#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
৪৫ এর প্রথমাংশ
মেহেরুন্নেসার বীরত্বে হতবাক গোটা সাহাবাদ। সাধারণ গরীব ঘরের একটি মেয়ে, নেহাৎ ই এক মোমের পুতুল স্বভাব যায়। সে কিনা একটা নারী যোদ্ধা দের দল নিয়ন্ত্রণ করছে? তাও আবার অঙ্কুর এর মত এক শয়তান বাহিনীকে হটিয়ে দেখালো। বাকের শাহ্ মেহেরুন্নেসার সামনে হাত জড় করে দাড়ালো। নিচু স্বরে বলল
“আম্মা গো। তোমায় যখন মহল থেকে বের করে দেওয়া হলো। তখন থেকে মন খানা কেমন কু গাইত। মনে হতো অনেক বড় অন্যায় করেছি বুঝি। একটা বার প্রায়শ্চিত্ত করতে দেবে আম্মা?”
মেহেরুন্নেসা ধনুকের বাট পিঠ থেকে নামিয়ে এগিয়ে আসলো বাকের শাহ্ এর দিকে।
“এ কি করছেন আব্বা। আপনি আমার গুরুজন। এসব বলে আমায় লজ্জা দেবেন না দয়া করে”
বাকের শাহ্ এর চোখ জোড়া কেমন চিকচিক করে উঠলো। ঘনঘন শ্বাস ফেলে অকপটে বলল
“ তুমিই! তুমিই সাহাবাদ এর যোগ্য সম্রাজ্ঞী”
কথাটা তীরের মত গিয়ে বিধলো দুজন মানুষের কানে। সিমরান আর মারজান। মারজান একা একা বিড়বিড়ালো
“এ বুড়ো বলে কি রে সিমরান? শুনলি?”
সিমরান ও মারজান এর কানে কানে বলল
“কিছু করুন আম্মাজান। এবার কিন্তু ও আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে। আমাদের সব জারিজুরি ভেস্তে দিবে। ও যেন কোনো ভাবে মহলে জায়গা না পায় আম্মা কিছু করুন”
“আরে থাম হতচ্ছাড়ি। ছোট ইঁদুর এর মত চ্যাও চ্যাও করতে নিছে। সামনে যাইয়া কিছু কইতে পারো না? সেই তো ঠেইলা পাঠাই দেও আমারে”
গুটি কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সবার সামনে মারজান বলল
“ও বীর যতই হোক। ওকে এই মহল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল ভুলে গেছেন আপনারা?”
বাকের শাহ্ এর চোয়াল শক্ত হলো।
“সেসব ভাবার জন্য আমি এখনো মরে যাই নি বেগম। ভালো হয় তুমি অন্দরে চলে গেলে”
“কিন্তু…… “
“আহহহহ”
হাত উঁচু করে বিরক্ত ভঙ্গিতে মারজান কে থামিয়ে দিল বাকের শাহ্। গোটা প্রাসাদের রক্ষী প্রহরী দাস দাসী সকলেই সেখানে উপস্থিত। বাকের শাহ্ সবার উদ্দেশ্যে বললেন
“শোনো সবাই। আমরা কয়েকমাস আগে মেহেরুন্নেসা কে, অর্থাৎ আমাদের বৌ মা কে অযথাই ভুল বুঝে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ, আমি বাকের শাহ্, গোটা জনতার সামনে বলছি। আমরা আমাদের করা ভুলের জন্য অনুতপ্ত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা সসম্মান আমাদের বেগম কে ঘরে তুলছি।”
সাধু, সাধু ধ্বনিতে মুখরিত হলো চারিদিক। মারজান এর মুখটা চুপসে গেল। মেহেরুন্নেসা বাকের শাহ্ কে জানায়
“আব্বা আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে আপনার সঙ্গে”
“সব শুনবো আম্মা। আগে ভিতরে এসো। বিশ্রাম নাও”
বাকের শাহ্ এর কথা মত ভিতরে গেল সবাই। রক্ষীরাও যে যার কাজে গেল। বাইজিদ, মাহাদি আর গোটা কয়েক সৈন্য রইলো সেখানে। মাহাদি বাইজিদ এর দিকে তাকিয়ে বলল
“আমি আহত দের সেনা মহলে নিয়ে যাচ্ছি। ও…ওখানে হেকিম ডাকা হবে”
মাহাদি যেতে নিলে বাইজিদ পিছন থেকে ডাকলো
“বন্ধু”
মাহাদির পা তড়িৎ গতিতে থামলো। যুদ্ধ ক্ষেত্রেও তার এতটা উত্তেজনা কাজ করে নি যা এখন করছে। বুকের ভিতর যেন ধুপধাপ হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। পিছনে ফিরে ভগ্ন গলায় বলল
“এ কি বলছেন শাহজাদা। আমি আপনার হুকুমের গোলাম। আপনার দাস। বেতনভুক্ত কর্মচারী। আমার গায়ে এত বড় উপাধি লাগাবেন না। এর ভার যে বহু গুণে ভারী। আমি অতি নগন্য জনাব। এসব আমার সাথে যায় না। আমি আপনার দাস ই উত্তম।”
বাইজিদ স্মিত হাসলো
“তুমি যে ভাবে প্রতিটি দুঃখে দুর্দশায় ঢাল হয়ে দাঁড়াও…..”
বাইজিদ কে কথা শেষ করতে না দিয়েই মাহাদি বলল
“এ তো আমার কর্তব্য হুজুর। বিনিময়ে পারিশ্রমিক পাই”
বাইজিদ শব্দ করে হেসে ফেলল। মাহাদি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাকে হাসতে দেখে। বাইজিদ হাসতে হাসতেই বলল
“সুনেরাহ তোমায় এমনি এমনি পাথর মানব বলে না”
মাহাদি মাথা নিচু করে ফেলল। সুনেরাহ শুনেই সে বুঝেছে বাইজিদ সুনেহেরার কথা বলেছে। তাকে তার ভাইজান আদর করে সুনেরাহ বলে। মাহাদির ভাবনার মধ্যেই বাইজিদ আচমকা জড়িয়ে ধরলো মাহাদি কে। শক্ত গোছের পুরুষ টাও এক পা পিছিয়ে গেল তাল সামলাতে না পেরে। আসলে শক্তি জিনিসটা জিদ এবং যুদ্ধে খাটানোই শ্রেয়। আবেগের কাছে তা সব সময় পরাজিত। বাইজিদ মাহাদিকে ছেড়ে তার পিঠ চাপড়ে বলল
“কখনো যদি সুযোগ হয়, তোনার ঋণ কিছুটা শোধ করার চেষ্টা করবো”
বাইজিদ আর দাঁড়াল না। চলে গেল প্রাসাদের ভিতরে। দ্রুত পায়ে নিজের কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াতেই থমকে গেল সে।
দরজা আধখোলা। ভিতরে ঢুকতেই কপাল কুঁচকে এলো। মেহেরুন্নেসা মাথায় হাত দিয়ে এমন ভাবে বসে আছে যেন বড় সর কিছু ক্ষতি হয়ে গেছে। বাইজিদ গিয়ে পাশে বসে বলল
“কি হয়েছে?”
মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি অনুসরন করে সে ও ঘরের চারিদিকে চোখ বুলায়। পুরো কক্ষ এলোমেলো।
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাপড়। টেবিলের ওপর উল্টে পড়ে আছে পিতলের পেয়ালা। বিছানার চাদর কুঁচকে একাকার। মনে হচ্ছে কয়েকদিন ধরে মানুষটার কোনো হুঁশই ছিল না। বাইজিদের দিকে তাকাতেই মেহেরুন্নেসার বুকটা কেমন করে উঠলো। এলোমেলো চুল। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। যুদ্ধের পোশাকে এখনও রক্ত লেগে আছে।
কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলো। তারপর খুব আস্তে বলল
“আমায় ছাড়া খুব কষ্ট হয়েছে না?”
বাইজিদ এর শূন্য চাহনি তে মেহেরুন্নেসার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এই মানুষটা গত কদিনে কতটা ভেঙে পড়েছে, সেটা তার চেহারাই বলে দিচ্ছে। আলতো করে হাত ছোয়ায় স্বামীর গালে।
“এই তো আমি এসে গেছি। আপনি আর অযত্নে থাকবেন না। আমি আপনার পুরো খেয়াল রাখবো। নিজে হাতে গুছিয়ে রাখবো আমার শাহজাদা কে।”
বাইজিদ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললো।
“জানো তোমাকে দেখার পর ই আমি বুঝতে পারলাম, এর আগে আমি আসলে কখনো সত্যিকারের বসন্তই দেখিনি। তুমি চৈত্রের হুট করে আসা বাতাসের মত, জুড়িয়ে দাও সর্বাঙ্গ।
মেহেরুন্নেসা আর কথা বাড়ালো না। যুদ্ধের ভারী কালো পোশাক বদলে হালকা জামা পরে নিলো। তারপর নিজেই কক্ষ গোছাতে শুরু করলো। এক এক করে কাপড় তুলছে। চাদর ঠিক করছে।
উল্টে থাকা জিনিসপত্র জায়গামতো রাখছে। আর বাইজিদ চুপচাপ বসে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
এতদিন পর এই দৃশ্যটা অসম্ভব চমৎকার লাগছে তার কাছে। কত দিন এই ঘরে মেহেরুন্নেসার আনাগোনা দেখা যানি। কোমল পায়ে সে কক্ষে হেঁটে বেড়ায় নি। ঘরে ঢুকেই তার শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ টা পায় নি। বাইজিদ হঠাৎ বলল
“ঘরটা আমাদের দুজনের তুলনায় একটু বেশিই বড়। আরেকজন সদস্য আসলে ভালো হয়”
মেহেরুন্নেসার হাত থেমে গেল মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার কাজে মন দিলো।
“এত সহজে মরছি না আমি।”
বাইজিদের কপাল কুঁচকে এলো
“মরার কথা কে বলল?”
“আমি মরলেই তো দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন তাই না।”
ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটলো।
“আমি মোটেও বিয়ের কথা বলিনি বেগম। আমি একটা পুঁচকে শাহজাদির কথা বলছি। যে দেখতে হবে একদম সুনেরার মত”
মেহেরুন্নেসা ঈষৎ অবাক হয়
“আপার মত কেন? আপনার বা আমার মত হলে ক্ষতি কি?”
বাইজিদ পালঙ্কে হেলান দিয়ে বলল
“নাহহ, একজন শাহজাদি হিসেবে সুনেহেরা বড্ড মানানসই। ওর বেশভূষাই অন্যরকম। আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা। গোটা রাজ্যে সোনালি চুল আর দ্বিতীয় কারও দেখেছো? তাছাড়া ওর আত্মবিশ্বাস, তেজস্বী দৃষ্টি, সৎ সাহস। সব মিলিয়ে আমাদের কন্যা ওর মত হোক।”
সব গোছানো শেষ হতেই মেহেরুন্নেসা বলল “আমি গোসলে যাচ্ছি।”
কথাটা শুনেই বাইজিদ সোজা হয়ে বসলো। তারপর একেবারে গম্ভীর মুখে বলল
“আমাকেও নিয়ে চলো।”
মেহেরুন্নেসা ঘুরে তাকালো
“কি?”
“একসাথে গোসল করি।”
এত স্বাভাবিক ভাবে কথাটা বললো যে কয়েক মূহূর্ত হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসা।
তারপর চোখ বড় বড় করে বলল
“আপনার শরম লাগে না?”
বাইজিদ নির্বিকার মুখে উঠে দাঁড়ালো।
“না।”
মেহেরুন্নেসা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো। বাইজিদ এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
“তুমি কতদিন দূরে ছিলে। আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। এখন তোমাকে ছাড়া একটুও থাকবো না। বউ ন্যাউটা হয়ে তোমার আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াবো।”
মেহেরুন্নেসার মুখের রাগটা একটু নরম হয়ে এলো। তবুও গম্ভীর মুখে বলল
“তাই বলে গোসল…..?”
বাইজিদ মাথা নেড়ে বলল
“হ্যা।”
মেহেরুন্নেসা বিরক্ত হয়ে কপালে হাত দিলো।
“আল্লাহ… এই মানুষটাকে নিয়ে আমি কি করবো!”
অগত্যা সাথেই গেল তার প্রাণপ্রিয় শাহজাদা। অনেকক্ষণ পর গোসলখানা থেকে বের হলো তারা। গরম পানির বাষ্প এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে কক্ষজুড়ে। বাইরে গভীর রাত। দূরে কোথাও প্রহরীদের হাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে ক্ষীণভাবে।
মেহেরুন্নেসা কালো রঙের সালোয়ার সেট পরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। ভেজা চুলগুলো কোমর পেরিয়ে আরও নিচ পর্যন্ত নেমে আছে। পানি টুপটুপ করে পড়ছে ডগা থেকে। পেছন থেকে বেরিয়ে এলো বাইজিদ। তার চোখ শান্ত।
অনেকদিন পর যেন একটু স্বস্তি ফিরেছে সেখানে।
টেবিল থেকে নরম কাপড়টা তুলে নিয়ে ধীরে মেহেরুন্নেসার চুল মুছতে লাগলো অত্যন্ত যত্নে।
যেন কোনো দামি রেশম ছুঁয়ে আছে।
মেহেরুন্নেসা আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। বাইজিদের আঙুল বড় বড় ঘন চুলের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে বারবার। কেমন কামুকতা নিয়ে তাকিয়ে চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে দিলো।
মেহেরুন্নেসার ভেজা ঘাড়টা উন্মুক্ত হয়ে উঠলো।
বাইজিদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সেখানে।
তারপর খুব আস্তে ঝুঁকে ঘাড়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
মেহেরুন্নেসার চোখ বন্ধ হয়ে এলো সঙ্গে সঙ্গে।
শরীরটা কেঁপে উঠলো হালকা। বাইজিদ পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরলো ধীরে।
ভেজা চুলের গন্ধ, আতরের মৃদু সুবাস আর মেহেরুন্নেসার উষ্ণ শরীর সবটা একাকার হয়ে অবাস্তব সুন্দর লাগছিল তার কাছে। মেহেরুন্নেসাও হাত রাখলো বাইজিদের বাহুর ওপর।
কয়েক মুহূর্ত শুধু একে অপরকে অনুভব করল। যেন এতদিনের ভয়, দুশ্চিন্তা, যুদ্ধ সবকিছু থেকে একটু আশ্রয় পেয়েছে দুজনেই।
বাইজিদ মুখ গুঁজে দিলো তার কাঁধের কাছে।
নিচু গলায় বলল
“আর কখনো দূরে যেতে দিব না এই বলে দিলাম।”
মেহেরুন্নেসার বুকটা কেমন নরম হয়ে এলো।
ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। দু হাত তুলে বাইজিদের গলা জড়িয়ে ধরলো। তারপর কপাল ঠেকিয়ে খুব আস্তে বলল
“আপনাকেও আর একা ছাড়বো না।”
এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ দুজনেই তাকালো সেদিকে। বাইরে থেকে দাসীর কণ্ঠ ভেসে এলো “শাহজাদা… জমিদার বাবু দরবারে ডাক দিয়েছেন।”
বাইজিদ ভ্রু কুঁচকালো
“এত রাতে?”
“জি। সকলকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।”
মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ একে অপরের দিকে তাকালো। তারপর দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে দরবারের দিকে রওনা হলো। সাহাবাদ প্রাসাদের বিশাল দরবারখানা আলোয় ঝলমল করছে।
উঁচু স্তম্ভগুলোতে মশাল জ্বলছে। রঙিন কাঁচের ঝাড়বাতির আলো পড়ে পুরো প্রাসাদ যেন সোনালি হয়ে উঠেছে। দরবার ভর্তি মানুষ।
রাজ্যের জ্ঞানী-গুণী, সভাসদ, সেনাপতি, নায়েব, উজির সবাই উপস্থিত। এক পাশে জমিদার পরিবারের নারীরা বসে আছে। রত্নপ্রভা, সুনেহেরা, মারজান, সিমরান। সকলের চোখ দরজার দিকে কাঙ্ক্ষিত জুটির অপেক্ষায়।
মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ ভেতরে ঢুকতেই ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে।
আজকের যুদ্ধের দৃশ্য সবাই দেখেছে। মেহেরুন্নেসার নেতৃত্বে নারী যোদ্ধাদের আগমনী দৃশ্যতে যেন সাহাবাদের মানুষ যেন নতুন করে দেখেছে তাকে।
বাকের শাহ্ সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তার মুখ গম্ভীর, অথচ চোখে গর্বের ছাপ স্পষ্ট। তিনি ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। দরবার মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাকের শাহ্ গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন মেহেরুন্নেসার দিকে। তারপর ভারী কণ্ঠে বললেন
“আজ সাহাবাদ এক ভয়ংকর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছে। আর সেই যুদ্ধে যিনি নিজের সাহস, বুদ্ধি আর যুদ্ধদক্ষতা দিয়ে রাজ্যকে রক্ষা করেছেন…”
একটু থামলেন তিনি। চারপাশের সবার চোখ এখন মেহেরুন্নেসার দিকে। বাকের শাহ্ আবার বললেন
“তিনি এই প্রাসাদের বেগম। তিনি সাহাবাদের গৌরব।”
বাইজিদের বুকটা গর্বে ভরে উঠলো। মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হৃদস্পন্দন যেন কানে বাজছে। ঠিক তখনই বাকের শাহ্ উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন
“আজ থেকে সাহাবাদের সম্রাজ্ঞী… মেহেরুন্নেসা নূর।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো দরবার কেঁপে উঠলো।
“সম্রাজ্ঞীর জয় হোক!”
“সম্রাজ্ঞীর জয় হোক!”
চারদিক থেকে ধ্বনি উঠতে লাগলো। সুনেহেরা আনন্দে হাত চাপড়াতে লাগলো। রত্নপ্রভার চোখ ভিজে উঠলো গর্বে। আর বাইজিদ তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসার দিকে চোখভরা ভালোবাসা নিয়ে।
মনে মনে বলছে
“এই আসন, এই সম্মান সবচেয়ে বেশি তুমিই প্রাপ্য।”
দরবারের উল্লাসে মেতে উঠলো। মেহেরুন্নেসা সামনে এগিয়ে এলো। কালো পোশাকের ওপর সোনালি আলোর ছটা পড়ে তাকে আরও রাজকীয় লাগছে। পুরো দরবারের সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেহেরুন্নেসা ধীরে চারপাশে চোখ বুলালো। তার চোখে কোমলতা কম।
যেন এই কয়েকদিনে সে বদলে গেছে সম্পূর্ণ।
তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল
“আজ সাহাবাদ যে বিপদ থেকে বেঁচেছে, সেটা শেষ বিপদ নয়। আমি সব সময় প্রজাদের পাশে আছি। কিন্তু আব্বা, শাহজাদা থাকতে আমি কেন…?”
বাকের শাহ্ মুচকি হেসে বলল
“কারণ বাইজিদ নিজেই চাইছে। এটা স্থায়ী না আম্মা। রাজ্যের হাল সঠিক ভাবে ধরার জন্য একজন মমতাময়ী এবং শাসনকর্তী মা দরকার। যা তুমি নিজেই। বাইজিদ তো আছেই শাসক হিসেবে। তবে বর্তমানে তুমি এই সাহাবাদ এর মাথা।”
দরবারে চাপা গুঞ্জন উঠলো। মেহেরুন্নেসা তাদের উদ্দেশ্যে বলল
“আমাদের শত্রু শক্তিশালী। ধূর্ত। আর নিষ্ঠুর। তাই আজ থেকে সাহাবাদে কিছু নতুন নিয়ম চালু হবে।”
সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
“আগামীকাল দরবারে আমি সেই নিয়মগুলো ঘোষণা করবো। প্রাসাদের সদস্য থেকে শুরু করে সৈন্য, কর্মচারী, সাধারণ মানুষ সকলকেই সেই নিয়ম মানতে হবে। এমনকি জমিদার মহলের লোকদেরও”
মারজান তড়িৎ গতিতে তাকালো তার দিকে। মনে মনে বিড়বিড়ায়
“ফকিন্নির ঝি। তোরে দেখাইতেছি শাসন গিরি খারা”
মেহেরুন্নেসা মারজান এর দিকে তাকিয়ে বলল
“অন্যথায় শাস্তি পেতে হবে।”
বাকের শাহ্ ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
মাহাদি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সুনেহেরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে। তার ভাবতেই অবাক লাগছে, কয়েক মাস আগেও যে মেয়েটা এ মহলে এসেছিল ভীত, অপরিচিত হয়ে। আজ সেই মেয়েটাই পুরো সাহাবাদকে নির্দেশ দিচ্ছে।
বাইজিদের ঠোঁটের কোণে ধীরে গর্বের হাসি ফুটে উঠলো।
গভীর রাত। যুদ্ধ থেমে গেলেও সাহাবাদ প্রাসাদ পুরোপুরি শান্ত হয়নি এখনও।আহত সৈন্যদের সেবা চলছে, প্রহরীরা টহল দিচ্ছে। কড়া নিরাপত্তা চারিদিকে। অঙ্কুর কে বিশ্বাস নেই।
সেইসব কোলাহল থেকে একটু দূরে আস্তাবলের সামনে পায়চারী করছে সুনেহেরা। বেগুনি ঘাগড়ার নিচের অংশে এখনও ধুলা লেগে আছে। চুলগুলোও পুরো শুকায়নি। তার চোখে ঘুম নেই।
বারবার একই চিন্তা ঘুরছে মাথায়। আজও কি পিচাশ গুলো আসবে? বেশিরভাগই তো মরে গেছে। বাকিরা…..
হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো গম্ভীর কণ্ঠ।
“এত রাতে এখানে কি করছেন শাহজাদী?”
সুনেহেরা ঘুরে তাকালো। আস্তাবলের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাহাদি। যুদ্ধের পোশাক এখনও খোলা হয়নি পুরো। কাঁধে ক্ষতের দাগ স্পষ্ট। হাতে চামড়ার দস্তানা। তবুও মুখটা শান্ত।
সুনেহেরা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল
“অভিনয় করবেন না। আপনি জানেন সব।”
মাহাদি ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। সুনেহেরার গা ঘেষে দাঁড়ায়
“হুমমমমমম। জানিই তো। কেন অন্য কারও জানার কথা ছিল?”
“তা কখন বললাম”
“তাহলে কি বললেন”
সুনেহেরা বিরক্ত হলো কিছুটা
“বললাম জেনেও কেন প্রশ্ন করছেন?”
“আপনি কি রেগে আছেন শাহজাদি?”
সুনেহেরা কটমট করে তাকালো। মাহাদি একটু ভড়কে গেল। ভাবলো সুনেহেরা রেগে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে চরম আশ্চর্যের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে সুনেহেরা এক ঝাপে বুকে গিয়ে আছড়ে পড়লো মাহাদির। জড়িয়ে ধরলো মাহাদিকে। মুহূর্তের মধ্যে জমে গেল চারপাশ। মাহাদি যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল। তার পুরো দেহ শক্ত হয়ে উঠলো এক নিমিষে। যেন বুঝতেই পারছে না কি করবে। সুনেহেরা মুখ গুঁজে রেখেছে তার বুকে।
মাহাদি নড়ার শক্তিটুকু পাচ্ছে না। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো।
তার হাতদুটো মাঝ পথে থেমে রইলো কিছুক্ষণ।
স্পর্শ করবে কি করবে না সেটাই যেন বুঝতে পারছে না। শেষমেশ খুব ধীরে, অত্যন্ত সতর্কভাবে সে হাত রাখলো সুনেহেরার মাথায়।
তার গলা অস্বাভাবিক রকম নিচু হয়ে এলো।
“আপনি আছেন তো শাহজাদি। কারও কিচ্ছু হবে না”
সুনেহেরা চোখ বন্ধ করলো। মাহাদির বুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে স্পষ্ট। দ্রুত। অস্বাভাবিক দ্রুত। ঠিক তখনই শুকনো পাতার ওপর কারও হাঁটার শব্দ ভেসে এলো। সুনেহেরা চমকে উঠে দ্রুত মাহাদির বুক থেকে সরে দাঁড়ালো। মাহাদিও মুহূর্তেই সজাগ হয়ে গেল। দূর থেকে মশালের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। কেউ এদিকেই আসছে।
সুনেহেরা ফিসফিস করে বলল
“এত রাতে আস্তাবলে কে আসছে?”
কথা শেষ না হতেই মাহাদি তার হাত ধরে দ্রুত আস্তাবলের পাশের বড় খড়ের গাদার আড়ালে নিয়ে গেল। দুজন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো সামনের দিকে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ।
মনে হচ্ছে কাউকে কিছু না জানিয়েই বেরিয়েছে।
বাইজিদ একটা সাদা ঘোড়ার লাগাম ধরলো, মেহেরুন্নেসা ও উঠলো তার পিঠে। বাইজিদও উঠলো। তারপর ধীরে ধীরে দুজনে চলে গেল নদীর দিকের পথ ধরে।
সুনেহেরা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো।
“ওমা…”
মাহাদি নিচু গলায় বলল
“চুপ।”
তবে তার নিজের চোখেও মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে।
রাতের নরম বাতাস কেটে নদীর দিকে এগিয়ে চলেছে বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসা। আজ বহুদিন পর তারা এক হয়েছে। আকাশে বিশাল গোল চাঁদ। একদম রুপোর থালার মতো ঝলমল করছে। নদীর পানিতে সেই চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে অসংখ্য রুপালি রেখা। পাড়ের কাশফুল গুলো বাতাসে দুলছে ধীরে ধীরে।
দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
নদীর পাড়ে এসে দুজন ঘোড়া থামালো। বাইজিদ আগে নেমে হাত বাড়িয়ে দিলো।
মেহেরুন্নেসা হাত রাখতেই আলতো টানে নামিয়ে নিলো তাকে। তারপর দুজনে গিয়ে বসল নদীর ধারের বড় পাথরটার ওপর। কিছুক্ষণ কেউ কথা বললো না। শুধু নদীর শব্দ শুনছিল।
মেহেরুন্নেসার মুখে চাঁদের আলো পড়ে যেন দৃপ্তি ছড়াচ্ছে চারিদিকে। বাইজিদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই মেয়েটাকে যত দেখে, ততই নতুন লাগে তার কাছে। মেহেরুন্নেসা ধীরে মাথা রাখলো বাইজিদের কাঁধে। নদীর বাতাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে দুজনকে। বাইজিদ তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আস্তে চাপ দিলো। তারপর নিচু গলায় বলল
“যারা ভালোবাসার প্রমাণ চায়, তারা সবচেয়ে বোকা মেহের। ওরা জানে না ভালোবাসা প্রমাণে নয়, বিশ্বাসে হয়। এই হাত টা বিশ্বাস করে ধরে রাখো……”
বাইজিদ এর কথা শেষ হওয়ার আগে মেহেরুন্নেসা বলল
“রাখলাম। তারপর?”
“হাহহহ। আমি আজীবন বউ ন্যাউটা হয়ে তোমার আঁচলের তলায় ঘুরঘুর করবো”
কেমন হয়েছে সবাই জানিও কেমন? পরবর্তী পর্ব হারিয়ে না ফেলতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখো। যারা বলো পোস্ট করার অনেক ক্ষন পরেও তোমাদের সামনে যায় না, রিয়্যাক্ট দাও। যে পোস্ট গুলোতে রিয়্যাক্ট কমেন্ট করা হয়, সেগুলো চট করেই সামনে যায় এটা তো কারও অজানা নয়। ভালোবাসা সবাইকে
#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
৪৫ এর শেষাংশ
সকালের নরম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে কক্ষজুড়ে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসা রোদ এসে পড়েছে বিশাল পালঙ্কটার একপাশে। বাইজিদের ঘুম ভাঙলো। উঠতে গেলেই অনুভব করলো তার বুকের ওপর কেউ মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। চোখ নামাতেই ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। তার প্রিয় স্ত্রী গুটিশুটি মেরে তার বুকে শুয়ে আছে।
মাঝরাতে নদীর পাড় থেকে ফিরেছিল তারা। ক্লান্ত ছিল দুজনেই। শেয়ার সাথেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কেউ টেরই পায়নি। মেহেরুন্নেসা একদম শিশুর মত ঘুমিয়ে আছে। কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে বাইজিদের বাহু আর বালিশজুড়ে। ঘুমের মধ্যে তার নিঃশ্বাস উঠানামা করছে। বাইজিদ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো স্ত্রীর মুখটার দিকে। এত কাছ থেকে দেখলেও কেন যেন তৃপ্তি মেটে না তার।
মেহেরুন্নেসার কপালটা অসম্ভব মসৃণ।
লম্বা ঘন পাপড়িগুলো চোখের ওপর ছায়া ফেলেছে। ঘুমের মধ্যে ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। গোলাপি আভা লেগে আছে সেখানে। আর ছোট্ট নাকটা তো বাইজিদ এর ভীষণ প্রিয়।
বাইজিদের হঠাৎ ইচ্ছে হলো আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখে। কিন্তু ঘুম ভেঙে যাবে ভেবে ছুঁলো না। মুগ্ধ হয়ে দেখতেই থাকলো। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব শান্তি যেন এই মুখটার মাঝেই লুকিয়ে আছে।
আস্তে করে হাত উঠিয়ে কানের পাশের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিলো। মেহেরুন্নেসা ঘুমের মধ্যেই একটু নড়লো।
আরও গা ঘেঁষে এলো তার কাছে। বাইজিদের বুকটা কেমন নরম হয়ে গেল। নিচু হয়ে খুব আলতো করে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো সে।
তারপর মৃদু স্বরে ডাকলো
“মেহের…”
কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলো একটু আদর মিশিয়ে
“সম্রাজ্ঞী শুনছেন? আপনার স্বামী আপনাকে ডাকছে”
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে চোখ না খুলেই বলল “উঁহু…”
বাইজিদ হেসে ফেললো আস্তে।
“আজ আপনার দরবারে প্রথম দিন। ভুলে গেছেন? উঠতে হবে না? সবাই অপেক্ষা করছে।”
মেহেরুন্নেসা এবার ধীরে ধীরে চোখ খুললো।
ঘুমজড়ানো চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো বাইজিদের দিকে। তারপর খুব আস্তে বলল “আরেকটু ঘুমাই?”
বাইজিদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়ংকর কঠোর এই মেয়েটা স্বামীর কাছে কোমলমতি। বিষয়টা ভালো লাগলো বাইজিদ এর। সবসময় অত তেজী গম্ভীর থাকলে প্রেম-পিরিতি জমে নাকি? আলতো করে নাক নাক ঘষে দিল।
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে উঠে বসল। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর পড়ে আছে। চোখে মুখে এখনও ঘুমের ছাপ। কিন্তু উঠতেই কপাল কুঁচকে এলো তার। মাথাটা প্রচণ্ড ধরে আছে।
গত কয়েকদিনের যুদ্ধ, দৌড়ঝাঁপ, মানসিক চাপ সব যেন একসাথে এসে ভর করেছে শরীরে। বাইজিদ সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।
“কি হয়েছে?”
মেহেরুন্নেসা চোখ বন্ধ করে কপালে হাত রাখলো।
“মাথা টা ধরেছে একটু।”
বাইজিদের মুখে সঙ্গে সঙ্গে দুশ্চিন্তা নেমে এলো।
“আজ দরবারে না গেলে তাহলে। আরেকটু ঘুমিয়ে নাও”
মেহেরুন্নেসা ধীরে মাথা নাড়লো।
“প্রথম দিন টায় একদম ফাকি মারা যাবেই না।”
কিছুক্ষণ পর হাতমুখ ধুয়ে তৈরি হলো সে। কালো বোরখা আর নিকাবে পুরো শরীর ঢেকে ফেললো। শুধু চোখদুটো দেখা যাচ্ছে। সেই চোখেই রাজকীয় এক গাম্ভীর্য। বের হয়ে যাচ্ছিল সেই সময় থামলো মেহেরুন্নেসা। ফিরে তাকালো বাইজিদের দিকে। এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো তাকে। বাইজিদও শক্ত করে আগলে নিল। আদুরে কন্ঠে বলল
“আমার সম্রাজ্ঞী ভয় পাচ্ছে বুঝি?”
মেহেরুন্নেসা নিচু গলায় বলল
“হুমমম। খুব ভয় লাগছে।”
বাইজিদ স্ত্রীর মাথায় চুমু দিয়ে বলল
“আমি আছি তো, আমাকে আপনার সহকারী বানাবেন সম্রাজ্ঞী?”
মেহেরুন্নেসার মন গলল না ঠাট্টায়। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললো।
“স্বাধীনতা অর্জন করার চাইতে নাকি তা টিকিয়ে রাখা বেশি কঠিন? যুদ্ধ তো জিতে নিলাম, কিন্তু পুরো সাহাবাদের দায়িত্ব নেওয়াটা কি এতই সহজ হবে? এই যুদ্ধই তো শেষ যুদ্ধ নয়। আর…”
বাকিটা শেষ করলো না। বাইজিদ তার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিলো।
“তুমি পারবে। তুমি না পারলে আর কেউ পারবে না। আমি আছি তোমার সাথে। চলো”
দুজনে একসাথে দরবারের দিকে রওনা হলো।
আজ দরবার একটু বেশিই জমকালো। সকল সভাসদ, সেনাপতি, নায়েব, উজির সবাই উপস্থিত। মেহেরুন্নেসা ঢুকতেই পুরো দরবার দাঁড়িয়ে গেল।
“সম্রাজ্ঞীর জয় হোক”
সম্মান মিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে এলো চারপাশ থেকে।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেল। ধীরে ধীরে সামনে এগোলো সে। দরবারের মাঝখানে উঁচু আসনটা আজ তার জন্য সাজানো।
সোনালি কারুকাজ করা বিশাল আসন। সেটার দিকে তাকাতেই কেমন অদ্ভুত দুর্বলতা অনুভব হলো তার। এত বড় দায়িত্ব, এত মানুষের আশা, যদি না পারে? পা দুটো যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
মেহেরুন্নেসা চোখ তুলে তাকালো বাইজিদের দিকে। একদম অসহায় দৃষ্টিতে। যেন নীরবে বলছে, আমি পারবো তো? বাইজিদ বুঝলো। যেমনটা সে সব সময় বোঝে তার স্ত্রী কে। সামনে এগিয়ে এলো। তারপর সবার সামনে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেহেরুন্নেসার হাতটা ধরে ফেললো। আস্তে করে বলল
“শুধু সামনে তাকাও। পুরো সাহাবাদ আজ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।”
মেহেরুন্নেসার কাঁপা নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো। বাইজিদ তাকে নিয়ে গিয়ে সেই সম্রাজ্ঞীর আসনে বসালো। পুরো দরবার আবার গর্জে উঠলো
“সম্রাজ্ঞীর জয় হোক!”
সম্রাজ্ঞীর আসনে বসে আছে মেহেরুন্নেসা। তবুও তার বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা কাটছে না।
বাইজিদ এর উদ্দেশ্য টা বড্ড ভাবাচ্ছে তাকে। কি করতে চাইছে বাইজিদ? সে কেন নিজে না বসে তাকে বসালো গদিতে? একবার আড়চোখে তাকালো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদের দিকে।
তার মুখে কোনো আফসোস নেই, বরং অদ্ভুত শান্তি। যেন মেহেরুন্নেসাকে এই জায়গায় দেখেই সে তৃপ্ত।
দরবারের কার্যক্রম শুরু হলো। নায়েব নেওয়াজে আবিদ সামনে এগিয়ে এলো। তার চেহারাও গম্ভীর। যুদ্ধের পর পুরো রাজ্যই যেন বদলে গেছে।
মাথা নত করে বলল
“সম্রাজ্ঞী সাহেবা, গতরাতের আক্রমণে সীমান্তের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রহরা আরও জোরদার করা হয়েছে। এখন যদি আপনি আপনার ঘোষিত নিয়মাবলি সম্পর্কে আদেশ প্রদান করেন…”
পুরো দরবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে। মেহেরুন্নেসা ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তার কালো নিকাবের আড়াল থেকেও গাম্ভীর্য স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। শান্ত কণ্ঠে বলল
“গতরাতের আক্রমণ আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। শত্রু এখন আর দূরে নেই। তাই আজ থেকে সাহাবাদের নিরাপত্তায় নতুন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দরবারের সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
“সূর্যাস্তের পর প্রয়োজন অপ্রয়োজন কোনো দরকারেই কেউ প্রাসাদের বাইরে যেতে পারবে না। এতকাল এই নিয়ম কেবল জমিদার মহলের মানুষেরা মেনে এসেছে। এখন গোটা রাজ্যের মানুষ মানবে। উত্তরের জঙ্গল পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। দিনে-রাতে কোনো সময়েই ওদিক পানে কেউ যাবে না যতদিন সম্রাজ্ঞীর পরবর্তী ঘোষণা না আসে। রাজ্যের প্রত্যেকটা মানুষকে সপ্তাহে একদিন জমিদার দের প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণে হাজির হতে হবে। যুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করুক, নিজেদের সুরক্ষার জন্য হলেও কিছুটা অনুশীলন প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়ই আসবে। সেনাপ্রধান মাহাদি ইকরাম এর নেতৃত্ব প্রত্যেক পুরুষ ওই শয়তান টার বাহিনী দের আক্রমণ থেকে নিজেকে সুরক্ষা করার জন্য অস্ত্র শিক্ষা নিবে।”
মাহাদি সম্মতি সূচনা মাথা নিচু করে কদমবুসি করলো। মেহেরুন্নেসা ফের বলল
“আর নারী দের প্রশিক্ষণ দিব আমি। সাথে প্রত্যেক মহল্লায় রাত্রিকালীন প্রহরা বাড়ানো হবে। আর প্রতি পরিবার থেকে অন্তত একজন পুরুষকে অস্ত্রচালনার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে এমন ভাবে যাতে প্রয়োজনে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারে।”
সভাসদদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন শুরু হলো।
মেহেরুন্নেসা থামলো না।
“নারীদের যুদ্ধপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবে আলাদা।”
এই কথায় পুরো দরবার একেবারে চুপ হয়ে গেল।
অনেকেই অবাক চোখে তাকালো। আলাদা বলতে? কি করতে চান সম্রাজ্ঞী?
মেহেরুন্নেসা বলল
“গতরাতেই আপনারা দেখেছেন, প্রয়োজন হলে নারীরাও যুদ্ধ করতে পারে।”
বাইজিদের ঠোঁটের কোণে গর্বের হাসি ফুটলো।
মেহেরুন্নেসা এবার একটু থামলো। তারপর বলল
“এবার নিয়মের বিষয়ে আসি।”
সে চোখ বুলালো পুরো দরবারে। হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে গেল। মারজান নেই। এত গুরুত্বপূর্ণ দরবারে সে অনুপস্থিত? মেহেরুন্নেসার চোখ ঠান্ডা হয়ে এলো মুহূর্তেই। কঠিন গলায় বলল
“মারজান কোথায়?”
কেউ উত্তর দিতে পারলো না। দরবারে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ আরও কঠোর হয়ে উঠলো।
“তাকে এখনই উপস্থিত করা হোক।”
কিছুক্ষণ বাদেই একজন দাসী এসে জানালো মারজান অসুস্থ। দীর্ঘ সময় ধরে চললো দরবার।
এক এক করে সবাই নিজেদের মতামত দিলো। নিরাপত্তা, খাদ্যসংকট, সীমান্ত পাহারা সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হলো।
সবশেষে দরবার মুলতবি ঘোষণা করা হলো।
সকল সভাসদ ধীরে ধীরে বেরিয়ে যেতে লাগলো।
কিন্তু মেহেরুন্নেসা নিজের কক্ষে ফিরলো না।
সোজা চলে গেল প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণের দিকে।
প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণে পৌঁছাতেই সৈন্যরা পথ ছেড়ে দাঁড়ালো। মেহেরুন্নেসার পরনে ভারী রাজকীয় কোনো পোশাক নেই। কালো যুদ্ধবেশ। কোমরে তলোয়ার। পিঠে ধনুক। মাহাদি নিজেও উপস্থিত সেখানে। সে কিছুটা বিস্ময় নিয়েই তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসার দিকে। মেহেরুন্নেসা একটা তলোয়ার হাতে নিলো।
তারপর ধীরে ঘুরালো একবার। মুহূর্তেই পুরো ভঙ্গি বদলে গেল তার। যেন এই নারী আর সেই দরবারে বসা সম্রাজ্ঞী এক নয়। চোখে ভয়ংকর মনোযোগ। পরের মুহূর্তেই শোঁ শোঁ শব্দ তুলে তলোয়ার চালাতে শুরু করলো সে। এত দ্রুত, এত নিখুঁত আঘাত যে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা হতভম্ব হয়ে গেল। তার পায়ের চালনা অত্যন্ত মসৃণ। এক পা পিছিয়ে আঘাত ঠেকাচ্ছে, পরমুহূর্তেই সামনে এগিয়ে পাল্টা আক্রমণ করছে।
মাহাদির চোখ সরু হয়ে এলো।
বুঝল সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসা প্রকৃত যুদ্ধ জানে। এরপর ধনুক হাতে নিলো সে। দূরে কয়েকটা লক্ষ্যবস্তু বসানো ছিল। প্রথম তীর একদম মাঝখানে। দ্বিতীয় তীর গিয়ে প্রথমটার গায়ে লাগলো। তৃতীয়টা ও ঠিক কেন্দ্রভাগে। চারপাশে ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়লো।
অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল চন্দ্রপ্রভা।
তার মুখের রঙ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এতদিন সে নিজেকে সাহাবাদের সবচেয়ে দক্ষ নারী যোদ্ধা ভাবতো। সবার প্রশংসা, সবার বিস্ময় সবসময় সে পেয়েছে। কিন্তু আজ সবাই তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে। তার যুদ্ধদক্ষতা তার সাহস তার উপস্থিতি সবকিছু যেন চন্দ্রপ্রভাকে ছাপিয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় কথা সে এখন সম্রাজ্ঞীও। হঠাৎ তার মনে পড়লো অঙ্কুরের কথা। অঙ্কুর ও মেহেরুন্নেসার রুপের মোহে অন্ধ। চন্দ্রপ্রভা যে তার জন্য কতকিছু করেছে তা অঙ্কুরের চোখেও পড়ে না। ভালোবাসা তো দূর। সামান্য কৃতজ্ঞতাও নেই তার প্রতি। সব গুণ কি মেহেরুন্নেসা একাই আয়ত্ত করছে? চন্দ্রপ্রভার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন তীব্র জ্বালা উঠলো। অদ্ভুত এক হিংসা।
ঠোঁট চেপে তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসার দিকে।
****
ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে আছে মেঝেজুড়ে। উল্টে পড়ে আছে ভারী কাঠের টেবিল। দেয়ালের মশাল পর্যন্ত ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে রাগে। গতরাতের পর থেকে অঙ্কুর যেন উন্মাদ হয়ে গেছে। তার চোখ লাল। চুল এলোমেলো। হাতে এখনও শুকিয়ে থাকা রক্তের দাগ। প্রাসাদের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সামনে থাকা একটা ধাতব পাত্রে লাথি মারলো সে। বিকট শব্দ তুলে সেটা গিয়ে দেয়ালে আছড়ে পড়লো। বিজ্ঞানীরা ভয়ে এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কারও মুখে কথা নেই। অঙ্কুর হঠাৎ সামনে থাকা বৃদ্ধ এক বিজ্ঞানীর কলার চেপে ধরলো।
দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“তোদের এত বিদ্যে না?” এত ওষুধ বানাস! এত পরীক্ষা করিস!”
লোকটা ভয়ে কাঁপছে। অঙ্কুর তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো মেঝেতে। তারপর চিৎকার করে উঠলো
“তাহলে এমন ওষুধ বানাস না কেন যেটা খাইয়ে দিলে মেহেরুন্নেসা আমার দিওয়ানা হয়ে যাবে!”
কক্ষটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। কেউ সাহস করে কথা বলছে না। কেবল অঙ্কুরের গর্জন আর ভাঙচুরের শব্দ। অঙ্কুর আবার গর্জে উঠলো
“বল!”
এক বৃদ্ধ চিকিৎসাবিজ্ঞানী কলার চেপে ধরে গলায় ছুরি ধরলো
“বল বানাবি কিন?”
বৃদ্ধ লোকটা কাঁপা গলায় বলল
“হুজুর এমন কোনো ওষুধ হয় না। মানুষের অনুভূতি জোর করে……”
কথা শেষ হওয়ার আগেই অঙ্কুর পাশে থাকা কাঁচের শিশিটা ছুঁড়ে মারলো তার দিকে। শিশিটা গিয়ে লোকটার কপালে আঘাত করলো।রক্ত নেমে এলো সঙ্গে সঙ্গে। অঙ্কুর পাগলের মতো হাসতে লাগলো।
“হয় না? তোরা মানুষকে নরপিশাচ বানাতে পারিস আর একটা মেয়ে আমাকে ভালোবাসবে সেই ওষুধ বানাতে পারিস না?”
সে এক লাফে টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়ালো।
চারদিকে ছড়িয়ে থাকা রাসায়নিকের শিশিগুলো একে একে ফেলে দিতে লাগলো। নীল তরল মিশে যাচ্ছে লাল ধোঁয়ার সঙ্গে। কোথাও আগুনের ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ উঠছে। পুরো কক্ষজুড়ে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো। অঙ্কুর নিজের মাথার চুল টানতে টানতে বিড়বিড় করলো
“ও আমার হবে। ওকে আমার হতেই হবে…”
ভাঙা কাচের বোতল একজন সৈন্যের গলায় চেপে ধরে বলল
“আচ্ছা বলতো বাইজিদ বেশি সুন্দর নাকি আমি?”
লোকটা বুঝতে পারছে না কি বলবে। যদি সত্যি বলে যে শাহজাদা বাইজিদ সুন্দর তাহলে কি মেরে দিবে? নাকি তাকে সুন্দর বললে মিথ্যা বলার অপরাধে চোখ তুলে নেবে।
“হু…হুজুর আ…আপনি, আপনি সুন্দর”
অঙ্কুর৷ হো হো করে হেস ওঠে
“সঠিক বলেছিস। বেঁচে গেলি”
তার চোখে তখন ভয়ংকর উন্মাদনা। এক বিজ্ঞানী আতঙ্কিত চোখে অন্যজনের দিকে তাকালো।
অঙ্কুর যেন পাগল হয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো ধুতি পাঞ্জাবি পরা মধ্যবয়স্ক একজন পুরুষ। মাথা নিচু করে বলল
“শাহজাদা, প্রাসাদের উল্টো দিকে জঙ্গলের শেষ প্রান্তের কূয়োতে বিজ্ঞানী দের তৈরী কৃত গত সপ্তাহের সব গুলো রাসায়নিক বিস্ফোরক ফেলে দিয়েছে কেউ।”
অঙ্কুর বিরক্ত হলো
“তাতে এত চ্যাচানোর কি আছে? ফেলে দিয়েছে কে সেটা আমি দেখে নিচ্ছি। তুমি লোক নিয়ে গিয়ে তুলে আনো সবগুলো”
লোকটা শুকনো ঢোক গিলে ভয়ার্ত চোখে তাকালো অঙ্কুরের দিকে। অঙ্কুর বিরক্ত হলো।
“ওমন হ্যাবলার মত তাকিয়ে আছিস কেন”
লোকটা মাথা নিচু করে বলল
“হুজুর অগ্নি বিস্ফোরণ পানিতে ভিজলে নষ্ট হয়ে যায়। ওগুলো আর কাজে লাগবে না।”
ব্যাস কথা বলতে দেরি। অঙ্কুরে হাতে থাকা ভাঙা কাঁচের বোতটা জোরসে মেরে দিতে দেরি নেই লোকটার মাথায়।
“কে? কে করলো এতবড় দুঃসাহসিক কাজ? তার কি জানের মায়া নাই। হ্যা? কে সেই বিশ্বাস ঘাতক। পাহারাদার গুলো কি করে সারা রাত। সব কয়টার গর্দান নেব আমি”
আহত লোকটা মাথায় হাত চেপে বলে
“হুজুর গত রাতে কয়েকজন প্রহরি জঙ্গলের ভিতর থেকে একজন নারী কে ঘোড়া নিয়ে ছুটে আসতে দেখেছিল। থামানোর চেষ্টা করতেই তাদের আক্রমণ করে। একা একটা নারী ১৬ জন সৈন্য কে আহত করেছে”
অঙ্কুরের চোখ জোড়া বড় হলো। যেন কিছু সন্দেহ করছে। নিচু গলায় বলল
“তারা কি দেখেছে নারীটিকে? কেমন দেখতে?”
লোকটা বসে পড়লো। ভাঙা আহত গলায় বলল
“হুজুর শুধু বলল, তার চুল গুলো সোনালি রঙের ছিল”
অঙ্কুরের গায়ে যেন বজ্রপাত হলো। এই সন্দেহ ই করেছিল সে। মেয়েটা একাই এতকাল ধরে তার সাথে যা করে আসছে। গোটা সাহাবাদ তার সাহস পায়নি। একবার বন্দি করেছিল। অঙ্কুর কে পর্যন্ত আহত করতে ছাড়ে নি। সেই বার মরতে মরতে বেঁচে গেছে অঙ্কুর। ওই মেয়ের তেজ এর সামনে টিকা মুশকিল। কি নিখুঁত তীরের নিশানা। এমন ভয়ংকর দুঃসাহসী এই পিচ্চি মেয়েটাই অঙ্কুরের আতঙ্কের কারণ। অযথাই ভয় পায় অঙ্কুর ওর নাম শুনলেই। কে জানে কবে ওর ওপর ই আক্রমণ করে বসবে।
ঠিক তখনই ভারী দরজাটা কড়কড় শব্দ তুলে খুলে গেল। কক্ষে প্রবেশ করলো চন্দ্রপ্রভা। তার মুখে কোনো ভয়ের ছিটে ফোটা নেই। অদ্ভুত ঠান্ডা ভাব তার বদন জুড়ে। অঙ্কুর ভেবেছিল চন্দ্রা আর আসবে না। কোন সাহসে এসেছে আবার?
অঙ্কুর ঘুরে তাকাতেই চোখ আরও লাল হয়ে উঠলো। মুহূর্তেই সামনে এগিয়ে এলো সে।
“তুই কোন সাহসে এখানে এসেছিস?”
পরের মুহূর্তেই সজোরে চেপে ধরলো চন্দ্রপ্রভার গলা। চন্দ্রা দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেল। অঙ্কুর দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“সব তোর জন্য হয়েছে! তোরা কেউ আমার কথা শুনলি না! মেহেরুন্নেসা পালালো, সাহাবাদ আমার হাত থেকে বেরিয়ে গেল!”
তার আঙুলের চাপ বাড়তেই শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো চন্দ্রার। আজ আর ধৈর্য বাধ মানলো না।
চোখ জোড়ায় আগুনের মত জ্বলে উঠলো রাগ।
পাশের টেবিলে রাখা ভারী চিনামাটির ফুলদানিটা হাতে তুলে নিয়ে সজোরে আঘাত করলো অঙ্কুরের মাথায়। টুকটো টুকরো হয়ে গেল দানি টা।
সেই শব্দটা পুরো কক্ষে প্রতিধ্বনিত হলো। অঙ্কুর ব্যথায় গর্জে উঠে পিছিয়ে গেল। মাথা চেপে ধরে টলতে লাগলো কয়েক পা। কপালের পাশ কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। চন্দ্রপ্রভা হাঁপাচ্ছে। গলার কাছে লাল দাগ পড়ে গেছে।
অঙ্কুর অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। যেন ভাবতেই পারেনি চন্দ্রা তার গায়ে হাত তুলবে। চন্দ্রপ্রভা ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইলো অল্প সময়। ভারী গলায় বলল
“বেইমান, প্রতারক। তোর জন্য কি কি না করেছি? এতগুলো মানুষের জীবন নিয়ে খেলছিস। তা জেনে বুঝেও তোর সঙ্গ দিয়ে গেছি। আর আজ তুই মেহেরুন্নেসা কে চাস? আমি কি তোর জীবনের কিচ্ছু না? আমাকে ভালো না বাসার কারণ আজ তোকে বলতেই হবে”
অঙ্কুর আহত অবস্থাতেও হো হো করে হেসে উঠে। হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে বলে
“ও রুবা, ও কি বলে রে? শুনছিস?”
চন্দ্রা চমকে পাশে তাকাতেই দেখলো রুবায়েত দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটেও হাসির রেশ। পোষাক পত্র একদম স্বাভাবিক। তার কপাল টা প্রশস্ত হলো।
“ওওওও তাহলে তুইও এই নোংরা খেলার সামিল আপা? বাহহহহ! হাত তালি, হাত তালি”
তালি বাজাতে লাগলো প্রভা
“কি দারুণ অভিনয় তোদের। শালার আমিও ধরতে পারলাম না?”
রুবায়েত রেগে দাঁতে দাঁত চিপে এসে চন্দ্রার চুলের মুঠি ধরলো শক্ত করে। চন্দ্রা ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো।
“আপা ছাড় লাগছে”
রুবায়েত কটমট করে বলল
“ভাইজান বিয়ে করবে মেহেরুন্নেসা কে। আর আমি বাইজিদ কে। আর তুই কিনা নিজের ভাইয়ের সাথে পিরিত করতে চাস হ্যা? ভাইজান আমাদের আপন ভাইয়ের মত। তার সাথে তুই….? ছিঃ।”
চন্দ্রা চুল ছাড়াতে ছাড়াতে বলল
“অন্তত তোর মত অন্যের স্বামীর দিকে তো নজর দিই না। এতদিন ভালোবাসতাম ওকে। আজ থেকে ওর মুখে থুহহহ”
রুবায়েত আরও জোড়ে চুল টেনে ধরতেই চন্দ্রপ্রভা চিৎকার করে উঠলো। সেই মূহুর্তে একটা তীর শো শো করে উড়ে এসে রুবায়েত কে এফোড় ওফোড় করে দিল। অল্পের জন্য তা চন্দ্রা কে স্পর্শ করলো না। উপস্থিত সকলে যেন আচমকা এই আক্রমণে স্তব্ধ। অঙ্কুর সহ সকলে যেদিক থেকে তীর এসেছে সেদিকে তাকাতেই দেখলো সোনালী ভোড়াটার পিঠে সুনেহেরা। চেঁচিয়ে বলল
“আপা জলদি আয়।”
এত ব্যাস্ততার মধ্যেও তোমাদের জন্য লিখি। ৩-৪ ঘন্টা সময় লাগে একটা পর্ব লিখতে। তাও এক বসায় লিখতে পারছি না কদিন হলো। সুন্দর একটা কমেন্ট ও তো করতে পারো প্রত্যেকে। আমি এত বড় পর্বের একটা গল্প লিখতে পারি। তোমরা এক লাইন কমেন্ট করতে পারো না? রিয়্যাক্ট দিও সবাই। ৩.৫k করা চাই কিন্তু এই পর্বে
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১০
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৪ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২১ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ গল্পের লিংক
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৯ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩২ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)