#নীভৃতে_প্রেম_আমার_নীলাঞ্জনা
#নাজনীন_নেছা_নাবিলা
#পর্ব_৪২
অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ
ডাইনিং টেবিল জুড়ে তখন গরম গরম নাস্তার সুবাস আর হালকা আড্ডার আমেজ। সবাই মিলে একসাথে খাবার টেবিলে এসে বসেছে। টেবিলের এক পাশে পাশাপাশি বসেছে নীলা আর মিহাল, ঠিক তাদের উল্টো দিকের অন্য পাশে তাদের মুখোমুখি বসেছে ইকরা এবং মুনভি। আর সবার অভিভাবক হিসেবে একদম মাঝখানের প্রধান আসনে বসেছেন মিনা মির্জা। বাড়ির গৃহকর্মীরা ব্যস্ত পায়ে রান্নাঘর থেকে একের পর এক ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু খাবারের বাটি এনে টেবিলে সাজিয়ে দিচ্ছে।
মিহাল ঘর থেকে গটগট পায়ে বেরিয়ে আসার ঠিক কিছুক্ষণ পরই নীলাও এসে খাবার টেবিলে যোগ দিয়েছে। আসলে তার পেটে তখন রীতিমতো ক্ষুধার যুদ্ধ চলছে। মিহালের দেওয়া ওই ‘ফালুদা’র লজ্জা আর রোমান্টিক কথার ঘোর নিয়ে যদি সে ঘরে বসে থাকত, তবে আজ আর তার কপালে সকালের নাস্তা জুটত না। তাই সমস্ত লজ্জা-শরম আর দ্বিধা-সংকোচ ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি করে রেখে, মুখে একরাশ কৃত্রিম উদাসীনতা ফুটিয়ে সে এসে এখানে বসে পড়েছে।
সবার প্লেটে তখন ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ঘিয়ে ভাজা মুচমুচে পরোটা আর সুগন্ধী আলুর দম। মিনা মির্জা সকাল সকাল নিজে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে এই স্পেশাল খাবারগুলো তৈরি করেছেন। তবে এই জিভে জল আনা লোভনীয় নাস্তা বাকি সবার প্লেটে সাজানো থাকলেও, ব্যতিক্রম কেবল একজনের বেলায়। মিহালের প্লেটে কোনো পরোটা বা আলুর দমের চিহ্নও নেই,তার সামনে রাখা হয়েছে মাত্র কয়েক টুকরো ড্রাই টোস্ট, কুচানো অ্যাভোকাডো আর এক বাটি ফ্রুট সালাদ।
নীলা ঠিক মিহালের পাশেই বসেছিল, তাই আড়চোখে মিহালের প্লেটের এই নিরামিষ ও সাদামাটা আয়োজন দেখতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। সে একবার নিজের প্লেটের ওই ঘিয়ে ভাজা পরোটার দিকে তাকাচ্ছিল, তো পরক্ষণেই আবার মিহালের প্লেটের ফলমূলের দিকে চেয়ে মনে মনে হাসছিল। যখন সে দেখল মিহাল বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটা চামচ হাতে নিয়ে ফ্রুট সালাদ মুখে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই নীলার ভেতরে দুষ্টুমিটা চাড়া দিয়ে উঠল। মিহালকে একটু খোঁচা দিয়ে কথা বলার এই সুবর্ণ সুযোগ সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইল না। সে সরাসরি মিহালকে কিছু না বলে, চোখের কোণে এক চিলতে কৌতুক ফুটিয়ে উল্টো দিকে বসা মুনভির দিকে তাকাল এবং বেশ রসিয়ে বলতে লাগল__
“আচ্ছা মুনভি ভাইয়া, পেশায় ডাক্তার তো আপনি, অথচ কড়া ডায়েট চার্ট মেইনটেইন করে চলছেন অন্য আরেকজন। এই সাতসকালে ঘিয়ে ভাজা পরোটা বাদ দিয়ে এই ঘাস-পাতা খাওয়ার মহামূল্যবান উপদেশটা কি আপনিই উনাকে দিয়েছিলেন?”
নীলার এমন রসালো খোঁচা শুনে টেবিলে বসা মিহাল বাদে বাকি সবাই মুখ টিপে মিটমিট করে হাসতে লাগল। মিহাল তখন ঠিক চামচ উঁচিয়ে এক লোকমা সালাদ মুখে পুরতে যাচ্ছিল, আর তখনই নীলা এই মোক্ষম মন্তব্যটি ছুঁড়ে দিল। কথাটি শুনে মিহাল চামচ সমেত খাবারটি আবার বাটির ভেতর নামিয়ে রাখল। সে নিজের ডান হাতটি অলস ভঙ্গিতে উরুর ওপর রেখে, বাম হাতের তালুতে ভর দিয়ে বেশ অবজ্ঞার সাথে নীলার দিকে তাকাল।
তারপর কিছুটা অহংকারের সুরে বলতে লাগল__
“দেখো নীলাঞ্জনা, আমি নিজের ফিটনেসের প্রতি সবসময় ভীষণ সচেতন। তাই আমাকে ফিট থাকার জন্য অন্য কারোর উপদেশের ওপর ভরসা করতে হয় না। আর উপদেশ দেবেই বা কে? এই মুনভি? যে নিজেই ফিটনেসের চরম অভাবে ভুগছে? হাহ্, হোয়াট আ জোক! ও নিজে সকাল-সাজ কীসব হাবিজাবি খায় তার কোনো ইয়ত্তা আছে? শোনো নীলাঞ্জনা, আমি তোমার একজন সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে বলছি যদি নিজের ভালো চাও তাহলে এইসব ঘিয়ে ভাজা তেল চিটচিটে আলতু-ফালতু খাবার খাওয়া মোটেও উচিত নয়।”
মিহালের মুখে নিজের ফিটনেস নিয়ে এমন কটূক্তি শুনেও মুনভি অবশ্য কিছু মনে করল না। কারণ এই চেনা ডায়লগগুলো তার কানপচানো মুখস্থ। মিহাল যখন-তখন তাকে এই একই খোঁচা দেয়, আর মুনভিও তা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়। কিন্তু মুশকিল হলো, পাশে বসা নীলা মির্জা এই কথা মোটেও হালকাভাবে নিতে পারল না। নীলা নিজেও নিজের ফিটনেসের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন এবং কেয়ারফুল। কিন্তু তাই বলে মিনা মির্জার পরম মমতায় বানানো এই ঐতিহ্যবাহী খাবারকে মিহাল ‘আলতু-ফালতু’ বলে অপমান করবে? এই ধৃষ্টতা নীলা মির্জা কোনোমতেই বরদাস্ত করবে না।
এদিকে মিহালের ওই চড়া কথার পিঠে মুনভিও এবার হালকা প্রতিরোধ গড়ে তুলল। টেবিল জুড়ে এখন দুই প্রিয় বন্ধুর মাঝে এক তুমুল যুক্তি আর তর্কের ঝড় বয়ে চলেছে। তারা দুজনেই একে অপরকে টেক্কা দিতে ব্যস্ত। নীলা মিহালের ঠিক ডান পাশে বসে পুরো পরিস্থিতিটা দেখছিল, আর তখনই তার উর্বর মস্তিষ্কে এক দারুণ শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। সে মনে মনে মিহালের উদ্দেশ্যে কুটিল হেসে বলল__
“আচ্ছা! আমার প্রিয় খাবারকে আলতু-ফালতু বলা হচ্ছে, তাই না প্রফেসর সাহেব? দাঁড়ান, এখন আমি আপনাকে কেমন মজা দেখাই। আমিও আজ দেখব আপনি কীভাবে আপনার ওই তথাকথিত হেলদি ঘাস-পাতা চিবিয়ে শেষ করেন। এই নীলা মির্জা জিনিসটা আসলে কী, তা আপনি আজ হারে হারে টের পাবেন, আমার প্রিয় প্যারেলাল। আপনার হেলদি খাবার আপনি শান্তিতে খেতেই পারবেন না।”
মনে মনে এই শয়তানি চালটা চেলেই নীলা ওষ্ঠাধরে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফোটাল। তারপর সবার অলক্ষ্যে, ডাইনিং টেবিলের নিচ দিয়ে নিজের বাম হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত শক্ত করে মিহালের ডান হাতটি মুঠোবন্দি করে ফেলল। মিহাল তখনো মুনভির দিকে তাকিয়ে পুরো দমে তর্ক-বিতর্ক করতে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু আচমকা টেবিলের নিচে এক নরম অথচ শীতল হাতের অতর্কিত স্পর্শে সে যেন মুহূর্তের মধ্যে হিমশীতল হয়ে গেল। এক তীব্র ও অদ্ভুত শিহরণ বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো তার পুরো মেরুদণ্ড বেয়ে বয়ে গেল। মুনভির দিকে তাকিয়ে অনর্গল কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বর আচমকাই গলার ভেতর আটকে গেল, মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরুল না। ওদিকে মুনভি অবশ্য বন্ধুর এই আকস্মিক নীরবতা টের না পেয়ে নিজের জয়ের আনন্দে তখনো একনাগাড়ে তর্ক করে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পরিবেশের গম্ভীরতা আরও বাড়িয়ে দিয়ে মিনা মির্জা টেবিলে হাত চাপড়ে বেশ কড়া একটা ধমক দিয়ে বলে উঠলেন__
“উফ্ মিহাল এবং মুনভি! তোদের কি শুরু হয়েছে বল তো? খাওয়ার টেবিলে বসে এত কিসের কথা তোদের? আর তোরা তো সাধারণ কথা বলছিস না, রীতিমতো ঝগড়া জুড়ে দিয়েছিস। এবার অন্তত তোদের ওই মুখ দুটো বন্ধ কর আর চুপচাপ খেতে থাক!”
মিনা মির্জার এই চড়া শাসনের সুর শুনে মুনভি তৎক্ষণাৎ চুপ মেরে গেল। তবে তার স্বভাবসুলভ চপল মনটা বোধহয় পুরোপুরি শান্ত হতে পারল না। সে কয়েক মুহূর্ত গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকার ভঙ্গি করল, তারপর অত্যন্ত নিরীহ মুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার ফস করে বলে উঠল___
“কিন্তু আন্টি মুখ যদি পুরোপুরি বন্ধই করে রাখি, তাহলে খাবারটা মুখের ভেতর পুরব কী করে? মুখ বন্ধ করে কি আদেও খাবার খাওয়া সম্ভব?”
মুনভির এই চরম মায়াবী অথচ বোকা বোকা যুক্তিটি শোনার সাথে সাথে তার পাশে বসা ইকরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে ফিক করে হেসে দিল। টেবিলে তখন এক অদ্ভুত হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। ইকরা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরেও কোনোভাবেই নিজের চিলতে হাসি থামাতে পারছিল না। অন্যদিকে মুনভি নিজের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন রসিকতার পর মিনা মির্জার চোখমুখের রাগী ও অগ্নিদৃষ্টি দেখে মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেল। সে ভয়ার্ত চোখে বারবার নিজের গলার শুকনো ঢোক গিলতে লাগল, যেন এখনই কোনো বড়সড় শাস্তির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
ছেলের সমতুল্য মুনভির এই পাগলামি দেখে মিনা মির্জা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর মুনভির ওপর থেকে নিজের নজর সরিয়ে পাশে বসা মিহালের দিকে তীব্র দৃষ্টিপাত করলেন। মিহালকে এক হাত উরুর ওপর রেখে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে দেখে তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন__
“আর তুই! তুই এভাবে এক হাত নিজের কোলের ওপর রেখে মূর্তির মতো বসে আছিস কেন শুনি? তাড়াতাড়ি তোর ওই হেলদি খাবার শেষ কর দেখি।”
মিনা মির্জার এই নতুন তাগাদায় টেবিলের নিচের পরিস্থিতি যেন আরও এক ধাপ জটিল হয়ে উঠল। মিহাল তখন এক চরম উভয়সংকটের মুখোমুখি। মায়ের কড়া আদেশ অমান্য করার উপায় নেই, আবার ওদিকে টেবিলের নিচে নীলার সেই শক্ত ও শীতল হাতের মুঠো থেকেও মুক্তি পাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। মিহালের তখন যেন বুকের ভেতর প্রাণ যায় যায় অবস্থা। কারণ নীলা শুধু টেবিলের নিচে তার ডান হাতটি শক্ত করে মুঠোবন্দি করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং নিজের হাতের সরু আঙুলগুলো দিয়ে অনবরত মিহালের হাতের ওপর আর পায়ের উরুর ওপর স্লাইড করে এক চরম সুড়সুড়ি আর মাদকতা ছড়াচ্ছে। এই অদ্ভুত ও অবশ করা পরিস্থিতিতে একজন মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে খাবার খাওয়া কি আদেও সম্ভব? তার প্রধান কার্যকারী ডান হাতটি তো পুরোপুরি নীলার মায়াবী নিয়ন্ত্রণে বন্দি হয়ে আছে। তার ওপর সে একজন পুরুষ! যদি ভালোবাসার মানুষটির এমন করে তাহলে সে কি করে নিজেকে ঠিক রাখবে?
ওদিকে নীলা নিজের মুখে এক পরম নিষ্পাপ ও নির্দোষ ভাব ফুটিয়ে তুলল। সে মিহালের দিকে মায়াবী চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম সুরে জিজ্ঞেস করল__
“ফুফু ঠিকই তো বলেছেন, আপনি কেন খাবার খাচ্ছেন না বলুন তো? আপনার সামনেই তো আপনার সেই অতি প্রিয় হেলদি খাবার সাজিয়ে রাখা আছে। আমরা না হয় আমাদের এই তেল,ঘি -চিটচিটে আলতু-ফালতু খাবারগুলো মনের সুখে গোগ্রাসে গিলছি, কিন্তু আপনি আপনার ওই পুষ্টিকর খাবার মুখে তুলছেন না কেন?”
মিহালের আর বুঝতে বাকি রইল না যে নীলা কেন এই ডাইনিং টেবিলে সবার অলক্ষ্যে তার সাথে এমন ভয়ঙ্কর খেলা খেলছে। সে নিমেষেই ধরে ফেলল যে একটু আগে সে নীলার ঘিয়ে ভাজা পরোটাকে ‘আলতু-ফালতু’ বলেছিল, আর এখন এই রূপসী নীলা মির্জা তারই সুদে-আসলে প্রতিশোধ নিচ্ছে। নীলা কতটা চতুর, তা সে হাতেনাতে প্রমাণ করে দিচ্ছে। সে নিজের বাম হাত দিয়ে টেবিলের নিচে নিখুঁতভাবে নিজের সয়তানি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, আবার একই সাথে ডান হাত দিয়ে খুব আয়েশ করে নিজের প্লেটের পরোটা ছিঁড়ে মুখে পুরছে। আর এদিকে মিহাল পুরো অবশ হয়ে এক লোকমা খাবারও মুখে তুলতে পারছে না।
নাস্তার টেবিলের সবাই এখন গভীর কৌতুহল নিয়ে মিহালের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ নিজের প্রিয় স্বাস্থ্যকর খাবার সামনে রেখেও সে এভাবে পাথরের মতো হাত গুটিয়ে বসে আছে কেন, তা কারও মাথায় ঢুকছে না। মিহাল অসহায় চোখে সবার দিকে একবার তাকাল। দেখল মা, মুনভি আর ইকরা—সবাই এক অদ্ভুত ও প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। আর তার ঠিক পাশে বসা নীলা আড়চোখে তার এই অসহায়ত্ব দেখছে আর ওষ্ঠকোণে এক চিলতে বাঁকা ও বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে তুলছে।
শেষমেশ আর কোনো উপায় না পেয়ে, মায়ের ধমক আর সবার কৌতুহলী চোখ থেকে বাঁচতে মিহাল তার বাম হাতটি বাড়াল। সে কাঁপতে কাঁপতে বাম হাত দিয়েই বাটি থেকে চামচ তুলে ফ্রুট সালাদ মুখে পুরতে শুরু করল। ডানহাতি মিহালকে এভাবে হঠাৎ বাম হাত দিয়ে খেতে দেখে ডাইনিং টেবিলের বাকি সবার চোখ যেন বিস্ময়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। মিনা মির্জা তো চরম অবাক হয়ে কপালে হাত দিয়ে বলেই উঠলেন__
“কিরে মিহাল! সকাল সকাল তোর মাথা-টাথা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে নাকি? তুই ডান হাত থাকতে হঠাৎ বাম হাতে কেন খাবার খাচ্ছিস শুনি?”
মিহাল এক চরম বোকা বোকা হাসি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলল__
“না মানে… আসলে মা, আমার ডান হাতটাতে খুব ব্যথা করছে। নাড়াতে পারছি না।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই উল্টো পাশ থেকে মুনভি ফোড়ন কেটে বলে উঠল__
“আরে দূর পাগল! তোর ব্যথা তো লেগেছিল বাম হাতে, সেদিন লড়তে গিয়ে বাম হাতটাই তো জখম হলো। তাহলে আজ ডান হাত দিয়ে না খেয়ে উল্টো বাম হাত দিয়ে কেন খাচ্ছিস? আচ্ছা সত্যি করে বলতো তোর মাথায় চোট লাগল নাকি? মানে মাথাটা ঠিক আছে?”
মুনভির এই অকাট্য যুক্তি শুনে টেবিলের বাকি সবাই মাথা নাড়িয়ে তাল মিলিয়ে বলল__
“ঠিকই তো,ব্যথাতো বাম হাতে।”
মিহাল এবার মুনভির দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাল। সে মনে মনে মুনভিকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলার মতো এক দৃষ্টি হেনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল__
“সোনা বন্ধু আমার! আমার শরীরের কোন জায়গায় ব্যথা, সেটা নিয়ে তোকে এত কে ভাবতে বলেছে শুনি? তুই যা না, তোর মেডিকেল সায়েন্স নিয়ে নতুন কোনো গবেষণা করগে যাহ। আর ব্যথাটা আমার শরীরে নাকি সোনা বন্ধু তোমার শরীরে? ডাক্তার হয়েছিস ভালো কথা, নিজের ওই ডাক্তারি সীমানার ভেতরেই থাক। রোগী হবার বিন্দুমাত্র কোনো প্রয়োজন নেই। আসছে আমার ব্যথার খতিয়ান নিতে! নিজে তো এক ফোঁটা ডাক্তার ডাক্তার ভাব রাখিস না, আবার যখন-তখন আবার রোগী সাজতে চাস!”
মিহালের এমন হঠাৎ করে খেপে যাওয়ার আসল কারণ মিনা মির্জা, মুনভি কিংবা ইকরা—কেউই প্রথমে ঠিক ধরতে পারল না। কিন্তু পাশে বসা নীলা ঠিকই সবটা বুঝতে পারল। সে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে পরম সুখে ঠোঁট টিপে হাসছে।
হঠাৎ করে ইকরা নীলাকে এভাবে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে দেখে বেশ অবাক হলো। তার মনের ভেতর খটকা লাগতেই সে টেবিলের ওপর থেকে নিজের নজরটা একটু নিচের দিকে নামাল। আর ভালো করে নীলার বাম হাতের অবস্থান লক্ষ্য করতেই তার কাছে পুরো বিষয়টা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। সে দেখল, নীলার বাম হাতটি টেবিলের নিচে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মিহালের ডান হাতটিকে কয়েদি বানিয়ে রেখেছে। আসল রহস্যটা উদ্ঘাটন হতেই ইকরা নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে ধরল। সে টেবিলের নিচ দিয়ে নিজের কনুইটা বাড়িয়ে পাশে বসা মুনভিকে বেশ জোরে একটা গুঁতা দিল।
মুনভি ইকরার এই অতর্কিত কুনির গুঁতা খেয়ে কিছুটা চমকে তার দিকে তাকাতেই, ইকরা নিজের চোখের ইশারায় নীলার হাতের দিকে তাকাতে বলল। মুনভিও কালবিলম্ব না করে ইকরার দৃষ্টি অনুসরণ করে ডাইনিং টেবিলের নিচটায় চোখ রাখল। ব্যস! চোখের পলকে তার কাছেও মিহালের বাম হাতে খাওয়ার রহস্যটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। সে নিজের এক হাত মুখে চেপে ধরে মিটমিট করে হাসতে লাগল।
মিনা মির্জা নিজের আসনেই বসে ছিলেন। একে তো ছেলের এই অদ্ভুত উল্টাপাল্টা আচরণ, তার ওপর হঠাৎ করে মুনভি আর ইকরার মধ্যে এই চোরের মতো চোখের ইশারা আর মিটমিটে হাসি—সব মিলিয়ে উনার মাতৃত্বসুলভ মনেও এবার খটকা লাগল, কিছুটা সন্দেহ দানা বাঁধল। তিনিও এবার মুনভি আর ইকরার দৃষ্টির পথ ধরে আড়চোখে নীলার হাতের দিকে তাকালেন। আর চোখ পড়তেই উনার ঠোঁটের কোণেও এক পরম স্নেহের ও কৌতুকের হাসি ফুটে উঠল। ছেলের এই মধুর অসহায়ত্ব দেখে তিনি আর কথা না বাড়িয়ে মুচকি হেসে বললেন__
“আচ্ছা বাবা মিহাল, তোর যখন ইচ্ছে তুই বাম হাত দিয়েই খা। নতুন বিয়ে হয়েছে তো… হয়তো এই মুহূর্তে তোর নিজের ডান হাতটা আর তোর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই!”
সবাই মিট মিট করে হাসলো এবং খাওয়া শেষ করতে লাগলো।
_____
খাবারের টেবিলজুড়ে তখন এক থমথমে নীরবতা। সবাই চুপচাপ, যেন শব্দ করলেই কোনো অদৃশ্য বাঁধ ভেঙে যাবে। সেই নীরবতার মাঝেই নীলা কী এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে ধরল মিহালের হাত। এমন শক্ত বাঁধন, যা আলগা করার কোনো লক্ষণই নেই। অগত্যা বেচারা মিহালকে বাঁ হাতের কসরত করেই খাওয়া শেষ করতে হলো।
খাবার পর্ব চুকতেই ইকরা বিদায় নেওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু মিনা মির্জা তাকে আটকে দিলেন। নীলার চোখদুটোও বলছিল, সে-ও চায় না ইকরা এখনই চলে যাক। কিন্তু তীব্র ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ইকরা নিজেকে গুটিয়ে নিল। দিনশেষে এটা তো আর তার নিজের বাড়ি নয়। মিনা মির্জা আর মিহাল মুখে যতই বলুক—‘এটা তোমারও বাড়ি’, তবু একটা অলিখিত দেয়াল তো রয়েই যায়। এই চেনা-অচেনা ঘরের দেওয়ালে নিজের অধিকারের দাবি বসাতে তার আরও কিছুটা সময় লাগবে। মনের ভেতর এই দোলাচলের কারণে সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না। তবে তার দ্বিধা প্রকাশের আগেই মিহাল আর মিনা মির্জা চূড়ান্ত রায় শুনিয়ে দিলেন। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হলো—এই নিয়ে পরে কথা হবে, এখন শুধুই বিশ্রামের সময়।
তর্কাতর্কির অবসান ঘটিয়ে সবাই যার যার ঘরের পানে পা বাড়াল। নীলা অবশ্য নিজের ঘরে গেল না। সে সোজা ঢুকে পড়ল ফুফুর ঘরে। বেশ খানিকটা সময় চলল দুজনের খুনসুটি আর প্রাণখোলা আড্ডা। একসময় ফুফুর ফোনে নিজের বাবা আর চাচাদের নম্বরগুলো পরম যত্নে সেভ করে দিল নীলা। তারপর একটা রিং হতেই আলতো পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। সে জানে, এই মুহূর্তে ফুফুর কিছুটা একান্ত সময় প্রয়োজন। নিজের ভাইদের কণ্ঠস্বর শুনে বহু বছরের জমাট বাঁধা অভিমান আর দূরত্বটুকু যেন এক নিমেষে গলে জল হয়ে যায়—সেই সুযোগটুকুই করে দিল নীলা।
মিহালের ঘরের দিকে প্রতিটা পদক্ষেপ বাড়ার সাথে সাথে নীলার বুকের ভেতরের দপদপানিটা যেন ক্রমশ তীব্র হতে লাগল। এক অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করছে তাকে। এখন নিজের ওপরই ভীষণ আফসোস হচ্ছে—কেন যে ডাইনিং টেবিলে অমন কাণ্ড করতে গেল সে! প্রথমে না হয় মিহালকে একটু শায়েস্তা করার জন্য হাতটা ধরেছিল, তা বলে পুরোটা সময় এভাবে হাত ধরে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না। লোকটা এখন মনের ভেতর কী ভাবছে তাকে নিয়ে? ভাবতেই লজ্জায় চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠছে তার।
অথচ কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! এতক্ষণ মিহালের হাতটা ধরে রাখার পরেও এখন কেন যেন মনে হচ্ছে, সময়টা বড্ড কম ছিল। আরও কিছুক্ষণ কি ধরে রাখা যেত না? আসলে সে তখন এতটাই ঘোর আর বেখেয়ালিপনার মধ্যে ডুব দিয়েছিল যে, হাতটা ছাড়ার কথা মাথাতেই আসেনি। ভাগ্যিস ঠিক তখনই ইকরা খাওয়া শেষ করে চলে যাওয়ার কথা তুলল। সবার মনোযোগ সেই দিকে ঘুরে যেতেই নীলার হঠাৎ হুঁশ ফিরল যে, সে এতক্ষণ মিহালের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। পরক্ষণেই সবার নজর এড়িয়ে অত্যন্ত সতর্কতায় হাতটা আলগা করে দিয়েছিল সে।
ভাবনার এই জাল বুনতে বুনতেই সে ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু ভেতরে ঢোকার মতো পর্যাপ্ত সাহস যেন কিছুতেই সঞ্চয় করতে পারছে না। পা দুটো ভারী হয়ে আসছে। অবশেষে দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে নিজের জামার গলাটা হাত দিয়ে কিছুটা ফাঁক করল সে, তারপর তপ্ত একটা শ্বাস ছেড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। আর ঠিক তখনই এক বুক জড়তা নিয়ে ঘরের ভেতর পা বাড়াল নীলা।
রুমের ভেতর পা রাখতেই নীলার চোখে পড়ল মিহাল তার চিরচেনা রকিং চেয়ারটায় হেলান দিয়ে দুলছে। এক হাত কপালে ঠেকিয়ে চোখ দুটো বুজে আছে সে। মিহালের এই ভঙ্গি দেখে নীলা ঠিক আন্দাজ করতে পারল না—লোকটা কি ডাইনিং টেবিলের সেই কাণ্ডটা নিয়েই ভাবছে, নাকি অন্য কোনো গভীর চিন্তা ভর করেছে তার মনে?
সে অত্যন্ত সাবধানে, টিপ টিপ পায়ে হেঁটে মিহালের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আলতো করে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল তার মুখোমুখি। মিহাল অবশ্য আগের মতোই চোখ বন্ধ করে রইল। তবে তার চেয়ারের দুলুনিটা হুট করেই থেমে গেল। আসলে সে তো চোখ বুজেও নিজের এই ‘নীলাঞ্জনা’র উপস্থিতি প্রতিটা মুহূর্তে টের পায়।
চোখ না খুলেই মিহাল গম্ভীর অথচ নিচু স্বরে বলে উঠল,
“এত দেরি হলো যে রুমে আসতে? খাবার টেবিলে তো বেশ স্বামী-ভক্তের মতোন আমাকে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দিচ্ছিলে। তো বলো, এখন কী করতে চাও?”
নীলা ঠোঁটের কোণে একটা ফিচলে হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর খানিকটা উঁচু হয়ে মিহালের একদম কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল__
“ফুফুমণি ঠিকই বলেছিল আপনার ডান হাত আপনার কন্ট্রোলে নেই। কিন্তু উনি এটা জানেনই না যে আপনার ডান হাতটা তখন আমার কন্ট্রোলে ছিল।”
কথাটা শেষ করেই সে চট করে মিহালের কানের কাছ থেকে নিজের মুখটা সরিয়ে নিল। তারপর বেশ একটা চ্যালেঞ্জিং দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মিহালের মুখোমুখি।
কিন্তু পরক্ষণেই পাশা উল্টে গেল। মিহাল কপাল থেকে হাত সরিয়ে চোখ দুটো মেলল। তার সেই গভীর চাউনি যেন নীলার সবটুকু সাহস এক পলকে শুষে নিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিহাল আচমকা নীলার একদম কাছাকাছি চলে এল। এতটাই কাছে যে দুজনের নিশ্বাসের ওলটপালট হাওয়া একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মিহালকে এভাবে এতখানি কাছে দেখে নীলা ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেল। নিজের হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন আড়াল করতেই যেন সে পরপর কয়েকবার শুকনো ঢোক গিলল।
নীলা ঘাবড়ে গেলেও পিছিয়ে গেল না। তার এই অবিচল থাকা দেখে মিহালের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। তার তপ্ত নিশ্বাস তখন নীলার মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে অবাধ্য ঢেউয়ের মতো। মিহাল আলতো হাতে নীলার কপালের সামনে এসে পড়া অবাধ্য ছোট ছোট চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। তারপর নিজের বৃদ্ধা আঙুলটা নীলার নরম গালে নরম ছোঁয়ায় স্লাইড করতে করতে ফিসফিসিয়ে বলল__
“শুধু আমার ডান হাত কেন নীলাঞ্জনা? আমার গোটা শরীর, মন—সব কিছুই তো তোমার নিয়ন্ত্রণে আছে। পুরো আমিটাতেই এখন তোমার রাজত্ব। জিতে নিয়েছো তুমি এই রাজার মন এবং এই রাজার রাজত্ব। আর বানিয়ে দিয়েছো এই রাজাকে তোমার ভালোবাসার কাঙ্গাল। এখন এই রাজা তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজের রাজ্য ত্যাগ করতেও রাজি।”
চলবে??
Share On:
TAGS: নাজনীন নেছা নাবিলা, নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৬
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৯
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩০
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১০
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা বোনাস পর্ব
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৩
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪০
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৯ প্রথম অংশ
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৬