#পর্ব_১৫
#আতিয়া_আদিবা
অ্যাটিক রুমের ছোট কাঠের জানালা গলে তখন ডিসেম্বরের এক মুঠো মিষ্টি রোদ এসে সামাইরার চোখের পাতা ছুয়ে দিয়েছে। গতরাতের তুষারঝড় পুরোপুরি কখন থেমে গেছে কে জানে? আল্পসের কোলে দিনের বেলাতেও কেমন অচেনা নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে সামাইরার চেতনার জগত ধীরে ধীরে জাগ্রত হলো। কুঞ্চিত ভ্রুঁ নিয়ে চোখ দুটো মেলল সে। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার!
সহসা তার নাকে এসে ধাক্কা দিল এক অতি পরিচিত পুরুষালি সুবাস। সামাইরা এবার চোখ পিটপিট করে তাকাল। তার পুরো শরীর তখনো শেহজাদের পেশিবহুল বাহুর মাঝে শক্ত করে বন্দি হয়ে আছে। তার নিজের ডান গালও লেপ্টে আছে শেহজাদের চওড়া বুকে।
সামাইরা কিছুক্ষণ সময় নিল। এরপর ধীরে ধীরে গতরাতের সেই উন্মত্ত, আদিম স্মৃতির প্রতিটি ফ্রেম তার মস্তিস্কে একে একে ভেসে উঠতে লাগল। সামাইরার হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সর্বনাশ!
সেই ‘হট স্পাইসড অ্যাপেল পাঞ্চ’ এর কড়া নেশা এখন কেটে গেছে তার। কিন্তু যে ঘোর সে নিজের ভেতরে তৈরি করেছিল, তার রেশ এখনো তার ওষ্ঠাধরে লেগে আছে। সামাইরা শিউরে উঠল। সে বুঝল গতরাতে সে শেহজাদকে বাধা দেয়নি! বরং তার প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি চুম্বনে নিজেকে উজাড় করে সঁপে দিয়েছে।
সামাইরাকে ঘিরে ধরল লজ্জা এবং অপরাধবোধ। অনুশোচনার বেড়াজালে জড়িয়ে সামাইরা এক ঝটকায় নিজেকে শেহজাদের বাহুপাশ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল। তবে খাটটি বড্ড সংকীর্ণ হওয়ায়
শেহজাদের অবচেতন বাঁধন বেশ শক্তপোক্ত। কাজেই নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টায় সামাইরা ব্যর্থ হল।
পুনরায় জোর দিয়ে শরীর মোচড় দিতেই শেহজাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটল। হাতের বাধন আলগা করতেই সামাইরা এক ছুটে আলাদা হয়ে গেল। শেহজাদের উন্মুক্ত বুক এবং পিঠের দিকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকাল সামাইরা। সেখানে একেবারে টাটকা কিছু আঁচড়ের ক্ষত। সামাইরার নিজের নখগুলো পরম আবেগে কালরাতে শেহজাদের বুকে এবং পিঠে বসিয়েছে, তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।
নিজের গায়ের কাপড় ঠিক করতে লাগল সামাইরা।রাগে, অপমানে আর এক তীব্র কান্নার টালমাটালে কাঁপতে লাগল সে। বলল,
-গতরাতে… গতরাতে আমি স্বাভাবিক ছিলাম না। আপনি ইচ্ছে করে আমার ওই অসামাল অবস্থার সুযোগ নিলেন? আপনি আপনার নিজের দেওয়া কথা এক রাতের কামনায় ভেঙে ফেললেন!
সামাইরার এই আকস্মিক ও তীব্র অভিযোগে শেহজাদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো মুহূর্তেই চঞ্চল হয়ে উঠল। নিজের অজান্তেই এক চরম আত্মপক্ষ সমর্থনের দোলাচলে পড়ে গেল শেহজাদ। কারণ, কালরাতের ওই ভালোবাসার মুহূর্তটি সেও চায়নি। কিন্তু আল্পসের অদ্ভুত মায়াবী ঘোর তাদের দুজনকে এমন এক কামনার স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, যে স্রোতে অবচেতন মনেই গা ভাসিয়েছে দুজন।
শেহজাদ বিছানা থেকে নামল। সামাইরার দিকে এক পা এগিয়ে এসে কিছুটা ব্যাকুল স্বরে বলল,
-সামাইরা, জাস্ট লিসেন টু মি। গতরাতে যা হয়েছে তা কোনো প্রকারের সুযোগ নেওয়া ছিল না। আই ওয়াজ নট ইন মাই সেন্সেস আইদার! ওই ড্রিকংসটাতে সম্ভবত নেশাজাতীয় কিছু মেশানো ছিল। আমার ব্রেন ফ্রিজ হয়ে গিয়েছিল। আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। তুমি ভুল ভাবছ।
-বাহ্! মিস্টার শেহজাদ রহমান আজ নিজের পুরুষালি অহংকার বাঁচাতে একটা পাহাড়ি ড্রিংক্স এর ওপর দোষ চাপাচ্ছে!
সামাইরা চিৎকার করে উঠল। তার দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
-আপনি একটা আস্ত হিপোক্রিট! আপনি মুখে বলেন এক কথা আর কাজে অন্য কিছু করেন। আমি কোনোভাবেই আপনার এই সস্তা অজুহাত শুনব না!
তাদের এই তুমুল তর্কাতর্কি, ঘরের ভেতর সামাইরার রাগে পা দাপানোর শব্দ আর খাটের কাঁপুনির আওয়াজ নিচে থাকা বৃদ্ধ দম্পতির কান এড়ালো না।
অ্যাটিকের কাঠের মেঝের সেই তীব্র দাপাদাপি আর কান্নার আওয়াজ শুনে হ্যান্স আর এলিসা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
থপ থপ থপ। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল তারা। পরক্ষণেই দরজায় সজোরে টোকা পড়ল। সেদিকে অবশ্য সামাইরা এবং শেহজাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কাজেই অনুমতি ছাড়াএলিসা আর হ্যান্স ঘরের ভেতরে ঢুকলেন।
এলিসা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত গলায় সুইস-জার্মান ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন,
-কী হয়েছে বাছারা? এত সকালে উঁচু গলায় কথা বলছো কেন? সব ঠিক আছে তো?
হ্যান্সও তার চশমাটা ঠিক করতে করতে শেহজাদ আর সামাইরার দিকে সন্দেহী চোখে তাকালেন।
শেহজাদ আর সামাইরার ভেতরের সামাজিক মুখোশটা এবার সচল হয়ে উঠল। হ্যান্স আর এলিসাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই তারা নিজেদের ভেতরের সমস্ত রাগ আর ক্ষোভ এক পলকে লুকিয়ে ফেলল। সামাইরা জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। দ্রুততার সাথে নিজের চোখের জল মুছে নিল। এমন একটা ভাব করল যেন সে জানালার বাইরের অপরূপ দৃশ্য দেখতে মগ্ন!
শেহজাদও মুহুর্তের মধ্যে নিজের চেহারায় কৃত্রিম হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। সে সামাইরার খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। যেন তাদের মাঝে অত্যন্ত মধুর কোনো খুনসুটি চলছিল এতক্ষণ।
এলিসা সামাইরার সামান্য কেঁপে ওঠা কাঁধ দেখে শেহজাদকে জিজ্ঞেস করলেন,
-তোমরা কি ঝগড়া করছিলে নাকি?
শেহজাদ অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে হ্যান্স আর এলিসার দিকে তাকিয়ে খাঁটি সুইস-জার্মান ভাষায় উত্তর দিল,
-না, না, সব একদম ঠিক আছে! ওই সামান্য কথা কাটাকাটি হচ্ছিল আর কি। ও কিছু না।
শেহজাদের কথায় হ্যান্স আর এলিসা আশ্বস্ত হলেন। তারা ভাবলেন, নতুন বিয়ে হওয়া দম্পতির মাঝে হয়তো সকালের মিষ্টি রোদের মতনই মিষ্টি অভিমান চলছে। হ্যান্স শেহজাদের পিঠ চাপড়ে হেসে বললেন,
-ঠিক আছে, ঠিক আছে। তরুণ বয়সে এমন একটু আধটু শব্দ হওয়াই স্বাভাবিক। তোমরা দ্রুত নিচে এসো, এলিসা ব্রেকফাস্ট তৈরি করে সাজিয়ে রেখেছে।
বৃদ্ধ দম্পতি হাসিমুখে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাওয়ার পর ঘরের ভেতরের সেই কৃত্রিম শান্তির পর্দাটা আবার পড়ে গেল। শেহজাদ দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে আবার সামাইরার দিকে ফিরল। সামাইরা তখনো জানালার কাঁচ ধরে রাগে ফুঁসছে।
শেহজাদ সামাইরার খুব কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরার চেষ্টা করে বলল,
-সামাইরা, প্লিজ জেদ কোরো না। আমি তোমাকে আবারও বলছি, গতরাতের ওই ঘটনায় আমার কোনো হীন উদ্দেশ্য ছিল না। আমি ইচ্ছে করে কিংবা সজ্ঞানে কিছু করি নি। ট্রাস্ট মি।
সামাইরা তেড়ে বলল,
-আপনার মতো একটা পশুকে আমি বিশ্বাস করব?
সামাইরা এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বিষাক্ত চোখে তাকাল। -আপনি বারবার একই কথা বলে নিজের পাপ ঢাকতে পারবেন না। বুঝতে পেরেছেন? আপনি হলেন…
সামাইরার এই অনমনীয় জেদ, তার এই বারবার অবুঝের মতো ব্লেম-গেম খেলা এবার শেহজাদের ভেতরের সেই দাপুটে পুরুষ সত্তাকে খেপিয়ে তুলল। সে আর কোনো কথা দিয়ে এই মেয়েটিকে বোঝাতে চাইল না। সে এবার ইচ্ছে করেই, অত্যন্ত আকস্মিকভাবে সামাইরার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে সজোরে চেপে ধরল। সামাইরার কথা শেষ হবার আগেই শেহজাদ তার মুখটা নিচু করে সামাইরার ওষ্ঠাধরে নিজের ঠোঁট জোড়া শক্ত করে চেপে বসিয়ে দিল। এক তীব্র, গভীর আর দমবন্ধ করা দীর্ঘ চুম্বন শুরু হল।
ঘটনার আকস্মিকতায় সামাইরার চোখ জোড়া বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। সে দুই হাত দিয়ে শেহজাদের বুকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু শেহজাদের লৌহকঠিন আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব। শেহজাদ ইচ্ছে করেই তাকে এই চুম্বনে বন্দি করল।যেন সে সামাইরার সমস্ত অবাধ্যতা আর চিৎকার এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
বেশ দীর্ঘক্ষণ পর শেহজাদ সামাইরাকে ছেড়ে দিল। সামাইরা তখন হাপাচ্ছে। তার ঠোঁট দুটো রক্তাভ হয়ে উঠেছে। শেহজাদ তার চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ধমকের সুরে বলল,
-অনেক নাটক হয়েছে সামাইরা। এখন আর একটা শব্দও মুখ থেকে বের করবে না। চুপচাপ নিচে আসো ব্রেকফাস্ট করতে। আই সেড, জাস্ট কাম ডাউন!
সামাইরা রাগে, অপমানে গরগর করতে লাগল। তার পুরো শরীরটা তখন চরম ক্ষোভে থরথর করে কাঁপছে। সে নিজের দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নখগুলো চামড়ার ভেতরে বসিয়ে দিল। তার ইচ্ছা করছিল এই মুহূর্তেই শেহজাদকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে। কিন্তু আফসোস! এই ইচ্ছা পূরণ হবার নয়।
শেহজাদ সামাইরার ওই রাগী, মুষ্টিবদ্ধ হাত আর কাঁপতে থাকা অবয়ব দেখল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে আলতো করে নিজের কোটের কলারটা ঠিক করে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অ্যাটিক রুমের দরজা খুলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। আর সামাইরা পাহাড় সমান রাগ নিজের মাঝে বন্দি করে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
মিনিট পনেরো পর সামাইরা নিজেকে কোনোমতে শান্ত করে নিচে নেমে এল। ব্রেকফাস্ট টেবিলের পরিবেশটা ছিল বেশ ছিমছাম। হ্যান্স আর এলিসার আন্তরিকতায় সামাইরা নিজের ভেতরের ঝড় কিছুটা দমিয়ে ফেলল।
পাইন কাঠের টেবিলের ওপর এলিসা সাজিয়ে রেখেছেন ঘরোয়া পদ্ধতিতে তৈরি আল্পাইন মাখন, পনির আর ওভেন থেকে সদ্য বের করা গরম ‘ব্রেড’।
এলিসা হাসিমুখে সামাইরার প্লেটে এক টুকরো গরম রুটি আর মাখন তুলে দিতে দিতে বললেন,
-কী হয়েছে বাছা? মুখটা এমন গুমোট করে রেখেছ কেন?
সামাইরা এলিসার প্রশ্ন বুঝল না। কাজেই তার দিকে তাকিয়ে একটা কৃত্রিম হাসি ফোটানোর চেষ্টা করল।
শেহজাদ এলিসার দিকে তাকিয়ে সুইস-জার্মানে বলল,
-ও আসলে একটু বেশিই সেন্সিটিভ বুঝলে? সকাল সকাল ওর সাথে আমার একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তাই এখন আমার ওপর ভীষণ চটে আছে।
হ্যান্স তার পাইপটা টেবিলে রেখে হেসে উঠলেন।
-হা হা হা! বন্ধু! রাগ করা তো মেয়েদের জন্মগত অধিকার। এলিসা যখন তরুণী ছিল, তখন আমার সাথে ঝগড়া হলেই তিন দিন রান্নাঘর বন্ধ করে রাখত। তবে নারীদের এই রাগটুকুই সংসারের আসল সৌন্দর্য বুঝলে? তুমি বরং ওকে নিজ হাতে একটু খাইয়ে দাও, রাগ গলে পানি হয়ে যাবে। হা হা হা!
হ্যান্সের কথা শুনে শেহজাদ সত্যিই টেবিলের মাঝখান থেকে একটা ব্রেড তুলে নিল। এরপর তাতে জ্যাম লাগিয়ে সামাইরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-নাও, খেয়ে নাও। রাগ করে তো আর লাভ নেই। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। যা দেখার তা তো দেখেই ফেলেছি।
সামাইরা দাঁতে দাঁত চেপে শেহজাদের চোখের দিকে তাকাল।
এলিসা হাসিমুখে বললেন,
-তোমাদের দুজনকে একসাথে দেখে আমার নিজের তরুণ বয়সের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। যাজ্ঞে, তোমরা ব্রেকফাস্ট শেষ করো।
ব্রেকফাস্টের শেষ দফায় এলো দুই মগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি। কফি হাতে তারা শ্যলে-র পেছনের দিকটায় চলে এলো। ছোট কাঠের দরজাটা খুলতেই সামাইরার চোখে পড়ল এক টুকরো অলৌকিক স্বর্গ।
কি অপরূপ সুন্দর একটি ছোট্ট পাহাড়ি বাগান!
বসন্ত বা গ্রীষ্মে হয়তো এখানে রকমারি রডোডেনড্রন কিংবা আল্পাইন ফুলের মেলা বসে। তবে ডিসেম্বরের এই সকালে পুরো বাগানটি শ্বেতশুভ্র বরফের পুরু চাদর গায়ে মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। বাগানের কাঠের বেঞ্চ আর ছোট টেবিলটার ওপর তুষারের আস্তরণ জমে আছে। সামাইরা ধীর পায়ে এগিয়ে একটি পাথরের দেয়ালের পাশে দাঁড়াল। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস তার গালজোড়া জমিয়ে দিচ্ছে। তবে কফির মগের উষ্ণতা তাকে আরাম দিচ্ছিল বেশ।
ঠিক তখনই দূর থেকে এক তীব্র যান্ত্রিক গর্জন ভেসে এল। সামাইরা চোখ তুলে তাকাল। শ্যলে-র ঠিক নিচ দিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যে প্রধান সড়কটি লাউটারব্রুনেন উপত্যকার দিকে চলে গেছে, শব্দটির উৎস সেই স্থানটিই। সেখানে চলছে এক অভূতপূর্ব ব্যস্ততা। সুইজারল্যান্ডের অত্যাধুনিক ও দক্ষ পুরকর্মীরা ঝড় থামার সাথে সাথেই রাস্তা সচল করার অভিযানে নেমে পড়েছেন। কমলা রঙের বিশালাকার স্নো-প্লাউ এবং স্নো-ব্লোয়ার মেশিনগুলো গর্জন করতে করতে রাস্তা বেয়ে এগোচ্ছে। চাকার সামনে থাকা দানবীয় ব্লেডগুলো রাস্তা থেকে বরফের পাহাড় কেটে ফোয়ারার মতো রাস্তার দুই পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। আর সেই মেশিনের ঠিক পেছন পেছন আরেকটি গাড়ি থেকে রাস্তায় ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে বরফ গলানোর বিশেষ লবণ আর নুড়ি পাথর।
ঝড়ের তান্ডবের পর প্রকৃতির এই শ্বেতশুভ্র নিস্তব্ধতার মাঝে মানুষের তৈরি এই যান্ত্রিক কর্মযজ্ঞ কেমন বৈপরীত্য তৈরি করেছে!
শেহজাদ বাগানের অন্য প্রান্তের একটি কাঠের বেঞ্চে গিয়ে বসল। সে কফির মগে একটা চুমুক দিতেই তার ওভারকোটের পকেটে থাকা আইফোনটি মৃদু ভাইব্রেট করে উঠল। শেহজাদ ফোনটা বের করতেই দেখল, তার সাইবার সিকিউরিটি টিমের প্রধানের কাছ থেকে আরেকটি মেসেজ এসেছে।
মেসেজের টেক্সট ফাইলটি খুলতেই শেহজাদের চোখ দুটো সরু হয়ে এল।
-নাফিস আহমেদ এবং মিসেস রহমান একই কলেজে পড়াশোনা করতেন। তারা একসাথে কলেজের একটি বিশেষ একাডেমিক প্রজেক্টে কাজও করেছে। তারা পূর্বপরিচিত।
শেহজাদ ফোনটা লক করে পকেটে রেখে দিল। সে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে ধীর পায়ে সামাইরার একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ছায়া সামাইরার ওপর পড়তেই সামাইরা সামান্য শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু মুখ ফেরাল না।
শেহজাদ খুব শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,
-তোমার কি আগে কোনো বয়ফ্রেন্ড ছিল?
-না, ছিল না।
শেহজাদ দমল না। সে সামাইরার খুব কাছাকাছি এসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
-বয়ফ্রেন্ড না থাক, এমন কেউ কি ছিল যাকে তুমি মনে মনে খুব পছন্দ করতে? কিংবা তোমাকে পছন্দ করত?
শেহজাদের এই পুনরাবৃত্তিমূলক জেরা আর সন্দেহের চাউনি সামাইরার ভেতরের সমস্ত সংযমের বাঁধ এবার মুহূর্তে ভেঙে চুরমার করে দিল। সকাল থেকে চেপে রাখা অপমান, রাতের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মিলনের গ্লানি আর শেহজাদের এই ক্রমাগত মানসিক নির্যাতন সব মিলে সামাইরা এবার রাগে ফেটে পড়ল। সে হাতের কফির মগটা পাশের পাথরের টেবিলটায় সশব্দে নামিয়ে রাখল। তবুও কিছুটা কফি উপচে পড়ল শুভ্র বরফের ওপর।
সামাইরা শেহজাদের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় প্রশ্ন করল,
-কেন বলুন তো? দুনিয়ার সবাইকে কি নিজের মতো মনে হয় আপনার? আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে দেখে কি আমারও কোনো বয়ফ্রেন্ড থাকতে হবে? আপনি একজন আস্ত চরিত্রহীন পুরুষ। আপনার স্বভাব হচ্ছে, আপনি গাছেরও খাবেন, আবার তলারও কুড়োবেন!
সামাইরার আরও একধাপ এগিয়ে শেহজাদের বুকের খুব কাছে এসে বলল,
-রাইসার সাথে ব্রেকআপের বিষয়টা কি আপনার এক নিখুঁত নোংরা চিত্রনাট্য ছিল না? শুধুমাত্র আমাকে ভোগ করার জন্য, আমার এই শরীরটাকে বিছানায় নেওয়ার জন্য আপনি এই হানিমুনের নাটক সাজালেন? এত কিছু না করে জবরদস্তি করলেই তো পারতেন!
শেহজাদ চোখমুখ শক্ত করে জিজ্ঞেস করল,
-কি বলছ এসব সামাইরা?
সামাইরা চরম অবজ্ঞার সাথে বলল,
-আপনি তো সমাজের চোখে, কাগজে-কলমে আমার স্বামী। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করেছেন, আমাকে এই নরকে আটকে রেখেছেন। শরীয়ত মোতাবেক আমার এই দেহ তো আপনার জন্য এমনিতেই হালাল ছিল! ছিল না? তাহলে এত ছলাকলা করার, এত ভালো মানুষ সাজার ভণ্ডামি কেন করলেন? জবরদস্তি করে নিজের ইচ্ছা পূরণ করে নিলেই তো হতো! কেন এই নোংরা নাটক করলেন বলুন তো?
সামাইরার এই নিষ্ঠুর বাক্যবাণগুলো সরাসরি গিয়ে বিঁধল শেহজাদের বুকের গভীরে। স্ত্রীর মুখে নিজের চরিত্রের এমন কুৎসিত বর্ণনা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল সে।
সামাইরাকে সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করেছে। তার সাথে অনেক অন্যায় করেছে। কিন্তু তার সম্মান বাঁচাতেই তো লড়াই করছে সে! সামাইরাকে নিয়ে তার চিন্তা হয়। খারাপ লাগে। মায়া লাগে। অনুভূতি জন্মেছে। অথচ সবকিছুকে এক নিমেষে ‘দেহ ভোগ করার এক সস্তা নাটক’ বলে উড়িয়ে দিল সে?
শেহজাদ রেগে গেল না। সে সামাইরার ওপর চিৎকারও করে উঠল না। সে একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ক্ষণিককাল।
শেহজাদ ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়াল। সে কোনো কথা না বলে, পেছনে না তাকিয়ে শান্তভাবে শ্যলে-র ভেতর চলে গেল। বাগানের কনকনে বাতাসের মাঝে সামাইরা একা দাঁড়িয়ে রইল। তার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে এলো চারিপাশ।
[আশা করি আমার চোখের ইনফেকশনের কথা সবাই জানেন। পোস্ট করেছিলাম। আমার স্ক্রিনটাইম একদক কমিয়ে আনতে হয়েছে। চোখে কোনোপ্রকার প্রেশার দেওয়া যাবে না। যার ফলে রেগুলার গল্প লিখতে পারছি না। অনেকদিন ধরে টুকটুক করে লিখা একটি পর্ব আজকে শেয়ার করলাম। ঈদ মোবারক]
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, তুমি এলে অবেলায়
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৭
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২২
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৯
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৪
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৪