ডেসটেনি পর্ব ২৫
#সুহাসিনি_মিমি
কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরটা অতিথিদের কোলাহলে একদম জমজমাট। নানান ধরণের মানুষের ব্যস্ত আনাগোনায় পুরো পরিবেশটাই গমগম করছে। প্রিয়ন্তী মুগ্ধ চোখে দেখছে চারোপাশটা। এত বড় আয়োজনের বিয়েবাড়িতে খুব বেশি আসা হয়নি ওর।মাঝে মাঝেই বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যাচ্ছে মেয়েটার।
পাভেল তখন সামনে তাকিয়ে পরিচিতদের সঙ্গে আলাপচারিতা জারি রাখছে। প্রিয়ন্তী উঠচ্ছাসে উসখুস করলেও মিতালীর হেলদুল নেই তেমন। প্রিয়ন্তী লক্ষ্য করেছে পুরোটা রাস্তায় একটাও কথা বলেনি ওর ভাবি। একপর্যায়ে প্রিয়ন্তী তো চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস ও করেছিল,
“ভাবি তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
“না তো!”
ব্যাস এতটুকুই উত্তর দিয়েছিলো মিতালী। প্রিয়ন্তীর ধ্যান ভাঙে। উৎসুক হয়ে তাকাই কমিউনিটি সেন্টারের সদর দরজার অভিমুখে। শুধু সেই নয় বরং আশেপাশের সবাই এমনকি পাভেল ও উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। হালকা আকাশি রঙের ব্লেজার স্যুট গায়ে ভিতরে প্রবেশ করছে অভিরাজ। সুটের ভেতরে সাদা শার্ট। হাতে সিলভার ঘড়ি। ফর্সা গায়ের রঙের সঙ্গে রঙটা এতটাই দারুণভাবে মানিয়েছে যে লোকটাকে আলাদা করেই চোখে পড়ছে ভিড়ের মাঝেও।
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, স্যুটের কালারটা প্রিয়ন্তীর গাউনের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যাচ্ছে।মিতালী প্রথমে ব্যাপারটা খেয়াল না করলেও অভিরাজ কাছে আসতেই চোখ হঠাৎ আটকে গেল দুজনের ড্রেসে।একই শেড।একই টোন।এতটা মিল কাকতালীয় হওয়ার কথা না অবশ্যই। ভ্রু কুঁচকে গেল মিতালীর।তবে কিছু বলল না সে। পাভেল এগিয়ে গেছে ইতিমধ্যে।গিয়ে বিনয়ী সরে সালাম জানায়,
“আস্সালামুআলাইকুম ভাই!”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম!”
ছোট করে সালামের উত্তর নিয়ে তাকায় দাঁড়িয়ে থাকা দুই নারীর দিকে। তবে দৃষ্টিটা যে মিতালী কে ভেদ করে সরাসরি গিয়ে প্রিয়ন্তীর উপর ঠেকেছে বুঝতে দেরি হলোনা মিতালীর।
ওদিকে লোকটার এরকম একঘেয়ে দৃষ্টিতে খানিকটা হাঁসফাঁস করে উঠল প্রিয়ন্তী। নড়েচড়ে দাঁড়ালো কিঞ্চিৎ। অলিভ গ্রীন রঙা চোখের মণিদুটো জ্বলজ্বল করছে। সেই দৃষ্টিতে মিউয়ে এলো মেয়েটা। পাভেলের ইশারায় অসস্তি চেপে কাছে এসে দাঁড়িয়ে সালাম জানাল ও। তারপর পাভেলই কথাবার্তা শুরু করল আবার,
“অনেক ব্যস্ত মনে হচ্ছে ভাইকে আজকাল?”
“একা সবকিছু সামলিয়ে উঠতে পারছিনা। তাই ব্যস্ততাই থাকা হচ্ছে ইদানিং!”
“আমি তো ভাবতেও পারিনি আপনি আসবেন বিয়েতে। শিহাবও নিশ্চিত ছিলোনা।”
“আসতে তো হতোই আমায়। আজ হউক বা কাল, আটকা যেহেতু পড়েছি তাই আসতে বাধ্যই বলা চলে!”
“হেহে!”
অভিরাজের কথাটা সযত্নে এড়িয়ে গেল পাভেল। আরও টুকটাক কিছু বিষয়ে কথাবার্তা চালালো দুজনে। কথার মোড় অবশ্য ঘুরেফিরে এসে শেষ হচ্ছে বিজনেসে। এর মাঝেই পাশ থেকে এসে ডাকল ওদের। কণের সঙ্গে ছবি তুলবে বলেছিলো। মিতালী প্রিয়ন্তী কে নিয়ে চলে গেল সেখানে। ওরা দুজন যেতে এক গার্ড এসে বাজতে থাকা ফোন এগিয়ে দেয় অভিরাজের সম্মুখে। স্ক্রিনে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে এক পাশে যেতে যেতে বলে,
“এক্সকিউজ মি।”
***
স্টেজে ছবি তোলার ঝামেলা শেষ হতে হতে বেশ খানিকটা সময় কে টে গেল। এর মধ্যেই পুরো কমিউনিটি সেন্টার আরও ভরে উঠেছে অতিথিদের ভিড়ে। বরযাত্রীরাও এসে পৌঁছেছে ততক্ষণে।বরযাত্রীর সঙ্গে বরের বন্ধু এসেছেও অনেক। হলরুমটাই কেমন গমগম করছে এখন।স্টেজ থেকে নামতেই পাভেল বলল,
“চলো, আগে খেয়ে নিই।”
মিতালীও মাথা নেড়ে সায় দিল। প্রিয়ন্তী তখনো একটু অস্বস্তিতে ডুবে আছে। খুব লক্ষ্য করছে ছেলেদের থেকে শুরু করে মেয়েরাও কেমন চোখে যেন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তিনজন একসঙ্গে ডাইনিং সেকশনের দিকে এগোলো। বড় বড় গোল টেবিল সাজানো পুরো জায়গাজুড়ে। সাদা কাভার দেওয়া চেয়ারের একটায় বসল গোল হয়ে। পাভেলদের সঙ্গে এসে যোগ দিল তার আরও এক বন্ধু ও তার ওয়াইফ।পাঁচজন একসঙ্গে বসল টেবিলে।একটু পরপরই সার্ভাররা খাবার এনে সাজিয়ে দিতে লাগল।
পোলাও, রোস্ট, কাবাব, রেজালা, সালাদ, সফট ড্রিংকস, একের পর এক। পাভেলের বন্ধু খেতে খেতেই গল্প শুরু করে দিল বন্ধুর সঙ্গে। মিতালীর সঙ্গে গল্প জুড়লো তার বন্ধুর স্ত্রী। ওদিকে প্রিয়ন্তী মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে খাচ্ছে।বাড়িতে থাকলে হয়তো আরও খেতো, কিন্তু বাইরে কোথাও এলে এমনিতেই খুব বেশি খেতে পারেনা ও। দুই-তিন লোকমার পরই কেমন পেট ভরে আসে। তার উপর চারপাশে এত মানুষ।
“আমি হাত ধুয়ে আসি।”
“একা যেতে পারবে?”
“হুম, এই তো সামনেই!”
মিতালীর প্রশ্নে প্রিয়ন্তী ছোট করে উত্তর দিয়ে উঠে পড়ল।গাউনটা আলতো সামলে ডাইনিং সেকশন পেরিয়ে এগিয়ে গেল ওয়াশ এরিয়ার দিকে।কমিউনিটি সেন্টারের একপাশে বড় করে হাত ধোয়ার জায়গা করা। দেয়ালজুড়ে লম্বা বেসিন, উপরে বড় আয়না।চারোপাশে মানুষের আনাগোনা থাকলেও ডাইনিং সেকশনের তুলনায় এই পাশটা তুলনামূলক নিরিবিলি। প্রিয়ন্তী ধীরে গিয়ে একটা ফাঁকা বেসিনের সামনে দাঁড়াল।কল ছেড়ে হাত ধুলো।কিছুক্ষণ চুপচাপ হাত ধুতে ধুতেই আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাতে অমনি চোখে পড়লো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য।
মেয়েদের ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসছে একটা ছেলে। কালো শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। চুলগুলো এলোমেলো। হাতের কনুই দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসছে বাইরে। প্রিয়ন্তী লক্ষ্য করল ছেলেটার ঠোঁটের কোণে লাল কিছু একটা লেপ্টে আছে। বুঝল ওটা মেয়েদের লিপস্টিক। দৃশ্যটা দেখেই ভ্রু কুঁচকে গেল প্রিয়ন্তীর। মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি ফুটে উঠল রমণীর। এই ধরনের ছেলেদের একদমই সহ্য করতে পারে না ও। পরপরই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো একটা মেয়ে। গায়ের ওড়না ঠিকঠাক করতে করতে সোজা চলে গেল বাইরে। বিয়েবাড়িতে এসে মেয়েদের ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে এসব করা,একদম জঘন্য ব্যাপার সেপার! আর এক সেকেন্ডও তাকাল না ও। বিরক্ত মুখে দ্রুত ভিতরে ঢুকে গেল ওয়াশরুমের ।মিনিট খানেক পর ফ্রেশ হয়ে দরজা খুলে বাইরে বের হতেই আচমকা ধাক্কা খেল কারও সঙ্গে।
“উফফ!”
চমকে গিয়ে প্রায় চেঁচিয়েই উঠল। সামনেই সেই একই ছেলেটা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝল ধাক্কাটা যে এর সঙ্গেই লেগেছে। ছেলেটা সামান্য বিব্রত হওয়া তো দূর সরে দাঁড়াল না অব্দি। বরং উল্টো ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। ছেলেটা যে ইচ্ছাকৃত ভাবেই এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল বিষয়টা বুঝতে মুখোভঙ্গি কঠোর করে চরম বিরক্তিতে আওড়াল প্রিয়ন্তী,
“আশ্চর্য!এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? অসভ্যের মতো!”
“অসভ্য?”
বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে আউড়িয়ে ধীরে ধীরে চোখ বুলালো প্রিয়ন্তীর উপর।ছেলেটার ওই বাজে দৃষ্টিতে গা ঘিনঘিন করে উঠল প্রিয়ন্তীর।ছেলেটা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল,
“সুন্দর জিনিস দেখলে একটু কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছা করতেই পারে, তাই না?এতে অসভ্যতার কি আছে মিস?”
“একদম বাজে কথা বলবেন না।সরে দাঁড়ান এখান থেকে!”
ছেলেটা এবার আরও সামনে ঝুঁকে এলো সামান্য।
“আরে, এত রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি তো শুধু একটু ভাব আদান প্রধান করতে এসেছি। আমরা কি পরিচিত হতে পারি? বাই দ্যা ওয়ে আমি রাফি, তুমি?”
বলেই এক হাত বাড়িয়ে দিলো যুবক। প্রিয়ন্তী তীক্ষ্ণ ভাষায় জবাব দিলো,
“সরে দাঁড়াতে বলেছি!”
“সরে দাঁড়ানোর জন্য তো আর এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম না।”
“আশ্চর্য!”
বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিতেই ছেলেটা হঠাৎ দেয়াল থেকে সোজা হয়ে পথরোধ করে দাঁড়াল ওর।
“এত তাড়াহুড়া কিসের? একটু কথা বললেই এমন ভাব নিচ্ছ যেন গিলে খাব!”
“দেখুন, পথ ছাড়ুন।”
ছেলেটা হেলে দাঁড়িয়ে মাথা কাত করল। দৃষ্টি নির্লজ্জভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রিয়ন্তীর উপর।বলল,
“তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আজকের অনুষ্ঠানের মেইন অ্যাট্রাকশন তুমি’ই!”
“ ভদ্রভাবে কথা বলুন।”
“ভদ্রভাবেই তো বলছি। সুন্দর লাগলে সুন্দরই তো বলব, নাকি অন্য কিছু এক্সপেক্ট করেছিলে, হু ?”
“অসভ্য, ইতর সরে দাড়ান বলছি নাহলে..
“আরে! রাগ করছ কেন? আমি তো শুধু ফ্রেন্ডলি হতে চাইলাম।”
“ফ্রেন্ডলি?মেয়েদের ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে এসব করাকে ফ্রেন্ডলি লাগে?”
তিক্ত হেসে কথাগুলো বলে থামে প্রিয়ন্তী। যা শুনতেই ছেলেটার মুখ শক্ত হলো।
“উফ! এত জাজমেন্টাল কেন তুমি ? বিয়েবাড়িতে মানুষ একটু এনজয়-করতেই পারে।”
“সবাই আপনার মতো নিচু মানসিকতার না। সরে দাঁড়ান বলছি!”
“নিচু মানসিকতা? নিচু কোনো কাজ করেছি তোমার সঙ্গে? শরীরে ব্যাড টাচ করেছি?”
“শুনুন, আমি আপনার সঙ্গে একটাও কথা বলতে ইন্টারেস্টেড না। আরেকবার বাজে মন্তব্য করলে সরাসরি সবাইকে ডাকব বলে দিচ্ছি!”
“তো ডাকো না। দেখি কে আসে।”
প্রিয়ন্তীর ধৈর্যর বাধ ভাঙলো এবার পুরোপুরি। বলল খিটমিটিয়ে,
“অসভ্য কোথাকার!আপনাদের মতো ছেলেদের কারণেই মেয়েরা কোথাও স্বস্তিতে থাকতে পারে না। শিক্ষিত পরিবারের ছেলে হলে অন্তত মেয়েদের রেসপেক্ট করতে শিখতেন।”
কথাগুলো শুনে ছেলেটার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল খানিকটা।চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। প্রিয়ন্তী আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সেখানে। বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে সামনে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়াল।পিছন থেকে মেয়েটার গাউনের লম্বা অংশটা পায়ের নিচে আটকে ধরলো ছেলেটা। আচমকা ভারসাম্য হারিয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে নিলে একজোড়া শক্ত বাহু এসে জড়িয়ে ধরল ওকে। পড়তে পড়তে নিজেকে সামলালো প্রিয়ন্তী লোকটার হাতের উপর শরীরের ভর ছেড়ে। পুরো ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রিয়ন্তী নিজেই বুঝে উঠতে পারল না ঠিক কী হয়েছে।
চোখ তুলে সামনে তাকাতেই চোখে পড়লো অভিরাজ কে। লোকটার চোখদুটো ভয়ংকর ঠান্ডা হয়ে আটকে আছে সেই ছেলেটার উপর। ওর বুক ধড়ফড় করছে দ্রুত।অভিরাজ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি ঠিক আছেন?”
নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে উত্তর করে ও,
“জি!”
ছেলেটা তখনো দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছে নিজের কার্য হাসিল না হওয়ায় রেগে আছে ব্যাপক।তার থেকেও বেশি বিরক্ত অভিরাজ কে এখানে দেখে।চাপা অসন্তোষ নিয়ে চেয়ে আছে।অভিরাজ নিঃসব্দে ঠান্ডা, স্থির চোখে আগাগোড়া পরখ করল ছেলেটাকে। এরপর সোজা ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,
“দেখে তো যথেষ্ট সুপুরুষই মনে হচ্ছে।তা একজ্যাক্ট সমস্যাটা কোথায়?থার্ড জেন্ডার? নাকি গে?কোনটা? “
“হোয়াট দ্য হেল!”
“তা না হলে মেয়েদের ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে কী করছিলে?এখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে লেডিস ওয়াশরুম!পিউর জেন্স হলে নিশ্চই এখানে আসতে না?”
প্রিয়ন্তী হতভম্ব হয়ে তাকাল অভিরাজের দিকে।
এত শান্তভাবেও কেউ এভাবে অপমান করতে পারে এটা সম্ভবত প্রথম দেখছে ও। লোকটার শেষক্ত বাক্যয় ফিক করে হেসে উঠল ও। ছেলেটা তেতে উঠল তাতে।
“মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ।”
“ওহ? ভাষা খারাপ লাগছে?”
“এক্সকিউজ মি?আপনি আমাকে কী বলতে চাইছেন?”
অভিরাজ শান্তভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।ছেলেটা এবার আরও উত্তেজিত হয়ে বলল,
“আপনি জানেন আমি কে?”
“না।উম,জানার আগ্রহও নেই।”
“লিসেন, ইউ ক্যান্ট টক টু মি লাইক দ্যাট!”
“তাহলে কীভাবে কথা বলব?মেয়েদের ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের বিরক্ত করা মানুষদের সঙ্গে আলাদা কোনো এটিকেট ফলো করতে হয় নাকি?”
ছেলেটা এবার দাঁত চেপে বলল,
“মাইন্ড ইয়োর ওন বিজনেস!”
“আমি তো সেটাই করছিলাম।কিন্তু তুমি এসে সেটা মেয়েদের ওয়াশরুম পর্যন্ত টেনে আনলে।”
ছেলেটা এবার আরও উত্তেজিত হয়ে এক ধাপ এগিয়ে এসে আঙুল তুলল অভিরাজের দিকে।
“ডোন্ট ইউ ডেয়ার মক মি!”
অভিরাজের চোখ নামল সেই আঙুলের দিকে।তারপর আবার চোখ তুলল। তাকালো ছেলেটার ফুসতে থাকা আদলে।
“নাইস হ্যান্ড!”
একদম নিচু সরেই কথাটা বলল অভিরাজ।এরপর ছেলেটার বাড়িয়ে রাখা আঙ্গুলটা নিজের দুই আঙুলের ভাঁজে শক্ত করে চেপে ধরে কানের কাছে মুখ দিয়ে ফিসফিস করে আওড়াল,
“আর কয়েকটা মিনিটই’তো আছে অবশিষ্ট। এভাবে ফাও জামেলায় না জড়িয়ে ভালো করে দুনিয়াটা দেখে নাও।কে জানে, কয়েক ঘণ্টা পর এই আলো-বাতাস আবার দেখতে পারবে কিনা।”
ছেলেটার চোখ বড় বড় হয়ে এলো। ফুসতে ফুসতে তেড়ে বেড়ে কিছু বলতে যাবে অভিরাজ ইশারায় পিছনে দেখালো। ছেলেটা অবচেতনে তাকালো সেখানে। ওদের থেকে কিছুটা দূরে কালো পোশাক পরা দুই-তিনজন শক্তপোক্ত লোক দাঁড়িয়ে আছে। লম্বাদেহি পুরুষগুলো দেখেই বুঝতে পারলো এরা তার’ই লোক।পোশাক আশাকে বুঝা যাচ্ছে এরা পেশায় বডিগার্ডস। সবার কানেই ব্লুটুথ ডিভাইস।
শুকনো গলায় ঢোক গিলল ছেলেটা।অভিরাজ ছেলেটার খুলে থাকা শার্ট এর বোতাম দুটো লাগিয়ে
কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে স্বাভাবিক সরে আওড়াল ফির,
“এখন ভদ্র ছেলের মতো অনুষ্ঠান এনজয় করো, কেমন?”
বলে সরে দাঁড়ালো একপাশে।
***
লম্বা শাওয়ার শেষে একদম পরিপাটি হয়ে ওয়াশরুম ছেড়ে বেরিয়েছে তাজধীর। পরনে চারকোল ব্ল্যাক শার্ট। হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। নিচে ডার্ক গ্রে ট্রাউজার। কব্জিতে শোভা পাচ্ছে দামি ঘড়ি। সদ্য গোসল করে এসেছে বলেই ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের উপর পড়ে আছে খানিকটা। নিজের মতো রুমের পরিবেশটাও ঠিক ব্যক্তিটির মতোই পরিপাটি। টেবিলের উপর ফাইল, ল্যাপটপ, পাশে গ্রীন টি-এর কাপ রাখা। লাউডে দিয়ে রাখা ফোনের স্পিকার। ফোনের ওপাশে থাকা ব্যক্তিটি একটানা কিছু বুঝিয়ে চলেছে অনেকক্ষণ যাবৎ।তাজধীর কিছুক্ষণ চুপচাপ শুনল। অবশেষে বলল,
“ ওই ডিলটা আজকেই ক্লোজ হবে।”
ওপাশ থেকে আবার কিছু বলতেই চোয়াল শক্ত হলো তাজধীরের। বলল,
“আই ডোন্ট কেয়ার হাউ। আমি আধাঘন্টার মধ্যে পৌঁছাচ্ছি, ব্যাস!”
বলেই কল কাট ল।কপালের মাঝখানে আঙুল চেপে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল একইভাবে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টা যে গুরুত্বপূর্ণ। নিচ থেকে ছেলেকে ডেকে যাচ্ছেন মোহনা,
“আযান! বাবা লাঞ্চ করবি না? নেমে আয়, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো!”
তাজধীর মানিব্যাগ পকেটে ঢুকিয়ে নামতে নামতে বলল,
“আম্মু, একটা জরুরি কাজে বের হতে হবে এখনই। ফিরে খেয়ে নিব।”
“আবার?সকালও ঠিকমতো কিছু খাসনি।”
নিচ থেকে অসন্তুষ্ট গলায় বললেন মোহনা। থামলেন হঠাৎ ফোন বেজে উঠার শব্দে। ফোন উঠিয়ে দেখলেন মিতালীর কল। ব্যস্ত হাতে ফোন রিসিভ করে কানে চাপলেন তিনি। ওপাশ থেকে শুনতে পেলেন মেয়ের চিন্তিত কণ্ঠখানা,
“আম্মু!”
“হ্যাঁ মা, বল।”
“আম্মু আমি একটা জিনিস ভুলে বাসায় রেখে এসে পড়েছি।”
“ওমা কি রেখে গেছিস?”
“বিয়ের গিফটটা! তাড়াহুড়ায় আমার ড্রেসিং টেবিলের উপরেই ফেলে রেখে চলে এসেছি হয়তো। তুমি গিয়ে একটু দেখোনা। ড্রাইভার কে দিয়ে পাঠিয়ে দাও জলদি।”
মোহনা বেগম কপাল চাপড়ালেন। বললেন,
“ এইটা কিভাবে ভুলে মানুষ? তোর এই বাজে অভ্যাস আর যাবেনা না?”
“কথা বাড়িতে এলে শুনিয়ো। এখনো জলদি এটা পাঠাও। নাহলে মান সম্মান আর কিছু থাকবেনা। তোমাদের জামাই এমনিতেই রেগে আছে খুব!”
“আচ্ছা আমি দেখছি। পাঠাচ্ছি কাউকে দিয়ে!”
ফোন রেখে সঙ্গে সঙ্গে কাজের মেয়েকে ডাক দিলেন মোহনা,
“রিনা!”
মেয়েটা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলো।
“জ্বি খালাম্মা?”
“জাফর কই?”
“জাফর ভাই তো একটু আগে বাজারে গেছে।”
“কখন গেছে?”
“এইতো একটু আগেই গেল। বাজারের লিস্ট করলাম না সকালে? ওগুলাই তো আনতে গেলো!”
“যাহ! এখন কি হবে?”
“কিছু হইসে খালাম্মা?”
তাজধীর নেমে এলো তখনি। চাবি হাতে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বের হয়ে যেতে নিচ্ছিল।শুনতে পেলো মায়ের ডাক,
“আযান একটা কাজ করতে পারবি বাবা? “
তাজধীর থামল।ঘুরে দাঁড়িয়ে তাড়া দিয়ে বলল,
“বলো?”
মোহনা বেগম একটু ইতস্তত করে বললেন,
“একটা কাজ করে দিবি?”
“আহ আম্মু, দ্রুত বলো। আমার ইম্পরট্যান্ট একটা কাজ আছে!”
“মিতালীরা বিয়েবাড়ির গিফটটা ফেলে গেছে বাড়িতে। জানিসতো মেয়েটা কেমন মন ভোলা। ফোন দিয়ে বলল ড্রাইভার কে দিয়ে পাঠিয়ে দিতে। জাফর ছেলেটা গেছে আবার বাজারে। তুই যদি একটু যাওয়ার সময় ওটা দিয়ে যেতিস বাবা? পারবি? “
আশা নিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় চেয়ে রইলেন মোহনা। ছেলে না তার আবার মুখের উপর না বলে দেয়। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে তাজধীর বলল,
“গিফটটা কোথায়?”
মোহনা বেগমের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।তিনি তাড়াহুড়ায় বললেন,
“এইতো আনছি!”
মায়ের কাছ থেকে ড়াপিং করা ছোট বক্সটা নিয়ে সোজা গাড়িতে গিয়ে বসল তাজধীর। পকেটে থাকা ফোনটা আবারও বেজে উঠলে রিসিভ করে লাউড দিয়ে একপাশে রেখে গাড়ির স্টেয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে জবাব দেয়,
“আই সেইড আ’ম অন মাই ওয়ে!”
পরমুহূর্তেই কালো মারসিটিজটা একটানে ছুটল বাড়ির গেট পেরিয়ে বহুদূর!
***
একদম হুট করেই বদলে গেল বাইরের আবহাওয়া।
মুহূর্ত আগেও স্বচ্ছ পরিষ্কার ছিল আকাশটা। আচমকাই গমগম শব্দ তুলে কেঁপে উঠল চারপাশ। পরপরই ঝমঝমিয়ে নেমে এলো শ্রাবনধারা।কমিউনিটি সেন্টারের বিশাল কাঁচঘেরা দেয়াল বেয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ছে পানি। দূরের গাড়িগুলোর ছাদে আছড়ে পড়া পানির শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ভেতর পর্যন্ত।
ভেতরে তখনো কোলাহল চলছে আগের মতোই। খাওয়া, গল্প করা আর সবশেষে ছবি তুলতে ব্যস্ত সকলে। সেইসব কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, কাঁচের দেয়ালটা ঘেঁষে একা দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়ন্তী।
দু হাত সামনে ভাঁজ করে মুগ্ধ চোখে বৃষ্টি দেখছে।
বৃষ্টির প্রতি তার দুর্বলতা বরাবরই আলাদা। বৃষ্টি নামলেই কেমন যেন সবকিছু ভুলে যেতে ইচ্ছে করে ওর। বুকের ভিতরটা হালকা হয়ে যায়। ওদিকে পাভেল ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বন্ধুদের নিয়ে। একেকজনকে ধরে ধরে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে মিতালীর সঙ্গে। মিতালীও ভদ্রভাবে সবার স্ত্রীদের সঙ্গে গল্পে যোগ দিয়েছে। চারপাশে সবাই বিবাহিত, সংসারী মানুষ। তাদের কথাবার্তার বিষয়ও ঘুরেফিরে সংসার, বাচ্চা, স্বামী এসব নিয়েই। সেখানে দাঁড়িয়ে ভীষণ অস্বস্তি লাগছিল প্রিয়ন্তীর।তাই চুপচাপ সরে এসে দাঁড়িয়েছে এখানে। অমনি শুনতে পেল ভারী, গমগমে এক পুরুষালি কণ্ঠ,
“বৃষ্টি পছন্দ খুব?”
চমকে পেছন ফিরে তাকাল প্রিয়ন্তী।দেখল, কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছে অভিরাজ। কালচে আলোয় লোকটাকে আরও বেশি গম্ভীর লাগছে।লম্বা দেহ,চওড়া কাঁধ প্রথম দেখায় যে কেউ বলবে,ভীষণ রাগী, অহংকারী টাইপের মানুষ হয়তো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মানুষটার ব্যবহার ঠিক উল্টো।
কথাবার্তায় অদ্ভুত এক স্থির ভদ্রতা ভাব আছে। কোনো কৃত্রিমতা নেই, আবার বাড়াবাড়ি ধরনের মিশুক ভাবও না। প্রিয়ন্তী ছোট্ট করে উত্তর দিল,
“হুম।”
সুটের পকেটে দু হাত গুঁজে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো অভিরাজ। একদম কাঁচের দেয়াল ঘেঁষে এসে স্থির হলো। বাইরে ঝরে পড়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়েই বলল,
“আমারও।”
“আপনারও বৃষ্টি পছন্দ?”
অবাক হয়ে মুখের উপর সরাসরি প্রশ্নটা করেই বসল।
এত গম্ভীর একজন মানুষ বৃষ্টি পছন্দ করে বিষয়টা কল্পনায় মেলাতে পারছে না ঠিকঠাক।অভিরাজ চোখ সরাল না বৃষ্টির দিক থেকে।শান্ত গলায় বলল বরং,
“হুম। তবে মেঘটা বেশি পছন্দ।”
“বৃষ্টির চেয়েও?”
“অনেকটা।”
“তবে আমার বৃষ্টিটাই বেশি পছন্দ।”
“মেঘটাই কিন্তু পরবর্তীতে বৃষ্টি হয়ে নামে।”
বাইরে তখনো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে।কাঁচের দেয়ালে টুপটাপ শব্দ তুলে আছড়ে পড়ছে পানির ফোঁটাগুলো।
প্রিয়ন্তী প্রথমে ভেবেছিল লোকটা হয়তো দু-একটা কথা বলেই চলে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অভিরাজ দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই।আর আরও আশ্চর্যের বিষয়—প্রিয়ন্তীরও বিরক্ত লাগছে না।
বরং কেমন যেন স্বাভাবিক লাগছে কথা বলতে।
“আপনি ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টি পছন্দ করেন?”
হঠাৎই প্রশ্নটা করল অভিরাজ।প্রিয়ন্তী বৃষ্টির দিকেই তাকিয়ে হেসে ফেলল ছোট্ট করে।বলল,
“অনেক ছোটবেলা থেকে। আমাদের বাসার ছাদে বৃষ্টি নামলেই আমি আম্মুকে লুকিয়ে উঠে যেতাম। পরে জ্বর আসলে আবার আম্মুর বকা খেতাম।”
“তাহলে এখন ভিজেন না ?”
“এখন ভাইয়া ভিজতে দেয় না।”
“কেন?”
“জানিনা। হয়তো ভাবে আমি এখনও বাচ্চা।”
“আপনাকে দেখলেও কিন্ত সেটাই মনে হয়।”
প্রিয়ন্তী সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকাল।বলল,
“মানে?!”
“খারাপ অর্থে বলিনি। আপনার মধ্যে একটা ইনোসেন্স ভাব আছে। সোজাসুজি বলতে গেলে বাচ্চা বাচ্চাই লাগে!”
এভাবে এক দুই কথায় কখন যে লোকটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে একদম সহজ হয়ে গেছে, নিজেই বুঝতে পারল না প্রিয়ন্তী। কথার মাঝেই আচমকা বলে উঠল অভিরাজ,
“চা খাবেন?”
“বৃষ্টির সঙ্গে এক কাপ চা হলে মন্দ হয়না! বাট এখানে চা কোথায় পাবেন?”
“আপনি খাবেন কিনা সেটা বলুন আগে।”
“পেলে সেই সুযোগ হাতছাড়া করবো কেন?বাই দ্যা ওয়ে আপনি চা ও খান নাকি?”
“উহুম। কফি টা প্রেফার করি। তবে কেন যেন হঠাৎ খেতে মন চাইলো।”
তারপর কাঁচের বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ বলল,
“তবে একটা সমস্যা আছে।”
“কি সমস্যা?”
“এভাবে কাঁচের ভেতর থেকে বৃষ্টি দেখে পুরো ফিল আসে না।”
“ও?”
“হুম। নিচে গেলে আরো ভালো লাগতো। সামনে না ছাদঘেরা ছোট ছোট বসার জায়গা আছে? ওইখানে বসে বৃষ্টি দেখলে বেশি মজা পাবেন!চলুন।”
“কোথায়?”
“বৃষ্টি উপভোগ করতে।”
প্রিয়ন্তী চোখ পিটপিট করে বলল,
“সিরিয়াসলি?”
“আমি খুব একটা মজা করি না।”
কথাটা এমন গম্ভীরভাবে বলল যে প্রিয়ন্তী না চেয়েও হেসে ফেলল। তারপর দুজন একসঙ্গে হেঁটে বেরিয়ে এলো কমিউনিটি সেন্টারের সামনের দিকে।বাইরে বের হতেই ঠান্ডা ভেজা বাতাস এসে লাগল মুখে।
কমিউনিটি সেন্টারের সামনের অংশটায় ছাদঘেরা ছোট ছোট বসার জায়গা করা। গোল টেবিল, পাশে ধাতব চেয়ার। ঠিক সামনেই খোলা জায়গা পেরিয়ে মেইন রাস্তা। একপাশে গাড়ির গ্যারেজ, অন্যপাশে বৃষ্টিভেজা শহর। ছাদের কিনারা ঘেঁষে টুপটাপ করে পানি পড়ছে নিচে।দূরের রাস্তার লাইটগুলো বৃষ্টির মধ্যে ঝাপসা হয়ে গেছে।প্রিয়ন্তী গিয়ে একদম সামনের চেয়ারে বসে পড়ল। চোখদুটো চকচক করছে উত্তেজনায়।
“টু বি অনেস্ট! এখন সত্যিই ভালো লাগছে।”
ছাদঘেরা বসার জায়গাটার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল অভিরাজের গার্ডরা। কালো ইউনিফর্মে সবাই একইরকম গম্ভীর সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। তবে এই মুহূর্তে তাদের চোখেমুখে সতর্কতার চেয়ে বিস্ময়টাই বেশি।দূরে বসে থাকা বস আর প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় একজন বলে উঠল,
“বুঝলাম না বসের আবার কি হইলো! বাংলাদেশে আইসা বস এমন আজব আজব কর্মকাণ্ড করতেছে কেন ভাই ?”
পাশেরজন সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে গুতো মেরে ফিসফিস করে উঠল,
“আস্তে বল! দেয়ালেরও কান আছে। বস শুনলে আজকে আর রক্ষা নাই।”
“বস কি আর সেই ধ্যানে আছে? বসের তো মাথাই নষ্ট হইয়া গেছে মনে হয়। যারে জীবনে চা তো দূরের কথা, কফির আশেপাশে পর্যন্ত ঘেঁষতে দেখলাম না, সেই মানুষ এখন সরাসরি চা অর্ডার করতেছে! ভাবা যায়?”
“ঘটনা কিন্তু আমিও নোটিশ করছি। গতকাল রাতে দেখছস না? নিজের গায়ে নিজেই জুস ফালাইলো লোকটা! তারপর আবার নিজেই ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল ক্লিন হইতে! আমি তো ভাবছিলাম চোখে ভুল দেখতেছি।”
“এইজন্যই তো কইতেছি, ব্যাপারটা ডেঞ্জারাস।”
দুজন যখন ফিসফিস করে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে আরেকজন এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। বয়সে একটু বড়,চেহারা দেখেই বোঝা যায় পুরোনো লোক।এসেই বিরক্ত গলায় বলল,
“আরে ভাই তোরা তো নতুন, তাই এত অবাক হচ্ছিস।
এসব দেখতে দেখতে আমি অভ্যস্ত। এইসব তো সবে শুরু। আগে আগে দেখ, বস আরও কত কি করে।”
“মানে?”
“মানে এসব পান্তা ভাত। আস্তে আস্তে দেখবি শুধু আরও কত কি হয়। এখন বেশি কথা না বলে যা, বস যা অর্ডার করছে দ্রুত নিয়ে আয়। না হলে পরে যদি মাথা গরম হয়, তখন তো জানোস’ই কি হবে!”
সময়ের সাথে সাথে বাইরে ঝড়ো বৃষ্টিটা বরং আরও বেড়েছে। গেটের সামনের পুরো জায়গাজুড়ে পানি জমে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে। অমনি কালো রঙের একটা গাড়ি এসে থামল পার্কিংয়ের একপাশটায়।
ড্রাইভিং সিটে বসা তাজধীর। হাতে মাঝারি আকারের একটা গিফট বক্স। গাড়ি থামিয়েই সরাসরি কল লাগালো মিতালী কে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই সংক্ষিপ্ত গলায় বলল সে,
“আমি এসে গেছি।এসে নিয়ে য..!”
কথা বলার মাঝেই আকস্মিক চোখ আটকালো অদূরে।থামল তার কণ্ঠনালী। একদম কয়েক গজ দূরে, ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়ন্তী।বৃষ্টির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে মেয়েটা। আঙুলের ফাঁক গলে টুপটাপ করে গড়িয়ে পড়ছে পানির ফোঁটা। ঝড়ো বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে বারবার। অ্যাসেন্ট-সি কালারের গাউনটার নিচের অংশটাও দুলছে বাতাসে।মেয়েটা পুরোপুরি বিভোর হয়ে মজে আছে সেই বৃষ্টিতে। মুহূর্তের জন্য তাজধীরের বুকের ভেতরটা কেমন থমকে গেল। চোখ সরাতে পারল না আর। কানে ধরা ফোনটার ওপাশে মিতালী কি বলছে, সেটাও শুনতে পেল না ঠিকঠাক। অদ্ভুত মুগ্ধতায় আটকে গেল তার দৃষ্টি। কিন্তু সেই মুগ্ধতা স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড।পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল চোখদুটো। কারণ প্রিয়ন্তীর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে অভিরাজ। লোকটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রিয়ন্তীর দিকে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন আশেপাশে আর কিছুই অস্তিত্ব নেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীতেই ভিবর সেই পুরুষালি দৃষ্টি।
আর প্রিয়ন্তী?মেয়েটা এতটাই বৃষ্টিতে মগ্ন যে কিছুই খেয়াল করছে না? তার হাত থেকে গড়িয়ে পড়া পানির ফোঁটাগুলো নিচে পড়ার আগেই অভিরাজ নিজের হাত মেলে ধরে নিচ্ছে নিচ থেকে ।টুপ টাপ ফোঁটাগুলো গিয়ে পড়ছে পুরুষালি সেই হাতের তালুতে। চোখদুটো স্থির প্রিয়ন্তীর মুখেই। মুগ্ধ,বিমোহিত, চমৎকৃত সেই চাহুনি। দূর থেকেও তাজধীরের বুঝতে একটুও সময় লাগল না সেই চাহনির মানে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। হাতের ফোনটা এত জোরে চেপে ধরল যে আঙুলের রগ পর্যন্ত স্পষ্ট ফুটে উঠল। অথচ খেয়ালই নেই, কলটা যে অনেক আগেই কে টে গেছে।
বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন জ্বলে উঠল তার।
তীব্র,অস্বস্তিকর অকারণ সেই জ্বলনে নিজেই নিজের উপর বিরক্ত সে। কারণটা সে নিজেও জানে না।
বা হয়তো জানে। স্বীকার করতে চায় না শুধু। ওদিকে অভিরাজ ধীরে ধীরে হাতের তালুর পানির ফোঁটাগুলোর দিকে তাকাল। তারপর আবার চোখ তুলল প্রিয়ন্তীর দিকে।নিচু, ভারী গলায় বিড়বিড় করে উঠল,
“মাই ব্লুবেরি!তোমাকে স্পর্শ করা পানির ফোঁটাগুলোকেও আমার হিংসে হয়,মন চায় সবকিছুর বাধা পেরিয়ে,নিজের ধৈর্য্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তোমায় নিজের করে নিতে। তুমি আমার, আমার ব্লুবেরি!”
তাজধীরের গাড়ির জানালায় ঠকঠক শব্দ পড়ল তখনি।তাজধীরের কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না। চোখ সরাল না পর্যন্ত।আবারও একঘেয়ে ঠক ঠক শব্দে
চোখ তুলে বাইরে তাকাতেই দেখতে পেল পাভেল কে।জানালার কাচ নামাতেই পাভেল বলল,
“ভাই! এতক্ষণ ধরে ডাকছি!”
তাজধীর কোনো উত্তর দিল না প্রথমে। শুধু নিচু হয়ে পাশের সিট থেকে গিফট বক্সটা তুলে নিয়ে বাড়িয়ে দিলো।পাভেল গিফটটা হাতে নিয়ে সৌজন্যেতায় ভিতরে যেতে বললে নাকোজ করে দেয় তাজধীর।পাভেল আর জোড় করল না। বক্সটা নিয়ে সোজা চলে গেলো ভিতরে।পাভেল চলে যেতেই আবার দৃষ্টি আটকে গেল সেই একই জায়গায়। সর্বদা শান্ত থাকা মানুষটাও আজ হঠাৎ কেমন অশান্ত হয়ে উঠছে। আর সেভাবে তাকিয়ে থাকা সম্ভব হলোনা কেন যেন। চোয়াল শক্ত করে স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরল শক্ত করে।এতটাই শক্ত করে ধরল যে আঙুলের গিঁট সাদা হয়ে উঠল।পরক্ষণেই একটানে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল দিতেই
গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল তীব্রভাবে।তারপর ঝড়ের বেগে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে গেল পার্কিং থেকে।
চলবে…
ডেসটেনির সম্পূর্ণ রোমান্টিক থিমে লেখা আমার দুটো ইবুকও আছে কিন্ত। যেখানে আপনারা সম্পূর্ণ আমিষ কমান্ডার কে দেখতে পাবেন। চাইলে ইবুক দুটো সংগ্রহ করতে পারেন বইটই এপস থেকে
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনি মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেসটেনি পর্ব ১১
-
ডেসটিনি পর্ব ৫
-
ডেসটেনি পর্ব ১৪
-
ডেসটেনি পর্ব ২৬
-
ডেসটেনি পর্ব ১৬
-
ডেসটেনি পর্ব ১৭
-
ডেসটেনি পর্ব ১২ (প্রথম অংশ)
-
ডেসটেনি পর্ব ২১ প্রথম অংশ
-
ডেসটেনি পর্ব ২৩
-
ডেসটেনি গল্পের লিংক