#ডেসটেনি [ ২৩ ]
#সুহাসিনি_মিমি
গরম চায়ের ঝাঁঝে চোখ-মুখ কুঁচকে উঠল তাজধীরের। একহাতে দ্রুত কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরল ঠোঁট। সামনে থেকে দাঁড়িয়ে মোহনা ছেলেকে বলেই যাচ্ছেন,
“বেশি গরম খেতে গিয়েছিস কেন বাবা? গরম জিনিস আস্তে ধীরে রয়ে সয়ে খেতে হয়!”
তাজধীর বলল না কিছুই। কেশে গলা পরিষ্কার করতে করতে কেবল হাত তুলে ইশারা বুঝালো ঠিক আছে সে। মা’কে পাশ কাটিয়ে আবারও তার অবাধ্য চোখ জোড়া গিয়ে আটকালো নীল শাড়িতে আবৃত রমণীর পানে।
ধীর পায়ে শাড়ির কুচি ধরে ধরে নামছে প্রিয়ন্তী। নীল শাড়ি তার সঙ্গে অফ-হোয়াইট আর ব্লু ফুলের গয়না গুলো নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে ওর সরল সৌন্দর্যটুকু। কানের পাশে নরম করে বাঁধা খোঁপা থেকে কয়েকগুচ্ছ চুল এলোমেলো হয়ে গাল ছুঁয়ে আছে। কপালে ছোট্ট একটা টিপ। মেয়েলি অধর জুড়ে আধিপত্য বিস্তার করছে হালকা গোলাপি রঙা কিছু একটা। সেদিকে দৃষ্টি পরতেই তৎক্ষণাৎ ঝটকা মেরে নিজ দৃষ্টি সামলালো তাজধীর। বুকের ভেতরটা অকারণে কেঁপে উঠল কেমন।
“এতক্ষন লাগে তোর?”
পাভেলের কথায় ধাতস্থ হলো সে। চোখ সরিয়ে নিল তড়িঘড়ি করে। ঠোঁট শক্ত করে বসে রইল আগের মতোই গম্ভীর হয়ে। হালচাল বড্ড স্বাভাবিক রেখে পুনরায় গ্রীন টি’তে চুমুক বসিয়ে যাচ্ছে। ওদিকে প্রিয়ন্তী নিচে নেমে এসে দাঁড়াতেই পাভেল উঠে দাঁড়িয়ে বলল পুনরায়,
“একবারে রেডি তো?”
ভাইয়ের প্রশ্নে উপর নিচ মাথা ঝাকালো প্রিয়ন্তী। অন্যদিকে তাজধীরের চোখ অনুসরণ করতেই মিতালীর চোখে পড়ল প্রিয়ন্তীকে। মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে চাপা, দুষ্টু এক হাসি ফুটে উঠল। সবটা যেন এক সেকেন্ডেই বুঝে ফেলল মেয়েটা। একটু ভেবে নিয়ে হঠাৎ করেই বলে উঠল,
“ভাইয়া তুমি-ও আমাদের সঙ্গে চলো না?”
তাজধীর ভ্রু কুঁচকালো অল্প। মিতালী এবার আরও নরম স্বরে বলল,
“মানে, তুমি তো বাসায় একাই থাকছো। একা একা থেকে কী করবে বলো? তার চেয়ে আমাদের সঙ্গে গেলে ভালো লাগবে। শিহাব ভাইয়ার ওখানে আজকে অনেক ফান হবে, সবাই থাকবে। তুমি গেলে আমাদেরও খুব ভালো লাগবে!”
তাজধীর ঠান্ডা চোখে তাকাল বোনের দিকে। গলার স্বর স্বাভাবিক করে অনাগ্রহ নিয়ে জানাল,
“আমি এসব গেদারিং পছন্দ করি না জানিস না ? ভিড়ভাট্টা, অযথা হইচই দেট’স ডাজেন্ট সুট মি এট অল!”
মিতালী কিছু বলতে যাবে, তার আগেই পাভেল কথাটা বলে উঠে মাঝপথে,
“আযান ভাই, মিতু কিন্তু ভুল কিছু বলেনি। চলেন না আমাদের সঙ্গে! আসলে শিহাব তো আলাদাভাবে আপনাকেও ইনভাইট করেছিল। কয়েকবার বলছিল আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলে। আম্মু কেও বললাম। আম্মু তো যেতেই চাইলেন না। দাদি তো বয়স্ক মানুষ। আপনি গেলে ওরা সত্যিই খুশি হবে। তাছাড়া, আপনায় আমি আরও আগেই বলতাম কিন্ত সাহস কুলিয়ে উঠতে পারিনি। আপনি ব্যস্ত মানুষ কিনা। তবে আপাতত তো বাড়িতেই আছেন, আমাদের সঙ্গে এঁটেন্ড করলে আমারও খুব ভালো লাগবে। প্লিজ না করবেন না।”
মিতালীও সুযোগ পেয়ে আবার বলল,
“প্লিজ ভাইয়া! একদিন গেলে কী এমন ক্ষতি হবে? সবসময় তো এভাবে বলিনা। আসো না, প্লিজ!”
একপাশে দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করছে প্রিয়ন্তী। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে দোয়া পড়তে পড়তে মুখ শুকিয়ে গেছে মেয়েটার। বিরতিহীন পড়েই যাচ্ছে। আল্লাহ! লোকটা যেন ঠাস করে না করে দেয় মুখের উপর। তবে না। এই লোক শুধু ওর বেলায় মুখের উপর রিফিউস করার ক্ষমতা রাখলেও বাকি সবার বেলায় ঠাসা। তাইতো ওর ভাই ভাবি বলা সবেই কি সুন্দর করে জানিয়ে দিলো,
“ওকেয়,ফাইন।এত করে যেহেতু বলছো। যাওয়াই যায়।”
“তুমি সত্যিই যাবে ভাইয়া?”
উত্তেজনায় হড়বড় করে বলে উঠল মিতালী।তবে মিতালী কে যতটাই খুশি দেখালো তার উল্টোটাই দেখালো প্রিয়ন্তী কে। মুখটা মলিন করে দাঁড়িয়ে রইলো ঠাই।মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
“গায়ে হলুদের আনন্দটুকুও শেষ। সব যাবে এখন জ্বলে! ব্যাটা খবিস!”
এরমধ্যে তাজধীর উঠে সোজা দরজার দিকে এগোতে নিলে পিছন থেকে কপাল কুঁচকে ডাকল মিতালী,
“এইই! ভাইয়া, তুমি কি এভাবে যাবে নাকি?”
তাজধীর থামল। ভ্রু কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল,
“তো?”
মিতালী দুই হাত কোমড়ে দিয়ে তাকাল ভাইয়ের দিকে। বলল,
“ভাইয়া প্লিজ! আমরা গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে যাচ্ছি, কোনো নেভির অফিসিয়াল মিটিং এটেন্ড করতে না!”
পাভেল পাশ থেকে হেসে উঠল শব্দ করে। কথাটার ইঙ্গিতটা বুঝতে কারোরই বাকি রইল না। তাজধীর মিতালীর দিকে তাকিয়ে তারপর নিজের পরনের পোশাকের দিকে চোখ বুলাল। অতঃপর বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রিয়ন্তীর আগাগোড়া একবার পরখ করে নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
“এখন আবার ড্রেসও চেঞ্জ করতে হবে।এই মেয়েটার জন্য আর কত কী করতে হবে কে জানে! শেষমেষ কিনা বিনা নিমন্ত্রণে হলুদেও যেতে হচ্ছে। ছেহ!শেইম অন ইউ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার,তাজধীর সিদ্দিক আযান!”
তাজধীর যেতেই ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল মিতালী। যাক! সে তার প্ল্যানে সাকসেস! এটাই তো চেয়েছিলো সে। তার ভাই আর প্রিয়ন্তীর কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা করা। এই দুজনের ফিলিংস এর ব্যাপারে সিউর হলে খুব শীগ্রই সে পাভেল কেও জানাবে। অপেক্ষা করবেনা তার ভাইয়ের মতবাদের।
:
:
:
নিজস্ব চকচকে কালো মারসিটিজের ড্রাইভিংয়ে স্টেয়ারিং চেপে বসে আছে তাজধীর। তখনি একে একে বেরিয়ে এলো মিতালী, পাভেল আর প্রিয়ন্তী। মিতালী গিয়ে পিছনের সিটে উঠে বসলে ভাবীর পিছন পিছন প্রিয়ন্তীও উঠতে গেলে বাইরে থেকে ডাকে তখন পাভেল,
“এই প্রিয়! তুই না পেছনে বসতে হেজিটেড ফিল করিস? সামনে এসে বস।”
প্রিয়ন্তী এক সেকেন্ড থামল। বলল অসস্তি চেপে,
“তুমি বসো ভাইয়া । আমি ভাবির সাথেই ঠিক আছি।”
বলতে বলতেই পেছনের সিটে মিতালীর পাশে বসল প্রিয়ন্তী।পাভেল কাঁধ উঁচিয়ে সামনের দরজা খুলে গিয়ে তাজধীরের পাশে বসল। গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই ভেতরে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এলো এরপর।সেকেন্ড খানেকের ব্যবধানেই ইঞ্জিন স্টার্ট করল তাজধীর।
মিতালী আর পাভেল টুকটাক এটা সেটা নিয়ে কথা বলছে।ভাই ভাবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হু হ্যা বলে যাচ্ছে প্রিয়ন্তী মাঝে মাঝে। এর মাঝেই হঠাৎ প্রিয়ন্তীর চোখ পড়ে রিয়ার ভিউ মীররে। ওমনেই চোখাচোখি হয় একজোড়া তৃষ্ণার্থ,অতল পুরুষালি নেত্রপল্লবের সহিত। ঝটকায় চোখ সরিয়ে নেয় প্রিয়ন্তী। পরোক্ষনে আবার কি মনে করে যেন তাকায়। লোকটা তখনো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চেয়েই আছে। কৃষ্ণ কালো রঙা চোখের মণি দুটো জ্বলজ্বল করছে যেন। তবে প্রিয়ন্তী এতক্ষনে লক্ষ্য করল লোকটারে পোশাকের ভিন্নতা। গায়ে হালকা বাসন্তী রঙা একখানা পাঞ্জাবী জড়িয়েছে ব্যাটায়। পাঞ্জাবির কলারটা পুরুষালি গলাটা ঝেকে বসে আছে। উজ্জ্বল ফর্সা বর্ণে মানিয়ে গেছে দারুন ভাবে। হাঁটা দুটোও ফোল্ড করে টেনেছে অনেকটা। নিজের মনকে নিজেই ধিক্কার জানালো প্রিয়ন্তী।
তড়িঘড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে চাইলো জানালায়। তবে অস্বস্তিটা কমলো না, বাড়ল। কিছু একটা ঠিক নেই।ওর ভিতরে এখনো আগের নায় অনুভূতিরে সৃষ্টি হচ্ছে।হতে দিবেনা। দেয়া যাবেই না। সেই ভেবে নিজেকে শক্ত করল। তাকাবেই না প্রয়োজনে।
:
:
:
একটা বড়সড় কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এসে গাড়িটা থামাল। চারপাশে আলো ঝলমল করছে, গেটের বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে জমজমাট আয়োজন। পাভেল সামনে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ ভাই, এখানেই রাখেন।”
গাড়ি থামতেই প্রথমে দরজা খুলে নামল মিতালী। তার পরেই প্রিয়ন্তী। দুজনেই শাড়ি সামলে নামতেই পাভেলও নেমে এসে বলল,
“চলো, ভেতরে যাই।”
“তোমরা যাও। আমি গাড়ি পার্কিং করে আসছি।”
“আচ্ছা ভাই।”
বলেই পাভেল মিতালী আর প্রিয়ন্তী কে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। গাড়িটা পার্কিংয়ে রেখে নেমে দাঁড়ালো তাজধীর। চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল স্বভাবসিদ্ধ অভ্যাসে। তারপর ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে গেটের দিকে এগোতে নিলে পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠে। থেমে পকেট থেকে ফোন বের করে
স্ক্রিনে চোখ পড়তেই কপাল কুঁচকে যায় সামান্য।
ইম্পরট্যান্ট কল। তৎক্ষণাৎ কল রিসিভ করে কানে চেপে ধরে বলল,
“ইয়েস!”
গম্ভীর স্বরে কথা বলতে বলতে ভেতরের দিকে পা বাড়াতেও নিয়েও অপর প্রান্তের ব্যক্তির কথায় থেমে দাঁড়ালো তাজধীর।উল্টো ঘুরে পা বাড়াল বাইরের দিকে। অমনি আকস্মিক অসাবধানতায় কারো সঙ্গে ধাক্কা লাগলে নিজে থেকেই ফোন কানে রেখেই হাত তুলে ইশারায় ‘সরি’ জানিয়ে একপাশ দিয়ে সরে গেল সে। মাথা ঘুরিয়ে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করল না। কয়েক কদম দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আবার মন দিল কথোপকথনে। কিন্তু যার সঙ্গে ধাক্কাটা লাগল,আচানক’ই থেমে গেল সেই আগন্তুক।
কিছু একটা ভেবে সন্দেহের বসে ঘাড় উল্টে তাকালো সেই আগন্তুক। চোখ সরু হলো সামান্য। লম্বা, বলিষ্ঠ গড়নের একজন মানুষ। গায়ে পরা গাঢ় রঙের কাবলি সেটটা নিখুঁতভাবেই ফিট করে গেছে পিটানো শরীরটায়। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করে গেল তাজধীরের গতিবিধি। অনুভূতিহীন শূন্য চোখটায় ফুটে উঠল একটা অদ্ভুত শীতলতা মিশ্রিত হাসি। আগন্তুকটা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল এরপর।অস্ফুট শব্দে কিছু একটা বাক্য ছুড়ে ঢুকে পড়ল সেন্টারে।
:
:
:
কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরের পরিবেশ আপাতত মানুষে জমজমাট। পাভেল, মিতালী আর প্রিয়ন্তী একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মিতালী পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলছে। পাভেল মাঝেমধ্যে কারও দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। মাঝে মাঝে এর ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সহধর্মিনী, বোনকে।পরিচিতদের একজনের সঙ্গে কথা বলার মাঝেই পাভেলের ফোনটা বেজে উঠলে সাইড এসে দাঁড়ায় পাভেল।স্ক্রিনে চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল যায় চেহারার স্বাভাবিক রঙ। ভ্রু সামান্য কুঁচকে, ফুটে উঠল একধরনের উত্তেজনা। সাথে অদ্ভুত একটা নার্ভাস ভাবও লক্ষ্য করা গেল বেশ। ব্যস্ত হাতে অস্তির হয়ে ফোনটা রিসিভ করল সে।প্রথমেই জানাল অত্যন্ত নরম গলায়,
“হ্যালো ভাইয়া! জি—জি! আপনি কোথায়?”
ওপাশের কথা শুনে সে প্রায় তাড়াহুড়ো করেই বলে উঠল আবার,
“ওহ আচ্ছা! আমি এইখানেই আছি। আপনি দাঁড়ান, আমি এখনই আসতেছি।”
ফোনটা কেটে ফেলার পরও কিছু সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল সে। নিজের উত্তেজনাটা সামলাচ্ছে।মিতালী এসে দাঁড়িয়েছে পাশে সে খবরটুকু ও নেই। মিতালী ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?”
“চলো, তোমাদের একজনের সঙ্গে ইন্ট্রোডিউস করাতে হবে।”
বলেই সামনে হাঁটা দিল। যেতে যেতে প্রিয়ন্তী কেও ডেকে নিলো সঙ্গে। হলঘরের একটু ভেতরের দিকে, ভিড় থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল কেউ একজন। গাঢ় রঙের কাবলি সেটে মোড়া লম্বা,বলিষ্ঠ গড়নের দেহখানা নিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে সেই আগন্তুককে দেখতেই লম্বা করে সালা ঠুকল পাভেল,
কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে ডেকে উঠল,
“ভাই!”
লোকটা ফোনে ব্যস্ত ছিল। পাভেলের কণ্ঠস্বরে উল্টো ঘুরে তাকালো।ঠোঁটের কোন ঘেঁষে রক্ত সূক্ষ, পরিহিত হাসি লক্ষ্য করা গেল ন্যানো সেকেন্ডের জন্যই। পাভেল মিতালীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও মিতালী, আমার ওয়াইফ। মিতু, উনিই হচ্ছেন অভিরাজ, আর জে কোম্পানির ওনার।”
মিতালী স্বাভাবিক ভদ্রতায় এগিয়ে এল। হেসে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।আপনার কথা কিন্তু অনেক শুনেছি। উনি তো আপনার কথা বলতে বলতে প্রায় ফেনা তুলে ফেলেন! যাক আজকে সামনাসামনি দেখলাম অবশেষে। আমাদের বিয়েতে এলেন না কেন? “
“আ’ম এক্সট্রিমলি সরি। অ্যাকচুয়াললি ইম্পরট্যান্ট কাজে আউটসাইড ছিলাম তখন।খুব ইচ্ছা ছিল তোমাদের বিয়ে’য় এঁটেন্ড করার।”
প্রিয়ন্তী তখন সম্পূর্ণ অন্য এক দুনিয়ায় টলমল করছে। অদ্ভুত, প্রচন্ড বিহুলতায় তাকিয়ে ছিল লোকটার দিকে। লোকটার চোখ দুটো কেমন অদ্ভুত আর পরিচিত লাগছে। কোথায় যেন দেখেছে ও। মনে পড়েছে। এই অলিভ গ্রিন রঙের মণিবিশিষ্ট চোখ দুটো তো সেদিন রাস্তায় দেখেছিলো। এইরে! এর কপালেই তো জুতো মেরেছিল সে। মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল বেচারির মুখ খানা। কেন? কেন? ওর সঙ্গে প্রতিবার কেন এমনটা হয়? লোকটা যদি ওকে চিনে ফেলে তো? গলা শুকিয়ে কাঠ হলো প্রিয়ন্তীর।
অভিরাজের নাম সে অনেকবার শুনেছে পাভেলের মুখে, ওর ভাইয়ের আজকের অবস্থানে আসার পেছনে এই মানুষটার বড় অবদান আছে। নামিদামি, প্রভাবশালী একজন মানুষ।পেশায় মস্ত বড় বিজনেসম্যান। বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর আরও বেশ কয়েকটি দেশে এই লোকের বিজনেস আছে। এত বড় একজন ব্যাক্তিত্ববান মানুষকে কিনা ও? আর ভাবতে পারলো না বেচারি।মনে মনে দোয়া-দুরুদ পড়া শুরু করে দিয়েছে। হাত কচলে যাচ্ছে অস্থিরতায়।শেষ! সব শেষ!
“এই প্রিয়!”
পাভেলের ডাকে হঠাৎ চমকে উঠে বাস্তবে ফিরল প্রিয়ন্তী।তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে ছোট করে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া!”
অভিরাজ এবার মিতালীর থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি তাকালো ওর দিকে। সেই একই স্থির দৃষ্টি।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দেখল ওকে।তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর জানাল সালামের। পাভেলের সঙ্গে দুই একটা প্রসঙ্গ এগোল এরপর। প্রিয়ন্তীরে দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় ভাইয়ের সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হওয়ায় মনে মনে স্বস্তির শ্বাস ফেলল প্রিয়ন্তী। ব্যাটা বোধহয় ওকে চিনতে পারেনি। চিনলে নিশ্চই এতটা স্বাভাবিক থাকতে পারতেন না।
“ব্লু শাড়িটায় তোমায় ঠিক ব্লু বেরির মতো লাগছে!”
পাভেলের সঙ্গে কথা বলার মাঝেই আচানক এহেন সম্মোধনে খানিকটা বেশিই ভরকালো।জমে গেল শরীর। ব্লু বেরি!মুহূর্তে তড়বড় করে একে একে জলসে উঠল মেসেজের স্মৃতিগুলো।শ্বাসটাও আটকে গেল এহেন সম্মোধনে। নির্বাক হয়ে কিছুক্ষন ভেবে সামলালো নিজেকে। ধমকালো পরোক্ষনে। ওনার মতো এমন ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ মানুষ নিশ্চই এরকম লেইম কর্মকান্ড করবে না।সময় কোথায় করার?
“তাজধীর ভাই…
পাভেলের ডাকে ঘোর কাটল প্রিয়ন্তীর।পরিচিত নামটা কানে যেতেই নড়েচড়ে দাঁড়ালো মেয়েটা। পাভেল দূরে তাকিয়ে ডেকে উঠল তখন,
“এইযে এখানে!”
দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল তাজধীর। ডাকে সাড়া দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সে। এসে দাঁড়াতেই পাভেল হেসে বলল,
“ভাই, ইনি হচ্ছেন তাজধীর ভাই,মিতালীর বড় ভাই।”
অভিরাজের দৃষ্টি এবার সরাসরি গিয়ে স্থির হলো তাজধীরের ওপর।হাভভাব এমন যেন সে আগে থেকেই চেনে তাকে। এক মুহূর্তও দেরি না করে অভিরাজ হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য।
তাজধীরও হাত বাড়াল। নিজে থেকে কিছু বলার আগেই অভিরাজ তাকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত, স্থির গলায় বলল,
“আই নো ইউ।”
একটু থেমে খুব স্পষ্ট করে উচ্চারণ করল,
“নাইস টু মিট ইউ, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিক আযান।”
খানিকটা অবাক’ই হলো তাজধীর। ভ্রু কুঁচকে গেল সামান্য।তবুও করমর্দনটা শেষ করে শান্ত গলায় বলল,
“আপনি আমায় চিনেন?”
“আপনার মতো এমন স্পেশাল ব্যক্তিত্বকে—কে না চিনবে বলুন?”
“পার্সোনাল?অর অনলি ফ্যামিলিয়ার উইথ মাই নেম?”
“দুটোই বলা যায়।উম! পেশায় বিজনেসম্যান আমরা। ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট নিয়ে কাজ আমাদের। দেশের বাইরে থেকে অনেক কিছু আনতে হয়, আবার পাঠাতেও হয়। শিপমেন্ট, কার্গো—সবকিছুই তো সমুদ্রপথেই আসে।”
অতঃপর চোখ সরু করে তাকাল তাজধীরের দিকে।
“আর সেই সমুদ্রপথ, সেই নিরাপত্তা সেগুলো কার অধীনে থাকে সেটা নিশ্চয়ই আমাকে আলাদা করে বলার দরকার নেই।সমুদ্রেরে প্রাণ, যোদ্ধা কে চিনবো না তা কি হয়?তাই বলছিলাম আপনাকে না চেনার প্রশ্নই আসে না। হাওএভার, আই’ম অলসো অ্যাওয়ার অফ অ্যানাদার সাইড অফ ইউর আইডেন্টিটি।”
শেষের কথাটা খানিকটা বিড়বিড় করে বললেও শুনতে কষ্ট হলোনা তাজধীরের। কথাটা শুনতেই অতিমাত্রায় ভ্রু প্রসারিত হয়ে উঠল তার। বলল,
“মানে?”
পেছন থেকে একজন তাড়াহুড়ো করে এসে ডাকল তখন,
“স্যার! একটু ইম্পরটেন্ট ইস্যু হয়েছে। আপনাকে একটু বাইরে আসতে হবে।ইটস আর্জেন্ট!”
অভিরাজ এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে পরিস্থিতিটা হিসাব করল।চোয়াল দুটো শক্ত হতে হতেও সামলালো নিজেকে। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“এক্সকিউজ মি।”
পাভেলের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“লেটস টক লেটার।”
বলেই চলে গেল। তাজধীর তখনো ঠান্ডা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো অভিরাজের চলে যাওয়ার পানে।
চলবে…..
Share On:
TAGS: ডেসটেনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেসটেনি পর্ব ৮
-
ডেসটেনি পর্ব ১৩
-
ডেসটেনি পর্ব ১৭
-
ডেসটেনি পর্ব ১০
-
ডেসটেনি পর্ব ১৫
-
ডেসটেনি পর্ব ১২ (দ্বিতীয় অংশ)
-
ডেসটেনি পর্ব ৯
-
ডেসটেনি পর্ব ৭
-
ডেসটেনি পর্ব ১৯
-
ডেসটেনি পর্ব ২