Golpo romantic golpo জেন্টাল মন্সটার

জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৬১


#জেন্টাল_মনস্টার

#লামিয়া_রহমান_মেঘলা

#পর্ব_৬১

[ 🚫কপি করা সম্পূর্ণ কঠোর ভাবে নিষেধ ]

কেটে গেছে পাঁচটি মাস।

রাশিয়ার সেই দীর্ঘ শীতের পর এখন বাতাসে এক ধরনের স্থির উষ্ণতা। আদ্রিতা আজ প্রিয়ার সঙ্গে ভার্সিটিতে এসেছে। নিয়মিত হয়ে গেছে তার এই পথচলা, প্রতিদিন সকালে প্রিয়ার হাত ধরে সেই চেনা গেট পেরিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকা। ভার্সিটির খোলা আকাশ, সবুজ ঘাস আর ছাত্রছাত্রীদের কোলাহল, সব মিলিয়ে জায়গাটা এখন তার কাছে শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এক ধরনের মানসিক আশ্রয়, যেখানে ক্লান্ত মন একটু শ্বাস নিতে পারে।

এখন আদ্রিতা থাকে আদ্রিসের মেনশনে। ভোর হলেই কেউ না কেউ, আদ্রিস, রেভেন, কিংবা সিকিউরিটির লোকজন, ওদের ভার্সিটিতে পৌঁছে দেয়, আবার সন্ধ্যায় ফিরিয়েও আনে। এই ব্যবস্থার ভেতর অদ্ভুত এক যত্ন লুকিয়ে আছে, যা বাইরে থেকে কঠোর মনে হলেও ভেতরে ভীষণ সুরক্ষিত।

আদ্রিস যেন দিন দিন আরও বদলে যাচ্ছে। তার ভেতরের সেই কঠিন, রাগী মানুষটার পাশে এখন এক নতুন রূপ ধরা দিচ্ছে, অপ্রত্যাশিত এক কোমলতা। আদ্রিতার জন্য সে নতুন গাড়ি পর্যন্ত কিনেছে, শুধু এই কারণে যেন রাস্তার কোনো ঝাঁকুনি বা ঝুঁকি তাকে স্পর্শ না করে। এই যত্নের ভেতরেও তার স্বভাবসুলভ কঠোরতা আছে, কিন্তু সেই কঠোরতার আড়ালে এখন আর আগের মতো শূন্যতা নেই।

আদ্রিতাও বদলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের ভয়গুলো ধীরে ধীরে সরছে, জায়গা দিচ্ছে এক অদ্ভুত দৃঢ়তাকে। তবু আদ্রিসের সামনে দাঁড়ালে সে আজও সেই আগের মতোই, একটু চুপচাপ, একটু নরম, যেন বয়সের চেয়েও ছোট কোনো পরিচিত ছায়া। কিন্তু তাতে আর আগের মতো ভেঙে পড়া নেই; আছে এক ধরনের অভ্যস্ততা, এক ধরনের নিশ্চুপ গ্রহণ।

মিরা আর সায়েরের বিয়ের দিন ঠিক করেছেন মিসেস মিহু। খুব শিগগিরই সেই আয়োজন সম্পন্ন হবে। একই দিনে আবার নতুন করে সবাইকে সামনে রেখে আদ্রিস আর আদ্রিতারও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হবে,এমনটাই পরিকল্পনা।

এক মাস পর নির্ধারিত সেই দিনটির অপেক্ষায় এখন চারপাশে জমে আছে ব্যস্ততা আর উত্তেজনা। আদ্রিতা আর প্রিয়া দুজনেই ভীষণ উচ্ছ্বসিত, যেন দিন গুনতে থাকা প্রতিটি মুহূর্ত তাদের জন্য নতুন এক গল্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এই আনন্দের মাঝেও বাস্তবতার চাপ ভারী। মিসেস মিহু চাইলে অনেক আগেই সবটা শেষ করতে পারতেন, কিন্তু ব্যবসার নানা জটিলতা, দেশ-বিদেশের দায়িত্ব, আর আদ্রিস, সায়ের ও রেভেনের নিরন্তর ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে সময় যেন হাতের মুঠো থেকে সরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ভ্রমণের ফলে যে কাজের ঘাটতি পড়েছে তা, মেটাতে গিয়ে সবাই এখন ক্লান্তির এক সীমাহীন চক্রে ঘুরছে। তবু সেই ক্লান্তির মাঝেও কোথাও যেন টিকে আছে সম্পর্কের টান, দায়িত্বের বন্ধন, আর আসন্ন এক নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা।

———-

ক্লাস শেষ করে আদ্রিতা আর প্রিয়া বেরিয়ে এসেছে ভার্সিটির করিডোর পেরিয়ে। বিকেলের হালকা আলো ক্যাম্পাসের গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন সবুজের উপর সোনালি ধুলো মিশে আছে। বাতাসে এক ধরনের নরম শীতলতা, দূরে কারও হাসির শব্দ, আর পাতার খসখস, সব মিলিয়ে পরিবেশটা শান্ত অথচ জীবন্ত।

ঠিক তখনই পেছন থেকে আদ্রিতাকে ডাকে ফ্লোরা।

“আদ্রিতা।”

আদ্রিতা থেমে যায়।

আজকাল তার শরীর একটু ভারী হয়ে উঠেছে। ছয় মাসের মাতৃত্ব তাকে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। ঢিলা ঢালা পোশাকের আড়ালেও তার পেটটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তবু সেই পরিবর্তনের মাঝেও তার মুখে এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা আছে, যেন নতুন এক জীবনের ভার সে নীরবে বহন করতে শিখে গেছে।

প্রিয়া তখন ফোনে কথা বলছিল। আদ্রিতাকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে সেও থেমে যায়, চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকায়।

ফ্লোরা দ্রুত এগিয়ে আসে। তার মুখে অল্প দম ফুরিয়ে যাওয়ার ছাপ, যেন সে তাড়াহুড়ো করে কিছু বলতে এসেছে।

“আদ্রিতা, তোমার নোটবুকটা লিওর কাছে আছে। ও তোমায় ডাকছে, তুমি নাকি ফিরোনি।”

আদ্রিতা একটু ভ্রু কুঁচকে বলে,

“আচ্ছা, এখন আবার উপরে যেতে হবে।”

ফ্লোরা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ে, কণ্ঠে অস্বস্তি লুকোনো,

“সরি আদ্রিতা, আমি আনতে পারতাম, কিন্তু তোমার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে আর পারিনি।”

আদ্রিতা একবার প্রিয়ার দিকে তাকায়। চোখের সেই নীরব ইশারায় বোঝানো থাকে পরিস্থিতি।

প্রিয়া মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেয় ঠিক আছে।

আদ্রিতা শান্ত গলায় বলে,

“”আপু, তুমি গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াও। আমি ক্লাসরুম থেকে নোটবুকটা নিয়ে আসছি, তারপরই আসছি।”

“ওকে।”

প্রিয়া ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগিয়ে যায়। তার পায়ের নিচে শুকনো পাতাগুলো মৃদু শব্দ করে ভেঙে পড়ছে।

আদ্রিতা আবার ক্লাসরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করে। করিডোরটা একটু ফাঁকা, দেয়ালের পাশে ঝুলে থাকা পোস্টারগুলো হালকা বাতাসে কাঁপছে। জানালা দিয়ে আসা আলো তার মুখে পড়ছে, কিন্তু সে টের পাচ্ছে না, মনে তখন অন্য চিন্তা।

ঠিক সেই সময় ফ্লোরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোন বের করে কাউকে দ্রুত কল দেয়।

“হ্যালো, কাজ হয়ে গেছে। আদ্রিতা এখন ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছে।”

ওপাশ থেকে কী বলা হলো বোঝা গেল না, শুধু ফ্লোরার মুখে এক মুহূর্তের জন্য অস্থির ছায়া নেমে আসে। তারপর সে তাড়াতাড়ি কল কেটে দেয়।

কোনো দেরি না করে সে দ্রুত ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যায়, যেন এই জায়গায় আর এক মুহূর্তও থাকতে চায় না।

এদিকে প্রিয়া গেটের কাছে এসে দেখে আজ তাদের নিতে একজন গার্ড এসেছে। গাড়িটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে। গাছের ছায়া গাড়ির গায়ে দুলে দুলে পড়ছে।

প্রিয়া গাড়িতে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই সে ফ্লোরাকে দ্রুত পায়ে দৌড়ে যেতে দেখে। মেয়েটার চলায় অদ্ভুত তাড়া, যেন কোনো অদৃশ্য ভয় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রিয়া কিছু বুঝতে পারে না। ভ্রু সামান্য কুঁচকে সে চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসে।

ঠিক তখনই ফোনের ওপাশ থেকে রেভেনের কণ্ঠ ভেসে আসে,

“প্রিয়া, কথা বলছো না কেন?”

প্রিয়ার মনোযোগ ভাঙে। সে হালকা হাসে, কণ্ঠে ক্লান্তি মিশিয়ে বলে,

“আমি গাড়িতে উঠে পড়েছি তাই।”

“ওহ, তাহলে মেনশনে পৌঁছে টেক্সট দিও।”

“হ্যাঁ, একটু পর আদ্রিতা এলেই গাড়ি ছাড়বে।”

রেভেন একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করে,

“আদ্রিতা কোথায় গেছে?”

“ক্লাসে গেছে, নোটবুক ফেলে রেখে এসেছে।”

ওপাশ থেকে এক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর রেভেন বলে,

“তুমি যেতে পারতে। এই অবস্থায় হাঁটাচলা করা ঠিক না।”

প্রিয়া একটু অনুশোচনার সুরে উত্তর দেয়,

“হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। আমি বরং গিয়ে দেখে আসি। মেয়েটা এখন ভারী হয়ে গেছে, হাঁটাচলায় ওর কষ্ট হয়।”

“ঠিক আছে, যাও।”

কল কেটে যায়।

প্রিয়া ধীরে ধীরে আবার ভার্সিটির ভেতরে পা রাখে। তার পেছনে গাড়ি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে, আর চারপাশে সন্ধ্যার আলো আরও একটু গাঢ় হয়ে আসতে শুরু করে।

————

প্রিয়া ক্লাসরুমে এসে দাঁড়াতেই তার ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে।

ক্লাসরুমটা ফাঁকা।

ডেস্কগুলো নিঃশব্দ, জানালা দিয়ে বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে ভেতরে, কিন্তু সেই আলোতেও যেন কোথাও প্রাণ নেই। বাতাসটা পর্যন্ত ভারী মনে হয়।

তার চোখ দ্রুত ঘুরে যায় চারপাশে।

“আদ্রিতা?”

কোনো উত্তর নেই।

প্রিয়া কয়েক পা এগিয়ে যায়, কণ্ঠে অস্থিরতা মিশে ডাক দেয় আবারও। তবুও সেই একই নীরবতা ফিরে আসে, যেন পুরো ঘরটা কথা বলতে ভুলে গেছে।

প্রিয়া দ্রুত নিজের ফোন বের করে আদ্রিতার নাম্বারে কল করে। কিন্তু অবাক হয় এটা দেখে ফোনটা ক্লাসরুমের ফ্লোরে পড়ে আছে।

তার কল করার ফলে জ্বলে উঠছে বার বার৷

প্রিয়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যায়।

সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। ভয়টা প্রথমে আসে না, আসে বিভ্রান্তি। তারপর ধীরে ধীরে সেই বিভ্রান্তির ভেতর দিয়ে মাথা চাড়া দেয় চিন্তা,একটা অস্বস্তিকর, অচেনা চিন্তা।

কাঁপা হাতে সে ফোনটা তুলে নেয়।

চারপাশে তাকায়।

কেউ নেই।

করিডোরটা খালি, জানালার বাইরে গাছের ডালগুলো বাতাসে ধীরে দুলছে, কিন্তু ক্যাম্পাসের ভেতরে যেন জীবন থেমে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, নেই কোনো মানুষের উপস্থিতি।

প্রিয়ার শ্বাস ভারী হয়ে আসে।

সে দ্রুত বেরিয়ে আসে ক্লাসরুম থেকে। পায়ের শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনি তোলে, কিন্তু সেই প্রতিধ্বনিও যেন অদ্ভুতভাবে একা শোনায়।

সে একবার ডাকে,

“আদ্রিতা!”

আবারও নীরবতা।

প্রিয়া প্রায় দৌড়াতে শুরু করে। চোখ ছুটে যায় এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, সিঁড়ি, করিডোর, গেটের দিক, লাইব্রেরির পাশ, সব জায়গায় খোঁজে সেই পরিচিত মুখটা।

কিন্তু কোথাও নেই।

আদ্রিতা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

প্রিয়ার বুকের ভেতর এবার ধীরে ধীরে একটা ভয় জমতে শুরু করে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, গলা শুকিয়ে আসে। চোখের সামনে সবকিছু একটু একটু করে ঝাপসা হয়ে ওঠে।

কাঁপা হাতে সে ফোনে আদ্রিসের নাম্বার ডায়েল করে।

কল বাটন চাপতেই তার হৃদস্পন্দন আরও দ্রুত হয়ে ওঠে, যেন পরের মুহূর্তটাই তার জন্য অজানা কোনো ঝড় বয়ে আনতে চলেছে।

———-

আজ দিনটা ভীষণ ক্লাসভরা ছিলো। কাজের এত প্রেশার ছিলো যে আদ্রিস এবং সায়ের দুপুরের লাঞ্চ টা করার সময় পর্যন্ত পায়নি।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে এই এখন তিনজন, আদ্রিস, রেভেন এবং সায়ের বসেছে লাঞ্চ করতে।

রেভেন লাঞ্চ করতে করতে আদ্রিসের দিকে তাকিয়ে বলে,

“বস বেশ কিছুদিন হলো টোটোর কোন খোঁজ নেই। লোকটা পিছু ছেড়ে দিলো নাকি?”

আদ্রিস চামচের খাবার মুখে দিতে দিতে উত্তর দিলো,

“মোটেই না। গত ৫ মাসে ৩ বার ওকে পরাস্ত করেছি আমি। আর এই হার সে এত সহজে মেনে নিবেনা। আমি নিশ্চিত সে মনে মনে ভয়ঙ্কর কিছু পরিকল্পনা করছে৷’

সায়ের নীরবে খাবার খাচ্ছে। আদ্রিসের প্রেডিকশন শুনে সে চামচ প্লেটে রেখে আদ্রিসের দিকে তাকায়,

” আদ্রিস তুই কি জানিস আসরাফ খান মানে তোর বাবা রাশিয়া এসেছে?”

আদ্রিস ভ্রু কুঁচকে তাকায়,

“হোয়াট! কবে? কখন?’

সায়েরের ভ্রু জুগল কুঁচকে যায় আদ্রিসের উত্তর শুনে। সে সিরিয়াস হয়ে ফের জিজ্ঞেস করে আদ্রিসকে,

” তুই সত্যি জানতিস না?”

“জানতাম না মানে? ড্যাড রাশিয়া এসেছে কিন্তু কবে?”

সায়ের আরও কিছু বলবে এমন সময় আদ্রিসের ফোনটা বেজে ওঠে।

প্রিয়ার নাম্বার দেখে আদ্রিস ফোন তুলে নেয়,

“হ্যা প্রিয়া বল।”

“ভ ভাইয়া………! “

চলবে?

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply