Golpo romantic golpo চেকমেট সিজন ২

চেকমেট সিজন ২ পর্ব ১০


চেকমেট_২ ||১০||

সারিকা_হোসাইন

সদ্য কিরণ ছড়ানো সূর্যের তাপে অবগাহন শেষ হতেই রোদের চোখ পরলো শাহরানের দিকে ।মানুষটা নিষ্ঠুরের ন্যয় সামনের দিকে ধেয়ে চলেছে।চারিধারে তার নজর নেই।দৃষ্টি বরাবর সম্মুখে।খুব বুঝি তাড়া!একটি বার পেছনে তাকানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করছে না সে।পেছনে যেনো সাক্ষাৎ ঘৃণা ভরা পাপ দাঁড়িয়ে আছে।পিছু ফিরলেই সেই পাপে পাপিষ্ঠ হয়ে পুড়ে মরবে অহংকারী পুরুষ।

শাহরানের যাত্রা পথে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শাহরানের পদচ্ছাপ গণনা করতেই রোদের ঘুমন্ত মস্তিষ্কে ধরা দিলো গত রাতের ঘটনা।মুহূর্তেই শরীর শিউরে উঠলো।অদ্ভুত ভয়ানক দম বন্ধকর এক পরিস্থিতি ।রোদের ভোঁতা মস্তিষ্ক হঠাৎ ডুবলো এখানে ফিরে আসার দুশ্চিন্তায়।সে তো শাহরানের ভুতুড়ে ফরেস্ট হাউজে ছিলো।তবে এখানে এলো কি করে?রোদের মস্তিষ্ক যখন নিজের ফিরে আসার চিন্তায় বিক্ষিপ্ত ঠিক তখন হামি তুলতে তুলতে বেরিয়ে এলো প্রিয়ন্তী

“কিরে এখন ঠিক আছিস?.

প্রিয়ন্তীর গলায় চট করে পেছন ফিরলো রোদ।অদ্ভুত মুখভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো প্রিয়ন্তীর পানে।এরপর জিজ্ঞেস করতে চাইলো গত রাতের ঘটনা।তার আগেই প্রিয়ন্তী বলে উঠলো

“নিষেধাজ্ঞা জারি সত্ত্বেও পাইন ফরেস্ট এ কেন ঢুকেছিলি?যদি ভয়ানক বিষাক্ত কিছুতে কামড়াতো তখন?নেহাত অল্প বিষের পোকা কামড়ে ছিলো।নিনাদ সঠিক সময়ে ডক্টর মার্টিন এর কাছে না নিয়ে এলে কি যে হতো!

প্রিয়ন্তীর মুখে নিনাদের নাম শুনে রোদের কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়লো।তার স্পষ্ট মনে আছে ওখানে শাহরান ছিলো।নিনাদ তখন সকলের সাথে বারবিকিউ পার্টি করছিলো।
রোদ নিজের ঝিমিয়ে আসা মাথা দুই হাতে চেপে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলো।অতঃপর ইতস্তত হয়ে শুধালো

“তুই স্পষ্ট দেখেছিস ওটা নিনাদ?তোর মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে।শাহরান ছিলো বোধ হয় তাই না?

রোদের কথায় ঘোর আপত্তি করে মাথা নাড়ালো প্রিয়ন্তী।এরপর হাত ঝেড়ে বললো

“তোর মাথাটা কি গেছে নাকি?আমরা সবাই যখন তোকে নিয়ে মাতামাতি করছিলাম শাহরান তখন এদিকে ফিরেও তাকায় নি।আমরা ডাকতে গেছিলাম তখন ও আসেনি।ইভেন চড়া গলায় বলেছে তুই মরলেই তার কি এসে যায়?আর ও কি না তোকে কোলে করে পাইন ফরেস্ট থেকে এখানে নিয়ে আসবে বাঁচাতে?ঘুমের ঘোর বুঝি এখনো কাটেনি তাই না?

প্রিয়ন্তীর মুখে শাহরানের এমন ভয়ানক নিষ্ঠুর কথা শুনে রুদের বুকের ভেতর কেমন কম্পন অনুভূত হলো।মানুষের ভালোবাসা বুঝি এতোই ঠুনকো?দুদিন আগেও কত ভালোবাসার বুলি আওড়ালো।আর আজ হঠাৎ মৃত্যু কামনা?

তাচ্ছিল্য হাসলো রোদ ।এরপর তপ্ত শ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলো সামনের বিশাল বরফে ঢাকা হ্রদের দিকে।কয়েকজন টিচার মিলে বরফ কেটে ওখানে মাছ ধরছে।সেই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সকল স্টুডেন্ট দের মাঝে বিশাল হইহুল্লোড় আর আনন্দ পরিলক্ষিত হচ্ছে।রোদ নিজের মনকে সামান্য হালকা করতে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো।রোদ কে দেখে জন এগিয়ে এসে শুধালো

“ডিড ইউ স্লিপ ওয়েল লাস্ট নাইট?

জনের চেহারা দেখেই রোদের গায়ে জ্বালা ধরলো।উত্তর দিতে ইচ্ছে হলো না।জনকে উপেক্ষা করে রোদ আশেপাশে তাকালো।ভিড়ের ওপাড়ে শাহরান শক্ত চোয়ালে হাতে মাছ ধরার হুইল ছিপ নিয়ে বসে আছে।যেনো বড় কোন মাছ ধরার জন্য ওঁৎ পেতে আছে সে ।রোদের বিক্ষিপ্ত মন হঠাৎ শয়তানি ফন্দি আটলো।তার ইচ্ছে হলো শাহরান কে জ্বালাতে।রোদ জানে জন শাহরানের জাত শত্রু।জনের সাথে রোদ কে কথা বলতে দেখলে নিশ্চিত জ্বলে পুড়ে দৌড়ে আসবে ছেলেটা।নিজের ফন্দি বহাল রেখে প্রশস্ত হাসলো রোদ।এরপর বিনিয়ে বিনিয়ে জনের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হলো।কিন্তু রোদের সমস্ত ভাবনায় জল ঢেলে নিজের মাছ ধরাতেই ব্যস্ত হলো শাহরান।রোদের পানে এক পলক তাকিয়েও দেখলো না।ভাবখানা এমন যেনো এখানে মাছ আর শাহরান ছাড়া আর কারোর অস্তিত্ব নেই।এবার বেশ অপমান লাগলো রোদের।কথায় কথায় জন বললো

“পাইন ফরেস্টের ভেতরটা অনেক সুন্দর।তুমি যেতে চাও আমার সঙ্গে?

রোদের হাসি বিলীন হলো।চোখ মুখে ক্রোধ নামলো।সে তাঁবুর দিকে পা ফেলতে ফেলতে বলে উঠলো

“নো থ্যাঙ্কস।ইউ গো অ্যালন।আম নট ফিলিং ওয়েল।

বলেই দ্রুত পদে প্রস্থান নিলো সে।কিন্তু জন রোদের ইগনোর মানতে নারাজ।মেয়েটা তার বহু শখের শিকার।এই ভয়ানক অরণ্যে এই শিকার বধ না করতে পারলে দ্বিতীয় সুযোগ আর কখনোই আসবে না।হাত কচলালো জন।সে আজ রাতেই যা করার করবে।এতে তার যা হয় হোক।মেয়েটাকে একবার ছুঁয়ে দেবার পর তার প্রাণ গেলেও সে কিচ্ছুটি মনে করবে না।বরং হাসতে হাসতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে।এরপর পরের জন্মে আবার এই মেয়েটার পিছু নেবে সে।


হাসি আনন্দ আর ঘুরাঘুরি শেষে সন্ধ্যায় চারিপাশে গোল হয়ে বসলো সবাই।আর একদিন পর ফিরে যেতে হবে তাদের।সময় যেনো খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।গোল হয়ে বসা সকল স্টুডেন্ট দের উদ্দেশ্যে একজন গাইড দাঁড়িয়ে বলে উঠলো

“কাল ভোরে আমরা সেলেঙ্গা রিভারে সাইবেরিয়ান পাখি দেখতে যাবো।সূর্য ওঠার আগে আমাদের পা হেঁটে বেরিয়ে যেতে হবে,এরপর বোটে করে ,তারপর স্পিড বোটে করে ওখানে যেতে হবে।যেতে অনেক সময় লাগবে। তাই সবাই আজ তাড়াতাড়ি ঘুমুবে।

গাইডের কথায় সবাই উৎসুক হয়ে উঠে দাঁড়ালো।এমন সময় নিজের তাবু থেকে তেড়ে এলো শাহরান।তার চোখ মুখ পাকা টমেটোর মতো টকটকে লাল হয়ে আছে।চোখ জোড়া দিয়ে যেনো অগ্নি ঝরছে।সেই অগ্নি স্ফুলিঙ্গ এখনই যেনো ভস্ম করে দেবে সব কিছু।মাথার সুন্দর চুল গুলো এলোমেলো।কেমন বিধস্ত রূপ গ্রাস করে নিয়েছে তাকে।শাহরানকে দেখে সকলেই হতবাক হলো।আজ পর্যন্ত কেউ তাকে এমন রূপে দেখেনি।প্রিন্সিপাল এগিয়ে এসে শাহরান কে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জনকে নিজের থাবায় এনে এলোপাতাড়ি কিল ঘুষি দিয়ে গলা টিপে ধরলো শাহরান।শাহরানের এহেন আচরণে ঘাবড়ে গেলো সকলে ।রোদ ভাবলো সকালের ঘটনার জন্য শাহরান এমন করছে।তাই সে শাহরান আর জনের মধ্যে ঢুকে শাহরান কে আটকানোর চেষ্টা করলো।কিন্তু শাহরান যেনো রোদের আগমনে আরো হাজার গুণ আগ্রাসী হয়ে উঠলো।শক্ত হাতের ধাক্কায় রোদ কে ছুড়ে ফেললো দূরে।বরফ মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগলো রোদ।শাহরান তাকালো না সেদিকে।সে যেনো আজ জনের প্রাণ নিয়ে তবেই দম ফেলবে।মুহূর্তেই আনন্দঘন পরিবেশ তপ্ত অঙ্গারে পরিণত হলো।জনের গায়ের জামা ছিঁড়ে নিলো শাহরান।আঘাত করলো সমস্ত শক্তি খাটিয়ে।এরপর হিসহিস করে বলে উঠলো

“আ উইল কিল ইউ।

শাহরান জন কে মাটিতে ফেলে জনের বুকের উপর বসে তুলে নিলো একটা পাথর ।থেতলে দিতে চাইলো জনের মাথা।কিন্তু জনকে টেনে নিচ থেকে ছাড়িয়ে নিলো জনের বন্ধুরা।হাঁপিয়ে উঠলো শাহরান।কয়েকজন মিলে তাকে ধরাধরি করে শাহরান কে সরিয়ে ঠেলে ঠুলে তাঁবুতে পাঠালো।নিনাদ এতক্ষন নীরব দর্শক ছিলো।সে জানে শাহরান কেন হঠাৎ এমন উন্মাদ হয়ে উঠেছে।গত রাতে শাহরান যখন রোদ কে পাইন ফরেস্ট থেকে এখানে নিয়ে আসে তখন কেউ শাহরানের অগোচরে ঢুকে পরে শাহরানের ফরেস্ট হাউজে।মানুষটা বোধ হয় হৃদয়হীন।নয়তো শাহরানের বাবার দেয়া এত দামি গিটার টা কিভাবে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করতে পারে?নিজের সবচাইতে পছন্দের প্রিয় জিনিসের এমন হাল সইবে কোন রক্তে মাংসে গড়া সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ?নিনাদ নিজের ধরে আসা মাথায় জনের কাছে এগিয়ে গেলো।গিয়ে জনের লাইটার টা জনের উপর ছুড়ে ফেলে কটাক্ষ করে বলে উঠলো

“অপরাধ করার খুব খায়েশ থাকলে প্রমান লোপাট করে তারপর অপরাধ করবে।নয়তো প্রাণে মরবে।

নিনাদ চলে গেলো।শাহরানকে সান্তনা দেবার ভাষা তার নেই।সারফরাজ এই ঘটনা জানলে সে নিজেই এসে জনের উষ্ণ র*ক্তে স্নান করবে।নিনাদ আড় চোখে রোদ কে দেখলো।মেয়েটার কুনুই আর গলার নীচে ছিলে গেছে।ফর্সা চামড়ায় মুহূর্তেই কেমন দগদগে রূপ নিয়েছে ক্ষত গুলো।নিনাদ পা চালিয়ে চলে যেতে চাইলো।কিন্তু বিবেক বাধা দিল।বেশি বুঝদার এই মেয়েকে দুটো কথা না শোনালে মন শান্তি পাবে না।তাই নিনাদ পকেটে থাকা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেড রোদের পানে এগিয়ে বলে উঠলো

“সব কিছুর ভেতর নিজেকে মাখানো বন্ধ করো।বড় ভাই হিসেবে এর চাইতে ভালো উপদেশ আমি আর দিতে পারছি না আপাতত।

নিনাদের পানে অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে রইলো রোদ।দিনকে দিন সে যেনো অন্য এক শাহরান কে আবিস্কার করছে।যেই শাহরানের পুরোটাই ক্রোধ, জেদ, হিংস্রতা দিয়ে ভরা।

নিনাদ চলে যেতেই জন হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো।তার মন হিংসা আর প্রতিশোধের আগুনে জলে উঠলো।শাহরানকে চূড়ান্ত কষ্ট দিতে মনটা নেচে উঠলো।সবাইকে যার যার তাঁবুতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের বিছানায় এসে হাটু ভাঁজ করে বসলো সে।সারা শরীরে প্রচুর ব্যথা।গলা দিয়ে না চাইতেও কোকানো ধ্বনি নির্গত হচ্ছে।শীতের সন্ধ্যায় মার গুলো মাংসে না লেগে সরাসরি হাড্ডিতে লেগেছে যেনো।জন নিজের ক্ষত গুলো একবার পরখ করে ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত জিভ দিয়ে চেটে বলে উঠলো

“কাল তোকে পঙ্গু বানিয়ে ছাড়বো বাস্টার্ড।


ঘন ঝাপসা কুয়াশার ধুম্রজাল ছেয়ে নিয়েছে পুরো বৈকাল হ্রদ।চারপাশে যেনো নীরব অশরীরি হিসহিস বাতাসে শব্দ তুলে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছে।এই বাতাস ভেদ করে কারোর নাকের নিশ্বাস পর্যন্ত কানে লাগছে না।চারপাশে ঘোর অন্ধকার যুক্ত নীরবতা।শুধু পাইন ফরেস্টের গহীন থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সঙ্গে ভয়ানক প্রাণীর হুংকার।
এমন ভয়ানক পরিবেশে জন নিজের মনোবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে সন্ত্পর্নে নিজের তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো।শরীরের জখম গুলো শীতে টনটনে ব্যথায় কাতর করে নিচ্ছে।কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা করলো না জন।হাতে একটা ধারালো চাকু নিয়ে রোদের তাঁবুর দিকে এগুলো সে।জন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো শুরুতেই প্রিয়ন্তী মেয়েটাকে চিরতরে ঘুম পাড়াবে সে।এরপর হাতের ক্লরোফার্ম দিয়ে জ্ঞান শূন্য করে রোদ কে নিয়ে যাবে পাইন ফরেস্টের গহীনে।এরপর মিটাবে নিজের আদিম প্রবৃত্তি।না না মেয়েটাকে সেসময় মোটেও এমন নির্জীব রাখবে না।ফিরিয়ে আনবে হুঁশে ।জনকে দেখে ভয়ে যখন মেয়েটা নিজেকে গুটিয়ে বাঁচার জন্য ছটফট এবং চিৎকার করবে সেসময় নিজের আনন্দ পুরোপুরি আস্বাদন করবে জন।

মনের কুৎসিত ভয়ানক ভাবনা কল্পনা করতে করতে গোলাপি ঠোঁট জোড়ায় ক্রুর হাসি ফুটিয়ে রোদের তাঁবুর সামনে এসে দাড়ালো জন।তাঁবুর দরজায় হাত দেবার আগেই লম্বা এক ছায়া গ্রাস করলো জনকে।সেই ছায়ার তপ্ত শ্বাস পুড়িয়ে দিলো জনের শরীর।কি ভয়ানক সেই শ্বাসের শব্দ!যেনো ক্ষুধার্ত অ্যানাকোন্ডা ।জন প্রথমে ভাবলো শাহরান।কিন্তু আগন্তুকের শরীরে অপরিচিত গন্ধ।শাহরানের শরীরের গন্ধ নয় এটা।জন আকস্মিক এহেন ভয়ানক ছায়ার আগমনে ভীত হলো।পেছন ফিরে দেখতে চাইলো অচেনা উপস্থিত আগন্তুক কে।কিন্তু তার আগেই ভেসে উঠলো রক্ত হীম করা ঠান্ডা ভারী গলা

“ইউ হ্যাভ টু ডাই!

জন কেঁপে উঠলো এমন ঠান্ডা স্বরে।জনের দুই কান পূর্বে কখনো এমন শীতল নীরব গর্জন শুনেনি।জন কম্পিত শরীরে পেছনে ফিরলো।নিজের চাইতে আরো হাত দেড়েক উঁচু ব্যক্তিকে দেখে জন ভয়ে ভয়ে শুধালো

“হু আর ইউ?

প্রশ্নের সাথে সাথেই কাঁপন ধরানো হীম বাতাসে ভেসে এলো নাটকীয় গম্ভীর গলার স্বর

“ইউর ডেথ।”

জন ফাঁকা ঢোক গিললো।এই বরফ ঝরা শীতে তার চিবুক গড়িয়ে ঘাম ছুটলো।গোলাপি ঠোঁটের উপর বিন্দু বিন্দু ঘর্ম বিন্দু।জনের গলবিল চৈত্রের ফাটা শুষ্ক মাঠের ন্যয় চৌচির হলো।কন্ঠনালী সামান্য ভেজাতে জন সেই ঠোঁটের উপর জমা নোনতা ঘর্ম বিন্দু লেহন করে পালাতে চাইলো।কিন্তু মৃত্যুর থেকে পালায় কার সাধ্যি?
জন কিছুর সাথে বেঁধে বরফ মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়লো।এরপর সব কিছু নীরবতায় ছেয়ে গেলো।
ধীরে ধীরে যেনো স্বাভাবিক হলো সবকিছু।এরপর সময় গড়ালো।সকলে আরো গভীর নিদ্রায় ডুবে গেলো।শুধু মাঝ রাতে পাইন ফরেস্ট থেকে ভেসে এলো কারো বুক ফাঁটা আর্তনাদ।সেই আর্তনাদ কারো কর্ণকুহরে পৌছালো না।শুধু পাইন ফরেস্টের পশুপাখির দল করুন স্বরে ডেকে ছুটে পালালো।
ভয়ানক নিষিদ্ধ পাইন ফরেস্টে কার আগমন হলো তবে?জন কি বেঘোরে নিজের প্রাণ হারিয়েই ক্ষান্ত হলো?


রাতের শেষ প্রহরে গাইড হুইসেল বাজিয়ে প্রত্যেকের ঘুম ভাঙ্গালো।বাঁশির শব্দে প্রত্যেকে চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে বেরিয়ে এলো।শাহরান গত রাতেই জানিয়েছে সে পাখি দেখতে যাবে না।সে এখান থেকে ফিরে যাবে।তাই শাহরান কে বাদে গাইড সবাইকে গণনা করলো।বার তিনেক গণনা করার পরেও জন লাপাত্তা।গাইড চোখ মুখ শক্ত করে বিরক্তি নিয়ে জনের বন্ধুদের শুধালো

“লাফাঙ্গা ফাজিল ছেলেটা কোথায়?

জনের বন্ধুরা মাথা নাড়ালো।তারা জনের খোঁজ জানে না।

গাইড দাঁত মুখ কামড়ে জোরে জোরে হুইসেল বাজিয়ে জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো।এরপর চারপাশে নজর নিক্ষেপ করলো।মুহূর্তেই গাইডের নজর বিস্ফারিত হলো।জনের একটা জুতো এবং হাতের ঘড়ি সাদা বরফের উপর ঝকঝক করছে।
গাইড দৌড়ে সেগুলো হাতে নিয়ে শাহরানের তাঁবুর বাইরে থেকে ডাকলো

“শাহ!

কোনো আওয়াজ এলো না।গাইড তাঁবুর হুক খুলে ভেতরে ঢুকলো।বিশাল তাবুর কোথাও শাহরান নেই।অথচ শাহরানের তাঁবুর সামনে জনের চিহ্ন।

মুহূর্তেই সকলের মস্তিষ্কে খেলে গেলো গত সন্ধ্যার ঘটনা।আতঁকে উঠলো প্রত্যেকে।শাহরান এর নম্বরে কল করা হলো।নট রিচেবল।নিনাদ সবাইকে বোঝাতে চাইলো শাহরানের বিষয়ে।তারা ভুল ভাবছে।কিন্তু সবাই নিনাদ কে থামিয়ে দিলো।

ধীরে ধীরে ফুটলো দিনের আলো।কারোর পাখি দেখতে যাওয়া হলো না।সূর্যের ফর্সা আলোয় সাদা বরফের উপর রঞ্জন ধারা দেখে সকলের সফেদ মুখ ফ্যাকাসে হলো।কল করা হলো নিকটস্থ পুলিশ।এমন সময় বন্য এক শেয়ালের মুখে এক টুকরো রক্তাক্ত মাংস দেখে ভয়ে শিউরে উঠলো সকলে।সাহসী দুজন ছেলে সেই শেয়াল কে তাড়া করতেই মুখের খাবার ফেলে পালালো শেয়াল।ফেলে যাওয়া সেই মাংস টুকরোর সামনে গিয়ে বমি উগলে দিলো ছেলে দুটো।হাতের রক্তাক্ত ট্যাটু জানান দিচ্ছে এটা জনের হাত।

ঘন্টা দুয়েক পর এলো পুলিশ।নিজেদের স্পেশাল কুকুর নিয়ে ছুটে চললো পাইন ফরেস্ট এ।সকলের মুখ থমথমে।কেউ কেউ ভয়ে অনবরত কাঁদছে।শাহরানের এহেন রক্ত হীম করা নিষ্ঠুরতায় রোদ হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো প্রিয়ন্তী কে জড়িয়ে।
প্রিয়ন্তী যেন আজ নিষ্প্রাণ ,জড় বস্তু।শাহরানের মতো মানুষ এমন ঘৃণিত কাজ করতে পারে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।পুরো দৃশ্যখানা তার কাছে ভ্রম মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে একটু পরেই ঘোর কেটে গেলে সবটা পরিস্কার হবে।

গাইড, টিচার আর স্টুডেন্ট সকলেই ছুটে চললো কুকুরের পিছু পিছু।পাইন ফরেস্টের শেষ মাথায় পাওয়া গেলো জমাট বাঁধা রক্ত।পুলিশ সেই স্থান হলুদ ট্যাপে সিল করে পুনরায় ছুটে চললো কুকুর নিয়ে।ফরেস্টের দক্ষিণ কোণে থামলো কুকুর।এরপর গন্ধ শুঁকে শুঁকে খুঁজে আনলো কাঁটা পা।জায়গা সিল হলো।কুকুর ছুটলো।দীর্ঘ সময় ছুটতে ছুটতে কুকুর থামলো একটি ভাঙা ফরেস্ট হাউজের পেছনে।সেখানে ঘন ঝোপের পেছনে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো কুকুর।
একজন পুলিশ সদস্য কুকুরের ঘেউ ঘেউ অনুসরণ করে দৌড়ে গেলেন।ঝোপের পেছনে মিললো ছিন্নভিন্ন গলিত জনের দেহ।

হাতে গ্লাভস পরে কয়েকজন পুলিশ মিলে তুলে আনলো সেই এলোমেলো দেহ।জনের এহেন কদাকার অবস্থা দেখে চোখ বুজে জ্ঞান হারালো কেউ কেউ।কেউ আবার মুখ চেপে সরে দাঁড়ালো।কেউ শিউরে উঠলো।

এদিকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে ঘুমে টিকতে পারলো না শাহরান।ভোর রাতের দিকে চোখ লেগে এসেছিলো।মাত্রই ঘুমটা গাঢ় হয়েছে।এই গহীন অরণ্যে কুকুরের ডাক পেয়ে সে বেশ অবাক হলো।ধরে আসা মাথার চুল খামচে গত সন্ধ্যার সেই রক্তাক্ত টিশার্ট জড়িয়ে পেছনের দরজা খুললো শাহরান।বেলকনীর ওপারেই পুলিশ সহ সকলেই দাঁড়িয়ে।মুহূর্তেই চোখাচোখি হলো রোদের সাথে।ঘৃণা আর ভয়ে দৃষ্টি সরিয়ে রোদ কম্পিত গলায় বলে উঠলো

“এরেস্ট হীম।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply