শেষপাতায়সূচনা [৫৯.২]
সাদিয়াসুলতানামনি
আজ বিকেল থেকেই পূর্ণতার মাথায় আবারও ব্যথা শুরু হয়েছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে ব্যথা বাড়তে থাকলে, পূর্ণতা অফিস থেকে বাসায় চলে আসে। ভেবেছিল এসেই মেডিসিন নিয়ে একটা ঘুম দিবে, কিন্তু তার ছেলেটা আবার বায়না ধরেছে বার্গার খাওয়ার।
পূর্ণতা ছেলেকে ভুলেও বাহিরের খাবার খাওয়ায় না। মাঝে মধ্যে চকলেট দেয় এটাই তার কাছে বেশি মনে হয়। সে বাড়িতেই সবজি দিয়ে বিভিন্ন স্ন্যাক্স বানিয়ে দেয় তাজওয়াদকে। তাজওয়াদ অন্য বাচ্চাদের মতোই শাক-সবজি ভাতের সাথে একদমই খেতে চায় না। তাই ভুলিয়ে-ভালিয়ে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে খাওয়ানো হয় তাঁকে ভেজিটেবলস।
প্রতিদিন সন্ধ্যার নাস্তার প্রিপারেশন পূর্ণতা আগেভাগেই করে রাখে। কিন্তু আজ কোন একটা কারণ বসত করা হয়নি। আর আজই ছেলেটা বার্গার খাওয়ার বায়না ধরেছে। পূর্ণতা চাইলেই ছেলেকে মানিয়ে না বানাতে পারে বার্গার। কিন্তু আজ তাজওয়াদ তার ক্লাস টেস্টে ফুল নাম্বার নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। রিওয়ার্ড হিসেবে ছেলের আবদারটুকুই নাহয় রাখল সে।
জিনিয়া তখনও বাসায় না ফেরায় পূর্ণতাকেই একা হাতে সব বানাতে হয়। কাটা-ধোয়াসহ যাবতীয় কাজ সেই করে। হোম মেইড মেয়োনিজ, বার্গার প্যাটি বানিয়ে একে একে সবগুলোকে দক্ষ হাতে বার্গার বানের উপর সাজিয়ে দেয়। সময়ের ব্যবধানে দশটা বার্গার বানায়। সেগুলোর সাথে বড়দের জন্য চা-কফি আর তাজওয়াদের জন্য মিল্ক শেক বানায়।
তার এগুলো বানাতে বানাতে জাওয়াদ ও জিনিয়া উভয়ই এসে পড়ে। বাবা আর ফুপিকে দেখে ছোট তাজ ছুটতে ছুটতে নিজের টেস্টের পেপারটা নিয়ে যায় তাদের কাছে। তারপর ভীষণ আগ্রহ ও গর্ব নিয়ে কাগজটা দেখিয়ে বলল–
—পাপা দেকো দেকো, আমি ফুল মার্ক পেয়েচি টেস্টে। পিপি তুমিও দেকো।
জিনিয়া আর জাওয়াদ দু’জনই তাজওয়াদকে বাহবা দেয় তার এহেন সাফল্যে। জিনিয়া তো তার রিওয়ার্ড হিসেবে তখনই একটা বড় ক্যাটবেরির প্যাকেট বের করে তাজওয়াদকে দেয়। তাজওয়াদ খুশি হয়ে তার পিপিকে বেশ কয়েকটা হামি দেয়।
তাদের তিনজনের এমন মাখোঁ মাখোঁ ভালোবাসাময় মূহুর্তে এসে বাগড়া দেয় পূর্ণতা।
—আপনারা দু’জন বাহির থেকে এসে ফ্রেশ না হয়েই বসে রয়েছেন কেনো? যান ফ্রেশ হয়ে আসুন।
আর তাজ, ঐটা এখন ছিঁড়বে না। আমি তোমার জন্য বার্গার বানিয়েছি। এটা খাবে। ডিনারের পর ঐটা খাবে। দাও আমাকে চকলেটের প্যাকেটটা।
পূর্ণতার গম্ভীর গলার স্বর শুনে তারা তিনজনই সুর সুর করে তার কথা পালনে লেগে যায়। জিনিয়া আর জাওয়াদ চলে যায় নিজেদের রুমে ফ্রেশ হতে। আর তাজওয়াদও লক্ষী বাচ্চার মতো মায়ের হাতে চকলেটের প্যাকেটটা তুলে দেয়। সে মোটেও কিন্তু বেশি দুষ্টুমি করে না। সে যেমন পূর্বে মা পাগল ছিলো, এখনও রয়েছে। তার হাবভাব দেখে মনে হয় ভবিষ্যতেও হয়ত থাকবে।
কিন্তু পূর্ণতা এখন থেকেই চেষ্টায় থাকে ছেলেটাকে সঠিক-ভুলের মাঝে পার্থক্য করা শিখতে। ছেলেকে নিজের প্রতি ঝুঁকতে দেখে সে যেমন খুশি হয়, তেমনই ভয়ও পায় ছেলেটা না ভবিষ্যতে নিজের বাবার মতো কিছু করে বসে অতি ভালোবাসায়।
হঠাৎই পূর্ণতার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলে সে তাড়াতাড়ি করে পাশের দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে নিজেকে স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় দেয়। সে অনুভব করে তার গা ভীষণ গুলোচ্ছে। বিষয়টা খেতে খেতেই খেয়াল করে তাজওয়াদ।
মা’য়ের বিবর্ণ মুখ ও হঠাৎ এমন করে থমকে যাওয়া দেখে সে খাওয়া রেখে ছুটে তার কাছে চলে আসে। তারপর উদ্বিগ্ন হয়ে বারংবার জিজ্ঞেস করতে থাক–
—মাম্মা, ও মাম্মি, কি হয়েচে তুমাল? এমুন কলে দালিয়ে গেলে কেনু?
পূর্ণতা ছেলের কণ্ঠস্বর শুনে চোখ মেলে তাকায়। জোরজবরদস্তি একটা হাসি দিয়ে বলে–
—কিছু হয়নি সোনা। গরম তো তাই মায়ের মাথাটা একটু কেমন করে উঠেছিল। তুমি যাও খাও গিয়ে।
—মিত্তে বলচো কেনু মাম্মা? কতদিন ধলে বিত্তি হচ্ছে, গলম কুতায়? তোমাল হ্যাডেক হচ্ছে, তাই না?
তাজওয়াদ তার মায়ের মাথা ব্যথা সম্পর্কে ছোট থেকেই জ্ঞাত। কানাডায় থাকাকালীন মাথা ব্যথা উঠলে এই ছোট জানটা ছাড়া তো আর কেউ ছিল না পূর্ণতার পাশে, যে কিনা তার একটু খোঁজ খবর নিবে। পানি অথবা ঔষধটা এগিয়ে দিবে। মাথা ব্যথায় পূর্ণতা যখন ছটফট করত, চুল খামচে ধরে কাঁদত। তখন ছোট তাজ তার কোমল হাতে অপরিপক্কভাবেই আঙ্গুলে মুভ নিয়ে মালিশ করে দিতো মায়ের মাথা।
পূর্ণতা একটু হেঁসে বলে–
—বেশি ব্যথা না, সামান্য। তুমি চিন্তা করো না, মাম্মা মেডিসিন নিলেই ঠিক হয়ে যাবো। খাও তুমি জান বাচ্চা।
তাদের মা-ছেলের কথার মাঝেই জিনিয়া আর মি.শেখ এসে পড়ে। পূর্ণতা তাদের স্ন্যাক দিয়ে জাওয়াদের খাবারটা নিয়ে রুমে চলে আসে। তারপর খাবারের ট্রে টা টি-টেবিলের উপর রেখে ঔষধ না খেয়েই চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়ে। সে আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ থাকায় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই ঔষধ গুলো অফ করে দিয়েছে নেওয়া। আজ হঠাৎই আবার ব্যথা উঠায়, কেমন পাগল পাগল লাগছে তার নিজেকে।
জাওয়াদ শাওয়ার নিয়ে একটা টাওয়াল কোমড়ে জড়িয়ে উন্মুক্ত দেহেই বের হয় ওয়াশরুম থেকে। বের হওয়ার পর পূর্ণতাকে বেডের উপর এমন এলোমেলো হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে তার কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ে। সে তটস্থ ভঙ্গিতে তার দিকে এগিয়ে এসে ঝুঁকে যায়। তারপর নিজের শীতল ডান হাতটি পূর্ণতার গালে রেখে আস্তে করে বলে–
—পূর্ণ, কি হয়েছে তোমার? এমন এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছো কেনো?
জাওয়াদ মাথা ভালো করে না মোছার কারণে টপটপ করে কয়েক ফোটা পানি পূর্ণতার চোখে-মুখে এসে পড়ে। পূর্ণতা আদো আদো চোখ খুলে বলে–
—প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে জাওয়াদ। ঔষধ দিন আমার।
জাওয়াদ বুঝতে পারে না সে কোন ঔষধ দিবে। কারণ গত কয়েক মাস ধরে পূর্ণতা কোন ঔষধ নিচ্ছে না। সে পূর্ণতার কাঁধের পেছনে হাত রেখে মাথাটা একটু উঁচু করে বালিশ গুঁজে দেয় মাথার নিচে। বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কোন ঔষধ দিবো? তোমার না মেডিসিন অফ রয়েছে বর্তমানে?
জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার মনে পড়ে মেডিসিন অফের বিষয়টা। সে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে বলে–
—মুভ আনেন, টাফনিল আছে না? ঐটাই দেন, তবে কিছু অন্তত দেন। নাহয় আমার মাথায় বাশ দিয়ে দু’টো বারি দিয়ে ফাটিয়ে দেন। না থাকবে মাথা, আর নাই করবে ব্যথা।
জাওয়াদ চটজলদি নিজের টাওয়াল পাল্টে একটা ট্রাউজার পরে বউয়ের সেবায় লেগে যায়। ঔষধ খাওয়ানোর আগে সে তড়িঘড়ি করে পূর্ণতার বানানো বার্গার থেকে দুই কামড় খাইয়ে দেয় তাকে। তারপর ঔষধ খাওয়ায় পূর্ণতাকে। এরপর নিজে বেডে এসে আধশোয়া হয়ে বউকে টেনে নেয় বুকের উপর।
জাওয়াদের শীতল বুকে নিজের মাথা রেখে পূর্ণতা ফুঁপিয়ে ওঠে। ভাঙা ভাঙা গলায় বলে–
—এই সেবাটুকু আমি ভীষণ করে চাইতাম জাওয়াদ, কানাডায় যখন আমার এমন পেইন হতো। আপনাকে ভীষণ করে চাইতাম। ভীষণ মিস করতাম আপনাকে। পানি ছাড়া যেমন মাছ ছটফট করে, তেমন করে ছটফট করতাম আপনার সান্নিধ্যের জন্য ছটফট করতাম। আমি তো তখন জানতাম, আপনি সুখে আছেন অন্য কারোর সাথে। তাও প্রতিবারের মতো আমার নির্লজ্জ, বেহায়া মন আপনার দিদার চাইত। অনেক অভিমান হতো আমার আপনার উপর। কিন্তু…..
নিজের বুকের উপর পূর্ণতার অশ্রুর আভাস পেতেই তাকে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। তার চুলের ভাঁজে আঙুল চালাতে চালাতে নত স্বরে বলে–
—হুশ, কাঁদে না জান। আমি জানি, আমার ভুলের পরিমাণ অনেক, যা-এই জীবনে শোধ করতে পারব বলে মনে হয় না আমার। কিন্তু তোমার অতীতের সকল অপূর্ণতা গুলো পূর্ণতার চাদরে মুড়িয়ে দিয়ে সুখের সর্বোচ্চ শিখড়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটা নিলাম।
এখন একটু ঘুমাও তো। ডিনারের সময় হলে ডেকে দিবো আমি। কাল রাত জেগে কাজ করেছিলে তাই না?
—হুম।
জাওয়াদের বুকে নাক ঘষতে ঘষতে ছোট জবাব দেয় পূর্ণতা। পারিবারিক বিভিন্ন কারণে কাজে অনেক গাফিলতি হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া সামনে বড় একটা প্রজেক্ট হাতে নিতে চলেছে পূর্ণতা পরিচালিত আহমেদ গ্রুপ। তাই কাজে অনেক প্রেশার বেড়েছে পূর্ণতার।
জাওয়াদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পূর্ণতার জবাব শুনে। তারপর বিনা বাক্য ব্যয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সেভাবেই বসে কাটিয়ে দেয় প্রিয় রমণীটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে।
দেড় ঘন্টা পর তাজওয়াদ তার নাস্তা ও স্কুলের পড়া শেষ করে বাবা-মায়ের রুমে আসে। মা’কে বাবার বুকে ঘুমাতে দেখে তাজওয়াদ পা টিপে টিপে বেডে এসে বাবার বুকের অপর পাশটিতে শুয়ে পড়ে।
জাওয়াদ চোখের উপর হাত রেখে শুয়ে ছিলো বলে তার কিছুটা তন্দ্রা ভাব এসে পড়েছিল। আর দরজাটাও আধখোলা থাকায় তাজওয়াদের নিঃশব্দে প্রবেশ করা সে টের পায় নি। কিন্তু নিজের বুকের উপর আরেকটি প্রাণের অস্তিত্ব টের পেয়ে জাওয়াদ চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে সেদিক টায় তাকায়।
তাজওয়াদও তখন ছলছল দৃষ্টিতে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। তাই তাদের দৃষ্টির সন্ধি হয়ে যায় আর জাওয়াদ দেখতে পায়, ছেলের চোখ অশ্রুতে টইটম্বুর। সে অন্য হাতটি দিয়ে তাজওয়াদকে নিজের সাথে আগলে নিয়ে চাপা গলায় বলে–
—কি হয়েছে বাবা? চোখে পানি কেনো তোমার?
—মাম্মাল চুকেও তো পানি বাবা।
জাওয়াদ পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে দেখে, পূর্ণতার বাম চোখের কার্ণিশে এক বিন্দুর মতো পানি। ঘুমানোর আগে যে কেঁদেছিল, সেটারই বোধহয়। জাওয়াদ একটা লম্বা শ্বাস ত্যাগ করে বলে–
—ও কিছু না। কাঁদে না বাবা। তোমার মাম্মা যদি জানতে পারে, তার জান বাচ্চা কেঁদেছে। তাহলে সেও আবার কান্না শুরু করে দিবে এই ভেবে, কেন কেঁদেছে তার বাচ্চাটা? এসব করতে করতে তখন মাম্মার আবারও মাথা ব্যথা উঠবে। বিষয়টা কি ভালো হবে তখন?
তাজওয়াদ ঠোঁট ফুলিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। জাওয়াদ ছেলেকে নিজের বুকের উপর শুইয়ে দিয়ে তার মাথাতেও আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
—মন খারাপ করে না আব্বু, তোমার মাম্মা মেডিসিন নিয়েই ঘুমাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠার পর দেখবে একদম আগের মতো ফিট হয়ে গিয়েছে।
তাজওয়াদ মেনে নেয় বাবার কথা। কারণ সে তার বাবাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা শিখে গিয়েছে এতদিনে। সে ঐভাবেই শুয়ে থেকে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে একধ্যানে। হঠাৎই তার মনে পড়ে তার দাদাভাই তাকে একটা সুরা শিখিয়েছিল। সুরাটির হলো সুরাতুল ফাতিহা। তার দাদাভাই তাঁকে সুরাটি শেখানোর সময় এর কিছু ফজিলতও বলেছিল। এই সুরার অপর নাম সুরাতুল শিফা। আল্লাহ পাকের উপর নিখাদ মনে ঈমানী বিশ্বাসের সহিত এই সুরা পড়ে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য দোয়া করলে আল্লাহ পাকের রহমতে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থতা লাভ করে।
তাজওয়াদের এই কথাটি মনে পড়তেই সে বাবার বুক থেকে উঠে বসে। তারপর বিরবির করে তিনবার সুরা ফাতিহা পড়ে মায়ের মাথায় ও মুখে ফু দিয়ে নিজের দুই হাত জড়ো করে বলে–
—আল্লাহ আমাল মাম্মাকে সুস্ত কলে দিন প্লিজ। তাজ আল মাম্মাকে জ্বালাবে না, দুট্টুমিও কলবে না। সব ভেজিটেবল খাবে। হোমওয়ার্ক কলাল সময়ও লাপালাপি কলবে না। সকালে স্কুলে না যাওয়াল জন্যও বায়না ধলবে না। একদম গুড বয় হয়ে যাবে। আপনি প্লিজ আমাল মাম্মাকে আগেল মতো কলে দিন।
জাওয়াদ একটা হাসি দেয় ছেলের কাজ দেখে। তার ছেলেটা এত মা পাগল। মায়ের কিছু হলে, ছেলেটাও যেন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
পেট কিছুটা ভরা থাকায় তাজওয়াদ বাবার বুকে মাথা রেখে মা’কে দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়ে। রাত সাড়ে দশটার দিকে জাওয়াদ পূর্ণতা আর তাজওয়াদকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিজ হাতে ভাত খাইয়ে দেয়। নরমাল একটা ঘুমের ঔষধ নেওয়ার কারণে পূর্ণতা ঘুম ঢুলতে ঢুলতেই খাবারটা খায়। তাজওয়াদও আধোঘুমে আধো জাগ্রত থেকে খায়।
খাওয়া শেষ করে মুখ ধুইয়ে মুছে দিতেই পূর্ণতা আর তাজওয়াদ ধপ করে আবারও শুয়ে পড়ে। ঘুমের ঘোরেই তাজওয়াদ গড়িয়ে গড়িয়ে মায়ের বুকে গিয়ে শুয়ে পড়ে। পূর্ণতাও ছেলেকে পেয়ে যেন আরো একটু স্বস্তি নিয়ে নিদ্রায় ডুবে যায়। জাওয়াদ তাদের মা-ছেলের এমন কান্ড দেখে মিটমিটিয়ে হাসতে থাকে।
জাওয়াদ নিচে বাবা আর বোনের সাথেই খেয়ে পূর্ণতাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিল। তাই এঁটো প্লেটটা টি-টেবিলের উপর রেখে ঘরের লাইট নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে প্রতিদিনের ন্যায় পূর্ণতার পাশে এসে শুয়ে পড়ে। পূর্ণতার পিঠ তখন জাওয়াদের দিকে ফেরানো।
কিছুক্ষণ বাদে পূর্ণতা ঘুমের ঘোরেই জাওয়াদের হাত টেনে নিজের উপর দিয়ে এনে সেটা তাজওয়াদের পিঠের উপর রাখে। পূর্ণতার এই কাজে জাওয়াদের অধরের কোণ বেঁকে যায়। সে আরেকটু এগিয়ে এসে তাজওয়াদসহ পূর্ণতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে।
কানের কাছে ফুসুরফুসুর শব্দের কারণে জাওয়াদ ঘুমের মধ্যেই বিরক্ত বোধ করে। শব্দটাকে পাশ কাটিয়ে আবারও ঘুমাতে চায়, কিন্তু পারে না। কিছু সময় পর আবার কেমন খচরমচর শব্দ হচ্ছে। না পারতে অবশেষে চোখ মেলে তাকায় সে যেদিকটা থেকে শব্দগুলো ভেসে আসছে।
শব্দের উৎসের দিকে তাকাতেই তার ঘুম-টুম সব গায়েব হয়ে যায়। সে দেখতে পায়, পূর্ণতা আর তাজওয়াদ গভীর মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কার্টুন দেখছে আর চিপস খাচ্ছে। দেখতে দেখতে তাজওয়াদ মাঝে মধ্যেই মায়ের মুখে চিপস তুলে দিচ্ছে আবার নিজেও খাচ্ছে। কখন আবার ফিসফিস করে কার্টুনের ক্যারেক্টার সম্পর্কে কি এসব বলছে দু’জনে।
জাওয়াদ জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে এখনও ভালো করে দিনের আলো ফুটেনি, অথচ তার সুখেরা ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। সে ঘুম ভাঙা গম্ভীর গলায় বলে–
—তোমরা না ঘুমিয়ে এত সকালে কি করছ এসব?
তার কণ্ঠস্বর শুনে তাজওয়াদ-পূর্ণতা দু’জনই চমকে জাওয়াদের দিকে তাকায়। এই সময়ে তারা জাওয়াদের জেগে যাওয়াটা আশা করেনি।
পূর্ণতা আস্তে ধীরে বলে–
—কাল আমরা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না, তাই সকাল সকালই ঘুম ভেঙে গেলো। ক্ষুধাও পেয়েছিল তাই চিপস খাচ্ছিলাম। খাবেন আপনি? নিন।
চিপসের বোলটা জাওয়াদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কথাটি বলে পূর্ণতা। জাওয়াদ ঘুম মাখা চোখে প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে থাকে। কালকে রাতের মাথা ব্যথায় মুষড়ে পড়া মেয়েটির মতো আজ লাগছে না পূর্ণতা। বরং চনমনে, সুস্থ, প্রাণবন্ত লাগছে। জাওয়াদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পূর্ণতা ও তাজওয়াদকে আবারও স্বাভাবিক হতে দেখে।
সে একটু এগিয়ে এসে পূর্ণতার কপালের কিনারা ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। পরাপর তাজওয়াদকেও আদরটুকু দিতে ভুলে না। তারপর সে বেড ছেড়ে উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে।
পূর্ণতা তাকে ওয়াশরুম থেকে বের হতে দেখে তাজওয়াদকে বেডে বসিয়ে নিজে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বলে–
—ছেলেকে রেডি করিয়ে দিন, আমি আপনাদের জন্য ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছি।
কথাটা বলে সে রুম থেকে বের হতে নেয়, তখন জাওয়াদ তার হাত ধরে আটকে দেয়। বাঁধা পাওয়ায় পূর্ণতা পেছন ফিরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে, জাওয়াদ গুরুগম্ভীর গলায় বলে–
—তুমি যদি আজ ভুলেও কিচেনে যাও, তাহলে তোমাকে আমি আগামী এক সপ্তাহ বিছানায় বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হবো।
পূর্ণতা বিস্ময় নিয়ে বলে–
—কিন্তু কেনো যাবো না কিচেনে?
—কাল ব্যথায় ছটফট করে আমাদের বাপ-ছেলের অবস্থা খারাপ করে দিয়ে, আজ জিজ্ঞেস করছো কেনো যাবে না কিচেনে। তোমার রাত জাগা, গরমে কাজ করা, দুঃশ্চিন্তা করা একদমই বারন। কিন্তু তুমি এসব কাজ গুলোই করে নিজের সাথে আমাদেরও অবস্থা খারাপ করে দাও। কেনো করো? আমায় নাহয় শাস্তি দাও বুঝলাম, কিন্তু আমাদের ছেলে। ও কি করেছে? তুমি জানো না, তোমার অসুস্থতায় ও মানসিকভাবে কতটা ভেঙে পড়ে?
জাওয়াদের কণ্ঠে রাগ ও কষ্ট উভয়েরই উপস্থিতি ছিলো। পূর্ণতা নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে প্রিয় পুরুষটির দিকে। তার বুকের ভেতর কেমন সুখ সুখ দোলা দিচ্ছে। তার ছেলে ব্যতীত আরো কেউ তার কষ্টে কষ্ট পায়। তাকে হারানোর ভয় চোখে ভেসে ওঠে। অভাগী পূর্ণতার কাছে এসব কিছু স্বপ্নের চেয়ে কম নয়।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]
শব্দসংখ্যা~২১০০
চলবে?
[আজ পুরোটা পর্ব পূর্ণতার সুখেদের নিয়ে লিখলাম। বেশি বেশি রেসপন্স না করলে কষ্ট পাবো কিন্তু।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫০.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৭.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.২