#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৪৪
বড় ঘাগড়া টা দুই হাতে ধরে মহলের বাইরের চওড়া পথটা দুয়ে হেঁটে যাচ্ছে সুনেহেরা। চোখে মুখে বিরক্তি। রোদে মোমের মত গায়ের রং যেন গলে পড়ছে। লাল হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ মুখশ্রী। কিছুক্ষণ আগেই এক দাসী খবর পাঠালো নায়েব নেওয়াজে আবিদ তার অপেক্ষায় বাগানে দাঁড়িয়ে। সেদিন সিমরান বাগানে কিছু অদ্ভুত গর্জন শুনেছিল, বাইজিদ সকলকে নিষেধ করেছে সেদিকটায় যেন কেউ না যায়। কিন্তু এই আকাঠা লোকটা সেখানেই ডেকেছে সুনেহেরা কেন।
“এই অকর্মা টা কে কেন যে আব্বা নায়েব করেছে। ইচ্ছে করে শূলে চড়িয়ে দি।”
গালাগাল দিতে দিতে বাগানে উপস্থিত হলো সুনেহেরা। কোথাও আবিদ কে না দেখে বিরক্ত হয়ে বলল
“বলি বাতাসের সাথে নাগড়দোলা চড়ছেন নাকি? ডেকে হাওয়া হয়ে গেলেন? আমার কি সময়ের দাম নেই? আপনার মাইনে কেটে নি…..”
সুনেহেরার কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখলো আবিদ একটা গাছের ডালে। সুনেহেরা হা করে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বলল
“এ কিইইই? ওমন বাঁদরের মত উল্টো ঝুলছেন কেন? বলি আমাকে কি এমন হনুমান নাচ দেখাতে ডেকেছেন? আকাঠা লোক একটা। আপনার চাকরি ছাড়া করে দিব আমি আব্বা কে বলে”
আবিদ গাছে ঝুলেই বলল
“আমার চাকরি না থাকলে কিন্তু সিমরান কে বিয়ে করতে পারবো না”
সুনেহেরা চোখ মুখ ঝাড়া দিয়ে মাথা ঝাকালো
“ওমা আমি তো মজা করছিলাম। আপনার চাকরি আছে, আছে। আপনি তাও পেত্নী টাকে বিদেয় করুন”
আবিদ ধপ করে নামলো গাছ থেকে। সুনেহেরার দিকে হাতে থাকা কৃষ্ণচূড়ার ডাল টা এগিয়ে দিয়ে বলল
“এটা আপনার জন্য শাহজাদী। আপনার সোনালি চুলে লাল কৃষ্ণচূড়া বড্ড মানাবে”
সুনেহেরা এক ভেংচি কেটে নিলো ফুলের ডাল টা।
“এনেছেন?”
আবিদ মৃদু কপাল কুচকায়
“কি?”
নিজের রাগ কে যেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সুনেহেরা। খ্যাক খ্যাক করে বলল
“এই কানা নাকি আপনি হ্যা? সেদিন যে কানের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম গোলা বারুদ চাই। দাঁত কেলিয়ে হে হে করে হাসলেন। এখন বলছেন কি?”
আবিদ মাথা নিচু করে বলল
“শাহজাদী, দুর্গাপুর থেকে এগুলো আনা হয়। যখন রাজ্যের জন্য আনা হবে তখনই আনতে পারবো। আলাদা করে আনার চিন্তা করলে আমায় বন্দি করবে তারা”
“তাহলে নিজের চেহারা টা মহলে গিয়ে দেখিয়ে আসলেই পারতেন। আমায় এখানে ডাকলেন কেন? খেয়ে দেয়ে কাজ নেই? নাকি বিয়ের ভূত মাথায় চড়ে সব গিলে বসেছেন”
আবিদ এর মাথা ঘুরে উঠে। এ মেয়ে কত কথা বলে। মিনমিনে গলায় বলল
“আসলে আমি একটা বিচার নিয়ে এসেছিলাম”
সুনেহেরা আরও তেতে উঠলো
“বিচার করার আমি কে? দরবারে যান। আব্বা আছে ভাইজান আছে। আমার কাছে কি?”
“শাহজাদি একটা পরামর্শ চাই”
সুনেহেরার চোখ সরু হলো। আবিদ বুঝলো আর হেঁয়ালি করলে শাহজাদি তার মাথা না ফাটিয়ে দেয়। তাই বলল
“শাহজাদি, ধরুন কোনো জমিদার দের কর্মচারী যদি শাহজাদি কে ভালোবাসে। তাহলে সেটা কি অপরাধ?”
“হ্যা”
সুনেহেরার অকপট উত্তরে ভড়কে গেল আবিদ। শুকনো ঢোক গিলে চোখ বড় বড় করে বলল
“কেন? কোনো গরীবের কি ভালোবাসার অধিকার নেই?”
সুনেহেরা ফুলের পাপড়ি গুলো এক ঝাড়া মেরে বলল
“আসলে তো সে ভালোবাসে না। সে চায় রাজত্ব, জমিদারি। ভালোবাসা টালোবাসা ফাউ কথা। নইলে সে গরীব কোনো এক গরীব কেই ভালো বাসলে পারে। শাহজাদি কেই কেন?”
আবিদের মুখে মেঘের মত কালো ছায়া নেমে আসে। টলমলে চোখো সুনেহেরার দিকে তাকিয়ে বলে
“যদি নিঃস্বার্থ ভাবে, অর্থবিত্তের লোভ ছাড়াই ভালোবাসে?”
সুনেহেরা ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ ভেবে বলল
“তাহলে ভালো বাসাই যায়”
“আর যদি শাহজাদি তার প্রেম গ্রহণ না করে?”
সুনেহেরা ফোস করে নিশ্বাস ছাড়ে। একটা ফুল ছিড়ে সেটা নিজের কানের পিঠে গুঁজতে গুঁজতে বলে
“তাহলে আর কি? প্রেম ভালোবসা কি আর জোর করে হয়? তবে গ্রহণ করবে না তার মানে এই না যে সে গরীব বলে তাকে প্রত্যাখ্যান করছে। হতেও পারে সে, অন্য কাউকে ভালোবাসে”
আবিদের গলা শুকিয়ে এলো। ঘামতে লাগলো দরদর করে। সুনেহেরা তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল
“আমি আব্বাকে আগেই বলেছিলাম আপনার মধ্যে ঘাপলা আছে। বানিজ্যে দেশে দেশে আপনাকে না পাঠাতে। আবার কোন রাজ্যের শাহজাদি কে নজর করে বসেছেন। আপনার কিন্তু ওই পেঁচামুখীকে নিয়ে মহল ছাড়া হওয়ার কথা”
“কাকে নিয়ে?”
সুনেহেরা বিরক্তি তে কপাল কুচকায়
“পেয়ারা পেরে দিন”
“আমি?”
সুনেহেরা রাগে চোখ বড় বড় করে তাকায়
“একটু আগে তো বেশ হনুমানের মত ঝুলছিলেন। এখন কি সমস্যা?”
কথা শেষ হতে না হতেই পিঠের ওপর দুম করে একটা পড়লো। ব্যাথায় পিঠে হাত দিয়ে পিছনে ঘুরতেই দেখলো রত্নপ্রভা অগ্নিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শক্ত গলায় বলল
“তোকে কতবার বলেছি, নায়েব মশাই এর সাথে সম্মান এর সহিত কথা বলবি। এগুলো কি ব্যাবহার”
সুনেহেরা কটমট করে আবিদের দিকে তাকালো। এই হুতুমপেঁচার জন্য আপা মারলো ওকে। আবিদ সুনেহেরার রাগী দৃষ্টি দেখে বলল
“ইয়ে শাহজাদী, তেমন কিছু বলে নি”
“আপনি আর ওকে আশকারা দেবেন না। দিন দিন খুউব অভদ্র হচ্ছে। চল গোসল করবি”
বলেই মহলের পিছনের নদীর দিকে হাঁটা দিল রত্নপ্রভা। সুনেহেরা পিছন থেকে বলল
“না আমি বাগান বাড়ির ওই বিলে যাব গোসল করতে।”
প্রভা দাঁড়ালো না।
“যা তুই একা একা। তোকে ভূতে খেয়ে নেবে। তখন বুঝবি”
সুনেহেরা নেওয়াজের দিকে তাকাতেই বেচারা এক লাফ দিয়ে উঠলো
“এই না না। আমি কিন্তু নিয়ে যেতে পারবো না। শাহজাদা শুনলে আমায় অনেক বকবে”
সুনেহেরা ভেংচি কাটে
“লাগবে না আপনার হেল্প। আমি মাহাদি কে বলছি। হুহহহ”
আবিদ অবাক হয়ে সুনেহেরার পিছন পিছন হাটা ধরলো।
“বাবাহহহ, শাহজাদি ইংরেজিও জানে? আর সেনাপ্রধান এর অত সময় কই আপনাকে বিলে পাহারা দিতে যাবে? ওনার কত কাজ।”
হাটতে হাটতে দুজন প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণের দিকে গেল। ভিতরে থেকে ঢাল-তলোয়ার আর অস্ত্রের ঝনঝন আওয়াজ। মাহাদি পূর্ণ মনোযোগে তলোয়ার চালনায় পারদর্শী হওয়ার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সৈন্য দের। ৫ জনের সাথে একাই লড়ছে। আবিদ বলল
“বললাম না সে ব্যাস্ত। এখন আপনার ডাক তার কানে যাবে কিনা সন্দেহ আছে”
বেগুনি রঙের ঘাগড়া টা দুহাতে উঁচু করে মাহাদি আর পাঁচ সৈন্যের কাছাকাছি যেতেই মাহাদি ইশারা করলো তাদের থামতে। আবিদের ভ্রু কুচকে গেল। শাহজাদী কিছু বলার আগেই মাহাদি থেমে গেল? সুনেহেরা কপাল কুচকে বাচ্চাদের মত আবদার করে বলল
“আমি বাগান বাড়ির ওই বিল টাতে গোসল করতে যেতে চাই”
আবিদ অধীর আগ্রহে তাকিয়ে মাহাদির অপেক্ষায়। সে নিশ্চয়ই দুজন সৈন্য কে বলবে যাও তোমরা শাহজাদির সাথে। কিন্তু আবিদকে ভুল প্রমাণিত করে মাহাদি নিজের তলোয়ার টা এক সিপাহীর হাতে দিয়ে বলল
“যেভাবে দেখালাম সেভাবে করবে। আগে তাল সামলানো রপ্ত করো। চলুন শাহজাদি”
মাহাদি পথের দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। সুনেহেরা আবিদের দিকে তাকিয়ে বিশ্বজয়ের এক হাসি ঝুলিয়ে নাচতে নাচতে যেতে লাগলো আস্তাবলের দিকে। বাগান বাড়ির দ্রুত পৌঁছানোর পথটায় পাঁচিল তুলে দিয়েছে বাকের শাহ। তাই ঘুরে বেশ দূর হয়। ঘোড়া নিয়ে যেতে হবে। মাহাদি নিজের বলিষ্ঠ বাদামি রঙের ঘোড়াটা বের করতেই সুনেহেরা তার পিঠে চেপে বসলো। মাহাদি একটু অবাক হয়। সে আশা করেছিল সুনেহেরা তার নিজের ঘোড়া নিয়ে যাবে। সুনেহেরা বলল
“কি হলো উঠে পড়ুন। আজ আমিও দেখাই আমি ঘৌড়দৌড়ে কত পারদর্শী”
মাহাদি শান্ত কন্ঠে বলল
“আপনি পিছনে বসুন শাহজাদি। ওকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।”
“আহহহ উঠুন না”
মাহাদি উঠে বসলো উপায় না পেয়ে। সুনেহেরা লাগাম টেনে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল। সেদিকে আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে রইলো আবিদ। কী হলো এটা? যেই মাহাদি প্রশিক্ষণ সময়ে কোনো বিরক্তি মেনে নেন না, সে প্রশিক্ষণ ছেড়ে শাহজাদীর সঙ্গে চলে গেল তাকে বিলে নিয়ে যাবে বলে? বিষয়টা মোটেও কেবল দায়বদ্ধতা মনে হলো না আবিদের। আবার এমন নয়তো তাদের মধ্যেও কোনো প্রেম জনিত সম্পর্ক? আবিদ চকিতে তাকালো সেদিকে। ততক্ষণে চোখের আড়াল হয়ে গেছে মাহাদি আর সুনেহেরা।
***
গোটা দিন কেটে গেল। উত্তরের প্রাসাদের নিচের বিশাল পাথুরে প্রকোষ্ঠটায় নামলো অস্বাভাবিক ব্যস্ততা। চারপাশে মশালের আগুন দপদপ করছে। দেয়ালের সাথে মোটা লোহার শিকল ঝুলছে। সেই শিকলে বাধা কয়েকটা বিকৃত দেহ কাঁপছে অদ্ভুত ভাবে। কারো হাত স্বাভাবিকের দ্বিগুণ বড়, কারো মুখের একপাশ ছিড়ে দাঁত বের হয়ে আছে, কারো চোখ পুরো সাদা। গলা দিয়ে গরগর শব্দ বের হচ্ছে তাদের। এখন আর তারা মানুষ নেই। অঙ্কু এদের পরিণত করেছে ক্ষুধার্ত জন্তুে।
অঙ্কুর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামলো নিচে। তার পেছনে কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈন্য। সবার হাতে লম্বা বর্শা আর মোটা লোহার চাবুক। শিকারীর ন্যায় চোখে আজ ভয়ংকর এক উন্মাদনা। সে সামনে এগিয়ে একটা নরপিশাচের মুখ চেপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে সেটা দাঁত বের করে কামড়াতে গেল। অঙ্কুর বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে হেসে উঠলো। শয়তানের মত বলল
“আর একটু ধৈর্য ধর। আজ তোদের ভালো শিকার মিলবে।”
পাশে দাঁড়ানো বিজ্ঞানীদের দিকে তাকাতেই তারা তড়িঘড়ি কয়েকটা বড় কাঁচের শিশি এগিয়ে দিল। ভিতরে কালচে লাল রঙের তরল। বাংলা ভাষা জানা একজন কাঁপা গলায় বলল
“এই তরল গুলো শরীরে ঢুকিয়ে দিতে পারলে কিছু সময় ওরা নিয়ন্ত্রণে থাকবে শাহজাদা।”
অঙ্কুর শিশিটা হাতে নিয়ে আলোয় ধরলো। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো।
“ব্যাপার নাহহহহ, কিছু সময়ই যথেষ্ট।”
তারপর একে একে সেই তরল ঢেলে দেওয়া হলো নরপিশাচ গুলোর মুখে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীর ভয়ংকর ভাবে কেঁপে উঠলো। শিরাগুলো ফুলে উঠতে লাগলো। কয়েকজন দেয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করলো। একটা হঠাৎ বিকট গর্জন তুলে উঠতেই পাশে দাঁড়ানো এক সৈন্য ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। অঙ্কুর চাবুক হাতে নিয়ে সজোরে মারলো সেটার পিঠে।
“শান্ত!”
অদ্ভুত ভাবে প্রাণীটা থেমে গেল। হাঁপাতে লাগলো শুধু। অঙ্কুরের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটলো। এই ভয়টাই তার ভালো লাগে। সবাই তাকে ভয় পাক, এটাই চায় সে। কিছুক্ষণ পর বিশাল লোহার দরজাগুলো খুলল তার চামচা গুলো । শিকল খুলে বের করা হলো নরপিশাচ গুলোকে। প্রত্যেকটার গলায় মোটা লোহার বেষ্টনী। সেই বেষ্টনীতে শিকল আটকানো। সৈন্যরা দূর থেকে সেগুলো টেনে ধরে রেখেছে। উপরের উঠোনে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল ঘোড়া। কালো পোশাকে সজ্জিত সৈন্যরা একে একে উঠে বসলো অশ্বপৃষ্ঠে। কারো হাতে মশাল, কারো হাতে বর্শা।
অঙ্কুর নিজের কালো ঘোড়াটার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘোড়াটা অস্থির হয়ে পা ঠুকছে মাটিতে। যেন সেও বুঝতে পারছে আজ রক্ত ঝরবে। অঙ্কুর ধীরে ঘোড়ায় উঠে বসলো। তারপর চারপাশে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল
“ আজ সাহাবাদ দেখবে অঙ্কুর বিন মাহের কে।”
এক সৈন্য মাথা নিচু করে বলল
“শাহজাদা, যদি সাহাবাদের সেনারা….”
অঙ্কুর থামিয়ে দিলো তাকে।
“ওরা আজ মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গণ করতে চলেছে শাম। ওদের নিয়ে কোনো কু মন্ত্রণা আমি শুনবো না উহু।”
তারপর সামনে হাত তুলে ইশারা করতেই শিকল ধরা সৈন্যরা নরপিশাচ গুলোকে টেনে আনতে লাগলো। অদ্ভুত সব গর্জন তুলে এগোতে লাগলো তারা। কারো মুখ দিয়ে লালা ঝরছে, কারো নখ পাথরে ঘষা লেগে কটকট শব্দ হচ্ছে। মশালের আলোয় পুরো দৃশ্যটা যেন জাহান্নামের কোনো বাহিনী। প্রাসাদের বিশাল ফটক ধীরে ধীরে খুলে গেল। অঙ্কুর ঠান্ডা চোখে সামনে তাকিয়ে রইলো।
তারপর গর্জে উঠলো
“সাহাবাদের দিকে!”
মুহূর্তেই ঘোড়ার শব্দে কেঁপে উঠলো চারপাশ।
ঝড়ের বেগে এগোতে লাগলো অশ্বারোহী দল। আর তাদের পেছনে শিকল টেনে দৌড়াতে লাগলো ভয়ংকর নরপিশাচ গুলো। সন্ধ্যা নামার পূর্ব মূহুর্তেই সাহাবাদ প্রাসাদের বিশাল ফটকের সামনে এসে থামলো অঙ্কুরের বাহিনী। চারপাশে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মশালের আগুনে লাল হয়ে আছে পাথুরে দেয়াল। প্রাসাদের ওপর প্রহরীরা অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে নরপিশাচ গুলোর গরগর শব্দ। তারা শিকল টানছে বারবার। যেন রক্তের গন্ধ পেয়ে পাগল হয়ে উঠেছে।
কালো ঘোড়ার পিঠে বসে অঙ্কুর ধীরে মাথা তুললো সাহাবাদ প্রাসাদের দিকে। ঠোঁটের কোণে ভয়ংকর হাসি। গর্জে উঠে বলল
“প্রাসাদ আক্রমননননন”
গোটা বহর মূল ফটক অতিক্রম করবে এমন সময় উত্তরের জঙ্গলের দিক থেকে ভেসে এলো একাধারে অনেক গুলো অশ্বখুরের শব্দ।
প্রথমে ক্ষীণ, তারপর ক্রমশ তীব্র। ধুপধাপ, ধুপধাপ, ধুপধাপ। বাহিনীর সবাই তাকালো সেদিকে। অন্ধকার জঙ্গল চিরে মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে এলো একদল অশ্বারোহী নারী।
মশালের আলো পড়ে ঝলসে উঠলো তাদের পোষাক। প্রত্যেক নারীর গায়ে সোনালী রঙের যুদ্ধবস্ত্র। কোমড়ে বাঁধা ধারালো তরবারি। পিঠে তীরভর্তি কাঁধছোঁয়া ধনুক। হাতে লম্বা বর্শা।
চোখে আগুনের মত তীক্ষ্ণতা। যেন যুদ্ধক্ষেত্রে জন্ম তাদের। তাদের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কালো ঘোড়াগুলোও যেন আগুন উগরে দিতে প্রস্তুত।
দৃশ্যটা এত আকস্মিক ছিল যে অঙ্কুরের সৈন্যরাও কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। নারী বাহিনীটা মুহূর্তেই এসে অর্ধবৃত্ত তৈরি করলো সাহাবাদ প্রাসাদের সামনে। তারপর সবচেয়ে সামনে থাকা সাদা ঘোড়াটা ধীরে এগিয়ে এলো। চারপাশের মশালের আলো এসে পড়লো অশ্বারোহীর ওপর।
কালো আবৃত যুদ্ধপোষাক। বুক থেকে কাঁধ পর্যন্ত চামড়ার বর্ম। পিঠে বাঁধা কালো ধনুক আর তীরভর্তি ঝুলি। ডান হাতে ধরা লম্বা বর্শা। মাথার আবরণীর নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা কালো চুল বাতাসে উড়ছে। চোখ জোড়া বাজপাখির মতই তীক্ষ্ণ। গোটা নারী যোদ্ধা দের সর্দারনী মেহেরুন্নেসা নূর।
প্রাসাদে গুটিয়ে থাকা কোমলমতি বেগম আর সাক্ষাৎ যুদ্ধদেবী। ঘোড়াটা সামনের পা তুলে বিকট শব্দ করতেই তার কালো আবরণী বাতাসে উড়ে উঠলো। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী যোদ্ধারাও একসাথে বর্শা তুলে ধরলো আকাশের দিকে। পুরো প্রাসাদ প্রাঙ্গণ কেঁপে উঠলো তাদের গর্জনে। অঙ্কুরের চোখ সরু হয়ে এলো। কয়েক মুহূর্ত সে শুধু তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসার দিকে।
তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠলো।
“আরে বাহহহ। আমার হবু বেগম ও আমার সাথে। মারহাবা বল সকলে মারহাবা।”
বলেই হো হো করে হেসে উঠলো। মেহেরুন্নেসা সাথে সাথে বর্শার অগ্রভাগ তাক করলো তার দিকে। তাকে বাচাতে সামনে এসে দাঁড়ালো এক সৈনিক। বর্শা টা এফোর ওফড় হয়ে গেলো তার দেহের মধ্য দিয়ে।
বাকি সৈনিক গর্জে উঠে আক্রমণ করতে এগিয়ে এলো তাদের। মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো সাহাবাদ, প্রাসাদের সামনের প্রান্তর।
মহলের সব দাস দাসীদের মধ্যে তখন হইচই। গোটা প্রাসাদ ভীত দানব গুলো কে দেখে। যাদের ভয়ে রাতে সৈন্যরা ওবদি গুটিয়ে থাকে তারা আজ প্রাসাদে হাজির। কি ভয়ংকর তাদের দেখতে।
মাহাদি তলোয়ার উঁচু করে গর্জে উঠলো
“সৈন্যদল প্রস্তত!”
তার সঙ্গে সঙ্গে প্রাসাদের ফটক খুলে বেরিয়ে এলো সৈন্যদল। ঢাল আর তরবারির শব্দে কেঁপে উঠলো চারদিক। কালো ঘোড়ায় চেপে মাহাদি সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়লো অঙ্কুরের বাহিনীর ওপর। তার তলোয়ারের আঘাত এত দ্রুত যে সামনে আসা প্রথম সৈন্যটার গলা মুহূর্তেই আলাদা হয়ে গেল দেহ থেকে। পেছন থেকে সাহাবাদের সৈন্যরাও ঝড়ের বেগে আক্রমণ করলো।
অন্যদিকে নারী যোদ্ধাদের দল তীর ছুড়তে শুরু করেছে একের পর এক। সোনালী পোষাক পরিহিত, কালো ঘোড়ার পিঠে বসে তারা এমন নিখুঁত ভাবে আক্রমণ করছে যেন বহু বছরের প্রশিক্ষিত সেনা। মেহেরুন্নেসা নিজের বর্শা ছুঁড়ে মারতেই সেটা গিয়ে বিদ্ধ হলো এক সৈন্যের বুক ভেদ করে।
তারপর মুহূর্তেই পিঠ থেকে ধনুক নামিয়ে টানা তিনটা তীর ছুঁড়লো সে। তিনজন সৈন্য ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়লো। এদিকে নরপিশাচ গুলো শিকল ছিঁড়ে ভয়ংকর গর্জন তুলে সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কারো কাঁধ ছিঁড়ে ফেলছে, কারো গলা কামড়ে ধরছে। চারপাশে চিৎকার আর রক্তের গন্ধ। মানুষের সাথে তারা অনায়াসে পারলেও দানব গুলোর সাথে পেরো উঠছে না।
ঠিক তখনই প্রাসাদের চূড়া থেকে শোঁ শোঁ শব্দে নেমে এলো একটা তীর। অঙ্কুরের পাশের সৈন্যটার কপাল ভেদ করে ঢুকে গেল সেটা।
অঙ্কুর চমকে মাথা তুললো। উপরে প্রাসাদের উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে সুনেহেরা। চুল বাতাসে উড়ছে। বেগুনি পোশাকের ওপর চামড়ার বেল্ট বাঁধা। হাতে ধনুক। এই এক মেয়ে যে অঙ্কুরের ভয়ের কারণ। অঙ্কুর ও তীর ছুড়লো সেদিকে কিন্ত লাগলো না।
সুনেহেরা আরেকটা তীর লাগালো ধনুকে। টানলো এরপর ছাড়লো। আরেকজন সৈন্য নিচে লুটিয়ে পড়লো। সুনেহেরা ঠোঁট কামড়ে আবার তীর তুললো। তার নিশানা এত নিখুঁত যে একটার পর একটা সৈন্য মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। নিচে দাঁড়িয়ে আবিদ হাঁ করে তাকিয়ে রইলো।
“ইয়া আল্লাহ…”
বাইজিদ বেড়িয়ে এসেছে নিজের তলোয়ার নিয়ে। একের পর এক সৈন্য কে ফেলে দিচ্ছে তার তীব্র আঘাতে। অনেকটা হটিয়ে ফলল সে অঙ্কুর বাহিনী কে। মাহাদি ও সুযোগ বুঝে আরও ভয়ংকর আক্রমণ শুরু করলো। তার নেতৃত্বে সাহাবাদের সৈন্যরা অঙ্কুরের বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিল। অঙ্কুরের প্রধান শক্তি তো দানব গুলো। কিন্তু হঠাৎ কি হলো? দানব গুলো একাই ঠাস ঠাস পড়ে যাচ্ছে। যেন শক্তি দমে আসছে তাদের। একে একে সব পড়ে গেল কয়েকটা ছাড়া। যেগুলো দাঁড়িয়ে আছে তারাও ঢুলছে। যে কোনো সময় পড়ে যাবে।
অঙ্কুর বুঝলো আজ আর জেতা সম্ভব না। তার বহু সৈন্য মরে গেছে। নারী যোদ্ধাদের আক্রমণে আর সাহাবাদের প্রতিরোধে পুরো পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে। দাঁত চেপে চারপাশে তাকালো সে। তারপর গর্জে উঠলো
“পিছু হটো!”
অবশিষ্ট সৈন্যরা দ্রুত ঘোড়া ঘুরিয়ে পালাতে শুরু করলো। অঙ্কুরও কালো ঘোড়াটা ঘুরিয়ে নিলো।
তবে সব নরপিশাচকে নিতে পারলো না। মাত্র কয়েকটাকে শিকলে বেঁধে টেনে নিয়ে যেতে পারলো তারা। বাকি গুলো যুদ্ধক্ষেত্রেই উন্মত্ত হয়ে ঘুরতে লাগলো। অঙ্কুর শেষবার ঘুরে তাকালো।
দূরে সাদা ঘোড়ার পিঠে বসে মেহেরুন্নেসা তাকিয়ে আছে তার দিকে। গর্জে বলল
“আমাকে হারিয়ে দিয়ে ভালো করলে না নূর। এর চরম মূল্য দিতে হবে তোমায়”
পর্দায় আবৃত মুখটায় ফিচেল হাসলো মেহেরুন্নেসা। তার একমাত্র দুর্বলতা তার আব্বু। গতকালই আব্বুকে সৈন্য পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দুর্গে আনিয়েছে।
বাকের শাহ্ দৌড়ে বেরোলো
“কে মা তুমি? কোন বীরের সন্তান তুমি? নারীদের এমন বীরত্ব আমি এ জীবনে দেখিনি”
বাইজিদ তলোয়ার নামিয়ে ক্লান্ত শরীরে চোখ সরু করে তাকায় মেহেরুন্নেসার দিকে। যুদ্ধ বস্ত্রে কাওকে সুন্দর লাগে বললে হয়তো মানুষ হাসবে, কিন্তু তাও লাগছে বাইজিদের কাছে। সহসা ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে বলল
“ও আপনার পুত্রবধূ আব্বা। আমার স্ত্রী। মেহেরুন্নেসা নূর। নূর-এ-সাহাবাদ।”
কেমন হলো জানাবেন সবাই। অবশ্যই অবশ্যই জানাবেন আর রিয়্যাক্ট দিয়েন। পরবর্তী পর্ব হারিয়ে না ফেলতে পেইজ ফলো করে রাখুন
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৯ এর শেষাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৮
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৩
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ