Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৩


#নূর_এ_সাহাবাদ

#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৪৩

রাত গভীর। সাহাবাদ প্রাসাদের বিশাল কক্ষটা আজ অদ্ভুত নীরব। জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ। দূরে কোথাও বজ্রের মৃদু গর্জন। কিন্তু বাইজিদের কানে কিছুই পৌঁছাচ্ছে না। সে বসে আছে মেঝেতে। রাজপুত্রের মতো না, বরং সব হারানো এক মানুষের মতো।

তার হাতে শক্ত করে ধরা মেহেরুন্নেসার সেই ওড়না। প্রিয় নারীর ঘ্রাণ মাখা কাপড়টা বুকের সাথে চেপে ধরে আছে এমনভাবে, যেন এটাই শেষ সম্বল। চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠলো সেই মুখ। আর সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

“মেহের…”

নামটা ঠোঁট ছুঁয়ে বের হতেই গলা ভেঙে গেল। কয়েকদিন ধরে সে ঘুমায়নি ঠিকমতো। খাবার ছোঁয়নি প্রায়। প্রাসাদের সবাই বুঝতে পারছে তাদের শাহজাদা বদলে যাচ্ছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে।

কিন্তু তার কিছুই পরোয়া নেই। কারণ প্রতিটা মুহূর্তে শুধু একটাই প্রশ্ন মাথার ভেতর আঘাত করছে। সে কোথায়? বেঁচে আছে তো? কাঁদছে না তো? ভয় পাচ্ছে না তো? ওড়নাটা মুখের কাছে আনতেই খুব হালকা সেই পরিচিত ঘ্রাণটা টের পেল বাইজিদ।

আর ঠিক তখনই স্মৃতিগুলো ঝড়ের মতো ফিরে এলো। সেই প্রথম দেখা। মহলের নিচের রত্নপ্রভার কক্ষটায় ছিল সে। নিজেকে আটকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টাও সেদিন ব্যার্থ হয়েছিলো। ভিতরটা উন্মাদনায় আগুন ধরে গেছিলো নারীটিকে দেখার আশায়। নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেরে সেদিন রাতেই নিঃশব্দে নেমে গিয়েছিল নিচে। একেবারে চোরের মতো। নিজের মহলেই পা ফেলে ফেলে হাঁটছিল সাবধানে। আজ মনে হলে হাসি পায় সাহাবাদের শাহজাদা, অথচ একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুক ধড়ফড় করছিল।

দরজাটা সামান্য খোলা ছিল। ভেতরে মৃদু প্রদীপ জ্বলছিল। আর সেই আলোয় সে প্রথম দেখেছিল মেহেরুন্নেসাকে। আজও মনে আছে, সেদিন পৃথিবীটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল। ছোট্ট পালঙ্কে কুঁকড়ে ঘুমিয়ে ছিল মেয়েটা। সাদা পোশাক পরে। কালো চুলগুলো ছড়িয়ে ছিল চারপাশে এত লম্বা, এত ঘন… যেন রাত নেমে আছে তার গায়ের ওপর।

ঘুমের ভেতরেও মুখটা কী অসম্ভব শান্ত ছিল।

মনে হচ্ছিল কেউ খুব যত্ন করে মাটির পুতুল গড়ে তাতে প্রাণ দিয়েছে। তার কপালের পাশ দিয়ে নেমে আসা চুল সরাতে ইচ্ছে হয়েছিল বাইজিদের। কিন্তু সাহস হয়নি। সে শুধু তাকিয়ে ছিল। আর তখনই ঘুমের মধ্যেই মেহেরুন্নেসা সামান্য নড়েছিল। ঠোঁট কেঁপে উঠেছিল হালকা। বাইজিদের বুক ধক করে উঠেছিল। সে ভেবেছিল মেয়েটা বুঝি জেগে যাবে। কিন্তু না সে আবার শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বাইজিদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করলো, কিছু একটা ঘটে গেছে তার ভেতরে। খুব অদ্ভুত কিছু। সেদিন প্রথমবার কোনো মেয়েকে দেখে তার মনে হয়েছিল সে এই মানুষটাকে রক্ষা করতে চায়। সব বিপদ থেকে। সব কষ্ট থেকে। তারপর ধীরে ধীরে সেই মেয়েটাই হয়ে উঠেছিল তার সকাল, রাত, শান্তি। তাকে আর যেতে দিল না মহল থেকে। নিজের করে রেখে দিল। কিন্তু ভাগ্য, সেই নারীটিকেই বার বার হারাতে বসে বাইজিদ।

আর আজ সেই মানুষটাই নেই। বাইজিদের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো। সে মাথা নিচু করে ওড়নাটা ঠোঁটে ছুঁইয়ে ফিসফিস করলো

“একবার ফিরে আয় মেহের…শুধু একবার…”

সেদিনের পর মেহেরুন্নেসার পূর্ণাঙ্গ দেখা হয়েছিল বিয়ের রাতে। সেই রাতটার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠলো বাইজিদের।

পুরো মহল আলোয় ঝলমল করছিল। চারপাশে উৎসবের শব্দ, আতরের ঘ্রাণ, মানুষের কোলাহল

কিন্তু তার সমস্ত দৃষ্টি আটকে ছিল এক জায়গায়।

মেহেরুন্নেসা। যখন তাকে বধূবেশে কক্ষে আনা হয়েছিল, বাইজিদ সত্যিই কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল। লাল বধূবস্ত্রে মোড়া মেয়েটা মাথা নিচু করে বসেছিল পালঙ্কের কোণে। ঘন কালো চুলের ফাঁক দিয়ে আধখানা মুখ দেখা যাচ্ছিল।

হাতে কাঁচের চুড়ি, কপালে সূক্ষ্ম টিকলি, চোখ নিচু

তবুও মনে হচ্ছিল পুরো কক্ষের আলো যেন তার থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে।

সেদিন খুব ধীরে তার সামনে গিয়ে বসেছিল বাইজিদ। ইচ্ছে হচ্ছিল সময়টাকে থামিয়ে দিতে।

শুধু তাকিয়ে থাকতে। শুধু এই মানুষটাকে নিজের করে কাছে রাখতে। কিন্তু সুখটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। রাত গভীর হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরটা অদ্ভুত ভারী লাগতে শুরু করেছিল তার।

চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। মাথা কেমন ঘুরছিল। প্রথমে ভেবেছিল ক্লান্তি। কিন্তু তারপরই বুঝেছিল কিছু একটা ভুল হচ্ছে। সে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকানোর চেষ্টা করেছিল শেষবার। কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল দ্রুত।

আর তারপর অন্ধকার। নিদ্রাবিষের প্রভাবে সে রাতেই অচেতন হয়ে পড়েছিল বাইজিদ।

স্মৃতিটা মনে পড়তেই দাঁত চেপে ধরলো সে।

নিজের বিয়ের রাতেও নিজের স্ত্রীকে আগলে রাখতে পারেনি সে। হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো তার সত্ত্বা। দম বন্ধ লাগছে। কক্ষের ভেতরটা অসহ্য মনে হচ্ছে। পাগল পাগল লাগছে তার।নবিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো বাইজিদ। দ্রুত পায়ে গিয়ে দাঁড়ালো বারান্দায়। বাইরে তখন ভয়ংকর ঝড়।

বৃষ্টি তীব্র শব্দে আছড়ে পড়ছে প্রাসাদের দেয়ালে।

আকাশজুড়ে বারবার বিজলী চমকাচ্ছে। বড় বড় গাছ পালা যেন ভেঙে পড়ার জোগার। বাইজিদ এর গায়ে বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে। সে আনমনে তাকিয়ে আছে বৃষ্টির দিকে।

ঠিক তখনই এক ঝলক বিদ্যুতের আলোয় নিচে একটা দৃশ্য চোখে পড়লো তার।ববাইজিদ থমকে গেল। ঝড়বৃষ্টির মাঝখানে একটা ঘোড়া দ্রুত ছুটে যাচ্ছে প্রাসাদের ফটক পেরিয়ে। আর তার পিঠে সুনেহেরা। ভেজা সোনালি চুল বাতাসে উড়ছে।

পোশাক বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে লেপ্টে গেছে। সে একবারও পেছনে তাকাচ্ছে না। সোজা ছুটে যাচ্ছে উত্তরের দিকে।

মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার তাকে গিলে ফেললো।

আর বাইজিদের বুকের ভেতর অজানা অস্বস্তি ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখলো সে দৃশ্যটা। প্রথমদিন ভেবেছিল হয়তো ভুল দেখেছে।

কিন্তু আজ, নিজের চোখে স্পষ্ট দেখলো সুনেহেরাকে। ঝড়বৃষ্টির মাঝখানে, গভীর রাতে, একা ঘোড়া ছুটিয়ে উত্তরের দিকে চলে যাচ্ছে সে।

বাইজিদের কপাল কুঁচকে উঠলো। সুনেহেরা চঞ্চল, একরোখা এটা সে জানে। কিন্তু এমন ভয়ংকর সময়ে উত্তরের দিকে যাওয়া? যেখানে এখন মৃত্যুর ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে? কিছু একটা তো আছেই রহস্য। এবার আর চুপ করে থাকা যাবে না।

সুনেহেরার সাথে কথা বলতেই হবে। অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এলো কক্ষে। পালঙ্কে শুয়েও চোখ বন্ধ করতে পারছিল না। মাথার ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরছে। মেহেরুন্নেসা কোথায়? সুনেহেরা রাতে কোথায় যায়? অঙ্কুর কি করছে? সবকিছু যেন জট পাকিয়ে গেছে।

চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে মেহেরুন্নেসার মুখ। হঠাৎ মনে হলো সে যদি এখন ভয় পেয়ে কাঁদে? যদি তাকে কেউ কষ্ট দেয়? বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো বাইজিদের। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল, সে নিজেও জানে না। ঠিক তখনই খুব আস্তে দরজায় শব্দ হলো।

টক।

টক।

বাইজিদ উঠে বসল।

“কে?”

কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর বাইরে থেকে ভেসে এলো নিচু গলা

“আমি ভাইজান।”

বাইজিদ ভ্রু কুঁচকে দরজা খুললো। চন্দ্রপ্রভাকে দেখে মুহূর্তেই বুঝে গেল কিছু একটা হয়েছে।

মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক নিস্তেজ। সে দ্রুত ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বাইজিদ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।

“কি হয়েছে?”

চন্দ্রা ধীরে মুখ তুললো। তার চোখে অদ্ভুত ক্লান্তি। কিছুক্ষণ ঠোঁট নড়লো না। তারপর খুব নিচু স্বরে বললো

“অঙ্কুর…”

একটু থেমে নিঃশ্বাস নিল সে।

“অঙ্কুর ই মেহেরুন্নেসা কে আটকে রেখেছে”

চন্দ্রপ্রভার কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলো বাইজিদ। তারপর ধীরে ধীরে মুখের রেখা শক্ত হয়ে উঠলো। চোখে জমে উঠলো চাপা ক্ষোভ।

“আমি আগেই ভেবেছিলাম।”

কণ্ঠটা ঠান্ডা। কিন্তু সেই ঠান্ডার নিচে তীব্র রাগ।

চন্দ্রা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। বাইজিদ এবার সামনে এগিয়ে এলো।

“বারবার বলেছিলাম অঙ্কুরকে বিশ্বাস করতে না।”

তার গলা ভারী হয়ে উঠলো,

“ওর মতো মানুষ শুধু ব্যবহার করতে জানে।”

চন্দ্রার চোখ ভিজে উঠতে শুরু করলো।

তবুও কিছু বললো না। বাইজিদ থামলো না।

“তুমি কার কথা শুনলে?”

তিক্ত হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে,

“নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবতে, তাই না?”

চন্দ্রা কাঁপা গলায় বললো

“আমি ভাবিনি”

“ভাবোনি?

” বাইজিদ এবার রেগে উঠলো,

“তোমার না ভাবার ফল সবাই ভোগ করছে এখন!”

কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।

চন্দ্রার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো। বাইজিদ এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগলো বিরক্তিতে।

“তুমি বুঝতেই চাওনি ও কেমন মানুষ।”

দাঁত চেপে বললো সে

“ওর কাছে সম্পর্ক, ভালোবাসা এসবের কোনো মূল্য নেই। তোমাকে তো ভালো বাসলোই না। উল্টো আমার ভালোবাসা কেড়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আজ তোমার জন্য মেহেরুন্নেসার এই হাল”

চন্দ্রা এবার মুখ তুলে তাকালো। চোখ লাল হয়ে গেছে কান্নায়।

“আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম…”

কথাটা ভাঙা গলায় বের হতেই বাইজিদ আরও বিরক্ত হয়ে উঠলো।

“এটাই তোমার সবচেয়ে বড় ভুল!”

চন্দ্রপ্রভা যেন কেঁপে উঠলো।

“মেহের কে বাঁচাতে হবে ভাইজান”

“ছাড়বোনা। অঙ্কুর কে আমি ছাড়বোনা।”

প্রভা তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালো। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। চোখের পানি মুছতেও ভুলে গেল। দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। বাইজিদ দাঁড়িয়ে রইলো স্থির হয়ে। দরজাটা ধীরে বন্ধ হওয়ার শব্দটা কানে বাজলো দীর্ঘক্ষণ। করিডরের অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে চন্দ্রপ্রভা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

*********

মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে অঙ্কুরের। দানবগুলো কেন বাইরে যায় না। সুনেহেরা রাতে কোথায় যায় । চন্দ্রপ্রভার আচরণ, সবকিছু মিলিয়ে অদ্ভুত এক অস্বস্তি চেপে বসেছে তার ভেতরে। অনেক রাত হয়ে গেছে। তবুও ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই চোখে। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে উত্তরের প্রাসাদের একদম কোণার কক্ষটার দিকে হাঁটা দিল সে। মেহেরুন্নেসার কক্ষ। তার মনে হলো প্রিয়তমাকে দেখলে হয়তো মাথাটা একটু শান্ত হবে।

দীর্ঘ করিডর পেরিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো অঙ্কুর। মুখে এখনও ক্লান্ত বিরক্তি। ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো আর পরের মুহূর্তেই থেমে গেল। কক্ষ ফাঁকা। পালঙ্কে কেউ নেই। চারপাশ নিস্তব্ধ। অঙ্কুরের চোখ সরু হয়ে এলো। সে দ্রুত ভেতরে ঢুকলো। পর্দার আড়াল স্নানকক্ষ জানালার পাশ কোথাও নেই।

মুহূর্তের মধ্যেই তার বুকের ভেতর ঠান্ডা কিছু নেমে গেল।

“মেহেরুন্নেসা?”

প্রথমবার নামটা উচ্চারণ করলো সে। কোনো উত্তর নেই। অঙ্কুর এবার দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলো।

তার গলা প্রাসাদের করিডর কাঁপিয়ে উঠলো

“পাহারা!”

চারদিক থেকে লোকজন দৌড়ে আসতে লাগলো।

অঙ্কুরের চোখ তখন ভয়ংকর।

“পুরো প্রাসাদ খুঁজে ফেলো! এক ইঞ্চি জায়গাও বাদ যাবে না! ফটক বন্ধ করো!”

তার গর্জনে সবাই ছড়িয়ে পড়লো মুহূর্তেই। অঙ্কুর নিজেও খুঁজতে শুরু করলো। একটার পর একটা কক্ষ। অন্ধকার সিঁড়িঘর। পুরনো করিডর।

গোপন পথ পর্যন্ত। কিন্তু কোথাও নেই মেহেরুন্নেসা। সময় যত গড়াচ্ছে, অঙ্কুরের মুখ তত বিকৃত হয়ে উঠছে রাগে। একজন রক্ষী কাঁপা গলায় এসে বললো

“শাহজাদা… কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।”

অঙ্কুরের চোখ লাল হয়ে উঠলো।

হঠাৎ পাশের ধাতব প্রদীপটা তুলে ছুঁড়ে মারলো দেয়ালে। প্রচণ্ড শব্দে সেটা ভেঙে পড়লো।

“অসম্ভব!”

গর্জে উঠলো সে। তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।

চোয়াল শক্ত।

“এই প্রাসাদ থেকে কেউ বের হতে পারে না…”

কিন্তু মেহেরুন্নেসা নেই।

সত্যিই নেই। আর সেই সত্যটাই ধীরে ধীরে উন্মাদ করে তুললো অঙ্কুরকে। ও কি ভূত নাকি যে উবে গেছে। ক্রোধে তার পুরো মুখ বিকৃত হয়ে উঠলো।

যেন মুহূর্তেই পুরো প্রাসাদ জ্বালিয়ে দিতে পারে সে। সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই আঘাত করে বসছে। কত কষ্ট সুযোগ এসেছিল তার। সেটাও হাতছাড়া হলো।

***

দুর্বল শরীর নিয়ে জঙ্গলের শেষ প্রান্তটা পার হতেই হাঁপিয়ে উঠলো মেহেরুন্নেসা। ঘন অন্ধকার বন পেরিয়ে অবশেষে নদীর পাড়ে এসে থামলো সে। চারপাশ নিস্তব্ধ। দূরে শুধু রাতের নদীর শব্দ ধীরে ধীরে তীরে আছড়ে পড়ছে পানি।

মেহেরুন্নেসা একটা ভেজা পাথরের পাশে হাত রেখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু শরীর আর সায় দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে পা দুটো এখনই ভেঙে পড়ে যাবে। কয়েকদিনের না খাওয়া, মানসিক যন্ত্রণা, বন্দিদশা সব মিলিয়ে শরীরটা একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে।

হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ বন্ধ করলো সে। তার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না সে সত্যিই পালাতে পেরেছে। মিরানের সাহায্য ছাড়া এটা কোনোদিন সম্ভব হতো না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মেয়েটা নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে পথ দেখিয়েছে তাকে।

গোপন করিডর। পাহারার ফাঁক, জঙ্গলের নিরাপদ পথ সব আগেই ঠিক করে রেখেছিল মিরান।

মেহেরুন্নেসার মনে পড়লো বিদায়ের আগে মিরান তার হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল—

“পিছনে তাকাবে না বেগম। যত দ্রুত পারো চলে যাও। আমার জীবন মরণ পরোয়া নেই। কিন্তু তুমি শাহজাদার প্রাণভোমরা। তোমায় নিরাপদ থাকতে হবে”

মেহেরুন্নেসার বুক হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো। মিরান এখন ঠিক আছে তো? অঙ্কুর যদি বুঝে যায় চোখ শক্ত করে ফেললো সে। না। এখন থামলে চলবে না। তার গন্তব্য প্রশিক্ষণ দুর্গ। ওখানে পৌঁছাতে পারলেই নিরাপদ থাকবে সে। ওই দুর্গে অঙ্কুর সহজে হানা দিতে পারবে না এটা সে জানে।

কারণ দুর্গটা শুধু আশ্রয় না, যুদ্ধপ্রস্তুত এক ঘাঁটি।

সেখানে মিশরীয় নারী যোদ্ধারা আছে। প্রশিক্ষিত রক্ষীরা আছে। অঙ্কুরও জানে ওখানে ঢোকা মানে সরাসরি সংঘর্ষ। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করলো আবার। পা টলছে। শ্বাস ভারী। মাঝে মাঝে সামনে ঝাপসা দেখছে। তবুও থামলো না। কারণ এখন থেমে যাওয়া মানে আবার অঙ্কুরের হাতে ধরা পড়া। আর সেই চিন্তাই তাকে জোর করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চললো অন্ধকার রাতের ভেতর।

মেহেরুন্নেসা কে না পেয়ে অঙ্কুরের চোখে তখন আর কোনো সংযম নেই। পুরো প্রাসাদের ভেতর হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো। রক্ষীরা, বিজ্ঞানীরা সবাই দূর থেকে দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্কুর ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো প্রধান সভাকক্ষে। তার মুখ শক্ত, চোয়াল কাঁটা-কাঁটা টানটান। একটা মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর গর্জে উঠলো

“আর সহ্য করবো না। কালই সাহাবাদ প্রাসাদ আক্রমণ হবে।”

রক্ষীদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল।

অঙ্কুর এক পা এগিয়ে এসে টেবিলে হাত রাখলো।

তার চোখে আগুনের মতো ঝিলিক।

“আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি… দেখেছি… ছাড় দিয়েছি।”

একটা তাচ্ছিল্য হাসি ফুটলো ঠোঁটে।

“আর না।”

তার কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠলো

“এই অঞ্চল এবার দখল হবে। তারপর প্রকাশ্যে আসবো আমি।”

কক্ষের ভেতর শীতল বাতাস যেন ভারী হয়ে এলো। অঙ্কুর ধীরে বললো

“আর লুকিয়ে নয়। এই রাজ্য হবে আমার। বণিক দের দ্বারা এই বিজ্ঞান কে কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্যে ব্যাবসা করবো আমি”

তার চোখে এখন ক্ষমতার তৃষ্ণা স্পষ্ট। সে হাত তুলে ইশারা করলো।

“স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবসা… সরবরাহ… সব শুরু হবে এখান থেকেই।”

একজন রক্ষী কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো

“আর রাজ্যের মানুষ? তাদের কি বিতাড়িত করবেন শাহজাদা?”

অঙ্কুরের মুখে আবার সেই শীতল হাসি ফিরে এলো।

“মানুষ?”

সে ধীরে ধীরে বললো

“তারা থাকবে ব্যবহার করার জন্য।”

তার দৃষ্টি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠলো।

“যাকে দরকার, তাকে আনা হবে। যাকে না, তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে। আমার গবেষণার জন্য বহু মানুষ দরকার এখনো। আমি কেন তাদের তাড়াবো?”

কক্ষের ভেতর কেউ আর কথা বললো না।

অঙ্কুর ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠ শেষবারের মতো ভারী হয়ে উঠলো

“কাল ভোরেই প্রস্তুতি শুরু করো। এইবার আর ফিরে আসা নেই। মহলে ঢুকে সব কটা কে কুচি কুচি করে কেটে গোটা মহল, অঞ্চল সবটা দখলে নিবো। আমি হবো জমিদার আর আমার মেহের হবে বেগম।”

ফের হুংকার করে বলল

“কাওকে বুঝতে দেবে না। কথা যেন পাঁচ-কান না হয়। আমরা আচমকা আক্রমণ করবো সাহাবাদ প্রাসাদ। ওরা পূর্বে জানতে পারলে প্রস্তত থাকবে। তখন তাদের কাছে আমরা হেরে যাব নিশ্চিত। তাই তারা যখন অপ্রস্তুত, সেই সুযোগ টাই কাজে লাগাবো আমরা।

পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখুন। আর রিয়্যাক্ট পূরণ করা চাই।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply