#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৫৪
মেহেরুন্নেসার চোখ বারবার ফিরে যাচ্ছে সেই শিশিগুলোর দিকে। মনের ভিতর কু গাইছে বড্ড।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবছে কিসের শিশি ওগুলো। পাশের এক দাসী ইতস্তত করে বলল
“সম্রাজ্ঞী… একটা কথা বলি?”
মেহেরুন্নেসা তাকালো।
“বলো।”
দাসীটা চারপাশ দেখে নিচু গলায় বলল
“এই শিশিগুলো আজ ভোরে একজন এনে রেখেছিল।”
“কে?”
“চিনি না।”
মেহেরুন্নেসার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“মহলের লোক?”
দাসি কি যেন ভেবে মাথা নাড়িয়ে বলল
“মনে হয় না। মুখটা ভালো করে দেখি নি। মাথা, মুখ সব ঢেকে এসেছিল। তারপর এখানে রেখে চলে গেছে।”
“প্রহরীরা আটকায় নি?”
দাসী মাথা নাড়লো।
“হয়তো কারো অনুমতি আছে ভেবেছে।”
মেহেরুন্নেসার মুখ শক্ত হয়ে উঠলো।
“ওকে খুঁজে বের করো। পুরো মহল তল্লাশি করো।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই লোক পাঠানো হলো। প্রহরীরা অন্দরমহল, বাগান, আস্তাবল, অতিথিশালা সব খুঁজলো। কিন্তু দাসীর বর্ননা মত কাউকে পাওয়া গেল না। মনে হচ্ছে লোকটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। চুলার ওপর দুধ ফুটতে শুরু করেছে।
মেহেরুন্নেসা অন্যমনস্কভাবে পাত্রটার দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
দুধের রং কিছুটা অস্বাভাবিক। সে দ্রুত কাছে এগিয়ে গেল। সাদা দুধের মধ্যে কেমন আবছা নীলচে আভা ফুটে উঠেছে। প্রথমে ভাবলো হয়তো ধোয়ার কারনে এমন দেখাচ্ছে। চামচ দিয়ে নাড়তেই স্পষ্ট দেখা গেল দুধে নীলচে রঙ মিশে গেছে। আতঙ্কে মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো।
একটু আগে দেখা সেই শিশিগুলো কি বিষের তবে? এ কি কোনো ক্ষতিকারক বিষ? এক ঝটকায় পাত্রটা চুলা থেকে নামিয়ে ফেললো।
“কেউ এটা স্পর্শ করবে না।”
কঠোর কণ্ঠে বলতেই দাসীরা ভয়ে সরে গেল।
মেহেরুন্নেসা নিজেই দুধটা বাইরে নিয়ে গিয়ে মাটিতে ঢেলে দিল। তার হাত কাঁপছে। আজ যদি সে খেয়াল না করতো, যদি এই দুধ জান্নাতের কাছে চলে যেত। না জানি আজ কত বড় অঘটন ঘটে যেত। ভাবতেই বুকের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা দ্রুত একজন প্রহরীকে ডেকে বলল
“এক্ষুনি গোয়ালাকে ডাকো।”
অল্প সময়ের মধ্যেই গোয়ালা ছুটে এলো। মেহেরুন্নেসা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নতুন করে গাভী দোহানো দেখলো। তাজা দুধ সরাসরি পাত্রে নেওয়া হলো। তারপর আবার হেঁশেলে এনে জ্বাল দেওয়া হলো। এইবার পুরো সময়টা সে চোখ সরালো না। দুধ ফুটলো সেরা ঘন ও হলো। কিন্তু কোনো অস্বাভাবিক রং দেখা গেল না। সব ঠিক আছে নিশ্চিত হয়ে একটা ছোট বাটিতে দুধ ঢাললো মেহেরুন্নেসা। তারপর নিজেই বাটি হাতে কক্ষের দিকে হাঁটতে লাগলো। করিডোর পেরিয়ে উপরে উঠতেই জান্নাতের খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা একটু কমলো। কক্ষে ঢুকে দেখলো জান্নাত বাইজিদের কাঁধে বসে আছে। ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার চুল টানছে। বাইজিদ আজ অনেকক্ষণ পর একটু হেসেছে। সকাল থেকে মন-মেজাজ ভার করে বসে ছিল লোকটা। মেহেরুন্নেসা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দুজনকে দেখলো। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার তীব্র ইচ্ছে হলো তার। সাথে মেয়ের বাবা কেও। কেউ একজন খুব পরিকল্পিতভাবে জান্নাতের ক্ষতি করতে চাইছে। মেহেরুন্নেসা দুধের বাটিটা রেখে জান্নাত কে কোলে নিতে গেলে মেয়ে আসে না। বাইজিদ ভ্রু নাচিয়ে বলল
“এবার বলো মেয়ে কাকে বেশি ভালোবাসে?”
মেহেরুন্নেসা হাফ ছেড়ে বলল
“বুঝেছি বুঝেছি, মেয়ে আপনাকেই বেশি ভালোবাসে। এবার দিন ওকে, খাওয়াতে হবে তো”
বাইজিদ মেয়েকে তুলে এনে মেহেরুন্নেসার কোলে বসিয়ে দিলো। কোলে দিতে গিয়ে চুমু দিল মেহেরুন্নেসার গালে। মেহেরুন্নেসা চোখ গরম করে তাকায়।
“কি হচ্ছে কি বাচ্চার সামনে?”
বাইজিদ ফের আরেক চুমু দিয়ে পালঙ্কে গিয়ে বসলো। মেহেরুন্নেসা জান্নাতকে দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ালো।
কক্ষে তখন শুধু সে আর বাইজিদ। জানালার বাইরে বিকেলের মৃদু হাওয়া এসে খিল নাড়িয়ে দিচ্ছে। মেহেরুন্নেসা বাইজিদ কে পুরো ঘটনাটা খুলে বললো। হেঁশেলের সেই শিশিগুলোর ব্যাপার এ। তারপর দুধের রং নীলচে হয়ে যাওয়া। বাইজিদ চুপচাপ শুনল। কথা যত এগোলো, তার মুখ তত কঠিন হতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত চোয়াল শক্ত করে বলল
“তুমি ঠিক দেখেছো? দুধের রং কি করে বদলে যায় আবার?”
“আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
“আর শিশিগুলো?”
“উত্তরের প্রাসাদে যে ধরনের শিশি দেখেছিলাম, অনেকটা সেরকম ই বলতে গেলে।”
বাইজিদ ধীরে উঠে দাঁড়ালো। মুখে কঠোরতা নিয়ে বলল।
“মহলে আরি বেশি নিরাপত্তা প্রয়োজন। অঙ্কুর নিশ্চয়ই আমাদের কাছের কাওকে হাত করে নিয়েছে”
মেহেরুন্নেসা তাকিয়ে রইলো। বাইজিদ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই প্রহরীদের ডাক দিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই মহলের প্রধান প্রহরী, মাহাদি, আবিদ এবং আরও কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এসে উপস্থিত হলো। বাইজিদের গলা ঠান্ডা।
ভয়ংকর দৃঢ় কন্ঠে বলল
“আজ থেকে মহলে কোনো বহিরাগত প্রবেশ করবে না।”
সবাই চমকে তাকালো। সে আবার বলল
“যে-ই আসুক। বণিক, ফেরিওয়ালা, দূত, হেকিম, কেউ না। আগে পরিচয় যাচাই হবে। তারপর প্রবেশাধিকার।”
মাহাদি মাথা নেড়ে বলল
“জি শাহজাদা।”
“হেঁশেল, গোয়ালঘর, পানির ভাণ্ডার, শিশুর কক্ষ সব জায়গায় আলাদা পাহারা বসাও।”
“জি।”
“আর জান্নাতের আশেপাশে সবসময় দুজন সশস্ত্র নারী প্রহরী থাকবে।”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকালো। বাইজিদ সাধারণত এত প্রকাশ্যে ভয় দেখায় না। কিন্তু আজ সে বিষয়টাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। আদেশ ছড়িয়ে পড়তেই পুরো মহলে নিরাপত্তা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রহরীদের সংখ্যা বাড়ানো হলো। প্রবেশদ্বারে তল্লাশি শুরু হলো।
সন্ধ্যার পর তো প্রায় কাউকেই বাইরে দেখা যাচ্ছে না।
বিকেলের দিকে সুনেহেরা একা একা বাগানে হাঁটছিল। মাথাটা ভার লাগছে। কয়েকদিন ধরে নানা ঘটনা ঘটছে। মনটাও ভালো নেই। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার চোখ গেল বাগানের একদম শেষ প্রান্তে। পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাশে। সুনেহেরা অবাক হয়ে দাঁড়ালো। দূরে বাগানের কাছটায় কেউ একরা দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক ধক করে উঠলো। মানুষের মত। আবার পুরো মানুষও না। লম্বা, অস্বাভাবিক রকম রোগা।
হাত দুটো প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। মুখটা ছায়ায় ঢাকা। চোখ দুটো যেন অস্বাভাবিকভাবে জ্বলছে। সুনেহেরার মুখ থেকে ফিসফিস করে বের হলো
“নরপিশাচ…?”
সেই দানবগুলোর কয়েকটাকে সে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখেছিল। ভুল হওয়ার কথা না। এক মুহূর্তও দেরি করলো না। ঘাগড়ার নিচের অংশ তুলে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটলো।
“প্রহরী! প্রহরী! এইদিকে আসো!”
কয়েকজন সৈন্য তার সাথে দৌড়ে এলো। সবাইকে নিয়ে যখন বাগানের সেই জায়গায় পৌঁছালো, দেখলো সেখানে কেউ নেই শুধু গাছপালা ছাড়া কৃষ্ণচূড়া গাছটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে। একজন সৈন্য চারপাশ দেখে বলল
“কোথায় শাহজাদি?”
সুনেহেরা হাঁপাতে হাঁপাতে চারদিকে তাকালো।
“এইখানেই তো ছিল।”
আরেকজন বলল
“কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। হয়তো আপনার ভ্রম…”
সুনেহেরা চোখ পাকিয়ে তাকাতেই চুপ করলো প্রহরী। সুনেহেরা গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
তারপর নিচের মাটির দিকে তাকাতেই কপাল কুঁচকে গেল। সবুজ লম্বা ঘাসগুলো চ্যাপ্টা হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা সত্যিই দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। বাম দিক দিয়ে দেখা যায় কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্ন। ঘাস অনুসরণ করে বাগানের শেষ ওবদি গেল তারা। কিন্তু তারপর আজ ঘাস নেই। তাই চিহ্নও নেই। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। প্রহরী রা তবুও আশপাশটা ভালো করে দেখলো। সুনেহেরা নির্দেশ দিলো চারপাশ ভালো করে দেখে মূল ফটক বন্ধ করে দিতে। মহলের চূড়ার ওপর বসে থাকা একটা কালো কাক বিকট শব্দে ডেকে উঠলো। কেন জানি শব্দটা শুনে অকারণেই গা শিউরে উঠলো সুনেহেরার।
***
রাত গভীর হতেই নিজের কক্ষ থেকে বের হলো চন্দ্রপ্রভা। আবিদ তখন ঘুমিয়ে। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ খুলে রাখার শক্তিও নেই তার।
প্রভা কিছুক্ষণ স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর উঠে গেলো। কালো বোরখাটা গায়ে জড়িয়ে আস্তে করে বের হয়ে গেল। পেটটা এখন বেশ ভারী হয়ে এসেছে। হাঁটতেও কষ্ট হয়। তবুও থামলো না, সেসব শারীরিক বন্ধকতা উপেক্ষা করে হাঁটা ধরলো জঙ্গলের দিকে। বহুদিন পর আজ অঙ্কুরের সাথে দেখা হবে। কবরস্থান পেরিয়ে, জঙ্গল পেরিয়ে অনেকটা পথ গিয়ে অবশেষে পৌঁছালো নির্ধারিত জায়গায়।
পুরনো ভাঙা এক ইমারত। ভেতরে মশাল জ্বলছে।
প্রভা ঢুকতেই দেখলো অঙ্কুর দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। তার মুখ আগের চেয়েও কঠিন।
চোখের নিচে কালি। দীর্ঘদিনের পলাতক জীবনের ছাপ স্পষ্ট। প্রভা ঠোঁটে হাসি এনে বলল
“অঙ্কুর…”
অঙ্কুর ফিরেও তাকালো না। ঠান্ডা গলায় বলল
“এসেছো?”
চন্দ্রপ্রভা থমকে গেল। কণ্ঠে কোনো উষ্ণতা নেই।
“কি হয়েছে?”
অঙ্কুর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখে ঘৃণা।
“তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হই চন্দ্রা।”
প্রভা কপাল কুঁচকালো।
“মানে?”
অঙ্কুর হেসে উঠলো। বিকট বিদ্রুপ এর হাসি।
“সারা জীবন ভালোবাসি ভালোবাসি বলে আমার পেছনে ঘুরলে।”
“অঙ্কুর…”
“চুপ।”
কঠোর গলায় থামিয়ে দিলো সে।
“তারপর কি করলে?”
প্রভা কিছু বললো না। অঙ্কুর এগিয়ে এলো।
“নায়েব কে বিয়ে করলে। বাহ বাহ। হাত তালি”
অঙ্কুর বাজখাঁই শব্দে হাততালি দিতে লাগলো।
“আসলে কি বলোতো, ওমন ফিটফাট এক জন সুপুরুষ সবসময় সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াতো। চোখেরও তো একটা সহ্য সীমা থাকে তাই না?”
চন্দ্রা ছলছল চোখ আর ক্রোধ নিয়ে বলল
“তুমি খুব ভালো করেই জানো বিয়েটা আমি ইচ্ছাকৃত করিনি।”
অঙ্কুর তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো।
“ওওওওওওওও, বাধ্য ছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সন্তানটাও বাধ্য হয়ে নিয়েছো? না মানে শরীরের টানে বাধ্য হয়েই তো কাছে টেনেছো তাই না?””
মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল প্রভার। অঙ্কুরের চোখ জ্বলছে।
“কি হলো? কথা বলছো না কেন? তুমি তো বলেছিলে আমাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসো না। কাওকে মেনে নিতেই পারবে না, অসম্ভব। কোথায় গেল তোমার সেই বড় বড় কথা হ্যা? চোখের সামনে তরতাজা টাটকা পুরুষ দেখে জিভ একেবারে লকলক করে উঠলো না?”
চন্দ্রা কিছু বলতে গেলে গর্জে উঠলো অঙ্কুর। প্রভা চমকে উঠলো।
“যে নারী অন্য পুরুষের সন্তান ধারণ করে, সে আবার কিসের ভালোবাসার কথা বলে?”
কথাগুলো ছুরির মত বিঁধলো প্রভার বুকে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল
“এসব কিন্তু আমি তোমার জন্যই করেছি।”
“আমার জন্য?”
অঙ্কুর হেসে উঠলো।
“তুমি এখন আবিদের স্ত্রী। তুমি তার সন্তানের মা হতে চলেছো। শালার জিন্দেগী রেহহহ, আমার জন্য আরেক পুরুষের থেকে গর্ভবতী হয়ে গেল”
হো হো করে শয়তান এর মত হাসতে লাগলো অঙ্কুর। প্রভা কাঁপতে লাগলো।
“প্রথমত আমি ওকে ভালোবাসি না। আর না ভবিষ্যতে বাসবো”
“কিন্তু ওর ঘরেই থাকো। ওর নামেই পরিচিত। ওর সন্তান পেটে ধরছস। রাত হলে ওর জন্যই কাপড় খুলিস। তারপরও দাবি করিস আমাকে ভালোবাসিস?”
প্রভার চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু অঙ্কুরের কোনো পরিবর্তন হলো না। ঠান্ডা গলায় বলল
“তোমার মত মানুষের ভালোবাসা আমার প্রয়োজন নেই। আর না তোমার উপকার এর প্রয়োজন আছে। সোজা কথা, তোমার প্রয়োজন আমার কাছে ফুরিয়ে গেছে”
প্রভা পাথর এর মত হয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ঘুরে বেরিয়ে গেল। অঙ্কুর আর একবারও ডাকলো না। উল্টো পিছন থেকে বলল
“কই আমি ছুঁতে চাইলেই তো ফোঁসকা পরতো। এখন আরেকজন এর সাথে শুতে বেশ ভালো লাগে। পতিতলার মহিলার চাইতেও নিকৃষ্ট”
প্রঋার গা ঘিনঘিন করতে লাগলো এসব শুনে। ফেরার পুরো পথটা প্রভার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়লো। কান্নার সাথে সাথে জমতে লাগলো রাগও। প্রচণ্ড রাগ, অপমান, ক্ষোভ। সবকিছুর দায় যেন সে একজনের ওপর চাপিয়ে দিল। যদি আবিদ তাকে বিয়ে না করতো, তাহলে আজ এসব শুনতে হতো না। যদি আবিদ না থাকতো তাহলে অঙ্কুর তাকে এভাবে অপমান করতো না।
বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। আবিদ উঠানে বসে আছে। সম্ভবত তার অপেক্ষাতেই।
প্রভার বুকের ভেতর আবার আগুন জ্বলে উঠলো। অঙ্কুরের কথাগুলো বারবার কানে বাজছে। সেই আগুনের সমস্ত তাপ গিয়ে জমলো আবিদের ওপর। আবিদ উঠানের মাঝখানে বসে আছে হাতে একটা হারিকেন। প্রভাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো।
“শাহজাদি? এত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন?”
প্রভা কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। আবিদ কয়েক পা এগিয়ে এলো।
“ আপনার শরীরের অবস্থাও ভালো না। অন্তত নিজের সন্তান টার কথাটা তো ভাবুন। কেমন নারী আপনি?”
“চুপ করুন।”
চন্দ্রার ধমকে আবিদ থেমে গেল। রত্নপ্রভার গলা অস্বাভাবিক উত্তেজিত।
“আর একটা কথাও বলবেন না।”
আবিদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কি হয়েছে?”
রত্নপ্রভার চোখে তখন ঝড়ের মত তেজী অগ্নি স্ফুলিঙ্গ
“আপনি আমার জীবনটা নষ্ট করেছেন।”
আবিদ হতভম্ব হয়ে গেল।
“রত্না…”
কাঁপা গলায় বলে উঠলো চন্দ্রা।
“বলেছিলাম না? বলেছিলাম, আপনার সন্তানের মুখ আপনাকে দেখতে দেব না।”
আবিদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে এলো।
“আপনি কি বলছেন টা কি? আপনার মাথা ঠিক আছে?”
“আমি তাহলে এবার কথা রাখি।”
মুহূর্তের মধ্যে পোশাকের আড়াল থেকে ছুরিটা বের করলো প্রভা। আবিদ পিছিয়ে যেতে যেতে বলল
“দয়া করুন শাহজাদি। এমনটা করবেন না। আমাকে আমার সন্তান এর মুখ দেখার ভাগ্য টুকু কেড়ে নিবেন না। আমার সন্তান কে জন্ম থেকে পিতৃহারা করবেন না।
আবিদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো ছুরি টা বসিয়ে দিল আবিদের বুকে। আবিদ বিস্ময়ে পিছিয়ে গেল। মুখে অবিশ্বাস। যেন সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। চন্দ্রপ্রভা দাঁতে দাঁত চেপে বলল
“সন্তানকে মারতে পারিনি, কিন্তু তো আপনাকে সরিয়ে দিতেই পারি।”
আবিদ টলতে টলতে পেছনে সরে গেল। হারিকেনটা হাত থেকে পড়ে মাটিতে গড়িয়ে গেল। মাটিতে এক হাঁটু ভর দিয়ে বসে পড়লো। চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। তাও সে রত্নপ্রভার দিকেই তাকিয়ে রইলো। সেই মানুষটার দিকে, যার ভালোবাসা পাবার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছে। যার প্রতিটা রাগ, অপমান, অবহেলা নীরবে সহ্য করেছে কেবল এই আশায় যে একদিন শাহজাদির মন গলবে। ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু শব্দ বের হলো না। রত্নপ্রভার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। ভেতরের ঝড় এখনো থামেনি। আবারও ছুরিটা তুলে ধরলো। ফের কোপ দিবে তখনি উঠানের অন্য প্রান্ত থেকে একটা আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এলো
“আবিদ!”
আবিদের মায়ের কণ্ঠ। বৃদ্ধা মহিলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে আতঙ্ক। চোখ বিস্ফারিত। রত্নপ্রভার হাত মাঝ পথে থেমে গেল। বৃদ্ধা মহিলাটি একবার ছেলের দিকে তাকাচ্ছেন।
একবার রত্নপ্রভার দিকে। মুখ থেকে কাঁপা কাঁপা স্বরে বের হলো
“এ…এ কি করলে মা?”
রত্নপ্রভা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কিন্তু পরক্ষণেই তার মাথায় অন্য চিন্তা এলো। এই ঘটনার সাক্ষী রয়ে গেছে একজন। বৃদ্ধা মহিলা পিছিয়ে যেতে লাগলেন।
“আমি…আমি লোক ডাকছি…আমি এক্ষুনি লোক ডাকছি। বিনা অপরাধে আমার ছেলেকে এভাবে হত্যা করতে পারো না তুমি। আমি এ….”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। রত্নপ্রভা দ্রুত এগিয়ে গেল।
অনেকক্ষণ পর উঠানে আর কোনো চিৎকার নেই।
শীতের রাতের বাতাস বইছে উঠানে। রত্নপ্রভা দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। তার হাত কাঁপছে। মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এখনো বুঝতে পারছে না ঠিক কী করে ফেলেছে। এখন তার সামনে একটাই লক্ষ্য, কেউ যেন সত্য জানতে না পারে। তড়িঘড়ি করে চারপাশ গুছিয়ে ফেলতে শুরু করলো সে।
চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করলো। ঘরের ভেতর বাইরে বারবার যাতায়াত করতে লাগলো।
গভীর রাতের অন্ধকারে বসে রইলো একা।
চারপাশে ভয়ংকর নীরবতার মাঝেও তার কানে বারবার বাজতে লাগলো আবিদের কথা গুলি।
প্রভা দুই কান চেপে ধরলো। অবাধ্য স্মৃতিগুলো থামলো না। অনেকক্ষণ উঠানের মাঝখানে বসে রইলো। রাত আরও গভীর হয়ে এসেছে। হারিকেনের ক্ষীণ আলো কাঁপছে।
তার চোখদুটো স্থির। একবার আবিদের দিকে তাকাচ্ছে। একবার বৃদ্ধা মহিলার দিকে। তারপর হঠাৎ করেই হেসে উঠলো। আবার পরক্ষণেই কান্না। উন্মাদের মত নিজের চুল টানতে লাগলো।
“না… না… আমি এগুলা কিচ্ছু করি নি। না না…”
কাঁপা কণ্ঠে বিড়বিড় করলো সে।
“সব দোষ তোমাদের… সব দোষ তোমাদের…”
তার চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়ছে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে কান্না থামলো। ভয় যেন তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো সত্য প্রকাশ পাওয়ার ভয়। লোকজন জেনে যাওয়ার ভয়। সাহাবাদে খবর পৌঁছে যাওয়ার ভয়। মেহেরুন্নেসা জেনে যাওয়ার ভয়। বাইজিদ জেনে যাওয়ার ভয়।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। দূরে কুকুরের ডাক শোনা যায়। প্রভা চমকে উঠলো।
তারপর তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বিছানার পাশে বসে পড়লো। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো। এভাবে বসে থাকা যাবে না। একবার যদি মেহেরুন্নেসা জেনে যায় যে চন্দ্রা আবিদ আর তার মা কে খুন করেছে। আর রক্ষে নেই তার। আজীবন কারাগারে থাকতে হবে। আর নয়তো মৃত্যুদন্ড পাবে।
পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখুন। কেমন হলো জানাবেন। সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করবেন
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ ২২ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪১
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৯ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫০
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৩
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩২ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪১