ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_১৪
সবাই রিয়েক্ট করে যাবেন পোস্টে।
রাহার ছোট্ট মন বড্ড অস্থির আর ব্যাকুল। চঞ্চল মনটা ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছে। উদগ্রীব উৎকণ্ঠা ভাব তাকে বেসামাল করে দিচ্ছে। মনের আনাচেকানাচে শুধু ভিহান ভাই ঘুরে বেড়ায়। কি সাংঘাতিক বিরক্তিকর বিষয়! যে লোকটাকে সে দেখতে পারে না। সারাক্ষণ তার উপর ছুড়ি ঘুরায় নিজের মতামত জোর করে চাঁপিয়ে দেয়, ধমকায়, বকাবকি করে সেই মানুষটাকে বারবার কেন মনে পড়ে তার? এই চিন্তা তাকে আরো ব্যাকুল করে দেয়।
অসুস্থতার সেই ঘটনার দুইদিন পাড় হয়ে গিয়েছে। রাহা এখনো নির্বাক ভঙ্গিতে ভেবে চলে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত আকস্মিক ঘটনার কথা। সেই শিউড়ে তুলা শীতল চুমুর কথা। তার এখনো বিশ্বাস হতে চায় না ভিহান ভাই তার কপালে চুমু দিয়েছে। ওই লোকটা? কিন্তু কেন? লোকটা কি তাকে বড্ড আদুরে ভাবে বলেছিল, “কিচ্ছু হবে না। একটু ধৈর্ষ ধর সোনা।”
কিছু বুঝতে পারে না মেয়েটা। সব কিছু এলোমেলো লাগে তার। নিজেকে আরো অস্থির লাগে সব কিছু ভাবতে গেলে। তাছাড়া ওই লোকটার সামনে গেলেও তো তার বুকটা ধুকবুক ধুকবুক করে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি তার হৃদয়ের আনাচেকানাচে ঘুরঘুর করে। হঠাৎ এসব কেন হচ্ছে তার সাথে?
বোকা রাহা দুইদিন তাই ভিহান ভাই এর সামনাসামনি খুব একটা যায় নি। স্কুলে যেতে হয় না বিধায় বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরই থাকে। উঁকিঝুঁকি মেরে যদি টের পায় ভিহান ভাই বাড়িতে নেই তবেই সে বের হয়।
এই দুইদিন সে খাবার টেবিলেও এক সাথে খেতে বসেনি তেমন। বসলেও আগেআগে খাওয়া শেষ করে ঘরে চলে এসেছে। নয়তো মায়ের কাছে বায়না ধরেছে ঘরের ভেতর নিজ হাতে খায়িয়ে দিতে। অবশ্যই গম্ভীর লোকটা প্রতিবেলার ঔষধের খুঁজটাও নিজে এসে নিয়ে গিয়েছে।
এই যে সকালেও মা তার ঘর পরিষ্কার করছিলো আর সে শুয়ে শুয়ে সিরিজ দেখছিলো কোনো একটা। এমন সময় কাঠখোট্টা ভিহান ভাই তার সদা সর্বদা রুক্ষ গম্ভীর মুখটা নিয়ে হাজির হয়েছেন। প্রস্থ বুকটা মেলে টানটান হয়ে পকেটে হাত গলিয়ে দাঁড়ালেন ঘরের ভেতরে।
“মেজো মা সকালের ঔষধ খেয়েছে ও?”
গুরুগম্ভীর কন্ঠে চমকে রাহা। ফোন রেখে সোজা হয়ে বসে। আড়চোখে সরু নয়নে তাকায় ভিহান ভাই এর দিকে। মনে মনে ফুঁসতে থাকে। “খাডাস বদ লোক, চোখের সামনে বসে আছি দেখতে পাচ্ছিস না? আমাকে নিয়ে প্রশ্ন আমি সামনে থাকতেও অন্যকে কেন জিজ্ঞেস করতে হবে দানব কোথাকার?”
জাহানারা জবাব দিয়ে বলেন, “এখনো খায়নি। তার নাকি দুদিন ঔষধ খেয়েই পিত্তি জ্বলে গিয়েছে। এখন তুই দেখ দুইটা দিয়ে কি করে খাওয়াতে হয়।”
এই বলে তিনি গটগট করে চলে গেলেন। এদিকে রাহা বোকার মতো ফেঁসে গেলো। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো ভিহান ভাই তালগাছের মতো এখনো ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে আবারও মাথা নুয়ে নিলো সে। ভিহান নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো,
“বেলা ১১ টা বাজতে চলল। ঔষধ খাস নি কেন?”
রাহা জবাব দিলো না। গুটিশুটি মেরে বিছানায় বসে রইল মাথা নিচু করে। বুক ফুলিয়ে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে কঠিন স্বরে এবার ধমকে উঠল ভিহান,
“কি জিজ্ঞেস করছি আমি স্টুপিড?”
ওমন শক্ত কন্ঠে কেঁপে উঠল রাহা। বুকের ভেতরটা ভয়ে ধড়ফড় করতে লাগলো। মাথাটা আরো নুয়ে দিলো। কাঁপাকাঁপা কন্ঠে জবাব দিলো,
“ভ…ভুল হয়েছে।”
“ঔষধ খাবি নাকি থাপ্পড়?”
রাহা মাথা নুয়া অবস্থায় সাহস করে একটু চোখ তুলে তাকালো। ওই লাল গরম ভিহান ভাই কে দেখেই আত্মা উড়ে যাওয়ার উপায় ছোট্ট রাহার। অভিমানী স্বরে তাই বলল,
“এ..এভাবে বলছেন কেন? ভালো করেও তো বলতে পারেন ভিহান ভাই। আপনি সবসময় আমাকে ধমকান। ঔষধ খেতে আমার ভালো লাগে না। মুখ তেঁতো হয়ে যায়।”
রাহার মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে আছে। ভিহান স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে রাহার ওই গুমরো মুখ দেখে নেয় ভালো করে। পরমুহূর্তে নিজেই এগিয়ে যায়। সেন্টার টেবিল থেকে ঔষধ আর গ্লাস নিয়ে এগিয়ে আসে। কোনো কথা না বলে ওগুলি ধরিয়ে দেয় রাহার হাতে। আহ্লাদী রাহার চোখ ভর্তি পানি। যেন পলক পড়লেই তা গলগল করে গড়িয়ে পড়ে। এই মেয়েকে নিয়ে ভিহানের বড্ড জ্বালা। মুখ থেকে কথা বের হওয়ার আগে দেখা যায় আহ্লাদীটার চোখ উপছে পড়া পানি। কি মসিবত! তপ্ত শ্বাস ফেলে ভিহান বেশ শান্ত ভঙ্গিতেই ইশারা করে বুঝালো খেতে। সামনে সিংহ দাঁড়িয়ে আছে শিকারি নজরে। এই মুহূর্তে কথা না শুনার কোনো উপায় আছে? রাহা মাথা নুয়ে ইচ্ছা না থাকা স্বত্বেও পাঁচটা ঔষধ এক এক করে গিলে নিলো তিক্ত মুখে। ঔষধ খাওয়া শেষে ভিহান নিজেই ওর থেকে গ্লাস টা নিয়ে রাখল টেবিলের উপর। নির্বিকার ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটা কুনাফা চকলেট বের করে রাহার হাতে গুঁজে দেয়। লম্বা চওড়া ভিহান ভাই বিছানায় বসা রাহার দিকে ঘাড়টা খানিক নুয়ে হিসহিস করে বলে,
“তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যা তাহলে আর ধমকাবো না। বরং..”
বাকি কথা আর সম্পূর্ণ করলো না ভিহান ভাই এরপর হনহন করে সোজা বের হয়ে গিয়েছিলো ঘর থেকে। কুনাফা চকলেট হাতে পেয়ে পেটুক রাহা বড্ড খুশি হলেও হতভম্বের মতো বসেছিলো।
নিচ থেকে বড়মার ডাক শুনা যাচ্ছে। ডিনারের জন্যে ডাকছে। রাহা গুটিশুটি পায়ে এগিয়ে গেলো নিচে। সবাই বসে আছে। শুধু ভিহান ভাই ছাড়া। লোকটা এখনো আসেনি ভেবে রাহা তাড়াতাড়ি করে যেতে লাগলো। দ্রুত খেয়ে সবার আগে উঠে যাবে।
তখনি পিছন থেকে শরীরকাটা দেওয়া ভারি সেই মোটা গলা শুনা গেলো, “আস্তে হাট, এখুনি পড়বি।”
মুহূর্তে রাহার পা থেমে গেলো। ঘাড় বাঁকিয়ে দেখলো ভিহান ভাই রুক্ষ থমথমে মুখে এই কথা বলে তাকে আগাগোড়া তীক্ষ্ণ নজরে দেখে নিয়ে তাকে পাশ কাটিয়েই চলে গেলো। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল রাহা। কথায় আছে যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়। এখন এই জাঁদরেলের সামনে এক গাদা অস্বস্তি নিয়ে খেতে হবে।
সবাই নীরবে খাচ্ছে। আরমান খান মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার আম্মা? এখন আপনার শরীর ভালো?”
রাহা সবার আগে কেন যেন ভিহান ভাই এর দিকে তাকালো। অথচ লোকটা আপনমনে খাচ্ছে। যেন এসব বিষয় শুনার তার সময় নেই। রাহার গাল ফুলে গেলো। চোখ সরিয়ে নিয়ে সে বাবার উদ্দেশ্যে বলল,
“ভালো আছি বাবা। এখন ঠিক আছে সব।”
সাদমান খান বললেন, “সে ভালো কথা। কিন্তু আম্মা ঔষধ গুলি আর মিস দিও না। ঠিক করে সময় মতো খাবে।”
রাহা আড়চোখে আবারও তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। খাডাস লোকটা এখনো একবারও চোখ তুলে দেখল না তাকে।
“ঠিক আছে খাবো ছোট আব্বু। এবার থেকে সব ঔষধ নিয়ম করে খাবো। তোমাদের আর কাউকে বলতে হবে না ধমকাতেও হবে না ঔষধ খাওয়া নিয়ে।”
কথাটা রাহা ভিহানের দিকে সুচালো নজরে তাকিয়েই বলল। এবার ভিহানও তাকালো তার দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। খুব অল্প সময় একে অপরের দিকে তাকালো। বিষয়টা আবার পাশে বসা জিদান টের পেয়ে সামান্য কেঁশে উঠল। সঙ্গেসঙ্গে রাহা চোখ নামিয়ে নিলো।
গাল ভরে হেসে বলল জিদান, “আমাদের রাহা রানীর আবার স্বভাব ভালো আছে বকে ফাতাফাতা করে ফেললেও একটু সামান্য আদর আর কুনাফা চকলেট দিলেই সব ভুলে যায়।”
জিদান ভাই ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসলো। চতুর ভিহান বুঝলো সে যে রাহা কে কুনাফা দিয়েছে সেটা নিশ্চয়ই কোনোভাবে জানে বা দেখেছে বজ্জাৎ টা। তবে সে কথা বাড়ালো না। নিজ মতো খাওয়ায় ব্যস্ত থাকলো।
রাহা অভিমানী চোখ আর গাল নিয়ে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। সেদিকে তাকিয়েই ত্যাড়া কন্ঠে বলল, “আমি এতটাও সস্তা না ভাইয়া।”
ভিহান কেবল চোখ ঘুরিয়ে তাকালো ফুলো গালে বসে থাকা রাহার মুখের দিকে। তার তীক্ষ্ণ নজর দেখেই মেয়েটা মাথা নুয়ে ফেলল।
“বালাইষাট, আমাদের রাহা রানী সস্তা হতে যাবে কেন? সে দামী। ভীষণ দামী আমাদের সবার কাছে। তাছাড়া বিশেষ মানুষের কাছে আরো বেশি দা….আআম..”
জিদানের নজর পাশে বসা ভাই এর লাল রাগী মুখের দিকে পড়তেই ছেলেটার কথা লেগে এলো। বাকি কথা আর শেষ করতে পারলো না চটপটে ছেলেটা। ভীতু মুখে ঢোক গিলে হাসার চেষ্টা করলো। তাকিয়ে দেখলো বাড়ির সকলে কেমন করে তাকিয়ে আছে। বিষয়টা বুঝেই দ্রুত কথা ঘুরালো।
“ওই আসলে আমি বলতে চাইছিলাম রাহার ভবিষ্যৎ স্বামীটা যে কোথায় পড়ে আছে। কে জানে। তার কাছেও তো আমাদের রাহা রানী বিশেষ দামী তাই না মেজো আব্বু?”
আরমান খান হাসতে হাসতে জবাব দিলেন, “তা তো হবেই। দেখতে হবে না কার মেয়ে। আমার একটামাত্র আদরের রাজকন্যা।”
জিদান ভাই এর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সেই সুযোগে বলল, “হ্যাঁ সেটাই। আমাদের রাহা রানীকে বিয়ে দিবো দেখে শুনে খুঁজে টুঁজে। লাখে একটা হবে। কোনো গম্ভীর রাগী লোকের হাতে কোনোভাবে বোন কে দেওয়া সম্ভব নয়। দেখা যাবে রাগের চোটে আমার বোনুকে চটকে ভর্তা বানিয়ে ফেলবে।”
সবার হাসি শুনা গেলো। শুধু ভিহানই রাগে টকটকে হয়ে গেলো। দাঁতে দাঁত কেটে রাগী চোখ পাকিয়ে বলল, “আর একটাও আজেবাজে কথা বললে বাড়ি থেকেই বের করে দিবো রাস্কেল।”
জিদান কাঁধ ঝাঁকিয়ে সম্মতি বুঝালো। তবে ভাই কে একটু জ্বালিয়ে মনে মনে শান্তিও পেলো পাজি ছেলেটা। অপর পাশে বসা কামিলি কপাল কুঁচকে বিরক্তের সাথে বলল,
“সেটাই বেস্ট ডিসিশন হবে। তাহলে আমাদের কান গুলি বেচে যাবে ভিহান ভাই।”
ভিহান কোনো কথা বলল না। কামিলি খেয়াল করলো ওর দিকে তাকালোও না একবারও। কিন্তু জিদান বলল এবার,
“শাঁকচুন্নি পেত্নী কোথাকার। দুদিন পর তোকেই বের করে দিবো। থাকবি তো গিয়ে ওই শ্বশুর বাড়ি। তবুও মুখের ফটরফটর দেখো ছাগলির।”
কামিলির রাগ লাগলো। দাঁতে চেঁপে ক্ষীণ স্বরে বলল, “যাবো না। কোথাও যাবো না। এখানে এই বাড়িতে থেকেই তোমার মাথা খাবো চিবিয়ে চিবিয়ে।”
“এ্যা আইছে। আমার মাথা খুব দামী জিনিস। এটা যেনতেন লোককে দেওয়া যাবে না। যত্ন করে এটা বউ এর জন্যে তুলে রাখবো। ওটা বউ এর খাবার। বউ আমার এসে তৃপ্তি নিয়ে মাথা খাবে।”
জিদানের কথায় রায়হান খান কেঁশে ওঠেন। তিনি বেশ ভালো করেই জানেন উনার এই ছেলে একটু ফাজিল টাইপের। রসিকতা তার স্বভাব।
আফসানা বেগম ওর কান ধরে বললে, “মুখে লাগাম টেনে কথা বল ফাজিল ছেলে। নয়তো বউ এসে মাথা খাওয়ার জন্যে তোর এই মাথাটাই না আমি না রাখি।”
জিদান চওড়া হাসি টেনে মধুর সুরে বলল, “আমার সম্মানিত আম্মাজান আপনি একদম চিন্তা করবেন না। এই মাথাটা আমি আপনার জন্যেও যত্ন করে তুলে রাখবো। আপনারা বউ শাশুড়ি যখন ঝগড়া করবেন এটা সযত্নে তুলে ধরবো আপনাদের দুজনের মাঝে। তৃপ্তি নিয়ে বউ শাশুড়ি আমার মাথা খাবেন কোনো সমস্যা নেই।”
এমন ভাবে অভিনয় সুরে বলছে ছেলেটা যেন মজার কোনো কৌতূহল শুনাচ্ছে সকলকে।
আফসানা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখেছেন আপনার অসভ্য ছেলে কি বলছে এসব?”
সাদমান খান বললেন, “আহ, থাক না ভাবি বাদ দাও। আর ও তো ভুল কিছু বলেনি সত্যি তো বড় হয়েছে বিয়েশাদি তো দিতে হবে।”
আফসানা বেগম চুপ করে গেলেন। আড়চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলেন স্বামীর গম্ভীর চিন্তিত মুখ।
“আমার খাওয়া হয়ে গিয়েছে আম্মু। আর খাবো না।”
জাহানারা বেগম কিছু বলার আগে শক্ত কন্ঠে গর্জে ওঠে ভিহান, “প্লেটের ভাত শেষ না করে যেন উঠা না হয়।”
রাহার রাগ হলো। কিন্তু সেটা দমন করে ক্ষীণ স্বরে বলল, “আমার পেট ভরে গিয়েছে।”
“কোনো কথা শুনতে চাইছি না। চুপচাপ খাবার শেষ কর।”
রাহার মেজাজ খারাপ হলো। এই লোক সবসময় সব কিছুতে তাকে জোর করে। কি আশ্চর্য বাড়ির কেউ কিছু বলেও না গণ্ডার টাকে। জলহস্তী একটা।
“আমি আর খেতে..”
“শাট আপ স্টুপিড।”
ভিহানের ধমকে কেঁপে উঠল রাহা। ভয় আরো জড়িয়ে ধরল। মাথা নুয়ে রাখা চোখ দুটিও ভিজে আসতে চাইলো রাক্ষসটার ধমকে। কাউকে কোনো কথা বলতে না দেখে অভিমানে গলা আরো ভরে এলো। এই গণ্ডার টা কি সবার মাথা কিনে নিয়েছে? কেউ কিছু বলে না কেন এটাকে?
রাহা কে মাথা নুয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে রায়হান খান বললেন, “জোর করছিস কেন ওকে ভিহান? খেতে না চাইলে না খাক। ওর পেট নিশ্চয়ই ভরে গিয়েছে।”
ভিহানের গলা একটুও নরম হলো না। নিজের গম্ভীর ঠাট বজায় রেখে জবাব দিলো, “ও কোনো পাখির বাচ্চা নয় বাবা, যে খাবারে দুইটা ঠোকর দিলো আর ওমনি ওর খাওয়া হয়ে গেলো।”
জাহানারা বেগম বললেন, “ভাইজান ডাক্তার বলেছেন ওর শরীর অনেক দূর্বল। আর ঠিক করে খাওয়া দাওয়াও করতে চায় না। দেখেছেন শরীরের অবস্থা?”
মাথা নুয়ে চুপ করে থাকা রাহার দিকে তাকিয়ে বললেন রায়হান খান, “ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করতে হবে তো আম্মা। তোমার যেটা ভালো লাগে ওটা নাও রাহা। এগুলি খেতে মন না চাইলে যা খেতে মন চায় মা চাচি কে বলো বানিয়ে দিবে।”
রাহার গলা দিয়ে আওয়াজ আসে না। চোখ ও তুলে না উপরে। সেভাবেই বলে, “খা..চ্ছি বড়বাবা।”
আরমান খান পাশে বসা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “খেয়ে নে মা। না খেলে শরীরটা আরো দূর্বল হয়ে যাবে।”
অভিমানী রাহা আর মুখে তুলে তাকালো না কারো দিকে। খেতে খেতে ভিহান গাঢ় নয়নে সেসবই দেখলো।
খাবার ফাঁকে রায়হান খান চোখ তুলে তাকালেন আরমান খানের দিকে। ভাই এর ইশারা বুঝে তিনি গলা খেঁকরি দিয়ে বললেন, “তা ভিহান বাপ আমার, বাড়িতে তো এবার বেশ কিছুদিন থাকবি।”
“হয়তো।”
“তা বাড়িতে যখন আছিস একটু ব্যবসার দিকে কিছুদিন নজর দে। আমাদেরও তো একটু সাহায্য হয়।”
খেতে খেতেই জবাব দিলো ভিহান, “দেখি।”
“তো কাল একবার আড়দের অফিসটায় একটু ঘুরে আয়।”
“না কাল একটা কাজ আছে। আমার ফ্রেন্ড শারহানের সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।”
“ঠিক আছে বাবা তাহলে পরশুদিন আমাদের একটু সময় দিস।”
এই পর্যায়ে ভিহান আর কথা বলল না। এসব ব্যবসা ট্যাবসা তার পছন্দের নয় তা বাপ চাচা ভালো করেই জানে। আর এটাও জানে তার বাপই যে চাচা কে দিয়ে এসব বলিয়েছে।
এবার আস্তেধীরে রায়হান খান বললেন, “আমি একটা বিষয় জানাতে চাইছি সকল কে। বিষয়টা রুশমি কে নিয়ে।”
রুশমির আত্মা কেঁপে উঠল। আতঙ্ক চাউনিতে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। সবাই কে নিজের দিকে এমন ভাবে তাকাতে দেখে বললেন রায়হান খান, “চিন্তার কিছু নেই। বিষয়টা রুশমির বিয়ের। আমার পরিচিত এক বন্ধুর ছেলের জন্যে আমার কাছে একটা মেয়ে চাইছে। খুব করে অনুনয় করছে যেন একটা মেয়ে দেই। ভিহানও যেহেতু বাড়ি আছে তাই আমি মনে করি একবার ওদের বাড়িতে দাওয়াত করা দরকার। তুই কি বলিস ভিহান?”
এই কথা শুনে রুশমির মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। আনমনে যেন সে চিন্তায় ডুবে গেল। আর কোনো কথাই তার কানে পৌঁছালো না।
ভিহান সবার আগে তাকিয়ে দেখল রাহা কে। মেয়েটা এখনো মাথা নুয়ে বসে আছে। কোনোদিকে তাকাচ্ছে না। খাবারও বোধহয় আর একটাও মুখে তুলে নি। শুধু হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করছে। কেবল তার ভয়েই যে এখনো উঠতে পারছে না সেটা ভিহান বেশ জানে। তাই নিজেই খাবার ছেড়ে উঠে গেলো। বাবার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আসুক। আগে দেখি ভেবে পরে জানাবো।”
খাবার টেবিল টায় নীরবতা কেটে গেলো। রুশমিও কাছে তাই লাগলো। কারণ পাশে বসা বাপ চাচার আর কোনো কথাই তার কানে এলো না।
রাহার মনটা ভীষণ খারাপ। বারবার কান্না আসছে তার। নাক টেনে যাচ্ছে অনবরত। এই বাড়ির কেউ তাকে ভালোবাসে না। ওই খাডাস জাঁদরেল টা সবসময় তাকে ধমকায়, কথা শুনায়। অথচ কেউ টু শব্দ করে না। তার বাবা মাও কিছু বলে না। বড্ড অভিমান হয়েছে তার সবার উপর। বিছানায় বসে নাক মুছতে লাগলো টিস্যু দিয়ে। কান্না আটকাতে গেলে তার নাক দিয়ে পানি পরে। যেন চোখ পানি আটকাতে গিয়ে নাকের পানি ছেড়ে দেয়। যেন ভেতর থেকে নোনাপানি বের হবেই হবে। সেটা চোখ দিয়ে না হলোও নাক দিয়ে বের হয়ে ছাড়বে।
চোখের পানি কষ্ট করে আটকে রাখলেও নাকের পানি বাঁধ মানছে না তার। দুইটা টিস্যু ভিজে গিয়েছে। অথচ কমার নাম নেই। আশ্চর্য কাঁদছে তো আর না তবে এতো পানি বের হচ্ছে কোথা থেকে?
তখনি পর্দা গলিয়ে মাথা উঁকিঝুঁকি দিলো রাফি।
বকের মতো গলা বাড়িয়ে দিয়ে ডাকলো, “আপু” বলে। রাহা তাকালো। তাকিয়েই নাক মুছে জবাব দিলো, “কি হয়েছে?”
“তোমার ডাক পড়েছে।”
“মাথা খাওয়ার জন্যে এখন আবার কে ডাকছে?”
“ভিহান ভাই।”
বলে রাফি ত্রিশ দাঁত দেখিয়ে হেসে ওঠল। রাহা রাগে তার দিকে নাক মুছার টিস্যু ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “উনাকে গিয়ে বল নিজের মাথা নিজে চিবিয়ে খেতে। নয়তো এমাজন জঙ্গলে যেতে। ওখানে খাওয়ার মতো শতশত পশুপাখি পেয়ে যাবে সে।”
“সে না হয় গিয়ে বললাম কিন্তু তোমায় কিন্তু তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে ভাইয়া। না গেলে খবর করে ছাড়বে।”
“দূর হো। দূর হো আমার চোখের সামনে থেকে।”
রাফি চলে যেতেই রাগে ফুঁসতে লাগলো রাহা।
“বজ্জাৎ জাঁদরেল টা ভেবেছে কি? যখন যা খুশি করবে? আমি কি তার কেনা গোলাম নাকি? যাবো না। কয়টার খবর করার করুক সে। গণ্ডার খবিশ একটা। সারাক্ষণ বকাবকি করে। সবার সামনে যা খুশি বলে ধমকায়।”
বিরক্ত হয়ে রাহা সর্পের মতো ফোঁসফোঁস করতে করতে গিয়ে ব্যালকুনিতে দাঁড়ালো। পাগলের মতো বিড়বিড় করে বকতে লাগল ভিহান ভাই কে।
বাহিরের পরিবেশটা ঠাণ্ডা। চারদিক দিয়ে শীতল বাতায়ন শরীর কাটা দিচ্ছে মাঝেমাঝে। রাতে বোধহয় বৃষ্টি আসতে পারে। দূর থেকে ধোঁয়াশাময় অভনী তে হঠাৎ হঠাৎ এক রত্তি আলো দেখা যাচ্ছে সেকেন্ড সময়ের জন্যে। রাহা এক দৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে। কিছুসময় অতিবাহিত হওয়ার পর ঘরে ফেরার জন্যে পিছু ঘুরতেই খাম্বার মতো তালগাছ ভিহান ভাই কে দেখে চমকে ওঠল রাহা। ভিহান ভাই যেন তার পিঠের একদম কাছাকাছি ছিলো। পিছু ঘুরতেই মৃদু ধাক্কা পেলো লোকটার শক্তপোক্ত বুকটার সাথে। আকস্মিক ঘটনাটায় মেয়েটা এত ভয় পেয়েছে যে পিছু যেতে চাইলে হকচকিয়ে গিয়ে বেসামাল হয়ে ব্যালকুনির রেলিং এর সাথে গিয়ে পিঠে ধাক্কা পাবে তার আগেই ভিহান ওর পিঠে হাত গলিয়ে দিয়ে নিজের কাছে টেনে আনলো। আরেকহাত রাখলো রেলিংই। হঠাৎ ঘটনাটায় বিস্তয় ভয়ে রাহা চোখমুখ খিঁচে গুটিয়ে রইল রাক্ষস লোকটার বুকেই। ভিহান খুব কাছ থেকে রাহার মুখের দিকে গভীর নয়নে তাকিয়ে রইল। ওর বুজে থাকা চোখের পাপড়ি গুলির দিকে তীব্র নজর দিচ্ছে। মনটা কেন যেন হাকুবাকু করছে ওই বন্ধ চোখের পাতায় একটা বার ঠোঁট ছুঁয়াতে। ওর শরীর থেকে প্রাকৃতিক ভাবে ভেসে আসা সাফরানের একটা মিষ্টি ঘ্রাণ এসে লাগছে শক্ত কঠিন লোকটার নাকে। রাহা এখনো চোখ খিঁচে রেখেছে দেখে ভিহান সেই সুযোগে ওর দিকে আরেকটু মুখ বাড়িয়ে দিয়ে নিঃশব্দে সুমিষ্ট ঘ্রাণ টা নিজের গহীনে টেনে নিলো। বুকের সর্বস্থানে অদ্ভুত প্রশান্তি আঁকড়ে ধরল ওর। এই দুনিয়ায় তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় সুঘ্রাণ হলো রাহার গা থেকে ভেসে আসা মিষ্টি এই সাফরানের ঘ্রাণ টা। এই ঘ্রাণ তাকে পাগল করতে সক্ষম। এর তীব্রতা এতই যে এই সুঘ্রাণ তার মাথা ঝিম ধরিয়ে দেয়। এই সুভাস তাকে মোহাচ্ছন্ন করে অদ্ভুত ভ্রম তৈরি করে দেয়। এটা তাকে এক মুহূর্তে ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
ভিহান চোখের পাতা খুলে তাকায় রাহার বুজে থাকা আদুরে মুখমণ্ডলে। হিসহিস করে ঠোঁট নাড়ায়, “তুই এতটা মাখন কেন হলি রাহা? এই যে তোকে একটু খেয়ে দেখার লোভ হচ্ছে মনে সেটার কি হবে রে বাটারফ্লাই?”
তার ওই বিড়বিড়ে কথা রাহাও বোধহয় শুনলো না। যেন কথাটা নিজের মনে মনেই আওড়ালো ভিহান।
সাড়াশব্দ না পেয়ে লম্বালম্বা নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে পিটপিট করে তাকালো রাহা। ভিহান ভাই এখনো তার পিঠে হাত গলিয়ে রেখেছে। তা দেখে শঙ্কিত চোখে ভ্রু উঁচু করে তাকালো সে। ভিহান ভাই এর গাঢ় চাউনি দেখে ভেতরটা আচমকা থৈথৈ করে উঠল। নিশ্বাসটা ঘন হয়ে এলো। ভেতরের আসন্ন ঘূর্ণিঝড় টা সামাল দিতে না পেরে আরেকটা পা পিছিয়ে যেতেই পিঠটা গিয়ে এবার ঠেকল ব্যালকুনিতে। বেসামাল পরিস্থিতিতে শরীরটা একটু হেলে যেতেই ভিহান ভাই ও ওর দিকে খানিকটা ঝুঁকে গিয়েছে। এবার বুঝি দম টা আটকেই গেলো রাহার। সেই অসহ্যকর যন্ত্রণা আবারও হৃদয় কে ঝাপটে ধরলো। শরীরটাও অসাড় লাগছে। মনে হচ্ছিল এই বুঝি নিচে পড়ে গেলো।
ভিহান ওর দিকে তাকিয়ে থেকেই পিঠের হাতটা সরিয়ে দিলো। এবার দুই হাত রাখলো রাহার দুই পাশে ব্যালকুনির রেলিং এ। গাঢ় নয়নে তাকিয়ে থেকেই শান্ত সুরে প্রশ্ন করল,
“ডেকে পাঠিয়েছিলাম?”
ঘোরে আচ্ছন্ন রাহা ভিহান ভাই এর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা দুলায়। যার অর্থ হ্যাঁ।
“গেলি না কেন?”
এবার আর জবাব দিতে পারে না। তবে চোখের পাতাও নড়ে না। ভিহানও ওর চোখের দিকে তীব্র আসক্তির সহিত তাকিয়ে থেকে নরমসুরে বলল,
“কিছু জিজ্ঞেস করছি?”
রাহা মাথা দুলায় আবারও।
“ডাকার পরেও কেন যাস নি?”
রাহা ঢোক গিলে। নিজের এলোমেলো নাম না জানা অদ্ভুত অস্থিরতা ব্যাকুল হয়ে গেলো ভেতরটা। সেটা হজম না হলেও আবার ঢোক গিলে নিজেকে সামলাতে চাইল। থেমে থেমে বলল,
“আ..আসলে আমি যাচ..যাচ্ছিলামই..”
“১০ মিনিট ধরে?”
“ওও..ওই ঔষধ খা..খাচ্ছিলাম।”
“মাথামোটা গাধা ঠিকঠাক ভাবে মিথ্যেটাও বলতে পারিস না এখন অবধি।”
রাহা বোকা বনে গেলো। এই লোকটার সামনে কখনোই সে মিথ্যে বলে পাড় পায় না সত্যিই তো জোড়ালো একটা কারণ দেখালেও তো হতো। তারচেয়ে বরং বলে দিতো “আমার হিসু পেয়েছিলো আমি বাথরুমে ছিলাম।” পরক্ষণে ভাবল ছিঃ ছিঃ এটা কেমন কথা? এটা আবার বলা যেতো নাকি এই খচ্চর লোকটাকে?
“আমায় কি ইগনোর করার চেষ্টা করছিস?”
রাহা বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইল নিরুত্তর ভাবে।
“করছিস?”
রাহা মাথা নাড়িয়ে না জানালো। ভিহান ওর কাছাকাছিই ছিলো। তবুও পাটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলো রাহার দিকে। তা দেখেই রেলিং এ শিটিয়ে থাকা রাহা আরেকটু পিছিয়ে যেতে চাইলো। এতে তার শরীর অনেকটাই রেলিং এর বাহিরে হেলে গেলো। আতঙ্কিত হলো তার চোখমুখ। দুই হাতে রেলিং আঁকড়ে ধরল। ভিহান যেন আরেকটু মুখ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হুঁ?”
“ন..নাআআ।”
“করছিস না?”
“না না..”
“কিম্তু আমি যে দেখতে পাচ্ছি দুই দিন ধরে কেমন এড়িয়ে যাচ্ছিস আমায়। আশেপাশে কম ঘুরছিস। সেসব কি তাহলে?”
“ও..ওই..”
“তোর কোনো বানোয়াট মিথ্যে শুনতে চাইছি না।”
“…
“বলবি? নাকি ফেলে দিবো নিচে?”
আতঙ্কে চোখ বড়বড় হলো রাহার। এই জাঁদরেল টা যা তাতে ফেলে দিতে একটুও ভাববে না। তার এখনো মনে হচ্ছে ৭/৮ বছর আগে কি নিয়ে জানি জিদান ভাইয়ার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছিলো এরপর এই গণ্ডার টা সত্যিসত্যি জিদান ভাই কে দুতলা থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিলো। সেই ভয়েই এখন ভিহান ভাই এর টিশার্ট খামছে ধরল ও।
“ন..নাআআ ফেলবেন না আমায় ভিহান ভাই। দয়া করে ফেলবেন না।”
ভিহান ঠোঁটে অদ্ভুত মিষ্টি এক হাসি ফুটিয়ে তাকালো রাহার চোখ বুজে থাকা মুখটার দিকে। ঘাড়টা খানিক নুয়ে তৃপ্তির সাথে রাহার খামছে ধরা হাতটাও দেখলো। নিরলস এক প্রশান্তিতে দুলে ওঠল ওর চিত্ত। লঘু স্বরে বলল,
“সত্যি বল তবে।”
একটু সময় নিয়ে জবাব দিল রাহা “আ..আমি এড়িয়ে যাচ্ছি না। আ..আসলে আপনার সামনে এলে আমার অ..অদ্ভুত লাগল। আম..আমমার অস্বস্তি হয়।”
ভিহান যেন খানিক আশ্চর্য ই হলো। কপালে সরু দুই তিনটা ভাঁজ পড়ল ওর। ওভাবেই তাকিয়ে রইল সন্দিহানি নজরে। ভিহান ভাই এর এই তীক্ষ্ণ চাউনি থেকে নজর ফেরাতে ব্যস্ত হলো রাহা। ভেতরটা হাঁসফাঁস করতে লাগলো।
কিছুসময় নীরব থেকে বিষয়টা বুঝার চেষ্টা করলো ভিহান। ঠোঁটে অদ্ভুত ভাবে নিগূঢ় এক হাসি ফুটল। লঘু স্বরে জানতে চাইল,
“কেমন অস্বস্তি হয়?”
ঢোক গিলল রাহা। রেলিং এর দুই পাশে ভিহান ভাই এর রাখা হাতের মাঝে আবদ্ধ হয়েই রাহা গুটিয়ে রইল। এক দলা ব্যাকুলতা নিয়েই বলল,
“জা..জ..জানি না।”
ভিহান খেয়াল করলো রাহার নিশ্বাসের ঘনত্ব বেড়ে গেলো। একেরপর এক শ্বাস টানতে লাগল মেয়েটা। এই মুহূর্তে ভিহানের ভেতরে ঠিক কি উত্থলিত হচ্ছে সে বুঝাতে অসমক্ষ। নিজের সংযম কে দৃঢ় করে চোখ বুজে নিলো সে। খানিক বাদে রাহার দিকে ঝুঁকে থেকে ধীর লয়ে বলল,
“তাহলে কি আমি ধরে নিবো তুই বড় হচ্ছিস রাহা?”
রাহা ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলো। যত্নের মতো বলল, “মা..মানে?”
“মানে তুই দ্রুত বড় হয়ে যা। নিজে নিজে বুঝতে শিখ সব। সব কারণ খুঁজে বের কর।”
“কি কারণ ভিহান ভাই?”
“ওই যে বললাম বড় হো। নিজে নিজে বুঝে নে। একজন তোর বড় হওয়ার অপেক্ষা।”
আশ্চর্যান্বিত কন্ঠে শুধায় রাহা, “কে?”
“বড় হলে নিজেই বুঝতে পারবি। এই কারণে দ্রুত বড় হো লিটল গার্ল। নিজেরটা নিজে বুঝে নে। সময় হলে আমার টা আমি আদায় করে নিতে পারবো।”
ভিহান ভাই এর এলোমেলো খাপছাড়া কথার কোনো মানে খুঁজে পায় না রাহা। লোকটা কি হঠাৎ পাগল হলো নাকি?
“আর কখনো আমায় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবি না। নয়তো তুলে আছাড় মেরে পঙ্গু বানিয়ে রাখবো।”
রাহা ড্যাবড্যাব করে চেয়েই রইল। কি সাংঘাতিক কথা!
“শুনেছিস?”
“হু।”
“বুঝেছিস?”
“হুম।”
“এবার মনে রাখিস শুধু।”
আশ্চর্য লোকটার কি আবোলতাবোল বলছে? কিছুই মাথায় ঢুকছে না তার। শুধু ভয়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে কেবল। রাহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজেই বলে উঠল এবার,
“আমি জানি আপনার সামনে এলে আমার এমন অস্বস্তি কেন হয়।”
রাহা মিনমিনে কন্ঠে বলা কথায় কপাল কুঁচকে এলো ভিহানের। বাম ভ্রুটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে উঁচু করে প্রশ্ন করল,
“কি জানিস তুই?”
রাহা মাথা নিচু করে রয়েসয়ে জবাব দিলো, “আপনি আমায় কালোজাদু করছেন তাই না ভিহান ভাই?”
রাহার এহেন কথায় তব্দা খেয়ে গেলো ভিহান। মুখের কথা হারিয়ে ফেলল একদম। কি জবাব দিবে কিছু বুঝতেও পারলো না। এই বলদ মাথামোটা টা কি বলছে এসব? একটা মানুষ ঠিক কতটা গাধা হলে এই ধরনের কথা বলে?
রাহা চোখ তুলে একবার ভিহান ভাই কে দেখে আবার নিচু করে নেয়।
“আমি জানি কেউ কাউকে কালোজাদু করলে এমন অস্বস্তি হয়। সারাক্ষণ অস্থির অস্থির করে। শরীর খারাপ যায়। আপনিও আমায় কালোজাদু করেছেন তাই তো?”
ভিহানের ইচ্ছা হলো নিজের চুল নিজে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। একবার মন চাইল এটাকেই মাথায় তুলে একটা আছাড় দিয়ে এখান থেকে ফেলে দিতে। দাঁতে দাঁত কটমট করে সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সেই সুযোগে রাহাও একটু এবার ঠিক হয়ে দাঁড়ায়।
রাহার এমন ছাগলামি কথায় মেজাজ চটে গেলো। চাঁপা রাগে ভিহানের শরীর নিশপিশ করলো। নিজের ঘাড়ে হাত ঘষতে ঘষতে দাঁতে দাঁত কটমট করে নজর ঘুরায়। চিবানো সুরে বলে,
“তোর কালোজাদুর মায়েরে বাপ। মনে হচ্ছে তুই সেটারই উপযুক্ত। ইডিয়েট একটা।”
রাহা সরল মুখে তাকায়। আলতো কন্ঠে বলে, “ধমকাচ্ছেন কেন?”
তপ্ত শ্বাস ফেলে ভ্রু তুলে প্রশ্ন করে ভিহান, “তুই কি আদৌও বড় হবি রাহা? আর কত সময় লাগবে তোর বড় হতে?”
ভিহান ভাই এর এই কথায় কেমন থম মেরে যায় রাহা। মাথা ফাঁকা লাগে তার। এই ভিহান ভাইটা যেন অদ্ভুত। কি বলে কি করে কিছুই তার মাথায় ঢুকে না।
ভিহান সটান হয়ে দাঁড়ায়। প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে ধারালো গলায় বলে এবার, “দুই মিনিট সময় দিচ্ছি আমার রুমে আসবি।” সুচালো নজরে আরেকবার রাহা কে দেখে নেয়, “যদি না আসিস তবে পরেরবার আমায় আসতে হলে কাঁধে তুলে নিয়ে যাবো।”
চলমান….
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা গল্পের লিংক
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৬
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩১
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ২
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২০
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১৬