কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ২৫
পর্ব_২৫
লামিয়ারহমানমেঘলা
[ 🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]
সেরিন নিশ্চিন্তে আখি পল্লব জোড়া এক করলো।
কায়ানের শরীরের পুরুষালি ঘ্রাণ সেরিনকে শান্ত করছে।
সেরিনকে গভীর নিদ্রায় মগ্ন দেখে কায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
সেরিনের কপালে ঘামে লেপ্টে থাকা ছোট ছোট চুল গুলো সরিয়ে দেয় মৃদু হাতে।
এরপর ওষ্ঠ ছোঁয়ায় কপালে।
কায়ানের চোখে ঘুম নেই। তার মস্তিষ্কে এখন নানান ধরনের চিন্তা ঘোরপাক খাচ্ছে।
কায়ান নিজের এসব দুশ্চিন্তা কোন ভাবেই দুর করতে পারছে না৷
এভাবেই প্রহর গুলো কেটে যেতে লাগে।
ফজরের আজান দিবে কিছুক্ষণ পরেই৷ ভোরের আলো ফুটবে কিছুক্ষণের মাঝে।
কায়ান তখনো ঘুমায় নি। না-ঘুমের দীর্ঘ ক্লান্তিতে তার দু’টি চোখ রক্তিম আভায় ভরে উঠেছে, যেন অনিদ্রার নীরব যন্ত্রণায় জেগে থাকা দুই জ্বলন্ত প্রদীপ।
কায়ান ধিরে নিজের হাতের উপরে থাকা সেরিনের মাথাটা নিচে বালিশে রাখে।
সেরিনের দিকে ঝুকে ওর মুখশ্রী জুড়ে সমস্ত ভাজ গুলো লক্ষ করে।
সেরিনের সমস্ত গালে হলকা চুমু খায়৷
এরপর একটা স্টিকি নোট নিয়ে কিছু লিখতে শুরু করে।
“আমি আশেপাশেই আছি। ঘুম থেকে উঠে রিলাক্স হয়ে যেও। আমি আছি সেরিন। কথা দিচ্ছি আমি আছি।”
কায়ান নোট খানা লিখে সেরিনের হাতে লাগিয়ে দেয়।
এরপর যে আসার পথ দিয়েই ফিরে যায়।
আজও সেরিনদের বাসা থেকে বেশ খানিকটা দুরেই গাড়িটা দাঁড় করানো ছিলো।
কায়ান সেদিকে এগিয়ে যায়৷
গাড়িটা চাবি দিয়ে আনলক করে উঠে বসে গাড়ির ভেতর।
এখান থেকে ঘন্টা খানেক পথ পারি দিলেই হিমেলের এলাকা যেখানে সে বাড়ি করেছে।
হিমেলের পোস্টিং চট্টগ্রাম হলেও বউ বাচ্চা নিয়ে সে এ বাড়িতেই থাকে।
কায়ান রওনা করে হিমেল দের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
মিনিট দশেক পর ফজরের আজান শোনা যায় মসজিদ থেকে। মুয়াজ্জিনের কন্ঠে যেন জাদু আছে। এত সুন্দর করে আজান দিচ্ছেন যা শুনে কায়ানের মনটা শান্ত হয়ে গেলো।
কায়ান গাড়িটা থামিয়ে দিলো মসজিদের সামনে৷
এত সুন্দর কন্ঠে যে মসজিদ থেকে আজান দেওয়া হচ্ছে সেখানে তাকে নামাজ পড়তে যেতেই হবে।
কায়ান গাড়ি থেকে নেমে সোজা চায়।
চারিদিকে জঙ্গলে ঘেরা পরিবেশ।
আশপাশ থেকে প্রায় সব পুরুষই হেটে আসছে মসজিদের দিকে।
কিন্তু মানুষ তুলনায় মসজিদটা খুবই দুস্থ মনে হলো কায়ানের।
কায়ান এগিয়ে গিয়ে চাপ কল থেকে ওজু করে ভেতরে চলে যায় নামাজ পড়তে।
মুয়াজ্জিন নামাজ শেষ করে মোনাজাত ধরে।
কায়ান নিজের দু হাত তুলে আল্লহর দরবারে।
কেন জানিনা আজকাল জীবনের ছোট্ট খুশিটা হারিয়ে যাওয়ার বড্ড ভয় তাড়া করে কায়ানকে।
নিজেকে পুরো পৃথিবীর সামনে যতটা শক্ত পোক্ত হিসাবে উপস্থাপন করে কায়ান। ভেতরে থাকা হৃদয়টা তার ততটাই নরম।
কাছের মানুষের ভালোবাসা এবং কাছের মানুষ গুলোকে হারানোর বড্ড ভয় পায় সে।
মোনাজাত শেষে কায়ান একটু সরে বসে দরজা থেকে। একে একে কসল মুসল্লী মসজিদ থেকে বেরিয়ে যায়।
সবাই বেরিয়ে গেলে মুয়াজ্জিনও বেরিয়ে যেতে লাগলেন। ঠিক তখনি দরজার পাশে একজন পুরুষকে দেখে তিনি থমকে যায়।
এগিয়ে আসেন কায়ানের দিকে,
“আসসালামু আলাইকুম৷”
কায়ান জবাব দেয়,
“ওয়ালাইকুম সালাম। “
মুয়াজ্জিন লুঙ্গি ধরে নিচে বসেন কায়ানের সামনে। ভ্রু কুঁচকে ফের প্রশ্ন করেন,
“এলাকায় নতুন নাকি? তোমারেত এর আগে দেখিনি বাবা। তার উপর তোমার পোশাক দেইখাত মনে হচ্ছে সেই বড়লোক কেউ৷”
কায়ান মৃদুহাসে মুয়াজ্জিনের কথা শুনে,
“কেন চাচা, আমিত শুনছি মসজিদে আসলে সবাই সমান।”
মুয়াজ্জিন মাথা নাড়ায়,
“হ এইডা ঠিক কথা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হইলো তোমারেত আমি দেখি নাই কখনো।”
“আমি চট্টগ্রাম থাকি। এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম আপনার কন্ঠে ফজরের আজান শুনে আমি ভবলাম এখানেই নামাজটা পড়ে ফেলি৷”
“ওও। আল্লাহ তোমারে হেদায়েত দিছে।”
কায়ান নিজের পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে মুয়াজ্জিনের হাতে ধরিয়ে দেয় মুয়াজ্জিন কপাল কুঁচকে নেয়।
“এসব কেন?”
“মসজিদে অনেক কাজ প্রয়োজন করে নিয়েন৷”
কথাটা বলে কায়ান এক দন্ড সময় ব্যয় না করে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো।
মুয়াজ্জিন তখনো টাকা গুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলো। এমন সময় বাহির থেকে গাড়ি স্টার্ট হওয়ার শব্দ শোনা গেলো।
মুয়াজ্জিন সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম দিক ফিরে আল্লহর নামে সিজদাহ্ দিলো।
এটা সত্যি তার জন্য এই টাকাগুলো ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। মসজিদে আজকাল খুব অসুবিধা হচ্ছিলো। গ্রামের সবাই মিলে টাকা তুলতে চেয়েছিলো। কিন্তু যত টাকা লাগত তা সবাই মিলে টাকা দিয়েও উঠাতে পারেনি ফলে কাজ অর্ধেক পথেই আটকে ছিলো।
হিমেলের বাড়ির কলিং বেলে শব্দ পড়তে ঘুমন্ত হিমেল বিছনা ছেড়ে উঠে এগিয়ে যায় সদর দরজার দিকে।
বড্ড অবাক হয় সে।
এই সময়ে কে আসবে তার বাড়িতে৷ এসব ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে সামনে কায়ানকে দেখে অবাক হয় হিমেল।
“কিরে কি অবস্থা তোর?”
হিমেলের প্রশ্ন শুনেও উত্তর না দিয়েই কায়ান ভেতরে প্রবেশ করলো। সে হনহনিয়ে হেটে গিয়ে হিমেলের ড্রইংরুমের কাউচের উপর বসলো। ভীষণ ক্লান্ত সে।
হিমেল সদর দরজা লাগিয়ে হেঁটে এলো কায়ানের দিকে। কায়ানের সামনে বসলো সেও।
“কিরে কি হয়েছে?’
কায়ান গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করে,
“ক্যাপ্টেন শাহারিয়ার কে পোস্টিং দিতে বলেছিলাম। দিস নি কেন?”
হিমেল ভ্রু কুঁচকে নেয়,
“ভাই দেখ আমি পুলিশ অফিসার আর্মি নই। তার পরেও আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি যেভাবে চেষ্ট করেছি এতেত হবার কথা ছিলো হলোনা কেন?’
” প্রশ্ন খানা আমাকে না করে যাকে কাজ দিয়েছিস তাকে করলে পারিস৷”
“আহা রাগ করছিস কেন? কি করেছে ওই আর্মি ক্যাপ্টেন? “
“আমার সেরিনকে দেখতে গেছিলো। আংটি পরিয়ে আসবে এই উদ্দেশ্যে।
আমার কপাল ভালো মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। নাহলে কি হতো?
হিমেল, আই সোয়ার, ওই ক্যাপ্টেনকে আমি মেরে ফেলব। আমার থেকে ওকে কেউ বাঁচাতে পারবে না৷”
হিমেলের ঘুম উড়ে গিয়েছে। শান্ত এই কায়ানের ক্রোধ ভীষণ ভয়ঙ্কর । যে গম্ভীর কন্ঠে সে কথা বলছে তা শুনে হিমেল কেন যে কারোর গলা শুকিয়ে আসবে, শরীর শীতল হয়ে আসবে।
“রিলাক্স কায়ান। আমি দেখছি কি করা যায়৷”
“তোর গেস্ট রুম কোথায়।”
“কি করবি?”
“ঘুমাব৷ এরপর ডিউটি টাইমে তুই আর আমি কুমিল্লা যাব৷”
“গিয়ে?”
কায়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হিমের দিকে চায়,
“গিয়ে ওই ক্যাপ্টেনকে নিজেদের উপস্থিতে, বিদায় করব এখান থেকে৷”
“ওকে। যা রেস্ট কর৷”
কায়ান উঠে রুমের দিকে অগ্রসর হয়।
হিমেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কি জানি এরপর কি হবে।
সকাল গড়িয়ে দশটার দিকে সেরিনের ঘুম ভাঙে।
মাথার ভেতর এখনো ঝিমধরা এক ভার, যেন রাতভর কান্নার ঢেউ পুরোপুরি থামেনি।
তবু জ্বরের তাপ অনেকটাই নেমে গেছে, শরীরটা অদ্ভুতভাবে শীতল, ক্লান্তির পরের নীরবতার মতো।
ঘামে ভেজা শরীর থেকে একধরনের কটু গন্ধ ভেসে আসে, যা নিজেকেই অস্বস্তিতে ফেলে।
বিছানায় উঠে বসতেই চুলগুলো গুছিয়ে বাঁধতে হাত তোলে সে,ঠিক তখনই হাতের তালুতে টের পায় ছোট্ট একটি স্টিকি নোট।
কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে দেখে, কায়ানের লেখা।
সেই ছোট্ট কাগজখানাই যেন সকালের নতুন সূচনা হয়ে ওঠে।
অবচেতনে ঠোঁটের কোণায় ফুটে ওঠে এক মিষ্টি, শান্ত হাসি।
বিছানা ছেড়ে নেমে সেরিন সোজা বাথরুমে যায়।
গোসল সেরে, তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে যখন ঘরে ফিরে আসে, তখন যেন তাকে আর আগের মতো লাগে না।
গত রাতের অসুস্থ, ভেঙে পড়া মেয়েটি কোথায় হারিয়ে গেছে,আজ সে অনেকটাই হালকা, ফুরফুরে।
মৃদু গুনগুন করতে করতে লম্বা চুলগুলো আঁচড়ে নিচ্ছিল সে।
মনে হয়, “কায়ান” নামের মানুষটা তার ভেতরের তুমুল ঝড়টা থামিয়ে দিয়েছে।
গত রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই আবারও তার ঠোঁটে ভেসে ওঠে নরম, লাজুক এক হাসি,
যেন সব কষ্টের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সকাল।
কায়ান নামক মানুষটার থেকে পালাতে পালতে কখন যেন নিজের সমস্ত টুকু দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছে সেরিন।
নিজেকে এই চরম সত্যির থেকে কোন ভাবেই দুরে সরিয়ে নিতে পারছে না সে।
চলবে?
Share On:
TAGS: কিস অফ বিট্রেয়াল, লামিয়া রহমান মেঘলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৫
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ৬
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ১
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৯
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৬
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৯
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৭
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪৬
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ৮
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪৩