Golpo romantic golpo প্রিয়তার পূর্ণতা

প্রিয়তার পূর্ণতা পর্ব ১৬


Nadia_Afrin

১৬
কাকডাকা ভোরে ফোনে কল এলো আমার।
ঘুমঘুম চোখে তাকালাম স্ক্রিনে।রিপা কল করেছে।সঙ্গে টেক্সটও।নিচে আসতে বলছে।
উঠতে চেষ্টা করলাম।কিছুর সঙ্গে টান লেগে আবারো ধপ করে শুয়ে পড়লাম।প্রলয় শুয়ে আছে আমায় ধরে।ওর একহাত আমার পেটের ওপরে। অসাবধানতাবশত কামিজ উঠে গেছে কিছুটা। ফলস্বরুপ প্রলয়ের হাত আমার উন্মুক্ত পেটে।শক্ত হাত ওর।
মূহুর্ত্তেই শরীর যেন অসাঢ় হয়ে এলো।কথা বলার শক্তিটুকু যেন হারিয়ে ফেলেছি।
ওর দিকে তাকালাম।লোকটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিষ্পাপ লাগছে।ওর এলোমেলো চুলগুলো কপাল ছেয়ে আছে।লালচে বর্ণের চুল ওর।খুব ইচ্ছে হচ্ছে ছুয়ে দেখতে।
দৃষ্টি গেল ওর ঠোঁটের দিকে।লোকটা সিগারেট খেলেও ঠোঁটটা ওতো বেশি কালো নয়।
উনার চোখের পাপড়ি প্রচুর।মেয়েদের এক্সট্রা আইল‍্যাশের মতো।
প্রলয়ের স্কিনটোন ভীষণ স্মুদ।কোনো খাঁদ নেই।
চকচকে,তেলতেলে।দাড়ি আছে অল্প।এই শেইপটা আমার পছন্দ।
আজ এই প্রথমবার তাকে এতো খুঁটিয়ে দেখছি আমি।জানিনা কী হয়েছে আমার।কেন করছি এমন বেহায়াপনা।
তবে ভালো লাগছে।
আনমনেই প্রলয়ের এলোমেলো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিলাম।
আমার স্পর্শে ঘুম ভাঙে তার।ঘাবড়ে যাই আমি।হাত সরিয়ে নেই।প্রলয় ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে আমার দিকে।কয়েকপল সময় নিয়ে নিজেকে ঠিক করে ওর হাতের দিকে তাকায়।
মূহুর্ত্তেই লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে বেচারা।হাত সরিয়ে নিয়ে এক লাফে বিছানা ছেড়ে বলল,”স‍্যরি স‍্যরি।ঘুমের ঘোরে ভুল হয়ে গেছে।”

আমি কিছু না বলে বিছানা ছাড়লাম।জামা ঠিক করলাম।গায়ে ওরনা নেই মনে পড়তেই ওপাশ ফিরলাম।প্রলয় বুঝতে পেরে মেঝে থেকে ওরনা কুড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিল।
ওরনাটা গায়ে জড়িয়ে দ্রুতই বের হলাম ঘর ছেড়ে।
বের হতেই দেখি রিপা নখে নেইলপলিশ করছে।
আমায় নিচে নামতে দেখে বলল,”রান্নাটা বসাও ভাবি।”

বললাম,”সঙ্গে চলো আমার।আমি রান্না করলে তুমি হেল্প করবে।”

ও নাক ছিটকে বলল,”পারবোনা।”

আমিও ওর পাশে বসে নেইলপলিশের এক লেয়ার নখে দিয়ে বললাম,”তাহলে সবাই না খেয়ে থাকতে হবে।কারণ আমি একাতো সব করতে পারবোনা।
এছাড়াও আজ আমার একটু বাইরে যাওয়ার প্ল‍্যান আছে।”

রিপা ফট করে বলল,”কোথায় যাবে?”

“কাজিনের বিয়ে।তো ওর জন্য অর্নামেন্ট কিনতে যাবো।”

রিপা আবারো বলল,”তোহ তোমার কেন যেতে হবে সংসার ফেলে?”

“সেটা কী তোমায় বলতে হবে?তুমি কী আমার শশুর বাড়ির কর্তা নাকি?”

রিপা অবাক হলো আমার কথায়।তবুও বলল,”কর্তা না হলেও আমি তোমার শশুর বাড়ির লোক তো।কোথাও যেতে হলে অবশ্যই আমার পারমিশন নিতে হবে।”

উপহাসের স্বরে বললাম,”ওহ রিয়েলি?তোমার পারমিশন আমায় নিতে হবে?
ভুলে যেও না আমি তোমার বড়ো ভাবি।আমায় মেনে চলা তোমার দায়িত্ব।
সুতরাং তুমি বরং আমার ব‍্যক্তিগত বিষয়ে নাক না গলিয়ে নিজের চর্কায় তেল দাও।”

ও বাবা!
আমার বলতে দেরি নেই,রিপা সাট করে মেঝেতে ঢোলে পড়লো।পড়ার আগে মা বলে চিৎকারও দিল।
মা ওপর থেকে এলেন সঙ্গে সঙ্গে।
সুমা আপুও দৌড়ে এলো।প্রলয় শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে নিচে এলো।
কবির ভাই ছেলেকে কোলে নিয়ে এলো।
মা হাই-হুতাশ করে বলতে লাগলো,”কী হলো গো আমার মেয়ের!
আমার এ কী সর্বনাশ হলো?
আমি আর বাঁচবোনা গো মেয়ের কিছু হলে।”

প্রলয় গ্লাসে পানি এনে রিপার মুখে ছিটিয়ে আমায় প্রশ্ন করলো ওর হঠাৎ কী হলো।

আমি মাথা নেড়ে বললাম কিছু জানিনা আমি।

মা বললেন,”নিশ্চয় এই মেয়ে আমার মেয়েকে কিছু করেছে।নাহলে আমার সুস্থ মেয়ে এভাবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায়?”

“অদ্ভুত!আমি কী করবো আপনার মেয়েকে?
ও কী ছোট বাচ্চা নাকি!”

বাড়িতে হুলস্থুল কান্ড শুরু হলো।
বাড়ির পাশেই একটা ফার্মেসি আছে।সেখান থেকেই একজন অভিজ্ঞ লোককে ডেকে আনলো প্রথমে।
উনার সঙ্গে কথা বলল কোন হাসপাতালে নিলে ভালো হবে বা ডাক্তার পাওয়া যাবে এখন।
মানে খুব সকাল তো এজন্য।
ঐ লোকটা আবার হাসপাতালে চাকরি করে।

তো উনি বলল উনি নিজেই ঠিক করতে পারবে।
রিপাকে সোফায় শোয়ানো হলো।
উনি শুধু মাত্র রিপার গালে হালকা থাপ্পড় দিল।
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা তাকালো দেখলাম।মাথা ধরে উঠে বসে বলল,”আমি কোথায়?”

মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,”তুই আমার কাছেই মা।কী হয়েছে তোর মা?
প্রিয়তা কী করেছে তোর সঙ্গে?”

রিপাকে দেখলাম আমার দিকে কিছুপল তাকিয়ে থেকে ফ‍্যাক করে কেঁদে উঠে বলল,”ভাবির অপমান আমি সহ‍্য করতে পারিনি।মাথা ঘুরে গেছে আমার।”

মা বলল,”দেখেছিস প্রলয়!তোর বউই বলেছে কিছু।
কী বলেছে বল মা।”

আমায় কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রিপা সব কথা বলতে লাগলো এক নাগারে।সঙ্গে কান্না আর নাক টানা তো আছেই।

বললাম,”তাই একথাতেই তুমি জ্ঞান হারাবে?
এটা কোনো কথা?”

সেই লোকটা কিছু বলার আগেই রিপা বলল,”ভাবির কথা শুনে আমার প্রেশার হাই হয়ে গেছিলো।স্টোক করে ফেলতাম আমি।লক্ষণ চলে এসেছিল।”

মানে ডাক্তারদের কিছু বলতে হবেনা।ও নিজেই বড়ো ডাক্তার।
বললাম,”নাটকটা কম করো রিপা।সাধারণ একটা বিষয় নিয়ে এতো কিছু ঘটিয়ে ফেলছো?”

রিপা উত্তেজিত হয়ে বলল,”নাটক করছি মানে?
তুমি আমার সঙ্গে খারাপ ব‍্যবহার করোনি?”

শুরু হলো কান্না।মায়ের দোষারোপও শুরু হলো।তিন মা-মেয়ে মিলে যেন ম”রার বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে।কান্না আহাজারিতে টেকার উপায় নেই।
প্রলয় কোনো মতে সেই লোকটাকে বিদায় দিয়ে কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলল,”তুই তো দেখছি মায়ের চেয়েও বেশি নাটকবাজ।
অভিনয়ে ফার্স্ট ক্লাস।”

কবির ভাই বলল,”সামান‍্য ভাবির কথাতেই হাই প্রেশার হয়ে যাচ্ছে রিপার।যখন স্বামীর বাড়ি যাবে,আশপাশের লোকের কটু কথা শুনবে,তখন কী করবে?”

মা ঝাঁঝালো স্বরে বলল,”তখনকারটা তখন দেখা যাবে।”

আমি আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেলাম।
এদের সঙ্গে মুখ নাড়িয়ে লাভ নেই।এরা বোঝার নয়।
ওপরে গিয়ে বসে রইলাম।প্রলয় এলো।রেডি হতে হতে বলল,”আপনি নাকি কোথায় যাবেন?”

“হ‍্যা।কাজিনের সঙ্গে বের হবো।ও শপিং করবে।
যাবো কী?”

“নিশ্চয়।”

নিচ থেকে প্রলয়ের জন্য ফল সহ ব্রেড, জ‍্যাম,ডিম নিয়ে এসেছি ব্রেকফাস্টে।
প্রলয় খাবারের থালা হাতে নিয়ে ডিমটা আমায় খাইয়ে দিল জোর করেই।
খেয়ে সরে আসতে নিলে হাত টেনে পাশে বসায়।
ফল খেতে বলে।এদিকে ফল আমার একদমই পছন্দ নয়।নিষেধ করলে চোখ রাঙিয়ে বলে,”চুপচাপ খেয়ে নিন। হেলদি খেতে হবে।আপনি উইক আছেন এখনো।চোখ-মুখ কেমন বসে গেছে।”

জোর করেই মুখে ফল তুলে দিচ্ছে।
না খেলে ভয় দেখাচ্ছে।ভয়ে ভয়েই খেয়ে নিলাম আমি।
প্রলয় তেমন খেলো না।অমনি চলে গেল।
বলে গেল সকাল সকাল বের হতে।

আমি আমার মতো তৈরি হয়ে নিচে এলাম।
কাজিন কল করছে বারবার।
নিচে এসে দেখি সুমা আপু রাধছে আর তার স্বামীকে গালি দিচ্ছে রীতিমতো।সে ই নাকি আপুকে জোর করে কিচেনে রেখে গেছে রাধতে।
আমি চুপচাপ বেড়িয়ে গেলাম।বের হওয়া মাত্র ড্রাইভার বেড়িয়ে এসে বলল,”চলুন ম‍্যাম।
আপনি যেখানে যাবেন রেখে আসছি।স‍্যার আপনাকে ড্রপ করে দিতে বলে গেছে।”

গাড়িতে উঠে বসলাম।লোকটার সবদিকে খেয়াল আছে।
ফোনে টুং করে সাউন্ড এলো।আমার বিকাশে কেউ বিশ হাজার টাকা পাঠিয়েছে।
বিষ্ময়ে চোখ বেড়িয়ে আসার উপক্রম।
তখনই কল এলো প্রলয়ের।বলল,”টাকা পেয়েছেন?”

অবাক হয়ে বললাম,”আপনি দিয়েছেন টাকা?
কিন্তু কেন দিলেন?”

“কাজিনের সঙ্গে শপিং এ যাচ্ছেন খালি হাতে ঘুরবেন না নিশ্চয়।মলে মেয়েদের খালি হাত মানায় না শপিং ব‍্যাগ ছাড়া।
এজন‍্য দিলাম।কিনে নেবেন কিছু। আরো লাগলে বলবেন।”

আমতা আমতা করে বললাম,” টাকা আমার এ‍্যাকাউন্ট থেকে উঠিয়ে নিতাম অথবা বাবার থেকে নিয়ে নিতাম।”

“লজ্জা করেনা বিয়ের পরও বাবার ঘাড় ভাঙিয়ে খেতে?
এই আপনার মতো কিছু মেয়ের আশকারায় কতো কাপুরুষ বউকে নির্যাতন করে বাপের বাড়ি পাঠায় যৌতুক চাইতে।
আপনার স্বামীর অবস্থা ততোটাও খারাপ নয় যে সামান্য শপিং এর টাকাটাই আপনাকে দিতে পারবেনা।
এমন শপিং আপনি মাসে দু-তিনবার করলেও আমার অভাব দেখা দেবেনা।
সুতরাং নিচু মন-মানসিকতা বদলান।”

প্রলয় ফট করে কল কেঁটে দিল।
ওর কথাগুলো যেন আমার মাথার ওপর দিয়ে গেছে।কী বললাম আমি?আর ও এভাবে আমায় পটপট করে কথা শুনিয়ে দিল?
আমার বাবার টাকায় আমার অধিকার নেই নাকি?
মা-বাবা সর্বক্ষণ বলে তাদের সব কিছু আমার।আমি তাদের একমাত্র মেয়ে।
যাকগে!ওর কথা মনে করে মন খারাপ করতে চাইনা।জমিয়ে শপিং করবো আজ।
অনলাইনে একটা পাকিস্তানি ড্রেস দেখেছিলাম সেদিন।ভীষণ সুন্দর!
পেলে আজ ওটাই নেব।

কাজিনের সঙ্গে দেখা করে প্রথমে গেলাম বয়েস সেকশনে।ও ওর বরের জন্য ফর্মাল ড্রেস কিনবে।
ওর নাম রোজা।
তো রোজা ড্রেস দেখছিল আর আমি টুলে বসে ছিলাম চুপচাপ।
হঠাৎ একটা কমপ্লিট সেটের দিকে চোখ গেল আমার।মেরুন রঙের ড্রেসটা খুবই আকর্ষণীয় লাগছে।আনমনেই সেটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগলাম।রোজা খেয়াল করলো তা।
আমায় মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল,”কিরে!
ভালোই তো নেড়েচেড়ে দেখছিস ড্রেসটা।পছন্দ হলো নাকি?”

“না মানে একটু দেখছিলাম আরকি!”

“আরে লজ্জা পাচ্ছিস কেন?
নিয়ে নে না ভাইয়ার জন্য।সে তোকে গিফট দিতে পারলে তুই কেন দিবিনা?”

“পছন্দ হবে?”

“কেন হবেনা?কোয়ালিটি ভালো।কালার ভালো।নাইস ফিটিং হবে।ভালোবেসে কেউ দেবে।
অবশ্যই পছন্দ হবে।
নিয়ে নে।”

একটু হেসে রাজি হয়ে গেলাম।সেটটা নিয়ে নিলাম।
ওখানকার কাজ মিটিয়ে একটা জুয়েলারির দোকানে গেলাম।রোজা ওর বরের জন্য রিং নেবে।
তো আমরা রিং দেখছিলাম।
একটা বালা ও গলার হাড়ের দিকে চোখ গেল আমার।
এটা আমার সেই বালা।যেটা আমার চুরি হয়েছিল।হাড়টাও আমার ঐ একই ডিজাইনের।
তৎক্ষণাৎ দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো কী তাদের গহনা নাকি কোনোভাবে সংগ্রহ করেছে।
তারা কিছুতেই আমায় ইনফরমেশন দিচ্ছেনা।
আমি রীতিমতো জোড়াজুড়ি করছি।রোজা এগিয়ে এলো।ওকে বললাম বিষয়টা।
ও ভালো করে দেখে চিনতে পারলো।এবার সেও জোর দিল।দোকানদার বলল এগুলো তাদের তৈরি গহনা।
আমি মানলাম না।
বললাম বালার মাঝখানে ঐ ফুলের ডিজাইনটার মাঝে একটা ‘P’ লেখা আছে।আমার নানির নাম পিয়াসির প্রথম অক্ষর।আর হাড়ের মাঝখানে যে ডিজাইনটা ওখানে একটু ভাঙা আছে।
উনি কোনোভাবেই পরখ করবেননা তা।একপ্রকার গন্ডগোল শুরু হলো।
ওখানকার ম‍্যানেজার এলো।
যে আমাদের সঙ্গে তর্ক করছিল সে ছিল সেলসম‍্যান।এবার ম‍্যানেজার এসে জানতে চাইলে সব বললাম তাকে।
উনি দেখতে চাইলো।
আমার কথা মিলে গেল।চিহ্ন আছে।সেলসম‍্যান বলল,”সামান‍্য এ দুটো চিহ্নতেই প্রমাণ হয়না এগুলো আপনার।
যদি আপনারই হয় তাহলে আমাদের কাছে এলো কী করে?”

বললাম,”চুরি হয়েছে।”

ওরা মানতে চাইলোনা।তর্ক করে যাচ্ছে সমানে।আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম।আসলে আমার গহনাগুলো এভাবে অন‍্যের হাতে দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারছিনা।
রোজা আমার ফোন নিয়ে প্রলয়কে কল করে।এরপর কল করে আমার সেই পুলিশ ভাইকে।ও আবার রোজার আপন ভাই।
মিনিট বিশেকের মাঝে প্রলয় এসে হাজির।আমায় কাঁদতে দেখে সোজা আমায় ওর কাছে টেনে নিয়েছে।ওর বুকে হেলান দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বললাম,”দেখুন এগুলো আমার সেই গহনা।
আমার স্পষ্ট মনে আছে।এগুলো আমার।”

প্রলয় সেই সেলসম‍্যানের দিকে তাকিয়ে বলল,”সোহেল আঙ্কেল আপনি এ দোকানে কাজ করেন?”

লোকটা যেন থতমত খেয়ে গেল প্রলয়কে দেখে।
ম‍্যানেজার বলল,”আপনি উনাকে চেনেন?”

“হ‍্যা।উনি আমার খালামনির দেবর হয়।”

এবার সেই লোকটা হেসে বলল,”প্রলয় বাবা তুমি!
এটা তোমার বউ নাকি?আমি চিনতে পারিনি বাবা।কিছু মনে করোনা।”

প্রলয়কে রোজা সবটা খুলে বলল।
আমার ভাইও এলো। এবার পুলিশ দেখে সেই আঙ্কেলের মুখটা শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে।সে ভাবেনি আমরা এতোদূর যাবো।
আমি সব প্রমাণ দিলাম।
গহনা পড়া আমার আর মায়ের ছবি দিলাম।মাকে কল করে কোনটা কতো হোলমার্কের সহ কত আনা আছে সব ডিটেলস জেনে নিয়ে বললাম।
৯৫% সঠিক বলেছি আমি।
রিপোর্ট ও লেখানো ছিল আমার।
ভাই বলল,”এই গহনার ইনভেস্টিগেশন আমি করছি।মাঝের কিছুদিন নিজের অসুস্থতার কারণে কাজটা পেন্ডিং এ রেখেছিলাম।তবে কাল সন্ধ‍্যায় খবর পেয়েছিলাম এই গহনাগুলো কারো দোকানে আছে।
আজ বিকেলে মিশনে আসার কথা ছিল।
কিন্তু এখনই আসতে হলো।এবার সবটা বলুন।”

আমার ভাই সোজা ম‍্যানেজারকে ধরলো।
ম‍্যানেজার জানায় তিনি কাল দোকানে ছিলনা।এসে দেখছে গহনাগুলো দোকানে। জিজ্ঞেস করলে বলেছে একজন নাকি এগুলো বিক্রি করতে চায় এজন্য রেখে রেখে।মাপ করে হিসেব করে টাকা দিতে হবে।

এবার সেই সোহেল আঙ্কেলকে চেপে ধরলে সে জানায় এক লোক নাকি রাতে তার বাড়ি এসে গহনাগুলো দিয়ে গেছে বিক্রি করতে।সে যে জুয়েলারির দোকানে কাজ করে এটা জেনেই এসেছে।
বলেছিল সিক্রেটে যেন কাজটা করা হয়।
এজন্য উনি নাকি কাউকে জানাননি।

উনার কথাগুলো কোনোমতেই বিশ্বাস হচ্ছেনা কারো।
প্রলয় চেপে ধরে বলল,”আরো গহনা ছিল ওগুলো কোথায়?”

লোকটা সবই বের করে দিল।
আমি সব বুঝে নিলাম।খুশিতে কাঁদছি আমি।
আমার গুলো নেওয়া শেষে জিজ্ঞেস করলাম একটা বালাও ছিল আমার শাশুড়ি মায়ের।সেগুলো কোথায়?

উনি এবার চুপ রইলেন।আমার ভাই তার কলার চেপে ধরতেই বলল,”ওগুলো নাকি বিক্রি করে দিয়েছে।”

ভাইয়া প্রচন্ড চড়াও হলো।
বলল,”একেতো বেআইনিভাবে গহনা কেনাবেচা করছিস।এতো ভারী গহনা কোনো লিগ‍্যাল ইস‍্যু ছাড়া কীভাবে নিজের কাছে রাখলি?
এজন্য তোর কী হবে জানিস?
আর কে সেই লোক?
এখনি কল কর।”

বলল,”আমি চিনিনা।মুখ দেখিনি।আজ মাঝরাতে টাকা নিতে আসার কথা ছিল।”

“ঠিক আছে।তাহলে আজ তোর বাড়িতে আমি পাহারা বসাবো।”

প্রলয় মাথা নিচু করে কী যেন ভাবছে।
আমি আমার মতো গহনা গুলো পেয়ে আনন্দে আত্মহারা।বুকে চেপে ধরছি।দেখছি বারবার।
ভাই তার সঙ্গে থাকা একজন কনস্টেবলকে বলল এই সোহেলকে জিপে ওঠাতে।
টেনে-হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে।
আমি ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বের হলাম।
ধন্যবাদ দিলাম তাকে।ভাইয়া আমার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,”ধন‍্যবাদ চাইনা।শুধু আমাকে জ্বালানোটা কমিয়ে দিস।”

আমিও ফিক করে হেসে বললাম,”ওটা পারবোনা।”

ভাই আমাদের বিদায় দিল।সে সোজা পুলিশ স্টেশনে যাবে।
আমরা সামনে এগোচ্ছি এমনই সময় ভাইয়া পেছন ডাকে।বলল,”তোর শাশুড়ির যে গহনা চুরি হয়েছে এগুলো বাদে,সেই কেসটা কিন্তু চলমান আছে।”

তার আর কিছু বলার আগেই প্রলয় বলল,”অফ করে দিন।ঐ কেসটা ছেড়ে দিন।ওটার কোনো অস্তিত্ব নেই আর।”

ভাইয়া ভ্রু কুচকে বলল,”কেন?”

প্রলয় শুধু একটু হাসলো।
ডাক পড়ে ভাইয়ার।জিপে উঠে বসে সে।যেতে যেতে প্রলয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে।

প্রলয় গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,”প্রিয়তা আপনার লাক ভালো।এজন‍্য এতোদিন পর হলেও নিজের হারানো জিনিস খুঁজে পেলেন।
এবার এর আসল চোরকে খুঁজে বের করা হবে।
আর আপনাদের তো শপিং মেইবি এখনো শেষ হয়নি।তো আপনারা শপিং করুন।
আর প্রিয়তা আপনি শপিং শেষে গহনা গুলো নিয়ে সোজা মায়ের কাছে যাবেন।যার জিনিস তাকে দিয়ে আসবেন।আপনার শখ থাকলে আমায় জানাবেন।আমি আপনাকে আস্তে ধীরে বানিয়ে দেব সব।
আমার কাজ আছে।আমি অফিসে যাচ্ছি।
সাবধানে থাকবেন।আর মনে করে মাকে সব দিয়ে দেবেন।”

আমি মাথা নাড়লাম।প্রলয় গাড়ির কাছে এগিয়ে গেল।
কী মনে করে যেন আবারো এলো।
বলল,”আপনি এখন গেলে ফিরতে পারবেন বাড়ি?”

কিছুক্ষণ ভেবে বললাম,”এখন গেলে মা আসতে দেবে কিনা সন্দেহ আছে।নাও দিতে পারে।কারণ বাবা ফিরবে রাতে।দেখা না করে ছাড়বে না।”

“তাহলে আসবেন না?

“মনে হয় না।”

“সত‍্যিই আসবেন না?”

ভ্রু উচিয়ে বললাম,”কেন জিজ্ঞেস করছেন একথা?”

প্রলয় আমতা আমতা করতে লাগে।পাশ থেকে রোজা বলে,”আরে ভাইয়া বলে দিননা আপনি প্রিয়তাকে মিস করবেন।ওকে ছাড়া থাকতে পারবেননা।”

আমি রোজাকে থামাতে চেষ্টা করলাম।
প্রলয় লজ্জামিশ্রিত হাসছে।
আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”যতো রাতই হোক আপনাকে ফিরতে হবে।
আমি গিয়ে নিয়ে আসবো।
থাকতে দেবনা।যা কাজ সব সেরে রাখবেন।আমি গেলে চলে আসবেন।”

প্রলয়ের এই অধিকারবোধ আমার বুকে শিহরণের সৃষ্টি করে।

ও চলে গেল।
আমিও রোজাকে নিয়ে একটা কাজে ছুটলাম।
পথে দেখা হলো অয়ন ভাইয়ের সঙ্গে।
আমায় দেখেই এগিয়ে এলো সে।
কথা বলল।কেমন করে যেন কথা বলেন ইদানিং তিনি।উদাসীন লাগে।
আজ তিনি আমায় জোর করে একটা পায়েল কিনে দিল।কেমন অদ্ভুত ব‍্যবহার তার।
পায়েলটা দিয়ে বলল,”বহু আগে তুমি একদিন তোমার পছন্দের পায়েলটি হারিয়ে ফেলে কেঁদেছিলে ভীষণ।সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম,নিজে যখন ইনকাম করা শিখবো,তোমায় একটা পায়েল গিফট করবো।
এতোদিন মনে ছিল না।
আজ তোমায় দেখে মনে হলো।
নিয়ে নাও এটা।তোমার পায়ে মানাবে।”

আমি কিছু বলার আগেই রোজা বলল,”আমাদের তাড়া আছে।আজ আসি।অন‍্যকোনোদিন কথা হবে।”

আমায় নিয়ে টানতে টানতে চলে গেল ও।
বোঝাতে লাগলো।আমি যেন অয়ন ভাইকে এড়িয়ে চলি।বিয়ে হয়ে গেছে আমার।
এখন আর অতীতমুখী হলে চলবেনা।প্রলয় অত‍্যন্ত ভালো ছেলে।ওকে আঘাত দেওয়া যাবেনা।

বাড়ি এলাম।এসেই মাকে জড়িয়ে ধরে সবটা বললাম।মা শুনে তো অবাক!
সেই সঙ্গে খুশিও।জিনিসগুলো আমাকেই রাখতে বলল।কিন্তু আমি আর সাহস করে রাখলাম না।

মা কিচেনে গেল।শুনেছে জামাই আসবে রাতে।রান্না চাপিয়েছে এখনই।
মা-বাবা প্রলয়কে ভীষণ ভালোবাসে।প্রলয়ের সঙ্গে এদের কীভাবে পরিচয় হয়েছে জানিনা।
জানতে হবে।এখন না।সঠিক সময়ে।

বাড়িতে সবার সঙ্গে বেশ আনন্দ করলাম।কাজিনরা থাকতে বলে আমায়।
মুখ গোমড়া করে বললাম,”হবেনারে এবার।”

ওরা বলছে প্রলয়কে নাকি বোঝাবে আমায় থাকতে দিতে।
তো প্রলয় এলো রাত প্রায় দশটার দিকে।এসে খাওয়া শেষে আমার ভাই-বোন মিলে ঘিরে ধরলো তাকে।আমায় রেখে যেতে অনুরোধ করলো।
কতো কিছু বলে বোঝালো।প্রলয় সুন্দর রাজিও হলো দেখলাম।দরজার কাছে এসে আমার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে,”তৈরি হয়ে নিন।বাড়ি যেতে হবে।”

আমার কাজিনদের মুখটা দেখার মতো হলো।ওদের সব চেষ্টাই বৃথা।
হাসি পায় আমার।হাসতেই সবাই মিলে বলল আমি নাকি প্রলয়ের পক্ষে।
আর রাত করলাম না।তৈরি হলাম।
প্রলয় সবার মন খারাপ দেখে গাড়ি থেকে এক গাদা চকলেট,চিপস সহ ড্রিঙ্কস দিল ওদের।বলল আজকে বরং তোমরা একটা মুভি নাইট করে নাও।
ওরা সবাই এবার খুশি।আমারও ভালো লাগলো।
ফেরার পথে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলাম সাইলেন্ট করা ছিল।বাড়ি থেকে দশবার কল করেছে।বুকটা ধ্বক করে ওঠে।না জানি কী হলো আবার।কোন শনি নাচছে আমার ভাগ‍্যে।

(গল্প সেদিনই লিখেছিলাম।কিন্তু আমার ওয়াইফাই ছিল না।রহস‍্য খুলছে ধীরে ধীরে )

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply