Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৫


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [৩৫]

রজনী রহমানের মাথাটা যেন কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে। চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে বহু বছরের সাজানো সব পরিকল্পনা। যে মেয়েটাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য এতদিন ধরে আগলে রেখেছিলেন, সেই রূপাকে বিয়ে করে নিয়ে চলে গেছে বাঁধন। বিষয়টা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। বুকের ভেতর অস্থিরতা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। নিজের রুমজুড়ে পাগলের মতো পায়চারি করছেন রজনী রহমান। হাতে ধরা ফোনটার স্ক্রিনে বারবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন। অপেক্ষা করছেন একটা ফোনকলের।অবশেষে ফোনটা কেঁপে ওঠে।

রিং বাজতেই তড়িঘড়ি করে কল রিসিভ করে কানে তোলেন রজনী রহমান। ওপাশ থেকে ভেসে আসে বিরক্ত গলা।

—- “কী হয়েছে? এতবার ফোন দিয়েছ কেন? কোনো ঝামেলা নাকি?”

ক্লান্তভাবে কপাল চেপে ধরে ভারী গলায় বললেন রজনী রহমান,

—- “ঝামেলা না সর্বনাশ হয়ে গেছে।”

ওপাশের লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে গম্ভীর স্বরে বলল,

—- “ধাঁধা না করে পরিষ্কার করে বলো। কী হয়েছে?”

দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে নিলেন রজনী রহমান। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

—- “আমার সৎ ছেলে রূপাকে বিয়ে করে রূপাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।”

কথাটা শেষ হতেই ওপাশে যেন বিস্ফোরণ ঘটে।

—- “কী! কী বলছ তুমি? বাঁধন রূপাকে বিয়ে করেছে? এটা কীভাবে সম্ভব? সবকিছু শুরু থেকে খুলে বলো তো।”

রজনী রহমান একটাও ঘটনা লুকালেন না। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে, সব বিস্তারিত বললেন। পুরোটা শুনে ওপাশে দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে আসে। তারপর ভারী একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে।

—- “রজনী ব্যাপারটা আমাদের ধারণার চেয়েও খারাপ হয়ে গেছে। রূপা এখন একজন এসপির স্ত্রী। ওর কাছ থেকে সই নেওয়া, তারপর ওকে সরিয়ে দেওয়া দুটোই এখন আগের মতো সহজ থাকবে না। তুমি কোথায় ছিলে? বিয়েটা আটকাতে পারলে না?”

হতাশায় কপাল চেপে ধরলেন রজনী রহমান। বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন,

—- “আমি কি জানতাম বাঁধন এমন একটা কাজ করবে? সবাই তো জানে রূপা ওর সৎ বোন। ভাই হয়ে সেই মেয়েকেই বিয়ে করবে এমন কথা কোনোদিন মাথায়ও আসেনি। যদি সামান্যও টের পেতাম, তাহলে অনেক আগেই রূপাকে এই শহর থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিতাম। আজ এই দিন দেখতে হতো না।”

ওপাশের লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর নিচু, কিন্তু হুমকিমিশ্রিত গলায় বলল,

—- “এখন ভুল নিয়ে আফসোস করে লাভ নেই। নতুন করে চাল দিতে হবে। কারণ বাঁধন যদি একবার সবকিছু জানতে শুরু করে তাহলে শুধু আমাদের প্ল্যান না, আমরা কেউই আর নিরাপদ থাকব না।”

রজনী রহমান কপালে হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখেমুখে স্পষ্ট অসহায়ত্ব। বহু বছরের সাজানো হিসাব যেন মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে অবশেষে ধীর কণ্ঠে বললেন,

—- “তো এখন কী করবো?”

ওপাশ থেকেও কিছুক্ষণ কোনো শব্দ এলো না। মনে হচ্ছে লোকটাও নতুন করে সবকিছুর হিসাব কষছে। তারপর ঠান্ডা, ভারী কণ্ঠে বললেন পুরুষটি,

—- “আপাতত চুপ থাকো। এখনই কিছু করা যাবে না। তাড়াহুড়ো করলে উল্টো সবকিছু নষ্ট হয়ে যাবে। আর শোনো, বাঁধন রূপাকে নিয়ে কোথায় উঠেছে, কোথায় থাকছে, সেটা খুঁজে বের করো। ঠিকানাটা যত দ্রুত সম্ভব জানতে হবে। সময় হলে আমি নিজেই জানিয়ে দেব, তোমাকে কী করতে হবে।”

বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। পরাজিত গলায় বললেন রজনী রহমান,

—- “ঠিক আছে।”

_____________

রূপাকে নিয়ে নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে বাঁধন। ফ্ল্যাটের ভেতরে পা রাখতেই মুগ্ধ হয়ে থমকে যায় রূপা। বড় বড় চোখে অবাক দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখতে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নিজের কৌতূহল আর আটকে রাখতে পারে না।এক রুম থেকে আরেক রুমে ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখছে সে। কখনো ড্রয়িংরুম, কখনো বারান্দা, কখনো রান্নাঘর। পুরো ফ্ল্যাটটাই যেন তার কাছে নতুন এক অচেনা জগত।

পরনে তখনও সেই নীল শাড়ি। রিসোর্টের একটা কর্মচারী মেয়ে সুন্দর করে শাড়িটা পরিয়ে দিয়েছে। রূপাকে নিজের মতো করে ফ্ল্যাট ঘুরে দেখতে দিয়ে ফোন বের করে অখিলকে কল দেয় বাঁধন। রূপার সব বই-খাতা আগের বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে বলে। সঙ্গে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও আনতে বলে।ফোন রেখে নিজেও বেরিয়ে যায় মার্কেটে।একটার পর একটা দোকান ঘুরে নিজের পছন্দমতো রূপার জন্য ড্রেস কিনতে থাকে বাঁধন। চার সেট সারারা নেয়, কারণ সারারা পরলে রূপাকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। এরপর কয়েক সেট পাকিস্তানি থ্রি-পিস পছন্দ করে। নিজের টি-শার্টের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কয়েকটা পাতলা কামিজও নেয়। সঙ্গে কয়েক পিস টি-শার্ট।সবকিছুই নিজের পছন্দে নেয় বাঁধন। যেন রূপার আলমারিতে কোনো কিছুরই অভাব না থাকে।সব কেনাকাটা শেষে দুই হাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে আসে বাঁধন। দরজা খুলেই অভ্যাসবশত চোখ চলে যায় ড্রয়িংরুমের দিকে।রূপা নেই।প্রথমে বিষয়টা স্বাভাবিকই মনে হয়। হয়তো অন্য কোনো রুমে আছে।

ড্রয়িংরুম থেকে বেডরুমে তাকায়।নেই,বারান্দায় যায় সেখানেও নেই। রান্নাঘর,ওয়াশরুম,পুরো ফ্ল্যাটটা চোখের পলকে খুঁজে ফেলে বাঁধন।কিন্তু কোথাও নেই।মুহূর্তেই শক্ত হয়ে ওঠে বাঁধনের চোয়াল। কপালের শিরাগুলো টান টান হয়ে আসে। বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে রাগে পরিণত হয়।রূপা পালিয়েছে।কথাটা মাথায় আসতেই চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। হাতে থাকা শপিং ব্যাগগুলো সোফার ওপর রেখে দরজার দিকে এগিয়ে যায় বাঁধন।ঠিক তখনই ছোট্ট ক্যান্ডি দৌড়ে এসে বাঁধনের পায়ের কাছে এসে থেমে যায়।আর ক্যান্ডির ঠিক পেছনেই শাড়ির কুঁচি দু’হাতে সামলে প্রাণপণে দৌড়ে রুমে ঢুকে পড়ে রূপা। বাঁধন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধপ করে দরজাটা বন্ধ করে দেয় সে।তারপর দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। কপালে চিকচিক করছে ঘামের বিন্দু। মনে হচ্ছে আর একটু হলেই কেউ তাকে ধরে ফেলত।রূপার এমন অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায় বাঁধন।

—- “এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? কোথায় গিয়েছিলি?”

হাঁপাতে হাঁপাতে একটা হাত সামনে বাড়িয়ে দেয় রূপা। মুঠো খুলতেই বাঁধনের চোখে পড়ে তালুর ওপর রাখা চারটা টকটকে লাল স্ট্রবেরি।মুখে তখনও হাঁপ ধরা, কিন্তু চোখে শিশুসুলভ আনন্দ।

—- “ছাদে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি স্ট্রবেরি গাছে একদম টকটকে লাল স্ট্রবেরি ধরেছে। এত সুন্দর লাগছিল যে লোভ সামলাতে পারিনি। এই চারটা পেড়ে নিয়েছি। তারপর হঠাৎ দেখি ছাদের এক কোণা থেকে একটা লোক দাঁত ব্রাশ করতে করতে বেরিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াইনি। যেই দেখেছি, অমনি দৌড় দিয়েছি।”

রূপার কথা শুনে বাঁধন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,

—- “হোয়াট! তুই স্ট্রবেরি চুরি করেছিস?”

বাঁধনের গম্ভীর দৃষ্টি দেখে সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নিচু করে ফেলে রূপা। তারপর অপরাধীর মতো ধীরে ধীরে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়।বাঁধনের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। রাগে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় সে। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার মুখের সেই নিষ্পাপ, শিশুসুলভ অভিব্যক্তিটা দেখে তার কঠিন রাগটাও যেন কিছুটা নরম হয়ে আসে।ঠোঁট গোল করে গভীর একটা শ্বাস নেয় বাঁধন। নিজেকে শান্ত করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

—- “শুন রূপ, একটা কথা ভালো করে জেনে রাখ। এসব আমার একদম পছন্দ না। তোর যা খেতে ইচ্ছে করবে, যা প্রয়োজন হবে, আমাকে বলবি। আমি এনে দেব। কিন্তু কখনো কারো জিনিস না বলে নিবি না। ফ্ল্যাটের আশেপাশে যেন তোকে আর এসব করতে না দেখি। আই সেইড, মনে থাকবে?”

মাথা নিচু করেই আবারও হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায় রূপা।

রূপার এমন শান্ত, বাধ্য আচরণ দেখে বাঁধনের গলার স্বরও কিছুটা নরম হয়ে আসে।

—- “গুড। আর শোন, সোফার ওপর শপিং ব্যাগ আছে, সেখানে তোর জন্য ড্রেস আছে। শাড়িটা চেঞ্জ করে ওখান থেকে যে কোনো একটা পরে নে। আর একটু পর তোর সব বই-খাতা চলে আসবে। কাল থেকে আবার কলেজে যাবি।”

কথাটা শুনতেই রূপার মুখটা মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে খুশির ঝিলিক।আনন্দে অবাক হয়ে বলে ওঠে,

—- “সত্যি?”

কিন্তু বাঁধন আর দাঁড়িয়ে থাকে না। ফোনটা কানে ধরে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে শুধু ছোট্ট একটা উত্তর দেয়,

—- “হুম।”

একটা শব্দেই যেন রূপার পুরো মনটা আনন্দে ভরে যায়।খুশিতে আত্মহারা হয়ে রূপা ছুটে আসে সোফার কাছে। শপিং ব্যাগগুলো থেকে জামাকাপড় বের করতে গিয়ে সে থমকে যায়। কাঠালি, কালো, গোলাপি—নানা রঙের শারারা, দারুণ সব পাকিস্তানি থ্রি-পিস, কামিজ, টি-শার্ট; এমনকি বাঁধনের নিজের ব্যবহারের কাপড়ও রয়েছে সেখানে। এত অল্প সময়ে লোকটা তার জন্য কত কিছু কিনে ফেলল! রূপা অবাক হয়ে ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। দ্বিধা কাটিয়ে একটা আরামদায়ক কমলা রঙের টি-শার্ট আর সাদা প্লাজো নিয়ে সে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর শাড়ি বদলে নতুন পোশাকে সে বেরিয়ে আসে। হঠাৎ ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসা গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর তার কানে বাজে। কৌতূহলী হয়ে সে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ায়। গিয়ে দেখে, সোফায় বসে বাঁধন আর অখিল অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে কিছু একটা আলোচনা করছে। সোফার ওপর বড় বড় মোটা ব্যাগ পড়ে আছে, বোঝা যাচ্ছে ওগুলোতেই রূপার বইপত্র।

এদিকে বাঁধন তার ভরাট গলার স্বরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অখিলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।

—-“শান্তার কী অবস্থা, অখিল?”

অখিল সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিস্প্রভ কণ্ঠে বলে।

—-“খুব একটা ভালো না,। গত দুদিন ধরে একদম চুপচাপ, কিছুই মুখে দিচ্ছে না। সারাক্ষণ শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। আমাকে বারবার বলছে যে সে তোর সাথে দেখা করতে চায়। ইটস ভেরি ডিফিকাল্ট টু হ্যান্ডেল হার রাইট নাউ।”

বাঁধন একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বলে।

—-“আমি কাল দেখা করব, তুই শুধু ওর সব কিছুর খেয়াল রাখিস। দ্যাটস এন অর্ডার। আর তোকে যে ফাইলটা দিয়েছিলাম, কিছু তথ্য বের করার জন্য সেটার কী আপডেট?”

অখিল মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে বসে তার দৃঢ় কণ্ঠে বলে।

—-“ও হ্যাঁ,। দ্য কেস ইজ আ বিট কমপ্লিকেটেড। তোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এখনো সেভাবে কিছু বের করতে পারিনি। কাজ চলছে, সব কিছু ক্লিয়ার হলেই তোকে জানাব।”

দুজনের কথার মাঝেই অখিলের নজর যায় ড্রয়িংরুমের কোণায় আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার ওপর। রূপাকে দেখেই অখিলের মুখে দুষ্টুমি ভরা এক চওড়া হাসি ফুটে ওঠে। সে গলা উঁচিয়ে ডাক দেয়।

—- “আরে ভাবি! আপনি ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এদিকে আসুন, এসে একটু বসুন।”

একজন পুলিশ অফিসারের গলার এমন সম্মানের ডাক শুনে রূপা যেন আকাশ থেকে পড়ে। লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে যায়। অখিলের এমন সম্বোধনে বাঁধনও ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। কয়েক মুহূর্তের জন্য বাঁধনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রূপার ওপর স্থির হয়ে থাকে। কমলা রঙের টি-শার্ট আর সাদা প্লাজুতে মেয়েটাকে স্নিগ্ধ আর অসাধারণ মানিয়েছে। রূপা লজ্জায় একপ্রকার কুঁকড়ে যায়। কোনো কথা না বলে, মুখটা নিচু করে এক দৌড়ে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ে। রূপার এমন চঞ্চল পালানো দেখে অখিল অবাক হয়ে বলে।

—- “কী হলো? এভাবে দৌড় দিল কেন ভাবি? আমি কি খুব বেশি লজ্জা দিয়ে ফেললাম নাকি?”

বাঁধন ফোনটা হাতে নিয়ে শান্তভাবে বলে।

—- “ওইটা নিয়ে তোর মাথা ঘামাতে হবে না। ওর ইচ্ছে হয়েছে তাই দৌড় দিয়েছে।”

অখিল একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বাঁকা চোখে বাঁধনের দিকে তাকায়। সে একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে বলে।

—- “তা আমার জানের জিগার বন্ধু, ম্যারিড লাইফ কেমন চলছে? মামা-কাকা হওয়ার সুসংবাদটা কবে দিচ্ছিস?”

বাঁধন সোফায় দুই পা তুলে আয়েশ করে বসে পড়ে। ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে, কণ্ঠস্বর শীতল রেখে সে বলে।

—- “ফালতু কথা একদম বলবি না, অখিল। ও এখনো ছোট, এসব নিয়ে আমি এখন একদমই ভাবছি না। টাইম উইল কাম,সময় হলে ঠিকই পেয়ে যাবি।”

অখিল সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে।

—- “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তো অপেক্ষায়ই রইলাম! বেশি দেরি করিস না কিন্তু।”

অনেকক্ষণ গল্পগুজব আর টুকটাক নাস্তা শেষে বিদায় নেয় অখিল। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে আসে বাঁধন। অখিল চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই সে ফ্রেশ হতে নিজের রুমে ঢুকে যায়।

____________

রাত ধীরে ধীরে গভীর হয়। চারপাশের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে নেমে আসে একরাশ নিস্তব্ধতা।ফ্ল্যাটের স্টাডি রুমে বই খুলে বসে আছে রূপা। ফ্ল্যাটটা বেশ বড়সড়। ফ্ল্যাটের মানুষের সন্তানদের পড়াশোনার কথা ভেবেই বোধহয় মালিক প্রতিটি বেডরুমের পাশাপাশি আলাদা স্টাডি রুমের ব্যবস্থা করেছেন। দুটি ডাবল বেডরুম, একটি সিঙ্গেল রুম সব মিলিয়ে পরিপাটি, আধুনিক আর প্রশস্ত একটি ফ্ল্যাট।ডাবল রুম দুটো বেছে নিয়েছে বাঁধন। রূপার সামনে বই খোলা থাকলেও অক্ষরগুলোয় মন বসছে না তার।তার কারন অখিল তার বইগুলো ঠিকই এনে দিয়েছে, কিন্তু বাঁধনের দেওয়া তার প্রিয় চুড়ি আর সাদা মাথার ব্যান্ডটা আনেনি। শুধু হিজাব আর ইউনিফর্ম এনেছে।ভাবতেই ছোট্ট মুখটা অভিমানে ফুলে ওঠছে।ব্যান্ডটা তার ভীষণ প্রিয় ছিল। অজান্তেই হাত চলে যায় খালি চুলের ওপর। যেন কিছু একটা নেই, খুব আপন একটা জিনিস হারিয়ে গেছে।পাশেই কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে ক্যান্ডি। মাঝেমধ্যে আদুরে ভঙ্গিতে রূপার কনুইয়ে নাক ছুঁইয়ে দেয়, আবার শরীর ঘষে গা এলিয়ে দেয় তার গায়ে।অন্যমনস্ক রূপা আপনমনে ক্যান্ডির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আর চোখ দুটো বারবার চলে যায় বইয়ের পাতায়, কিন্তু মনটা যেন রয়ে গেছে অনেক দূরে।

অন্যদিকে, পাশের রুমে সোফায় বসে ল্যাপটপে ডুবে আছে বাঁধন।ল্যাপটপের স্ক্রিনে অবিচল দৃষ্টি। আঙুলগুলো দ্রুত ছুটে চলেছে কিবোর্ডের ওপর। মাঝেমধ্যে কোনো তথ্য দেখে ভ্রু কুঁচকে উঠছে, আবার পরক্ষণেই কয়েকটি ফাইল খুলে গভীর মনোযোগে সেগুলো খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করছে।ফ্রেশ হয়ে সে পরে নিয়েছে কমলা রঙের একটি টি-শার্ট, নিচে সাদা ট্রাউজার। সরল পোশাকেও তার ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং শান্ত, সংযত উপস্থিতিটাই তাকে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো করে তুলেছে।অনেকক্ষণ ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকায় বাঁধন। সময় শেষ, কিন্তু তার কাজের রেশ যেন কাটছে না। ঠিক সেই মুহূর্তে ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতা চিরে কলিং বেলটা বেজে ওঠে। সম্ভবত ডেলিভারি ম্যান এসেছে। কারন সে খাবার অর্ডার করেছিল।একটা অস্থির নিঃশ্বাস ফেলে, গাল ফুলিয়ে সে ল্যাপটপটা ঝপ করে বন্ধ করে দিল। উঠে দাঁড়িয়ে ধীর, ভারী পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলল। ডেলিভারি বয় খাবারের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলে,

—- “স্যার, আপনার অর্ডারটা।”

বাঁধন বিল মিটিয়ে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ভেতরে ফিরে আসে। ড্রয়িংরুমে ব্যাগটা রেখে সে পা বাড়ায় স্টাডি রুমের দিকে। রুমের ভেতর মৃদু আলোয় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রুমে ঢুকতেই বাঁধনের চোখ আটকে যায় টেবিলের ওপর পড়ে থাকা রূপার দিকে। রূপা মাথাটা টেবিলের ওপর গুঁজে পড়ে আছে; হাতে ধরা কলম দিয়ে খাতার সাদা পাতায় একটার পর একটা দাগ টেনে হিজিবিজি কাটছে। তার গাল দুটো এমনভাবে ফুলে আছে যেন অভিমান আর রাগে ফেটে পড়বে কোনো বেলুনের মতো।

বাঁধন দরজার ফ্রেম ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার আর আলোর লুকোচুরিতে এই অষ্টাদশীর মানিয়ে নেওয়া অবয়বটার দিকে সে পলকহীন চেয়ে রইল। তারপর মখমলি গলায় বলে উঠল,

—- “কী হয়েছে? এভাবে পড়ার টেবিলটাকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছিস কেন?”

বাঁধনের কণ্ঠের সেই পরিচিত ভারী সুরটা রূপার কানে পৌঁছাতেই সে চমকে ওঠে। চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। বাঁধনের পরনেও তার মতোই কমলা রঙের টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার। হুবহু একই রঙের ম্যাচিং! ফর্সা শরীরের ওপর এই উজ্জ্বল রঙের প্রলেপ বাঁধনের পৌরুষকে এক ধরনের তীব্র এবং বিপজ্জনক রূপ দিয়েছে। রূপার হৃদপিণ্ডটা যেন মুহূর্তের জন্য বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল বাঁধনের এই অমোঘ আকর্ষণের জালে সে পুরোপুরি ধরা পড়ে গেছে।অষ্টাদশীর এই ঘোরলাগা, নিবিড় চাহনি দেখে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অদম্য বাসনার বাঁকা হাসি। সে ধীরে ধীরে রূপার দিকে এগিয়ে এল। ফিসফিস করে বলে,

—- “আমি জানি আমি দেখতে সুন্দর , তাই বলে এভাবে তাকিয়ে থাকবি? চোখ নামা। তোর এই কামুক চোখের দৃষ্টি একদম সুবিধার না, এমন বাজে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাবি না তুই।”

বাঁধনের কথায় ঘোর কাটে রূপার। মুহূর্তের মধ্যে গাল দুটো আরও ফুলিয়ে ফেলে জেদে চোখ বন্ধ করে নিল সে। এত বড় অপমান! লোকটার দিকে আর তাকাবেই না সে। রূপার এমন শিশুসুলভ কাণ্ড দেখে বাঁধন নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসি থামানোর চেষ্টা করল। মেয়েটা কি আসলেই পাগলি নাকি? সে শান্ত পায়ে রূপার পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নিয়ে তার নরম লোমে হাত বুলাতে বুলাতে নিচু স্বরে বলে,

—- “এমন বেলুনের মতো গাল না ফুলিয়ে, বল কী হয়েছে?”

রূপা গাল ফুলিয়ে চোখ বন্ধ রেখেই একগুঁয়ে স্বরে বলে,

—- “কিছু না। আপনার জানতে হবে না। যান এখান থেকে, আমাকে একা থাকতে দিন।”

বাঁধন ক্যান্ডিকে আলতো করে টেবিলে নামিয়ে রেখে পুরো শরীরটা রূপার দিকে ঘুরিয়ে বসল। তার কণ্ঠে এবার অধিকারের মিশেল দেওয়া গাম্ভীর্য,

—- “চোখ খোল। আর কী হয়েছে সেটা ভালো মেয়ের মতো বলবি, নাকি অন্যভাবে আদায় করব?”

রূপা চোখ বন্ধ রেখেই, যেন কোনো জেদি বাচ্চা, অস্ফুট স্বরে বলল,

—- “আমার ব্যান্ড লাগবে। ব্যান্ড এনে দেন।”

বাঁধন ভ্রু কুঁচকে রূপার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে বিস্ময়,

—- “ব্যান্ড? কিসের ব্যান্ড?”

রূপা এবার চোখ না খুলেই হাতটা বাতাসে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,

—- “মাথার ব্যান্ড! আপনি যেটা দিয়েছিলেন। আমার ওই ব্যান্ড আর চুড়ি গুলা চাই।”

বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সহজভাবে বলল,

—- “ওহ, আচ্ছা। এই ব্যাপার? কাল আমি নতুন করে কিনে দেবো। এখন চল, অনেক রাত হয়েছে, খেয়ে নিবি।”

রূপা সাথে সাথে মাথা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল,

—- “উঁহু! আমি নতুন কিছু বুঝি না, আমার ওই ব্যান্ড আর ওই চুড়ি গুলাই চাই!”

কথা আর বাড়াল না বাঁধন। এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে থেকে, একটা গভীর লম্বা শ্বাস টেনে বলে,

—- “ওকে ফাইন। আমি কালই সবকিছু তোর সামনে হাজির করবো।”

মুহূর্তের মধ্যে রূপার চোখ খুলে যায়। খুশিতে চকচক করে ওঠে তার জোড়া চোখ। সে উত্তেজিত হয়ে বলে,

—- “পাক্কা?”

বাঁধন একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে,

—- “পাক্কা। এখন চল, “

রূপা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে আদুরে আবদার নিয়ে বলে,

—- “ওকে, এখন কোলে নেন?”

বাঁধন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে,

—- “হোয়াট?”

রূপা জেদের সাথে ঘাড় নেড়ে বলে,

—- “হুম, কোলে নিয়ে যেতে হবে।”

বাঁধন একটু বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলে,

—- “পা নেই তোর? হেঁটে যাওয়ার ক্ষমতা নেই?”

রূপা কৌতুকী চাহনিতে বলে,

—- “আছে। কিন্তু আমি আপনার কোল ছাড়া ডাইনিংয়ে যাবো না।”

বাঁধন এবার একটু কড়া সুরে বলে,

—- “অতিরিক্ত বাচ্চামি হয়ে যাচ্ছে রূপা?”

রূপা আগের চেয়েও বেশি জেদি ভঙ্গিতে বলে,

—- “আরও হবে! এখন না নিলে আমি খেতে যাবো না, বলে দিলাম।”

বাঁধনের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, সে ধমকের সুরে বলে,

—- “এই জেদ আমার একদম পছন্দ না। আই ডোন্ট লাইক ইট! একদম বাচ্চামি না করে সোজা হেঁটে চল।”

রূপা উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কঠোর গলায় বলে,

—- “আমি আপনার কোল ছাড়া যাবো না। আপনার খিদে লেগেছে, আপনি গিয়ে খেয়ে নিন। আমি যাবো না।”

রূপার এই আকস্মিক আদুরে জেদ আর অদ্ভুত বাচ্চামি স্বভাবটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না বাঁধন। মেয়েটা হুট করে কখন এমন জেদি আর বায়না ধরা হয়ে উঠল, তা বাঁধনের মস্তিষ্কের অগোচর। কিছুক্ষণ সে রূপার দিকে নীরব, নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তারপর একটা গভীর, ভারী শ্বাস ফেলে ধীর স্বরে বলে,

—- “ওকে, কোলে নিয়েই যাচ্ছি।”

বলেই রূপাকে পাঁজাকোলা করে তুলতে গেলে রূপা ছিটকে পিছিয়ে গিয়ে বলে,

—- “এই, কী করছেন?”

বাঁধনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, তার ধৈর্যের বাঁধ যেন মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গেল। রূপার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে সে গর্জে ওঠে,

—- “থাপ্পড় দেবো একটা! চোখে দেখতে পাস না যে কোলে নিচ্ছিলাম।”

রূপা মুখ বাঁকিয়ে জবাব দেয়,

—- “তো ওইভাবে কেন?”

বাঁধন বিরক্তির আতিশয্যে ভ্রু কুঁচকে বলে,

—- “তো কীভাবে নেবো? আমার মাথার ওপর চাপিয়ে নিয়ে হাঁটবো?”

রূপা এবার রহস্যময় দুষ্টু হাসি হেসে বলে,

—- “আপনি ওদিকে ফিরে দাঁড়ান, আমি বলছি।”

আর কোনো কথা না বলে বাঁধন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রূপার দিকে পিঠ দিয়ে উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। ঠিক সেই সুযোগটাই নিলো রূপা। বিদ্যুৎগতিতে সে সামনে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে বাঁধনের শক্ত পেশীবহুল গলা জড়িয়ে ধরে পিগি-ব্যাক হাগ করে তার পিঠের ওপর উঠে বসল। হঠাৎ রূপার ওজনে বাঁধন সামনের দিকে সামান্য নুয়ে পড়ল। পরক্ষণেই বাঁধন তার গলার স্বর চড়িয়ে, বিস্ময় আর রাগের সংমিশ্রণে চিৎকার করে ওঠে,

—- “হেই! হাউ ডেয়ার ইউ।”

বাঁধনের রাগী সুরের ধমক রূপার কানে যেন ঝিরঝিরে বাতাস হয়ে এল, তাতে তার বিন্দুমাত্র ভয় নেই। উল্টো সে বাঁধনের গলাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।নিজের দুই পা দিয়ে বাঁধনের শক্ত, পেশীবহুল কোমরটা এমনভাবে পেঁচিয়ে নিল যেন তারা দুজন একটি অঙ্গে পরিণত হয়েছে। এরপর বাঁধনের কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে, উষ্ণ নিঃশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে বলে,

—- “আপনি কেমন হাসব্যান্ড, বলুন তো? বউয়ের সামান্য একটু ভারেই এভাবে হেলে পড়ছেন! পুরোটা জীবন এই বউটাকে পিঠে নিয়ে সামলাবেন কী করে, মিঃ বাঁধন রহমান?”

বাঁধন রাগে গজগজ করলেও, রূপার ঠোঁটের ছোঁয়া আর তার দুষ্টু কণ্ঠস্বরের মাদকতায় বাঁধনের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, বিপজ্জনক শয়তানি হাসি ফুটে উঠল। রূপা যে তাকে জেনেশুনেই উত্যক্ত করছে, তা বুঝতে বাঁধনের এক মুহূর্তও দেরি হলো না। সে ধীরস্থিরভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের বাঁধন আরও মজবুত করল। রূপার পা দুটো টেনে নিজের কোমরের সাথে এমনভাবে আটকে নিল যেন সে কোথাও পালাতেই না পারে। ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে লাগামহীন কন্ঠে বলে।

—- “এই সামান্য ভার তো তুচ্ছ,। এই ভার নিয়ে আমি নির্দ্বিধায় পুরো পৃথিবী ঘুরে দেখাতে পারব। কিন্তু তুই? পারবি তো আমার পাগলামি আর আমার পাহাড় সমান ভার সামলাতে?

বাঁধনের কথার গভীরতা রূপার কচি মাথায় সেভাবে ঢুকল না। বাঁধনের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে সে কৌতূহলী স্বরে বলে,

—- “মানে? কী বলছেন এসব?”

বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নির্বিকার কণ্ঠে বলে,

—- “মানে তোর মাথা। তোর ওই ছোট মাথার ঘিলুতে এসব ঢুকবে না। বেশি বুদ্ধি খরচ না করে একদম চুপচাপ থাক।”

রূপা আর কথা বাড়াল না, কিন্তু মনের ভেতর তখন দুষ্টু বুদ্ধির কারসাজি। সে মনে মনে মিষ্টি হেসে বলে

—-” আপনি কি মনে করেছেন আমি আপনাকে পেয়ে খুশি না? আরে, পৃথিবীর কোন মেয়ে আপনার মতো সুদর্শন এমন পুরুষকে জীবনসঙ্গি হিসেবে পেয়ে খুশি না হয়ে থাকতে পারে বলেন তো? আমি তো ইচ্ছে করেই হালকা নেকামো করছিলাম যাতে আপনি বুঝতে না পারেন যে আমি আপনাকে পেয়ে কত খুশি। যাই হোক, সবশেষে এটাই বলি স্বামী যদি হয় আপনার মতো ড্যাশিং বয়, তাহলে আমি রূপা সমাজ কেন, পুরো পৃথিবী ছাড়তে রাজি। এখন থেকে দেখবেন এই রূপা আসলে কী! জ্বালিয়ে যদি আপনাকে না মেরেছি, তাহলে আমিও আপনার মিসেস রূপ না।”

খাওয়ার টেবিলে এসে বাঁধন নিজের হাতেই রূপাকে খাইয়ে দেয়। রূপাও কোনো বাক্যব্যয় না করে, যেন এক শান্ত বাধ্য মেয়ে, সবটুকু খাবার মুখ বুজে খেয়ে নেয়। খাওয়া-দাওয়া শেষে ক্লান্তি নিয়ে রূপা ঘুমানোর জন্য রুমের দিকে পা বাড়ায়, ঠিক তখনই বাঁধনের গম্ভীর, শীতল কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে আসে,

—- “কোথায় যাচ্ছিস?”

রূপা থমকে দাঁড়িয়ে মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়ায়। চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময় নিয়ে বলে,

—- “কেন, ঘুমাতে।”

বাঁধন ধীর, ভারী পায়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর বাম দিকের একটা রুমের দিকে আঙুল উঁচিয়ে অমোঘ স্বরে বলে,

—- “ভুল দিকে যাচ্ছিস। তোর রুম ওইদিকে।”

বাঁধনের নির্দেশিত দিকে তাকাতেই রূপার হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে ইতস্তত করে অবিশ্বাসের স্বরে বলে,

—- “কিন্তু আপনি তো এই রুমে যাননি! আপনি তো ডান দিকের রুমে ঢুকলেন?”

বাঁধন বাঁকা চোখে তার দিকে তাকিয়ে উদাসীনভাবে বলে,

—- “হুম। কারণ আমি ডান দিকের রুমে ঘুমাবো, আর তুই বাম দিকেরটাতে।”

রূপা মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মানে তারা আলাদা রুমে থাকবে? রূপার চোখের পাতায় জল চিকচিক করে ওঠে, কম্পিত কণ্ঠে সে বলে,

—- ” আমরা আলাদা থাকব?”

বাঁধন তার শান্ত কিন্তু গভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রূপার ওপর স্থির করে। তার চোখের ভাষা তখন কঠোর, কোনো তর্কের অবকাশ সেখানে নেই। খুব ছোট করে, যেন কোনো অমোঘ আদেশ জারি করছে, সে বলে,

—- “হুম। এখন ভালো মেয়ের মতো চুপচাপ রুমে গিয়ে ঘুমা। আমার যেন দ্বিতীয়বার কোনো প্রশ্ন শুনতে না হয়।”

মাথা নিচু করে রূপা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল, নড়াচড়া করার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। বাঁধন ভ্রু কুঁচকে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলে,

—- “কী বলেছি, শুনতে পাসনি?”

বাঁধনের সেই গম্ভীর ধমকের শব্দে রূপা ভয়ে কেঁপে ওঠে। তড়িঘড়ি করে ফ্লোর থেকে ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নিয়ে সে এক দৌড়ে রুমে গিয়ে ঢুকেই ধড়াস করে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। বাঁধন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস। সে এখনই রূপার সাথে এক বিছানায় থাকতে চায় না। ৩০ বছরের টগবগে যুবক সে, একটা যৌবনবতী নারীকে পাশে নিয়ে সারারাত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এ এক অগ্নিপরীক্ষা! এই নিজেকে সামলানোর লড়াইয়ে সে নিজেই হয়তো পাগল হয়ে যাবে, তাই ঝুঁকি না নিয়ে আলাদা রুমের ব্যবস্থা করেছে সে। বাঁধন পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।

অন্যদিকে রূপার চোখের পাতায় ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। নরম বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে সে অস্থির হয়ে উঠেছে। কী এক পুরুষ! এক রাতেই তার সব ঘুম হারাম করে দিয়েছে। বারবার ইচ্ছে হচ্ছে দৌড়ে গিয়ে বাঁধনের রুমে ঢুকে পড়ার, কিন্তু বাঁধনের কঠোর চাহনি আর ধমকের কথা মনে পড়তেই এক অজানা ভয় তাকে জাপটে ধরেছে। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল, তবুও ঘুমের দেখা নেই। রাত যত গভীর হতে লাগল, ঘরের নিস্তব্ধতা যেন রূপার বুকের ভেতর ভয়ের কাঁটা হয়ে বিঁধতে লাগল। নতুন পরিবেশ, অচেনা এই রুমটা যেন তাকে গিলে খেতে চাইছে; তার মনে হচ্ছে অন্ধকারের আড়াল থেকে কোনো অশরীরী ছায়া তাকে পলকহীন চেয়ে দেখছে।অবশেষে ভয় আর না পেরে ক্যান্ডিকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। বিড়ালের মতো টিপটিপ পায়ে, নিঃশব্দে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। লকের শব্দ না করে সাবধানে দরজা খুলল, তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ করে বাঁধনের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। রুমের দরজাটা সামান্য ভেজানো; ভেতর থেকে ড্রিমলাইটের ম্লান আলো চুইয়ে বেরিয়ে আসছে।কাঁপা বুকে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল রূপা। দেখল, বাঁধন বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে গভীর মনোযোগে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য লেপ্টে আছে তাতে। লোকটা তাহলে এখনো ঘুমায়নি! রূপা অসহায়ের মতো দরজার বাইরের অন্ধকার চত্বরে দাঁড়িয়ে রইল। বাঁধনের সেই গম্ভীর অবয়বের দিকে তাকিয়ে একটা শব্দ করার সাহসও যেন তার তলপেটে দলা পাকিয়ে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। হঠাৎ বাঁধন ফোনটা বিছানার পাশে রাখতেই রূপা বিদ্যুৎগতিতে দেয়ালের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। ভয়ে তার বুকের স্পন্দন বেড়ে গেছে, ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে সে। ক্যান্ডিকে বুকের সাথে আরও জোরে চেপে ধরল, যেন ওটাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়। কয়েক মুহূর্ত বাদে সে আবার অতি সাবধানে উঁকি দিল। দেখল, বাঁধন এখন পাশ ফিরে উল্টো দিকে শুয়ে আছে, অর্থাৎ লোকটা এতক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।

রূপা আর দেরি করল না। বিড়ালের মতো নিঃশব্দে পা টিপে টিপে বাঁধনের রুমে এসে ঢুকল। সন্তর্পণে রুমের দরজাটা ভালো করে চাপিয়ে দিয়ে সে একদম বাঁধনের বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল।বাঁধন এখন নিশ্চিন্তে, নিষ্পাপ বাচ্চার মতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রূপা এক মুহূর্তের জন্য তার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে থমকে গেল। লোকটা জেগে থাকলে যখন বাঘের মতো গর্জন করে, ঘুমালে তখন তাকে একদম অবুঝ বাচ্চার মতো লাগে। রূপা বাঁধনের ঠিক পাশেই ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নিজের এক হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাঁধনের শান্ত মুখের দিকে।কেন জানি না, এই মানুষটার দিকে তাকালে তার চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন অকারণে দুরুদুরু করে উঠছে। সে কি সম্মোহিত? নাকি এই মানুষটার পৌরুষ আর শান্ত রূপের মিশ্রণে সে পুরোপুরি ধরা পড়ে গেছে? সব ভয় ভুলে গিয়ে সে যেন এক মায়াবী ঘোরে ডুব দিয়ে আছে।রূপা বাঁ হাতটা বাড়িয়ে বাঁধনের চোখের সামনে আলতো করে নাড়ায়। লোকটা গভীর ঘুমে পাথরের মতো পড়ে আছে। রূপা একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। পালকের মতো হালকা ছোঁয়ায় ক্যান্ডিকে পাশে সরিয়ে দেয় সে। এরপর অতি সাবধানে বাঁধনের শক্ত কবজিটা নিজের হাতে তুলে নেয়, তারপর তার বুকের ওপর মাথা রেখে বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে।মুহূর্তেই বাঁধনের শরীর থেকে ভেসে আসা তীব্র, আভিজাত্যমাখা পুরুষালি ঘ্রাণ রূপার নাকে তুফানের মতো আছড়ে পড়ে। রূপা যেন নিশ্বাস নিতেই ভুলে যায়, শরীরটা অবশ হয়ে আসছে তার।নিজের অস্তিত্বের প্রতিটি কোণায় এই নেশা মিশিয়ে দিতে সে বাঁধনের বুকের সঙ্গে আরও লেপ্টে যায়।বাঁধনের বুকের ধুকপুকানি রূপার কানে মৃদু ড্রামবিটের মতো বাজছে। সেই স্পন্দনের ছন্দ শুনতে শুনতে সে নেশাতুর নিঃশ্বাসগুলো তার বুকের ভাঁজে আটকে ফেলে ফিসফিসিয়ে ওঠে,

—- “যেমন আপনার কঠোর চেহারা, তেমনই তার এই মাদকতাময় ঘ্রাণ। বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর নামী-দামী সব পারফিউম আপনার গায়ের এই ঘ্রাণের কাছে তুচ্ছ, হার মানতে বাধ্য। কারণ, পারফিউম তো শুধু সুবাস ছড়ায়, কিন্তু আপনি? আপনি সরাসরি নেশা ছড়ান! এমন এক নেশা, যার একবার স্বাদ পেলে মানুষ নিজেকে ভুলে যায়, বারবার ডুবে থাকতে ইচ্ছে করে শুধু আপনার এই ঘ্রাণেই।”

চলবে…!

[অসুস্থ শরীর রীচেক দিতে পারিনি ভুল হলে মানিয়ে নিও]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply