Golpo romantic golpo প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে

প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৮


#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১৮)

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

আলো-আঁধারির খেলায় মেতেছে নিসর্গ । আকাশ জুড়ে মেঘেদের গর্জন। ঝড়ের পূর্বাভাস বার্তার জানান দিচ্ছে। নীরবতায় নিশ্চুপ তাজ। বাহিরটা যতটা শান্ত হৃদয়ের অন্তস্তল ঠিক ততটায় উত্তপ্ত। কাঠফাটা রোদের তৃষ্ণার্থ পাখির মতো ছটফট করছে আত্মাটা। দিশেহারা মন ছিন্নবিচ্ছিন্ন হচ্ছে বার বার। নিলুর আব্বু খানিকক্ষণ চুপ থেকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন,

” মেয়ে বড় হলে বাবাদের দুশ্চিন্তা ১০০ গুণ বেড়ে যায়। কোনোমতে মেয়েটার বিয়ে দিতে পারলে বড় একটা বোঝা মাথা থেকে সরে যেত।”

তাজ দু’হাতে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে চাপা নিঃশ্বাস ছাড়ল। অদ্ভুত এক বেড়াজালে আঁটকে আছে। বলতে চেয়েও বলতে না পারার ব্যথাটা একটু বেশিই তীব্র হয়ে উঠে। নিঃশ্বাসে বিরক্তির ভাব ফুটে উঠছে। তাজ মনে মনে বিড়বিড় করছে এমতাবস্থায় নিলুর আব্বুর ফোনে কল এসেছে। নিলু কল করেছে। নিলুর আব্বুর হাসিমুখে কল রিসিভ করে বললেন,

” হ্যাঁ মা, বল।”

“আব্বু, কোথায় তুমি?”

“তোর বন্ধু তাজের সঙ্গে কথা বলছিলাম।”

আব্বুর মুখে এমন কথা শুনে নিলু রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেল। থতমত খেয়ে আওড়াল,

” তাজের সঙ্গে? “

” হ্যাঁ। “

” তাজকে তুমি কোথায় পেলে?”

” ওর কাজিনকে নিয়ে মেলায় এসেছে। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল তাই একটু কথা বলছিলাম।”

নিলু পড়ল ভীষণ দুশ্চিন্তায়। কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,

” আম্মুর শরীরটা একটু খারাপ। তুমি লেবু নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় এসো।”

” তোর আম্মুর আবার কি হলো?”

নিলু খানিক রাগী স্বরে জবাব দিল,

” প্রেশার বেড়েছে। তুমি লেবু নিয়ে আসো জলদি।”

” আসতেছি।”

ফোন কানে রেখেই নিলুর আব্বু ছুটছেন । যেতে যেতে তাজকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

” তোমার সাথে পরে কথা বলব।”

তাজ তখনও পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। এ যাত্রায় বেঁচে গেল বলে খুশি হবে নাকি পরবর্তী ঝড়ের ভয়ে আতঙ্কিত হবে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। আব্বুর কল কেটে নিলু সঙ্গে সঙ্গে তাজের নাম্বারে কল করল। তাজের ফোন নৌমির হাতে। ডিসপ্লেতে নিলুর নাম দেখে নৌমি কল রিসিভ করে সালাম দিল৷ মেয়েলি কণ্ঠ শুনে নিলু ভ্রু গুটিয়ে শুধাল,

“কে?”

নৌমি কিঞ্চিৎ মজার ছলেই বলল,

” আপনি কে? “

মেলার হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে নৌমির কণ্ঠ ঠিকমতো চিনতে পারে নি। তারউপর অতিরিক্ত টেনশনে নিলুর মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরন ধপধপ করে কাঁপছে। নিলু চিনতে পারেনি বলে নৌমির বেশ মজা লাগছে। নৌমি ফের বলল,

” আপনি যাকে খুঁজছেন সে এখন ব্যস্ত আছে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন অথবা আমার সঙ্গে কথা বলুন।”

নিলু রাগে বিড়বিড় করতে করতে কল কেটে দিয়েছে।নৌমি ঠোঁট উল্টে আদুরে ভঙ্গিতে বলল,

” আজকাল একটু মজা করলেও মানুষ সিরিয়াস হয়ে যায়!”

শুভ্র চুড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে মনোযোগ সহকারে চুড়ি দেখছে৷ কখনও সাদা কাঁচের চুড়ি হাতে নিচ্ছে কখনও বা রঙিন চুড়ি। সুমি এসে শুভ্রর পাশে দাঁড়াল। ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,

” ভাইয়া, এক দোকানে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? চলো।”

“তোরা যা৷ আমি আসছি।”

সুমি এক কদম এগুতেই শুভ্র ডাকল,

” সুমি শুন।”

” হ্যাঁ বলো।”

” নৌমি কোথায়?”

” রাফিদের সঙ্গে আইসক্রিম খেতে গেল।”

” এই রাতে আইসক্রিম!”

” হুম।”

শুভ্র দুই সেট চুড়ি সুমির সামনে ধরে জিজ্ঞেস করল,

” কোন চুড়ি গুলো সুন্দর? “

” দুটায় সুন্দর।”

” নৌমিকে কোনটা মানাবে?”

সুমি সঙ্গে সঙ্গে কপাল গুটাল। ভাইয়ের মলিন চেহারার পানে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে ভীতিকর কণ্ঠে শুধাল,

” তুমি নৌমি আপুর জন্য চুড়ি কিনছ?”

” দেখছিলাম আর কি!”

সুমি ঠোঁট বেঁকিয়ে মুচকি হাসল। অতঃপর ঠাট্টার স্বরে বলল,

” তোমার সাথে আমার ঝগড়া হলে তুমি ২ দিন আমার সঙ্গে একটা কথাও বলো না। সেখানে নৌমি আপুর সঙ্গে ঝগড়া হলো এক ঘন্টাও হয় নি তারমধ্যেই ওর জন্য চুড়ি কিনছ। কিভাবে সম্ভব?”

শুভ্র মুখ ফুলিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। চুড়িগুলো যথাস্থানে রেখে এক রাশ বিরক্তি চোখে মুখে টেনে বলল,

” চল।”

” চুড়ি নিবে না?”

” না।”

” কেন?

” প্রয়োজন নেই তাই।”

সুমি নির্বাক চোখে তাকিয়ে বলল,

” আমি এমনি বলেছি।”

” নৌমিকে এ ব্যাপারে কিছু বলবি না।”

” কেন? তুমি আমার কথায় রাগ করে চুড়ি নিচ্ছ না?”

” বলেছি বলবি না মানে বলবি না। চল।”

মিনিট দশেক পর তাজ এসেছে৷ অনেক খোঁজাখুঁজির পর নৌমিদের খুঁজে পেয়েছে। আন্নি আর সুমি দোকান ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করছে। শুভ্র চায়ের কাপ হাতে মেলার এক কোনে বসে আছে। মলিন চেহারার বিষণ্ণ চাউনি নৌমি আর তাজের পানে। একটা দোকান পরেই তাজ আর নৌমি দাঁড়িয়ে। ডজন ডজন চুড়ি নিচ্ছে হাতে৷ সেই চুড়ি নৌমির হাতে পড়িয়ে দিচ্ছে তাজ। তারসঙ্গে নৌমির একেরপর এক বাহানা শুনছে,

“এই চু্ড়ি ভালো না। এইটা বড়, ঐটা আমায় মানাবে না। “

বেশ কিছুক্ষণ শুভ্র মনোযোগের সহিত সে দৃশ্য দেখল৷ হঠাৎই শুভ্রর মেজাজটা খারাপ হলো। সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল নৌমিদের কাছে। নৌমির হাত থেকে এক ডজন চুড়ি নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,

” ৪০ টাকার কাঁচের চুড়ি নিয়ে এত বাহানার কি আছে! ভালো লাগলে সবগুলো নিয়ে নে। তোদের কাছে টাকা না থাকলে আমি দিচ্ছি টাকা।”

তাজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই নৌমি বলে ওঠল,

” তোমার মতো অঢেল টাকা আমার নেই ভাই। তাই এক ডজন চুড়ি নিতে আমাদের ১০ বার ভাবতে হয়। তোমার যদি এসব ভালো না লাগে তাহলে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারো।”

নৌমির কথাগুলো শুভ্রর কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো লাগছে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হওয়ার পথে। এলোমেলো বাতাসে ধূলো উড়ছে৷ মেলার দোকানপাটও বন্ধ করতে শুরু করেছে। শুভ্র গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে তাজ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দুই সেট চুড়ির দাম দিয়ে দিল। নৌমিও চুপচাপ দুই সেট চুড়ি নিয়ে শপিং ব্যাগে রাখল। শুভ্র সে দৃশ্য দেখে রাগে গজগজ করতে করতে মেলা থেকে বেড়িয়ে গেল। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। সবাই কেনাকাটা শেষ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করল অথচ শুভ্র নিরুদ্দেশ।

বেশ কিছুক্ষণ পর বৃষ্টিতে ভিজে সবাই বাসায় পৌঁছেছে। দরজার সামনে শুভ্রর আব্বু দাঁড়িয়ে আছে। সবার দিকে এক নজর দেখে তাজকে জিজ্ঞেস করলেন,

” শুভ্র কোথায়? তোদের সঙ্গে আসেনি?”

” ওর আসতে একটু দেরি হবে তাই আমরা চলে এসেছি।”

রাত ১ টা ৩৫ মিনিট। বৃষ্টি কমেছে কিছুক্ষণ হলো। আশেপাশে গাছের পাতা থেকে টুপটাপ পানি পরছে। নৌমি বাসায় ফিরেই ঘুমিয়েছিল। মিনিট দুয়েক আগে হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙেছে। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সোজা তাকাতেই নজর পড়ে তাজের রুমের দিকে। এত রাতেও রুমে আলো জ্বলছে। তাজের নাম্বারে কল করবে ভেবেও করল না। চাপা অভিমান জমেছে মনের কোনে। এই অভিমানের কারণ নেই। হয়তো সন্ধ্যে বেলা নিলুর বিড়বিড় করে নৌমিতে উদ্দেশ্য করে বলা কথাগুলোর কথা মনে পড়ছে৷ আকাশ এখনও মেঘলা। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঠান্ডা শীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। নৌমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। তৎক্ষনাৎ চোখের সামনে শুভ্রর মলিন চেহারা ভেসে ওঠল। সন্ধ্যার পর থেকে কতবার রাগ দেখাল ছেলেটাকে। মন খারাপ করে ওদের সঙ্গে বাসায় ই ফিরে নি। নৌমি মনে মনে আওড়াল,

” শুভ্র ভাইয়া কি বাসায় ফিরেছে? নাকি এখনও ফিরে নি? ভাইয়াকে কি একটা কল দিব?”

অনেক ভেবেচিন্তে ডায়াল করল শুভ্রর নাম্বারে। কয়েক সেকেন্ড রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো। নৌমি তড়িৎ বেগে শুধাল,

” শুভ্র ভাইয়া তুমি কি বাসায় ফিরেছ? আমি না বাসায় এসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তারজন্য খোঁজ নিতে পারি নি। তুমি কি আমার উপর রেগে আছ?”

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসে নি। নৌমি বুঝতে পারল শুভ্র একটু বেশিই রেগে আছে। নৌমি মলিন গলায় বলল,

” সরি ভাইয়া, সরি।”

কারো কোনো সাড়াশব্দ না পেড়ে নৌমি গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করল,

” বললাম তো সরি৷ তখন ওভাবে রিয়েক্ট করা ঠিক হয় নি। কিন্তু কি করব বলো। আমরা এত কেনাকাটা করে অভ্যস্ত নয়। চাইলেই সব কিনতে পারব এত সামর্থ্যও আমাদের নেই। আচ্ছা সে যাই হোক তুমি না সেদিন বলেছিলে, আমি যখন বলব তুমি তখনই আমার সঙ্গে ঘুরতে যাবে! আমি আজ বলছি, চলো ঘুরতে যাই। আমি আমাদের বাসার সামনে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। যদি তুমি আসো তাহলে মনে করব তুমি আমাকে মাফ করে দিয়েছো। আর যদি না আসো তাহলে তোমার সঙ্গে আর কোনো কথা নেই৷ বাই।”

নৌমি কল কেটে শ্বাস ছেড়ে মুচকি হাসল। তৎক্ষনাৎ তাজদের রুমের দিকে তাকাল।

চলবে……

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply