তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
২৯.
চারদিকে তীব্র অন্ধকার, ফিনাইলের কড়া গন্ধ নাকে লাগছে। থেমে থেমে গোঙানির শব্দ শোনা যায়। মাথায় একটা ভোঁতা যন্ত্রণা নিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। নিজেকে ধাতস্থ করতে সময় লাগল। শরীরের ভেতরে ভালো লাগছে না। গা গুলিয়ে বমি আসছে। যতদূর মনে পড়ছে– শেষবার সবুজের বাড়িতে থেকে বের হওয়ার রাস্তা খোঁজ করছিলাম। তারপর কী হয়েছে? আমার কিছু মনে পড়ছে না কেন?
আশেপাশে কেউ নেই। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। এখানে এত অন্ধকার কেন? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ধপ করে ঘরের বাতি জ্বলে উঠল। ধবধবে সাদা দেয়ালে কালচে রঙের ঘড়ি ঝুলছে। ঘড়িতে রাত দশটা বেজে বায়ান্ন মিনিট। সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে সচারাচর এমন ঘড়ি দেখা যায়। কেউ না কেউ নিয়ে চলে যায়। ঘড়িটা চলছে। বোধকরি সঠিক সময় দেখাচ্ছে। আমার শরীরের অবস্থা নাজেহাল। হাতে ক্যানুলা করা হয়েছে। স্যালাইন চলছে। আশেপাশে কেউ নেই। থাকলে জিজ্ঞাসা করা যেত। মিনিট দশেক ঝিমানো পর বাদশা এলো। বসে থাকতে দেখে উজ্জ্বল গলায় বলল, “উঠে গেছিস? আমার যা চিন্তা হচ্ছিল না।”
“আমি এখানে কীভাবে এলাম?”
সে ভীষণ অবাক হলো। বিস্মিত গলায় বলল, “তোর কিছু মনে নেই? তুই তো অচেতন ছিলিস না।”
“সত্যিই আমার কিছু মনে নেই।”
“হবে হয়তো। সে যাইহোক, এখন কেমন লাগছে?”
“খুব বেশি খারাপ লাগছে না, আবার তেমন ভালোও লাগছে না। মাঝামাঝি।”
“ডাক্তার বলেছে– তোর শরীরে বিষাক্ত কিছু ঢুকেছে। কখন কী খেয়েছিলি সে-সব কথা জিজ্ঞেস করছিল।”
“ওহ আচ্ছা! আব্বা মা কেউ আসেনি?”
“উনাদের জানানো হয়নি। কল দিয়েছিলাম– আন্টি বলল কী এক কাজে দুজনে তোর নানাবাড়িতে গিয়েছে। আজ রাতে ফিরতে পারবে না। তোকে বলতে বলল। তাছাড়া ডাক্তার বলেছে তোর অবস্থা আহামরি খারাপ না। শরীর দূর্বল। স্যালাইন দিলে ঠিক হয়ে যাবে। তাই তাদেরকে আর কিছু জানালাম না। ”
“জায়েদা কোথায়?”
“থানায়। দারোগা সাহেবকে কল দিয়েছিলাম। তিনি এসে জায়েদাকে নিয়ে গিয়েছেন। পুলিশের হেফাজতে রাখবেন।”
“ভালো।”
“শরীর কেমন লাগছে? ডাক্তারকে ডেকে আনব।”
“এখন আর ডাকতে হবে না।”
“সে কথা বলার সুযোগ নেই। ডাক্তার বলেছে– তোর জ্ঞান ফিরলেই যেন তাকে ডেকে নিয়ে আসি। চেক-আপ করবে।”
বাদশা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। ফিরলও বেশ দ্রুত। ডাক্তার সাহেবকে পায়নি। তিনি হাসপাতালে নেই। মাঝবয়েসী একজন নার্স এসেছে। সে এসেই আমার বাম হাতের কব্জিতে হাত রাখল। অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “বাবার শরীর এখন কেমন?”
“মোটামুটি। খুব বেশি খারাপ লাগছে না।”
“এইতো আলহামদুলিল্লাহ। চিন্তা করো না। শরীর ঠিক হয়ে যাবে।”
আমি মাথা দোলালাম। সে স্টেথোস্কোপটা আমার বুকের উপর চেপে ধরতে ধরতে বলল, “এর আগে কখনো এমন হয়েছে? হঠাৎই শরীরের ভেতরে খারাপ লাগা, অস্থিরতা। শরীর ঘেমে যাচ্ছে। এমন কিছু কী হয়েছে? একটু চিন্তা করে বলো।”
বেশ খানিকক্ষণ চিন্তাভাবনা করে তেমন কিছু মনে পড়ল না। মাথা দুলিয়ে না বললাম। নার্স বলল, “আরও একটু চিন্তা করো। তোমার শরীরের অসুস্থতা একদিনের না।”
“কেন? আমার কী এমন হয়েছে?”
“প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে– তোমার শরীরের বি’ষা’ক্ত কিছু ঢুকছে। কী বি’ষ সে ব্যাপারে কোন ধারণা পাওয়া যায়নি। বেশকিছু টেস্ট করতে হবে। তারপর বোঝা যাবে।”
“ছাড়া পাব কখন?”
“ডাক্তার সাহেব বলতে পারবেন। আপাতত বিশ্রাম করো। খুব বেশি খারাপ লাগলে আমাদের জানাবে। ওষুধ দিয়ে যাব।”
নার্স মুচকি হাসলো। রুমের কয়েকটা বাতি নিভিয়ে দিতে বলে চলে গেল। বাদশা বলল, “চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা কর। খানিকক্ষণ ঘুমতে পারলে ফ্রেশ লাগবে।”
বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলাম। হালকা শীত লাগছে। গায়ে চাদর জড়াতেই কেমন ঘুম চলে এলো। লম্বা হাই তুললাম।
ঘুম ভাঙল বেলায়। ততক্ষণে ঘড়িতে নয়টা সতেরো। আব্বা মা এসেছে। মায়ের মুখ থমথমে। বাদশা নেই। ডাক্তার সাহেব অন্য সব রুগী দেখছে। কথা বলা নিষেধ। মাকে দেখে মনে হলো– চুপচাপ থাকতে তার একটু অসুবিধাই হচ্ছে।
ডাক্তার সাহেব সময় নিয়ে রুগী দেখেন। আমাকে আরও একটু বেশি সময় দিলেন। থমথমে গলায় বললেন, “ভালো করে চিন্তা করবে, তারপর প্রশ্নের জবাব দেবে।”
মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বললাম। ডাক্তার সাহেব বললেন, “হঠাৎ হঠাৎ শরীর খারাপ লাগে? গা গুলিয়ে বমি পায় এমন?”
“কখনো সখনো খারাপ লাগে।”
“শেষ কবে বমি করেছ বলতে পারবে?”
“কয়েকদিন আগে। সম্ভবত দুপুরের দিকে। বমি সাথে র’ক্তও দেখেছিলাম।”
ডাক্তার সাহেবের কপালে ভাজ পড়ল। চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, “বেশ কিছু টেস্ট করতে হবে। আমি বলে দিচ্ছি, ওরা স্যাম্পল নিয়ে যাবে।”
ডাক্তার চলে যেতেই মা হাফ ছেড়ে বাঁচল। বিচলিত গলায় বলল, “আল্লাহ রে! আমার ছেলেটার সাথে এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? দুইদিন পরপর কোন না কোন বিপদ লেগেই আছে।”
“তেমন কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি।”
“এই তোর ছোট চাচার বিয়ের কথা হওয়ার পর থেকেই একটা না একটা ঝামেলা লেগে আছে। কে তোরে এসব ঝামেলায় জড়াতে বলেছিল?”
“কেউ বলেনি।”
মা ভীষণ বিরক্ত হলো। ভ্রু কুঁচকে বাদশার বাবার দিকে তাকালো। বাবা বললেন, “ডাক্তার সাহেবের সাথে কথা হয়েছে। দুই এক দিনের আগে ছুটি পাবে না। আপাতত কেবিন খালি নেই। ওয়ার্ডেই থাকতে হবে।”
মা কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল।
হাসপাতালের জীবন বিরক্তির, সেই সাথে ভীষণ কষ্টের। সারাক্ষণ শুয়ে-বসে থাকতে হয়। আমার শরীর আগের চেয়ে ভালো। হাঁটাচলা করতে অসুবিধা হয় না, খাওয়াদাওয়া স্বাভাবিক। তবুও ডাক্তার সাহেব আমাকে ছাড়বেন না। চিকিৎসার পুরো ব্যাপারটা বাবার হাতে। তিনি নিয়ম করে ডাক্তারের সাথে কথাবার্তা বলছেন। নার্স এসে সকাল বিকাল র’ক্তের স্যাম্পল নিয়ে যাচ্ছে। রিপোর্ট কী হচ্ছে জানি না। আমাকে কেউ কিছু বলছে না। বাদশাকে জিজ্ঞেস করলে সে-ও চুপ করে থাকে।
আজ বুধবার। হাসপাতালে থাকার চার নম্বর দিন। বেলা পড়ে গেছে। চার দিনে বাইরে কী হয়েছে না হয়েছে জানি না। বাড়ির কেউ তেমন আসে না। সারাদিন মা থাকে, অফিস শেষ করে বাবা আসে, বাদশা আসে, দাদি প্রথম দিন এসেছিল। ফুফু পরপর দু’দিন এসেছে। ছোট চাচা আসেনি। কেন আসেনি জানি না। জিজ্ঞেস করা হয়নি।
আসরের আজান শেষ হওয়ার পরপর তিমু এলো। হাতে করে দু’টো গোলাপ, এক মুঠো বেলি ফুল নিয়ে এসেছে৷ ফুলগুলো বিছানার উপর রাখতে রাখতে বলল, “সাজ্জাদ ভাই, তোমার শরীর কেমন আছে?”
“শরীর ভালো। সবকিছু ঠিকঠাক।”
“তা ভালো। এই নাও, আপেল খাও।”
আপেলের রং টকটকে লাল। বাজারে এত লাল আপেল দেখা যায় না। বেশ রসালো এবং মিষ্টি। ভালো লাগছে খেতে। আপেল চিবুতে চিবুতে তিমু দিকে তাকালাম৷ কেমন উদাসীন হয়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে বললাম, “কী হয়েছে? তোকে এমন বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন?”
“তেমন কিছু হয়নি। হাসপাতালের পরিবেশ আমার ভালো লাগে না।”
“আচ্ছা, একটা কথা বল।”
“কী কথা?”
“ছোট চাচা কোথায়? তাকে তো দেখলাম না।”
“ছোট মামা জে’লে। তার নামে কে’স হয়েছে।”
“কে’স! কিসের কে’স?”
“এটেম টু মা’র্ডা’র।”
“কী বলছিস এগুলো? ছোট চাচা কাকে খু’ন করতে চেয়েছে?”
“তোমাকে।”
তিমু খুব সহজ গলায় কথাটা বলল। ছোট চাচা আজকাল আমাকে আর পছন্দ করে এ কথা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু তার জন্য মা’র’তে চাইবে? এ কথা কী বিশ্বাসযোগ্য?
“তিমু, মজা করিস না। সত্যি কথা বল।”
“আমি কী কখনো তোমায় মিথ্যে কথা বলেছি?”
“না, তা বলিস না।”
“তাহলে?”
“দেখ তিমু, হেয়ালি করিস না। কী হয়েছে? আমায় সবকিছু খুলে বল।”
“ছোট মামা তোমাকে মা’র’তে চেয়েছিল। স্লো পয়জন ব্যবহার করেছে। তানহার বাবার সাথে হাত মিলিয়েছে।”
ছোট চাচাকে কতটা ভরসা করি জানা নেই। তবে ব্যাপারটা মানতে বেশ ধাক্কা লাগল। বুকের ভেতর ব্যাথা শুরু হলো। তিমু বলল, “সেদিন তুমি বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই ছোট মামা কোথাও একটা গিয়েছিল। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। সে ঘরের ভেতরে ঢুকেই বেরিয়ে গেল।”
“তারপর?”
“কারেন্ট নেই। ভ্যাপসা গরম। বড় মামা বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরেছে। সারা বিকেল ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে ঘেমেটেমে একাকার অবস্থা। বাইরে হালকা বাতাস বইছে। বড় মামা তেঁতুল গাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে বসে ছিলেন। ছোট মামা বড় মামাকে দেখতে পায়নি। সে গাছের সাথে হেলান দিয়ে তানহার নানির সাথে কথা বলতে শুরু করে।”
তিমু থামল। আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। বোতলের ছিপি খুলে ঢকঢক করে সব পানি খেয়ে ফেললাম। ছোট চাচার সাথে কবে আমার এত শত্রুতা জন্মেছে? বাইরের লোকের কথায় নিজের ভাইয়ের ছেলেকে মা’র’তেও তার বুক কাঁপল না?
“কষ্ট পেও না সাজ্জাদ ভাই। জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটে যা আমরা বিশ্বাস করতে পারি না।”
“কষ্টের অনুভূতি কী এড়িয়ে যাওয়া যায় তিমু? আমি বুঝতে পারছি ছোট চাচা আমার পছন্দ করে না। সে আমার জানের শত্রু। তারপরেও আমার কষ্ট হচ্ছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আমার ভেতরে যে কষ্ট হচ্ছে এটাকে আমি মিথ্যা বলব কী করে?”
“ছোট মামার দোষ কোথায় জানি না। তবে সে আমার চোখে ভয়ংকর রকমের অপরাধী।”
তিমু গোটা ঘটনা খুলে বলল। ছোট চাচা বাবাকে দেখতে পায়নি। সে তানহার নানিকে কল দিয়েই রাগারাগি শুরু করে। আমাকে এতদিন ধরে স্লো পয়জন দিয়েছে। তেমন কোন কাজ হয়নি। এতে তার কী দোষ? তানহার নানি যেভাবে বলেছে সে ঠিক সেইভাবেই কাজ করেছে। নিয়মমাফিক আমার ঘরের পানির বোতলে স্লো পয়জন মিশিয়ে দিয়েছে। পয়জন কাজ না করলে তার তো কিছু করার নেই। তার সাথে ডিল হয়েছিল– তারা যে জিনিস দিবে ওইটা আমাকে খাওয়াতে হবে। ওষুধ ধীরে ধীরে কাজ করবে, শরীরের পরিবর্তনও আসবে খুব ধীরে। কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। ডাক্তার দেখালেও তেমন কিছু ধরা পড়বে না। খেতে না পারা, বমি বমি ভাব এগুলোতে সাধারণত গ্যাসের সমস্যা ধরা হয়। গ্যাসের ওষুধ খেতে খেতে শরীরের যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে। তখন আর কিছুই করার থাকবে না।
বাবা এই কথা শুনে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যান। তার আপন ছোট ভাই তার ছেলেকে মে’রে ফেলতে চাইছে– এ কথা বিশ্বাস করা তার জন্য শুধু কষ্টকর নয়, রীতিমতো অসম্ভব। বাবা সাথে সাথে কোন প্রতিক্রিয়া দেখান না। ছোট চাচার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তবে তার কথা শেষ হয় না। এক পর্যায়ে সে বাবাকে দেখে ফেলে। তারপর কী বলবে বুঝতে পারে না।
বাবা উঠে ছোট চাচাকে মা’র’তে শুরু করেন। মে’রে মে’রে আধম’রা বানিয়ে পুলিশকে কল দেন। ছোট চাচা পুলিশের সামনে সব স্বীকার করেছে। তানহার নানির কথায় সে এই কাজ করতে রাজি হয়েছে। তানহার নানি আলাদা করে ছোট চাচার সাথে কথা বলেছে।
সেদিন ছোট চাচা অফিসে বসে ফাইল ঘাঁটছিল। হঠাৎই তানহার নানি তার সামনে গিয়ে বসল। হালকা গলায় বলল, “খরচ কিছু জানো?”
ছোট চাচা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো। সরু গলায় বলল, “কি খরব জানবো?”
“তোমার ভাইপো সাজ্জাদের সাথে তানহার বিয়ের কথা চলছে।”
ছোট চাচার কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করেনি। সে বেশ তীক্ষ্ণ গলায় বলেছে, “বাজে কথা বলবেন না। এই ধরনের আজগুবি কিছু ঘটবে না।”
“আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? সে আমার কথা বিশ্বাস না-ই বা করলে। নিজের চোখে দেখলে তো বিশ্বাস করবে।”
“নিজের চোখে এমন কিছু দেখব না।”
“দেখবে দেখবে। দুটো দিন অপেক্ষা করো। আমরা সবাই তোমাদের বাড়িতে যাব। তোমাকে জানিয়েই যাব৷ তবে তোমার বাড়ির লোকেরা তোমাকে এই কথাটা লুকিয়ে যাবে।”
ছোট চাচা তখন তার আর কোন কথা শোনেনি। বের করে দিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে ওই মহিলার কথাই সত্যি হয়েছে। তারা যে আমাদের বাড়িতে এসেছিল দাদি এ কথা ছোট চাচাকে বলতে নিষেধ করেছিলেন। আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়েই নিষেধ করেছিলেন। এই ঘটনার পর ছোট চাচার বাড়ির সবার উপর দিয়ে বিশ্বাস উঠে যায়। অবশ্য বিশ্বাস উঠে না যাওয়ার কোন কারণ ছিল না। তানহার নানি, মা আমাদের বাড়িতে এসে পাত পেড়ে খেয়ে চেয়েছে। দাদি মাকে রান্নাবান্না করতে বলেছিল– সেই কথার রেকর্ডও শুনেছে। এরপর তানহার নানিকে অবিশ্বাস করার কিছু থাকে না।
তানহার নানি শুধু আমাদের পরিবারের মধ্যে ফাটল ধরাতে চায়নি। সে রীতিমতো ছোট চাচাকে আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছে। টাকা অফার করেছে। আমাকে মা’র’তে পারলে ছোট চাচাকে বিশ লাখ টাকা দেবে, সেই সাথে তানহার সাথে বিয়ের ব্যাপারটাও দেখবে। ছোট চাচা সাত পাঁচ চিন্তা করেনি। রাজি হয়ে গিয়েছে। মানুষ কী এভাবে সম্পর্ক ভুলে যায়? আসলে মানুষই সম্পর্ক ভুলে যায়।
সন্ধ্যা নেমে গেছে। তিমু চুপচাপ বসে পা দোলাচ্ছে। কথা বলছে না। ওকে দেখে খুব দুঃখিত মনে হচ্ছে। তিমুকে ডাকব, ঠিক সেই সময়ই বাদশা ঢুকলো। নরম গলায় বলল, “তোর শরীর কেমন আছে?”
“ভালো লাগছে। তোকে একটা প্রশ্ন করব?”
বাদশা হাতে ধরে রাখা পেপার ব্যাগ থেকে আঙুরফল বের করে বাটিতে রাখছিল। সে সেই কাজে ব্যস্ত হয়ে আনমনে বলল, “হ্যাঁ, বল না। কী বলবি?”
“ছোট চাচা আমাকে বি’ষ দিয়েছে এই কথা কী তুই জানিস?”
বাদশা চমকে আমার দিকে তাকাল, পরক্ষণেই চোখ ঘুরিয়ে তিমুর দিকে তাকালো। আমি বললাম, “তোরা সবাই আমার থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখতে চাইছিস কেন?”
“ডাক্তার বলেছে– তোকে কোন ধরনের মানসিক আ’ঘা’ত দেওয়া যাবে না। এতে তোর শরীরের বড় রকমের ক্ষতি হতে পারে।”
“আল্লাহ চাইলে তেমন কিছু হবে না।”
বাদশা কিছু বলল না, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আমি বললাম, “জায়েদার ব্যাপারে আর কী হয়েছে?”
“জায়েদার বাবা মায়ের বিরুদ্ধে পুলিশকে বিভ্রান্ত করায় দায়ে কে’স হয়েছে। তানহার নানিও এখন জে’লে। সে তানহার বাবার কথায় প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়ে এসব করে ফেলেছে। তার উদ্দেশ্য ছিল– তার মায়ের সংসার যেমন মাঝ নদীতে ডুবতে বসেছে। তোদের সংসারেও তেমন আ’গু’ন জ্বালিয়ে দেবে। সে সবকিছু স্বীকার করেছে।”
“সবুজের ব্যাপারটা কী?”
“ওই ব্যাপারও অনেকটা ওদের পরিকল্পনা। যেদিন আমরা দোকানদারের সাথে কথা বলে সবুজের ব্যাপারে জেনেছিলাম। সেদিন জায়েদার বাবাও দোকানদারের সাথে কথা বলেছে। দোকানদার জায়েদার বাবাকে আমাদের কথা বলে দেয়। তারপর আর কী। ওরা পরিকল্পনা করেছিল– আমাদের দু’জনকেই মে’রে নদীতে ফেলে দেবে। জায়েদাকে আগে থেকে বুঝিয়ে পড়িয়ে রেখেছিল। তানহার নানি নিজে গিয়ে সব ঠিকঠাক করে এসেছে। তবে শেষ মুহূর্ত জায়েদা ওদের কথা শোনেনি। আমাদের পালাতে সাহায্য করেছে।”
“ওইদিন কী হয়েছিল?”
“যাচ্ছিলাম, হঠাৎই পেছনে ঘুরে দেখি তুই মাটিতে পড়ে আছিস। তড়িঘড়ি করে তোর কাছে এলাম। জায়েদা বলল– জ্ঞান নেই। হাসপাতালে নিয়ে যেতে। ভাগ্য সহায় ছিল। কয়েক পা সামনে যেতে দেখি খানিক দূরে একটা ভ্যান পড়ে আছে। দুজনে ধরাধরি করে তোকে ভ্যানের উপর তুললাম। নদী পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে ফোনে নেটওয়ার্ক চলে এসেছিল। দারোগা সাহেবকে কল দিতে তিনি এসে তোকে হাসপাতালে ভর্তি করলেন।”
“আব্বা মাকে জানিয়েছিলি?”
“হ্যাঁ, জানিয়ে ছিলাম। ওইদিনই তোর ছোট চাচা ধরা পড়েছে তাই উনাদের আসতে দেরি হচ্ছিল। এই কথা তোকে বলা যেত না, সেজন্যই নানাবাড়ির কথা বলেছিলাম।”
“ওহ! সবাই তো জে’লে। কোর্টে হাজিরা কবে?”
“সে কথা এখনও জানি না। তবে খুব শীগ্রই পড়বে। চিন্তা করিস না।”
মা এসেছে। রাতের খাবার নিয়ে এসেছে। লাউয়ের পাতা দিয়ে চিংড়ি মাছ ভর্তা, দেশি মুরগী ঝাল। আমি সব জেনে গেছি এই কথা মাকে বুঝতে দিলাম না। শান্ত, স্বাভাবিক রইলাম।
বাইরে শান্ত স্বাভাবিক দেখালেও তেমন লাভ হলো না। সময়ের সাথে সাথে অসুস্থ হতে শুরু করলাম। কেমন অদ্ভুত লাগছে৷ নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, চোখ বুঁজে যাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে মা নার্সদের ডাকতে গেলেন। আশেপাশের সবাই ছুটে এসেছে। উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সিনিয়র নার্স এসে আমাকে ঘুমের ইনজেকশন দিলো। তরল গলায় বলল, “ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দিচ্ছি। খানিকক্ষণ ঘুমতে ঠিক হয়ে যাবে।”
মা ভেবেছিল নার্স মিথ্যে কথা বলেছে। সে ছুটে গিয়ে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড থেকে ডাক্তার ডেকে নিয়ে এলো। ততক্ষণে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।
সকাল দশটার দিকে ডাক্তার সাহেব আমাকে দেখাতে এলেন। রিপোর্ট আগের চেয়ে ভাল। শরীরের বি’ষক্রিয়া কমতে শুরু করেছে। বাবা বললেন, “এখনও কী ভর্তি রাখতে হবে নাকি বাড়িতে নিয়ে যেতে পারব?”
ডাক্তার সাহেব বললেন, “বাড়িতে নিয়ে যান। তিন দিন পরপর টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট দেখিয়ে যাবেন। আমি ওষুধ লিখে দিচ্ছি। আপাতত এগুলোই চলুক।”
বাবা আমাদের গাড়িতে তুলে দিয়ে অফিসে চলে গেলেন। বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে বসেছি। বাদশার কল। কলেজে যেতে হবে৷ স্যার সবাইকে যেতে বলেছে। ভীষণ জরুরি। শরীরের অবস্থা ভালো। হাঁটা-চলা করতে অসুবিধা হচ্ছে না। ব্যাগপত্র গুছিয়ে কলেজের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লাম।
কলেজ থেকে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কাজকর্ম বিশেষ কিছু না। কয়েকটা কাগজে সই করতে হবে। লম্বা লাইনের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে এত সময় চলে গেল। তড়িঘড়ি করে বাড়ি ঢুকলাম। খিদেয় পেট জ্বলছে। দুপুরের ওষুধ খেতে হবে। মা বেশ কয়েকবার কল দিয়েছিল।
বাড়িতে ঢুকতেই দেখি চিৎকার চেঁচামেচি। দাদি মায়ের সাথে ঝগড়া করছেন। মা-ও কিছু কম যাচ্ছে না। তীক্ষ্ণ এবং তীব্র গলায় প্রতিটা কথার জবাব দিচ্ছেন। আমি গিয়ে মাকে থামালাম। মা বলল, “তোর দাদি বাড়িতে উকিল ডেকেছে। তামিমের জামিনের ব্যাপারে কথাবার্তা বলেছে। যে আমার ছেলেকে মা’র’তে চাইছে তার জামিন করার জন্য এত তাড়াহুড়ো কিসের? দু’দিন জে’লের ভাত খেলে কী সে ম’রে যাচ্ছে?”
দাদি চুপ রইলেন না। শক্ত মুখে বললেন, “আমার ছেলে জে’লে আটকে আছে। আমি মা হয়ে তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করব না তো আর কে করবে? তোমরা করবে? তোমরাই তো পুলিশ ডেকে তাকে ধরিয়ে দিয়েছ।”
মা বলল, “বেশ করেছি ধরিয়ে দিয়েছি। আমি পারলে তখনই ফাঁ’সি দিয়ে দিতাম।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমরা সবাই তো ও-ই চাও।”
“হ্যাঁ, চাই। আপনি যেমন আপনার খু’নি ছেলেকে বাঁচাতে উকিল ধরেছেন। আমিও তেমন আমার ছেলের খু’নিকে জে’লের ভাত খাওয়াতে উকিল ধরব।”
“খু’নি বলছ কাকে? তোমার ছেলে কী ম’রে গেছে? এইতো এখনো সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
মা কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। শান্ত গলায় বললাম, “ দাদি, আমি আপনার কী হই না হই এই প্রশ্নে যেতে চাই না। আপনি আপনার ছেলে নিয়ে চিন্তিত থাকবেন এটা খুব স্বাভাবিক। তবে আপনাকে একটা ছবি দেখাই।”
পকেট থেকে মোবাইল বের করে দাদিকে একটা ছবি দেখালাম। একজন মহিলা মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে, পাশে তার ছেলের হাত হাতকড়া। দুজন পুলিশ ছেলের দুই হাত ধরে রেখেছে।”
দাদি ছবি দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। সরু গলায় বললেন, “এসব কী?”
“এই লোকের যাবত জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সে কারণে তার মা কাঁদছে। এবার আসল কাহিনি শুনুন। এই লোক যৌতুকের টাকা দাবি করে বউয়ের গায়ে আ’গু’ন দিয়ে বউকে পু’ড়ি’য়ে মে’রে ফেলেছিল। তখন এই মা ছেলের কোন দোষ দেখেনি। ছেলের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেনি। আজ এতদিনে তার ছেলে উচিত শা’স্তি পাচ্ছে। তখন কপাল চাপড়ে কাঁদছে। অপরাধীদের কোন ধর্ম বর্ণ হয় না, তারা কারো আত্মীয় অনাত্মীয়ও না। তাদের পরিচয় তারা অপরাধী। সময় থাকতে ঠিককে ঠিক, ভুলকে ভুল বলতে শিখুন। পরবর্তীতে আফসোস করতে হবে না।”
দাদি কিছু বললেন না। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। এবার সবকিছুর সমাধান হওয়া উচিত। এভাবে আর ভালো লাগছে না।
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৬
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১০
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৪
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৪
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৭
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক