#কালারব্লাইন্ড — ১৮
#সোফিয়া_সাফা
করিডর ধরে মাথা নিচু করে প্রায় দৌড়ানোর ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছিল আলতা। ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে ভেসে এলো ফারিশের গলা,
“আরে আলতা, দাঁড়াও দাঁড়াও! আমি এসে পড়েছি। একটু জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলাম, তাই দেরি হয়ে গেল।”
হঠাৎ ফারিশকে দেখে আলতা চমকে উঠে থমকে দাঁড়াল। বুকে জমে থাকা অশেষ অস্থিরতা নিয়ে সাহস সঞ্চয় করে একবার পেছনে ফিরে তাকাল সে। না, শ্রেয়ান পিছু নেয়নি। সে এতক্ষণ অযথাই আতঙ্কে তটস্থ হয়েছিল।
“আলতা, কী হয়েছে তোমার? তোমাকে এমন ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে কেন?” ফারিশের সশব্দ প্রশ্নে আলতা তড়িঘড়ি চোখ তুলে তাকাল।
ভাবতে লাগল, শ্রেয়ানের কথা ফারিশকে বলা ঠিক হবে কি? সেদিনই তো বলেছিল সে ওই লোকটাকে চেনে না, আজ আবার কিছু বলতে গেলে নতুন করে কথা বাড়বে। তাছাড়া ষোড়শী বলতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে না শ্রেয়ানের ব্যাপারে।
আলতাকে চুপচাপ ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে দেখে ফারিশের দৃষ্টি মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। অনুমানের ওপর ভর করে সে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ল, “কেউ কি তোমাকে কিছু বলেছে?”
ভাবনার আচ্ছন্ন জগৎ থেকে হঠাৎ ছিটকে বেরিয়ে এলো আলতা। তার চেহারার দ্বিধা আর অপ্রস্তুত ভাব ফারিশের চোখের আড়াল হলো না, যা তার সন্দেহকে আরও গাঢ় করে তুলল। সে চড়া গলায় বলল, “বলো আমাকে, কী হয়েছে?”
“তেমন কিছুই না, ভাইয়া। আপনার আসতে দেরি হচ্ছিল। তাই আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, এই যা।”
ফারিশের চেহারার টানটান ভাবটা একটু শিথিল হলো, লজ্জিত হেসে বলল, “ওহ, আই অ্যাম সো সরি, আলতা!”
“সমস্যা নেই ভাইয়া, চলুন এবার। তাঁরা আপু হয়তো অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেছে।”
“হুম চলো।”
__________
“কোন সাহসে আপনি আমার চুল কালো করে দিয়েছেন? বলুন, কে দিয়েছে আপনাকে সেই অধিকার? আমার সঙ্গে এমন করার আগে একবারও মনে হয়নি, আপনি কতটা জঘন্য কাজ করছেন?”
আলতার কথাগুলো গায়ে বিঁধলেও যুবকের বুকের ভেতর উথলে ওঠা ক্রোধ চেপে সে দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে সংযত রাখল। চাপা গলায় গমগম করে উঠল তার কণ্ঠ, “আমি রঞ্জক মাহতাবির! কাউকে কৈফিয়ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই আমার। বেশি লাফালাফি করলে মাথা ন্যাড়া করে চোখ দুটো খুব যত্ন সহকারে উপড়ে ফেলব তোমার!”
এমন ভয়ঙ্কর হুমকির মুখে যেকোনো মেয়েরই থমকে যাওয়ার কথা কিন্তু আলতার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুকরো অদ্ভুত, শীতল হাসি। কিছুক্ষণ পর সেই হাসি রূপ নিল করুণ ঠাট্টায়। তাকে এভাবে অবলীলায় হাসতে দেখে রঞ্জক ক্ষেপে উঠে খ্যাঁক করে উঠল, “এই মেয়ে, হাসছ কেন তুমি?”
“হাসবো না তো কী করবো? আপনি এতো হিংসুটে যে আমার এবার সত্যিই করুণা হচ্ছে আপনার ওপর। আপনার উচিত ছিল আমার চোখদুটো তুলে ফেলার পরিকল্পনা না করে নিজের অকেজো চোখের বিকল্প খুঁজে বের করা।”
রঞ্জকের চোখ দুটো যেন আঁধার কুঁড়ে জ্বলে উঠল, “কী বলতে চাইছ তুমি?”
“এটাই যে, আমার চোখদুটো সুন্দর কিন্তু আপনি তা দেখতে অক্ষম সেই জন্য আপনি হিংসার বশে আমার চোখ নষ্ট করে ফেললেই কি আপনার চোখের অন্ধত্ব দূর হয়ে যাবে? এই পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে যা আমাদের মতো করে দেখার ক্ষমতা আপনার নেই। তাই বলে সেসবকিছু ধ্বংস করে ফেলার অধিকার কি আছে আপনার?”
রাত তখন গভীর। রঞ্জকের সেই ‘সিক্রেট টাওয়ারের’ ছাদের চূড়ায় পাশাপাশি বসেছিল রঞ্জক আর আলতা। রঞ্জকের মুখটা ফেরানো ছিল রাতের কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের দিকে, আর আলতা বসেছিল তার ঠিক বিপরীতমুখী হয়ে। দুটো শরীর পাশাপাশি থাকলেও, তাদের মাঝে যেন নিরন্তর দূরত্ব।
আকাশের কোল ঘেঁষে ওঠা রূপোলী চাঁদের স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছিল আলতার মুখাবয়বে। সেই রূপোলী আভায় ষোড়শীর ফর্সা গাল দুটো যেন মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। রঞ্জক আড়চোখে একবার তাকাল সেই স্নিগ্ধতার দিকে, তারপর এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “অন্য কিছু দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ আমাকে কোনোকালেই দগ্ধ করেনি। আমি আমার নিজ চোখের তৈরি দৃশ্যমান পৃথিবী নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম… যতদিন না তুমি এলে—”
কথাটা পুরো শেষ করতে পারল না রঞ্জক। মাঝপথেই থমকে গেল তার কণ্ঠ। আলতা এবার ধীরে ধীরে পাশ ফিরে তাকাল তার দিকে। রঞ্জকের মুখের অভিব্যক্তি তখন জটিল, দুর্বোধ্য রূপ নিয়েছে; যেন নিজের ওপরই চরম বিরক্ত সে, নিজের মনের গোপন সত্যটা প্রকাশ করে ফেলায় গভীর অনুশোচনায় ভুগছে।
আলতা সামান্য পেছনের দিকে হেলে পড়ে, নিগূঢ় চোখে রঞ্জকের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমাকে পরিপূর্ণভাবে দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপে কেন হিংসুটে হবেন আপনি? আমি না ধ`র্ষিতা?”
রঞ্জক বিস্মিত হয়ে তাকাল। এই দফায় দৃষ্টির মিলন ঘটল তাদের। রঞ্জকের সেই বর্ণান্ধ, ধূসর চোখে এখনো আলতার চোখের তারা দুটো গাঢ় বাদামি।
আলতা ঠোঁটের কোণে আবারও এক চিলতে তেতো হাসি ফুটিয়ে তুলল, “এমনভাবে চমকে গেলেন যেন এই প্রথমবার শুনলেন।”
রঞ্জক দৃষ্টি সরিয়ে নিতেই আলতা ধারালো গলায় বলল, “আচ্ছা রঙান্ধ মশাই, আমি একজন ধ`র্ষিতা। এখানে আমার অপরাধটা কোথায়? আমি না এতোদিনেও নিজের অপরাধ খুঁজে পাইনি। এটা হয়তো আমারই ব্যর্থতা নয়তো আপনিই বলুন, সবাই কেন আমাকেই দোষারোপ করবে?”
রঞ্জকের বুকের ভেতর আচমকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল। নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতেই যেন সে ভারিক্কি গলায় বলে উঠল, “সেদিন নিশ্চয়ই তোমার পোশাক ঠিক ছিল না। আবার হতে পারে তোমার চুল আর চোখদুটোই সেই নিকৃষ্ট প্রাণীগুলোকে প্রলুব্ধ করেছিল।”
আলতা পুরোপুরি নির্বাক হয়ে গেল। চেহারায় রঙ উবে গেল তার, “আপনি কি বলতে চাইছেন, ওদের কোনো দোষ ছিল না? সব দোষ কেবল আমারই ছিল?”
এবার রঞ্জক কথা হারিয়ে ফেলল। আলতা নিজেই অভিমানী সুরে বলল, “হয়তো ছিল না। ওদের দোষ থাকলে নিশ্চয়ই ওদেরকেও প্রত্যেক মুহূর্তে অপমান, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা সইতে হতো।”
রঞ্জক তবু নিরুত্তর রইল। তার এই নীরবতা সহ্য হলো না ষোড়শীর। অস্থির হয়ে উচ্চারণ করতে লাগল, “বলুন না! চুপ করে আছেন কেন? বলুন ওদের কোনো দোষ ছিল না? সব দোষ আমার? আমার সাথে যা যা হয়েছে, সবকিছুর জন্য কেবল আমিই দায়ী আর শাস্তিটাও শুধু আমারই পাওয়া উচিত?”
রঞ্জকের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। সে চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারল না। গলা কেমন যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। একদম অপ্রত্যাশিতভাবে আলতা ডান হাতে তার ডান বাহু চেপে ধরল। আলতার ছোঁয়া লাগা মাত্রই রঞ্জকের মনে হলো, চেপে ধরা জায়গাটা যেন তপ্ত আগুনে ঝলসে যাচ্ছে! আলতা তখনো একই কথা বলে চলেছে।
ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো রঞ্জক। তন্দ্রাঘোর পুরোপুরি কাটেনি তখনো। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল সে।
পুরো ঘর অন্ধকার। যেন একটা নিশ্ছিদ্র কৃষ্ণগহ্বর।
রঞ্জক উঠে বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বেলে দিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে শান্ত হলো। গত দুদিন ধরে পার্টি মিটিং, অফিসের ব্যস্ততায় পর্যাপ্ত ঘুমানোর সময় পায়নি যুবক। আজ কাজের চাপ কিছুটা কম থাকায় বাড়ি ফিরেই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল। আর অমনি নিবিড় ঘুমে হানা দিয়েছে সেই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন।
বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিতেই লকস্ক্রিনে মেসেঞ্জারের একটা নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। তাদের একটি ফ্যামিলি গ্রুপ আছে। যেখানে পরিবারের সদস্যরা সারাদিনই সক্রিয় থাকে; অবশ্য রঞ্জক বাদে। সে খুব একটা মেসেজ দেখে না, আর দেখলেও প্রতিক্রিয়া দেখায় কালেভদ্রে। গ্রুপ নোটিফিকেশন মিউট করা থাকলেও স্ক্রিনে ‘@everyone’ ট্যাগ করা একটা মেসেজ ভেসে উঠেছে। মেসেজটা ধারা করেছে, “ডিনার রেডি। সবাই খেতে চলে এসো।”
ফোনটা নামিয়ে রেখে স্লিপারে পা গলিয়ে উঠে দাঁড়াল রঞ্জক। কোণায় রাখা খাঁচার ভেতরে পোষা পাখি জুবা তখনও ডানা মুড়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ওয়াশরুমে ঢুকে বেসিনের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল রঞ্জক। সেই যে বিয়েটা হলো, তারপর থেকে আজ পর্যন্ত একমুহূর্তের জন্যেও শান্তি পায়নি সে। মেয়েটাকে নিয়ে ভাবতে না চাইলেও অবচেতন মস্তিষ্কে মেয়েটার উৎপাত ঠেকানো ক্রমশই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
স্বপ্নের ঘোরে কিংবা কল্পনায় মেয়েটার এই অনাহূত আসা- যাওয়া এখন আর অবাক করে না রঞ্জককে। এ যেন তার নিত্যদিনের অলিখিত শাস্তি।
“কবে যে ডিভোর্স দিয়ে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবো।” বিড়বিড় করতে করতেই রঞ্জক হাতমুখ ধুয়ে পরিপাটি হয়ে ডিনারের উদ্দেশ্যে নিচে নেমে এলো।
টেবিলে বসে থাকা আলতা রঞ্জককে আসতে দেখে মাথার কাপড় ঠিকঠাক করে নিলো। গৃহকর্মীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে পুরো টেবিলে খাবার পরিবেশন করছিল ধারা। একটু পরেই আরিজ মাহতাবিরও এসে নিজের চেয়ারে বসলেন। পরিবারের প্রায় সবাই উপস্থিত, কেবল ইভান ছাড়া। ছেলেটার হয়তো আজও নাইট ডিউটি আছে, তাই এই সময় বাড়িতে নেই সে।
“বউমা, আজ কলেজে গিয়ে কেমন লাগল?” খাবার খেতে খেতেই বেশ স্নেহের সুরে প্রশ্নটি করলেন আরিজ মাহতাবির।
আলতা অত্যন্ত নিচু স্বরে উত্তর দিল, “জি, ভালো।”
“ফারিশের সুবাদে জানতে পারলাম, তোমার নাকি দু-তিনটা বন্ধুও হয়ে গেছে?”
হঠাৎ এমন কথা শুনে রঞ্জক অজান্তেই আলতার দিকে ড্যাবড্যাব চোখে তাকাল। আলতা অবশ্য তার চাউনি খেয়াল করল না। সে নিজের প্লেটে দৃষ্টি আটকে রেখে নিস্পৃহ গলায় বলল, “দু-তিনটা হয়নি। শুধুমাত্র একটা হয়েছে।”
ফারিশ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন ছুড়ল, “কেন? ওই যে সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট দুটো, ওরা কি তোমার বন্ধু ছিল না?”
আলতা ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল, “না, তাদের সাথে এখনো বন্ধুত্ব হয়নি।”
আরিজ প্রফুল্ল মুখে বললেন, “ও আচ্ছা, বন্ধুত্ব হয়ে গেলে বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে এসো।”
আলতা মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো। পরপরই রুক্ষ গলায় রঞ্জক চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “বাহ! খুব ভালো, লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকলেও এই বিষয়ে পিছিয়ে নেই একদম। মাত্র দুদিনেই দুউই তিইনটা বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে।”
রঞ্জকের কথা বলার এমন বাঁকা ধরন শুনে ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত সবাই একযোগে তার দিকে অবাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আলতাও অপমানে মুখটা থমথমে করে তাকাল তার দিকে। তাদের চোখাচোখি হতেই রঞ্জক বেফাঁস প্রশ্নটা করে বসল, “তা সবগুলোই কি ছেলে বন্ধু? নাকি কোনো মেয়েও আছে?”
এমন আপত্তিকর প্রশ্ন শুনে আলতার কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ে গেল। আরিজ গম্ভীর গলায় ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তা জেনে তোমার কি কাজ? তুমি অযথা মাথা ঘামাচ্ছো কেন?”
“প্রশ্নটা আমি তোমাকে করিনি। যাকে করেছি সে বোবা হলে অন্য কথা ছিল। তোমার প্রশ্নের উত্তর যেভাবে ফটাফট দিয়েছে সেভাবেই আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দিলেই হয়।”
“ও তোমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবে না, রঞ্জক।” বাবার কথায় এবার মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হলো রঞ্জক।
সে রক্তিম চোখে সোজা আলতার দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল, “উত্তর দাও!”
আরিজ চাপা স্বরে আওড়ালেন, “বললাম তো ও তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইন্টারেস্টেড নয়।”
রঞ্জক কটমট চোখে কিছুক্ষণ আলতার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু আলতা সেই যে মাথা নিচু করেছে সে আর চোখ মেলায়নি রঞ্জকের আরক্ত চোখের সাথে।
ভেতর ভেতর প্রচণ্ড রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চামচ দিয়ে খাবার নাড়তে লাগল রঞ্জক।
একই সময়ে টেবিলের অন্য প্রান্তে ফারিশের প্লেটে মাছের দুটো টুকরো তুলে দিল ধারা। ফারিশ সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠল, “ওই তুই কি আমাকে রাক্ষস ভাবিস নাকি? এতো দিচ্ছিস কেন?”
ধারা কিছুটা থতমত খেয়ে বলল, “সবসময় যেমন আরএম এর ভাগেরটা তোকে দিই, আজও তো তাই দিলাম। কী হলো হঠাৎ তোর? তুই না মাছ খেতে ভালোবাসিস?”
“হ্যাঁ, ভালোবাসি! কিন্তু অন্য কারো ভাগেরটা খাওয়ার ইচ্ছা ফুরিয়ে গেছে। যার ভাগেরটা, তাকেই দিয়ে দে।”
রঞ্জক তখন আলতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রাগে অন্ধ হয়ে ফুঁসছিল। ফলে ধারা আর ফারিশের কথাপোকথনের মূল সূত্রটা তার মাথায় ঢোকেনি। কান অব্দি পৌঁছানো অস্পষ্ট দু-একটা শব্দ থেকেই সে নিজের ধ্যানে আনমনে বলে উঠল, “হ্যাঁ, ঠিকই তো! তুই আমার ভাগেরটা ওকে দিবি কেন? আমারটা আমাকেই দে!”
রঞ্জকের কথা শুনে ধারার মুখ হাঁ হয়ে গেল। তাকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফারিশ কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে বলল, “ওই ভেদু যাচ্ছিস না কেন? দে ভাইয়াকে। সে যখন সাধ করে খেতে চাইছে, দিয়ে দে না!”
ধারা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রঞ্জকের পাতে মাছের টুকরোটা তুলে দিতে গেল। আর ঠিক তখনই রঞ্জকের চোখ পড়ল ধারার এগিয়ে দেওয়া চামচের দিকে। মাছের টুকরো দেখেই গা রি রি করে উঠল তার। বাম হাতে ঝাড়া মেরে ধারার হাতটা সরিয়ে দিতে গিয়েই ঘটল অঘটন।
রসালো মাছের টুকরোটা আলতো করে ছিটকে গিয়ে রঞ্জকের ডান হাতের কবজির ওপর ‘টুপ’ করে পড়ল!
চোখ বুজে চিল্লিয়ে উঠল রঞ্জক, “হোয়াট দ্য *****।” রঞ্জক কী বলল না বলল তা উপস্থিত কেউই ঠিকঠাক অনুধাবন করতে পারল না।
মাথাটা যেন ঘুরে গেল ধারার। রঞ্জক উঠে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠল, “অই তুই আমাকে মাছ দিচ্ছিলি কেন? তুই জানিস না আমি মাছ খাই না।”
ধারা ভীতিগ্রস্ত গলায় অস্ফুটস্বরে বলল, “কিন্তু তুই-ই তো বললি—”
“জাস্ট শাট আপ!”
রঞ্জক একবার রক্তচোখে টেবিলে উপস্থিত সবাইকে দেখে নিল। আলতা এতক্ষণ স্তম্ভিত চোখে চেয়ে থাকলেও রঞ্জক তাকানোর সাথে সাথে মাথা নিচু করে নিয়েছে। রঞ্জক নিজের শার্টের কনুই অব্দি গোটানো হাতা ঝাটকা দিয়ে নামাতে নামাতে ওয়াশবেসিনের দিকে চলে গেল।
রঞ্জকের ইস্পাতের মতো পোক্ত হাতের ধাক্কায় হাতের কবজিতে বেশ চোট পেয়েছে ধারা। বয়সে নিজের চেয়ে ছোট ভাইয়ের থেকে পাওয়া এই আঘাতে তার বুকটা অজানা কষ্টে ভারী হয়ে উঠল। সে চোখভরা জল নিয়ে ফারিশের দিকে তাকিয়ে বলল, “সব তোর জন্য হয়েছে।”
ফারিশ নিরীহ ভঙ্গিতে বলল, “আমি কি করেছি? ভাইয়াই তো খেতে চাইলো।”
ধারার হাত টনটন করলেও সে বুঝতে দিল না হাতে ব্যথা পেয়েছে সে। কেবল কামিজের একপাশ খামচে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবে না জেনে মুখটা আড়ালে নিয়ে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
ধারার কষ্টটা আলতা অনুভব করতে পারল। কেমন যেন গলা আটকে এলো তার। কিন্তু ধারার পিছুপিছু উঠে যেতে পারল না, বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা কী মনে করবেন—সেই সংকোচে। সালিহা খাতুন অবশ্য মেয়ের পিছু পিছু চলে গেছেন। ধারার স্বামী কৌশিককে খুব একটা বিচলিত হতে দেখা গেল না; কেমন এখনো খেয়েই যাচ্ছে নির্বিঘ্নে।
বোনের মন খারাপ ভালো ভাবেই টের পেয়েছে ফারিশ। তবুও চামচের পর চামচ খাবার মুখে পুরে যাচ্ছে। যেন তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে যেতে পারলেই বাঁচে সে। এমন সময় কারো ফোন বেজে উঠল। প্রথমে ভ্রূক্ষেপ না করলেও ফারিশ যখন বুঝতে পারল ফোনটা রঞ্জকের তখন সে গুরুত্ব দিল। উঠে গিয়ে রঞ্জকের ফোনটা হাতে তুলে নিল সে। বাকিরা নিজেদের মতো খাবার খাওয়ায় ব্যস্ত।
ফারিশের মনে রঞ্জকের প্রতি আগে থেকেই ক্ষোভ জমে ছিল এই সুযোগে সে সেই ক্ষোভটুকু উগড়ে দিতে চাইল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “ও আচ্ছা, ভাইয়ার প্রেমিকা কল দিচ্ছে দেখছি। রিসিভ করে কথা বলবো নাকি? আফটার অল হবু ভাবি কল দিচ্ছে রিসিভ না করলে খারাপ দেখায় না? কী বলো তোমরা? রিসিভ করি?”
ফারিশের এমন অবান্তর কথা শুনে উপস্থিত সবাই থমকে গেল। ফারিশ আড়চোখে খেয়াল করল— আলতাও মুখ তুলে তাকিয়েছে তার দিকে। সে এবার আলতার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতেই বলল, “বুঝলে আলতা, ভাইয়া হয়তো তোমাকে এই কারণেই মেনে নিতে পারছে না। কীভাবে নেবে বলো, তার যে প্রেমিকা আছে।”
আরিজ মাহতাবির ঝটকা খেলেন ফারিশের কথায়, “ফারিশ তুমি কী সব বলছো? মজা করা বন্ধ করো, সবাই সত্যিই ধরে নিচ্ছে।”
ফারিশ বুঝতে পারল আরিজ তাকে থামিয়ে দিতে চাইছেন কিন্তু ফারিশ থামবে না। রঞ্জক ক্রমশ তার মাথা খারাপ করে ফেলছে। সেও এবার রঞ্জকের শান্তি বিনষ্ট করবে। এভাবে তলারটা কুড়িয়ে গাছেরটাও খেতে চাইলে মোটেও সহ্য করবে না সে।
“আমি মজা করছি না চাচ্চু।” ফারিশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল।
আরিজ এবার চোখ রাঙিয়ে থমথমে গলায় বললেন, “তুমি মজাই করছ! আর এই বিষয়ে আমি কোনো কথা শুনতে চাই না।”
“আচ্ছা, এটা যদি ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড না-ই হয়, তবে তুমিই বলো চাচ্চু—ভাইয়ার ফোনে এই নম্বরটা ‘মাই কিউটিপাই’ নামে সেভ করা কেন?” ফারিশের এই জবাবে আরিজ যেন পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। রাগ আর অস্বস্তির মিশেলে তার মুখমণ্ডল অগ্নিশর্মা রূপ নিল।
ফারিশ আরও কিছু একটা বলে আগুনে ঘি ঢালতে যাবে; তার আগেই রঞ্জক হাত ধুয়ে ডাইনিংয়ে ফিরে এলো। ফারিশের হাতে নিজের ফোন দেখে ভ্রূ কুঁচকে শুধাল, “তুই আমার ফোন দিয়ে কী করছিস?”
ঠোঁটের বাঁকে অমায়িক হাসির রেখা ফুটিয়ে ফোনটা রঞ্জকের দিকে বাড়িয়ে দিল ফারিশ, “কই, কিচ্ছু না তো! নাও তোমার ফোন। কে যেন কল করেছে, রিসিভ করো।”
রঞ্জক সন্দেহজনক চোখে ফারিশকে দেখে নিয়ে এক ঝটকায় ফোনটা লুফে নিল। স্ক্রিনে তাকাতেই দেখল, ‘মরেও না কূটনী’ সেভ করা নম্বর থেকে কলটি এসেছিল!
সে আর কারো দিকে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করল না। দাঁতে দাঁত চেপে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল, অতঃপর তীব্র অসন্তোষ নিয়ে হনহনিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
ফারিশ কোনোমতে হাসি চেপে মুখটাকে বিষণ্ণ করে বলল, “দেখলে আমাদের সামনে কথাও বলা যাবে না। কেমন দৌড়ে চলে গেল। নির্ঘাত নিজের রুমে গিয়ে আরামসে গুটুরগু করবে।”
আরিজ মাহতাবির আর সহ্য করতে না পেরে উঠে দাঁড়ালেন। ফারিশকে পাশ কেটে যাওয়ার সময় একবার অসন্তুষ্ট চোখে তাকাতে ভুললেন না।
খাওয়া দাওয়া শেষে ফারিশ চলে গেল আরিজ মাহতাবিরের কক্ষে। তাকে দেখেই আরিজ ক্ষেপে গেলেন, “তুমি এটা ঠিক করোনি ফারিশ। আমরা কি ওদের সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চাইছি না? রঞ্জককে এমনিতেই ভালো চোখে দেখে না বউমা। এমতাবস্থায় ওকে শুনিয়ে দিলে রঞ্জকের প্রেমিকা আছে।”
ফারিশ একটুও দমে না গিয়ে জবাব দিল, “আমি মোটেও ওদের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাই না চাচ্চু?”
“মানে? তাহলে কী চাও তুমি?”
“সম্পর্ক কোনোদিন বাইরের মানুষ জোর করে টিকিয়ে রাখতে পারে না চাচ্চু। যদি না, মুল মানুষ দুটোর মধ্যে সদিচ্ছা থাকে। মেজো ভাইয়ার মাঝে আমি সেই সদিচ্ছার ছিটেফোঁটাও দেখি না। তাই আমি এখন থেকে ঠিক সেটাই করব, যাতে আলতাও তার কাছ থেকে কোনো আশা না রেখে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারে।”
“এমনটা করলে তো ওদের ডিভোর্স হয়েই যাবে। তারপর আমরা কী করবো?”
“সেকেন্ড অপশন অ্যাপ্লাই করে এমন একটা ভালো ছেলে খুঁজে বের করব যে সবটা জানার পরেও আলতাকে বিয়ে করতে রাজি হবে। আলতা সুখে থাকলে ওর মা-ও মুখ বন্ধ রাখবেন। আর আমাদেরও অযথা ভয় পেতে হবে না।”
আরিজের মনে ফারিশের এই যুক্তি মোটেও ধরল না। তিনি কিছুতেই চান না রঞ্জক আর আলতার সংসারটা ভেঙে যাক। তাই তিনি বুদ্ধিটার দুর্বল দিকটা তুলে ধরতে চাইলেন, “তোমার কি মনে হয়, এমন ছেলেকে আমরা খুঁজে পাবো?”
“কেন পাবো না?”
“তুমি নিজেকে দিয়েই বিচার করো। তুমি নিজেই কি এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হতে?”
ফারিশ প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চাইল, “আমি ভালো ছেলের প্রসঙ্গে বলেছি।”
“তুমি বলতে চাইছো তুমি ভালো নও?”
ফারিশ থতমত খেয়ে গেল, “আজব! তুমি এইসবে আমাকে টানছো কেন?”
“আমি শুধু চাইছি, তুমি রঞ্জকের জায়গায় একবার নিজেকে দাঁড় করিয়ে ভেবে দেখো।”
“ভেবে দেখেছি, চাচ্চু। সব মেনে নেওয়া গেলেও ভাইয়া যেভাবে আলতাকে অপমান করে, সেগুলো মেনে নেওয়া যায় না।”
“তুমি মেনে নিতে পারছো না কারণ আলতা তোমার…”
“স্টপ চাচ্চু, আমি আর একবারও শুনতে চাই না আলতা আমার কী হয়।” বলেই ফারিশ তার চাচার শর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁইছুঁই।
খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে বসে আছে আলতা। কোলের ওপর একটা নোটপ্যাড রাখা। ফারিশ যা যা হোমওয়ার্ক দেয় সবগুলো রাতের মধ্যেই শেষ করে ফেলে সে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। পড়তে পড়তে চোখের পাতা দুটো বারবার ভারী হয়ে আসছে, ঘুমে তলিয়ে যেতে চাইছে মন; কিন্তু পরমুহূর্তেই ঝটকা খেয়ে চোখ মেলে আবার বইয়ে নিমগ্ন হচ্ছে সে।
দিনরাতের চব্বিশটা ঘণ্টা তার এই একটাই পরিধি; নাওয়া-খাওয়া আর পড়াশোনা। পড়াশোনা ছাড়া পৃথিবীতে আঁকড়ে ধরার মতো তার আর কিচ্ছু নেই। তাই নিজের সবটুকু দিয়ে পড়াশোনাকেই আপন করে নিয়েছে সে।
বইয়ের পাতায় চোখ ডুবিয়ে পড়ার মাঝেই হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ বেজে উঠল।
হকচকিয়ে উঠল ষোড়শী। তড়িঘড়ি খাট থেকে নেমে দরজার কাছে গিয়ে সতর্ক গলায় শুধাল, “কে?”
“সাহেবা, আমি এসেছি।” ওপাশ থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এলো। আলতা বুঝতে পারল একজন গৃহকর্মী এসেছে। সে দরজা খুলে দিতেই মহিলাটি বললেন, “আপনাকে মেজো সাহেব তলব করেছেন।”
আলতার ভ্রূ কোঁচকায়। মোটা স্বরে প্রশ্ন করে, “কেন?”
গৃহকর্মী মুচকি হাসলেন। মনে মনে ভাবলেন মেয়েটাকে তার স্বামী ডাকছে আর মেয়েটা কী না উল্টো তার মতো একজন কাজের লোকের কাছে জানতে চাইছে তার স্বামী তাকে কেন ডাকছে?
মহিলার ঠোঁটের এই অর্থপূর্ণ হাসি আলতার নজর এড়াল না। সে গলা পরিষ্কার করে বলল, “আপনার আর কিছু বলার না থাকলে আপনি এখন আসতে পারেন, খালা।”
মহিলাটি দ্রুত হাসি সংবরণ করে বললেন, “মেজো সাহেব বলেছেন, আপনার পাখিটা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তিনি অনেক চেষ্টা করেও ওষুধ খাওয়াতে পারছেন না। পাখিটা শুধু আপনার নাম ধরেই ডাকছে।”
চলবে…
Share On:
TAGS: কালারব্লাইন্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৭(ক+খ)
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৬
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৭
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১২
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৪
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৩
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৪
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১০
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৩
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৯