Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩৫


#জল_তরঙ্গের_প্রেম

পর্ব সংখ্যা;৩৫

#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি

বাবার হাতে দাবাং চড় খেয়ে দ্বিগুণ ক্ষেপে গেলো ক্ষেপা তরঙ্গ। রাগে তিরতির করে কাঁপছে তার চোয়াল। ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে বহু আগে। কপাল আর হাতের নীল শিরা গুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে রেগে বোম হয়ে আছে সে। চেঁচিয়ে উঠল তরঙ্গ;-

–” এক ব্যর্থ বাবার সাথে কথা বলছি। যে নিজের মেয়েদের রক্ষা করতে পারে না। দ্বিতীয় ওয়াইফের কথায় উঠে বসে।”

ছেলের এমন ত্যাড়া জবাবে; ফোরকান দেওয়ান ফের তেড়ে গেলেন তরঙ্গকে মারতে। কিন্তু এর মাঝেই ফারহান দেওয়ান হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলেন। গম্ভীর কন্ঠে সুধালো তিনি।

–” থামো ফোরকান, ওকে বলতে দাও।”

–” কি বলবো চাচ্চু? তোমাকে বলে ও লাভ নেই। তোমার মেয়ের জন্য তোমার দরদ হচ্ছে না। আমি বলে আর কি করবো?”

ফারহান দেওয়ানের ফর্সা মুখশ্রী কেমন বেরঙিন হয়ে গেছে। কপালের রগ গুলো ফুলে উঠেছে ওনার। বিরস মুখে তাকিয়ে আছেন মেঝের দিকে। ফোরকান দেওয়ান রাগে ফেটে যাচ্ছেন। বড় ভাইয়ের এমন নির্লিপ্ততা আর ছেলের এমন অসভ্যতামিতে অবাক তিনি। বছরের মধ্যে এক মাস ও বাড়িতে না থাকা ফোরকান দেওয়ান নিজের স্ত্রী আর ভাইয়ের বউয়ের তরীর সাথে করা খারাপ ব্যবহার সম্পর্কে কিছুই জানা নেই।

তিনি এসব সংসারি ঝামেলায় থাকেন না। নারায়ণগঞ্জের ফক্ট্যারির ওখানেই থাকেন ফোরকান দেওয়ান। বছরের মধ্যে অর্ধেক সময় ই সেখানে শ্রমিকদের মধ্যে ঝামেলা চলতে থাকে। একবার ঝামেলা এতোটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, থানা – পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়ে ছিলো। সেই থেকে ওনি নারায়ণগঞ্জ থাকেন। বড়দের এমন চোটপাট করতে দেখে ভয়ে সিটিয়ে গেলো তিন্নি। তড়িঘড়ি করে টিভির সুইচ অফ করে ড্রয়িং রুমের কর্ণারে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। ভয়ে বাচ্চাটার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হঠাৎ, সবার এমন রাগের কারণ বুঝতে পারছে না সে। সুযোগ বুঝে ছুট্টে পালালো তিন্নি।

এর মধ্যে তরঙ্গ বাবার দিকে তাকিয়ে পুনরায় চেঁচিয়ে উঠলো;-

–” তুমি জানো বাবা? তোমার গুণধর স্ত্রী আমার বউয়ের পিঠে খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়েছেন। ছ্যাঁকা দিয়ে ও তিনি ক্ষান্ত হননি। আমার অবলা বউটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।”

ফোরকান দেওয়ান আঁতকে উঠলেন;-

–” কি?”

তরঙ্গ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আওড়ালো,

–” হ্যাঁ বাবা, এর বিচার তোমরা করো। না হলে আমি কেস করবো!”

–” তুমি থামো তরঙ্গ। সাহানারা? তরঙ্গ যা বলছে তা সত্যিই?”

–” তোমার এখনো কনফিউশন আছে? এই তরী এদিকে আয়।”

কথা শেষ করে, ঝড়ের বেগে সিঁড়ির কাছে দাঁড়ানো তরীর নিকট; এগিয়ে এলো তরঙ্গ। সতর্ক হাতে তরীর পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চুল গুলো বাম পাশে সরিয়ে দিল সে। অতঃপর, আলতো করে তার ঘাড় স্পর্শ করে বাবা – চাচার দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো মেয়েটাকে। মূহূর্তেই শ্যাম সুন্দর তরীর পিঠের চামড়া উঠে যাওয়া দ*গ*দ*গে ক্ষ*ত চিহ্নটুকু স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সেই ক্ষ*ততে চোখে পড়তেই ফারহান দেওয়ান চোখ বুজে নিলেন। ফোরকান দেওয়ান যেন কিছুক্ষণের জন্য নিজের বাকশক্তি হারিয়ে ফেললেন।

নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। সহধর্মিণী হিসেবে সাহানারা পারফেক্ট না। এতে অবশ্য ফোরকান দেওয়ানের আপসোস নেই। কিন্তু তিনি যে এতোটা নিচু কাজ করতে পারবেন তাও জানতেন না তিনি। সম্বিত ফিরতেই ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সামনে এগিয়ে এলেন ফোরকান দেওয়ান। পরক্ষণেই, সহধর্মিণীর গালে সজোরে চড় বসিয়ে দিলেন তিনি।

আকস্মিক পুরুষালি হাতের তীব্র আঘাতে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে শাড়ির পাড়ে হোঁচট খেয়ে; সোফার কিনারায় ধাক্কা খেলেন সাহানারা। সোফার শক্ত কাঠের হাতলে আঘাত পাওয়ার দরুন, ঠোঁটের কিনারা বেয়ে সরু র*ক্তের ধারা বইলো ওনার। স্বামীর এহেন আচরণে, বিস্ময় আর অপমানের মিশেলে নির্বাক হয়ে গেলেন তিনি। সোফায় বসে ঠোঁটের কিনারা চেপে ধরে ছলছল চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন।

–” আমাকে তুমি মারতে পারলে তরঙ্গের বাবা? এই তোমার ভালোবাসা?”

–” আমার ভালোবাসার উপর আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকাও। এই দিন দেখার জন্য তোমাকে ভালোবেসে বিয়ে করে ছিলাম সানু? আমার ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলে তুমি? আব্বা, আম্মা ঠিকিই বলে ছিলেন। কয়লা ধুলে যেমন ময়লা যায় না। তেমন অজাত কে ভালোবাসলেই জাতে তোলা যায় না।”

স্বামীর মুখে তাচ্ছিল্য পূর্ণ কড়া কথায় মুখ নামিয়ে নিলেন সাহানারা। বয়সের চাপে নুইয়ে পড়া গাল বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ওনার। স্বামীর অপমান আর মারের তোপে রাগে, কষ্টে, অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তরীর পানে। তরঙ্গের বাজ পাখির ন্যায় সরু দৃষ্টি তা সহজেই দেখে নিলো। মা – ছেলের সম্পর্কের সমীকরণ ভুলে কিছুক্ষণের জন্য আর্দশ স্বামী রূপে অবতীর্ণ হলো ছেলেটা।

–” আমার স্ত্রীকে একদম চোখ রাঙাবে না মা। অপরাধ তুমি করেছো। আমার বউ ভুক্তভোগী।”

ছেলের এরূপ আচরণে মুখে আচঁল চাপলেন সাহানারা। অপর হাতে কপাল চাপড়ে আহাজারি করে উঠলেন তিনি।

–” এই মুখ পুড়ি আমার ছেলেকে কালো জাদু করেছে। আমার বুকের ধন আমার সাথে এমন আচরণ করছে। আমার ছেলে আমাকে আঙুল তুলে কথা বলছে। ও আল্লাহ্ আমাকে তুলে নেন।”

বিরক্তি হয়ে হাত উঁচিয়ে সাহানারা কে থামিয়ে দিলেন ফোরকান দেওয়ান। সাহানারার কান্না, হাহাকার সব নাটক ভৈই সত্যি লাগছে না।

–” নাটক বন্ধ করো সানু। এতো বয়স হয়েছে তবুও যৌবনের সেই হিংসেপনা ছাড়তে পারোনি।

–” হ্যাঁ, নাটক তো লাগবেই। মা হও নি তো। বাপ হয়েছো। ছেলে – পেলে মানুষ করোনি। দরদ বুঝবে কি?”

ওনাদের এই দ্বন্দ্বের মাঝে ঘৃণিত নজরে বুশরার দিকে তাকালেন ফারহান দেওয়ান। রাগে, ঘৃণায় শরীর কাঁপছে ওনার। তাতে বিশেষ ভ্রু-ক্ষেপ করলেন না বুশরা। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে, শাহাদাত আঙ্গুল মুখে চেপে চুপ থাকার ইশারা করলেন তিনি। নিজের অজ্ঞতা সহ্য করতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়লেন ফারহান দেওয়ান।

–” আমার শরীর খারাপ করছে ফোরকান। আমি ঘরে যাচ্ছি। এসব ভালো লাগছে না।”

কথা শেষ করে চোখ মুছতে মুছতে রুমের দিকে চলে গেলেন ফারহান দেওয়ান। ওনাকে যেতে দেখে বুশরা ও সুযোগ বুঝে কথার চাল দিলেন।

–” ভাবি আপনি এতোটা নিচে নামলেন কি করে? আমি ভাবতেই পারছি না। আমি গিয়ে দেখি ওনার কি হয়েছে। আমার ওনার কিছু হলে আমি তোমাকে ক্ষমা করবো না।”

বুশরার কটাক্ষ পূর্ণ কথায় নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলেন না সাহানারা। রাগে তিরতির করে কাঁপতে থাকা হাত জোড়া চেপে ধরলেন একে অপরের সাথে।

–” একদম নাটক করবি না। যেই আমার সময় খারাপ হলো। ওমনি কেঁটে পড়ছিস?”

বুশরা জবাব দিলো না। মুখ বাঁকিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন তিনি। সবার এমন গা ছাড়া ভাব দেখে, হুট করে তরঙ্গ চুপ হয়ে গেলো। মাথা ঝাঁকিয়ে, শুভ্র মুখশ্রী দু’হাতের তালুর মাঝে চেপে ধরে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। নিজের রাগ সংবরণের একটা সহজ মাধ্যম। অতিরিক্ত রেগে গেলে নিজের উপর এই প্রক্রিয়া এপ্লাই করে তরঙ্গ। আজ ও তার ব্যতিক্রম করছে না সে। এতদিনে একটা কথা বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছে তরঙ্গ। আর যাইহোক, মাকে এভাবে কথা দিয়ে ভালো করা যাবে না। সে আড়ালে গেলেই ফের নিজের রূপে অবতীর্ণ হোন সাহানারা।

তীক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন ব্রেইনে কিছু ছক এঁকে নিলো ছেলেটা। পর পর তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা তরীকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো সে। এতোক্ষণ, বাঘের মতো হুংকার দেওয়া ছেলেকে হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যেতে দেখে ফোরকান দেওয়ান ছেলের দিকে তাকালেন। ওনার সাথে সাহানারা ও তাকালেন। দু’জনেই চুপ করে ওদের প্রস্থান দেখলেন। ছেলেকে চলে যেতে দেখে সোফায় বসে পড়লেন ফোরকান দেওয়ান। ব্যর্থতার কড়াঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ওনার হৃদয়। বাবাকে দেওয়া কথা ওনি রাখতে পারেননি। এতোদিনে ও সাহানারা কে নিজের মতো গড়ে নিতে পারেননি তিনি। বরং, ওনার ভাবি মরা মেয়েটাকে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে তার ভুলের জন্য।

********

তরীকে নিয়ে নিজের রুমে ফিরলো তরঙ্গ।

কার্বাড খুলে, নিজের গিটার আর জরুরি ব্যাংক কার্ড গুলো বের করে নিলো। গিটার টা বিছানায় রেখে কার্ড গুলো পকেটে পুরে; ভার্সিটির ব্যাগটাতে কিছু শার্ট, র্টি-শার্ট নিয়ে নিলো। তরঙ্গ কে ব্যস্ত হাতে জিনিসপত্র গোছাতে দেখে ছেলেটার হাত টেনে ধরলো তরী। ধরে আসা গলায় প্রশ্ন করলো সে;-

–” এসব কি করছেন তরঙ্গ?”

তরীর কোমল কণ্ঠে তরঙ্গের পা জোড়া থেমে গেলো। এলোমেলো চুলে, ক্লান্ত মুখশ্রীর তরঙ্গ কে দেখে বুকটা ব্যথায় মোচড়ে উঠলো তরীর। চোখ-মুখের ফোলা বেড়েছে। র*ক্তি*মা ভাব ও দ্বিগুণ হয়েছে। তরীর মুখটা আঁজলায় নিয়ে মাঝ ললাটে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিলো তরঙ্গ। তরঙ্গের মায়াময় ছোঁয়াতে চোখ বুঁজে নিলো তরী।

–” পৃথিবীতে ভালোবাসা কিনতে পাওয়া যায় না কেন তরী জান? তবে আমি আমার জমানো সব পুঁজি দিয়ে তোর জন্য ভালোবাসাময় একটা পৃথিবী কিনতাম।”

তরঙ্গের এহেন আদুরে কথায় তরীর বন্ধ চোখের পাতা চুঁইয়ে জলের স্রোত বইলো।

–” আমার ভালোবাসাময় একটা পৃথিবী লাগবে না তরঙ্গ। আমার কেবল ভালোবাসাময় আপনি হলেই হবে। আমার আর কিচ্ছুটি লাগবে না। আপনি থেকে যান। আপনি ছাড়া আমার সত্যিই আর কিছু লাগবে না।”

কথা বলতে বলতে, শব্দ করে কেঁদে ফেললো তরী। মলিন হাসলো তরঙ্গ। পুনরায় চুমু খেলো সে। আলগোছে তরীকে নিজের বুকে আগলে নিয়ে বিশ্বজয়ী হাসি দিলো তরঙ্গ।

–” আমি তো তোর ই জান। এই অধম তরঙ্গ চিরকাল ই তোর থাকবে। মৃত্যু ও তোকে আর আমাকে আলাদা করতে পারবে না। কারণ পরকালে ও তুই আমার ই হবি।”

#চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,

কেমন আছেন আপনারা? আমার উপর খুব রাগ হচ্ছে না? জানি। কিন্তু কিছুই করার নেই। সমুদ্রের মাঝ বরাবর ডুবতে থাকা এক নাবিকের যেমন দশা। আপনাদের লেখিকা ও তেমন ই আছে। এই ভাসা-ডোবার মাঝেই আপনাদের জন্য এতোটা লিখতে পারছি। কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply