Golpo থ্রিলার গল্প বজ্রমেঘ

বজ্রমেঘ পর্ব ৩৫


পর্বসংখ্যা_৩৫ .

ফাবিয়াহ্_মমো .

থমথমে গলাটা শুনে শাওলিন চমকে পেছনে তাকায়। ভয় আর বিস্ময় একসাথে গ্রাস করল। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শোয়েব। চোখ দুটো স্থির। অস্বাভাবিকভাবে স্থির! একমুহূর্ত দেরি না করে শাওলিন বলে উঠল,

  • আপনি গর্ব করে বলছেন? লজ্জা করল না আপনার?

কপাল কুঁচকে গেছে। নিঃশ্বাসে রাগের প্রকোপ,

  • একটা মানুষকে শিক্ষা দিতে গিয়ে আপনি আমাকে ব্যবহার করলেন! আর এখন —

হাতের কাপটা এত শক্ত করে চেপে ধরেছে যে, আঙুল সাদা হয়ে যাচ্ছে। শাওলিন জেদি স্বরে বলল,

  • আমাকে ঘুটি বানিয়ে কী প্রমাণ করতে চান? ভেবেছেন আমি খুশি হব?

শোয়েব চুপ। বাঁ কাঁধ দেয়ালে ঠেকানো। ওর তেজি দৃশ্যটা বিশ্লেষণ করছে দুই চোখে। এই চুপটাই শাওলিনকে আরও ক্ষেপিয়ে তুলছে,

  • এটাকে প্রতিশোধ বলে না, অফিসার ফারশাদ! প্রতিশোধ বলে না।

এবার ঠোঁট কাঁপতে শুরু করেছে, কণ্ঠ কঠিন,

  • এটা শয়তানি! সাক্ষাৎ শয়তানিটা করলেন!

প্রায় চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষমুহুর্তে নিজেকে সামলাল শাওলিন। শোয়েব চাইলেই সমস্যাটা আলাদা করে মিটাতে পারতো। কিন্তু না, শাওলিনকে ব্যবহার করেই সবিতাকে অপমানটা করল সে। ঠিক সেই মুহুর্তে বুকের বাঁধন খুলে ফেলেছে শোয়েব। বলছিল ভারী সুরে,

  • কাল ক্ষতি হতে পারতো,

বলেই সপাটে সোজা হয়ে দাঁড়াল। রান্নাঘরের মেঝেতে দৃঢ় পদক্ষেপ ফেলে এগোচ্ছে সে,

  • সকালে ওই ফুলের ব্যবস্থা ফ্রিজেই করে রেখেছিলাম। যেন —

কণ্ঠ নির্বিকার, নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু চাহনি বরফ-শীতল,

  • যেন বাইরে যাওয়ার দরকার না হয়।

কথা ও কদম একসাথে চলছে। শাওলিন বুঝতে পারে আবারও বদ্ধ, কোণঠাসা হচ্ছে। সেই শাওয়ারের নিচে বদ্ধ বাথরুমে যা ঘটেছে, আবারও তা ধরা দিচ্ছে রান্নাঘরের ভেতর। দুম করে পেছাতেই কোমরে শীতল স্পর্শে দেয়াল ঠেকল। সেখানেই মূর্তি বেশে জমে গেল শাওলিন। ওর মুখোমুখি ভয়াল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেল শোয়েব। বাইরে থেকে কেউ দেখলে কেউ দেখবে না শাওলিনকে। ওর হাত থেকে কাঁচের কাঁপটা ছিনিয়ে পেছনের সিঙ্কে রাখে সে। কণ্ঠে নাটকীয় সুর ঢেলে হালকা চালে বলল,

  • আশ্চর্য হচ্ছি শাওলিন। তুমি আমার কাজে খুশি হবে, তা না, তুমি চোটপাট দেখালে। অন্য কেউ হলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতো। রান্নাঘরে কী করতো, বুঝে নাও শাওলিন।

চোখ শক্ত করে তাকাল শাওলিন। থরথর করে কাঁপছে থুতনি,

  • আমি অন্য কেউ না অফিসার ফারশাদ। যে এসব নোংরামিতে হাততালি দিবে। আমি শেহজানা আলম।

একমুহুর্ত থেমে জেদি সুরে বলল,

  • আপনি ভেবেছেন, চাচীকে শায়েস্তা করলে আমি খুশি হব! আপনাকে বাহবা দিব! কিন্তু আমার নজরে, আপনি আর চাচী দুজনই জঘণ্য! চলে যান আমার সামনে থেকে।

শোয়েব নিরব হয়ে থাকে। চোখ সরায় না ওর চোখদুটো থেকে। তার পন্থায় ভুল ছিল ঠিক। কিন্তু ওকে তো ছোটো করতে ওভাবে ঘটায়নি। হঠাৎ পেশিবহুল বুকে প্রচণ্ড চাপ খায় শোয়েব। চোখ ঝুঁকিয়ে দেখে, নরম দুই হাত তার প্রশস্ত বুকে পাঁচ আঙুলে প্রবল দূরে ঠেলছে। ক্ষোভের আগুনে বেজে উঠেছে রিনরিনে কণ্ঠ,

  • দূরে যান!

শাওলিন খেপে ওঠে বলল,

  • দূরে যান আপনি! আপনার হিসাব দূরে গিয়েই মেটান। নিজেই নিজের সম্মান নষ্ট করলেন! আর আশা করছেন আমি সম্মতি দিব!

রাগে, ক্ষোভে, চরম বিরক্তিতে শাওলিন চিড়বিড়িয়ে উঠল। একবার নজরও করল না, শোয়েবের চোখদুটো কেমন নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে। হাতের চাপ আরো প্রবল করবে, শোয়েব নিজেই দু পা সরে যায়। মাঝখানে ফাঁকা হতেই শাওলিন সামনে ঘুরে সিঙ্কের ট্যাপ ছাড়ে। খেপাটে হাতে ধুতে থাকে কাপ। পানি ছিঁটকায় চারপাশ। অনেকটা সময় পর পিছু ফিরে চায় শাওলিন। বিশাল রান্নাঘর ফাঁকা, কেউ নেই। কিন্তু কারো উপস্থিতি তখনো রয়ে গেছে, যেন দমবন্ধ করা ভারের মতো।

.

ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই বাড়িতে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। সবিতা আফরোজ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলছে না। আহসান বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে। মায়ের মুখ ফ্যাকাশে। কিছুক্ষণ হলো ঘুমিয়েছেন। খালিদ মির্জা যে ওষুধ দিয়েছেন তাতে কাজ হয়েছে। আহসান বুঝতে পারছে সমস্যা অন্য কোথাও। ফুড পয়জনিং বলে বিশ্বাস হয় না তার। আহসান ধীরে ধীরে ঘরটা ছেড়ে বেরোল। দোতলার সিঁড়ি ভেঙে করিডোর হাঁটতে থাকে সে। শোয়েবের দরজায় এলে বেকায়দায় হাতটা পড়ে তার। লোহার মৃদু আওয়াজে কিঞ্চিত ফাঁক হয় দরজা। ভেতরে উঁকি দিয়ে শোয়েব আছে কিনা দেখছিল আহসান। হঠাৎ বিছানায় চোখ আঁটকাল! চুম্বকের মতো বিঁধে যেতেই মুখে অদ্ভুত পরিবর্তন হলো। ধীরে ধীরে ভেতরে অনধিকার প্রবেশ করে আহসান। বিছানায় নারীসুলভ পোশাক, ছোটো মাপে, যা সেগুফতাও পড়ে। কিন্তু এগুলো ভারি সুন্দর। একটা কাপড় তুলে নেয় আহসান। নাকে বুলিয়ে গভীরভাবে ঘ্রাণ টেনে নেয়। চোখের পাতা ভীষণ ভার ভার, রসালো ঢোক গিলে আহসান। ‘উম..’ আরামদায়ক শব্দে শরীর কেঁপে উঠে, চোখের ক্যানভাসে ফুটে ওঠে মুখে না বলা এক দৃশ্য। উত্তেজনার তুঙ্গে উঠছে, হঠাৎ খুট করে ছিটকিনির শব্দ, চমকে সেদিকে তাকায় আহসান। তাড়াহুড়োয় কাপড়টা ফেলে বাইরে ছুটে পালায় সে। অমন সময় বাথরুম থেকে বের হয় শাওলিন। ভেজা চুল টাওয়েলে মুছতে ব্যস্ত। হঠাৎ থমকে গেল শাওলিন, কিছু একটা অস্বাভাবিক! মন বলছে, এখানে কেউ একজন ছিল। ভেতরে ভেতরে আঁচটা পেতেই বিছানায় ভ্রুঁ কুঁচকে ফেলল। কাপড়গুলো এলোমেলো! ঝট করে দরজার দিকে তাকাতেই আধখোলা দেখতে পেল। কে ভেতরে ঢুকেছিল? প্রশ্নটা মনে মনে করতেই ভ্রুঁ দুটো তখন সমান হয়ে গেল। ‘ বজ্জাত লোক! সে ছাড়া কে হবে? ‘ তবু মনের কোথাও যেন উত্তরটা সন্তুষ্টি দিল না। কিছু একটা পুরোপুরি মিলল না।

আহসান যখন শোয়েবের ঘর থেকে বের হচ্ছে, তখন দোতলায় উঠছিল অধরা। দৃশ্যটা দেখে ফেলে বিস্ফোরণ চোখে তাকাল।

‘ আহসান ভাই এদিকে… শাওলিন!’

কথাটা বলতে বলতে আহসান ছাদে উঠে গেছে। অধরা স্তম্ভিত হয়ে কতক্ষণ ওভাবে ছিল জানা নেই। যখন সম্বিত পেল দ্রুত দরজার কাছে গেল সে। দরজা চাপানো। এবার হয়ত ছিটকিনি দিয়েছে। আহসান ভাই ভেতরে কী করছিল? শাওলিন গোসলে ছিল, এই ফাঁকে কী… অধরার মন কাঁটা দিয়ে ওঠে। জলদি সেগুফতা ভাবী আসুক!

.

সন্ধ্যায় শোয়েব বাড়িতে ছিল না। জিপ নিয়ে ফর্মাল পোশাকে বেরিয়েছে। খালিদ মির্জা স্ক্র‍্যাচে ভর দিয়ে উচুঁ তাক থেকে বই নিতে চেষ্টা করছেন। পারছেন না। বাঁ হাঁটুর নিচ থেকে ঢলঢল করছে পাজামা। হঠাৎ পেছন থেকে নরম কণ্ঠে কেউ বলল,

  • আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

খালিদ ডান কাঁধ বরাবর পিছু তাকান। চোখ জুড়ানো রঙে মেয়েটা শাড়ি পরেছে। হালকা প্যাস্টেল শেডের শাড়ি, মোটা পাড়যুক্ত রূপালি রঙ, মাঝে সিঁথি কেটে পেছনে ছোট্ট একটি ব্যাণ্ডে কিছু চুল আঁটকে, পিঠময় লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দেয়া।

  • আপনি এখানে বসুন। আমি আপনার জন্য বইটা এনে দিচ্ছি।

দুহাতে একটি চেয়ার টেনে মেয়েটা বসতে অনুরোধ করছে। খালিদ এই প্রথমবার অন্যের সহমর্মিতায় ‘না’ বলতে পারলেন না। বগলে স্ক্যাচ চেপে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চেয়ারে বসলেন। মেয়েটা মাঝারি টুল টেনে নীটসের বইটা নামিয়ে আনল। ফুঁ দিয়ে ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,

  • Beyond good and evil.

খালিদ বুদ্ধিদীপ্ত চোখে মেয়েটাকে পরখ করে বললেন,

  • বই পড়ো?

মুখ তুলে না জানাল মেয়েটা। খালিদ স্ক্র‍্যাচ তুলে একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন,

  • ওই চেয়ারটা টেনে বসতে পারো।

মেয়েটা মুখোমুখি বসতেই খালিদ বইটার একটা পাতা খুললেন। চোখে রিডিং গ্লাস পড়ে খসখস পাতা উলটাতে বললেন,

  • নাম কী?
  • শাওলিন।
  • পুরো নাম?
  • শেহজানা আলম শাওলিন।

খালিদ শব্দবন্দি কালো অক্ষরে চোখ বুলাতেই বললেন,

  • তুমি শাওলিন অর্থ জানো?

কপালে খানিক কুঞ্চন পড়তে যাচ্ছিল। শাওলিন ইতস্তত চোখে জবাবটা দিল,

  • সবুজ বন।

ধপ করে বইটা বন্ধ করে তাকান খালিদ। ইন্টারভিউ নেয়া ব্যক্তিদের মতো দৃষ্টি করে শুধান,

  • আমি কী তোমার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে পারি?
  • জ্বি, চাচা।
  • তোমাকে ভরসা করতে পারি?
  • আমি তো জানি না আপনি কী ব্যাপারে ভরসা করতে চাচ্ছেন। কিন্তু কিছু জানালে সেগুলো আমার কাছে রাখব। তৃতীয় ব্যক্তি জানার সুযোগ থাকবে না।
  • ধন্যবাদ, শেহজানা। আমি তোমাকে শেহজানা ডাকব। তাহিয়ার পর তোমাকে বেশি ভালো লেগেছে।
  • কিন্তু আপনার সঙ্গে আজই আমার প্রথম কথা হলো।

খালিদ হালকা হেসে বললেন,

  • ফারশাদ কারো ব্যাপারে কিছু বলেনি, না? তুমি তো এখনো আমাদের চেনো না?
  • না।
  • মির্জা এন্টারপ্রাইজের নাম শুনেছ? কিছু বলেছে এই ব্যাপারে?

শাওলিন মুখ কালো করে বলল,

  • আমি জানি না। আপনার মনে হতে পারে, আজকের যুগে কে এতোটা নির্বোধ হবে যে স্বামীর কিছু জানবে না। আসলে, আমার জানার আগ্রহটা সীমিত। না কখনো জানতে ইচ্ছে হয়েছে, না জানার জন্য কাউকে চাপ দিয়েছি।
  • এমনটা কেন?
  • কাউকে জিজ্ঞেস করলে সে কতটুকু সত্য বলে?
  • তোমার কাছে কেউ সত্য বলে না?
  • আমি জানতে চাইলে বলে না। মানুষ সম্পূর্ণ সত্যি গোপন করে। কখনো আধ মেশানো সত্য, কখনো পুরোটাই মিথ্যা। আমি শেষেরটা নিতে পারি না। মিথ্যা। মিথ্যা আমার অপছন্দ।

খালিদ অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে একবুক গভীর শ্বাস ফেলেন। বইটার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ওটা টেবিলস্থ করে বলেন,

  • এই বংশে কন্যাসন্তান নেই, শেহজানা। বংশের উত্তরাধিকার বাইরে থেকে পাঁচজন। কিন্তু ভেতর থেকে একজনই।
  • কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটা উনার হয় কেন?
  • বনবিভাগ ফারশাদকে অন্ধ ভরসা করে কেন?

প্রশ্নটা শুনে আঁটকালো শাওলিন। ওর চাহনি দেখে খালিদ নিজেই উত্তর জুগালেন,

  • ফারশাদ সেই একমাত্র ব্যক্তি, যে এখানে অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম পেয়েছে। কেন?

শাওলিন থমথমে চোখে তাকাল। খালিদ দখিনের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিকেলের অপূর্ব আকাশটা দেখলেন। কমলা ও লালের মিশেলে অদ্ভুত মায়া ছড়ানো ওইখানে।

  • বনবিভাগ সেই জায়গা, যেখানে পাশ্ববর্তী দেশের চলাচল ঠিক হয়। এখানে পাশ করানো সেই অনুমতি, যা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে চোরাচালান, মাদক, মানুষ, গোপন কাজ অনুমোদন পায়।

ধীরে ধীরে মুখের অবস্থা পরিবর্তন হচ্ছিল শাওলিনের। প্রচণ্ড উদ্বেগ চোখে ছড়ালে বাকিটা শুনতে লাগল ও,

  • বাংলাদেশের প্রথম ট্রানজিট ছিল রামগড়ে। রামগড় স্থলবন্দর, যেটা এখন ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু-১ নামে পরিচিত। এর অবস্থান এই খাগড়াছড়িতে।

বিস্ময় ফুটে উঠল চোখে। শাওলিন কিছু প্রকাশের পূর্বে খালিদ আবারও বলে উঠেন,

  • এই বন্দর ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে যুক্ত। ভারত চেয়েছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তাদের ট্রানজিট চলবে। রামগড় স্থলবন্দর সেই পরিকল্পনার ফসল।

ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবী, সাদা পাজামা, এ যেন অন্য আরেক খালিদ মির্জা। এই পোশাককে ছদ্ম লাগছিল শাওলিনের। খালিদ বুকে হাত ভাঁজ করে রাশভারী সুরে বলেন,

  • এই জায়গাটাকে সতর্কভাবে সামলাতে হয়। কেউ চোখের বাইরে গেলে বদলে যেতে পারে। এখানে মদদ দেয়ার লোক প্রচুর। ফারশাদ এদেরকে মুঠির ভেতর রেখেছে। এই নিয়ন্ত্রণ এখনো বজায় আছে বলেই ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা স্বস্তিতে এখানে আসতে পারে।

শাওলিন ফট করে বলল,

  • যদি কখনো এই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যায়, অথবা এই মুঠি যদি আলগা হয় তখন? তখন কী হবে?

এবার চোখ নত করেন খালিদ। যেন বুকের ভেতর অজানা শঙ্কাকে চাপা দিতে এমনটা করলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃদু গলায় বলেন,

  • তখন ওই সমস্যাকে নির্মূল করা হবে। নির্মূল মানেই হত্যা করে ফেলা।

শিউরে উঠল শাওলিন। যেন চোখের সামনে মৃত্যুকেই দেখতে পেল। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো ওর স্বামী তাহমিদের চাইতেও ভয়ংকর পেশায় যুক্ত। যেখানে বনাঞ্চল দিয়ে সমস্ত প্রতিরোধ তিনি সামলে দিচ্ছেন নিরবে। দেশের জনগণ বুঝতেও পারবে না সীমান্তের ভেতর কী ভয়াবহতা চলছে। খালিদ নত দৃষ্টি তুলে শাওলিনের মুখে তাকান। অমন উদভ্রান্ত, ভীত চাহনি দেখে মৃদু হাসেন ভদ্রলোক।

  • যদি কখনো বোঝো ফারশাদ ব্যস্ত, বাড়িতে সময় দিতে পারছে না, রাগ কোরো না। নিজের আরাম ফেলে যারা অন্যের আরামে শ্রম দিচ্ছে, হতে পারে বিনিময়ে বেতন পাচ্ছে, কিন্তু এই বেতনের চাইতে বড়ো ধর্ম দেশপ্রেম। জন্মেছ এই দেশে, কিন্তু কেউ যদি এ দেশে আগ্রাসন চালায়? যদি তোমার মাটিকে ছিনিয়ে ওদের ভূমি বলে? কেমন লাগবে ওই কষ্টটা?

একটু থেমে গলায় ঢোক গিলেন খালিদ,

  • মানুষের মতো মানুষ সবাই হয় না। অল্প কজনই পারে। স্রষ্টা এই পৃথিবীতে মানুষকেই বেশি দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু মানুষ নিজের মূর্খামির কারণে অন্ধকার থাকছে।

টেবিল থেকে নীটশের বইটা তুলে নিলেন খালিদ। পাশ থেকে স্ক্র‍্যাচটা ঠিক করে বললেন,

  • ফারশাদ একজীবনে দুটো জিনিস শিখেছে। ছোটোলোক ছাগলদের বর্জন করা। বুলেটের ভাষায় মুখ বন্ধ করে দেয়া।

স্ক্র‍্যাচটা শক্ত করে চেপে উঠে দাঁড়ালেন খালিদ। বইটা বাঁহাতে চেপে হাঁটতে নিলে হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে উঠল,

  • চাচা,

খালিদ দাঁড়িয়ে পড়লেন সেখানেই। মাথা পিছু ঘুরানোর আগেই প্রশ্ন করল শাওলিন,

  • ক্যান্টনমেন্টের ঘুম উড়ানোর জন্য ক্যান্টনমেন্টের লোক হওয়া লাগে?

খালিদ বুদ্ধিতে জ্বলজ্বল চোখদুটো ওর দিকে ফেললেন। ঠোঁটে মৃদু হাসি। মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলেন,

  • ক্যান্টনমেন্টের ঘুম উড়ানোর জন্য উচিত কথা বলা লাগে। আর কিছু লাগে না।

এবার শাওলিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবয়স্ক, রহস্যময় লোকটা হাসি দিয়ে বললেন,

  • যেদিন দেখবে, তোমার উচিত কথায় কারো ঘুম উড়ে গেছে, সেদিন বুঝবে ঠিক পথে আছ। উচিত কথার ফলাফল-

আবারও হাসল রহস্যময় খালিদ। পা হীন জায়গাটা বাতাসে উড়ছে,

  • আশ-শাহাদাতু শারাফুন। “শহীদী মৃত্যু সম্মান।”

ঘুরে চলে গেলেন অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য খালিদ মির্জা। ২০১০ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলো, আবাস হিসেবে কারাবরণ, উপহার হিসেবে শাস্তি, নির্যাতন, পঙ্গুত্ব। পঙ্গুত্ব বরণের পর বইপড়া একমাত্র শখ হয়ে যায়। খালিদ মির্জা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গেলেন। কত ভঙ্গুর গল্প, কতটা পঙ্গুর মতো, কতটা না বলা দুঃখ উনার ভেতরে চাপা।

.

রাতে খাবার টেবিলের বজ্রাঘাত পড়ল শোয়েবের মাথায়। সে খাবার মুখে তুলেছিল, কিন্তু পরবর্তী লোকমা হাতেও তুলল না। ফাতিমা নাজ বৌভাত নিয়ে প্রসঙ্গ উঠালেন। ধীর গলায় বললেন,

  • বৌভাতের একটা তারিখ ঠিক করা দরকার।

কথাটা বাতাসে ভেসে থাকল কিছুক্ষণ। রোকেয়া, তাহিয়া, সবাই একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। আরিফা চুপ। শাওলিন নির্বিকার মুখে মাথা নিচু করে ভাত নাড়াচাড়া করছে। তৌফিক মির্জা গম্ভীর স্বরে বললেন,

  • কাল সেগুফতা, মিথিলা ফিরছে। কথা হয়েছে ওদের সাথে। তৌহিদকে পাঠিয়ে দিয়েছি ওদের আনার জন্য। এই সপ্তাহের ভেতর অনুষ্ঠান করলে সমস্যা দেখি না।

শোয়েবের চোখ সোজা ঘুরে গেল শাওলিনের দিকে। মাত্র এক সেকেন্ড থামাল সে। সেই দৃষ্টিতে ছিল ব্যগ্র-ব্যাকুল প্রশ্ন। “তুমি কী চাও শাওলিন? না করে দাও! নয়ত আমার ওপর বলো! ” ঠিক সেসময় শাওলিনকে প্রশ্নটা করলেন ফাতিমা নাজ,

  • রেবা, তারিখ জানতে চাচ্ছে। তোমার কোনো মতামত আছে শাওলিন?

শাওলিন দুবার মাথাটাকে ডানে-বামে নাড়াল। চোখদুটো ফাতিমার দিকে থাকলেও ওর আড়চোখ বুঝতে পারছে অস্বাভাবিক কিছুই।

  • আমার কোনো মতামত নেই দাদী।

শোয়েব ব্যগ্র হয়ে তাকাল ওর দিকে। শাওলিন নিজের মতো করে বলল,

  • আপনি সিদ্ধান্ত নিন। সেখানে পরশু বললে পরশু। আপনি যা ভাববেন, অসুবিধা নেই তাতে।

শোয়েব নির্বাক হয়ে গেল। একটা মন তখনো নিশ্চিত ছিল, শাওলিন তার কথা বলবে। এই সিদ্ধান্তটা শোয়েবকে নিতে বলবে। আর শোয়েব এই সুযোগে আঁটকে দেবে ওকে। কিন্তু কিছুই বলল না শাওলিন। সকালের রাগ এখানেও বুঝিয়ে দিল সে। শোয়েব মাথা নুয়ে ফেলল প্লেট বরাবর। নিজেকে প্রচণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে সে। রাগে হাতের উলটোপিঠে নীল শিরা ফুলে উঠেছিল। শাওলিন একবার যদি তাকাতো, ও দেখতে পেতো শোয়েব কিছুই খায়নি। আর একবারও মুখে তোলেনি খাবার। শাওলিন যখন তাকাতে নিবে, ঠিক তখনই শোয়েব প্লেটে হাত ঝাড়তে থাকে। শাওলিন শুধু দেখল একমাথা চুল আর চশমার রিমলেস ফ্রেম। বুঝল না কেন অতোটা ক্ষণ মাথা নিচু করে আছে। একটু পর ধড়াম করে চেয়ার পিছে ঠেলে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।

  • আপনারা শেষ করুন। আমাকে বেরুতে হবে।

টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে শোয়েব হন্তদন্তে চলে যাচ্ছে। পেছন থেকে তাহিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

  • কোথায় যাচ্ছ শোয়েব! কিছুই তো খেলে —

কথাগুলো বাতাসে ঝুলে থাকল। তাহিয়া একদৃষ্টে কপাল কুঁচকে দেখল, জিপটা নিয়ে চলে যাচ্ছে। রাগ, জেদ, হতাশা সমস্তই টায়ারে যেন ঘর্ষণ তুলে দিল। তীব্র ধূলোয় ঝড়ে নেমপ্লেট ঢাকা পড়ল।

শাওলিন বাঁয়ে তাকিয়ে দূরবর্তী গেটে লাল হেডলাইট দুটো ঝাপসা হতে দেখল। ক্রমশ রাত্রির আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছিল গাড়িটা। মুখ ফিরিয়ে খাবারে মনোযোগ দিল শাওলিন। আস্ত রসুন কোয়ার সাথে ঝাল ঝাল শুটকির ভুনাটা ওর পছন্দের পদ। আজ লোকমাটা মাখাতে পারল না ও। ভাত নাড়াতে গিয়ে থমকে গেল আঙুল। ডান চোখের কোণ দিয়ে দেখল, ওই প্লেটটা আঁছোয়া। কিছুই মুখে দেয়নি সে। পানির গ্লাসটা তখনো টইটুম্বর ভরে আছে।

.

‘ আমার কোনো মতামত নেই ’

এই একটা কথাই ভনভন করে মাথার ভেতর বেজে চলেছে। স্টিয়ারিংটা শক্ত হাতে ধরে ড্রাইভ করছে শোয়েব। রাতের আঁধার ঘুটঘুটে, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে শোঁ শোঁ করে চলছে জিপ। ‘ আপনি ভেবেছেন চাচীকে শায়েস্তা করলে খুশি হব? ‘ আবার কথাগুলো মনে পড়ল তার। শোয়েব চোখ বুজে আবার তাকাল রাস্তায়। মন শান্ত হচ্ছে না। অস্থির লাগছে। ছটফট হচ্ছে তার। এমন সময় ড্যাশবোর্ডের ওপর আলোটা অন-অফ হলো। ফোন আসার সংকেত! শোয়েব স্টিয়ারিং সামলে ফোনটা রিসিভ করল।

  • মিস্টার ফারশাদ! স্যার, আমি দুঃখিত। আপনাকে বিরক্ত করার একদমই ইচ্ছে ছিল না।

কলের ওপাশ থেকে মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠ এল। কোম্পানির রাশিয়ান শাখার এজেন্ট। সুন্দর মুখ, নির্মেদ দেহ, সংক্ষিপ্ত পোশাকে নিজেকে ধারালো রাখে নাতালিয়া।

  • স্যার, আমি জানতাম না সরাসরি কলটা আপনার কাছে সংযোগ পাবে। আমি রোডিওন স্যারকে অনেকবার কল করতে চেষ্টা করেছি। রোডিওন স্যার রিচ করেননি।
  • বর্ণনা ছাড়ো। রোডিওন এখন কোথায়? কল ধরছে না কেন?

নাতালিয়া আমতা আমতা সুরে বলল,

  • স্যার, মিস্টার রোডিওন কোথায় গেছে বলে যায়নি। তাকে দুদিন ধরে অফিসে দেখছি না। এখানে কিছু ঝামেলা হয়েছে স্যার।
  • কেমন ঝামেলা? জাবেরকে ইনফর্ম করা হয়েছে?
  • জাবের স্যার এই ঝামেলাটা আপনাকে দেখে দিতে বলেছেন। আপনি যদি একটু রাতের দিকে…

নাতালিয়া দ্বিধাপূর্ণ কণ্ঠে থামে। শোয়েব ভাবলেশহীন সুরে বলল,

  • রাত কয়টা?
  • মিস্টার ফারশাদ, আপনি যদি বাংলাদেশ সময় রাত দুটোর দিকে দেখেন. . আপনি একটু দেখলেই হয়ে যাবে।
  • হবে কিনা জানি না, কিন্তু রোডিওন না এলে চিরদিনের মতো চাকরিটা হারাবে। ওকে খুঁজে বের করো যেভাবেই হোক।

শোয়েবের কণ্ঠে কঠোরতা পেয়ে সোজা হয় যায় নাতালিয়া।

  • স্যার, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

কলটা কেটে দিল শোয়েব। জিপটা ইউটার্ণ ঘুরিয়ে বাড়ির পথ ধরল। রাত নটার কাছাকাছি। বাংলোর দোতলায় নিজের ফোন ঘাঁটছিল শাওলিন। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ নেই। ছুটির জন্য একটা অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়েছিল। কাজটা শ্রেষ্ঠার ক্ষমতায় মঞ্জুর হয়ে গেছে। সেই ফাইলটাই চেক করছিল শাওলিন। এমন সময় নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে গেল। দোতলার চেয়ে নিচতলায় কিছুটা ভালো নেটওয়ার্ক। ব্যাপারটা মনে হতেই দুয়ার খুলে বাইরে বেরোয় শাওলিন। নিচতলায় সবাই ঘরে। সিঁড়ি ভেঙে অফিস ঘরের দরজা ঠেলতেই হঠাৎ কপাল কুঁকড়াতে লাগল। কী হচ্ছে? এখানে মনিটরটা চালু কে করল? শোয়েবের ডেষ্কের ওপর কম্পিউটার সেট আপ। আপনা আপনি প্রসেসিং হচ্ছে মনিটর স্ক্রিনে। শাওলিন ভেতরে ঢুকে রিভলবিং চেয়ারে চলে আসলো। মনিটরের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালে কিছুই বুঝতে পারল না। লেখাগুলো কী? রিভলবিং চেয়ারে বসে কাছে ঝুঁকল শাওলিন। মনিটরে দেখল, একের পর এক ফাইল জমা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট। প্রত্যেকটার ওপর ছোটো করে লেখা –

MIRZA ENTERPRISES — INTERNATIONAL HOLDINGS

হঠাৎ একটা লাইন চোখে আঁটকে গেল। “Authorized under Shoyeb Farshad Mirza clearance.”

মাউস নাড়িয়ে একটা জায়গায় ক্লিক করল শাওলিন। স্ক্রিনে ফাইলটা খুলে গেল। একটার পর একটা লাইন, কোড, রিপোর্ট, ইংরেজি টার্ম . .
চোখ বুলাল শাওলিন। ভ্রুঁ কুঁচকে গেল ধীরে ধীরে।

“Transit . . clearance . . mapping…?”

কিছুই পরিষ্কার হচ্ছে না। শব্দগুলো আলাদা আলাদা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু একসাথে বসালে অর্থ দাঁড়াচ্ছে না। স্ক্রল করল আরেকটু নিচে। সংখ্যা, তারিখ, লোকেশন। সবকিছুই যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওর কাছে এগুলো অর্থহীন। শাওলিন ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

  • এগুলো কী?

ঠিক তখনই শুনল, ধপ, ধপ, ধপ। করিডোরে কারো পায়ের শব্দ। শাওলিন থমকে গেল হঠাৎ। হৃদস্পন্দন আচমকা বেড়ে উঠল। কেউ আসছে!
চোখ একঝলকে দরজার দিকে গেল, তারপর আবার স্ক্রিনে। বের হয়ে যাবে? নাকি . . না! মাথার ভেতর দ্রুত সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে ও। ফাইলটা যাই হোক, গুরুত্বপূর্ণ। ছেড়ে আসা যাবে না। ওই মুহূর্তেই মাউস ছেড়ে কিবোর্ডে হাত চালাল। দ্রুত কয়েকটা ক্লিক করল শাওলিন।

Copy .
Transfer .
Send to device .

ফোনটা ডেস্কের পাশে ছিল। কাঁপা হাতে ঝটকায় তুলে নিল। স্ক্রিনে ব্লুটুথ ট্রান্সফারের ছোট্ট আইকন জ্বলছে।

Transferring.. 32%

পায়ের শব্দ আরও কাছে। শাওলিনের গলা শুকিয়ে আসছে। এখন স্ক্রিনে.. 57%

শাওলিন নিঃশ্বাস আটকে রাখল.. 81%

দরজার বাইরে একটা ছায়া পড়েছে। শাওলিন বিস্ফোরিত চোখে দেখল। আঙুল কাঁপছে থরথরিয়ে। স্ক্রিনে তাকাল শাওলিন।

100% — Transfer Complete .

এক মুহূর্ত দেরি না করে ফাইলটা ক্লোজ করে দিল। স্ক্রিন আগের মতো সাধারণ অবস্থায় ফিরে গেল। ফোনটা দ্রুত নিজের পাশে নামিয়ে রাখল ও। ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে থামল ছায়াটা। শাওলিন ধীরে ধীরে মাথাটা তুলে তাকায়। করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে . . আহসান। চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি জড়ানো। যেন কিছু খুঁজছে সে। দুজনের চাহনি বিদ্ধ হলো একসময়। সময় কাটল . . এক সেকেণ্ড, দুই সেকেণ্ড, হঠাৎ আহসান ওই দৃষ্টির কাছ থেকে নিজেই দৃষ্টি সরালো। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বলল,

  • এই সময় এখানে? কোনো দরকার?

কণ্ঠটা স্বাভাবিক, কিন্তু অস্বস্তিকর ভঙ্গির। শাওলিন নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,

  • নেটওয়ার্ক নিচে ভালো . . তাই –

কথা শেষ করতে পারল না। শাওলিন দেখতে পেল আহসান আরেকটু কাছে এগিয়ে আসে। কণ্ঠে আন্তরিক সুর ঢেলে বলল,

  • ফারশাদ নেই? সে কোথায়? তাকে একটু দরকার ছিল।

আহসানের তীক্ষ্ম চোখ একবার ডেস্ক, একবার কম্পিউটার, তারপর শাওলিনের মুখে বিদ্ধ হলো। কী যেন দেখে হঠাৎ বলল,

  • কিছু খুঁজছিলে?

শাওলিন জমে গেল। সর্বনাশ! ওর কিছু কী ধরে ফেলেছে নাকি? দ্রুত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

  • না। আমি একটা কাজে এসেছিলাম। একটা মেইল পাঠাব, তাই ডেস্কটপটা ব্যবহার করছিলাম।

আহসানের চোখ ওর প্যাস্টেল শাড়িতে পরল। সাদা ব্লাউজ, ওই শাড়িটার সাথে অদ্ভুত মানিয়ে গেছে। মেয়েটাকে অল্প আলোতে দেখাচ্ছে অদ্ভুত ভুবনমোহিনী রূপে। আহসান মুগ্ধ নয়নে ওর পা থেকে দৃষ্টি বুলাবে, হঠাৎ ধপ করে উঠল। জীপের দরজা খোলার বিকট স্বর! হ্যাঁ, চিনতে ভুল হয় না। বড়ো বড়ো পা ফেলে কয়েক সেকেণ্ডেই যেন মূর্তিমান ভয়টা উপস্থিত হয়ে গেল। বজ্র গলায় প্রশ্নটা বাতাস মুখর করছে,

  • এদিকে কী করছ আহসান?

স্ত্রীর সামনে নাম ধরেই ডাকল শোয়েব। আহসান চমকে পিছু তাকায়। দরজার ফ্রেমে সুউচ্চ মূর্তি। ডান ভ্রুঁটা কাঁটা দাগ সহ উঁচুতে তোলা।

  • তুই এসে গেছিস?

সম্বোধন বদলে ‘তুই’তে নামল আহসান। গলায় হালকা হাসি। কোনো প্রত্যুত্তর দেয় না শোয়েব। শীতল চোখ ভেদ করছে শাওলিনকে। শাওলিন ওই প্রখর দৃষ্টির সামনে জবুথবু। শোয়েব সোজা হাঁটতে হাঁটতে ভেতর ঢুকল। তার উপস্থিতি বুঝেই যেন ঘরের বাতাস, মনিটর, সিপিইউ সিস্টেম বন্ধ হয়ে গেছে। শাওলিন ফোন হাতে চুপচাপ আহসানকে পাশ কাটিয়ে এল। শোয়েবের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল বাইরে। আহসান পকেটে দুহাত পুরে ঘটনাটা দেখছিল। হালকা কৌতুক মেশানো কণ্ঠে বলল,

  • মনে হচ্ছে তোর সময় ভালো যাচ্ছে না। চাইলে বড়ো ভাইয়ের সাথে খুলে বলতে পারিস।

শোয়েব এবার সোজাসুজি তাকাল। ছুরির মতো কেটে কথাটা বলল,

  • এটা তোমার জায়গা না, আহসান। সীমা বুঝে চলো।

আহসান হেসে ফেলল। তেরছা কণ্ঠে বলল,

  • তোর অতিথি তো আমি। সম্মানটা তো নিশ্চয়ই দিবি।

শোয়েব চোখের পলক ফেলছে না। চাহনিটা দেখেই মুখের অবস্থার পরিবর্তন ঘটল তার। আহসান হো হো করে হেসে রসিকতার সুরে বলল,

  • রিল্যাক্স কাজিন। একটু বেশি বুঝছিস। এদিকে এমনিতেই হাঁটাহাঁটি করছিলাম। তোর বউ দেখলাম কম্পিউটারের সামনে বসে ঘাঁটছে। কী করেছে . . ওসব ঠিক জানি না।

শোয়েব একঝলক মনিটরে, মাউসে, ডেস্কে নজর বুলিয়ে দেখল। আপাত চোখে কিছু ধরা পড়ল না। আহসান হাসি দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল। ফাঁকা অফিস রুমে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখল শোয়েব। মনে মনে বলছে, “তুমি কী দেখেছ, শাওলিন? এখানে একটু আগে কী করেছ?”

অন্যদিকে বাথরুম লক করেছে শাওলিন। ফোল্ডারটা আরেক জায়গায় ফরোয়ার্ড করে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। এই ফোল্ডারটা এখানে দেখা যাবে না। ঢাকায় দেখতে হবে। শোয়েব ফারশাদ মির্জা কীভাবে এই ব্যবসা চালাচ্ছে? এই ইন্টারন্যাশনাল সোর্স কীভাবে এদেশে লাগছে? আশা করা যায়, এটা অস্ত্র বিষয়ক না। এমনটা না হোক। সে ব্যবসায়ী হোক, উদ্যোক্তা হোক, যা খুশি হোক, শাওলিন কিছুতেই ক্ষুণ্ণ হবে না। শুধু ভয়ানক কিছুর শামিল না হোক … নির্দয় কিছুর!

FABIYAH_MOMO .

নোটবার্তা :

দেরির জন্য দুঃখিত।
ভয়, দূরত্ব, প্রশ্নে দেহ-মন ছমছম করুক! 🖤

শব্দসংখ্যা ৩২০০+ ।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply