমন হয়?”
নয়না চোখ বড় করে বলল, “চুপ! একদম উল্টোপাল্টা কথা বলবে না।”
“সুনয়না। এই যে সুন্দর চোখের অধিকারিণী, মেঘ বালিকা, তুমি কি জানো তোমার এই রাগি চোখ দুটো আমার হৃদয়ে ভালোবাসার উত্তাল ঢেউ তোলে?”
নয়না জিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “এসব কথায় গলছি না হু। রাগ দেখালে ভয় পেতে হবে। বউয়ের রাগ কিন্তু সহজে নিলে চলবে না, জনাব।”
জিয়ান হুট করে বালির ওপর হাত রেখে লিখল ‘সুনয়না’। এরপর শব্দ করে বলল, “এই নামটা আমি শুধু বালিতে না, আমার হৃদয়ে লিখে রেখেছি। সমুদ্রের পানি হয়তো এই নাম মুছে ফেলবে, কিন্তু যতদিন আমি বেঁচে আছি, আমার হৃদয় থেকে এই নাম কেউ মুছতে পারবে না।”
“যদি কখনো মুছে যায়?” নয়না তাকিয়ে রইল জিয়ানের দিকে।
“তাহলে প্রতিদিন নতুন করে লিখতে হবে। আর আমি প্রতিদিন আমার হৃদয়ে নতুন করে নানা রঙে তোমার নাম লিখব।”
“প্রতিদিন?”
“যতদিন নিশ্বাস নেব, ততদিন।”
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ১৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৩