Golpo থ্রিলার গল্প বজ্রমেঘ

বজ্রমেঘ পর্ব ৩৬


বজ্রমেঘ পর্ব ৩৬

. #বজ্রমেঘ . ❤

#পর্বসংখ্যা_৩৬ .

#ফাবিয়াহ্_মমো .

বুকের ভেতর ভীষণ ঝড়। অস্থির বেগে দাপাদাপি করছে হৃৎপিণ্ড। কিবোর্ডের ওপর নুইয়ে থাকা মাথায় রুক্ষ হাতে ধীরে ধীরে বিলি কাটছিল শোয়েব। অপর হাতের শক্ত বাহুবন্ধনে আগলে রেখেছিল নির্মেদ কোমরটা, ওকে একচুলও ভারসাম্য হারাতে দিল না। পুরোটা সময় জুড়ে স্থির, অচঞ্চল, নিঃশব্দ ছিল শাওলিন। এক হাত মেঝের দিকে ঝুলে আছে, অন্য হাতটা মুঠো পাকানো শোয়েবের নেভিব্লু টিশার্টে। অস্থির এক নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে অধর মুক্ত করল শোয়েব। তাকাল একটু আগের মিষ্টি যুগলে। তার বর্বর আদরে কেটে গেছে একটু, লালচে রক্তে সিক্ত হয়েছে অধর ত্বক। কপালটা ওর কপালে মিলিয়ে গভীর শ্বাস ছেড়ে বলল,

– তুমি কী চাচ্ছিলে সময়টা আরো দীর্ঘ হোক? তোমাকে এভাবেই কিছুক্ষণ যন্ত্রণা দিই?

চোখ বন্ধ শাওলিনের। ব্যথার ক্ষীণ জ্বালাতন কপালের ওপর কুঞ্চন সৃষ্টি করেছে। চিকন ভ্রুঁ দুটো ওর মনের ভাব-অনুভাব বোঝাচ্ছে অকপটে। শোয়েব তা অপলক দেখে মুচকি হাসিতে রম্য গলায় বলল,

– তোমার ভ্রুঁ দুটোও নিজের কথা জানাচ্ছে শাওলিন। তুমি লুকোচুরি করো, কিন্তু লুকোতে পারো না কিছুই। চোখ খোলো . . তাকাও।

কণ্ঠের বিবশতা শাওলিনকে প্রখর স্পর্শের মতো ছুঁয়ে ধরেছে। কণ্ঠ, চাহনি, হাত, মন সবকিছু যেন দখল করে নিচ্ছে লোকটা। শাওলিন না তাকালে শোয়েব বাঁহাতের থাবায় ঝুলন্ত হাতকে তুলে নিল মুঠোতে। আঙুলের ফাঁকে আঙুল মিলিয়ে কিবোর্ডের পাশে ফাঁকা স্থানে চেপে ধরল কোমল হাত। শোয়েব অধীর গলায় বলে উঠল ফের,

– যদি একবার আমার চোখে নিজেকে দেখতে, কখনো আমার কাছ থেকে নিজেকে দূর করতে না শাওলিন।

কথাটা বলে কাঁটা অধরে পৌরুষ ঠোঁট চেপে দেয়। প্রগাঢ় ছোঁয়ায় শিউরে উঠে শাওলিন। মানুষটার বুকের ভেতর নিজের সবটুকু সেই কখন সপে দিয়েছে, গলার কাছে আঁটকে গেল নিঃশ্বাস। প্রবল মুষ্টির ভেতর বাঁধা হাত, অন্য হাত তার টিশার্ট ভেদ করে নখর বিদ্ধ হচ্ছে। চোখ বন্ধ, অশান্ত শ্বাস ফেলছে শোয়েব। ওই ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে রেখে শোয়েব প্রতিটি কথা বলতে লাগল,

– তোমাকে কতো কথা বলা বাকি। সব তো বলা হয়নি শাওলিন। তুমি এখনো প্রাণচঞ্চল মেয়েটা হতে পারোনি। এখনো হাসোনি। একবারও না।

কালো চুলের গহিনে সবগুলো আঙুল নাড়াচ্ছে শোয়েব। তার মুঠোবন্দি হাতে টের পাচ্ছে ওর সরু আঙুলের চাপ। টাটকা রক্তফোঁটা আপন ওষ্ঠে মুছিয়ে দিয়েছে সে, কণ্ঠস্বর আরো কোমলাবৃত করে বলছে,

– কিছু নিয়ম না মানার গোঁড়ামি যদি করি, যদি বৌভাত, চলন, পুরোনো নিয়ম না মানি, এর ক্ষতিগুলো আমার হোক। সম্পূর্ণ দায় আমি নিচ্ছি শাওলিন। তুমি সকালের ঘটনায় ওভাবে অন্যের হাতে মতামত ছেড়ো না।

– তাহলে কী করব?

চোখ বোজা রেখে শাওলিন আস্তে আস্তে শুধাল। প্রত্যুত্তরে চোখের পল্লব ফের কুঁচকে ফেলল ও। প্রতিটি শব্দ ওর ঠোঁটে রেখে জানাল,

– সব সিদ্ধান্ত তোমার, শুধু মতামতগুলো আমার থাকবে।

যে হাত চুলের গভীরে ছিল, সেই হাত ওর ঘাড়ের পেছনে চাপ দিয়ে কিবোর্ড থেকে ওঠাল। রিভলবিং চেয়ারে গা এলিয়ে ওকে মিশিয়ে ফেলল বুকের ভেতর। চেয়ারে ঝুলানো কালো স্যূট ডানহাতে বুঝে নিল শোয়েব, বুকের ভেতর ঢাকলো কালো স্যূটে। হলুদ বাতিটা নিভিয়ে দিল। স্যূটে ঢাকা দেহে একহাত চেপে অন্যহাত ওর উষ্ণতায় ডুবিয়ে দিল। ঘুম জড়িয়ে আসছে। মাদক মাদক এক নেশালু অনুভবে বোধ হারাচ্ছে। শোয়েব বহুক্ষণ পর সুস্থির ভাবে বলল,

– আজ ছুটি নিব?

শাওলিন কিছু না বুঝেই বলল,

– হুঁ।

– বন ঘুরে দেখতে চাও?

– হুঁ।

– তাহলে আমাকে দু সপ্তাহ দাও। চার বছরে যতগুলো ছুটি পাওনা, সবগুলো মঞ্জুর করাব।

মানুষটা কোনোভাবেই চাইছে না ঢাকায় ফেরা। জমানো ছুটিগুলো পর্যন্ত ওর পায়ের কাছে অর্পণ করে দিচ্ছে। শাওলিন খানিকটা সময় পর মৌণতা ভাঙল। ধীর কণ্ঠে শান্তভাবে বলল,

– ছুটিগুলো নষ্ট করার কারণ দেখছি না।

– তুমি থেকে গেলে নষ্ট হবে না। রেবাকে বলে দাও এখনো এদিকটা বুঝে উঠতে পারোনি। তোমার সময় লাগবে।

মাথার যে অংশ কিবোর্ডের চাপে ব্যথা ছিল, সেখানে আঙুলের স্পর্শে আরাম অনুভব করল শাওলিন। স্বস্তির পরশে বুকটা নির্ভার হয়ে এল। এতোটা মুক্ত, হালকা, শান্তি, সাচ্ছন্দ্য কখনো অনুভূত হয়নি ওর। দুটি ক্ষীণ হাতে শোয়েবকে সন্তপর্ণে জড়িয়ে ধরল। চেয়ারের হেডরেস্টে মাথা এলিয়ে ছিল শোয়েব, যে হাত স্যূটের ভেতর ওকে ছুঁয়ে রেখেছে, ব্লাউজের শেষ ও পেডিকোটের শুরু যেখানে, তার মধ্যখানের উন্মুক্ত ত্বকে রুক্ষ আঙুল বুলিয়ে যাচ্ছে।

– শাওলিন,

বুকের ভেতর থেকে ক্ষীণ উত্তর এল,

– হুঁ,

– আমার কথা তোমাকে স্বস্তি দেয়?

– হুঁ,

– আমার উপস্থিতি তোমাকে নিরাপদ রাখে?

– হ্যাঁ,

– আমার আদর তোমাকে কাতর করবে না?

শাওলিন কোনো কথা বলল না। প্রশস্ত, তপ্ত, কঠোর বুকে মিশে গেল আরো। রাত গভীর থেকে গভীরতর। পাহাড়ি হিম নেমে আসছে ভূমিতে। চারধার নৈসর্গিক মায়া-মূর্ছনায় নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত, সুনশান। গম্ভীর, হিমশীতল সুরে শোয়েব নেমে এল ওর চুলে, গাল মিলিয়ে চোখ বুজে ফেলে বলল,

– আমি কাউকে বিদায়ী টেক্সট দিইনি, শুধু তুমি ছাড়া। সেদিন ট্যূর বাসটা থামানো যেতো। খাগড়াছড়িতে তুমি আমার সর্বোচ্চ ক্ষতিটা করে গিয়েছ। তবু যেতে বাঁধা দিইনি।

হুঁ হুঁ করে বুকের ভেতর ভয় জানান দিল। শাওলিন সামান্য নড়ল তার বাহুযুগলে। কণ্ঠে অসীম উদ্বিগ্নতা নিয়ে প্রশ্নটা করল,

– কী ক্ষতি?

শোয়েব স্যূটের ভেতর ডানহাতকে গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে উপরে উঠাচ্ছিল। প্রতিটি আঙুলের ছোঁয়ায় লোমস্তর কাঁটা দিয়ে উঠছে ওর। পিঠের সেই জায়গায় হাতের থাবা রাখল, যেখানে ছুরি বিদ্ধ আঘাতে শাওলিন যন্ত্রণায় ছিল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছে শাওলিন। পরবর্তী কথাগুলো শোনার অপেক্ষায় মুখিয়ে আছে স্নায়ু-মন।

– আমার আঘাত আমার ছিল না। অন্যের আঘাত আমার হয়ে গেল। যার সঙ্গে দুদিন আগে পরিচয় ছিল না, হঠাৎ পরিচয়ে তার বলা না-বলা ব্যথা, যন্ত্রণা, দুঃখগুলো আমার করে দিল।

শাওলিন ইতস্তত ভাবে ছোট্ট ঢোক গিলে বলল,

– আমি আপনার কাছে কিছুই বলিনি অফিসার ফারশাদ। এখনো না।

– তুমি না বললে আমি জানব না?

– যদি জেনেই থাকেন, তাহলে আগে কেন সবটা গুছিয়ে দিলেন না?

– তুমি বেঁকে বসলে আমি এগোতে পারব? সকালে যে কাজটা করেছ, এরপর তো আরো নিশ্চিত তুমি আমার কাজের ধরণ পছন্দ করবে না। আমি যেভাবে ব্যাপারটা ঠিক পথে আনব, সেটা তোমার রাগ, জেদ, বিরক্তি হারে হারে বাড়াবে।

– কাউকে হিসেব বোঝাতে শারীরিক যন্ত্রণা কেন দিতে হবে? যদি সে বোঝার মতো বিবেকে না-ই থাকে? কেন শুধু শুধু সময় নষ্ট?

– তুমি যে দৃষ্টিতে মানুষ দেখো, তা আমার সঙ্গে মিলবে না। এ নিয়ে জোর করব না শাওলিন। তোমার বোঝার, ভাবার, দেখার দিকটা আলাদা হবে, এসব আমি কনসিডার করি।

– মানুষটা আপনার বাড়ির লোক। আপনি আলাদা ভাবে তাকে যা খুশি তা বলতে পারতেন। তখন সে শুনলে শুনুক, না শোনাটা তার ব্যাপার। কিন্তু সবার সামনে যখন অপমান করবেন, যেখানে আলাদা ভাবে তাকে বোঝানোর চমৎকার সুযোগ আছে, তখন সে মনে মনে আপনাকে ঘৃণা করবে। কিছু ঘৃণা যদি খারাপ মানুষ করে থাকে, আপনার ক্ষতিটাও বিশ্রী ভাবে করবে। আপনি বুঝে দেখুন, সকালের কাজটা কেমন বাজে হয়েছে।

– তুমি কী ভয় পাচ্ছ সবিতা চাচি খারাপ কিছু করবেন?

– চারপেয়ে প্রাণীর চেয়ে দুপেয়ে প্রাণী বিষাক্ত। তারা আপনাকে ক্ষতি করার আগে বুঝতেও দেবে না, আপনাকে কতটা ঘৃণা করে। যখন বিষ ছড়াবে, তখন তাদের নোংরামিতে আপনার চারপাশটা দুর্গন্ধ হবে।

– তুমি কী এজন্যই রেবার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলো না? তার নাটক চুপচাপ দেখে যাও?

শাওলিন কিছু বলল না। বুকের ভেতর মাথাটা লুকিয়ে দিল। অফিস ঘরটা প্রশস্ত, বিশাল। জানালাগুলো সে অনুপাতে বৃহৎ আকার। বন থেকে ভেসে আসা হাওয়া, ঝিরঝির পাতার স্বর, রাতপাখির ডানা ঝাপটানি, আর মানুষটার দেহে মিশে থাকা এক অদ্ভুত মাদক ঘ্রাণ, সবকিছু একাকার হয়ে মন্ত্রমুগ্ধে বিবশ হলো। বহুক্ষণ পরে ক্ষীণ গলায় বলল শাওলিন,

– পৃথিবীতে কোনো হিসেব বাকি থাকে না। মানুষ যে বিচারে অক্ষম, তা নিশ্চিত করেন স্রষ্টা। কে কী করল, কেন করল, এসব নিয়ে ঘাঁটানোর আগ্রহ হয় না। আমি ততটা জানলেই খুশি, যতটা আমার জন্য দরকার।

কথাগুলো শুনে স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যটা হালকা হলো শোয়েবের। ঠোঁটে মুচকি হাসিটা ফুটে তার চোখদুটো আলোক উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। বাহুর দৃঢ়তা ওকে দমবন্ধ করে অবশ করল,

– এজন্যই প্রকৃতি চেয়েছে তুমি আমার হও। তোমার আগ্রহ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবে না। আমি কখনো তোমার ভুলগুলো নিয়ে দুর্ব্যবহার করব না। তোমার সমস্ত ভয় আমি দূর করে দেব।

শাওলিন কঠোর চাপে নিজেকে শিথিল করতে পারল না। ওর কাঁটা অধর আতপ্ত বুকে নড়চড় করিয়ে ক্ষয়াটে স্বর ফোটাল,

– আমার সমস্ত ভয় কী নিয়ে? আপনি জানেন?

– তোমার সমস্ত ভয় কিছু হারানো নিয়ে। ছোটোবেলায় যা দেখেছ, যা তখন বোঝেনি এখন বুঝেছ, যাদের ভুলে যেতে চাও, কাদের সহ্য করতে চাও, সবকিছু নিয়েই তোমার ভয়। মানুষের কাছে শক্ত থাকো, কিন্তু রাত তোমাকে ঘুমোতে দেয় না। তুমি এখানে এসে শান্তিটা পেয়েছ। আর প্রথমবার কোনো পুরুষের কাছে নিজেকে শান্ত পেয়েছ।

কথাটুকু বলেই স্যূটের ভেতরে হাত ওর দেহে চাপ বাড়ালো, ধীরে ধীরে আরো পিষে গেল শোয়েবের দেহসৌষ্ঠব্যে। শাওলিন আর্ত স্বর ফোটাল না, অস্থির দুহাতে সকালের মতো ঠেলেও দিল না, বরং অব্যক্ত ঘনিষ্ঠতা প্রথমবারের মতো নিঃসংকোচে হৃদয়ে গ্রহণ করল। শোয়েব নেশালু শীতল স্বরে হৃদস্পর্শ করে বলল,

– তুমি আমাকে কেমন চোখে দেখো, তা আমি জানি না। যেমনি ভাবো, সবচেয়ে কাছের মানুষ করে রেখো। আমি তোমার কাছে শান্তি খুঁজে পাই। স্বস্তিতে ভালো লাগে আমার।

When flowers bloom,

they look like spring.

They remind me of a girl-

now blooming as Mrs. Shawleen.

দুটো মানুষ একে অপরের পরিপূরক। যেন সকালের ঝাপটা রাতের আঁধারে কেটে গেছে। শোয়েব রেগে উঠতে পারতো, পালটা আঘাত করতে পারতো ওর ফাইল চুরিটা নিয়ে, কিন্তু বিচক্ষণতা তাকে শান্ত করেছে। বুঝিয়েছে একজন আগুন হলে অন্যকে পানি হতে হয়। আম্মি আর আব্বু কখনো রাত অবধি রাগ জমায়নি; পরদিনের জন্য কথা বন্ধ রাখেনি। তার সদ্য বধূ, তার অন্তরের অংশ, শাওলিন কী সত্যিই জমিয়ে রাখবে পরদিনের জন্য?

.

ভোরে ঘুমটা ভাঙল। চারপাশে কুয়াশা ঘেরা ঝাপসা প্রকৃতি। জানালা দিয়ে দূর পাহাড়ে কালচে ছায়া দেখা দিচ্ছে, আকাশে ধূসর মেঘের আস্তরণ। রিভলবিং চেয়ারে কালো স্যূটের নিচে নিজেকে আবিষ্কার করল শাওলিন। কালরাতের স্মৃতি ছেঁড়া তুলোর মতো স্মরণ আকাশে ভাসছে।

হঠাৎ তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেটে যায়। চট করে ঘোর ভেঙে চারধারে নজর ছুঁড়ল। হুড়মুড় করে দাঁড়িয়ে পড়ে মানুষটাকে ব্যাকুল চোখে তল্লাশ করল। নেই! কোথায় গেল? ঘড়িতে চোখ গেল, ভোর সোয়া পাঁচটা। এখনো আঁধার কাটেনি বাইরে। স্যূটটা বাঁহাতে ঝুলিয়ে হলঘর, রান্নাঘর, পুরো নিচতলাটা দেখে, শেষে দোতলায় ধপ ধপ পা ফেলে ছুটল। একবারও খেয়াল করেনি, নিচতলা থেকে কেউ ওকেই দেখছে। ফাতিমা নাজ ওযু শেষে ঘরে ফিরছেন। নাতবধূর উদ্বিগ্ন চেহারায় যে অস্থিরতা দেখলেন, তাতে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিলেন।

শাওলিন ধড়াস করে ঘরের দরজা খুলতেই ভেতরে তারস্বরে আর্তনাদ ছড়াল। প্রতিটি কোণ পরিচ্ছন্ন। গোছগাছ। ধূলো নেই। রাজকীয় সুলভ বিশাল শয্যাটা শূন্য। দখিন আর উত্তর দিকে জানালা সম্পূর্ণ খোলা। যা বোঝার বুঝে নিল শাওলিন। আজও খুব ভোরে জেগেছে। ওকে না ডেকে বাইরে চলে গেছে। ওয়াশরুমে ঢুকেছে শাওলিন, এমন সময় বেসিনের আয়নায় ঠোঁটদুটো মনোযোগ কেড়ে নিল। নিম্ন অধরের ঠিক ডানদিকে রক্ত জমাট, এক চিলতে কাঁটা। জায়গাটা আঙুলে ছুঁতেই গতরাতের সবকিছু বুকে কাঁপন ছড়ালো। যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন আফিমের মতো এক মাতাল অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। যেখানে বোধ, বিবেক, নিয়ন্ত্রণ সবকিছু অক্ষম। হাতমুখ ধুয়ে বেরোলে হঠাৎ বিছানায় দৃষ্টিবদ্ধ হল। বুকটা মোচড়ে উঠল সহসা। থোকায় থোকায় কাঠগোলাপ ফুল। সদ্য তোলা, মিষ্টি সুগন্ধি নাকে ধাক্কা দিচ্ছে। বিছানায় আরো জিনিস রাখা। তবে ওগুলো ওয়ালেট, হাতঘড়ি, জিপের চাবি। একদিকে ঘর্মাক্ত টিশার্ট, জকিং ট্রাউজার। খুটখাট শব্দ শুনে মুখটা ওয়াক-ইন-ক্লোজেটের বন্ধ দুয়ারে ফিরেছে। অমনেই খটাশ শব্দ! তাড়াতাড়ি নিজেকে আলমারির কাছে আনলো শাওলিন। দ্বার খুলে কাপড় নাড়াচাড়া করতে লাগল। পেছনে ঘরময় ঘুরছে চেনা পদক্ষেপ। তবু পিছু ঘুরল না। হঠাৎ আড়চোখে দেখল ডান দ্বারে শক্ত হাত, পাশ থেকে ধীরে ধীরে ওটা সরে যাচ্ছে, শাওলিন নিচের অধর কামড়ে স্থির থাকছিল, হঠাৎ ‘উহ..’ করে চোখ খিঁচিয়ে উঠল। দ্রুতবেগে ডানহাতটা ঠোঁটে চলে আসে। পাশ থেকে তখন চিন্তিত গলাটাও ছিঁটকে এসেছে,

– কী হয়েছে ? দেখি!

শাওলিন চোখ খোলেনি। ডানহাত সরিয়ে ঠোঁটের অবস্থা দেখল শোয়েব। পরখ দৃষ্টিতে বুঝল কাঁটাটা কাঁচা হয়েছে। রক্ত বেরোচ্ছে ভুরভুর করে। মেজাজটা সামান্য খারাপই হলো। ভ্রুঁতে ক্ষিপ্ত ভাব তুলে গরম স্বরে শাসালো,

– যখন জানোই কাল থেকে এ দুটো আমার, তখন কেন এখানে অত্যাচার করো?

বিস্ময়ে চোখের পাতা খুলল। ঈষৎ হাঁ হলো রক্তমাখা ঠোঁটদুটো। কথার অমন ভঙ্গিতে ওর ভ্রুঁ দুটো উপরে উঠতে উঠতে হতভম্ব অবস্থা। শোয়েব আলমারির ড্রয়ার খুলে তুলো বের করে। ছেঁড়া তুলোয় মুছে দিল রক্তটা। শাওলিন তখনো স্তব্ধ। হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে আছে। কী বলল আর কী ভয়ংকর ইঙ্গিত দিল, তাতে ঢোক গিলে ও। শোয়েব তুলোটা ফেলে দিয়ে বলল,

– আজ ছুটি নেয়া হলো। যদি বিকেলের ভেতর রেবাকে সিদ্ধান্ত জানাও, তাহলে কাল থেকে আগামী তেরোদিন ছুটি নেব।

শোয়েব সরে গেল। শাওলিন হাতমুখ মুছে ডান কাঁধে টাওয়েল রেখেছিল। ওর টাওয়েলটা টান দিয়ে গোসলে ঢুকে গেল শোয়েব।

.

তাহমিদ লাপাত্তা। খোঁজ নেই আজ সপ্তম দিন। ধানমন্ডির পরিবেশ খুব একটা সুস্থ নয়। আগামীকাল রেবেকা আসবে। বিয়ের সময় বাঁধা শর্ত ছিল, শাওলিনের ইচ্ছের ওপর মর্জি খাটাতে পারবে না শোয়েব। যদি ও ইচ্ছে করে পড়বে, ঢাকায় থাকবে, তবে সেই মতামত গ্রহণ করতে হবে। জোহরা খালেক রুটি বানিয়ে নাশতা টেবিলে রাখলেন। চোখ তুলে তাকান রেবেকার ভ্রুঁকুটি মুখে। কুটিল অভিব্যক্তিতে চোখমুখ কালো। রাগে রুটির ছেঁড়াটা খালি খালি চিবোচ্ছে। জোহরা গলা খাকারি দিয়ে চায়ের কাপ তুলে বললেন,

– রেবেকা,

ভ্রম ভেঙে তাকাল রেবেকা।

– জ্বি, আন্টি?

– কী নিয়ে অন্যমনষ্ক আছ? ওই ছেলেটার জন্য?

রেবেকা স্বীকার করল। সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,

– আমি যতটা ঠাণ্ডাভাবে সবকিছু সামলে রেখেছি, শোয়েব সেটা করবে না। আমার চিন্তাটা এদিকেই। ও উষ্কানিতে ওস্তাদ। মেয়েটাকে চালু বানিয়ে উলটো দিকে নাচাবে।

জোহরা খালেক গভীর চুমুক দিলেন। লেবু চায়ের টক-তেঁতো পানীয়টা গলাধঃকরণ করে বললেন,

– তোমার ভয়টা আসলে কোনদিকে? শোয়েব ওকে বদলে দেবে নাকি ওকে দিয়ে তোমাকে শায়েস্তা করাবে?

– দুটোই। পুরোনো পাপ পিছু ছাড়ে না। আমার একটাই ভুল, শাওলিনকে খুব ছোটো করে দেখা। প্রথমেই যদি বলে দিতাম, ঢাকায় পড়ার কোনো দরকার নেই। তাহলে ডানা দুটো গজাতো না।

জোহরা খালেক চুমুক দিতে গিয়ে থামলেন। চোখদুটো অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে স্থির করে বললেন,

– তুমি কী ওর ভালো চাও নাকি অন্যকিছু? মাঝে মাঝে তোমার কথা আর কাজে মিল থাকে না রেবা। মুখে বলছ ভালো, তাহলে ওর স্বামীর পুরোনো কেচ্ছা কেন শোনাতে চাও?

– ও আমাকে অপমান করেছে জানেন। আমাকে বলেছে আমি নাকি ভুল বুঝতে পারি না। আচ্ছা আমি কী ভুল করেছি? ওকে কী মদ্যপ নেশারুর কাছে তুলে দিয়েছি? নাকি ফকিন্নির ছেলের সাথে বিয়েটা দিয়েছি? আমাকে ওসব কথা বোঝাতে যায় কেন?

জোহরা খালেক এক দশক কাটিয়েছেন এ সংসারে। শাওলিনের নানা বাড়িতে কাজ করতো জোহরার খালা। খালার পরিবারে যৎসামান্য পড়ালেখায় নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন তিনি। সংসার জীবনের পাট স্বামীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কেটে গেছে। একটা পালক মেয়ে আছে। তাকে বিয়ে দিয়ে হাত ফাঁকা। জোহরা তার দিব্যজ্ঞানে রেবেকাকে সহ্য করছেন দুবেলা খাবার, মাথার ওপর ছাদ, নিরাপত্তা সবটুকুর জন্য। শহুরে জীবনে যাপন বা এ দেশে চলাচল আজও বিশ্ব মানদণ্ডে নিচু। জোহরা খালেক এক অপাঙক্তেয় খড়কুটোর মতো সহ্য করছেন সব। জোহরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কথাটা তুললেন,

– শোয়েবের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার সবটা জানা নেই। প্রায়ই দেখি তুমি ওর জীবন নিয়ে আলাদা একটা ইঙ্গিত দাও। তোমার জেঠা আর চাচা দুই পরিবারই দেখলাম বিশেষ একটা ঘাঁটায় না তাকে। এর পেছনে কী কারণ?

বলার মতো চমৎকার একটা প্রসঙ্গ পেয়ে রেবেকা চোখমুখ উজ্জ্বল করল। কারো অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতে একপ্রকার আনন্দ আছে। গোপন, অগোচর, অব্যক্ত, অপ্রকাশিত সবকিছু নিয়ে এক অদ্ভুত জ্ঞান রাখতে পছন্দ তার। প্রয়োজনে সেই জ্ঞান থেকে খোঁটা দিতে পৈশাচিক সুখ ভোগ হয়। রেবেকা রুটি চিবোতে চিবোতে গম্ভীরভাবে বলল, ভাবটা এমন যেন এসব নিয়ে ঘাঁটাতে ইচ্ছুক না।

– কাহিনির তো শেষ নেই। ঘটনা যদি একটা ঘটাতো, তাহলে চুপ থাকতাম। যেমনটা এতোগুলো দিন চুপ ছিলাম। কিন্তু মানুষটা বাটপার। যেমনটা দেখাচ্ছে, পুরো অভিনয়।

জোহরা আগ্রহী চোখে উৎসুক দেখালেন। ব্যাপারটা বুঝে রেবেকা আরো অনিচ্ছুক ভঙ্গি দেখাচ্ছে,

– যা হয়েছে, হয়েছে। এসব ঘেঁটে লাভ নেই। মানুষ তো আর এসব শুনে বিশ্বাস করবে না।

– বিশ্বাস পরে। আগে কী ঘটনা সেটা তো জানতে হবে। আমিও তো এতোদিন কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু বুঝেছি কিছু একটা গলদ। বলো। শোনা যাক।

– ওর বাবা,

– হ্যাঁ,

– খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমাদের বাড়িতে উনার নাম বলতে অজ্ঞান।

– আচ্ছা। কী করতেন ভদ্রলোক? শুনেছি প্রবাসেই ছিলেন।

– আমেরিকা সরকার ওর বাবাকে মূল্যবান চোখে দেখতো। এমনকি বাংলাদেশও।

প্রবল বিস্ময়ে কাপ ছলকে উঠল। জোহরা আশ্চর্য চোখে বাকি কথাটা শুনলেন,

– পেশায় একজন উঁচুদরের মানুষ ছিলেন। এমন একটা ফর্মুলা বানিয়েছিলেন, যার ওপর ওদের সাম্রাজ্য টিকে আছে। আপনি বোধহয় জানেন না, শোয়েব বাংলাদেশি না।

এ কথা শুনে জোহরা চিৎকার করে বলল,

– মানে!

চায়ের কাপটা সজোড়ে টেবিলে রাখলেন। অবিশ্বাস্য চোখে কিছু বলবে, তার আগেই রেবেকা কথার সেতু যোগ করল,

– শোয়েবের জন্ম নর্থ ড্যাকোটায়। আমেরিকা! ও পুরোপুরি বাঙালি না।

ঠিক তখনি জোহরা কিছু একটা মনে করতে পারলেন। হতবাক চোখে বিস্ময় নিয়ে বললেন,

– চোখ দুটো! ওর চোখদুটো নীল। এগুলো..

– হ্যাঁ। ওর চোখের রঙ। এগুলো ছাড়াও চুলের রঙে আলাদা ব্যাপার আছে। চুলটা পুরোপুরি কালো না, গাঢ় বাদামির মিশেল।

– ও বাংলা বলে কীভাবে? অনর্গল শুদ্ধ উচ্চারণ! জন্ম বিদেশে হলে এতোকিছু কীভাবে সম্ভব?

– এটা ওর যোগ্যতা। ভাষা, চলন, ব্যবহার খুব সহজেই আয়ত্ত করতে পারে। সামনে একটা ডেমো বসিয়ে দিবেন, হুবহু নকল করে দেখাবে। কথাটা অবশ্য তাহমিনা জেঠি বলতেন।

– তাহমিদের মা? ভদ্রমহিলা কী বড়ো ভাইয়ের ছেলেকে দেখতে পারতো না? ছেলেটার সঙ্গে তো তোমার জেঠিই সমস্যা করেছিল। বিয়ের প্রস্তাব…

আবারও বলতে দেয়া হলো না। রেবেকা মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,

– বিয়ের প্রস্তাবটা শোয়েবের জন্যই শুরু। তাহমিদের জন্য কখনোই ছিল না। কিন্তু আমি আসলে চাইনি প্রস্তাবটা শোয়েবের জন্য যাক।

জোহরা আগে থেকে এমনটা আন্দাজ করেছিলেন। কিন্তু মুখ ফসকে বলেননি। প্রথম কথা, বিয়ের আবহ শুরু হয় শোয়েবের জন্য। আর শেষও হয়েছে তাকে দিয়েই। তাহমিদ কখনোই ছিল না, উলটো সে অদ্ভুত ভাবে নিখোঁজ।

– ওর বাবা রিসার্চ কারিকুলামের জন্য নর্থ ড্যাকোটায় ছিলেন। কাজটা সরকারি। ইউএস সরাসরি তদারক করতো। শোয়েবের জন্ম ওখানেই একটা শহরে হয়।

– তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমি তো সবকিছু পরিপাটি দেখছি। তুমি বলছ..

রেবেকা চায়ের কাপটা নামাল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটল হাসি। হাসিটা মানুষ তখনই দেয়, যখন কারো পতনের গল্প বলতে যাচ্ছে।

.

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। পাহাড়ের গায়ে ধূসর মেঘের চাদর ঝুলে আছে। দূরের বনভূমি থেকে ভেজা মাটির গন্ধ এসে মিশছে বাড়ির বারান্দায়। রান্নাঘরের ভেতর গরম তাওয়ায় পরোটা পড়ার শব্দ উঠছে ছ্যাত ছ্যাত করে। শাওলিন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল ধীরে ধীরে। সাদা-হলুদ মিশ্রণে নরম একটা সুতি শাড়ি পরে আছে। ভেজা চুলের ডগা পিঠ ছুঁয়ে আছে এখনো। কিন্তু মুখের প্রশান্তিটা লুকানো গেলেও ঠোঁটের ডানপাশের ক্ষীণ কাটা দাগটা লুকানো গেল না। ও যতবার নিচের অধর ভেতরে টেনে রাখতে চাইছে, ততবার জায়গাটা জ্বালা করে উঠছে।

ডাইনিং স্পেসে পা রাখতেই ফাতিমা নাজ চোখ তুলে তাকালেন। ছোটো চাচি আরিফা একপলক দেখেই হাসি লুকোতে মুখ ঘুরান। সেই হাসিতে এমন এক রহস্য ছিল, যা দেখে শাওলিনের মুখ আরক্তিম। বুক ধক করে উঠল বেচারির। তাহিয়া চোরা হাসি দিয়ে বলল,

– ঘুম হয়েছে ছোটো বউ?

শাওলিন চমকে নিজেকে সামলে নিল। নতুন সম্বোধন যেন ওকে খোঁচানোর উদ্দেশ্যে বলছে।

– জ্বি, হয়েছে ভাবী।

– তাই নাকি? চোখদুটো তো অন্য কথা বলছে।

শাওলিন উত্তর দিল না। চুপচাপ চেয়ার টেনে বসেছে। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে অধরা গরম আলু ভাজি এনে টেবিলে রাখল। একপলক তাহিয়ার ইঙ্গিতটা দেখে শাওলিনের দিকে তাকাল সে। সঙ্গে সঙ্গে হাসিটা দিবে দ্রুত বেদম কাশিতে ঢাকল,

– ইয়ে… শাওলিন,

– জ্বি, ভাবী।

– আজ সেগুফতা ভাবী আর মিথিলা ভাবী আসছে।

অধরার কথায় দ্বিধা ফুটল চোখে। ফাতিমা পরোটা তুলে শুধালেন,

– তোমরা গতবার যে এসেছ, ঝর্ণা দেখেছ?

প্রশ্নটা শাওলিনকে করা। উত্তর দিবে এমন সময় নিচে নেমে এল শোয়েব। কানে ফোন, গতরাতের মতো থমথমে মুখে কথা শুনছে। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়তেই শাওলিনকে প্রত্যুত্তর করতে শুনল,

– ঝর্ণা দেখতে বাকিরা গিয়েছিল। দুর্ভাগ্য বশত ওদের সাথে বেরোইনি।

প্লেটে সেদ্ধ ডিম, পাউরুটি। ছুরিতে মাখন তুলে শোয়েব কল কাটল। এদিকে শাওলিনকে প্রশ্নটা করল অধরা,

– কেন? পানিতে নামোনি তুমি? তাহলে কোথায় ছিলে?

মাথা ঘুরিয়ে ডানে তাকাল শাওলিন। আসমানী রঙা শার্ট, চুলগুলো ভেজা। রৌদ্রের আলো সরাসরি চশমার কাঁচ ভিঙিয়ে চোখ ছুঁয়েছে। ওই ভঙ্গিতেই প্রত্যুত্তরটা দিল,

– রেসোর্টে ছিলাম। ওরা সবাই সাঁতারে দক্ষ। পানিতে নামা নিয়ে সমস্যা নেই। আমি অবশ্য সাঁতার পারি না। তাই ছোটো থেকেই দাদা পানি থেকে দূরে রাখতেন।

ওর বাঁ পাশ থেকে তাহিয়া তথ্যটা দিল। রুটি চিবোতে চিবোতে বলল,

– সুইমিং চ্যাম্পিয়নের পাশে বসে এ কথা বলছ?

– আপনি সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন?

– ইয়া আল্লাহ! আমি.. আমি না!

– তাহলে?

– দোতলার পাশের ঘরে যাওনি?

এবার বিষ্ময়ের পালা শাওলিনের। থমকানো চাহনিতে তাহিয়ার দিকে ভ্রুঁ কোঁচকাল,

– না। আমার ও ঘরটা দেখা হয়নি। কেন?

কথাটা শোনার পর তাহিয়া শোয়েবের দিকে তাকাল। বলবে কী? ও নির্বিকারে সেদ্ধ ডিম খাচ্ছে। একটা উদ্ভট ব্যাপার লক্ষ করল, পুরুষরা এসব অর্জনকে গর্ব করে বলে। মেডেল, ক্রেস্ট, সার্টিফিকেটে ভরিয়ে তোলে শোবার ঘর। প্রিয়তমা বা স্ত্রীকে বোঝায় সে কত যোগ্য। তাহিয়ার স্বামী তৌহিদ মির্জাও তো কম যায় না। এহেন কিছু নেই, শোপিসের মতো সাজিয়েছে। আরেকদিকে, একই বংশের ছোটো ভাই এসব নিয়ে চুপ। মনে মনে তাহিয়া অবাক সুরে বলছিল,

– আল্লাহ যাকে দেন, তাকে সবদিক দিয়েই ঢেলে দেন। অঢেল পেয়েও তার গলা উঁচু হয় না। আর যাকে দেন-ই অল্প, তার ভাবটা এমন, যেন পৃথিবীই পেয়ে গেছে। দর্পে পা মাটিতে পড়ে না।

টেবিলে একটা আলোচনার ঝড় উঠল। জাবের এসে ঘোষণা দিল খাগড়াছড়িতে এসেছে, ছোটো ভাইয়ের তদবিরে বন, জঙ্গল, পাহাড় চষে দেখবে না, এসব তো মানা যায় না। সে তৌহিদের কাঁধে জোরসে চাপড় মেরে ছোটো ভাইকে বলল,

– ফারশাদ, সব যাব। তোর দুটো চ্যালাকে খবর দে। জিপ দুটো লাগবে। হুড খোলা।

শোয়েব কফির মগে ঠোঁট রেখে তাকাল। কথাগুলো কাটকাট ভাবে বলল,

– রাফান আর পার্থ। একবারই বললাম। আরেকবার বলব না।

আরেকবার বলার প্রয়োজন ফুরাল। জাবের ফুঁ দেয়া মোমবাতির মতো হাসিমুখ নেভাল। তৌহিদ পরিবেশ ঠাণ্ডা করতে বলল,

– মায়াবিনী লেক, কী যেন নাম . . রাতের আঁধারে জায়গাটা নাকি দূর্দান্ত। ওখানেই যাব!

অধরার চোখ চকচক করে উঠল,

– সত্যি! পুরো ফ্যামিলি একসাথে গেলে দারুণ হবে। আমরা ক্যামেরা নিব!

তাহিয়াও উৎসাহে যোগ দিল,

– বাড়ি থেকে তাহলে সব গোছাই? সারাদিন ঘোরা হবে। রাতে খিচুড়ি, গান, আড্ডা, সব চলবে!

বড়োরা এ কথায় নীরব সম্মতি জানাল। সবচেয়ে উৎফুল্ল দেখাল সবিতাকে। ভদ্রমহিলা সেজেগুজে থাকতে ভালোবাসেন, উপলক্ষ পেলে তো কথাই নেই। ফাতিমা নাজ একটু চিন্তিত গলায় জানতে চাইলেন,

– অফিসার সাহেব, গতবার আপনার এলাকায় দুর্বৃত্তের হামলা হয়েছিল। এবার যদি নিরাপত্তা নিয়ে ঝামেলা হয়, এটা একেবারেই মানা যাবে না।

শোয়েব কফির মগ নামিয়ে তাকাল। চশমার ওপাশে চোখদুটো স্থির করে বলল,

– নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা নেই। দুর্বৃত্তরা গাড়ি চেনে। কেউ আগ বাড়িয়ে যম ডেকে আনবে না।

প্রত্যেকে আশ্বস্ত হলো এ কথায়। কিন্তু পরবর্তী কথার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। শোয়েব খুব স্বাভাবিক গলায় জানিয়ে উঠল,

– আমার কিছু কাজ আছে। বাড়িতে থাকব। আপনারা ঘুরে আসুন। অ্যারেঞ্জমেন্ট করে দিচ্ছি।

পাশ থেকে শাওলিন স্থির। চুপচাপ পরোটা ছিঁড়ে নামিয়ে রাখল। চোখ নত, কিন্তু কান খাড়া। বুকে ধুকপুক করছে কেন জানি। ছোটো চাচি এই প্রথম মৌণতা ভেঙে বললেন,

– ফারশাদ! বাবা, তুমি না গেলে কীভাবে হবে? বউ যে..

আরিফার দিকে শান্ত স্বরে বলল শোয়েব,

– শাওলিন যেতে চাইলে আপত্তি নেই। তাছাড়া ও অসুস্থ। কালরাতেও জ্বর এসেছিল। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব ভাবছি। যেতে চাইলে, যাক।

কথাটা বলেই কফির মগে চুমুক দিল শোয়েব। মিথ্যা মামলার আসামির মতো তাকাল শাওলিন। চোখদুটো আরেকটু হলে কোটর থেকে বের হয়ে যাবে! কী ডাহা মিথ্যা! ওর জ্বর কখন এল? ও তো কালরাতে. . ইয়া আল্লাহ, কী পরিষ্কার মিথ্যা বলছে। ডানে তাকিয়ে শাওলিন বাক হারালো তখন। শোয়েব ওর চাহনি দেখে বলল,

– তোমার শরীর তো পুরো ঠিক না। একটু আগেও বমি করে ভাসিয়েছ। রেবাকে বলে দিয়েছ, কাল চলে আসতে। এই অবস্থায় যেতে পারবে?

শাওলিন বোবা। ও কখন বলেছে? কলই তো দেয়নি! কথা কবে বলল! ওর বোবার মতো চাহনি দেখে ফাতিমা চিন্তিত হয়ে বললেন,

– ফারশাদ, কী হয়েছে খুলে বলো তো? ভোরে যে দেখলাম ও সুস্থ? ধপধপ করে দোতলায় উঠছিল!

শোয়েব নির্বিকার মুখে শান্ত। ব্যাপারটা দুই দুই চার করে কফিটা দূরে রেখে বলল,

– বমি করার জন্যই উঠছিল। নিচতলায় ওয়াশরুমে নেই।

শাওলিন নির্বাক হয়ে বলল,

– নেই?

– অফিস রুমে বাথরুম কোথায় পাও? জানালা দিয়ে?

এবার দাদিও মহা ধন্দে পড়ে গেছে। নাতবধূর চেহারা দেখে কী খুশিটাই ছিলেন, সেটা কর্পূরের মতো উবে গেল সহসা। না, ইহজন্মে প্রিয় নাতীর কোল ভরা দেখা হবে না। বৃদ্ধা চেয়ার ছেড়ে শাওলিনের কাছে এলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে নাতীকে শুধালেন,

– ও কী মাথা ঘুরে পরে গেছিল?

শোয়েব এবারও মিথ্যায় চম্পট দিয়ে বলল,

– হ্যাঁ। কিন্তু তুমি বুঝলে কীভাবে? পরে গিয়েই ঠোঁটটা কেটেছে। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়াটাই ঠিক না।

এবার ঠোঁট কাঁটার রহস্য আরো পাতলা। টেবিলে ছোটোরা মিচকি হেসেছিল, ভৃত্যরা দুষ্টুমি করছিল, আর বড়োরা কাঁচুমাচু চোখে ব্যাপারটা অগোচর করছিল। উভয় দলই এবার মাথাটা হেঁট করে নিল। এদিকে শাওলিন দুপাশে ধীরে ধীরে মাথা নাড়াচ্ছে। সবাই নিজেদের মাঝে বিভোর। শাওলিন মনে মনে সেরা শিক্ষাটা পেয়ে বলল,

– মিথ্যুক দেখেছি। এমন মিথ্যুক দেখিনি। কেমন বাটপার!

#নোটবার্তা — বিশাল পর্ব। তবে এটা এক অংশ। আরেকটা অংশ হবে। আজ লেখার সুযোগ এটুকুই। কাল দেবার কথা ছিল, অথচ ঘুম দিয়ে ভোর। অতঃপর আজ পরিপূর্ণ পর্ব এলো। কোথাও ঘোষণা দিইনি আজ আসবে। তবে পড়ে জানান কেমন লেগেছে। শুভ রাত্রি। ঘুম ছড়াক!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply