Golpo ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ ডিফেন্স রিলেটেড

ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ২৪


#ক্যাপ্টেন_ভিহান_আরভিদ

#লেখনীতে_সাদিয়া

#পর্ব_২৪

সবাই সাড়া দিবেন।

সর্ব প্রথমে লম্ফঝম্ফ করা ছেলেটা এতক্ষণ রাস্তায় শুয়ে কাতড়াচ্ছিল। বুকের উপর আড়াআড়ি ভাবে ছু ড়ি দিয়ে কা’টা স্থান টা খুব বেশি গভীর হয়নি। যেন কোনো ডাক্তার মেপেঝেপে অপারেশন করার জন্য কে’টেছে। তবে অনেকটা জখমও হয়েছে। র ক্তও বের হচ্ছে। এতক্ষণ মরার মতো রাস্তায় চিত হয়ে শুয়ে গলাকা’টা গরুর মতো ধাপিয়েছে। যেই দেখল হাতের খুব কাছে একটা ছু’ড়ি পড়ে আছে রাস্তায় আর মেয়েটাও প্রায় কাছেই। তাই ভেতরে টগবগ করা রাগটা আর থামাতে পারলো না। হিংস্রাত্মক ভাবটা তাই শরীরের আ’ঘাতকেও ছাড়িয়ে গেল। পাশে থাকা ছু’ড়িটা তুলে নিয়ে ক্ষিপ্ত মনোভাবে মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিলো ভয়াল এক আ’ঘাত করার উদ্দেশ্যে।

সৌভাগ্য বশত আচমকা ভিহানের চোখে এমন একটা দৃশ্য পড়তেই ওর চোখ কৌটর থেকে বের হওয়ার উপায়। তড়িতে মস্তিষ্কও কেমন সচল হয়ে ওঠল। একেবারে ঝড়ের বেগে রাহাকে এক হাত দিয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে ঘুরিয়ে নিলো আরেক হাত দিয়ে ছেলেটার কব্জি বরাবর আ’ঘাত করার উদ্দেশ্যে হাতটা বাড়িয়ে দিলো ছু’ড়ির দিকে।

বলবান হাতের এক আ ঘাতে ছু’ড়িটা ছিটকে পড়ার আগেই কচ করে একটা শব্দ হলো। মুহূর্তে চোখমুখ খানিকটা কুঁচকে নিলো ভিহান। ছু’ড়িটা দূরে গিয়ে পড়ল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটলো যে রাহা কিছুই বুঝতে পারলো না। নির্বিকার ভাবে শুধু ভিহান ভাই এর উমে জড়িয়ে থাকলো অবুঝের প্রাণহীন বস্তুর মতো।

ডান হাতের নিচে বুকের সাথে লেপ্টে আছে রাহা। ওদিকে বা হাত দিয়ে টুপটুপ করে কিছু ঝড়ছে তা বেশ অনুভব করলো ভিহান। তবুও আর চুপ রইলো না। এক অশনি চাউনি দিয়েই ছেলেটার বুক বরাবর প্রকাণ্ড লা’থি দিয়ে ওঠল। কা টা জখমে এক সর্বনাশী লা’থি খেয়ে ছেলেটা সত্যি আর দাঁড়াতে পারলো না। আবারও রাস্তায় ঢলে পড়ল।

রাহা বোবা প্রাণীর মতো চুপটি করে রইলো। বিকার অনুভূতি শূন্য একটা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো ও। চোখের চাউনি স্থির। যেন এসব কিছু তাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছে। ওর অবস্থা দেখে খানিক ঘাবড়ে গেলো ভিহানের। কলিজা মুচড় দিয়ে ওঠল। ডান হাত দিয়ে ওর গাল স্পর্শ করে বলল,

“নাথিং এলস, জান। আমরা বাড়ি ফিরবো, হুম?”

ভিহান আর সময় নষ্ট করতে চাইলো না। এভাবেই মেয়েটা ওর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা একটু আগেই কাটালো। নয়তো খান বাড়ির সন্তান রা একেকটা যত্নের চাদরে মুড়ে থেকেছে। বিশেষ করে ভিহান এই মেয়েটাকে ছোটবেলা থেকেই আগলে বড় করেছে। পারেনি শুধু ও কলিজায় ঢুকিয়ে রাখতে মেয়েটাকে। অথচ..

ভিহান ওর কব্জি চেঁপে ধরল। পিছন ঘুরে এক পা বাড়ালেও অনুভব করল রাহা এখনো পাথরের মতো ঠাই দাঁড়িয়ে রইল শূন্যে তাকিয়ে। ভিহানের অপরাধ বোধ ভেতরটা হাহাকার করে তুলল। শুকনো ঢোক গিলে বাড়ানো পা টা আবারও রাহার দিকে এগিয়ে নিলো। খুব ক্ষীণ নরম সুরে জানতে চাইল, “পারবি আদুরী?”

প্রশ্নটা করলেও রাহা উত্তর দিতে পারলো না। মেয়েটা ভেতরে ভেতরে যেন ফুঁপিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাহির থেকে এক টুকরো জমা বরফ খণ্ড। নিজের উপর উঠা রাগটা সামলে নিয়ে ভিহান আর কোনো কথা বাড়ালো না। খানিক ঝুঁকে রাহা কে পাজোকোলে তুলে নিলল। এইটুকুন রাস্তা অথচ ভিহান যত্ন করে নিজ প্রেয়সী কে কোলে তুলে নিয়ে আসলো বাইকের সামনে।

আস্তে করে নামিয়ে দিয়ে বাহু ধরে বসালো ওকে। মেয়েটা এখনো স্থির নিশ্চল। যেন প্রাণহীন কোনো বস্তু। চোখের চাউনি স্থির নিষ্পলক।

“ঠিক আছিস তো আমার জান?”

বলতে বলতে ভিহান ওর আপাদমস্তক চোখ বুলালো। ওকে ঠিক দেখেই ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছাড়ল ও। অথচ একবারও খেয়াল করলো না এতক্ষণ পর নিরলস ক্লান্ত একজোড়া নেত্র এক রাশ প্রশ্ন নিয়ে ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

দুই হাতের তালুতে রাহার ছোট্ট আতঙ্কিত নিষ্প্রাণ মুখটা তুলে নিয়ে ওর কপালে চুমু দিলো। পরপরই দুই হাত দিয়ে বুক গহীনে ঝাপটে ধরল কিশোরী কে। বাইকে বসে থাকা রাহার মাথাটা দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ভিহানের বুকের মাঝ বরাবর গিয়ে ঠেকেছে। মাথাটা শক্ত কে ওর বুকে চেঁপে ধরে অপরাধী কন্ঠে বিড়বিড় করল ভিহান,

“আমার আদুরী, লক্ষ্মী জান আমার। খুব করে ভুল হয়েছে আমার। বড্ড সরি। প্লিজ তুই নরমাল বিহেভিয়ার দেখা। দেখ আমার হৃদপিন্ড টা কি করে লাফাচ্ছে।”

রাহা সত্যি করে খেয়াল করলো লোকটার বুকের ভেতরটা বেসামাল ভাবে ধুকবুক করছে। ওখানে যেন উথাল ঝড় বইছে। বুকের উঠানামার গতিটা তীব্র হাপানোর মতো।

“তুই নরমাল হো আদুরী। নয়তো আমার অশান্ত বুকের ভেতরটা শান্ত হবে না। প্লিজ জান, ডু দিজ।”

বেশ কিছুটা সময় পার হলো। ভিহান নিজেকে সামলে নিলেও খেয়াল করলো রাহা এখনো তার বুকের সাথে নির্বিকার ভাবে মিশে আছে। ভিহান বুঝল অবস্থা বড্ড খারাপ। এই পরিস্থিতি আরেকটু পর তার হাতের নাগালের বাহিরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।

রেস্টুরেন্ট থেকে খিচুড়ি নেওয়ার সময় ওয়েটার কে বলেছিলো এক বোতল মিনারেল ওয়াটার দিয়ে দিতে। পাগলি টা আবার কখন জ্বালাতন শুরু করবে গলা শুকিয়ে গিয়েছে বলে। এই রাত বিরাতে পরে বিপাকে পড়বে ভেবেই বলেছিলো। এটা এখন কাজ লাগছে। বোতলটা নিয়ে থমথমে মুখে ভিহান নিজেই রাহার মুখের সামনে ধরল। রাহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ভিহান কিচ্ছুটি বলল না। ইশারা দিয়ে বুঝালো মুখে নিতে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে রাহার। তাই সে আর অমত করলো না। ভিহান ভাই এর হাত ধরেই এক ঢোক পানি মুখে নিলো। আরেক ঢোক নেওয়ার সময় রাহা হঠাৎ খেয়াল করলো ভিহান ভাই এর বাম হাতের তালুতে র ক্ত লেগে আছে। থকথকে র ক্ত কেমন ঝলকে উঠছে। কিছু সময়ের জন্য আঁতকে ওঠল রাহা। কলিজা মুচড় দিয়ে ওঠল ওর। ভ্রুকুটি করে বোতলটা ঠেলে নিয়ে নিঃশব্দে দুইহাতে ভিহান ভাই এর বাম হাতটা নিজের কাছে নিয়ে এলো। এর নৈঃশব্দ্যে করা কাজ দেখে ভিহানের কপালও কুঁচকে গেলো খানিক। সেও চুপচাপ দেখে গেলো মেয়েটার অভিব্যক্তি।

হাতের তালুর শেষভাগে কিছুটা আ ঘাত লেগেছে। খুব বেশি গভীর না। তবে এতটা ছোটও না। বেশ কিছুটা কে’টেছে বিধায়ই র ক্ত এখনো থলথল করছে জায়গায়টায়। রাহা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। মুখ তুলে তাকালোও না ভিহান ভাই এর দিকে। আর না তো এক ফোঁটা কান্না করলো। মেয়েটা আসলেই যেন বরফের আবরণে জমে গিয়েছে। বিষয়টা ধাক্কা দিলো ভিহান কে। সে সন্দিগ্ধ শঙ্কিত নয়নে ভ্রুজোড়া কুঁচকে কেবল তাকিয়ে রইল রাহার আদুরে শুকিয়ে যাওয়া মুখটার পানে।

রাহা সেকেন্ড কয়েক চুপচাপ যান্ত্রিক বস্তুর মতো কাটা হাতটার দিকে তাকিয়ে রইলো। অবশেষে একটু আগে বেঁধে দেওয়া ভিহান ভাই এর রুমালটা এক টানে চুলের গোড়া থেকে টেনে বের করে নিলো। থমথমে নিষ্প্রভ মুখে রুমালের গিটটা খুলে সেটা আবার ভিহানের হাতেই সুন্দর করে বেঁধে দিলো। এত সময়েও ভীতু মেয়েটা একটা টু শব্দ করলো না। এত বড় একটা ঘটনা কি ওকে পাথর বানিয়ে দিলো?

ভিহান সইতে পারলো না। ভেতরটা তার উন্মাদ উন্মাদ লাগছে। বুকের মাঝে জ্বালা দেওয়া এই অন্তঃদহন আর সামলে উঠতে না পেরে অদম্য সৈনিকটাও অসহায়ের মতো পরাজয় বরণ করে হাটু গেড়ে ধপ করে বসে পড়ল রাস্তার উপর। রাহা তখনো বাইকের উপর নির্বিকার ভাবে অনুভূতি শূন্য তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর দিকে।

ওমন নির্জন খোলামেলা জায়গায় ভিহান হাটু গেড়ে রাস্তায় বসেছে তার অন্তরের মালকিনের সামনে। চোখে মুখে নির্লিপ্ত অসহায় আর অপরাধ বোধ। আকাশে ছিড়িছিড়ি বৃষ্টিটা অনেকটা কমে গিয়েছে বললেই চলে। আশেপাশে ঠান্ডাঠান্ডা বাতাস বইছে। দূর থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। অদ্ভুত অন্যরকম শীতল একটা পরিবেশ। এত কিছুর পরও ভিহানের হৃদয় শান্ত হলো না। হাটু মুড়ে রাহার সামনে বসে ওর কোলের উপর রাখা হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিলো। কাতর ভেঙ্গে আসা কন্ঠে বলল,

“এই আদুরী, তাকা না আমার দিকে। দেখ আমার ভেতরটা পু’ড়ছে। নিজেকে উন্মাদ লাগছে। এক রত্তি শান্তি পাচ্ছে না তোর জাঁদরেল টা। তুই প্লিজ আমাকে একটু শান্ত কর জান। শুধু একটু স্বাভাবিক আচরণ কর। বোকা বোকা হাসির সাথে অবান্তর কিছু বকবক কর তাহলেই আমি ঠিক হয়ে যাবো। আমাকে একটু ঠিক কর না আদুরী।”

রাহা নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। কিচ্ছু বলল না। তার সামনে বসে থাকা মানুষটার চোখে মুখে নির্লিপ্ত অসহায় বোধ আর কাতরতা। দেখেই বুঝা যাচ্ছে ভেতরের অশান্তি উদ্বিগ্ন ভাব লোকটার বুক ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। রাহা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। কিছু বুঝলো না মস্তিষ্কে কিছু ঢুকলোও না। সত্যিসত্যি পাথরের মতো বসে রইলো।

কিছু সময় এভাবেই অতিবাহিত হলো। অতঃপর রাহা প্রাণহীন শুষ্ক গলায় বলল, “আমাকে বাড়ি নিয়ে যান।”

ওর শুকনো জমে থাকা মুখ দেখে ভিহানের সব কিছু তছনছ হয়ে গেলো যেন। ভেতরে এক রাশ অশান্তির ঝড় আর চাঁপা যন্ত্রণার খনি নিয়ে নিজেকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলো। আর কোনো শব্দ নিজেও খরচ করলো না সে। অদ্ভুত শীতলতা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। রাহা চুপচাপ বাইকের দুই পাশে পা দিয়ে বসল। ভিহানও উঠে বসল বাইকে। চাবি ঘুরানোর আগে হঠাৎ হীম শীতল কন্ঠে বলে ওঠল,

“তোর ওড়নাটা দেওয়া যাবে?”

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল রাহা। কোনো সাড়াশব্দ করলো না। যেন নিজ মনে কিছু বুঝে উঠার চেষ্টা করল। ভিহানও বেশি ঘাটলো না। সময় গড়িয়ে যেতেই রাহা নিঃশব্দে কাঁধ থেকে ওড়নাটা খুলে বাড়িয়ে দিলো ভিহানের হাতে। রুক্ষ কঠিন মুখে ভিহান সেটা তুলে নিলো নিজ হাতে। প্রস্থ ওড়ানাটা জড়সড় করে ভিহান এক করে নিলো। এরপর সেই ওড়নাটা পিছন দিক থেকে নিয়ে রাহা কে নিজের সাথে বেঁধে নিলো। নির্বাক রাহা টু শব্দ করলো না। শুধু চুপটি করে ভিহান ভাই এর সাথে বাঁধা অবস্থায় বসে থেকে উনার বিশাল কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিলো। নিজের সাথে ওড়না দিয়ে রাহা কে পেঁচিয়ে নিয়ে এরপর ভিহান বাইক স্টার্ট করলো।

মিনিট সময় না যেতেই ভিহান খেয়াল করল রাহার মুঠোতে থাকা বুকের কাছের শার্টের অংশ ঢিলে হয়ে এসেছে। পিছন দিক থেকে মেয়েটাও যেন একেবারে নিস্তেজ। এই আশঙ্কা করেই ভিহান ওড়না দিয়ে ভালো করেই নিজের সাথে পেঁচিয়ে নিয়েছে নিজ প্রেয়সী কে। মেয়েটা মোটেও ঘুমিয়ে যায়নি। সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে।

রাত তখন ১০ টা বেজে ৫৬ মিনিট। খান বাড়ির সবার মুখে গভীর চিন্তা। জাহানারা বেগম সোফায় বসে গুনগুন করে কাঁদছে মেয়ের জন্যে। আফসানা বেগমের অবস্থা নাজেহাল। ছেলের চিন্তায় উনি দিশেহারা। মেয়েটাকে নিয়ে কোথায় আছে উনার ছেলে? ফোন কেন ধরছে না? কোনো বিপদে পড়েছে কিনা সেই ভেবে অস্থির সবাই। নীলা দুই জা কে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

আরমান খানের মুখটা করুণ হয়ে আছে। তিনি কি করবেন বুঝতে পারছেন না। অস্থির ভাবে পায়চারি করছে। কাকে ফোন দিবে কোথায় খুঁজ করবে মাথা কাজ করছে না উনার। সাদমান খান কারো সাথে ফোনে কথা বলছেন। ১২ টার মাঝে ওরা না এলে থানায় যাবেন। রায়হান খান থমথমে মুখে বসে আছেন। উনার চোখমুখ ধারালো। ছেলের উপর বড্ড চটলেন তিনি। কোথায় আছে এত রাত অবধি মেয়েটাকে সাথে নিয়ে? সবসময় ছেলের আড়ালে বকাঝকা করা আর সামনে এলেই ছেলের ভক্ত হওয়া রায়হান খানও আর বেশ সত্যিই বিরক্ত ছেলের উপর।

সবচেয়ে চিন্তায় আছে হলো জিদান। বেচারা না পারছে কিছু করতে আর না পারছে সবটা সবাই কে জানাতে। ওর অবস্থা হলো ডাঙ্গায় বাঘ জলে কুমির। যেদিকেই যাক না কেন বিপদ অনিবার্য। পরপর শুকনো ঢোক গিলছে। একটু পরপর গিয়ে টেবিল থেকে পানি খাচ্ছে। চিন্তায় গলাটা বেশি শুকিয়ে আছে। যেন গলায় মরুভূমি আটকেছে। বাড়িতে আসার পর থেকে বড়ভাই এর দেওয়া গোপন নাম্বারটায় কল দিচ্ছে তো দিচ্ছেই। কিন্তু কল আর উঠাচ্ছে না। চিন্তায় হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে ওর।

“শ্লার ভাই আমার। কোথায় আছে কি করছে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। মাঝখান থেকে আমাকে ফাঁসিয়ে দিলো।”

জিদান নখ কামড়াতে কামড়াতে পিছন ঘুরতেই রাগী থমথমে মুখে কামিলি কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। এক মুহূর্তের জন্যেও জিদান থমকালো। পরক্ষণে হাঁসফাঁস করেও সেটা লুকিয়ে বিরক্তির ভাব তুলে দূরদূর করে বলল, “সর হাট।”

জিদান ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে চলে যেতে চাইলেও পারলো না। কামিলি পথ আটকে দাঁড়ালো। চিবানো সুরে বলল, “তুমি জানো রাহা আর ভিহান ভাই কোথায়।”

জিদান এবার সরাসরি তাকালো কামিলির চোখের দিকে। ওর শক্ত নিশ্চিত চাউনি দেখে জিদান কিছুটা ঘাবড়ালো। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো এটা হয়তো কিছু জেনেছে। পরক্ষণে নিজেকে শক্ত করার ভান ধরে বলল, “ক..কি বলতে চাস?”

রাগে কামিলির চোখমুখ ধারালো হয়ে ওঠল। কটমট সুরে বলল সে, “ভণিতা না করে বলবে ওরা কোথায় আছে? নাকি আমি গিয়ে সবাই কে বলল ওরা কোথায় আছে তুমি সেটা জানো।”

“কানের উপরে দুইটা খাইলেই বালপাকনামি করা বাহির হইয়া যাইবো তোর। ছাবলামি করবার আইছোস আমার কাছে?”

“তুমি নিশ্চিত জানো ওরা কোথায় আছে। ওরা ইচ্ছে করে আমাদের রেখে অন্য জায়গায় গিয়েছে সেটা আমি বেশ ভালো করে বুঝতে পারছি। আর তুমি সেটায় সাহায্য করেছো।”

জিদান ইতিউতি করলো। এই বিপদ টাকে কি করে পায়ে মাড়ানো যায় সেই চিন্তায় করলো সে।

“এত রাত হয়ে গিয়েছে ওরা এখনো বাহিরে কি করে? কোথায় আছে ওরা?”

“ওই ছেমড়ি আমি কি ওদের পু’টকির পেছনে লাইগা আছি?”

“মুখ সামলে কথা বলো। আমি এখুনি গিয়ে সবাইকে বলল।”

“তুই বললেই সবাই বিশ্বাস করবে কেন? কোনো প্রমাণ আছে?”

“প্রমাণ তো তোমার ওই ফোনটাই।”

আঁতকে ওঠল জিদান। খাইছে রে। এই মাইয়া কি সত্যিই তাকে কেলানি খাওয়ার ফন্দি করলো নাকি?

কামিলির চিত্ত কঠিন দৃঢ় আর আত্মবিশ্বাসী দেখালো। যেন সে নিশ্চিত। ঠোঁটে কেমন করে হাসি টেনে সে তাকিয়ে রইলো ওর ফোনের দিকে।

“সেই কখন থেকে কাকে ফোন করছিলে তুমি?”

কি উত্তর দিবে ভেবে পেলো না জিদান। পরক্ষণে মস্তিষ্ক সজাগ হলো তার ফোনের দিকে কামিলির হাত বাড়ানো দেখে।

“দেখি ফোনটা দাও আমাকে।”

জিদানের হাত থেকে ফোনটা প্রায় কেড়ে নিতে চাইলো কামিলি। ঠোঁট দিয়ে দাঁত কামড়ে জিদান রাগী চোখে তাকালো।

“উস্ঠা দিয়া ওর দাঁত ভাইঙ্গা ফালমু কামরাঙার বাচ্চা। আমার ডার্লিং এর গা থেকে হাত সরা।”

সিঁড়ির কাছটায় কিছুটা আড়ালে দুইজন একেঅপরের সাথে ঝগড়া করছিলো। তখুনি এগিয়ে এলো রুশমি। সে প্রচণ্ড বিরক্ত মুখে বলল,

“তোমাদের চুল টানাটানি টা এই মুহূর্তে না করলেই কি নয় ভাইয়া?”

ভাইয়ের উপর ত্যক্ত চোখে তাকালো মেয়েটা। আগ বাড়িয়ে বলল কামিলি, “আপু তুমি ধরো তাকে। জিদান ভাই জানে ওরা কোথায় আছে।”

রুশমি সন্দিগ্ধ চোখে তাকালো ভাইয়ের মুখপানে। সেই সুযোগে জিদান টান মেরে নিজের ফোনটা নিয়ে হুমকি দিলো কামিলি কে, “এই ধারে বেশি বালপাকনামি করবার আসবি না কামরাঙা। এক্কেবারে সানডে মানডে ডট ডট কইরা দিবো।”

“ফালতু কথা রেখে আগে বলো রাহারা কোথায় আছে, অসভ্য লোক?”

ঝগড়া লম্বা করার সুযোগ না দিয়ে ভাই কে প্রশ্ন করল রুশমি, “সত্যি তুমি জানো ওরা কোথায় আছে ছোটভাইয়া?”

জবাব দিলো না জিদান।

“কি হলো বলছো না কেন কিছু? এখন পর্যন্ত ওরা বাড়ি ফিরলো না কোথায় আছে কেমন আছে কে জানে। আর তুমি চুপ করে আছো? বলছো না কেন ছোট ভাইয়া রাহা আর বড় ভাইয়া কোথায়?”

“জানলে কি আর তোদের সাথে মশা মারি?”

“তুমি হেয়ালি করছো ভাইয়া? এই বিষয়টা নিয়েও তুমি হেয়ালি করছো? আমরা সবাই চিন্তত আর তুমি কিনা গাছাড়া ভাবে আছো?”

চিন্তার উপর কানের দুই পাশে মেয়েলি ঘ্যানঘ্যান বিরক্ত লাগছে জিদানের। খানিক রেগেও গিয়েছে চিল মুডে চলাফেরা করা ছেলেটা। শক্ত হুশিয়ারি বার্তা দিতে আওয়াজ তুলল সে,

“খবরদার এই বিষয় নিয়ে বাড়ির কেউ যদি শুধু জানতে পারে তাহলে তোদের কে গ্রিল বানাবো আমি।”

১১ টার বেজে ২৩ মিনিট। বাহিরে ঘুরঘুর করে দিন ডাকছে। প্রবল বেগে বাতাস বইছে। যেন এখুনি লণ্ডভণ্ড করা ঝড় শুরু হবে। সর্বনাশা তুফান গ্রাস করবে সব কিছু। বাড়ির মানুষের চিন্তা বাড়লো। রায়হান খান এবার উত্তেজিতই হলেন। পুলিশের কাছে যাওয়া দরকার। তাছাড়া উনার ব্যক্তিগত সোর্চও কাজে লাগানো হয়েছে। রাত বাড়ছে প্রকৃতির অবস্থা খারাপ। বাড়ির দুইটা ছেলে মেয়ে এখনো বাহিরে সেই চিন্তা একদণ্ড স্বস্তি দিচ্ছে না কাউকেই।

এমন সময় বাহিরে বাইকের শব্দ শুনা গেলো। এখুনি এসে থামলো। জিদান “দেখছি” বলে দ্রুত এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। রাহা কে পাজোকোলে করে রুক্ষ কঠিন মুখে ভিহান এগিয়ে এলো। ওদের দুজনকে এলোমেলো বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে সবাই চমকে ওঠল। দ্রুত এগিয়ে এলো। রাহা অচৈতন্য হয়ে ভিহানের কোলে পড়ে আছে। জাহানারা বেগম হঠাৎ মেয়েকে নিস্তেজ দেখে ডুকরে ওঠলেন।

“আমার মেয়ে আমার কলিজার টুকরার কি হয়েছে।”

সবাই ঘিরে ধরলো ভিহান কে। চাচা চাচিদের প্রশ্নে বিরক্ত আর ক্ষিপ্ত হলো সে। বেশ খানিকটা চেঁচানো সুরেই বলল, “ভেতরে যাওয়ার জায়গা দিবে? সবাই সরো এখান থেকে।”

ওর শক্তিশালী ধমকে রাহা কে নিয়ে উপরে ওঠার জায়গা ফাঁকা করে দিলো। জাহানারা বেগম দৌড়ালেন ভিহানের পিছুপিছু।

রাহার রুমে এসে আলতো করে ওকে বিছানায় শুয়িয়ে দিলো। ততক্ষণে ঘরে সবাই ছুটে এসেছে। জাহানারা বেগম দৌড়ে বিছানায় মেয়ের পাশে বসলেন। কাঁদতে কাঁদতে হাত ধরে আকুল স্বরে প্রশ্ন করে, “কি হয়েছে আমার মেয়ের? ও কথা বলছে না কেন? কি করেছো তুমি আমার মেয়ের সাথে?”

আরমান খান স্ত্রী কে ধমকে ওঠলেন, “মতিভ্রমে পেয়েছে নাকি তোমাকে? এ কেমন প্রশ্ন করার ধরন?”

সাদমান খান ভাি কে শান্ত করলেন। জাহানারা বেগম কেঁদে বলতে লাগলেন, “আমার মেয়ে কথা কেন বলছে না? চুপ করে কেন আছে? কি হয়েছে আমার মেয়ের কেউ বলছে না কেন?”

নীলা বেগম উনাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। রায়হান খান এবার ছেলের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”

বাবার চোখে মুখে স্পষ্টত রাগ। ভিহান শান্ত গুরুগম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো, “রাস্তা।”

“আমার মেয়েকে বাহিরে নিয়ে এতরাত পর্যন্ত রাস্তায় কি করছিলে সেটা জানতে চাইছি।”

প্রায় চিৎকার করে ওঠলেন রায়হান খান। তবে ভিহানও বিগড়ে গেলো না। সে হিমালয়ের মতো শক্ত চোখমুখ আর পেটানো বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এতক্ষণ পর আফসানা বেগম করুন সুরে প্রশ্ন করলেন ছেলেকে,

“তোর হাতে কি হয়েছে বাবা?”

ভিহান খেয়াল করলো বাড়ির সবাই এতক্ষণ পর ওর হাতের দিকে তাকালো। অথচ নারী ছেঁড়া জননীর সবার আগেই নজরে পড়েছে তার কাটা হাতের উপর। ঠিক যেমন রাহার মা রাহার জন্যে উতলা হয়ে পড়েছে তেমনি তার জন্মদাত্রীও নিশ্চয়ই তার জন্যেই উথলা ছিল।

ভিহান তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। শক্ত চোয়ালে জবাব দিলো, “ওই সামান্য আঘাত।”

“বাপ আমার কি করে পেয়েছিস আঘাত? বেশি কেটেছে? দেখা দেখি।”

অস্থির স্বরে জনাতে চাইলেন আফসানা বেগম।

“শান্ত হোও। আসার সময় রাস্তায় ঝামেলা হয়েছিল একটু।”

রায়হান খানও ছেলের হাতের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভেতরটা উনার কেমন খচখচ করছে। আঘাতটা কি বেশি পেয়েছে? কি দিয়ে কতটুক পেয়েছে আঘাতটা? ছেলের চিন্তায় অস্থির হলেও থমথমে কন্ঠে জানতে চাইলেন, “কিসের ঝামেলা হয়েছিল যে এত রাত অবধি বোধবুদ্ধি হারিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে বাহিরে থাকতে হয়েছে? বাড়িতে এত গুলি লোক যে চিন্তিত, একটা খবর দেওয়া প্রয়োজন সেটা তোমার মতো ছেলের মাথায় এলো না একবারও? চুপ করে না থেকে কথা বলো।”

বাবার ধমকে ভিহান এক চুলও মাথা গরম করলো না। বরং সাহসী বীরের মতো বাবার চোখের দিকে তাকালো। এই মুহূর্তে ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার আগ্রহ কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই হলো না ওর। তাছাড়া এখন বিস্তারিত বলতে গেলে বাড়ির পরিবেশ আরো বিগড়ে যাবে। সেই চিন্তা করেই খসখসে গলায় পরিস্থিতি বিবেচনা করে মেপেমেপে উত্তর করলো ভিহান “ডাকাত” বলে। ব্যস্ত আর কোনো কথা নয়। ঘার বাঁকিয়ে একনজর বোনের দিকে তাকালো। শীতল গম্ভীর গলায় বলল,

“ওকে আগে ফ্রেশ করিয়ে দে।”

“আচ্ছা ভাইয়া।”

রুশমি এককথায় উত্তর করলো। ভিহান আর দাঁড়ালো না। দাম্ভিকতার সাথে শক্ত চোয়াল নিয়ে রাহার রুম ত্যাগ করলো।

নিস্তেজ মেয়ের পানে অশ্রুধারা নয়ন নিয়ে জাহানারা বেগম একবার তাকালো। পরক্ষণে নিভুনিভু তেজ নিয়ে কেমন ঝাঁঝালো নজরে স্বামীর দিকে তাকালেন। স্ত্রীর এই নীরব ভস্ম করে দেওয়া নজর যে অশনিসংকেত তা আর আরমান খানের কাছে অজানা রইলো না।

চলমান….

হাম্বা মোবারক সবাই কে।🐂 ঈদের জন্য কিছুদিন ছুটি নিলাম আপনাদের থেকে। কেমন? সবাই বেশিবেশি গোশত খান আর আরাম করুন। ঈদ মোবারক আমার প্রিটি পাখিরা🥰

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply