#বাঁধন_রূপের_অধিকারী
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [৪৮]
সীমাকে নিয়ে সোজা বাড়িতে চলে এলো ইশতিয়াক।রুমের ভেতর ঢুকেই ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সীমাকে টেনে এনে বিছানায় আছড়ে ফেলল।হঠাৎ এমন ধাক্কায় চমকে উঠলো সীমা। চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে বলল,
“এটা কী হলো?”
ইশতিয়াক স্বাভাবিক গলায় ধীরস্বরে প্রশ্ন করল,
“কী হয়েছে?”
“আপনি আমাকে সবার সামনে থেকে এভাবে হুট করে নিয়ে আসলেন কেন?”
সীমার গা ঘেঁষে বিছানায় বসে পড়ল ইশতিয়াক। একদম কাছে ঝুঁকে এসে সীমার চিবুকে নিজের উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই নিয়ে এসেছি।”
সীমা বুক ফুলিয়ে চোখের চোখ রেখে সোজা জানিয়ে দিল,
“আপনার ইচ্ছেতে তো আর আমার জীবন চলবে না।”
ইশতিয়াক ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কানের কাছে মুখ আনল,
“তাহলে শুনি, কার ইচ্ছেতে চলবে?”
“আমার নিজের ইচ্ছেতে চলবে!”
ইশতিয়াক হালকা একটু হাসল।
“তো চলবে। তোমায় নিষেধ কে করেছে?”
সীমা এক মুহূর্তও দেরি করল না। বিছানা থেকে নামতে নামতে দ্রুত গলায় বলল,
“হ্যাঁ। এখন আমার ইচ্ছে আমি আর আপনার সাথে এক মুহূর্তেও থাকব না। বিশেষ করে এই বাড়িতে তো ভুলেও না। আমি এখনই চলে যাচ্ছি।”
কথাটা শেষ করেই ঘরের দরজার দিকে ছুট দিতে গেল সীমা। তৎক্ষনাৎ ক্ষিপ্র গতিতে সীমার ডান হাতটা খপ করে চেপে ধরল ইশতিয়াক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রবল টানে সীমাকে এনে আছড়ে ফেলল নিজের শক্ত বুকে। আকস্মিক ধাক্কায় কিছুটা কেঁপে উঠল মেয়েটা। প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলতে যাবে অমনি ওকে নিচে শুইয়ে দিল ইশতিয়াক। ভারী পুরুষের চাপে সীমার যেন দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। রাগে-ক্ষোভে চোখ জোড়া লাল করে বললো,
“এটা কী হচ্ছে ? উঠুন আমার ওপর থেকে।”
ইশতিয়াক কোনো তাড়াহুড়ো করল না। সীমার নরম গালে আলতো করে নিজের আঙুল বুলিয়ে দিল। চোখে চোখ রেখে নিচু স্বরে আওড়ালো,
“তোমার এই তেজ কতদিন থাকবে?”
সীমা চিবুক উঁচিয়ে জবাব দিল,
“সারাজীবন থাকবে!”
ইশতিয়াক ঠোঁটের কোণে বাঁকা একফালি হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আমি যদি বলি খুব বেশিদিন থাকবে না?”
“আপনি আসলে কী চাইছেন একটু বলবেন?”
ইশতিয়াক সীমার আরও কাছে ঝুঁকে এলো। ঠোঁটের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বললো,
“সত্যিই বুঝতে পারছো না আমি কী চাইছি?”
সীমা অভিমানে কন্ঠে বলল,
“না, বুঝতে পারছি না।”
ইশতিয়াক মৃদু কণ্ঠে শুধাল,
“সত্যিই কি বুঝতে পারছো না। নাকি না বোঝার ভান করছো?”
হঠাৎ গভীর নিস্তব্ধতায় তলিয়ে গেল সীমা। ওষ্ঠাধার রুদ্ধ করে নীরব হয়ে রইল।মুখ ফুটে একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। ইশতিয়াক আবারও ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
“সীমা, আমার চোখের দিকে তাকাও?”
তাকাল না সীমা। অবাধ্য নয়নযুগল অন্যদিকে অনড় হয়ে রইল। আবারও অনুযোগ আর আর্দ্র স্বরে ইশতিয়াক বললো,
“সীমা, লুক এট মি?”
অগত্যা আলগোছে ইশতিয়াকের পানে চাইল সীমা। রমণীর দু-গালে নিজের উষ্ণ হাত রাখল ইশতিয়াক। কৃষ্ণতারকার নিবিড় মণিজোড়ায় নিজের আকুল দৃষ্টি গেঁথে কাতর কণ্ঠে বললো,
“আমি জানি সীমা, আমি তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। অকারণে বকেছি, গায়ে হাত তুলেছি, তিল তিল করে তীব্র যন্ত্রণায় নীল করেছি তোমার মন। জানি সেসব অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু সীমা, আমি সেই সমস্ত ভুল শুধরে নিতে চাই। আমায় শুধু একটিবার মার্জনা করে দাও। একটিবার সুযোগ দাও আমায়। আই প্রমিজ, এই দেহে প্রাণ থাকতে এক চুল পরিমাণ আঘাতও তোমার গায়ে লাগতে দেব না। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে হলেও তোমার ওই রক্তিম ওষ্ঠে অমলিন হাসি ফুটিয়ে রাখব আমি। পৃথিবীর সমস্ত সুখ এনে সঁপে দেব তোমার পায়ে”
_______
জিনিসপত্র সব গুছিয়ে বিমানবন্দরে এসে উপস্থিত হলো বাঁধন, রূপা, আকাশসহ বাকি সবাই। লক্ষ্য একটাই। আজই চিরচেনা জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরবে তারা।লাউঞ্জের ভিড়ে পা রাখতেই হঠাৎ বৃষ্টির মুখোমুখি হয়ে গেল রূপা। মেয়েটার ম্লান চেহারায় স্পষ্ট বিষাদের ছায়া। এমন অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতে রূপা যেন একদম আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দুটি বড় বড় করে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললো,
“বৃষ্টি। তুই এয়ারপোর্টে?”
বৃষ্টি নিজেও থমকে গেল কিছুটা। তবে রূপার পাশেই আকাশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকজুড়ে বিষণ্নতার এক ভারি মেঘ জমে উঠল তার। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে নিচু স্বরে বললো,
“হুম। আমরা বাংলাদেশে ফিরছি। আসলে..। “
কথার পুরোটা শেষ হওয়ার আগেই রূপা উচ্ছ্বাসে নেচে উঠল,
“সিরিয়াসলি! আমরাও তো আজই দেশে ফিরছি। কী দারুণ। আমরা আবার সবাই একসাথে বাংলাদেশে থাকব।”
কথা শেষ করেই রূপা কথা বলতে এগিয়ে গেল হায়দার শেখের দিকে। বাঁধন আর আকাশও সৌজন্যের হাত বাড়িয়ে কুশল বিনিময় সেরে নিল হায়দার শেখের সাথে।তারপর বিমানের ভেতর ঢুকেই কালবিলম্ব না করে পাশাপাশি দুটো সিটে গাদাগাদি করে বসে পড়ল রূপা আর বৃষ্টি। ওদের দুজনকে এমন বুঁদ হয়ে গল্পে মেতে উঠতে দেখে মুহূর্তেই মুখটা মেঘলা করে ফেলল বাঁধন। চোখ জোড়া সংকীর্ণ করে কটমট দৃষ্টিতে আকাশের পানে চাইল। বাঁধনের জ্বলন্ত চাহনি দেখে চোখের পলক নেচে উঠল আকাশের। ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে রেখে শুধাল,
“কিছু বলবি?”
বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ স্বরে বাঁধন জবাব দিল,
“না।”
কথাটা বলেই সিটের ওপর ধপ করে আছড়ে পড়ল বাঁধন। বাঁধনের ভেতরের ব্যাকুলতার তোলপাড় একপলকেই ধরে ফেলল আকাশ। বউয়ের পাশে বসতে না পেরে বেচারার মনটা যে কতটা চটে আছে, তা বুঝতে আর বাকি রইল না তার। বিলম্ব না করে বাঁধনের পাশের খালি সিটটায় গিয়ে বসল আকাশ। বাঁকা হেসে আক্ষেপের সুরে ফিসফিসিয়ে বললো,
“আহা রে বেচারা। বউয়ের পাশে একটু বসতেও পারল না? সো স্যাড।”
চোখ দুটো বড় বড় করে রাগি দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকাল বাঁধন। হাঁড়ির মতো গোমরা মুখ দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না আকাশ। নিমিষে খিলখিল করে হেসে উঠল।
“আরে ভাই, আমি তো একটু মজা করছিলাম। থাক মন খারাপ করিস না। মাত্র তো কয়েকটা ঘণ্টার ব্যাপার।”
সিটের হেলান দেওয়ার জায়গায় মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে রইল বাঁধন। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা কণ্ঠে বলল,
“শোধ নেব।”
—
অবশেষে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে স্পর্শ করল বিমানটি।রানওয়ে ছাড়িয়ে বাইরে পা রাখতেই আনন্দে যেন ডানা মেলল রূপার চঞ্চল মন। ঠিক যেন পাখির মতো লাফিয়ে নামল। ওদের নিতে বাড়ি থেকে আগে থেকেই এসে অপেক্ষা করছিলেন আহসান রহমান, আতিক রহমান ও হাজি রহমান।একসাথে পুরো পরিবারকে বিমানবন্দরে উপস্থিত দেখে একেবারে থ বনে গেল রূপা, আনন্দে তার চোখ দুটো যেন ছানাবড়া হয়ে উঠল! মুহূর্তে সব কায়দা-কানুন ভুলে দৌড়ে গিয়ে আহসান রহমানকে জড়িয়ে ধরল । ব্যাকুল কণ্ঠে ডেকে উঠল,
“বাবা।”
আহসান রহমানও পরম আদরে বুকে টেনে নিলেন আদরের ধনকে। পিঠে হাত বুলিয়ে সস্নেহে বললেন,
“আমার সোনা মা। অনেক মিস করেছি তোমাকে।”
“আমিও তোমাকে অনেক মিস করেছি বাবা।”
“তোমাকে একদম সহিসালামত আর ভালো দেখে বুক থেকে যেন ভারি একটা পাথর নেমে গেল।”
পাশ থেকে ভাব নিয়ে শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটাতে গুটাতে চ্যাটাং করে আকাশ বললো,
“ভালো থাকবে না মানে? বাঁধন থাকতে রূপার কিছু হবে তা ভাবলে কী করে?”
আকাশের এমন রসিকতায় উপস্থিত সবার মুখেই হাসির রোল উঠল। কেবল বাঁধন একাই মুখটি হাঁড়ির মতো ভার করে একদম অচঞ্চল রইল। রূপা ততক্ষণে চঞ্চল পায়ে আতিক রহমান ও হাজি রহমানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পরম তৃপ্তিতে তাদের জড়িয়ে ধরে মনভরে কুশল বিনিময় সেরে নিল।এরপর পরিবারের গুরুজনেরা সকলে মিলে হায়দার শেখের দিকে এগিয়ে গেলেন। কুশলাদি বিনিময়ের শেষে হঠাৎ থেমে গেলেন হায়দার শেখ। চেহারায় একপ্রকার গম্ভীর টান এনে উপস্থিত সবার পানে চেয়ে বললেন,
“আসলে আপনাদের একটা কথা বলার ছিল।”
আহসান রহমান সাগ্রহে শুধালেন,
“কী কথা? বলুন ভাইসাব?”
হায়দার শেখ পরম মমতায় পাশে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টির মাথায় নিজের হাতটি রাখলেন। স্পর্শ পাওয়া মাত্রই অজানা ভয়ে থরথর করে মাথা নিচু করে ফেলল বৃষ্টি। হায়দার শেখ মন্থর কণ্ঠে প্রকাশ করলেন,
“আসলে আমি বৃষ্টির বিয়ে ঠিক করেছি। আর ঠিক সে কারণেই এভাবে হুট করে বাংলাদেশে ফিরে আসা।”
আকাশের মাথায় যেন হুট করে বিশাল এক বাজ ভেঙে পড়ল। চোখের সামনে ধোঁয়াটে হয়ে উঠল সবকিছু, যেন পুরো পৃথিবীটা হঠাৎ বনবন করে ঘুরছে। বুকের ঠিক মাঝখানটায় তীক্ষ্ণ খাঁজ কাটা ব্যথা। যেন কলিজার ভেতর কে যেন শক্ত হাতে মোচড় দিল।চারপাশের আনন্দটা থমকে গেল আচমকা। রূপা মুখটা হা করে চরম বিস্ময়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে খড়খড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
“আঁহ। বৃষ্টি, ইউ মিন সিরিয়াসলি?”
মেয়েটা চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেল না। মাটির দিকে মুখ বুজে স্রেফ একটু আলগোছে মাথা নাড়ল।আহসান রহমান ভুরু কুঁচকে একটু খটকা নিয়ে শুধালেন,
“তা তো বুঝলাম ভাইসাব কিন্তু এভাবে না জানিয়ে হঠাৎ?”
হায়দার শেখ অটল সুরে বললেন,
“আসলে ছেলে আমার খুব পূর্বপরিচিত। মানুষ হিসেবে বড্ড ভালো, একদম জানাশোনা। তাই আর দেরি না করে হুট করেই পাকা কথা দিয়ে ফেললাম।”
বড়রা নিজেদের মধ্যে টুকটাক গল্পে মেতে উঠতেই বাঁধন সুযোগ বুঝে হেলেদুলে আকাশের গা-ঘেঁষে দাঁড়াল। আকাশের ভারী কাঁধে কনুইয়ের ভর দিয়ে একটু গলা খাঁকারি দিল। অতঃপর শয়তানি হাসি ঠোঁটে চেপে ফুসফুস করে বললো,
“তারপর৷ মিস্টার প্রীতিভাজন আকাশ? বুকের ভেতর অনুভূতিটা এখন ঠিক কী রকম কিলবিল করছে বলবেন কি?”
আকাশ মুখটা এক নিমেষে কচি বাচ্চার মতো ছোট করে ফেলল। টানটান পুরুষালি চোখে ছলছল করে উঠল বাষ্প। বুজকুড়ি কাটা জলের মতো টলমল করছে মনি দুটি। আরেকটু উসকে দিলেই হয়তো ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে। পুরুষটা। বাঁধন নিজের ভেতরের উদগত হাসিটা দাঁতে দাঁত চেপে আটকে রাখল।সমব্যথীর মতো মুখ করে বানিয়ে বানিয়ে বললো,
“ছাড় তো ভাই৷ তোর কপালে বৃষ্টির চেয়েও দশ গুণ ভালো মেয়ে লেখা আছে। ভুলে যা ওকে।”
বলেই পকেটে দু-হাত সেঁধিয়ে একদম বীরদর্পে গটগট করে আগেভাগেই হেঁটে বাইরে বেরিয়ে গেল বাঁধন।আকাশের বুকের ভেতরে ছাইচাপা আগুন জ্বলছে। একবার আড়চোখে বৃষ্টিটার দিকে তাকিয়েই হন্তদন্ত হয়ে ছুটল বাঁধনের পিছু পিছু। পার্কিংয়ে বাঁধনকে ধরে ফেলে ব্যাকুল গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
“তুই কি আমার এই হালে দাঁড়িয়েও রসিকতা করছিস বাঁধন? তুই কী বুঝতে পারছিস না আমার বুকের ভেতর কীভাবে জ্বালাপোড়া করছে?”
বাঁধন গাড়ির বনেটে গা এলিয়ে দাঁড়াল। হাত দুটো বুকের ওপর ক্রস করে রাশভারী গলায় বললো,
“এডিয়ট আমি কিভাবে জানবো তোর বুকের ভেতর কী হচ্ছে না হচ্ছে। “
আকাশ যেন এবার পায়ে ধরে ফেলবে। করুণ আর্তনাদে বলল,
“ভাইরে ভাই, তুই যেকোনো ফাঁদ পেতে এই বিয়েটা ভেঙে দে। বাঁচা আমাকে।”
বাঁধন এক তুড়িতে তা উড়িয়ে দিয়ে নিরেট গলায় বলল,
“পারবো না।”
ঠিক তখনই ডানা কাটা পরীর মতো উড়তে উড়তে ছুটে এলো অ্যান্সি, সাথে নিক্সি, ওমর আর জেইন। অ্যান্সি চোখ দুটো মার্বেলের মতো গোল গোল করে হাসতে হাসতে বলল,
“আরে অদ্ভুত তো। কথা ছিল আকাশ ভাইয়া আগে ছাদনা তলায় বসবে, এখন দেখি বৃষ্টিই বাজিমাত করে দিল। আমরা ভাবলাম কী, আর ঘটল কী?”
নিক্সি একটু পাজিল মারার ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে উঠে চ্যাটাং করে বললো,
“আকাশ ভাইয়া, আপনার স্টুডেন্টের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল, আপনি এত চুপচাপ কেন? আপনি কি খুশি হননি?”
আকাশ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। মুখটা কুচকুচে কালো করে চোয়াল দুটো পাথরের মতো শক্ত করে বাঁধনের দিকে জলন্ত নজরে তাকাল। তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে এয়ারপোর্টের গমগমে ভিড়ের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিল।ও চলে যেতেই বাঁধন বাদে বাকি সবাই আর সহ্য করতে পারল না। রাস্তার মাঝখানেই একজোটে হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ল।
_______
টুকটাক কথাবার্তা শেষেই আহসান রহমান একেবারে একছত্র জিদ ধরে ববসলেন৷ কোনো অজুহাত না শুনেই জোরজবরদস্তি করে হায়দার শেখ আর বৃষ্টিকে আজকে নিজের গাড়িতে তুলে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে এলেন।গাড়ি থেকে নেমে প্রাঙ্গণে পা রাখতেই চঞ্চল রূপা হঠাৎ নিথর হয়ে গেল। কত দিন পর সেই চেনা ভিটেবাড়ি! অপলক চোখে স্তব্ধ হয়ে বাড়িটার দিকে চেয়ে রইল । এই একটা বাড়ির ইট-পাথরে জড়িয়ে আছে তার কত শত রূপকথার শৈশব, কত মধুর স্মৃতি। আবার যে কখনো এই উঠোনে পা রাখার সৌভাগ্য হবে, তা তো স্বপ্নেও ভাবেনি!
ঠিক তখনই সদর দরজা ঠেলে অপরাধীর মতো পা টিপে টিপে বেরিয়ে এলো শান্তা। বুকে একরাশ অপরাধবোধ চেপে ধীর পায়ে রূপার সামনে এসে দাঁড়াল। ইতস্তত করে নিচু কণ্ঠে বলল,
“কেমন আছিস রূপা?”
রূপার নিষ্পাপ মনে কোনো ক্ষোভের ছিটেফোঁটাও নেই। ওষ্ঠাধারে অমলিন হাসি ফুটিয়ে সহজ গলায় বলল,
“আমি খুব ভালো আছি! তুমি কেমন আছো আপু?”
“হুম ভালো।”
আর সামলাতে পারল না শান্তা। তড়িৎ রূপার নরম দুটি হাত চেপে ধরে ব্যাকুল গলায় বলল,
“রূপা আমি জানি। তোদের সাথে আমি অনেক বড় অন্যায় করেছি।ভুল করে ফেলেছি । তুই প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিস? ভুল তো মানুষেরই হয়। আমারও হয়েছিল।”
শান্তার কাঁপাকাঁপা হাত দুটো নিজের উষ্ণ করপুটে শক্ত করে টেনে নিল রূপা। মিষ্টি হেসে সান্ত্বনার সুরে বলল,
“আমি একদম রাগ করে নেই আপু। পেছনের তিতকুটে দিনগুলোর কথা সব ভুলে যাও এখন। আমরা আবার আগের মতোই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে একসাথে বাঁচব।”
শান্তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে রূপাকে নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরল। রূপাও পরম মমতায় শান্তার পিঠে হাত রেখে সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিল।এরপর পা বাড়াল ভেতরের দিকে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই শিল্পী রহমানকে দেখতে পেয়ে রূপা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ছুটে গিয়ে কাকিমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললো,
“কাকিমণি৷ কেমন আছ তুমি?”
শিল্পী রহমানও ব্যাকুল হয়ে মাতৃত্বের সমস্ত স্নেহ উজাড় করে রূপার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। বাষ্পরুদ্ধ গলায় বললেন,
“এতদিন মোটেও ভালো ছিলাম না রে মা। তুই ছাড়া এই মস্ত বড় বাড়িটা একদম খাঁ খাঁ করত, শ্মশান মনে হতো। এখন তুই ফিরে এসেছিস। এখন সবসময় ভালো থাকবো।”
শিল্পী রহমানের সাথে কথাকথনের মাঝেই রূপার চঞ্চল নয়নযুগল হঠাৎ গৃহের চারিপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল। উৎসুক দৃষ্টিতে কাকে যেন ব্যাকুল হয়ে খুঁজছে। রূপার অগোছালো চাহনি আর অস্থিরতা এক মুহূর্তেই ধরে ফেলল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধন। বুঝতে আর বাকি রইল না যে, রূপা আসলে রজনী রহমানকে খুঁজছে। যে নির্মম সত্যটা এখনো রূপার কান অবধি পৌঁছায়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলল বাঁধন। গাম্ভীর্য মেখে ধীর পায়ে রূপার গা-ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। ভারি গলায় বলল,
“রজনী রহমান বাড়িতে নেই৷ উনি বর্তমানে জেলহাজতে আছেন।”
অবাক চোখে বাঁধনের দিকে তাকাল রূপা। বুকটা যেন একমুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল।
“মানে?”
বাঁধন আর কোনো কিছু চেপে রাখল না। অপ্রিয় সত্যটা এবার একদম সোজাসুজি প্রকাশ করে দিল। নজরের রহমানের চক্রান্ত, তাদের গোপন উদ্দেশ্য আর রজনী রহমান কীভাবে পুরো চালটা চেলেছিলেন এক এক করে সব উগরে দিল।কথাগুলো শুনে মুহূর্তের জন্য হীম হয়ে গেল রূপা। যেন পায়ের তলা থেকে মাটিটা সরে গেছে! আলতো করে কেঁপে উঠল তার ওষ্ঠাধার। পরক্ষণেই নিজের ভেতরে অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যিটার তোলপাড় সামলাতে না পেরে এক দৌড়ে সোজা ছাদে চলে গেল সে। ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।পিছু পিছু বাঁধনও নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল ছাদে। নিচ থেকে বাকিরা উঠতে চেয়েছিল, কিন্তু ওদের দুজনকে এখন খানিকটা একাকী সময় দেওয়া প্রয়োজন এই ভেবে আর কেউ ওমুখো হলো না।
ওদিকে বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ প্রান্তরের মতো ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে রূপার। রজনী রহমান যত নোংরা চক্রান্তই করে থাকুন না কেন, যত বড় অপরাধীই হন না কেন। সেই মানুষটাই তো তাকে মায়ের মমতার ছদ্মবেশে পরম সুখটুকু উপহার দিয়েছিলেন। নিপুণ কৌশলে পরম যত্নবান মায়ের রূপ ধরে ছিলেন তার সামনে। কোনো দিন বুঝতে দেননি মাতৃহীন হওয়ার দগ্ধ যন্ত্রণা। সেই মা যে আসলে এক নির্মম প্রতারক। এই কঠিন সত্যটা এত সহজে মেনে নেয় কী করে?
কাঁদতে থাকা রূপার ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল বাঁধন। স্বভাবসুলভ কাঠিন্য তার চেহারায়।দু-হাত পকেটে গুঁজে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ওই নোংরা মনের মহিলার জন্য আবার কাঁদে নাকি কেউ?”
বাঁধনের কর্কশ কণ্ঠ শোনামাত্রই হাত দুটো মুখ থেকে সরাল রূপা। চোখ দুটি রক্তজবার মতো লাল। ঝাপসা চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে বাঁধনকে দেখেই সহসা উঠে দাঁড়াল। তারপর বাঁধনের শক্ত বুকে ছোট ছোট কিল-ঘুষি বসিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“একদম উনাকে নোংরা বলবেন না। আরেকবার উনাকে নোংরা বললে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম!”
বাঁধন একটুও না নড়ে অটল ভঙ্গিতে শুধাল,
“বললে কী করবি তুই?”
“আমি বারণ করেছি মানে বলবেন না।”
“আমি একশো বার বলব। কী করবি তুই আমার? মেরে ফেলবি?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই বাঁধনকে দুই বাহুতে আঁকড়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল রূপা। ছোট্ট বাচ্চার মতো হিঁচকি তুলতে তুলতে বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলল,
“মানুষ এতটা সুন্দর করে কীভাবে ভালোবাসার অভিনয় করে বলুন তো? এতটা নিষ্ঠুরভাবে কীভাবে মানুষ কাউকে ঠকাতে পারে? বিশ্বাস করুন, উনি মনে মনে যতই খারাপ হোন না কেন, আমার কাছে মা হিসেবে উনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ! জানি সবটাই ছিল উনার স্রেফ ফাঁদ আর অভিনয়, কিন্তু সেই অভিনয়টা ছিল সত্যিকারের মায়ের স্নেহের চেয়েও বড্ড যত্নবান। অন্তত ছলেবলে হলেও উনি আমাকে কখনো একটা মায়ের অভাব টের পেতে দেননি।”
রজনী রহমানের জন্য রূপার সরল আকুলতার অশ্রুপাত দেখে বাঁধনের ভ্রু কুঁচকে এলো। বিরক্তির ছাপ ভেসে উঠল মুখাবয়বে। কিন্তু মুহূর্তেই রূপার ছলছল চোখের পানে তাকিয়ে তার ভেতরের রাগটা উবে গিয়ে জাগল বেপরোয়া প্রীতি।দুই হাতে রূপার সরু কোমর নিবিড়ভাবে জড়িয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। বেপরোয়া কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো,
“উমম কাঁদে না সুইটহার্ট। তোকে এভাবে কাঁদতে দেখলে আমার কেবলই চুমু খেতে ইচ্ছে করে। আর একটা ফোঁটাও যদি জল ফেলেছিস, তবে কিন্তু সরাসরি চুমু খেয়ে বসব বলে দিলাম।”
থমথমে কান্নার মাঝখানে বাঁধনের বেপরোয়া বাক্যদ্বয়ে একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল রূপা। বুকটা তার কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। আর এই লোকটা তাকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া দূরে থাক। উল্টো এমন সব কথাবার্তা বলে উত্যক্ত করছে। অশ্রুসিক্ত রক্তিম চোখে বাঁধনের পানে চেয়ে অনুযোগের সুর তুলে বলল,
“আমি কাঁদছি। আমার কষ্ট হচ্ছে।”
বাঁধন রূপার কোমর আরও একটু চেপে ধরে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“কোথায় কষ্ট হচ্ছে জান? বলো আমায়। আমি এখনই সেখানে আদর করে দিচ্ছি। সব কষ্ট উধাও হয়ে যাবে।”
রূপা রেগে গিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“দেখুন?”
রূপার চোখের মণি দুটোতে নিজের গাঢ় দৃষ্টি গেঁথে মৃদু হেসে বাঁধন উত্তর দিল,
“দেখতেই তো চাচ্ছি। তুই-ই তো দেখাচ্ছিস না।”
রাগে আর গভীর অভিমানে পুনরায় বাঁধনকে আঁকড়ে ধরে অঝোরে কেঁদে উঠল রূপা। ভেজা গলায় বলল,
“আপনি এসব বুঝবেন না! মা না থাকার যন্ত্রণা কতটা কষ্টকর হয়, তা বোঝার মতো ক্ষমতা অন্তত আপনার নেই!”
নিমিষে থমকে গেল চারপাশ। আধো কণ্ঠে নিঃশব্দে ডেকে উঠল বাঁধন,
“মা”
একটি শব্দেই মুহুর্তের মধ্যে থমকে গেল রূপার মস্তিষ্ক। বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল। অবচেতনেই নিজের মস্ত বড় ভুলটা অনুধাবন করল । বাঁধনেরও তো মা নেই!অল্প বয়সেই তো মাতৃহারা হয়েছে পুরুষটা। রূপা তো তাও অভিনয়ের খাতিরে হলেও মায়ের ভালোবাসা আর সোহাগটুকু পেয়েছিল৷ কিন্তু বাঁধন তো সেইটুকুও পায়নি! আর সে কি না এমন নির্দয়ভাবে এই লোকটার বুকে কথাটা বিঁধিয়ে দিল?
তৎক্ষণাৎ মাথা তুলে ব্যাকুল চোখে বাঁধনের পানে চাইল রূপা। পলকের মধ্যে দেখতে পেল, শক্ত-কঠিন পুরুষটির তামাটে গাল বেয়ে নিশব্দে টপ করে ঝরে পড়ল এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু। দৃশ্যটি দেখে নিমেষে হাহাকার করে উঠল রূপার বুক। কাঁদছে এই ইস্পাতকঠিন হৃদয়সম্পন্ন লোকটা। কতটা গভীর দহন জমলে এমন একটা মানুষ চোখের অশ্রু ফেলতে পারে। তা রূপার হৃদয়স্পন্দনে একমুহূর্তেই প্রতিধ্বনি তুলল।
এক মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে নিজেকে উঁচিয়ে বাঁধনের দুটি গাল পরম মায়ায় নিজ সুকোমল করপুটে তুলে নিল রূপা। নিজের নাকের সাথে বাঁধনের তপ্ত নাক ঠেকিয়ে দ্রুতশ্বাসে হাঁপাতে হাঁপাতে ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
“আই অ্যাম সরি! সত্যিই আই অ্যাম সরি। আমার একদম মনে ছিল না যে আপনারও তো মা নে…”
কথাটি শেষ হওয়ার অবকাশটুকুও দিল না বাঁধন। বাঁ হাতে পরম আবেগে রূপার ঘন চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরল। ডান হাতের প্রাগাঢ় আবেষ্টনীতে রূপার সরু কোমর নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে রমণীর রক্তিম অধরে নিজের উষ্ণ ঠোঁট মিলিয়ে দিল। পুরুষটির ব্যাকুল আক্রমণে রূপাও পিছিয়ে গেল না। অকৃত্রিম আবেশে তীব্র সাড়া দিল তার অনুরাগে।দুজনের চোখ বেয়েই ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়তে লাগল নোনা জল। মিশতে লাগল দুই ব্যাকুল প্রাণের তপ্ত নিঃশ্বাস। জড়িয়ে গেল একে অপরের চোখের কষ্টের অশ্রু।
চলবে…!
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৯
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৬
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৮