Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩৪


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_৩৪

আব্রাজ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তখনো গ্লাসে সোনালী তরল নিয়ে বর্ষণমুখর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘরের ভেতর নৈশি তখনো রাগে ফুঁসছে। আব্রাজের সেই রাজকীয় আয়েশ করে মদ খাওয়া দেখে নৈশির নিজেরও গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। একদিকে রাগ, অন্যদিকে এই ভ্যাপসা গরমে এক চুমুক ঠান্ডা পানীয়ের জন্য তার মনটা আনচান করে উঠল। সে গটগট করে নিচে গিয়ে ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠান্ডা কোক নিয়ে এল। ঘরে ঢুকে সজোরে বোতলের ক্যাপটা খুলে সে টেবিলে রাখল। আব্রাজের দিকে একবার অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে গ্লাসে কোক ঢালতে যাবে, ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে দলের সাধারণ সম্পাদকের নাম দেখে নৈশি বিরক্তি প্রকাশ করল। সে গ্লাসটা অর্ধেক পূর্ণ করে রেখে বোতলটা পাশে রাখল। যাওয়ার আগে আব্রাজের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে কড়া গলায় শাসিয়ে গেল, “খবরদার আব্রাজ! এই কোকের বোতলে হাত দেবেন না বলছি। ওটা আমার পার্সোনাল। আপনি আপনার বিষ নিয়ে থাকুন!”

আব্রাজ কোনো উত্তর দিল না, নৈশি ফোনটা নিয়ে গটগট করে বারান্দার অন্য প্রান্তে চলে গেল পলিটিক্যাল জটিলতা সামলাতে। নৈশি আড়ালে যেতেই আব্রাজ ব্যালকনি থেকে ভেতরে ঢুকে এল। টেবিলের ওপর রাখা সেই ঠান্ডা কোকের বোতলটা দেখে তার কেন জানি একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে হলো। সে গ্লাসের কোকটুকু এক চুমুকে খেয়ে নিল, তারপর বোতলটা মুখে তুলে বেশ খানিকটা খালি করে ফেলল। খাওয়ার পর তার মনে পড়ল, নৈশি ফিরে এসে যদি দেখে কোক অনেকটা কমে গেছে, তবে এই গ্রামের বাড়িতে আজ কালবৈশাখীর চেয়ে বড় ঝড় বইবে। আব্রাজ চারপাশটা দেখল, কোকের লেভেল ঠিক করার কোনো উপায় নেই। হঠাৎ তার নজর গেল পাশে রাখা ব্ল্যাক লেবেলের বোতলটার দিকে। “কোকের রঙ আর মদের রঙ মাঝে মাঝে এই সাদৃশ্যটা বেশ কাজে দেয়!” আব্রাজ বিড়বিড় করে হাসল। সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কোকের বোতলের বাকি অংশটুকু নিজের মদ দিয়ে ভর্তি করে দিল। দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এর ভেতরে এখন এক ভয়ংকর ‘ককটেল’ অপেক্ষা করছে। সে আবার আগের মতো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়াল। মিনিট দশেক পর নৈশি ফোন রেখে ঘরে ঢুকল। উত্তেজনায় তার মাথা গরম হয়ে আছে। সে এসেই কোনো কিছু না ভেবে টেবিল থেকে গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক ঢোক গিলে নিল। “উফফ! কোকটা আজ একটু তিতকুটে লাগছে কেন?” নৈশি ভ্রু কুঁচকে বোতলের দিকে তাকাল। তবে ঠান্ডার আমেজে সে আর বেশি ভাবল না। তৃষ্ণার চোটে সে গ্লাস ভরে আরও দুবার সেই মিশ্রণটি খেয়ে নিল। মিনিট পাঁচেক পর। নৈশির মাথাটা হঠাৎ করে হালকা মনে হতে লাগল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা যেন কেন জানি একটু দুলছে। নৈশি নিজের কপাল টিপে ধরে বিড়বিড় করল, “অদ্ভুত তো! গ্রামের কোক খেলে কি মানুষের ঘরবাড়ি দুলতে শুরু করে?”

আব্রাজ দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করছিল। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “নেত্রী, আপনার কি গ্রাউন্ড সাপোর্ট কমে যাচ্ছে? পা কি টলছে?”

নৈশি এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো এখন নেশার ঘোরে একটু ঢুলুঢুলু। সে আব্রাজের দিকে এক পা এগিয়ে যেতে গিয়ে টাল খেয়ে তার বুকের ওপর পড়ে যেতে নিল। আব্রাজ তাকে ধরে ফেলল। নৈশি আব্রাজের পাঞ্জাবির কলারটা জাপ্টে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। “আব্রাজ সাহেব! আপনার এই পাঞ্জাবির বোতামগুলো না… একদম আপনার মতোই বজ্জাত! এরা কেন জানি আমাকে দেখে হাসছে!”

আব্রাজ অবাক হয়ে দেখল, কড়া পলিটিশিয়ান নৈশি এখন একদম অন্য মানুষ। নৈশি আব্রাজের নাকের ওপর আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে বলল, “আপনি কি আকাশে উড়ছেন এমপি সাহেব? আপনি তো দেখি ফড়িংয়ের মতো উড়ছেন! ইশশ… আপনার এই গম্ভীর মুখটা না… একদম লুচ্ছাদের মতো দেখতে!”

আব্রাজ হেসে ফেলল। “লুচ্ছা? নেত্রী, আপনি জানেন আপনি কী বলছেন? আপনি তো মাতাল হয়ে গেছেন!”

নৈশি এবার আব্রাজের গলার কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি মাতাল? আরে না… মাতাল তো আপনি! আপনার ড্রেসিং টেবিলটা তো দেখি জাজিম নিয়ে ড্যান্স করছে! আর আপনি… আপনি কেন আমার এত কাছে দাঁড়িয়ে আছেন মিস্টার মীর আব্রাজ? আপনি কি আমাকে আপনার ‘ভোটার’ বানাতে চান?”

কথাটা বলেই নৈশি আব্রাজের চিবুকটা ধরে নিজের দিকে একটু টানল। তার নিশ্বাসে এখন কোকের মিষ্টি গন্ধ নয়, বরং মদের কড়া ঝাঁজ। আব্রাজ বুঝতে পারল ডোজটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। সে নৈশির কোমরটা জড়িয়ে ধরে তাকে সোফার দিকে নিয়ে যেতে চাইল।

নৈশি সোফায় বসতে গিয়ে আব্রাজকেও টেনে নিচে ফেলল। সে আব্রাজের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার সিল্কের পাঞ্জাবির একটা বোতাম ছিঁড়ে ফেলল। “এই বোতামটা অনেক বেশি কথা বলছিল! আমি ওকে ডিসমিস করে দিলাম। হাহাহা!”

আব্রাজ নৈশির এই ‘লুচ্ছামি’ আর পাগলামি দেখে হাসতে হাসতে বলল, “নৈশি, কাল সকালে যখন জ্ঞান ফিরবে, তখন নিজের এই ভিডিও দেখলে আপনি পলিটিক্স ছেড়ে হিমালয়ে চলে যাবেন!”

নৈশি আব্রাজের কানে কামড় দেওয়ার ভান করে আদুরে গলায় বলল, “কালকের কথা কাল… আজ রাতে আপনি শুধু আমার ‘অপজিশন’ লিডার নন, আজ রাতে আপনি মীর বাড়ির সেই বজ্জাত ছেলে, যে আমার প্রেমে পাগল।”

“আর আপনি একটা ছাগল। যান গিয়ে পাতা খান।”

আব্রাজের মুখে নিজেকে “ছাগল” শোনার পর নৈশি কয়েক সেকেন্ড থমকে রইল। তার নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক যেন হিসেব মেলাতে পারছে না এই গ্রামের বাড়িতে তাকে কেউ ছাগল বলার সাহস পায় কী করে? সে রাগে গাল ফুলিয়ে আব্রাজের পাঞ্জাবির কলারটা আরও জোরে মুচড়ে ধরল। “আমাকে ছাগল বললেন? আমি… আমি হবু জনপ্রতিনিধি! আমাকে পাতা খেতে বলছেন? আপনার সাহস তো কম না মিস্টার আব্রাজ! আমি আপনাকে এখনই… এখনই ‘অভিশংসন’ করব!”

আব্রাজ এক হাত দিয়ে নৈশির কপালটা ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল, “অভিশংসন পরে কইরেন নেত্রী, আগে নিজের পা-টা সামলান। কার্পেটের ওপর যেভাবে ডিগবাজি খাচ্ছেন, মনে হচ্ছে কোনো সার্কাসের অডিশন দিতে আসছেন। আর হ্যাঁ, এই যে পাঞ্জাবির কলারটা মুচড়ে শ্যাওলা বানিয়ে ফেললেন, এটার বিল কি আপনার পার্টি ফান্ড থেকে আসবে?”

নৈশি এবার টলতে টলতে আবার আব্রাজের গায়ের ওপর আছড়ে পড়ল। তার দুহাত এখন আব্রাজের ঘাড়ের ওপর। সে খুব কাছাকাছি এসে আব্রাজের চোখে চোখ রেখে আধো-আধো গলায় বলল, “পার্টি ফান্ডে কিচ্ছু নেই। সব আপনি চুরি করেছেন! আপনার এই চওড়া বুকটা… এটাও কি চুরির টাকায় বানানো?”

আব্রাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নৈশির কোমরে হাত দিয়ে তাকে সোজা করার চেষ্টা করল। “আমার বুক চুরির টাকায় বানানো কি না জানি না, তবে আপনার মাথাটা যে এখন গোবর দিয়ে ঠাসা সেটা নিশ্চিত। ওইটুকু কোক খেয়েই যদি এই অবস্থা হয়, তবে তো সংসদে গিয়ে আপনি স্পিকারের চেয়ারে বসে লুডু খেলবেন!” নৈশি এবার একটু আহ্লাদী হয়ে উঠল। সে আব্রাজের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সংসদে কেন যাব? আমি তো এখন আপনার হৃদয়ের বিরোধী দলে বসতে চাই। আপনি আমাকে একটু স্পেস দিবেন না ক্যাপ্টেন?”

আব্রাজ বিরক্তির এক শেষ পর্যায়ে পৌঁছে নৈশিকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল, “স্পেস? আপনাকে স্পেস দিলে তো আপনি সেখানেও ব্যানার টানিয়ে পোস্টার মারবেন! দয়া করে এই ‘লুচ্ছামি’ বন্ধ করেন নৈশি। আপনার এই সস্তা রোমান্স দেখলে আমার বমি আসছে। এমনিতে তো সামনে আসলে মনে হয় চণ্ডীপুরী দেবী, আর এখন দেখি একদম সস্তা সিনেমার ভিলেনের মতো আচরণ করছেন। বাংলার রিনাখান লাগছে।”

নৈশি দমল না। সে আবার এগিয়ে এল। এবার সে আব্রাজের পাঞ্জাবির ছেঁড়া বোতামের জায়গায় নিজের আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল, “আপনার এই পাঞ্জাবিটা বড্ড দামি না? আমার শাড়ির সাথে না… একদম ম্যাচিং হয়েছে। আচ্ছা আব্রাজ, আমরা যদি এখন এই ঘরে একটা ডুয়েট গান গাইতাম? ওই যে… ‘তুমি আমার রাজনীতি, আমি তোমার ভোট’… হাহাহা!”

আব্রাজ এবার নৈশির হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে বিছানার দিকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “গান গাইতে হবে না। আপনি বরং একটা ভাষণ দেন ‘কীভাবে এক বোতল কোক খেয়ে ইজ্জত নিলামে তুলতে হয়’। মানুষ আপনাকে ভোট না দিলেও বিনোদন হিসেবে মাথায় তুলে রাখবে।” বিছানায় ধাক্কা দিয়ে বসিয়ে দিতেই নৈশি শুয়ে পড়ল না, বরং আব্রাজের হাত ধরে তাকেও নিজের দিকে টান দিল। আব্রাজ অপ্রস্তুত থাকায় নিজের ভারসাম্য হারিয়ে নৈশির খুব কাছে ঝুঁকে পড়ল। নৈশি আব্রাজের নাকে আলতো করে কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, “আপনি না… খুব পচা! কিন্তু আপনার পারফিউমটা দারুণ। একদম আপনার মতো… তিতা কিন্তু নেশা ধরায়।”

আব্রাজ নিজের নাক বাঁচিয়ে তড়িৎগতিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাক মুছতে মুছতে বলল, “পারফিউম তিতা না নেত্রী, আপনার কপাল তিতা যে আমার মতো লোকের পাল্লায় পড়েছেন। এখন চুপচাপ এই বালিশটা পেটে নিয়ে পড়ে থাকেন। আর একটা শব্দ করলে আমি কিন্তু ভিডিও অন করে আপনার লাইভ স্ট্রিমিং করে দেব। তখন কাল সকালে ভোটারদের বলবেন যে ‘আমি মাতাল ছিলাম না, আসলে ওটা কোকের সাইড ইফেক্ট ছিল’!”

নৈশি বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে বিড়বিড় করল, “লুচ্ছা এমপি… একদম বজ্জাত… উফফ, ঘরটা কেন আবার ঘুরছে?”

আব্রাজ গ্লাস হাতে ব্যালকনির দিকে যেতে যেতে পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে বলল, “ঘর ঘুরছে না নেত্রী, আপনার কপাল ঘুরছে। ঘুমিয়ে পড়ুন, নয়তো কাল সকালে আয়নায় নিজের মুখ দেখে নিজেই নিজেকে ‘রিজাইন’ করতে বলবেন!”

বিছানার ওপর ছটফট করতে থাকা নৈশিকে সামলানো আর উত্তাল বঙ্গোপসাগরকে শান্ত করা আব্রাজের কাছে এখন দুটোই সমান অসম্ভব মনে হচ্ছে। আব্রাজ দুবার তাকে চাদর মুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই নৈশি সেই চাদর লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে আব্রাজের পাঞ্জাবির হাতা খপ করে ধরে নিজের দিকে টানছে। “আব্রাজ… আপনি খুব খারাপ! আপনি আমাকে ওই বিশ্রী তিতা ওষুধটা খাইয়েছেন কেন? আমার না… কেমন যেন উড়ু উড়ু লাগছে।” নৈশি আধোবোজা চোখে আব্রাজের গলার কাছে মুখ নিয়ে বিড়বিড় করল। তার উষ্ণ শ্বাস আব্রাজের ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়তেই আব্রাজের শক্ত চোয়ালটা আরও একবার শক্ত হয়ে এল। আব্রাজ নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে কোনোমতে চেপে রেখে কর্কশ গলায় বলল, “নেত্রী, দয়া করে এই সস্তা নাটকটা বন্ধ করবেন? আমি আপনাকে ড্রিঙ্ক করাইনি, আপনি নিজে থেকে আমার জিনিস চুরি করে খেয়েছেন। এখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে চুপচাপ ঘুমান। কাল সকালে আপনার এই ‘বিপ্লবী’ ইমেজটার জানাজা পড়তে চাই না আমি।”

নৈশি এবার হুট করে উঠে বসল। তার চোখের মণি এখন নেশার ঘোরে আর জেদে টলমল করছে। সে আব্রাজের কলারটা ধরে তাকে নিজের এতটাই কাছে টেনে আনল যে দুজনের নাকের ডগা প্রায় ছুঁইছুঁই। নৈশি ঠোঁট উল্টে বলল, “ইমেজ? কিসের ইমেজ? আপনার ওই ২০ টাকার কাবিননামায় লেখা নেই যে আমি আপনার বউ? ওই যে… বিশ টাকার মোহরানা দিয়ে আমাকে কিনে নিয়েছেন, এখন কি আমাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন?”

আব্রাজ থমকে গেল। এই মেয়েটা যে এই মুহূর্তে তার অবচেতন মনের সবচেয়ে গভীর ক্ষতটায় আঙুল দেবে, তা সে ভাবেনি। মেয়েটা কি তাকে খোঁচা মারল? আব্রাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নৈশির কব্জিটা নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরল। তার গলার স্বর এবার আর ব্যঙ্গাত্মক নয়, বরং নিচু আর ভারি। “আপনি জানেন না আপনি কী বলছেন নৈশি। ২০ টাকা হোক আর ২০ কোটি আপনি এই মুহূর্তে মীর আবরাজ রোদের স্ত্রী। আর মীর আবরাজ তার অধিকারে থাকা জিনিস নিয়ে খেলতে জানে না। সো, জাস্ট গো টু স্লিপ বিফোর আই লুজ মাই শেইমফুল কন্ট্রোল।”

নৈশি হাসল। সে হুট করে তার নরম হাত দুটো আব্রাজের গালের ওপর রাখল। আব্রাজের সেই কয়েকদিনের না কাটা দাড়িগুলোতে আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল, “হারিয়ে ফেলুন না আপনার কন্ট্রোল… দেখি আপনি কত বড় বাঘ! আপনি শুধু বড় বড় ভাষণ দিতে জানেন, কিন্তু এই বিশ টাকার বউটার সামনে এসে আপনার সব দাপট কোথায় যায় মিস্টার এমপি?”

আব্রাজ আর পারল না। নৈশির এই মাতলামি, এই অবাধ্যতা আর তার গায়ের সেই পারফিউমের সাথে মিশে থাকা অ্যালকোহলের কড়া ঘ্রাণ আব্রাজের চার বছরের জমানো ধৈর্যকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল। সে এতক্ষণ নিজেকে একজন জেন্টলম্যান হিসেবে ধরে রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু নৈশির এই ‘লুচ্ছামি’ আর ‘উস্কানি’ তাকে পুরুষ হিসেবে এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আব্রাজ একটা কর্কশ হাসি দিয়ে নৈশিকে বিছানায় শুইয়ে দিল এবং তার ওপর নিজের শরীরের ভার ছেড়ে ঝুঁকে পড়ল। তার চোখের মণি এখন আগুনের মতো জ্বলছে। *“খুব স্পর্ধা না আপনার নেত্রী? বলেছিলেন না আমি চোর? হ্যাঁ, আমি চোর! আর আজ রাতে আপনার এই সবটুকু অহংকার আর জেদ আমি চুরি করে নেব। বিশ টাকার মোহরানায় আপনি যদি নিজেকে সস্তা ভেবে থাকেন, তবে আজ বুঝিয়ে দেব মীর আবরাজ তার সস্তা জিনিসের দাম কীভাবে চুকিয়ে দেয়!”*

নৈশি এবার ভয় পাওয়ার বদলে আব্রাজের চুলে নিজের আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তার মুখে সেই নেশাধরা হাসি। “চুকিয়ে দিন তবে… দেখি আপনার মোহরানা কত দামি…” বাইরের কালবৈশাখী তখন তার চূড়ান্ত তাণ্ডব শুরু করেছে। জানালার শার্সিগুলো বাতাসের ধাক্কায় আর্তনাদ করছে, কিন্তু ঘরের ভেতরের পরিবেশটা হঠাৎ করেই থমকে গেল। আব্রাজ আর নিজের ঠোঁটকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারল না। নৈশির সেই অবাধ্য, প্রলাপ বকতে থাকা ঠোঁটদুটোকে সে এক লহমায় নিজের অধীনে নিয়ে নিল।

নৈশির মাতাল মস্তিষ্ক তখন কোনো যুক্তির ধার ধারছে না। সে শুধু অনুভব করছিল আব্রাজের সেই তপ্ত শরীরের স্পর্শ আর তার পাথরের মতো কঠিন হাত দুটোর মরণকামড়। আব্রাজ এতক্ষণ লড়াই করছিল নিজের সাথে, কিন্তু এখন সে ছেড়ে দিয়েছে। যে মেয়েটাকে সে ঘৃণা আর জেদ দিয়ে জয় করতে চেয়েছিল, আজ তাকে সে আদিম এক আকুলতায় নিজের করে নিচ্ছে। নৈশি আব্রাজের পাঞ্জাবির বোতামগুলো এবার সত্যি সত্যিই একে একে ছিঁড়ে ফেলল, আর আব্রাজ তার সারা জীবনের গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে সেই নেশাখোর নেত্রীর মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলল। ২০ টাকার সেই তুচ্ছ কাবিননামাটা

আজ এই নিঝুম রাতে এক অমোঘ সত্য হয়ে দাঁড়াল।

রাত তখন প্রায় ভোর হতে চলল। ঘরের বাতিটা তখনো নিভু নিভু। আব্রাজ যখন নৈশির ক্লান্ত আর ঘুমন্ত শরীরের পাশে নিজেকে এলিয়ে দিল, তখন তার মনে একটাই চিন্তা, কাল সকালে এই মেয়েটা যখন সুস্থ হবে, তখন তাকে কীভাবে সামলাবে?

কালবৈশাখীর সেই উত্তাল রাত পেরিয়ে পিলুগ্রামের আকাশে তখন সদ্য কাঁচা সোনার মতো মিষ্টি রোদ ফুটে উঠেছে। রাতের ঝড়ে ধুয়ে যাওয়া গাছপালা থেকে টুপটুপ করে জল ঝরছে, আর জানালার ফাঁক গলে আসা এক চিলতে স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে মীর আরভিদ আর আর্যার ঘরের মেঝেতে। আর্যা তখন সবেমাত্র গোসল শেষ করে বারান্দা সংলগ্ন ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে একটা বাসন্তী রঙের সুতির শাড়ি, ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর এলিয়ে আছে। একটা ধবধবে সাদা তোয়ালে দিয়ে সে তার অবাধ্য চুলগুলো ঝাড়ছিল, আর ক্ষণে ক্ষণে জলের দু-একটি বিন্দু তার ফর্সা ঘাড় আর পিঠের উন্মুক্ত অংশে চুইয়ে পড়ছিল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে আর্যার গালে লজ্জার এক গাঢ় লাল আভা ফুটে উঠল। গত রাতের প্রতিটা স্মৃতি, আরভিদের সেই চাদর জড়ানো উষ্ণতা আর তার ঠোঁটের গভীর ছোঁয়া মনে পড়তেই আর্যা চোখ দুটো বুজে ফেলল। ঠিক তখনই বিছানার অগোছালো চাদরের মাঝ থেকে মীর আরভিদ তেজ চোখ মেলল। চোখ খুলেই তার নজর গেল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্নানসিক্ত রূপসীর দিকে। আরভিদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে বিছানা ছেড়ে আলতো পায়ে, একদম নিঃশব্দে এগিয়ে গেল আর্যার পেছনে।

আর্যা তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে হঠাৎ আয়নার দিকে তাকাতেই দেখল পেছন থেকে আরভিদের সেই চওড়া, খালি বুকটা তার পিঠের খুব কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আর্যা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই আরভিদের দুটো শক্ত হাত পেছন থেকে আর্যার কোমর জড়িয়ে ধরল। আর্যা সামান্য কেপে উঠে তোয়ালেটা বুকের কাছে চেপে ধরল। “উফফ আরভিদ! ছাড়ো… কী করছ সকাল সকাল? শরীর এখনো ভেজা, তোমার গায়েও জল লাগবে।”

আরভিদ কোনো কথা বলল না। সে আর্যার কাঁধের ওপর নিজের চিবুকটা রাখল। আয়নায় আর্যার চোখের দিকে তাকিয়ে সে নিজের দুহাতের বাঁধন আরও একটু শক্ত করল। তার তপ্ত নিশ্বাস আর্যার কানের লতিতে আছড়ে পড়তেই আর্যা শিউরে উঠল। “লাগুক জল। আমার বউয়ের গায়ের জলের ছাঁট যদি আমার গায়ে না লাগে, তবে এই সকালের কোনো মানে হয়?” আরভিদের গলাটা সকালের আলস্যে আরও একটু ভারী আর নেশা ধরা শোনাল। সে আর্যার ভেজা চুলগুলো একহাতে একপাশে সরিয়ে দিয়ে তার ফর্সা, উন্মুক্ত ঘাড়ে নিজের ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দিল।

আর্যার হাত থেকে তোয়ালেটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হলো। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আদুরে গলায় বলল, “আরভিদ, শোনো না… এটা মেজো খালামণির মেয়ের বিয়ে বাড়ি। নিচে অলরেডি সবার চেল্লামেল্লি শুরু হয়ে গেছে। আজ বড় অনুষ্ঠান, কত কাজ বাকি! এখন নিচে না গেলে মা কিন্তু খুব রাগ করবেন। মেজো খালাও এসে খোঁজ নিতে পারেন।”

আরভিদ আর্যার ঘাড় থেকে ঠোঁট না সরিয়েই ফিসফিস করে বলল, “আজ এই আরভিদ দুনিয়ার কোনো মায়ের ধমককে পরোয়া করে না, আর্যা। মেজো খালা, বড় খালা কিংবা স্বয়ং আরযান ভাইয়া আসলেও আজ আমি এই দরজা খুলছি না। আজ যখন তুমি আমার এত কাছে, তখন নিচে ওই পলিটিক্যাল সার্কাস আর বিয়ের আদিখ্যেতার মাঝে আমি আমার বউকে ছেড়ে দিতে পারি না।” কথাটা বলেই আরভিদ আর্যাকে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। আর্যার কোমরে রাখা তার হাতটা এবার শাড়ির আঁচল ভেদ করে তার মসৃণ পিঠে গিয়ে ঠেকল। আরভিদের চোখের ওই অবাধ্য, তৃষ্ণার্ত চাউনি দেখে আর্যার বুকের ভেতরটা আবার সেই কালবৈশাখীর রাতের মতো তোলপাড় করতে লাগল। “আরভিদ… প্লিজ, কেউ চলে আসবে…” আর্যার কণ্ঠস্বর এখন পুরোপুরি বুজে এসেছে, সেখানে আর কোনো নিষেধের জোর নেই।

“আসুক।” আরভিদ আর্যার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট এনে থামল। “আজ সকালটা শুধু আমাদের, আর্যা। কোনো মান-অভিমান নয়, কোনো দূরত্ব নয়। শুধু তুমি আর আমি।”

আরভিদ আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে আর্যার সেই কাঁপতে থাকা ঠোঁটদুটোকে নিজের গভীরে টেনে নিল। বাসন্তী শাড়ির আঁচলটা একসময় ড্রেসিং টেবিলের কোণ ঘেঁষে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। বাইরের রোদের উষ্ণতা আর ঘরের ভেতরের এই আদিম আকুলতার মাঝে আরভিদ আর আর্যা তাদের নতুন জীবনের খাতায় ভালোবাসার আরও একটা তীব্র, ঘনিষ্ঠ অধ্যায় এঁকে দিল। বিয়ে বাড়ির চেল্লামেল্লি তখন বাইরের করিডোরেই থমকে রইল, মীর বাড়ির এই দম্পতির ঘরে তখন কেবলই সমর্পণের উৎসব।

জমিদার বাড়ির সুবিশাল ডাইনিং টেবিলটা তখন নানা পদের খাবারে সাজানো। মেজো খালার হাতের ভুনা খিচুড়ি, হাঁসের মাংস আর আচারি বেগুনের সুবাসে মীর বাড়ির ড্রয়িংরুম ম-ম করছে। মীর পরিবারের বাকি ভাইরা আর কাজিনরা তখন হাসাহাসি আর খোশগল্পে মত্ত, কিন্তু টেবিলের এক প্রান্তে বসে থাকা সাঁঝের চারপাশের জগতটা যেন একদম নিশ্চুপ। সাঁঝের জ্বরটা ভোরের দিকে ছেড়েছে ঠিকই, কিন্তু শরীরটা এখনো তুষের আগুনের মতো ভেতরে ভেতরে পুড়ছে। তার ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের নিচে কালি স্পষ্ট জানান দিচ্ছে গত রাতের ঝড়ের কথা। সে চামচ দিয়ে খিচুড়িটা কেবল নাড়াচাড়া করছিল, এক লোকমাও গলায় নামানোর রুচি তার নেই। তার চেয়েও বড় অস্বস্তি তার ঠিক পাশেই বসে থাকা মানুষটাকে নিয়ে। মীর আরযান শানকে নিয়ে। আরযানের পরনে একটা ধূসর রঙের ক্যাজুয়াল শার্ট, হাতা দুটো বরাবরের মতো গোটানো। সে অত্যন্ত আয়েশ করে কফি খাচ্ছে, কিন্তু তার রক্তবর্ণ চোখ দুটো এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। সারারাত যে এই লোকটা এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করেনি, তা কেবল সাঁঝই বুঝতে পারছে। সাঁঝ আড়চোখে আরযানের দিকে তাকাতেই তার গত রাতের সেই অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো মনে পড়ে গেল, সেই শীতল রুমাল, সেই জলের গ্লাস আর সেই অদৃশ্য হাতের পরম মমতা। তবে স্বপ্ন নাকি বাস্তব কে জানে? সাঁঝের ভাবনার মাঝেই আরযানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর টেবিলের সব কোলাহল ছাপিয়ে তার কানে আছড়ে পড়ল।

“খিচুড়িটা কি শুধু দেখার জন্য পাতে নিয়েছিস সাঁঝ? নাকি ওটা নিজে নিজেই তোর পেটে চলে যাবে?”

আরযান সাঁঝের দিকে না তাকিয়েই কথাটা বলল। সাঁঝ একটু চমকে উঠে নিচু স্বরে বলল, “আমার খিদে নেই। মুখটা তেতো লাগছে।”

“খিদে না থাকলেও খেতে হবে।” আরযান কফির কাপটা সশব্দে পিরিচের ওপর রাখল।

সাঁঝ বিরক্তি আর ক্লান্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার পা দুটো তখন রীতিমতো ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যথায়। হয়তো প্রবল জ্বর আর মানসিক চাপের ধকল পা দুটো নিতে পারছে না। সে অবচেতনভাবেই টেবিলের নিচে নিজের এক পা দিয়ে অন্য পা ঘষতে লাগল। যন্ত্রণায় তার কপালে ভাঁজ পড়ল।

সে পাশে বসে থাকা রাজের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “ভাই আমার পা দুটো কেন জানি খুব ব্যথা করছে। একদম সোজা হয়ে বসতে পারছি না।”

সাঁঝের এই সামান্য অভিযোগটা আরযানের কানে পৌঁছাতেই তার হাতের কফির কাপটা আবার টেবিলের ওপর ফিরে গেল। আরযান এবার সরাসরি সাঁঝের দিকে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা হিংস্রতা আর জেদ।

“পা ব্যথা করছে?” আরযান অত্যন্ত শান্ত গলায় প্রশ্ন করল।

সাঁঝ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, হয়তো কালকের ধকলে…”

সাঁঝের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরযান হঠাৎ চেয়ারটা সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের সবাই মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। আরযান কোনো কথা না বলে সাঁঝের চেয়ারটা এক ঝটকায় নিজের দিকে টেনে আনল। তারপর অবিশ্বাস্যভাবে, সে নিজে আবার নিজের চেয়ারে বসে সাঁঝের অবাধ্য পা দুটো সজোরে টেনে নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিল।

“আরে! আরযান ভাইয়া! কী করছেন? ছাড়ুন!” সাঁঝ লোকলজ্জায় আর বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল। টেবিলের সব কাজিন আর বড়দের চোখ তখন তাদের দিকে। আরযান সাঁঝের কোনো প্রতিবাদ কানেই তুলল না। সে তার শক্ত, পাথরকাটা হাতের আঙুলগুলো দিয়ে সাঁঝের পায়ের পেশিগুলোতে প্রবল চাপে টিপতে শুরু করল। তার হাতের চাপ এতই বেশি ছিল যে সাঁঝ ব্যথায় কুঁকড়ে গেল। “উফফ! আরযান ভাইয়া লাগছে! ছাড়ুন বলছি! সবার সামনে কী করছেন এটা?” সাঁঝ কান্নারত গলায় ছটফট করতে লাগল।

আরযান তার সেই স্বৈরাচারী হাসিটা হাসল, যা দেখে যে কেউ ভয় পাবে। সে সাঁঝের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলল, “চুপ করে থাক সাঁঝ! অবাধ্য হওয়ার ফল তো তোকে ভোগ করতেই হবে। খেতে চাস না, কথা শুনিস না তাই এই পা ব্যথা তোর জন্য একটা মোক্ষম সুযোগ। এই যে আমি তোর পা টিপে দিচ্ছি, এটা কোনো সেবা নয়, এটা তোর শাস্তি। তুই যতবার ছটফট করবি, আমি তত বেশি জোরে চাপ দেব। ব্যথায় নীল হয়ে যাবি, তাও ছাড়ব না।”

সাঁঝ দেখল আরযানের আঙুলগুলো তার পায়ের গোড়ালিতে এমনভাবে বিঁধছে যেন সে সত্যিই কোনো অপরাধের সাজা দিচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই যন্ত্রণাদায়ক চাপের পরপরই সাঁঝের পায়ের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্লান্তিটা যেন এক নিমেষে উবে যেতে লাগল। আরযানের শাসনটা উপরে কঠোর হলেও, তার হাতের জাদুকরী চাপে সাঁঝের ব্যথার উপশম হচ্ছিল দ্রুত। আরযান সবার সামনে এমন একটা ভাব করতে লাগল যেন সে খুব বড় কোনো দণ্ড দিচ্ছে তার অবাধ্য বন্দিনীকে। সে পাশে থাকা তাজকে উদ্দেশ্য করে বলল, “দেখ তাজ, অবাধ্য ঘোড়াকে যেমন চাবুক দিয়ে সোজা করতে হয়, মীর আরযানের সীমানায় থাকা অবাধ্য পাখিদের তেমনি ব্যথার ওষুধ দিয়ে শায়েস্তা করতে হয়। ও যত বেশি ব্যথা পাবে, তত বেশি মীর আরযানকে মনে রাখবে।”

সাঁঝ আর কিছু বলতে পারল না। সে বুঝতে পারছে না এই লোকটা শাসনের নামে কি তাকে যত্ন করছে নাকি?।সে মাথা নিচু করে আরযানের হাঁটুর ওপর নিজের পা দুটো সঁপে দিল। টেবিলের বাকিরা যখন আরযানের এই অদ্ভুত ‘শাস্তি’ দেখে মুখ টিপে হাসছিল, সাঁঝ তখন আরযানের লাল হয়ে থাকা চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল এই কঠিন পাথরের ভেতর যে সমুদ্রের মতো গভীর যত্ন লুকিয়ে থাকে তা কতটা সত্য? আরযান সাঁঝের পা টিপতে টিপতে আবার কড়া গলায় বলল, “এবার পুরো খিচুড়িটা শেষ কর। এক দানা বাকি থাকলে এবার শাস্তিটা আরও কড়া হবে, মনে থাকে যেন!”

সাঁঝ এবার মুখ না তুলেই খিচুড়ির চামচ মুখে তুলল। আর একটাও কথা বলল না পুরোটা সময়….

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply