#বাঁধন_রূপের_অধিকারী
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [১৭]
[•••অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ•••]
সকাল খুব ভোরেই ঘুম ভাঙল রূপার। জানালার ফাঁক গলে নরম সোনালি আলো এসে পড়েছে তার মুখে। চারপাশে এখনো শান্ত নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবীটা ঘুমিয়ে আছে।পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল বৃষ্টি এখনো বাচ্চাদের মতো নাক ডেকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আর ঠিক তার পাশেই গোল হয়ে শুয়ে আছে ছোট্ট ক্যান্ডি।
ক্যান্ডিকে দেখামাত্রই রূপার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মায়াভরা হাসি ফুটে উঠল। কেন জানি এখন এই ছোট্ট প্রাণীটাকে দেখলেই তার মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে যায়। যেন সমস্ত দুঃখ, ভয় আর অস্বস্তি কয়েক মুহূর্তের জন্য কোথাও হারিয়ে যায়।
সে ধীরে ধীরে ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট তুলতুলে শরীরটা তার বুকের সাথে মিশে যেতেই রূপার ভেতরটা নরম হয়ে এলো। সে আদর করে ক্যান্ডির নরম লোমে হাত বুলাতে লাগল।ক্যান্ডি আধো ঘুম চোখেই রূপার হাতে জিভ বুলাতে লাগল। যেন নিজের ভাষায় অভিমান করে বলছে তার খুব ক্ষিদে পেয়েছে।রূপা হেসে ফেলল। তারপর ক্যান্ডির গোলাপি নাকে আলতো টোকা দিয়ে আদুরে গলায় বলল।
“ওলে বাবু তোমার বুঝি অনেক ক্ষিদে লেগেছে?”
ক্যান্ডি আবারও তার হাতে মুখ ঘষতেই রূপার হাসিটা আরো গভীর হয়ে উঠল।
সে ক্যান্ডিকে কোলে নিয়েই নিচে নেমে এলো।ততক্ষণে পুরো বাড়িতে ভোরের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে মশলার গন্ধ ভেসে আসছে। রজনী রহমান আর শিল্পী রহমান সকালের রান্না নিয়ে ব্যস্ত।রূপা চুপচাপ ফ্রিজ খুলে একটা টাটকা গাজর আর লাল টমেটো বের করল। তারপর ক্যান্ডিকে কোলে নিয়েই রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এত সকালে তাকে রান্না ঘরে দেখে রজনী রহমান মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন।
“তুই এত সকালে রান্নাঘরে কী করছিস?”
রূপা ক্যান্ডির কান টেনে আদর করতে করতে নরম গলায় বলল।
“এই যে ক্যান্ডির ক্ষিদে পেয়েছে ওর জন্য গাজর আর টমেটো কাটতে আসলাম।”
রজনী রহমানের মুখে মায়াভরা হাসি ফুটে উঠল। তিনি রূপার হাত থেকে গাজর আর টমেটোটা নিয়ে বললেন।
“তুই দাঁড়া, আমি কেটে দিচ্ছি।”
এই বলে খুব যত্ন করে ছোট ছোট টুকরো করে একটা বাটিতে সাজিয়ে দিলেন।
রূপা বাটিটা হাতে নিয়ে আবার নিজের রুমে ফিরে এলো। কিন্তু রুমে না গিয়ে সোজা ব্যালকনিতে চলে গেল।ব্যালকনিতে পা রাখতেই ভোরের ঠান্ডা বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিল। মুহূর্তেই মনটা কেমন শান্ত হয়ে গেল।আকাশটা এখনো পুরোপুরি উজ্জ্বল হয়নি। নরম কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশ। ফাঁকা রাস্তায় দু-একটা গাড়ি ধীরে ধীরে চলছে। দূরে মসজিদ থেকে ভেসে আসা কোরআন তেলাওয়াতের সুরে সকালটা আরো মায়াময় লাগছে।
রূপা ব্যালকনির রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ক্যান্ডিকে গাজরের টুকরো খাওয়াতে লাগল। ছোট্ট ক্যান্ডিটা মজা করে খাচ্ছে, আর মাঝেমধ্যে গোল গোল চোখ তুলে রূপার দিকে তাকাচ্ছে।ঠিক তখনই হঠাৎ তার চোখ চলে গেল নিচের গেটের দিকে।আহসান রহমান আর বাঁধন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। সম্ভবত ফজরের নামাজ পড়ে ফিরেছে দুজন।বাঁধনকে দেখামাত্রই রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।গত রাতের সেই মুহূর্তটা আচমকা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাঁধনের রাগে জ্বলে ওঠা চোখ।রূপার গাল দুটো অজান্তেই হালকা লাল হয়ে উঠল।সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।না এই মানুষটার দিকে আর তাকাতে চায় না সে।যতটা সম্ভব দূরে থাকবে বাঁধনের থেকে। খুব দূরে।
বৃষ্টি ঘুম থেকে উঠে এলোমেলো চুলে দাঁত ব্রাশ করতে করতে ব্যালকনিতে চলে এলো। চোখে এখনো ঘুমের ঘোর লেগে আছে। রূপার সামনে এসে সে বড় একটা হাই তুলে অলস গলায় বলল।
“কখন উঠেছিস?”
রূপা ক্যান্ডির মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে শান্ত গলায় বলল।
“এই তো, কিছুক্ষণ আগেই।”
বৃষ্টি এবার কৌতূহলী চোখে ক্যান্ডির দিকে তাকাল। তারপর আঙুল দিয়ে ক্যান্ডির নরম গালে আলতো খোঁচা দিয়ে মুগ্ধ গলায় বলল।
“আচ্ছা একটা কথা এতটা কিউট খরগোশ তুই কোথায় পেলি? কাল থেকেই দেখছি এই খরগোশটা তোর হাতেই ঘুরছে!”
রূপা মুচকি হেসে ক্যান্ডিকে আরো কাছে টেনে নিল। তারপর তার নরম মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে বলল।
“রাস্তায় পেয়েছি।”
বৃষ্টি যেন বিশ্বাসই করতে পারল না। চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বলল।
“হোয়াট, সিরিয়াসলি? এত সুন্দর একটা খরগোশ কেউ রাস্তায় ফেলে রাখে নাকি, আর দেখ না, একদম শান্ত কাউকে খামচিও দেয় না। মনে হচ্ছে কারো খুব আদরের পালা খরগোশ ছিল।”
রূপার চোখে হঠাৎ একটুখানি মায়া নেমে এলো। সে ক্যান্ডির ছোট্ট কানটা ছুঁয়ে নরম গলায় বলল।
“আমিও প্রথম দেখেই বুঝেছি ও খুব ভালো একটা বাচ্চা। হয়তো কেউ অনেক আদর-ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে। তাই তো মানুষের ভালোবাসাও বুঝতে পারে।”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ ক্যান্ডির দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল।
“কিন্তু কেউ ওকে রাস্তায় ফেলে যাবে কেন?”
রূপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর দূরে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল।
“হয়তো পথ হারিয়ে ফেলেছে বা যে মানুষটা ওকে পুষত, সে কোনো বিপদে পড়ে ওকে রাস্তায় রেখে যেতে বাধ্য হয়েছে।”
রূপার কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য বৃষ্টিও চুপ হয়ে গেল।তারপর সে ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে গালে গাল ঠেকিয়ে হেসে বলল।
“যাই বলিস এই বাচ্চাটা কিন্তু ভীষণ কিউট আর মিষ্টি। একদম তুলতুলে একটা বেবি!”
রূপা হেসে ক্যান্ডির নাকটা আলতো করে চেপে ধরে বলল।
“তার জন্যই তো ওর নাম দিয়েছি ক্যান্ডি।”
বৃষ্টি সাথে সাথে হেসে উঠল। ক্যান্ডির নরম কানটা নাড়াতে নাড়াতে বলল।
“একদম পারফেক্ট নাম হয়েছে। সত্যি বলছি, ওর সাথে নামটা দারুণ মানিয়েছে।”
দুজনের কথার মাঝেই ধীরে ধীরে সকালটা পুরোপুরি জেগে উঠল। ব্যালকনিতে ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে, ঠান্ডা বাতাসে ক্যান্ডির সাদা লোমগুলো হালকা উড়ছে।
___________
সময় গড়িয়ে প্রায় আটটার দিকে বাড়িতে এলো অখিল।সে মূলত বাঁধনের সাথে দেখা করতেই এসেছে।অখিলকে দেখেই বাড়ির সবাই বেশ আপন করে নিল। রজনী রহমান থেকে শুরু করে আহসান রহমান সবার সাথেই খুব সহজভাবে কথা বলতে লাগল সে। তার ব্যবহারটাই এমন, অল্প সময়েই মানুষকে আপন করে নিতে পারে।
কিছুক্ষণ সবার সাথে গল্প করার পর অখিল আর বাঁধন কথা বলতে বলতে বাড়ির পেছনের বড় বাগানের দিকে চলে এলো।সকালের হালকা রোদ তখন ঘাসের উপর পড়ে চকচক করছে। দূরে গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির এখনো পুরো শুকায়নি। পরিবেশটা শান্ত হলেও বাঁধনের মুখে সেই শান্তির কোনো ছাপ নেই।তার চোখ-মুখ শক্ত, ভেতরে যেন অদৃশ্য কোনো চাপা অস্থিরতা কাজ করছে।হাঁটতে হাঁটতেই সে নিচু, ঠান্ডা গলায় অখিলকে জিজ্ঞেস করল।
“কেসটার আপডেট কী?”
অখিল কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বলল।
“কেভিনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে নারী পাচারের পুরো চক্রটা একা ও চালাত না এর পেছনে আরো কেউ আছে।”
বাঁধনের চোয়াল মুহূর্তেই শক্ত হয়ে এলো। চোখের দৃষ্টি ভয়ংকর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে থেমে গিয়ে ধীরে বলল।
“মুখ খুলেছে?”
অখিল এবার মাথা নেড়ে বলল।
“হ্যাঁ একটা নাম বলেছে। মারুফ হোসেন।”
নামটা উচ্চারণ হতেই যেন সময়টা এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।বাঁধনের হাঁটার গতি থেমে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে অখিলের দিকে উঠল।চোখের ভেতর স্পষ্ট বিস্ময় আর সন্দেহ জমে উঠেছে।সে ভারী গলায় আবার বলল।
“কী নাম বললি?”
অখিল ভ্রু কুঁচকে আবারও বলল।
“মারুফ হোসেন। জানা গেছে এই মুহূর্তে তিনি দেশের বাইরে আছে। এজন্য আমাদের টিম এখনই কোনো অ্যাকশন নিতে পারছে না।”
অখিল আরো কিছু বলছিল, কিন্তু বাঁধনের কানে তখন আর কিছু ঢুকছে না।মুহূর্তের মধ্যে তার মাথায় ঝড়ের মতো ভেসে উঠল সেদিনের কথা, রূপা বলেছিল তার বাবার নাম মারুফ হোসেন।বাঁধনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ অদ্ভুতভাবে ধক করে উঠল।
তাহলে কি?
না, এটা কি শুধুই নামের মিল?নাকি সত্যিই রূপার আসল বাবা রজনী রহমানের প্রথম স্বামী এই ভয়ংকর নারী পাচার চক্রের সাথে জড়িত।বাঁধনের মুখটা ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠতে দেখে অখিল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভ্রু কুঁচকে শান্ত গলায় বলল।
“তুই মনে হয় কোনো টেনশনে আছিস কোনো সমস্যা?”
বাঁধন মুহূর্তেই নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা চাপা দিল। মুখের ভাব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে নিচু গলায় বলল।
“না তবে এই কেসটা যত দ্রুত সম্ভব সলভ করতে হবে। মারুফ হোসেনকে যেকোনোভাবে দেশে ফিরতে বাধ্য করতে হবে।”
কথাটা বলার সময় তার চোখের দৃষ্টি ভয়ংকর ঠান্ডা হয়ে উঠল। যেন নামটার পেছনে লুকিয়ে থাকা মানুষটাকে সে এখনই সামনে পেলে শেষ করে ফেলবে।অখিল মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“হ্যাঁ আলতাফ সাহেবও একই কথা বলছে। লোকটা দেশের বাইরে থাকায় কাজটা আরো কঠিন হয়ে গেছে।”
দুজনের কথার মাঝেই বাড়ির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো শান্তা।
অখিল এসেছে শুনেই সে রুম থেকে বের হয়েছে। সেদিনের সাহায্যের জন্য মানুষটাকে একটা ধন্যবাদ অন্তত বলা দরকার মনে হয়েছিল তার।হালকা রঙের একটা সালোয়ার পরে চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে সে বাগানের দিকে এলো। সকালের বাতাসে তার ওড়নাটা হালকা উড়ছে।
কিন্তু কিছুটা কাছে আসতেই সে থেমে গেল।অখিল আর বাঁধন দুজনেই এতটা মনোযোগ দিয়ে কথা বলছে যে তাদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।বাঁধনের গম্ভীর মুখটা আরো কঠিন হয়ে আছে, আর অখিলও অস্বাভাবিক রকম সিরিয়াস।
শান্তা কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।এখন হঠাৎ গিয়ে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না।তাই সে আর সামনে এগোল না। দূর থেকেই চুপচাপ তাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তবে তার চোখ বারবার গিয়ে আটকে থাকছে অখিলের মুখে।
অখিলের শান্ত, স্থির ভঙ্গিতে কথা বলার ধরনটা দেখে শান্তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ অদ্ভুতভাবে ধক করে উঠল।মনে হলো বুকের ভেতরের স্পন্দনটা কেঁপে উঠেছে।সে নিজেও বুঝতে পারল না এমন কেন হচ্ছে।সাধারণত মেয়েরা তো সেই পুরুষকে দেখেই এমন অনুভব করে, যাকে তাদের ভালো লাগে যাকে দেখলে বুকের ভেতর অস্থিরতা কাজ করে।কিন্তু তার তো ভালো লাগে বাঁধনকে।
তাহলে বাঁধনকে দেখে কখনো এমন অনুভূতি হয়নি কেন?আর এই মানুষটা অখিলকে দেখলেই কেন বুকের ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শান্তা নিজের ভাবনার মাঝেই হারিয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই একটা ভারী, পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এলো তার কানে।
“আরে শান্তা, কেমন আছো?”
শান্তা হালকা চমকে উঠে সামনে তাকাল।দেখল বাঁধন আর অখিল দুজনেই তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।বাঁধন স্বভাবমতো একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত প্যান্টের পকেটে গোঁজা। চোখে সেই চিরচেনা শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টি।আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অখিলের চোখে মুখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। তার উপস্থিতিটাই যেন আলাদা একটা চাপ তৈরি করছে। শান্তা দ্রুত নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা লুকিয়ে ফেলল। তারপর ঠোঁটে ছোট্ট হাসি এনে অখিলের দিকে তাকিয়ে বলল।
“জ্বি স্যার ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
অখিল হালকা মাথা নেড়ে বলল।
“ভালো। তোমার শরীর এখন কেমন?”
শান্তা ছোট্ট করে মাথা নাড়িয়ে বলল।
“ভালো।”
অখিল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার শান্ত গলায় বলল।
“এখনো কী ভয় করে?”
প্রশ্নটা শুনেই শান্তার ভেতরটা বিরক্তিতে ভরে উঠল।এই লোকটা কি সবসময় অফিসারের মতোই কথা বলে।বাড়ির ভেতরেও জেরা করার অভ্যাস যায় না নাকি। তবুও মুখে কিছু প্রকাশ না করে কোনো রকমে বলল।
“না।”
অখিল এবার হালকা মাথা নেড়ে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে বলল।
“হুম গুড। একদম স্ট্রং থাকবে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রূপা আর বৃষ্টি। দুজনের পরনেই কলেজ ড্রেস, কাঁধে ব্যাগ। তবে আজ রূপাকে যেন অন্যদিনের চেয়েও আলাদা লাগছে।আজ সে দুই বেনি করেনি। পুরো ঘন কালো চুল ছেড়ে দিয়েছে। হাঁটুর পর্যন্ত নেমে যাওয়া সিল্কের মতো চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে। মাথায় সাদা রঙের ছোট্ট বানি ইয়ার হেডব্যান্ড, যেটা তাকে এতটাই কিউট আর নিষ্পাপ দেখাচ্ছে যে দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো পুতুল হেঁটে বেরিয়ে এসেছে।ফর্সা মুখে একদম হালকা গোলাপি আভা, বড় বড় চোখ দুটোতে ঘুম ভাঙা কোমলতা এখনো রয়ে গেছে।ক্যান্ডিকে খাইয়ে সে রুমেই রেখে এসেছে। চাইলে সাথে নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু যদি কলেজে গিয়ে ক্যান্ডি কাউকে আঁচড়ে দেয় বা স্যার কিছু বলে।এই ভেবেই আর নিয়ে আসেনি।
দুজনের পেছন পেছন বেরিয়ে এলো আকাশ।পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। শার্টের হাতা দুটো নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গোটানো। চুলে হালকা জেল দিয়ে সুন্দর করে সেট করা। দূর থেকে দেখলে সত্যিই সিনেমার কোনো হিরোর মতো লাগে। আকাশ গাড়ির পাশে এসে দাঁড়িয়ে হালকা হাসল। তারপর রূপা আর বৃষ্টিকে উদ্দেশ্য করে বলল।
“দুজনেই আমার গাড়িতে ওঠ, আমি পৌঁছে দিচ্ছি।”
বৃষ্টি কথাটা শুনে একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।যে মানুষটার থেকে সে দূরে থাকতে চায়, সেই মানুষটাই বারবার অদ্ভুতভাবে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।রূপা আর বৃষ্টি গাড়ির দিকে এগোতেই ঠিক তখনই বাগানের দিক থেকে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে এলো বাঁধন, অখিল আর শান্তা।অখিলকে দেখেই আকাশ আর গাড়িতে উঠল না। সোজা এগিয়ে গিয়ে তার সাথে হ্যান্ডশেক করল।আগেই পরিচয় হয়েছিল দুজনের। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে।দুজন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল।
এদিকে রূপার চোখ গিয়ে আটকে রইল বাঁধনের ওপর।লোকটা যেন নিজের আলাদা এক জগতে দাঁড়িয়ে আছে।পুরো মনোযোগ ফোনে।শরীরে কালো রঙের ফিটিং টি-শার্ট, নিচে সাদা ট্রাউজার। বাম হাত পকেটে গোঁজা, ডান হাতে ফোন স্ক্রল করছে। কপালটা হালকা কুঁচকে আছে। চোয়াল শক্ত। মুখে সেই ভয়ংকর গম্ভীর ভাব, যেটা দেখলেই মনে হয় মানুষটা সবসময় রাগ নিয়ন্ত্রণ করে রাখে।
সকালের নরম আলোয় তার ফর্সা মুখটা আরো তীক্ষ্ণ লাগছে। এলোমেলো চুলগুলো কপালের উপর পড়ে আছে।একটা পুরুষ কতটা মারাত্মক আকর্ষণীয় হতে পারে, সেটা বাঁধনকে না দেখলে হয়তো কেউ বুঝত না।বৃষ্টি কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে রূপার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“বাঁধন ভাইয়া কিন্তু সেই হ্যান্ডসাম রে দেখ না কত লম্বা! উনার সামনে আকাশ ভাইয়া আর ওই ছেলেটাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে দুজনেই পনেরো বছরের কিশোর।”
রূপা সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে বৃষ্টির দিকে তাকাল। তারপর দাঁত চেপে নিচু গলায় বলল।
“ফালতু কথা বন্ধ কর। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।”
বৃষ্টি খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর দুষ্টুমি ভরা চোখে রূপার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“একটা মারাত্মক সত্যি কথা বলি শোন আমিও যদি তোর জায়গায় থাকতাম, তাহলে তোর মতো আমিও বাঁধন ভাইয়ার ওপর ক্রাশ খেয়ে বসে থাকতাম!”
রূপা সাথে সাথে রাগী চোখে তাকাল বৃষ্টির দিকে।তার চোখমুখ এমনভাবে কুঁচকে গেল যেন এখনই বৃষ্টির গলা টিপে ধরবে।বৃষ্টি সেটা দেখেই হেসে ফেলল। তারপর ঠোঁট কামড়ে কোনো রকমে নিজের হাসি চেপে চুপ হয়ে গেল।এদিকে বাঁধন তখনো রূপাদের দিকে তাকায়নি। পুরো মনোযোগ ফোনেই।কিন্তু অখিলের নজর হঠাৎ গিয়ে পড়ল রূপা আর বৃষ্টির ওপর।সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল।
“ওই দুইটা মেয়ে আবার কে?”
আকাশ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। তারপর হালকা হাসি দিয়ে বলল।
“ও রূপা আর বৃষ্টি। রূপা আমার চাচাতো বোন, আর ওর ফ্রেন্ড বৃষ্টি,আর রূপা তোমাদের এসপি সাহেবের ছোট বোন।”
‘রূপা’ নামটা কানে যেতেই বাঁধনের আঙুল থেমে গেল ফোনের স্ক্রিনে।ধীরে ধীরে সে মাথা তুলে সামনে তাকাল।আর পরের মুহূর্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো রূপার ওপর।রূপা তখন অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সকালের বাতাসে তার লম্বা কালো চুলগুলো এলোমেলোভাবে উড়ছে। কখনো গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে, কখনো ঠোঁটের কোণে এসে লাগছে। সাদা বানি ইয়ার হেডব্যান্ডে মেয়েটাকে অসম্ভব নিষ্পাপ লাগছে।বাঁধন নিচ থেকে ধীরে ধীরে পুরো মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করল।
কলেজ ড্রেস, কাঁধে ব্যাগ, চুল খোলা আর সেই ঘন কালো চুল হাঁটুর নিচ পর্যন্ত নেমে যাওয়া চুলগুলো যেন চোখ সরাতে দিচ্ছে না তাকে।অদ্ভুতভাবে বাঁধনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।সে খুব ভালো করেই লক্ষ্য করেছে,এই মেয়েটাকে দেখলেই তার ভেতর কেমন যেন অস্বাভাবিক কিছু হতে থাকে।মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়।রাগ হয়, আবার চোখও সরাতে পারে না।আজ রূপাকে চুল ছেড়ে থাকতে দেখে তার ভীষণ রাগ হলো। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল,এইভাবে চুল ছেড়ে কলেজে যাচ্ছে কেন মেয়েটা, মানুষকে কী দেখাতে চায়।তার খুব ইচ্ছে করছে এখনই গিয়ে একটা চড় বসিয়ে দাঁত চেপে বলতে।
“তোর সাহস কী করে হয় চুল ছেড়ে কলেজে যাওয়ার?”
কিন্তু ঠিক তখনই বুকের ভেতর বহুদিনের জমে থাকা সেই তীব্র ঘৃণাটা আবার মাথা তুলে দাঁড়াল।এই মেয়েটার জন্যই তো তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।এই মেয়েটার জন্যই তার পুরো পৃথিবীটা একসময় এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।আর সেই অতীতের আগুন আজও বাঁধনের ভেতরে নীরবে জ্বলছে।বাঁধনের ভাবনার মাঝেই অখিল তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে, একটু অবাক আর সন্দেহ মেশানো গলায় বলল।
“বাঁধন, এসব কি শুনছি? তোর বোন? মানে তোর তো কোনো বোনই নেই তাহলে বোন কোথা থেকে এলো?”
বাঁধন একবারও থামল না। সে সোজা বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগল, একদম গম্ভীর, শক্ত মুখে। পকেটে হাত গোঁজা, চোখ সামনে স্থির।তারপর পিছনে না তাকিয়েই ঠান্ডা, একেবারে কেটে যাওয়া কণ্ঠে বলল।
“আমার কোনো বোন নেই।”
কথাটা শেষ করেই সে বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না, কিন্তু শব্দগুলোর ভেতর যেন একটা অদ্ভুত দূরত্ব আর কড়াকড়ি জমে ছিল।তার চলে যাওয়ার পর পরিবেশটা মুহূর্তেই থমথমে হয়ে গেল।আকাশ একটু থেমে অখিলের দিকে তাকাল, তারপর শান্ত গলায় বলল।
“আসলে রূপা আমার বর্তমান চাচির মেয়ে। মানে চাচির আগের পক্ষের মেয়ে ও।”
অখিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে মাথা নেড়ে হালকা একটা হাসি দিল।
“ওহ আচ্ছা বুঝেছি। সৎ বোন।”
একটা বিশেষ কথা, এই গল্পে কিন্তু রূপা বাঁধন ছাড়াও কাপল আছে, ইতিমধ্যে পাঠকরা হয়তো বুঝে গেছো কে কার সাথে
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৫
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৫