Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬০.২


#শেষ_পাতায়_সূচনা [৬০.২]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি [রোমান্টিক এলার্ট
]
—কিহ্হ্হ্হ্?
ছেলের এমন অপ্রীতিকর উত্তর শুনে অজান্ত বেগমের মুখ দিয়ে আপনাআপনিই কথাটি বের হয়ে যায়। তার বলা শব্দটির আওয়াজ ছিল স্বাভাবিকের চেয়েও একটু বেশিই। লজ্জা পেয়ে বেচারি তাড়াতাড়ি করে বেরিয়েই আসেন ছেলের রুম থেকে।
অন্যদিকে শ্বাশুড়ি মায়ের গলার আওয়াজ শুনে আরওয়ার হুঁশ ফিরে। তার সাথে সাথে আরিয়ানেরও। আরওয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়। তার প্রাণপ্রিয় স্বামী যে কত বড় একটা লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, সেটা অনুধাবন হতেই রাগে তার ভেজা শরীরটা জ্বলে ওঠে।
আরওয়া ওয়াশরুমের থাকা মগ এনে ধুমধাম বা”রি লাগায় আরিয়ানের পিঠে। বস্ত্রহীন শরীরে সেই বারির আঘাত সামান্যই লাগে, তবে লাগে। আরওয়া রা’গে চি”বিয়ে চি”বিয়ে বলে–
—অ্যাঁই অসভ্য লোক! কি করলেন এটা? মায়ের সামনে কি বললেন? আমি এখন লজ্জায় মায়ের সামনে যাবো কি করে?
ভুল যেহেতু করেই ফেলেছে ঝাড়ি, বকা আর উত্তম-মধ্যম খাওয়াও ফরজ হয়ে গিয়েছে বুঝতে পেরে,, আরিয়ান অপরাধীর ন্যায় মুখ করে বলে–
—গালতি সে মিস্টেক হো গেয়া জানেমান। সরি।
—আপনার সরি গুলিয়ে খান অসভ্য, নির্লজ্জ লোক। মনটা চাচ্ছে… মনটা চাচ্ছে…
রাগে বিরক্তি এসে পড়ে আরওয়ার। তারা স্বামী-স্ত্রী ওয়াশরুমে একসাথে শাওয়ার নিচ্ছে, বিষয়টা আবার তার মা-তুল্য শ্বাশুড়ির কাছে তারই গুনধর স্বামী জানিয়েছে। কত লজ্জাজনক একটা অবস্থা পড়বে সারাটা দিন আরওয়া সেটা কি এই লোক বুঝে? সে তো চলে যাবে অফিস, বাড়িতে সারা দিন অজান্তা বেগমের সাথে থাকবে আরওয়া। কথা না হোক, চোখাচোখি হলেই তো আরওয়া লজ্জার সাগরে ডুবে ম””রবে।
আরওয়া যখন এসব ভাবতে ব্যস্ত, আরিয়ান তখন সুযোগ বুঝে ভেজা টাউজার পরেই বাহিরে চলে যায়। নিজের প্রেস্টিজ নিয়ে তার এত চিন্তা না থাকলেও, যেই ব্লান্ডার সে করে ফেলেছে এর জন্য বউটা সেই লেভেলের রেগে আছে। ইতিমধ্যে পিঠে দু’টো মগের বা”রি খেয়েই বুঝতে পেরেছে সে আরওয়ার রাগের প্রখরতা। তাই এখন আরওয়ার সামনে না থাকাটাকেই সেফ মনে করছে।
আরিয়ান বাহিরে এসে চটজলদি শুকনো কাপড় পরে নেয়। তারপর আরওয়াকেও নতুন জামাকাপড় দিয়ে ভেজা ফ্লোরটা মুছে নেয়। ফ্লোর মোছা হতেই আরওয়া বের হওয়ার আগেই হুড়তুড় করে অফিসের জন্য রেডি হয়ে নেয়। নিচে গিয়ে কোন দিকে না তাকিয়ে স্ট্রেট নিচের দিকে তাকিয়ে খেয়েই বাড়ি ছাড়বে। আসবে একদম সন্ধ্যায়, ততক্ষণে নিশ্চয়ই পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। অফিসের জন্য লেট হয়ে যাচ্ছে দেখে আরিয়ান নাকেমুখে খাবার খেতে থাকে। তাকে এত তাড়াহুড়ো করতে দেখে আরওয়ার মা বললেন–
—আরিয়ান বাবা, এত তাড়াহুড়ো করে খেয়ে নেই খাবার। পরে হজমে সমস্যা হবে। সময় নিয়ে ভালো করে চিবিয়ে খাবার খেতে হয় বাবা।
শ্বাশুড়ি মায়ের কথায় আরিয়ান নিজের খাওয়ার স্পিডটা একটু কম। এরই মাঝে আরওয়াও এসে পড়ে খেতে। আরওয়া আসতেই তার সাথে চোখাচোখি হয় একদফা আরিয়ানের। আরওয়া রাগে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তারপর মুখটা আরেকটু নামিয়ে নিজেও খেতে বসে পড়ে।
আরিয়ান খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় অফিসের জন্য। তবে দিনের বাকিটা সময় আরওয়ার জন্য এতটাও লজ্জা বা অস্বস্তিকর হয় না। উপরওয়ালাই তাকে সহায়তা করে এর জন্য অবশ্য। অজান্তা বেগমের ভাইয়ের ছেলের পুত্র সন্তান হওয়ায়, সে খবর পাওয়া মাত্রই ভাইয়ের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আহনাফ সাহেবও যান তার সাথে। বাড়িতে থেকে যায় মেইড, আরওয়া ও তার মা।
আরওয়ার ভাই রাসেল ও তার ভাবী সিলেট ফিরে গেলেও, তার মা থেকে গিয়েছেন কিছুদিন। আরিয়ান, আহনাফ সাহেব ও বিশেষ করে আরওয়ার আবদারে থাকতে রাজি হয়েছেন তিনি। দিন টুকু আরওয়া তার মায়ের কাছে সাংসারিক বিভিন্ন উপদেশ ও নতুন নতুন রান্নার রেসিপি শিখেই কাটিয়ে দেয় বেশ ভালো ভাবেই।


জাওয়াদের আজ তেমন কোন কাজ না থাকায়, সে লাঞ্চ আওয়ারেই অফিস থেকে বের হয়ে গিয়েছে। তার বর্তমান উদ্দেশ্য, বউয়ের অফিসে গিয়ে তাঁকে বগলদাবা করে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়া। তাজওয়াদ আজ বাসাতেই আছে তার দাদাভাই আর পিপির সাথে। জিনিয়ার ইমপোর্টেন্ট ক্লাস নেই বলে, সে আজ বাসাতেই থাকবে। তাই তাজওয়াদকে স্কুল থেকে আনার ও এরপরের কাজগুলো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। বোনের উপর ছেলের দায়িত্ব দিয়ে সে নিশ্চিন্তে প্রেয়সীর সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করবে আজ।
যেই ভাবা সেই কাজ। দুপুর বারোটার ভারী জ্যামজট পাড় করে জাওয়াদের গাড়ি এসে থামে আহমেদ গ্রুপের অফিসের সামনে। গাড়ি পার্ক করে অফিসে ঢুকেই জাওয়াদ সর্বপ্রথম জিজ্ঞেস করে নেয় পূর্ণতা অফিসে আছে নাকি? কারণ পথিমধ্যে সে কয়েকবার পূর্ণতাকে ফোন দিয়েছিল, ফোনটা পূর্ণতা রিসিভ করেনি। পূর্ণতার এসিস্ট্যান্ট আগে ছিল আরওয়া, কিন্তু সে বর্তমানে ভাইয়ের বউ হওয়ায় পূর্ণতা এসিস্ট্যান্টহীনতায় রয়েছে। অগত্যা জাওয়াদকে নিজেই এসে জানতে হচ্ছে, পূর্ণতা অফিসে রয়েছে নাকি কোন সাইট ভিজিটিংয়ে গিয়েছে।
রিসেপশনিস্ট জানায়, পূর্ণতা অফিসেই রয়েছে। এবং বর্তমানে তার একটি মিটিং চলছে এক ক্লাইন্টে সাথে। জাওয়াদ তথ্যটা জানার পর ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসে।
আধা ঘণ্টা পর পিওন এসে জানায়, পূর্ণতার মিটিং শেষ হয়েছে। জাওয়াদ খবরটা শুনে, ওয়েটিং থেকে বেরিয়ে পূর্ণতার কেবিনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু মাঝপথেই কিছু অযাচিত ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে ক্রোধে তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
জাওয়াদ দেখে, বয়স ত্রিশের কাছাকাছি এক পুরুষের বাহুতে ঝুলে আছে পূর্ণতা। আর পুরুষটির পূর্ণতার কোমড় আঁকড়ে ধরে তাকে পড়া থেকে বাঁচিয়েছে।
—পূর্ণ…
গুরুগম্ভীর গলায় স্বাভাবিকের থেকেও বেশ খানিক উঁচু গলায় ডাক দেয় জাওয়াদ পূর্ণতাকে। জাওয়াদের গলার স্বর শুনে পূর্ণতা চটজলদি নিজে পরপুরুষের বাহু থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁকে ধরে রাখা লোকটি এরই মাঝে জিজ্ঞেস করে–
—আপনি ঠিক আছে মিস পূর্ণতা ?
কিন্তু পূর্ণতা তার প্রশ্নের দিকে কোন ধ্যান না দিয়ে চপল পায়ে হেঁটে চলে যায় জাওয়াদের কাছে। সিচুয়েশন ও জাওয়াদের আগমন উভয়ই পূর্ণতাকে কিছুটা ঘাবড়িয়ে দিয়েছে। সে জাওয়াদের কাছে এসে তার বাহু চেপে ধরে অস্থিরতা নিয়ে চাপা গলায় সাফাই দিতে চায়–
— শাড়ি আঁচলে পাড়া লাগায় পরে যেতে নিয়েছিলাম, তাই উনি…..
জাওয়াদ পূর্ণতাকে কথা শেষ হওয়ার আগেই থামিয়ে দিয়ে থমথমে গলায় বলে–
—ইউ ডোন্ট নিড টু এক্সপেল এনিথিং। আই ট্রাস্ট ইউ মোর দ্যান মাই লাইফ।
পূর্ণতা জানে জাওয়াদ তাঁকে সীমাহীন বিশ্বাস করে। কিন্তু তবুও সে নিজেকে জাওয়াদের কাছে স্বচ্ছ রাখতে চায়। এতে কেন জানি সে নিজেই মানসিক শান্তি পায়।
পূর্ণতা জাওয়াদের বাহু চেপে ধরে কিছুক্ষণ আগের লোকটির সামনে নিয়ে আসে। তারপর সৌজন্য মূলক হাসি দিয়ে জাওয়াদের সাথে লোকটির পরিচয় করিয়ে দিতে বলে–
—ইনি হচ্ছেন আমার হাসবেন্ড জাওয়াদ শেখ। আর তাজের পাপা, ইনি হচ্ছেন আমাদের নতুন ক্লাইন্ট। নাভিদ রহমান। আজই উনার সাথে ডিল সাইন হয়েছে আমাদের কোম্পানির।
জাওয়াদ নাভিদের সাথে ম্যানলি হ্যান্ডশেক করে। পরিচয় পর্ব শেষ করে নাভিদ হঠাৎই বলে বসে–
—মিসেস পূর্ণতা আপনি যে বিবাহিত আর এক বাচ্চার মা তা আপনাকে দেখলে মনেই হয় না।
—হাতে গোল্ডের চুড়ি আর নাকে জ্বলজ্বল করতে থাকা নাকফুল থাকার পরও পূর্ণকে যদি বিবাহিত মনে না হয়, তাহলে আমি বলবো, অতিশীঘ্রই আপনার চোখের ট্রিটমেন্ট দরকার মি.রহমান।
বাংলাদেশের সমাজের প্রেক্ষাপটে, এই দুটো অলংকারই তো বিবাহিত নারীরাই বেশি ইউজ করে। এটা তো একটা কমনসেন্স। তাই নয় কি মি. নাহিদ রহমান?
জাওয়াদের মুখের উপর জবাব দেওয়ায় নাভিদের মুখে একদম তালা লেগে যায়। সে চলে যেতে চাইলে পূর্ণতা লাঞ্চ করে যাওয়ার অফার দেয়। কিন্তু নাভিদ ভদ্র ভাবে সেই অফার ফিরিয়ে দিয়ে চলে যায়।
পূর্ণতা জাওয়াদকে নিয়ে চলে আসে নিজের কেবিনে। পিওনকে লাঞ্চ রেডি করতে বলে সে গিয়ে বসে জাওয়াদের সামনে। জাওয়াদের গম্ভীর মুখ দেখেই বুঝে যায় লোকটা চরম বিরক্ত। পূর্ণতা শব্দ করে শ্বাস ফেলে নিজের মাথাটা জাওয়াদের কাঁধে রেখে বলে–
—আজ হঠাৎ আমার অফিসে কি মনে করে?
—কিছুটা এমনিই এসেছিলাম, চলে যাচ্ছি।
কথাটা বলে সে পূর্ণতার হাত ছাড়িয়ে উঠে যেতে চায়, কিন্তু পূর্ণতা ছাড়ে না তার হাত। শক্ত করে ধরে রাখে।
—ইট ওয়াজ অ্যান এক্সিডেন্ট জাওয়াদ।
—আমি জানি, কিন্তু তাও আমি তোমার শরীরে অন্যকারো স্পর্শ মেনে নিতে পারছি না। প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছে আমার।
—তাহলে নিজের স্পর্শ দ্বারা সেই অযাচিত স্পর্শ মুছে দিন আমার অঙ্গ থেকে।
—আইডিয়া মন্দ না।
কথাটা পূর্ণতা আনমনেই বলেছিল, যাতে জাওয়াদের ভাবনা গুলো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা থেকে সরে অন্যদিকে যায়। কিন্তু এটা বলে যে সে নিজেই নিজের জন্য কুয়ো খুঁড়ল, সেটা বেচারি বুঝতেই পারল না।
জাওয়াদ হঠাৎই বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়, তারপর সোফায় বসা পূর্ণতাকে ঝট করে কোলে তুলে সোফাতেই শুয়ে দেয়। জাওয়াদ অপরাপর একেকটি কাজে পূর্ণতা থতমত খেয়ে যায়। সে শোয়া থেকে উঠতে উঠতে বলে–
—কি করছেন এগুলো?
জাওয়াদ তাকে উঠতে দেখে খানিক ধমক দিয়ে বলে–
—চুপচাপ শুয়ে থাকো। শোও বলছি।
জাওয়াদের ধমক খেয়ে পূর্ণতা ঠোঁট ফুলিয়ে শুয়ে পড়ে। জাওয়াদ পূর্ণতার কেবিনে থাকা এটার্চ রুমের ওয়াশরুমের গিয়ে একটা টাওয়াল, মগে করে পানি আর সাবান নিয়ে আসে। লুফা না থাকায়, টাওয়াল দিয়েই কাজ সারতে হবে তাকে।
জাওয়াদ জিনিস গুলো নিয়ে এসে পূর্ণতা সামনে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসে তার কোমড় থেকে শাড়ি সরিয়ে টাওয়ালে সাবান লাগিয়ে ডলে ডলে মুছতে থাকে জায়গাটা। একটু বেশিই শক্তি প্রয়োগ করে মোছার কারণে পূর্ণতার সাদা চামড়া লাল হয়ে ওঠে কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই। কিন্তু তাও সে একটা টু শব্দ করে না।
পূর্ণতা দেখতে চাইছে জাওয়াদ শেষ অব্দি কি করে। সময় নিয়ে ঘষাঘষি করার কারণে জায়গাটা অযাচিত স্পর্শ মুক্ত হয় ঠিকই, সেই সাথে লালচে বর্ণ ধারণ করে। জাওয়াদ টাওয়ালের শুকনা জায়গা দিয়ে মুছে, নিজের মুখ নামিয়ে এনে একের পর এক স্পর্শ দিতে থাকে নিজের ঠোঁটের।
কাজটা শেষ করতে সে কিছুটা সময় নেয়। সে যখন কাজটা শেষ করে ওঠে, তখনই কেবিনের দরজায় নক হয়। জাওয়াদ টাওয়াল, মগ আর সাবান নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলে, পূর্ণতা শোয়া থেকে উঠে পরিধেয় শাড়িটা ঠিক করে নেয় চট করে। তারপর গিয়ে পিওনের থেকে খাবারের ট্রে টা নেয়, এবং পিওনকে বলে দেয়, জাওয়াদ যতক্ষণ অব্দি তার অফিসে আছে কেউ যাতে তাঁকে ডিস্টার্ব না করে। কোন কাজ থাকলে ম্যানেজারের সাথে যেন কথা বলে। অতি গুরুত্বপূর্ণ কোন কথা বা কাজ ছাড়া যেন কেউ তার কেবিনে নক না করে।
পিওন অর্ডার দিয়ে পূর্ণতা কেবিনে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। জাওয়াদও ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে চলে এসেছে। জাওয়াদ এসে দেখে, তার প্রাণপ্রিয়ার মুখ ভার করে রাখা। সে বুঝতে পারে, তার ধমক আর তার কাজের জন্য প্রেয়সীর অভিমান হয়েছে। ব্যাপার না, অভিমানের কারণ যদি সেই তৈরি করতে পারে, তাহলে সেই অভিমান দূরও সেই করবে।
নিজের প্রিয়ার মন ভালো করতে জাওয়াদ তাকে নিজ হাতেই খাইয়ে দেয়। খাওয়ার সময় পূর্ণতা কোন কথাই বলে না, চুপচাপ খেতে খেতে কিছু কাজ সেড়ে নেয়। তার মন বলছে, জাওয়াদ যখন একবার তার অফিসে এসেছে তাঁকে নিয়েই বাসায় ফিরবে। তাই আগেভাগেই কাজগুলো শেষ করে নিচ্ছে।
তাদের দু’জনের খাওয়া শেষ হতে হতে পূর্ণতার কাজও শেষ হয়ে যায়। জাওয়াদ ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে দেখে পূর্ণতা ল্যাপটপ আর এলোমেলো ফাইলগুলো গুছিয়ে রাখছে। সে টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলে–
—তোমার আর কোন কাজ আছে পূর্ণ?
—তেমন একটা নেই।
সংক্ষিপ্ত আকারে জবাব দেয় পূর্ণতা। জাওয়াদ তার আড়ালে একটু হেঁসে নিয়ে বলে–
—তাহলে তো তোমায় নিয়ে একটা সফরে যাওয়া যেতেই পারে।
—সফর? কিসের সফর? কোথায় যাবো তাও এই মাঝ দুপুরে?
জাওয়াদ তার প্রশ্নটির তৎক্ষনাৎ জবাব না দিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়, তারপর হঠাৎই পূর্ণতার হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে তাঁকে দাঁড় করায়। একহাত দিয়ে পূর্ণতার কোমড় চেপে ধরে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় তাকে। তারপর নিজের মুখটা পূর্ণতার কানের কাছে নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে–
—ভালোবাসাবাসির সফরে, স্বর্গীয় এক সুখের রাজ্যে মাই লাভ।
জাওয়াদের কথাটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই বিস্ময়রে পূর্ণতার চোখজোড়া বড় বড় হয়ে যায়। এই লোক বলে কি এসব? মাঝ দুপুরে অফিসে বসে ভালোবাসাবাসির সফরে যেতে চাইছে। মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি?
পূর্ণতা তার বিস্ময় প্রকাশের জন্য মুখ খুলতে নিবে তখনই জাওয়াদের তপ্ত ঠোঁট জোড়া এসে আলগোছে জায়গা করে তার ঠোঁটের ভাঁজে। ভীষণ যত্ন নিয়ে প্রেয়সীকে ভালোবাসায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে জাওয়াদ ও তার ওষ্ঠদ্বয়। পূর্ণতা যদিও ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে একটু মোচড়ামুচড়ি করে, কিন্তু তার স্থায়িত্ব হয় কিছু সময়ের।
উপন্যাস, নাটক, সিনেমাতে পূর্ণতা সবসময় দেখে এসেছে পুরুষেরা তার প্রিয় নারীর সান্নিধ্যে আসলে দূর্বল হয়ে যায়। তাদের সকল জারিজুরি, রাগ, অভিমান বিলীন হয়ে যায়, যখন পুরুষটি তার ব্যক্তিগত নারীর স্পর্শ পায়। কিন্তু তার জীবন বরাবরই স্রোতের বিপরীতে চলেছে।
পূর্ণতা কেন জানি জাওয়াদের সাথে বেশিক্ষণ রাগ, অভিমান পুষে রাখতে পারে না। পূর্ণতার ভুল থাকা না সত্ত্বেও যদি জাওয়াদ পূর্ণতাকে বকা দেয়, এরপর জাওয়াদ এসে কয়েকবার মাফ চাইলেই পূর্ণতা মোমের মতো গলে যায়।
এই যে কিছুক্ষণ আগের ঘটনাতে, জাওয়াদ নিজের জেলাসি দূর করতে পূর্ণতাকে হার্ট করল। এতে কিন্তু পূর্ণতার নরম মনে বেশ খানিকটা অভিমানের মেঘ জমেছে। কিন্তু জাওয়াদ যেই ক্ষণে এসে তাঁকে নিজের ভালোবাসার স্পর্শে মাতোয়ারা করা শুরু করল, সেই ক্ষণেই পূর্ণতার মন থেকে অভিমানের মেঘ বিলীন হয়।
তাই বলে যে পূর্ণতা এই ধমকের ঝাঁজ তুলবে না, তা কিন্তু না। সে আসলের সাথে সুদও দিবে জাওয়াদকে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।
জাওয়াদ চুম্বমরত অবস্থায় পূর্ণতাকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয় রেস্ট রুমের দিকে। পূর্ণতা দুই হাত দিয়ে সযত্নে জাওয়াদের কাঁধ চেপে ধরে। রেস্ট রুমে প্রবেশ করে জাওয়াদ পা দিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে পূর্ণতাকে নিয়ে বেডে শুয়ে দেয়।
গায়ের কোর্ট আগেই খুলে রেখেছিল সে, শুধু শার্টটা রয়েছে বর্তমানে জাওয়াদের অঙ্গে। নিজেদের ওষ্ঠ একে অপরের থেকে মুক্ত করে জাওয়াদ দ্রুত হাত শার্টের বোতাম গুলো খুলতে থাকে। তাঁকে এত অস্থির হতে দেখে পূর্ণতা নিভু নিভু চোখ তাকিয়ে শ্বাস টেনে টেনে বলে–
—আজকের পর থেকে আগামী একমাস আপনার আমার কাছে আসা নিষেধ। এটা আমাকে ধমক দেওয়ার আর রুড ব্যবহার করার শাস্তি আপনার।
—প্রিয়তমাদের এত নিষ্ঠুরতায় মানায় না অনুরাগিনী আমার। তাদের এহেন নিষ্ঠুরতা আমাদের মতো প্রেমিক পুরুষদের অন্তরে পীড়ার কারণ হয়।
পূর্ণতা জাওয়াদের নাটুকেপনায় ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে দেয় মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। জাওয়াদ তার হাসি দেখে যেন বখাটেপনার করতে আরেকটু বেশি প্রশ্রয় পায়।
সে শার্টের কয়েকটা বোতাম খুলেই পূর্ণতার উপর আধশোয়া হয়। অন্যদিন জাওয়াদের ভাড় পূর্ণতার কাছে কষ্টকর না হলেও, আজ সে জাওয়াদকে নিতে পারে না নিজের উপর। তলপেটে ব্যথা অনুভব করে। তাই পূর্ণতা চোখমুখ কুঁচকে বলে–
—আপনি তো তাহলেই মোটু হয়ে গিয়েছেন তাজের পাপা। ভাড় লাগছেন।
পূর্ণতার কোঁচকানো মুখাবয়ব দেখে জাওয়াদ নিজের শরীরটা তুলে নেয়। কিছুটা একটা ভেবে বলে–
—পনেরো দিন ধরে নিয়মিত জিমে তিন ঘন্টা সময় দিচ্ছি। এতদিনে কয়েক কেজি না হোক, আধা কেজি তো কমেছিই। আর তাছাড়া আগে তো কখনো বলো নি ভাড় লাগছি। সমস্যা হচ্ছে কোথাও তোমার?
—হুম। তলপেটে।
পূর্ণতার কথা শুনে জাওয়াদ নিজের শরীরটা বেডেই রাখে বেশির ভাগ। তারপর তার কাঁধে মুখ গুঁজে দিতে দিতে বলে–
—এখন ভার লাগছে?
পূর্ণতা ব্যস্ত হাতে জাওয়াদের শার্টের বাকি বোতাম গুলো ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে–
—উহুঁ।
তারপর তাদের মাঝে আর কোন কথা হয় না। জাওয়াদ সত্যি সত্যিই পূর্ণতাকে সফর করিয়ে আনে এক স্বর্গীয় সুখের রাজ্য থেকে। রুমটির বাহিরে সবাই যখন নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, তখন এই প্রেমিক যুগল নিজেদের মান-অভিমান কাটিয়ে সুখে ভাসতে ব্যস্ত।


রাত নয়টার মধ্যে শেখ বাড়ির সবাই যখন খেয়েদেয়ে গল্প করায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই জিনিয়ার ফোনটি বেজে ওঠে। আননোন নাম্বার থেকে কল আসায় জিনিয়া শুরুতেই রিসিভ করে না। কিন্তু নাম্বারটি থেকে বারংবার ফোন আসায়, পূর্ণতা তাকে বলে–
—কে ফোন করছে এতবার করে একবার ধরেই দেখো না জিনু। হয়ত পরিচিত কেউ কোন প্রয়োজনেই করছে এতবার ফোন।
পূর্ণতার কথা শুনে জিনিয়া ফোনটি রিসিভ করে। হ্যালো বলার পর ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটি যা বলে, তা শুনে জিনিয়া স্তব্ধ হয়ে কথা বলতেও ভুলে যায়। কিছুসময় পর তার হাত থেকে আপনাআপনিই ফোনটি পড়ে যায়। তাঁকে হঠাৎই এমন থমকে যেতে দেখে পূর্ণতা, জাওয়াদ আর মি.শেখ ঘাবড়ে যায়। পূর্ণতা তার কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে কিছুটা ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে জিনু? কে ফোন করেছিল? আর বললোই বা কি, যা শুনে তুমি থমকে গেলে?
জিনিয়া হঠাৎই কাঁপতে শুরু করে। কাঁপতে কাঁপতে মুখ ফুটে দুয়েকটা কথাই সে বলতে সক্ষম হয়–
—টনি….এক্সিডেন্ট… ক্রিটিকাল অবস্থা ওর….
এই তিনটা শব্দ বলেই সে চোখ বন্ধ করে ঢলে পড়ে সোফায়। মেয়েটা অতিরিক্ত শকিং নিউজ নিতে না পেরে জ্ঞান হারিয়েছে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২৩২২
#চলবে?
জাওয়াদ, পূর্ণতা ও তাদের ছোট ছানাকে নিয়ে লেখা আমার তৃতীয় ই-বুক “পূর্ণতার সংসার”
পড়ুন ই-বই “পূর্ণতার সংসার”
https://link.boitoi.com.bd/hMuN3
[গল্পের এই পর্যায়ে এসে আপনাদের কেন জানি কাঁদাতে, আমার ভীষণ মন করছে ডিয়ার রিডার্স। আমি কি কাজটি করার অনুমতি পাবো?
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ] See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply