#মূল্য |০৮|
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
—”তার মানে তুমি তোমার ব্যবসা ছাড়বে না?”
নীলা তৎক্ষনাৎ তার কথার উত্তর দেয় না, বরং একটু সময় নিয়ে রয়েসয়ে বলতে চায় কিছু। কিন্তু তার আগেই একটি পুরুষালি গম্ভীর গলা থেকে শোনা যায় বয়োবৃদ্ধের প্রশ্নের উত্তরটি।
—”না, নীলা ছাড়বে না তার ব্যবসা। আমি চাই আমার বউ অন্যদের মতোই স্বাধীনতা পাক।
অরিত্রের কথাটি শুনে কেবিনে উপস্থিত সকলেই তার দিকে ফিরে তাকায়। সকলেই যতটা না অবাক হয়েছে, তার চেয়েও বহুগুণ বিস্মিত হয়েছে নীলা। কারণ অরিত্রই তো তাকে কাজটা ছাড়ার জন্য কত কিছু বলেছিল। এমনকি টাকার খোঁটাও শুনেছিল। সেই লোক আজ তার পক্ষ নিয়ে কথা বলছে, তাহলে তো অবাক হওয়ারই কথা।
ছেলের কথা শুনে অরিত্রের মা থমথমে মুখে বলেন–
—আমরা কি ওকে স্বাধীনতা দিচ্ছি না?
—যদি ওকে ওর শখটা পূরণ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে তো আপাত দৃষ্টিতে তো তাই লাগবে মা। দেখো, আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু শখ, একান্ত চাহিদা থাকে। সেগুলো সঠিক সময়ে পূরণ না করতে পারলে একসময় গিয়ে দীর্ঘশ্বাস আর আফসোস করা ছাড়া কিছুই করতে পারব না।
আমি চাই না আমার স্ত্রী সেই আফসোসটুকু করুক। এমনিতেই আমি তাকে আফসোস করার কম কারণ দেই নি, ভবিষ্যতে তার আমাকে বিয়ে করার আফসোসটাও দিতে চাচ্ছি না। তাই আমি চাই, নীলা সংসারের পাশাপাশি ওর বিজনেসটাও চালিয়ে যাক।
শেষোক্ত কথাটি অরিত্র নীলার অশ্রুসিক্ত চোখে চোখ রেখে বলে। নীলা অরিত্রের এই সাপোর্টটা পেয়ে অর্ধেক দুনিয়া হাসিল করার মতো সুখ অনুভব করতে থাকে। পার্টনারের এই সাপোর্টটুকুই তো মেয়েদের বড় প্রাপ্তি। তাই নয় কি?
যেখানে নীলার স্বামীই তাকে অনুমতি দিচ্ছে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার, সেখানে বাকি আর কি-ই বা বলবে। অরিত্রের এহেন সাপোর্ট অরিত্রের মা নিজের অপমান হিসেবে ধরে দেন। চিরাচরিত শ্বাশুড়ি মায়ের মন সেই একটা কথাই বলে ওঠে–
—আমার ছেলেকে নিজের আঁচলে বেঁধে নিয়েছে এই মেয়ে। তাবিজ-কবচ করে নিজের ভেড়া বানিয়ে নিয়েছে নীলা অরিত্রকে।
এসব ভেবেই সে আরো ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে নীলার উপর। সে গটগট করে কেবিন থেকে বেরিয়ে চলে যান। তার পেছন পেছন অরিত্রের খালামনি, ঈশিতা, তার বোনও চলে যায়। কেবিনে রয়ে যায় শুধু নীলা, অরিত্র, তার বাবা, তার ছোট ভাই ও ভাইয়ের বউ।
অরিত্রের বাবা নিতান্তই সাধাসিধা ও বুঝদার লোক। সে আবেগের সাথে নিজের বিবেকও খাটিয়ে চলেন। তার কোন আপত্তি নেই পুত্রবধূদের কাজ করা নিয়ে। তার দুই মেয়ে যদি শ্বশুর বাড়ি যেয়ে বাহিরে চাকরি করার স্বাধীনতা পেতে পারে, তাহলে তারা কেন অন্যদের মেয়েদের বেলায় অবিচার করবেন?
অরিত্রের বাবা নীলার মাথায় হাত রেখে দোয়া করে বলেন–
—সফল হয়ে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করো মা।
—আমার জন্য দোয়া করবেন বাবা। মা’কেও বলবেন করতে।
—বাবা-মায়েরা সবসময় সন্তানদের জন্য দোয়া করে মা। তোমার শ্বাশুড়ি ছেলের অসুস্থতা দেখে আজ রেগে আছেন হয়ত। কিন্তু আমি তাকে বুঝাবো। তুমি মন খারাপ করে রেখো না তার কথায়।
নীলা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। অরিত্রের ছোট ভাইও বাবার পেছন পেছন চলে আসে। কাকলী চলে যাওয়ার আগে নীলাকে বেস্ট অফ লাক বলে যায়। তারা সবাই চলে যেতেই কেবিনটা কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতায় ছেয়ে থাকে।
নীলা সেই আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে ধাতস্থ হতে সময় দেয়। তারপর রয়েসয়ে বলে–
—তুমি শুয়ে রেস্ট করো অরিত্র। আমি একটু চোখমুখে পানি দিয়ে আসি।
কথাটা বলে নীলা কেবিনে লাগোয়া ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে ফ্রেশ হতে। অরিত্র সেদিকে কিছুসময় তাকিয়ে থাকে। নীলার সাথে তার আরো কথা বলার ছিল, তার থেকে মাফ চাওয়ার ছিল, কিন্তু হলো না। নীলা যে তার প্রতি কতটা অসন্তুষ্ট, কতটা হতাশ তার কিছুটা ধারণা আজ পেয়ে গিয়েছে। সে ভাবে, পরে একসময় চেয়ে নিবে মাফ।
অরিত্রকে তিনদিন হসপিটালে থাকতে হয়। তারপর তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হওয়ায় তাঁকে হসপিটাল থেকে রিলিজ করে দেওয়া হয়। এই তিনদিন বহু মানুষ অরিত্রকে হসপিটালে দেখতে আসে। তার অফিসের কলিগরাও এসেছিল তাঁকে দেখতে, তখন অনেকেই নীলার প্রশংসা করেছে। মেয়েটা সংসার সামলে আবার বিজনেসও দাড় করাচ্ছে। বিষয়টা কি কম কথা নাকি?
অরিত্রের অনেক কলিগের স্ত্রী নীলার থেকে ড্রেস অর্ডার দিয়েছে। তারাই নীলার কাজের প্রশংসা করেছে নিজেদের স্বামীর কাছে। আর তারা সেই কথাগুলো অরিত্রকে বলে।
কলিগদের কাছে স্ত্রীর প্রশংসা শুনে অরিত্র গর্ববোধ করতে থাকে নীলাকে। অন্যদিকে নীলার শ্বাশুড়ি শুধু লুচির মতো ফুলেছে। সেদিনের পর থেকে সে নীলার সাথে ভালোভাবে দু’টো কথা বলেন না। সবসময় খোঁচা দিয়ে বা আঘাত দিয়ে কথা বলে সে নীলার সাথে।
অরিত্রকে বাসায় নিয়ে আসা হলে নীলার শ্বশুর-শ্বাশুড়িও ছোট ছেলের বাসা থেকে চলে এসে বড় ছেলের বাসায় উঠেন। দুই ছেলের বাসাতেই তারা কম-বেশি সময় কাটান।
বাসায় এসেও নীলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না। কাজের লোক ঘর মুছে দিয়ে গেলে, নীলার শ্বাশুড়ি তার কাজের ভুল ধরে নীলাকে দিয়ে আবারও ঘর মোছান। কাপড় ধুয়ে দিয়ে গেলে, সেখানেও একই কাজ করে। নীলা কিছু বললেই কান্না-কাটি, অশান্তি শুরু করে দেন। এক কথায়, নীলার শ্বাশুড়ি চাইছেন যেকোন পন্থায় নীলাকে তার বিজনেস থেকে সরিয়ে দিতে। আর তাকে এমনটা করতে উস্কানি দিচ্ছে তার বোন ও বোনের মেয়ে।
রাত আটটায় অরিত্র অফিস থেকে আসতেই নিত্যদিনের মতোই নীলা কিচেন থেকে ছুটে এসে দরজা খুলে দেয়। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে অরিত্রের মা টিভি দেখছেন, সে চাইলেই দরজা খোলার কাজটা করতে পারত। কিন্তু করলেন না। নীলাকে রান্নাঘর থেকে কাজ ফেলে এসে দরজা খুলতে হলো।
অরিত্র বাসায় প্রবেশ করে মাকে টিভি দেখতে দেখে ভ্র কুঁচকে নেয়। সে দেখেছে, নীলা তার জন্য দরজা খুলে দিয়েই আবারও ছুটেছে কিচেনে। নিশ্চয়ই সে ব্যস্ত ভীষণ। তাহলে তার মা তার জন্য দরজা খুলে দিতেই পারত। কিন্তু কেন দিলো না সেটা অরিত্রের বোধগম্য হলো না।
রাতে খাবার খাওয়া শেষে অরিত্রের বাবা-মা গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসেন। আর অরিত্র নীলার হাতে হাতে এঁটো থালাবাসন কিচেনে রেখে এসে ডাইনিং টেবিল পরিষ্কার করে দেয়। এতে করে নীলার একটা কাজ হলেও আগায়। আর স্ত্রীর প্রতি একটা সুপ্ত ভালোবাসাও প্রদর্শন করা হয়। নীলা যদিও অরিত্রকে মানা করে বলেছিল, কাজটা সে একাই করে নিবে। কারণ তার শ্বাশুড়ি পছন্দ করেন না তার ছেলেরা বউয়ের কাজে সাহায্য করুক। কিন্তু অরিত্র তাও জোর করেই কাজটা করে। এতে করে নীলার মনে অরিত্রের জন্য তৈরি হওয়া নেগেটিভি একটু একটু করে কমতে থাকে।
কিন্তু তাদের এই সুন্দর বিষয়টা স্বভাবসুলভ পছন্দ হয় না অরিত্রের মায়ের। সে বসে থেকেই গলা উঁচিয়ে বলে ওঠে–
—হ্যাঁ গো বড় বউমা, ছেলেটা সারাদিন অফিস করে আসল মাত্র। ওকে দিয়ে এসব কাজ না করালে কি হচ্ছিল না তোমার?
নীলার মন ও মেজাজ উভয়ই খারাপ হয়ে যায় শ্বাশুড়ি মায়ের কথা শুনে। সে শান্ত গলায় বলে–
—মা, আমি তো আপনার ছেলেকে বলিনি আমার কাজে হাত দিতে। আমায় ধমকিয়ে সরিয়ে দিয়ে সে কাজটা করল। সাহায্য না করতে দিলে স্বামী ধমকায়, আবার সাহায্য করতে দিলে আপনি কথা শোনাচ্ছেন। আমি করবো টা কি একটু বলতে পারেন?
নীলার কথা শুনে অরিত্রে মা চোখ কপালে তুলে নেন। এই মেয়ে আগে শত কথায় রা করত না, আজ সে জবাব দিচ্ছে মুখের উপর। তিনি মনে মনে ভাবেন, তার বোনই ঠিক বলেছেন। নীলা বিজনেস শুরু করেছে দেখে সাপের পাঁচ দেখে ফেলেছে। কিছুদিন পর অরিত্র ও তাদের উপর নীলা ছুড়ি ঘুরাবে।
নীলার কথা শুনে অরিত্রের মা মুখ বাঁকিয়ে বললেন–
—বাহ বউমা, মুখে মুখে তর্কও করছো আজকাল।
—সত্য কথা বলাটাও বুঝি তর্কের অন্তর্গত, মা?
শ্বাশুড়ি-বউয়ের এমন নীরব তর্ক-বিতর্ক বড় আকার ধারণ করতেই তাদের স্বামীরা নিজেদের স্ত্রীদের সরিয়ে নেন সেখান থেকে। অরিত্রের বাবা তার স্ত্রীর কথার মাঝে হাত ঢুকিয়ে বলে–
—আহ হা অরুর মা, কি শুরু করলে রাত-বিরেতে। চলো ঘরে চলো, আমার ঔষধ গুলো গুছিয়ে দিবে। চলোওও…
ভদ্রলোক হাত ধরে টেনে নিয়ে যান স্ত্রীকে। নীলার কাজও ততক্ষণে শেষ হয়ে আসায় সেও গটগট করে নিজের রুমে চলে যায়। অরিত্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে চলে আসে।
নীলা রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে আবারও রুম থেকে বের হতে নিলে, অরিত্র জিজ্ঞেস করে–
—কোথায় যাচ্ছো এত রাতে আবার? ঘুমাবে না?
—পরে ঘুমাব। হাতে কয়েকটা কাজ আছে, সেগুলো শেষ করে নেই আগে।
—সেসব তো কাল করলেও চলবে। এখন আর কাজ করা লাগবে না, আসো ঘুমাতে আসো। এমন করলে তো তোমার শরীর খারাপ করবে।
—কাল কখন করবো? সকাল উঠার পর থেকে দুপুর তিনটা অব্দি আপনার মা আমাকে দুই মিনিট স্বস্তি পেতে দেয় না। তুমিই বলো, এতক্ষণ দৌড়াদৌড়ির পর শরীরে এনার্জি থাকে?
তারপরও বিজনেসের ছুতো দিয়ে সংসার লাটে তুলছি–কথাটা শুনতে শুনতে কানটা পচে যাচ্ছে। বিজনেস যেহেতু আমার, আমাকেই সাফার করতে দিন।
সবারই ধৈর্যের একটা সীমা থাকে। সেই সীমা অতিক্রম করলে মানুষ আর মিষ্টি ভাষায় আসে না। নীলার ক্ষেত্রেও তাই। সবকিছু করেও শুনতে হচ্ছে সংসার লাটে তুলছে সে। নীলা নিজের মতো ক্ষোভ ঝেড়ে চলে যায় অরিত্রের স্টাডি রুমে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
#চলবে?
[গল্পটার আর দু’টো পর্ব রয়েছে সম্ভবত। তাই ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ রইল।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]
Share On:
TAGS: মূল্য, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৯.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৮.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৩.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬১.১