Golpo ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ ডিফেন্স রিলেটেড

ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১


ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ

লেখনীতে_সাদিয়া

পর্ব_১

“ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ বেঁচে থাকতে তার চাচাতো বোন কে বিয়ে করবে না সে কখনো। তারউপর ওমন বেয়াদপ আধপাগল মেয়েকে। নেভার।”

আদরের নাতির রুক্ষ গলার কথা শুনে লতিফা বেগম একটু থতমত খেলেন। বুঝলেন ওপাশে নাতি তার ভীষণ ক্ষেপেছে। তাই তিনি নরম হয়ে বলেন,

“ও ভিহান দাদুভাই। আমার সোনা মানিক তুমি রাইগো না। আমার রাহা খুব ভালো তুমি তো জানো শুধু একটু দুষ্টুমি করে।”

“ও যা করে তা দুষ্টুমি বলে না দাদি। ও অত্যন্ত অভদ্র বেহায়া পাজি একটা মেয়ে। ওই বেয়াদপ কে দেখলেই আমার শরীরের রক্ত গরম হয়ে যায়।”

নাতির কথা শুনে লতিফা বেগম মিটিমিটি হাসেন। কন্ঠ নামিয়ে বলেন,

“শরীরের রক্ত গরম হওয়াই তো ভালো দাদুভাই। বউ তো এমন হওয়াই চাই যাকে দেখলে শরীর মন ছলাৎ করে চাঙ্গা হয়ে যায়। রক্ত উষ্ণ হয়ে যায়।”

“দাদি তোমার এসব অহেতুক কথা শুনার সময় নেই আমার।”

“ও ভিহান দাদুভাই আমার লক্ষ্মী সোনা। তুৃমি তো রাহা কে নিয়ে সবটা জানোই। এটাও জানো ওকে কেন তোমার কাছে দিতে চাই। তুমি দয়া করে হ্যাঁ বলে দাও।”

ফোনের ওপাশ থেকে রুদ্র কঠিন আওয়াজে ভেসে আসে, “আর কখনো এই বিষয়ে আমাকে কিছু বললে এবারের ছুটিতেও আমি বাড়ি ফিরছি না।”

আঁতকে উঠেন লতিফা বেগম। নাতি তার প্রায় দেড় বছর হয় বাড়ি ফিরে না। এবারও যদি না আসে? তাই দ্রুততার সাথে বলেন তিনি, “না দাদুভাই এসব বলো না। আমার কথাটা শুনো তুমি।”

ওপাশে থাকা ভিহান বলল, “সরি দাদি আমি এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারবো না। এছাড়া কিছু বললে বলো। নয়তো রাখছি।

“আহহ, দাদুভাই শুনো আমার কথা। তুমি বাড়ি ফিরো। ওসব পরে দেখা যাবে।”

“কোনো পরে টরে নয় শুধু শুনে রাখো এটা এই জীবনে সম্ভব নয়।”

ফোনের ওপাশ থেকে ভিহান একটা নরম মেয়েলি সুর শুনতে পেলো। যে আধোআধো কন্ঠে বলছে,

“দেখো না দাদি হাটুতে ব্যথা পেয়েছি।”

নরম মিষ্টি একটা স্বর। যেন পুরোটা আহ্লাদে গলে যাওয়া। কথাটা কর্ণগোচরে আসতেই কপাল সরু হয়ে গেলো ভিহানের। শুনতে পেলো দাদি জিজ্ঞাস করছেন,

“আমার চাঁন, ব্যথা পেলি কি করে?”

“পেয়ারা গাছে উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়েছি দাদী।”

ব্যস আর কিছু বলতে বা শুনতে হলো না। ভিহানের মেজাজ চড়ে গেলো। কল্পনা করল ষোড়শী এক কিশোরীর কাঁদোকাঁদো মুখ। মেজাজ ক্ষিপ্ত হয়ে বিরক্তি আকাশচুম্বী হলো। হাত কঠিন মুষ্টিমেয় করে দাঁতেদাঁত চেঁপে শুধু ঠোঁট নাড়ালো,

“বিরক্তকর।”

রাহা হয়তো নেকামি সুরে দাদির কাছে মলম আবদার করছিল সেসব কিছু তোয়াক্কা না করে সে গট করে কল টা কেটে দিলো। এখন মেজাজ তার খিটখিটে হয়ে আছে ওই রাবিশ মেয়েটার জন্য। সাধারণ কথাও হয়তো এই মুহূর্তে তার কাছে বিরক্তকরি লাগবে তাই দাদির থেকে বিদায় না নিয়েই কল কেটে দিলো। ফোনটাও ত্যক্ত রূপে ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়।

লতিফা বেগম রাহা কে কাছে ডাকলেন।

“কোথায় ব্যথা পেয়েছিস দেখি।”

তুলতুলে শরীর নিয়ে রাহা আরো এগিয়ে গেলো দাদির কাছে। ঘা ঘেঁষে বসল। পা টা উপরে তুলে বলল,

“এই দেখো।”

“দেখবো কি করে পড়েছিস তো কি জিন্স না পিন্স। ফ্রগের সাথে এসব পড়তে হবে কেন?”

“এখন তুমিও আমায় বকবে? মাও বকে দিলো।”

আহ্লাদী স্বরে বলে রাহা কাঁদোকাঁদো মুখ করল। লম্বা শ্বাস ফেলেন লতিফা বেগম। এই মেয়েকে নিয়ে আসলেই তিনি ভারি চিন্তায় আছে। এমন আহ্লাদী অবুঝ মেয়ে হয়তো ওর বয়সে আর কেউ হয় না। মেয়েটা বয়সের তুলনায় বেশিই নরম সরল সোজা। আর খুব আদুরে। স্নেহ মায়া মমতা ভালোবাসার খুব কাঙ্গাল। এমন না যে বাড়ির কেউ তাকে অবহেলা করে কিংবা কষ্ট দেয়। তবুও মেয়েটা সবার থেকে আদর পাওয়ার জন্যে মুখিয়ে থাকে।

“আচ্ছা বকবো না। তবে মলম দিবো কি করে? পরনের ওসব জিন্সপিন্স খুলে ফেল।”

রাহা বড়বড় চোখ করে বলল, “ছিঃ দাদি তুমি কত দুষ্টু। প্যান্ট খুলতে বলো কেন? মলতব কি তোমার? ইটিসপিটিস করার ধান্ধা নাকি? হু হু?”

লতিফা বেগম মেয়ের বাহুতে মৃদু চড় দিয়ে বলেন, “ন*ডি ভাব দেখাতে আসছে আমার সাথে। সেদিনও না তোকে গোসল করিয়ে দিলাম।”

“দাদি একদম পঁচা পঁচা কথা বলবে না। নয়তো আমি কিন্তু বাবা কে বলে দিবো।”

৬০ বছরের বৃদ্ধা মুখ মুচড়ান।

“ঢং, বাপ চাচার ননির পুতুল।”

রাহা ভাব নিয়ে বলল, “আমি তো পুতুলই। দেখো না পুতুলের মতো দেখতে সুন্দর।”

চাঁদের রঙ এর মতো গায়ের রঙ রাহার। এমন আদুরে মুখে মেয়েটার হাসি দেখে লতিফা বেগমের অন্তর ঠান্ডা হয়ে যায়। তিনি হেসে রাহার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই মেয়েকে বিয়ে দিবেন কোথায় তিনি? বিয়ে দিয়ে থাকবে কি করে বাড়ির সব কটা মানুষ? আবার বাহিরে বিয়ে দিলে হবে জ্বালা। এই মেয়ের হুটহাট আবদার দুষ্টুমি কে সহ্য করবে? এমন আদুরে একটা মেয়েকে তার নাতি ভিহান কেন পছন্দ করে না? সবসময় খ্যাটখ্যাট করে। যেন মেয়েটার জন্মের প্রথম দিন থেকেই ভিহানের এই আচরণের শুরু।

তিনি রাহার থুতনিতে হাত দিয়ে চুমু খান। নরম সুরে বলেন, “আহ্লাদী টা।”

রাহাও মুচকি করে হাসে। পরক্ষণে জিজ্ঞাস করে, “তুমি মনে হয় ফোনে কথা বলছিলে দাদি। কার সাথে কথা বলছিলে?”

বৃদ্ধার ধ্যান ফিরে এতক্ষণে। ফোনের স্কিনে তাকিয়ে দেখে নাতি তার কল কেটে দিয়েছে।

“আরে ভিহান দাদুভাই এর সাথে।”

নামটা শুনা মাত্র বিস্ময়ে চোখদুটি বড় হয়ে যায়। ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চায়।

“ওই জলহস্তী টা তোমায় কল দিয়েছে?”

“এ কেমন কথা রাহা? জলহস্তী মানে কি? এই কারণেই তো ও তোর উপর এত রাগ করে।”

রাহা মুখ ভেংচালো। স্থির কন্ঠে বলল, “তাতে আমার বয়েই গেছে।”

“আর কবে ঠিক হবি তুই রাহা? ওকে কেন শুধু শুধু রাগাস তুই?”

“আমি রাগাই? না উনি এমনি এমনি আমায় সবসময় বকাবকি করে রাগ ঝাড়ে? খাডাস একটা।”

“রাহা আর যদি শুনি এসব..”

দাদির শক্ত কন্ঠ শুনে রাহা চোখ তুলে তাকায়। গাল ফুলিয়ে দিয়ে বলে, “আমার এখন তোমার কাছে আসাটাই ভুল হয়েছে। তুমি বরং তোমার আদরের নাতির সাথে পিরিত করো। লাগবে না আমার মলম।”

রাহা লম্বালম্বা পা ফেলে চলে যেতে লাগল।

“রাহা? শুন কথাটা। মলম দিবি না হাটুতে? রাহা? বোন আমার শুন..”

দাদির আর কোনো ডাক অভিমানি রাহা সাড়া দিলো না। মেয়েটা বড্ড অবুঝ আর জেদি।

খান বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ হলেন লতিফা বেগম। মৃত স্বামীর তিন পুত্র আর দুই মেয়ের জননী তিনি। তিন ছেলে রায়হান খান, আরমান খান, সাদমান খান একসঙ্গেই থাকেন। রাহাদের যৌথ পরিবার। সদস্য সংখ্যাও অনেক। রায়হান খান, উনার স্ত্রী আফসানা। তাদের তিন ছেলে মেয়ে ভিহান, জিদান, রুশমি। আরমান খান, উনার স্ত্রী জাহানারা আর মেয়ে রাহা। সাদমান খান উনার স্ত্রী নিলা তাদেরও তিন ছেলে মেয়ে। বড় মেয়ে কামিলি, এরপর দুই ছেলে সামি, রাফি। তাদের সবাই কে নিয়ে খান পরিবার। শুধু মাত্র চাকরি সূত্রেই ভিহান পরিবার ছাড়া থাকে।

আফসানা বেগম হাক ডাকেন, “রাহা? রাহা মা? কোথায় তুই?”

জিন্স খুলে রাহা ঢোলাঢালা প্লাজু আর লম্বা টপ পড়েছে। গলায় ঝুলছে স্কার্ফ। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। তাকে এভাবে দেখে আফসানা বেগম ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন,

“কিরে রাহা? তোর পায়ে কি হয়েছে? এভাবে হাটছিস কেন?”

রাহা থমথমে মুখ নিয়ে নিচে নামল। আফসানা বেগমের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তার কিছু বলার আগেই পাশ থেকে জবাব দিলো জাহানারা বেগম,

“পঙ্গু সাজতে চাইছে আপা। বেশি ইতরামি করলে এমন হবে না? আমার জীবনটা ভেজে কয়লা করে ফেলছে বজ্জাৎ মেয়েটা।”

“আহ, মেজো বকছিস কেন? হয়েছে কি? কি হয়েছে রে মা?”

রাহার দিকে তাকিয়ে বললেন আফসানা বেগম। তার আগে এবারও উত্তর দিলো জাহানারা বেগম,

“কি আর হবে? বান্দরগিরি করতে গিয়েছিল গাছে উঠে। শয়তান ধাক্কা দিয়ে পঙ্গু হওয়ার পথ সহজ করে দিয়েছে।”

“আহা মেজো এমন করছিস কেন? মেয়েটার সাথে একটু ভালো করে কথা বলতে পারিস না?”

“আর ও যা সব কীর্তি করে বেড়ায় সেটা দেখো না? এত বড় মেয়ে হয়েছে এরপরও শরীরে এখনো ভার স্থির এলো না। সারাক্ষণ বাচ্চাদের মতো করতে থাকে, সারাবাড়ি ছুটোছুটি করে, গাছে উঠে, বাগানে লাফাতে থাকে, এটাওটা ভাঙ্গতে থাকে, ঘর নোংরা করে ফেলে। ওর গুণগান গাইতে গেলে মুখ ব্যথা হয়ে যাবে আমার। তারউপর কিছু বললে আহ্লাদে গলে যাবে। ওর জন্যে ভিহানই ঠিক আছে। একে আমাদের ভিহান বাবাই শায়েস্তা করতে পারবে।”

“এভাবে বলিস না মেজো। ওর জন্যেই তো বাড়িটা ফুরফুরে থাকে। খান বাড়ির প্রাণ যে ও।”

রাহার মুখে হাত বুলিয়ে বলেন আফসানা বেগম। মায়ের বকুনি খেয়ে মলিন মুখে হাসি ফুটে রাহার বড়মার কথায়। এক গাল হেসে বড় মাকে জড়িয়ে ধরে সে। জাহানারা বেগম রাগান্বিত গলায় বলেন,

“আমি আর কি করবো? আমার কথার কি কোনো দাম আছে? বাড়ির কারো জন্যে এই মেয়েকে আমি কিছু বলতে পারি? কিছু বললেই সবার কাছে গিয়ে নালিশ করবে আর সবাই আমাকে কথা শুনাবে। বাড়ির একটা মানুষের জন্যে এই মেয়েকে আমি শাসন করতে পারি না। আহ্লাদ দিয়ে দিয়ে এই মেয়েকে সবাই মাথায় তুলে ফেলেছে। আমার হয়েছে যত জ্বালা।”

জাহানারা বেগম রাগে এসব বলতে বলতে খুন্তি হাতে আবারও চলে গেলেন রান্না ঘরে।

আফসানা বেগম বললেন, “কিরে মা? গাছে উঠিস কেন? কতবার মানা করেছি না গাছে উঠতে? পড়ে গিয়ে যদি বেশি ব্যথা পেতি?”

“আমার কি দোষ বড়মা? পেয়ারা গুলি ডাকছিল আমায়। গাছে পেয়ার হয়েছে তো খাওয়ার জন্যেই। পেয়ারা গাছে রেখে কি করে আমি নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম? আমি তো ভদ্র মেয়ে কারো ডাক কি অগ্রাহ্য করতে পারি?”

আফসানা বেগম মুচকি হেসে আলতো করে রাহার কান ধরে বললেন, “তবে রে বাচাল মেয়ে। পেয়ারা তকে ডাকছিল?”

“বিশ্বাস করো বড়মা পেয়ারা ডেকেছে আমায়। বলছিল কিরে রাহা আমি একা এভাবে ঝুলে আছি আমাকে বাঁচাবি না? আমার জন্যে কি তোর একটুও মায়া হচ্ছে না? ব্যস আমিও পটে গেলাম। আমার তো আবার খুব মায়া দয়া তুমি তো জানো বড়মা।”

রাহার আহ্লাদী মুখ দেখে আফসানা বেগম হেসে উঠেন শব্দ করে।

“হয়েছে এবার বকবক থামা। পাতা বুড়ি একটা।”

রাহা গাল ফুলিয়ে হাসে। আফসানা বেগম হাত টেনে বলেন, “আয়। সাবধানে হাটিস।”

“কোথায় যাবো বড়মা?”

“রান্না ঘরে?”

“রান্নাঘরে?”

“হুম।”

“বড়মা দোহাই লাগে তোমার তুমিও মায়ের মতো বলো না রান্নাবান্না শেখার জন্যে। নয়তো শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এই হবে ওই হবে। আমি রান্নাবান্না পারি না। ওসব পারবো না আমি। আমি তো এখনো ছোট বলো। বাচ্চারা কি রান্নাঘরে যায়? আগে বড় হই পরে রান্না শিখবো।”

“চুপ করবি তুই? সারাক্ষণ কথা না বললে চলে না তোর?”

“কথা না বলে তো আমি থাকতে পারি না বড়মা। কথা বন্ধ করে রাহা থাকতেই পারে না।”

“সেটা কি আর বলতে? রান্না ঘরে আয়। গরুর গোশত রান্না করেছি।”

“কি?”

উচ্ছ্বাস নিয়ে বড় গলায় বলে উঠল রাহা। আফসানা বেগম মুচকি হাসেন।

“গরুর গোশত রান্না করলে তোর আর ভিহানের তো স্বভাব গরম গরম কষাকষা গোশত খাওয়ার। তাড়াতাড়ি আয়।”

লাফাতে লাফাতে রাহা রান্না ঘরে গেলো। তা দেখে জাহানারা বেগম বললেন, “দেখো ইতর মেয়ের কাজ। বাঁদরের মতো কেমন লাফাচ্ছে।”

“মেজো এখন আর কিছু বলিস না মেয়েটাকে একটু শান্তিতে খেতে দে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ বড়মা তাড়াতাড়ি দাও।”

আফসানা বেগম এক বাটি ধোয়া উঠা গোশত দিলেন। রাহা কিচেন কাউন্টারের উপরে উঠেই এক টুকরো গোশত ফু দিয়ে মুখে তুলে নিলো। প্রচণ্ড গরমে মুখে আর রাখতে না পেরে আবারও সেটা প্লেটে ফেলে মুখ হা করে হু হা করতে লাগল।

“আস্তে” বলে আফসানা বেগম রাহার মুখে ফু দিতে লাগলেন। জাহানারা বেগম ক্ষিপ্ত সুরে বললেন, “এত যে লাই দাও এই মেয়েকে। দেখেছো ওর কান্ড? ওই মেয়ে কি রাখডাক করেও খেতে পারে না?”

আফসানা বেগম বলেন, “আস্তে খা মা। ফু দিয়ে একটু ঠান্ডা করে নে আগে।”

“এত লোভনীয় লাগছে। ঘ্রাণ টা আহ..!”

জিদান এসে রাহার পাশে দাঁড়ালো। বলল,

“কিরে পিচকু একাই খাচ্ছিস নাকি ভাইয়া কে রেখে?”

রাহা গোশত মুখে চিবাতে চিবাতে পাশ ফিরে তাকায়। জিদান ততক্ষণে ওর বাটিতে হাত দিয়েছে। গোশত মুখে নিয়েই বলে উঠল রাহা,
“ভাইয়া এখানে কিন্তু আমার মুখের ফেলানো গোশতের টুকরা আছে। তুমি..”
বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই জিদান “হোপ” বলে ধমকে উঠল। আবারও আগের মতো হাত বাড়িয়ে এক টুকরো গোশত মুখে নিয়ে রাহার দিকে তাকালো। আঙ্গুল গোল করে বুঝালো, “বোনু সেই হয়েছে।”

ভাইয়ের ভাব দেখে মুখ ভর্তি গোশত নিয়ে হাসে রাহা। জিদান ভাইটা কত্ত ভালো। তাকে একেবারে নিজের বোনের মতো আদর করে। আর ওই ভিহান খাডাস টা? সবসময় তার সাথে খেঁখ খেঁখ করে। নাকের আগায় রাগ নিয়ে ঘুরে। কিছু হতে না হতেই সাপের মতো ফোঁস করে উঠে। রাহা মনে মনে ভেংচায় লোকটাকে। পরক্ষণে ভাই এরদিকে তাকিয়ে হাসে।

হেলতে দুলতে রুশমিও চলে আসে রান্নাঘরে। ওদের দুইজন কে দেখে বলে, “কিরে তোরা কি করছিস এখানে?”

জিহাদ বলল, “তুই এখানে আসলি কেন? এখন আমাদের ভাগে কম পড়বে না? যা ভাগ।”

“ভাগবো মানে? আমাকে রেখে কি খাচ্ছো তোমরা ভাইয়া?”

“মধু মধু।”

জিদান রুশমির মাঝখানে রাহা বলল, “কষা মাংস খাচ্ছি আপু। পুরা মধু।”

“আমাকেও দে।”

“চলে এসো।”

জিদান আর রাহার সাথে এবার রুশমিও যোগ দিলো। বাড়ির ছোট বউ নিলা চুপচাপ রান্নার কাজে ব্যস্ত। রাহা বলে উঠল, “সামি রাফি কোথায় ছোট মা?”

তিনি রাহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন, “আছে হয়তো নিজের ঘরে।”

রাহা গলা চেঁচিয়ে বলল, “সামিইই, রাফিইই?” পাশে থাকা রুশমি আর জিদান মুখ কুঁচকে নেয়। খাওয়ার ফাঁকে জিদান বলে, “বোনু? এটা তোর গলা নাকি মাইক?”

রুশমি জবাব দিলো, “বাঁশ।”

জিদান বলল, “মনে হচ্ছে আব্বুর এবারের চেয়ারম্যানের নির্বাচনে টাকা খরচ করে মাইক আনতে হবে না আমাদের পিচকুর খালি গলাই যথেষ্ট।”

“কান ঝালাপালা করে দিবে ভাইয়া।”

“ধানিলংকা না আমার বোন?”

রাহা হাসল। সামি রাফিও যোগ দিলো তাদের সাথে কষা গোশত খেতে। আফসানা বেগম পাতিল থেকে আবারও বাটি ভর্তি করে দিলেন মাংসের টুকরো। নিলা বেগম বললেন, “বড় আপা তরকারি তো কষানোতেই শেষ হয়ে যাবে। মনে হচ্ছে আবারও বসাতে হবে মাংস।”

আফসানা বেগম বলেন, “থাক মানা করিস না ছোট। ছেলেমেয়ে গুলি একটু আনন্দ করে খাক। ফ্রিজের বাকি গোশতটাও ধুয়ে ফেল। কাল না হয় রহিম কে দিয়ে দশ বারো কেজি আনিয়ে নিবো।”

রাহাদের দিকে তাকিয়ে বলেন তিনি, “কিরে? তোদের আরো লাগবে?”

“আমি তো এমনিতেই লোভী মা। কেউ কিছু দিলে না করতে পারি না।”

জিদানের কথায় হেসে উঠেন আফসানা বেগম।
“পাজি কোথাকার” থামেন তিনি। “কিরে? কামিলি কোথায়? ওকেও ডাক।”

নিলা বেগম তৎক্ষণাৎ বলে উঠেন, “থাক না আপা। ওর হয়তো শরীর খারাপ।”

“সেকি? জ্বরটর এলো নাকি মেয়ের?”
বললেন জাহানার বেগম।

“তেমন কিছু না বলছিল একটু ক্লান্ত।”

মা চাচির কথা শুনে রুশমি আড়চোখে রাহার দিকে তাকায়। গাধা মেয়েটা খাওয়ায় ব্যস্ত। কিন্তু কামিলির বিষয়টায় সে বোধহয় একটু আঁচ করতে পারল।

ভিহান নিজের ফ্ল্যাটে ল্যাপটপে বসে কাজ করছিল। গুরুত্বপূর্ণ একটা ফাইল তৈরি করছে সে। বর্তমানের কিছু আপডেট ইমেডিয়েট পাঠাতে হবে উপরমহলে। কালকেই কল করেছিল মেজর ইদরাদ নেওয়াজ। ভরাট গলায় ইনফরমেশন চাইছিল। আজ না দিতে পারলে গম্ভীর রাগী লোকটা নির্ঘাত ফেটে যাবে।

গোধূলির হাওয়া বইছিল। জানলার পর্দা পেড়িয়ে হাল্কা গায়ে লাগছিল সেই হাওয়া। পাশে থাকা কাউচের উপর পড়েছিল ফোনটা। হঠাৎ সেটা বেজে উঠল। কল দিয়েছে তার টিম মেম্বার আরাফ। কপাল কুঁচকে সে দ্রুত কল রিসিভ করল। আরাফ দ্রুততার সাথে বলল,

“স্যার ইমেডিয়েট একটু হাইওয়ের রাস্তায় আসেন। আমি ওদের চোখে চোখে রাখছি।”

মস্তিষ্ক সচল হয়ে গেলো ভিহানের। সে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালো। “আম কামিং” বলেই কল কেটে দিলো। কার্বাড থেকে হাল্কা ওলিভ রাঙ্গা এক কালারের শার্টটা গায়ে দিয়েই সে চাবি নিয়ে বের হয়ে গেলো। কোথায়, কোন হাইওয়ে কিছুই জানতে হলো না তার। কারণ নির্দিষ্ট এড়িয়ায় কাজ করছে তারা। দ্রুত ফ্ল্যাটের দরজা লক করে বের হয়ে গেলো সে।

“ভিহান কে দিয়ে এত এত আশার কি হচ্ছে এখন? কি করছে সে? আমাদের কোনো আশার দাম আছে তার কাছে? ঢাকায় বসে কি করে ও?”

সকাল তখন ৯ টা বাজে। রাহা মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। হাই তুলতে তুলতে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় চাচাদের কথা শুনতে পেলো সে।
রায়হান খান বিরক্ত সুরে নিজের ছেলেকে নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। পাশ থেকে ছোট চাচা সাদমান খান বললেন,

“ভাইজান উত্তেজিত হবেন না আপনি। শান্ত হোন।”

“আমাকে শান্ত হতে বলছিস? কি করে শান্ত হবো আমি? এত আশা করেছিলাম ছেলেকে নিয়ে। বাহিরে লেখাপড়া করালাম ভাবলাম ছেলে আমাদের এতএত ব্যবসা বাণিজ্য সামলাবে। তা না করে সে কি করছে? কি না কি চাকরি করে যাচ্ছে সেই কয়েক বছর ধরে।”

বড় ভাইয়ের কথা শুনে মেজো ভাই আরমান খান বলেন, “ভাইজান ও তো আর ওখানে বসে নেই। চাকরিবাকরি করছে।”

“তোমরা আর ওর হয়ে কথা বলো না। চাকরি করছে। কিসের চাকরিবাকরি করছে? কিছু জিজ্ঞাস করলে বলে সরকারি চাকরি। আরে সরকারি চাকরি কি কম আছে দেশে? কোন চাকরি কেমন চাকরি কি কাজ কিছুই বলে না কাউকে। বাপ চাচার ব্যবসা রেখে উনি মানুষের গোলামি করে।”

রাহা সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়েই মুচকি হাসে। বড় আব্বু লোকটাকে বকছে শুনে সে বেশ খুশি হয়। ভাব কত সাহেবের। ইশশ বড় আব্বু যদি এভাবে লোকটাকে কথা শুনাতে পারতো সামনাসামনি।

“ভাইজান আপনি..”

“আমাকে কিছু বুঝাতে হবে না আরমান। ও কি চাকরি করছে তাতে আমার মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু আমার কথা হলো এখান থেকে ঢাকা কতদূর? কি এমন চাকরি করে যে বাড়িতে আসতে পারে না? কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান ইদ কোনো কিছুতেই তাকে পাওয়া যায় না কেন? কি এমন সরকারি চাকরি যে দেড় বছর হয়ে যায় সে আসতে পারে না নিজের বাড়ি?”

রায়হান খান বেশ উত্তেজিত হয়ে গিয়েছেন। তাই আর কেউ কথা বাড়াল না। লতিফা বেগমও বড় ছেলের হম্বিতম্বিতে সোফায় চুপচাপ বসে আছেন।

“বাড়িতে এত এত মানুষ। নিজের বাবা মা ভাই বোন রেখে ঢাকার ওই ফ্ল্যাটে কি আছে ওর?”

লতিফা বেগম এবার নরম সুরে বলেন, “এবার থাম বাপ। ছেলেটা এতদিন পর আসছে কোনো অশান্তি করিস না।”

“হ্যাঁ আমার মাথা কিনে নিয়েছে তো। এতদিন পর তোমার আদরের বড় নাতি আসছে বলে আমাকে এবার লুঙ্গি পড়ে নাচতে হবে।”

বড় ভাই এর কথা শুনে আরমান এবং সাদমান খান ঠোঁট টিপে হাসেন। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে রাহাও হাসে। রান্নাঘর থেকে স্বামীর কথা শুনতে পেয়ে ছুটে এলেন আফসানা বেগম।

“এসব কেমন কথা তোমার? কোন বয়সে কোন কথা বলতে হয় সেটাও ভুলে যাচ্ছো নাকি তুমি? আম্মা আপনি কিছু বলছেন না কেন?”

“ভুলে তো যাচ্ছিই। বয়স হয়েছে ভুলবো না? দুদিন পর তোমার বড় ছেলে আমাকে পাগল বানিয়ে পাবনা পাঠিয়ে দিবে। তখন তোমাদের শান্তি হবে।”

“এতদিন পর আমার ছেলেটা বাড়ি আসছে আর তার আগেই তুমি শুরু করে দিয়েছো।”

“আমার ভুল হয়েছে মহারানি। আপনি আপনার আদরের ছেলের আসার উপলক্ষ্যে গরু জবাই করুন।”

আফসানা বেগম রাগি চোখে তাকান স্বামীর দিকে। পাশ থেকে শাশুড়ি ইশারায় বুঝান চুপ থাকতে। তাই তিনি কটমট করে আবারও চলে যায় রান্না ঘরে।

রাহা স্তব্ধ হয়ে থাকে সিঁড়ির কাছে। নিজের কানে শুনা কথাও বিশ্বাস করতে পারে না সে। তাই দ্রুত ছুটে যায় বড়মার কাছে।

“বড় মা একটু আগে কি বললেন?”

কপাল কুঁচকে জানতে চান আফসানা বেগম, “কি বললাম?”

“ওই যে কে আসবে যেন বললে?”

তিনি তৃপ্তির হাসি হেসে জবাব দিলেন, “আমাদের ভিহান আসছে আজ।”

রাহা একেবারে বিমূঢ় হয়ে গেলো। মনে হলো কিছুক্ষণ সে বরফের মতো জমে গেলো। ওই খাডাস লোকটা কেন আসছে বাড়িতে? হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড় করে রাহা,

“তোমাদের ভিহান নয় আমার জম আসছে।”

চলমান…
আসসালামু আলাইকুম ডিফেন্স রিলেটেড নতুন গল্প নিয়ে হাজির হলাম। টুইস্ট কাজিন খুনশুটি আর একশন নিয়ে লেখা আরেকটা ডিফেন্স রিলেটেড গল্প। রেসপন্স পেলে কন্টিনিউ করবো ইনশাল্লাহ নয়তো ডিলিট করে দিয়ে নতুন গল্প দিবো। অবশ্যই সবাই মতামত দিবেন। আর পেইজের রীচ একেবারে ডাউন তাই সামনে গেলে একটা রিয়েক্ট করবেন আর বেশিবেশি শেয়ার করবেন সবাই। ভালোবাসা♥
হ্যাপি রিডিং🥰

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply