Golpo romantic golpo মিস্টার মাংকিম্যান

মিস্টার মাংকিম্যান পর্ব ৪


মিস্টার_মাংকিম্যান

পর্ব- ৪

লেখিকাঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা

হাসপাতালের সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গণ্ডি থেকে বের হওয়ার পর বাইরের তপ্ত বাতাস নিয়তির অবশ শরীরে কেমন অদ্ভুত অসাড়তা এনে দিয়েছিল। বাসায় ফেরার পুরোটা পথ গাড়ির পেছনের সিটে মায়ের কোলে মাথা রেখে অচেতনের মত শুয়ে ছিল সে। আধবোজা চোখ গড়িয়ে তখনো জল পড়ছে।

আসলাম সাহেব ড্রাইভ করার সময় একবারের জন্যও লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাননি। উনার হাত দুটো স্টিয়ারিং হুইলকে শুধুমাত্র পোক্তভাবে ধরে রেখেছিল।প্রিয় এই শহরের চেনা রাস্তাগুলো আজ উনার কাছে কেমন অপরিচিত গোলকধাঁধাময় লাগছে। যে সমাজকে তিনি এত বছর ধরে নিজের সততা আর নিয়মানুবর্তিতা দিয়ে জয় করেছিল, সেই সমাজের প্রতিটি ধূলিকণা যেন আজ তাকে পরিহাস করছে!

বাসায় পৌঁছানোর পর রেহানা বেগম পরম মমতায় নিয়তিকে ঘরে নিয়ে এলেন। জানালার ভারী পর্দাগুলো টেনে দিলেন। ড্রেসিং টেবিলের ওপর ওষুধের প্যাকেটগুলো সাজিয়ে রাখলেন। নিয়তির গায়ের জামাটা বদলে একটা নরম সুতির ফ্রক পরিয়ে দিলেন।
রেহানা অত্যন্ত কোমল গলায় বললেন,

-মা, একটু উঠে বস। এই ওষুধটা খেয়ে নে।

নিয়তি কোনো কথা না বলে মায়ের সাহায্য নিয়ে কোনোমতে উঠে বসল। মেয়েটার ঠোঁট দুটো দেখাচ্ছে শুকনো পাপড়ির ন্যায়। ওষুধটা খেয়ে সে আবার বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়ল। কম্বলটা টেনে একদম চিবুক পর্যন্ত মুড়ি দিল।

রেহানা বিছানার পাশে বসে নিয়তির কপালে হাত বুলাতে লাগলেন। রেহানার ভেতরের মাতৃত্বের অসহায় হাহাকার।তিনি মেয়ের সামনে প্রকাশ করতে পারছিলেন না। একজন মা হিসেবে তিনি নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন ততক্ষণে। যে মেয়েকে তিনি নিজের চোখের আড়াল হতে দিতেন না, যাকে প্রতিটি মুহূর্তে আগলে রাখতেন, সেই মেয়ের সাথে নিজের ঘরে, তার নিজের রক্তের একজন মানুষ এত বড় নৃশংসতা চালিয়ে গেল, আর তিনি তা টের পাননি?

এই অপরাধবোধ রেহানার কলিজাটাকে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিচ্ছিল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। ওষুধের আসল প্রতিক্রিয়া শুরু হলো।

নিয়তির পেটের ভেতর থেকে কেমন তীব্র মোচড় দিয়ে ওঠা ব্যথা ক্রমশ মেরুদণ্ড বেয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ব্যথার তীব্রতায় নিয়তির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগল। মেয়েটা দুই হাঁটু বুকের কাছাকাছি এনে নিজেকে গুটিয়ে নিল।

-উহ!!!

নিয়তির গলা দিয়ে অবরুদ্ধ গোঙানি বেরিয়ে এলো।

  • কী হয়েছে মা? খুব কষ্ট হচ্ছে?
    রেহানা তড়িঘড়ি করে মেয়ের আরও কাছে এগিয়ে এলেন।

-পেটের ভেতর কেমন যেন লাগছে মা। মনে হয় সব ছিঁড়ে যাচ্ছে… খুব ব্যথা…

রেহানা লক্ষ্য করল তার মেয়ের কাপড়ের পেছনের অংশ রক্তে ভিজে যেতে শুরু করেছে। রেহানার ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। নিয়তি ব্যথায় আরো কুঁকড়ে গেল। বিছানায় ছটফট করতে লাগল।

রেহানা বেগম আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি নিয়তির ছোট ছোট হাত দুটোকে নিজের মুঠোয় ভরে নিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

-আমি আছি মা, তোর অভাগী মা টা এখনো বেঁচে আছে। তোর কিচ্ছু হবে না। তুই শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখ!

★★★

আসলাম সাহেব সন্ধ্যার পর থেকেই বারান্দার এক কোণে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসে আছেন। উনার ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে একটা বিড়ি। ধূমপানের অভ্যাস উনার বহু বছর আগেই ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু আজ এই মানসিক বিপর্যয়ের রাতে ভেজা চোখে তিনি একটার পর একটা বিড়ি ফুঁকে চলছেন।

নিয়তি পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়ার পর রেহানা ধীর পায়ে বারান্দার দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুহুর্তেই তামাকের কড়া গন্ধ উনার নাকে এসে লাগল। তিনি দেখলেন উনার স্বামী বারান্দার এক কোণে কেমন কুঁকড়ে বসে আছেন! চোখের জলে তার সাদা পাঞ্জাবির কলার ভিজে জবজবে।

-নিয়তি ঘুমিয়েছে?

আসলাম সাহেব না ঘুরেই খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করলেন। অতিরিক্ত বিড় ফুঁকার ফলে তার গলা একেবারে বসে গিয়েছে।

-হুঁ। ব্লিডিং হচ্ছে… শরীরটা একদম শেষ হয়ে গেল মেয়েটার।

রেহানা বারান্দার গ্রিল ধরে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ালেন। আসলাম সাহেবের হাতের জ্বলন্ত বিড়িটার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললেন,

-আর কত খাবে? এমনিতেই কাশির চোটে কথা বলতে পারছ না।

আসলাম সাহেব হাতের বিড়িটা ফেললেন না। ওটা আঙুলের মাঝে ধরে রেখেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস আত্মবিধ্বংসী সুরে বললেন,

-জানো রেহানা? ছোটবেলা মুরুব্বিদের মুখে শুনে আসছি, অন্যকে সাহায্য করলে নাকি পুণ্য হয়। সেই পুণ্য আবার দ্বিগুণ হয়ে নিজের জীবনে ফিরে আসে।

আমি তো আমার জীবনে কোনোদিন কারও ক্ষতি করিনি। শফিক যখন এসেছে, তাকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখেছি। ও আমার বাড়িতে এসেছে, আমার অন্ন খেয়েছে।

আমার সেই পুন্যগুলো কেন এমন দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে এলো রেহানা? সৃষ্টিকর্তা কেন আমার নিষ্পাপ মেয়েটার জীবন দিয়ে আমার পরীক্ষা নিলেন? এ পরীক্ষায় পাশ করা নৈব নৈব চ! রেহানা, নৈব নৈব চ!

বলতে বলতে আসলাম সাহেবের গলার স্বর বুজে এলো। তিনি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না।তিনি দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। একজন বাবার এই বুকফাটা কান্না বারান্দার নিস্তব্ধ বাতাসকে চিরে খান খান করে ফেলল।

রেহানাও আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি আসলাম সাহেবের কাঁধের ওপর হাত রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। এই মধ্যরাতের অন্ধকারে, নিজেদেরই তৈরি করা সুরক্ষিত নীড়ে বসে এই মা-বাবা আজ চরমভাবে পরাজিত। তাঁরা মা-বাবা হয়েও নিজ বাড়িতে নিজের সন্তানকে নরপিশাচের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলেন না। এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা, এর চেয়ে বড় লজ্জা একজন মা-বাবার জন্য আর কী হতে পারে?

রেহানা চোখ মুছে বললেন,
-তাহলে এখন আমাদের কী করণীয়? এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো শয়তানটা পার পেয়ে যাবে। নিয়তির এই অবস্থার বিচার আমরা কার কাছে চাইব?

আসলাম সাহেব হাতের বিড়িটা গ্রিলের বাইরে ফেলে দিলেন। আগুনের স্ফুলিঙ্গটা নিচে পড়তে পড়তে মিলিয়ে গেল। উনার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

-আগামীকাল সকালেই আমি গ্রামে যাব, রেহানা।
শফিকের সাথে একটা চূড়ান্ত বন্দোবস্ত তো করতেই হবে! ও কি ভেবেছে? আমার মেয়ের জীবনটা শেষ করে দিয়ে নিজের বউয়ের আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকবে? ছেড়ে দিলে তো হবে না! ওর এই পাপের হিসাব আমি কড়ায় গণ্ডায় উসুল করব।

রেহানা প্রত্যুত্তরে কিছু বললেন না। তিনি শুধু স্বামীর দৃঢ় চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

★★★

পরের দিন।
কেবল ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আসলাম সাহেব গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। উনার গাড়িটা যখন শহরের সীমানা পেরিয়ে কাঁচা রাস্তার দিকে এগোচ্ছিল, মাথার ভেতর কেবল নিয়তির সেই যন্ত্রণাকাতর মুখটা ভেসে উঠছিল। আজ তিনি একজন ক্ষিপ্ত পিতা, যে নিজের সন্তানের সম্ভ্রমহানির প্রতি শোধ নিতে যাচ্ছে।

কয়েক ঘণ্টার জার্নি শেষে আসলাম সাহেবের গাড়িটা শফিকদের গ্রামের বাড়ির উঠোনে এসে থামল। আসলাম সাহেব এভাবে হুট করে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়া গ্রামে আগমনে শফিকের পুরো পরিবার অত্যন্ত অবাক হলো।

উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা শফিকের বৃদ্ধ বাবা আর বাড়ির অন্য সদস্যরা আসলাম সাহেবকে দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

-আরে আসলাম! তুমি হঠাৎ এই সকালে? কোনো খারাপ খবর আছে নাকি?

আসলাম সাহেব কারও সাথে কুশল বিনিময় করলেন না। উত্তর দিলেন না। তিনি সোজা বারান্দায় উঠে এলেন এবং কঠোর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

-শফিক কোথায়? আর ওর বউ রিনা কোথায়? ওদের দুজনকে এখনই এই ঘরে ডাকুন। আমি ওদের সাথে কথা বলব।

আসলামের গলার স্বরের অস্বাভাবিক টোন দেখে বাড়ির মুরুব্বিরা আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলেন না। শফিক আর রিনাকে ঘরের ভেতরের ছোট বৈঠকখানায় ডেকে আনা হলো।

শফিক ঘরে ঢুকল অত্যন্ত ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে। শফিকের পেছনে রিনা এসে দাঁড়াল। তার চোখেও এক ধরণের প্রতিরক্ষামূলক চাউনি।

আসলাম সাহেব ঘরের দরজাটা লাগিয়ে দিলেন। আচমকা শফিকের শার্টের কলার মুঠোর মধ্যে ধরে জিজ্ঞেস করলেন,

-শফিক, তুই আমার মেয়ের সাথে কি করেছিস জার*জের বাচ্চা?

শফিক শুরুতে একদম আকাশ থেকে পড়ার ভান করল।

-আমি! আমি কি করমু নিয়তি মামণির সাথে? কি বলেন দুলাভাই কি হইছে?

আসলাম শফিকের গালে ঠাঠিয়ে একটা চড় মেরে ফের জিজ্ঞেস করলেন,

-শুয়ো*রের বাচ্চা, তুই আমার ওইটুকুন ছোট্ট মেয়ের সাথে যে জঘন্য কাজটা করেছিস, তার সমস্ত মেডিকেল রিপোর্ট আমার কাছে আছে। এবার তুই নিজের মুখে বলবি, নাকি তোরে পুলিশের ধোলাই খাওয়াব বল?

আসলামের হুংকারে বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না শফিক। বরং সে রিনার দিকে তাকিয়ে এক কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,

-দেখেন দুলাভাই, আপনার মেয়ে শহরে বড় হইছে।ওর চরিত্রের তো কোনো গ্যারান্টি নাই! আজকালকার শহরের মেয়েরা কোথায় কার সাথে কী করে বেড়ায়, কোন ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ায়, তার কোনো হিসাব আছে? এখন নিজের দোষ ঢাকতে আমার মতো একটা ভদ্র মানুষের নামে মিথ্যা কলঙ্ক ছড়াচ্ছে! ওয় তো একটা আস্ত নষ্ট মেয়ে!

“নষ্ট মেয়ে!” শব্দ দুটো শফিকের মুখ থেকে বের হওয়া মাত্রই আসলাম সাহেবের বুক কাঁপতে লাগল! কি বলছে এসব এই নরপশু?
ক্লাস সিক্সে পড়া একটা নিষ্পাপ মেয়ে, যার জরায়ু আজ ওষুধের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় রক্তক্ষরণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেই এতটুকুন মেয়ের চরিত্রের দোষ খুঁজছে এই নরপশুটা?

আসলাম সাহেব আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না। এবার তিনি নিজের শরীরের সর্বশক্তি একত্র করে শফিককে ধুমধাম মারতে লাগলেন।

-এই আসলাম ভাই এই, আমার স্বামী গায়ে হাত তুললেন কেন!

রিনা চিৎকার করে শফিকের দিকে ছুটে গেল।

-শহর থেকে এসে আমাদের বাড়িতে আমার স্বামীরেই অকারণে মারতেছেন? কেন কি করছে আমার স্বামী?

শফিক ওঁর ঠোঁটের কোণ দিয়ে জর্দার লাল রস মুছতে মুছতে বলল,

-আমাকে মারলেন তো দুলাভাই? তা যদি এই কাজটা আমি করেও থাকি, তাহলে আপনি কী করবেন? কোর্ট কাচারি করবেন? পুলিশে মামলা দেবেন? দেন না! মামলা দিলে সম্মানটা কার যাবে? আপনার যাবে। আমারে আর কয়জন চিনে বলেন? আর সবচেয়ে বড় কথা, ওইটুকুন বাচ্চা মেয়ে নিয়তি, আপনি বাবা হয়ে পারবেন মেয়েরে কোর্টের ওই নোংরা ঝামেলার মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে?

উকিলরা জজের সামনে ওর শরীরের ভেতরের খুঁটিনাটি নিয়ে সবার সামনে জেরা করবে, ও মুখ দেখাতে পারবে?

খবরের কাগজে নিয়তির নাম আর ছবি দিয়ে বড় বড় হেডলাইন লেখা হবে ‘আসলাম সাহেবের নাবালিকা মেয়ে’ বাকিটুকু আর না বলি দুলাভাই!

মেয়েটার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে তো? ও কি এই সমাজে আর কোনোদিন কোনো ভালো ঘরে বিয়ে বসতে পারবে? ওর জিন্দেগি তো ওখানেই শেষ! বুঝছেন না দুলাভাই?

শফিক একটু এগিয়ে এসে আসলাম সাহেবের মুখোমুখি দাঁড়াল। সস্তা জর্দার তীব্র বমি আনা গন্ধ আসলাম সাহেবের নাকে এসে লাগল। শফিক ফিসফিস করে বলল,

-ভুল তো মানুষেরই হয় দুলাভাই। কাজেই আমাকে মাফ করে দেন। এই ঘটনাটা এখানেই ভুলে যান। আমারে ঘাঁটাইলে কিন্তু আপনার মেয়ের ভবিষ্যত নিয়েই ঝামেলা বাঁধব। আমার কিচ্ছু হব না।

আসলাম সাহেবের বুকের ভেতরটা এক নিমিষে খরাগ্রস্ত মরুভূমি হয়ে গেল। শফিক মিথ্যা বলেনি। এদেশের সমাজ ব্যবস্থাই এমন।

এদেশে ধর্ষক হওয়ার চেয়ে ধর্ষিতা হওয়া ঢের অপরাধের।

এ সমাজ অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভুক্তভোগীর চরিত্র হনন করতে বেশি ভালোবাসে।

আসলাম সাহেব যদি আইনে দারস্থ হন তবে পুলিশ স্টেশন থেকে শুরু করে আদালতের কাঠগড়া প্রতিটি জায়গায় নিয়তিকে এক চরম লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্র’ মানুষগুলো নিয়তির দিকে সহানুভূতির চোখে তাকাবে না।
নিয়তির দিকে তাকাবে এক কুৎসিত, লোলুপ আর পরিহাসের চাউনি নিয়ে। স্কুলে ওর সহপাঠীরা ওকে এড়িয়ে চলবে। স্কুলের শিক্ষকরা ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে। খবরের কাগজের কাটতি বাড়ানোর জন্য নিয়তির ব্যক্তিগত জীবনকে বাজারে ফ্রন্ট পেইজে বিক্রি করা হবে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ শফিকের মতো পশুকে হয়তো কোনো না কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ছেড়ে দেবে। কিন্তু নিয়তিকে প্রতিটা মুহূর্তে জীবন্ত কবর দিতে দ্বিধাবোধ করবে না।

আসলাম সাহেবের চোখের সামনে নিয়তির ভবিষ্যৎটা এক নিমিষে কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন দেখাল। মেয়ের বেঁচে থাকার এই ন্যূনতম অধিকারটুকু, মাথা উঁচু করে শ্বাস নেওয়ার এই হকটুকুও যে এই জঘন্য সমাজ ব্যবস্থা কেড়ে নিবে – তা তিনি খুব স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারলেন।

আসলাম সাহেব আর কোনো কথা বললেন না। চোখের সামনে তখন কেবল ভেসে উঠছিল নিয়তির সেই ব্যথায় কাতরানো নিষ্পাপ মুখটা। তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন এবং ধীর পায়ে বৈঠকখানার দরজাটা খুলে বাইরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। পেছনের ঘর থেকে শফিকের উল্লাস আর রিনার চিৎকার ভেসে আসছিল। কিন্তু আসলাম সাহেবের কান ততক্ষণে যেন বধির হয়ে গেছে!

★★★★★

বাড়ি ফিরে আসলাম নিয়তির ঘরে ঢুকলেন। মেয়েটা তখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তিনি মেয়ের পাদুটো বুকে চেপে ধরে নীরবে অশ্রু ফেলতে লাগলেন। মনে মনে আহাজারি চলতে লাগল,

-হে আল্লাহ! আমি কি করব? আমায় পথ দেখাও হে খোদা। এই অসহায় বাবাকে তুমি পথ দেখাও!

হঠাৎ আসলাম সাহেব লক্ষ্য করলেন নিয়তির পা জোড়া শক্ত হয়ে গেছে। আঙুলগুলো ফ্যাকাশে সাদাবর্ণ ধারণ করছে! তিনি কুঞ্চিত ভ্রুঁ নিয়ে মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন। নিয়তিও তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দুচোখ ভরা অবিশ্বাস। সে তার বাবার স্পর্শকেও আর বিশ্বাস করতে পারছে না।

আসলাম সাহেব চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো। মেয়ের চোখে তার প্রতি অবিশ্বাস দেখে গোটা শরীর শিউরে উঠল। দ্রুত পা ছেড়ে দিল নিয়তির। বুকভরা হাহাকার নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।

নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। তিনি তার স্ত্রীকে জোরে জোরে ডাকতে লাগলেন,

-রেহানা… রেহানা…

রেহানা জায়নামাজের ওপর বসে ছিলেন। তিনি একছুটে স্বামীর কাছে আসলেন। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

-কি হয়েছে?

আসলাম সাহেব বিস্মিত স্বরে বললেন,

-আমার মেয়ে তো কোনোদিন আমাকে অবিশ্বাস করে না রেহানা! আমার মেয়ে তো আমার বুকটার মধ্যে শুয়ে গল্প শুনতো। হুটহাট গালে চুমু খেতো। মাথা থেকে খুঁজে খুঁজে পাকা চুল এনে দিত। ওর মধ্যে তো আমার আগের সেই মেয়ে নাই রেহানা! আমার নিয়তি কই রেহানা? আমার নিয়তিকে এনে দাও রেহানা। আমার খুকুকে আমার কাছে এনে দাও রেহানা। আমার খুকুকে আমার কাছে এনে দাও।

আসলাম সাহেব এখনো কাঁদছেন। স্ত্রীর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছেন। আর রেহানা চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে পড়ে চলেছেন,

“হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া, আলাইহি তাওয়াক্কালতু”

“আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি।”

👉আমার লিখা এই গল্পটি চুরি হচ্ছে অনেক। যারা আমার নাম ব্যবহার করে শেয়ার করছে তাদের ব্যতীত বাকি সব পেইজে কপিরাইট দেওয়া হয়েছে। আশাকরি, জলদি স্ট্রাইক খাবে। আপনারা আমার গ্রুপ Atia ‘গল্পাঙ্গন’ Adiba 🌸 তে জয়েন হয়ে থাকুন গল্পের আপডেটের জন্য❤️ ভালোবাসা রইল।]

(চলবে…)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply