Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ৭


#কালারব্লাইন্ড — ০৭

#সোফিয়া_সাফা

 দুপুরের আলো ফিকে হয়ে বিকেল গড়িয়েছে। আলতা তার শ্বশুর মশাইয়ের সঙ্গে কেনাকাটা করতে বাইরে বেরিয়েছে। বেরোনোর আগে আলতা পরনের সাদা শাড়িটা পাল্টে ধূসর একখানা সুতির শাড়ি জড়িয়েছে। 

গাড়ি আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে। আলতা বসেছে সামনের সিটে। পাশেই ড্রাইভিং সিটে বসে নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। পেছনের সিটে বসে আছেন আরিজ মাহতাবির ও তার ব্যক্তিগত বডিগার্ড। আরিজ মাহতাবিরের আশেপাশে লোকটাকে সবসময়ই দেখা যায়। লোকটা বেশ কমবয়সী; সবসময় মুখ গম্ভীর করে রাখে এবং খুব কম কথা বলে।

আলতা নীরব ভঙ্গিমায় সিটে মাথা এলিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে চলেছে। জীবনে কোনোদিনও রাজধানীতে আসার সুযোগ হয়নি তার। এই প্রথম তার চোখের সামনে ধরা দিয়েছে সুপরিকল্পিত রাস্তাঘাট আর সারি সারি উঁচু অট্টালিকা। বিকেলের নরম স্নিগ্ধতায় চারপাশের প্রতিটা দৃশ্যই যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো লাগছে। সাজানো-গোছানো দোকানপাট, রেস্তোরাঁ আর শিশুদের কোলাহলমুখর পার্ক; চারপাশজুড়েই মানুষের ব্যস্ত উপস্থিতি। 

নিজের ভাবনার জগতে ডুবে ছিল আলতা। তখনই পেছনের সিট থেকে ভেসে এলো শ্বশুরের ভারী কণ্ঠস্বর। তার শ্বশুর মশাই ফোনে কারো সাথে বাক্যালাপ করছেন।

আরিজ মাহতাবিরের ফোনালাপ শুনে আলতা বুঝতে পারল; অপরপ্রান্তের ব্যক্তিটি গুঞ্জন। আলতা অনুমান করে ধরেই নিয়েছে সম্পর্কের হিসেবে গুঞ্জন তার ভাসুর। কারণ তার ছোট চাচিশাশুড়ির মুখে গুঞ্জনকে বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে উল্লেখ করতে শুনেছিল সে। অবশ্য গুঞ্জন কিংবা এই নতুন পরিবেশের কোনো কিছু নিয়েই আলতার মনে বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই। বলা যায়, নিজের চারপাশের রূপ-রং নিয়ে ভাবার আগ্রহটাই সে হয়তো হারিয়ে ফেলেছে।

আলতা শূন্য চোখে বাইরে তাকিয়ে ছিল। আরিজ মাহতাবির কথায় কথায় বললেন, “আমি এখন অফিসে নেই, রঞ্জকের বউকে নিয়ে একটু বাইরে বের হয়েছি। অফিসে ফিরেই তোমাকে ফাইলগুলোর ছবি তুলে পাঠাবো। আমি বলি কী, তোমার কোনো সমস্যা না হলে তুমি বরং আরও কয়েকটা দিন ওখানেই থাকো। নিজের চোখে সবটা সম্পন্ন হতে দেখলে তুমিও নিশ্চিন্ত হতে পারবে আর আমিও।”

আরিজ মাহতাবির গুঞ্জনের উত্তরের অপেক্ষায় রইলেন। গুঞ্জন রাজি হওয়া মাত্রই তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, “আচ্ছা, নিজের খেয়াল রেখো। রাখছি।”

অতঃপর গাড়িজুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এল। মিনিট কয়েক পর গাড়িটা থামলো বিশাল এক শপিংমলের পার্কিং এরিয়ায়। আরিজ মাহতাবির নিজে নেমে এসে আলতার পাশের দরজাটা খুলে দিলেন। আলতা ধীরপায়ে নেমে দাঁড়াল। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশচুম্বী ইমারতটির দিকে তাকাতেই তার চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

আলতার চোখমুখের চকচকে ভাবটা খেয়াল করে আরিজ মাহতাবির ঈষৎ হেসে বললেন, “শপিংমলের ভেতরটা আশা করি এর চেয়েও বেশি ভালো লাগবে তোমার।”

কথাটা আলতার কানে পৌঁছালেও সে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারল না। কারণ তার নিষ্পলক চোখজোড়া তখন আটকে গেছে শপিংমলের চূড়ায় ঝুলে থাকা বিশাল সাইনবোর্ডটায়। সেখানে রঙিন আলোয় নিয়ন অক্ষরে জ্বলছে আর নিভছে: ‘Mahtabir Fashion House’

“এবার তাহলে ভেতরে যাওয়া যাক, বউমা?” শ্বশুরের মিহি কণ্ঠে আলতার ঘোর ভাঙলো। সে মাথা নেড়ে সায় দিতেই আরিজ মাহতাবির ভেতরের দিকে পা বাড়ালেন।

আলতাও তার পিছু পিছু হাঁটা শুরু করল। আরিজ মাহতাবির অবশ্য নিজের গতি কমিয়ে এনে একদম বউমার পায়ের তালে তাল মিলিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন। তাদের দেখামাত্রই কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যস্তভাবে এগিয়ে এলো। 

আরিজ মাহতাবিরের সাথে সংক্ষিপ্ত কুশলবিনিময়ের পর তারা চটজলদি একজন সেলসওম্যানকে ডেকে আনলো। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সেই নারী আলতাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেল।

আলতা ছোটবেলা থেকেই শাড়ি পরতে অভ্যস্ত। তাই সে শুরুতেই শাড়ির সেকশনে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। সেলসওম্যান তাকে নিয়ে এলো রাজকীয় সব শাড়ির সমাহারে সাজানো কাঁচঘেরা এক কক্ষে। চারপাশে সাজানো অসংখ্য শাড়ির নকশা, শেড আর ঝলমলে কারুকাজ দেখে আলতা রীতিমতো বিড়ম্বনায় পড়ে গেল।

সেলসওম্যান তাকে সাহায্য করল শাড়ি নির্বাচনে। খুব বেশি শাড়ি পছন্দ করেনি আলতা। যতগুলো প্রয়োজন, শুধু ততগুলোই নিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেলসওম্যান তা হতে দেয়নি। একপ্রকার গছিয়েই দিয়েছে একের পর এক শাড়ি। 

লাগামহীন প্রশংসায় বলেই গেছে, ‘এই শাড়িটায় আপনাকে খুব মানাবে। এই ডিজাইনটা কালকেই নতুন এসেছে… আর এটার ফ্যাব্রিক কোয়ালিটি? ট্রাস্ট মি, দারুণ আরামদায়ক হবে!’ আরও এমন কিছু বলেছে যার বেশিরভাগ টেকনিক্যাল শব্দই আলতার বোধগম্য হয়নি।

আলতা কিছু সময় তাজ্জব হয়ে শুধু বসেই রইল। কিন্তু শাড়ির পাহাড় জমতে দেখে একপর্যায়ে আর না পেরে বলে উঠলো, “আর লাগবে না। আমি সারাজীবনের কেনাকাটা একসাথে করতে আসিনি।”

তার শেষোক্ত কথাটা শুনে সেলসওম্যান কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে হা করে চেয়ে রইল আলতার দিকে। তারপর কণ্ঠ কিছুটা খাদে নামিয়ে বলল, “সারাজীবনের কেনাকাটা কেই-বা একসাথে করতে আসে ম্যাম? আপনি এএম স্যারের সঙ্গে এসেছেন। উপরন্তু স্যার বারবার বলে দিয়েছেন আপনি নিতে না চাইলেও আপনার প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে যেন সবকিছু ম্যানেজ করে দিই। সেখানে কোনো কমতি থাকলে নির্ঘাত আমার চাকরিটা চলে যাবে।”

আলতা পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার মুখের ভাব দেখে সেলসওম্যানের বুক ধক করে উঠল। চরম আতঙ্কে তার গলার স্বর কেঁপে গেল, “ম্যাম, আপনার কি শাড়িগুলো পছন্দ হয়নি? প্লিজ বলুন! দরকার হলে আমি একদম গোড়া থেকে আবার দেখানো শুরু করবো। তবুও দয়া করে এএম স্যারের কাছে কমপ্লেইন করবেন না!”

​আলতা নিজের আসন ছেড়ে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়ালো। শাড়ির বিশালাকার স্তূপের ভেতর থেকে বেছে বেছে হাতে গোনা চার-পাঁচটা সাধারণ সুতির শাড়ি আলাদা করে তুলে দিল মেয়েটির হাতে। তারপর দৃঢ় গলায় বলল, “শুধুমাত্র এই কয়টা শাড়িই ব্যাগে ভরে দিন।”

সেলসওম্যান একদম তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটি কপালে ওঠার জোগাড়! করুণ স্বরে বলল, “মাত্র এই কয়টা শাড়ি? কিন্তু কেন ম্যাম? আমাদের বিশাল কালেকশন কি আপনার পছন্দ হয়নি? বলুন না, কী সমস্যা হচ্ছে? আমি প্রয়োজনে আপনাকে অন্য ফ্লোরে বা ভিআইপি এক্সক্লুসিভ সেকশনে নিয়ে যাচ্ছি!”

আলতা খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। ভেবে পেল না কথাটা কীভাবে বলবে। যদিও সে জানে, না বলে উপায় নেই। শাড়ির চেয়েও সেইসব জিনিস এখন দৈনন্দিন জীবনে তার বেশি প্রয়োজন। এটাই সবচেয়ে ভালো সুযোগ। এখনই তাকে জিনিসগুলো সংগ্রহ করতে হবে।

আলতা নিচু স্বরে মেপে মেপে বলল, “আমি একসাথে খুব বেশি কেনাকাটা করে অভ্যস্ত নই। ওই কয়টা শাড়ি দিয়েই আপাতত অনেক দিন চলে যাবে আমার। তবে আমার অন্য কিছু জিনিসের প্রয়োজন আছে।”

সেলসওম্যান যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ততক্ষণাৎ উৎসাহ নিয়ে শুধালো, “জি ম্যাম, অবশ্যই! বলুন না, আর কী কী লাগবে আপনার?”

আলতার দেহভঙ্গিতে স্পষ্ট অস্বস্তি ফুটে উঠল। হাত দুটো শাড়ির আঁচলে শক্ত করে চেপে ধরল সে। এক অদৃশ্য জড়তায় যেন তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে। ভেতরে জমে থাকা সংকোচটুকু কোনোমতে গিলে নিয়ে, চারপাশে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, “এখানে কি সাজগোজের প্রসাধনী পাওয়া যাবে?”

আলতার এমন মোলায়েম আর দ্বিধাজড়িত প্রশ্ন শুনে সেলসওম্যান ঠোঁটের কোণে হাসির উষ্ণতা ছড়িয়ে বলল, “অবশ্যই পাওয়া যাবে ম্যাম! আফটার অল, আপনি দেশের এক নম্বর ফ্যাশন হাউজে দাঁড়িয়ে আছেন। চলুন, আমরা তাহলে এবার মেক-আপ অ্যান্ড পার্সোনাল কেয়ার সেকশনে যাই।”

আলতা মাথা নেড়ে শাড়িগুলোর দিকে তাকাল, সেগুলো বুঝে পাওয়ার আশায়। কিন্তু সেলসওম্যান অন্য একজনের হাতে শাড়িগুলো ধরিয়ে দিতে দিতে বলল, “শাড়ি নিয়ে একদম ভাববেন না ম্যাম। এগুলো প্যাক হয়ে সরাসরি আপনার গাড়িতে পৌঁছে যাবে। আপনি বরং আমার সঙ্গে চলুন।”

আলতা তাই করল। সেলসওম্যানের পিছু পিছু হাঁটা ধরল সামনের দিকে। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল একটু পরেই—এস্কেলেটরে ওঠার সময়। শাড়ির সেকশনটা ছিল নিচতলায়, আর প্রসাধনীর সেকশনে যেতে হলে কয়েক তলা ওপরে উঠতে হবে।

চলন্ত সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শুকনো ঢোক গিলল কিশোরী। এমন অদ্ভুত চলন্ত সিঁড়ি আজ পর্যন্ত চোখে দেখেনি সে। 

সেলসওম্যান অবশ্য আলতার এভাবে থমকে দাঁড়ানোর কারণটা আঁচ করতে পারল না। সে এস্কেলেটরে উঠে কয়েক ধাপ ওপরে চলে গিয়ে বলল, “কী হলো ম্যাম? এস্কেলেটরে উঠুন, আমাদের ছয় তলায় যেতে হবে।”

মনে মনে সবটুকু সাহস এক করে আলতা ডান পা বাড়িয়ে চলন্ত ধাপটার ওপর রাখল। কিন্তু পায়ের নিচের মেঝেটা হঠাৎ নড়ে উঠতেই সে এতটাই ঘাবড়ে গেল যে বাম পা তুলতেই ভুলে গেল। এস্কেলেটরটা ধীরে ধীরে তাকে ওপরের দিকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল।

​আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে আলতা তড়িঘড়ি ডান পা-টা ফিরিয়ে নিতে গেল। ফলস্বরূপ ভারসাম্য হারিয়ে শরীরটা পেছনের দিকে ঢলে পড়তে লাগল। আলতা চোখ দুটো বন্ধ করে নিল; ভেবেই নিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পেছনের শক্ত মেঝের ওপর আছড়ে পড়তে যাচ্ছে সে। কিন্তু আশ্চর্য বিষয়, তেমন কিছুই হলো না! পেছন থেকে অচেনা কারও শক্তপোক্ত হাতের তালু এসে তার পিঠে ঠেকল। মুহূর্তেই থেমে গেল তার পতন।

সেলসওম্যান ততক্ষণে প্রায় ওপরে উঠে গিয়েছিল। পেছন ফিরে তাকাতেই নিচে আলতাকে টালমাটাল হয়ে পড়তে দেখে সে হন্তদন্ত হয়ে অন্য পাশের নামার এস্কেলেটরে উঠে নিচে নেমে এলো।

পায়ের তলার ভূমি শক্ত অনুভূত হতেই আলতা নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু যে মানুষটি তাকে পতন থেকে বাঁচাল, তাকে একঝলক দেখার তাগিদে পেছনে ফিরতেই বুকটা ধক করে উঠল তার। তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। কালো মাস্কে ঢাকা তার মুখের সিংহভাগ, মাথায় নিচু করে পরা বড়সড় একটা বেসবল ক্যাপ।

আলতা কয়েকবার চোখের পলক ফেলে তাকিয়ে রইল। অচেনা ছদ্মবেশের আড়ালেও মানুষটাকে কেমন যেন পরিচিত মনে হলো তার। এদিকে লোকটা যেন তার চেয়েও দ্বিগুণ অবাক হলো এই অনাকাঙ্ক্ষিত সান্নিধ্যে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে লোকটা আলতার চোখের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই বিস্ময়ে বড় হয়ে এল তার চোখজোড়া।

সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকাল লোকটা। আলতা যেন নিজের জায়গাতেই জমে গেছে। লোকটার চোখজোড়া ধূসর। সেই চোখজোড়া দেখেই এক লহমায় আলতার পুরো শরীর হিম হয়ে এলো। চোখে চশমা না থাকলেও আলতার অনুমেয় হলো এই চোখজোড়ার মালিক তার স্বামী মহোদয় ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না।

ধীরে ধীরে মুখ নিচু করে নিজের বাম হাতটার দিকে তাকাল ছদ্মবেশী রঞ্জক। একটু আগেই তো এই হাত দিয়েই আলতাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে সে। মুহূর্তেই ব্যাপারটা চরম বিরক্তির কারণ হয়ে উঠল তার কাছে। পকেট থেকে একখানা রুমাল বের করে বাম হাতটা মুছতে গিয়েও মাঝপথে থেমে গেল সে।

আড়চোখে পাশ ফিরে দেখল, আলতা দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে তার প্রতিটা নড়াচড়া লক্ষ্য করছে। এমুহূর্তে এমন আচরণ করলে মেয়েটা তাকে চিনে ফেলবে, যা সে চাইছে না। তাই রুমালটা দিয়ে সে ঘাম মোছার বাহানায় নিজের ঘাড় মুছতে মুছতে এস্কেলেটরে উঠে গেল। 

আলতাকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেলসওম্যানের চাউনি সরু হয়ে এল। ধারণা করে নিল আলতার মধ্যে সামান্য কৃতজ্ঞতা বোধটুকুও নেই। লোকটা তাকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাল, অথচ একটা ‘ধন্যবাদ’ জানানোর সৌজন্যতাটুকুও দেখাল না!

“ওপরে যাওয়ার কি আর অন্য কোনো উপায় নেই?”

সেলসওম্যান নিজের অসন্তোষ চেপে বলল, “এলিভেটর আছে ম্যাম। আমি আপনাকে চারপাশের গ্ল্যামারাস পরিবেশটা দেখাতে চাইছিলাম তো তাই এস্কেলেটর ব্যবহার করতে চেয়েছি।”

আলতা একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় স্বীকার করল, “আসলে… এই ধরনের সিঁড়িতে ওঠার অভ্যাস নেই আমার।”

সেলসওম্যান ভারী অবাক হলো। তবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল, “ওহ, আচ্ছা! চলুন তাহলে, আমরা এলিভেটর দিয়েই ওপরে যাই।”

***

ছয় তলায় এসেই আলতা এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অবশেষে সে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সংগ্রহ করার সুযোগ পেয়েই গেছে। সেলসওম্যান তাকে নিয়ে গেল সেই তলার সবচেয়ে বড় আর আলোকোজ্জ্বল আউটলেটটায়। দোকানের সেলসম্যানরা নিজেদের ব্র্যান্ডের একেকটি প্রসাধনী নিয়ে তার সামনে ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে শুরু করল।

আলতা সেসব চকচকে কৌটো আর প্রসাধনী একপাশে সরিয়ে রেখে নিচু স্বরে বলল, “আমাকে এমন কিছু দিন যা দাগ লুকাতে সাহায্য করবে… আর অনেকক্ষণ স্থায়ী হবে।” আলতার কণ্ঠ জড়িয়ে আসছিল, তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে কোনোমতে শব্দ কটি উচ্চারণ করল সে। 

দোকানদার আলতার কথা শুনে বেশ কয়েক রকমের প্রোডাক্ট বের করে কাউন্টারে রাখলেন। তন্মধ্যে আলতার গা-ঘেঁষে এসে দাঁড়াল সেই দীর্ঘদেহী পুরুষটি। পকেট থেকে একটি কাগজের টুকরো বের করে কাউন্টারে ছুড়ে দিয়ে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “গিভ মি দ্য প্রোডাক্টস অন দিজ লিস্ট।”

কথাটা শুনে আলতা চমকে তাকাল পাশে। রঞ্জক তখনও টের পায়নি কার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে। দোকানের একজন প্রবীণ সেলসম্যান ততক্ষণে কাগজের টুকরোটি তুলে নিয়ে রঞ্জকের চাহিদামতো জিনিসগুলো গুছিয়ে দিতে লাগলেন। রঞ্জক এখানকার রেগুলার কাস্টমার। তাই নামগুলো বারবার পড়ে দেখারও কোনো প্রয়োজন পড়ল না।

“ম্যাম, এই কনসিলারটা হাই কভারেজ। দাগগুলো বেশ ভালোভাবে ঢেকে রাখবে। আর এই ক্রিমটা নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বক ভেতর থেকে নিরাময় করতেও সাহায্য করবে।”

সেলসওম্যানের এই কথাগুলো কানে যেতেই রঞ্জক কৌতূহলী হয়ে পাশ ফিরে তাকাল, আর সাথে সাথেই পুনরায় মুখোমুখি হলো আলতার! মাস্কের আড়ালেই বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে উঠল সে, “এই মেয়েটা দেখছি আমার পিছুই ছাড়ছে না। বাই দ্য ওয়ে, ও এখানে করছে টা কী?”

আলতার ত্রস্ত চোখজোড়া তখন রঞ্জকের ওপরেই থমকে ছিল। তখনই সেলসওম্যান আলতার মনোযোগ কাড়তে আবার বলে উঠল, “ম্যাম, আপনি যদি স্পষ্ট করে বলতেন যে দাগগুলো কীসের; কোনো পোড়া দাগ, ব্রণ নাকি চোট পাওয়ার কালশিটে? তাহলে আমি আপনাকে একদম সঠিক প্রোডাক্ট গুলো দিতে পারতাম।”

মেয়েটির প্রশ্ন শুনে রঞ্জকের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সরু হয়ে এলো। পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে দেখে আলতা তাড়াহুড়ো করে বলল, “আপনি… আপনি যেকোনো একটা দিয়ে দিন!”

আলতা মূলত কথা বাড়াতে চাইছিল না, কিন্তু সেলসওম্যান নাছোড়বান্দা! সে জোর দিল, “আরে ম্যাম, লজ্জা পাবেন না! আপনি দাগের ধরনটা খুলে বলুন, তা না হলে ভুল প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে কিন্তু দাগ ঢাকবে না। উল্টো সমস্যাও হতে পারে।”

আলতার শরীর কাঁপতে লাগল। রঞ্জকের সমস্ত মনোযোগ যে এখন তার ওপরেই নিবদ্ধ এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে নিজে অন্যদিকে মুখ করে থাকলেও হলফ করে বলতে পারে রঞ্জক এমুহূর্তে কান খাড়া করে তার উত্তরটা শোনার অপেক্ষা করছে। 

আলতা মনে মনে চাইছিল দাগের ধরন বলে উপযুক্ত প্রোডাক্ট গুলোই নিতে, কিন্তু এই পাথরের মতো কঠিন লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে সে কীভাবে বলবে তার শরীরের দাগগুলো কোন ধরনের?”

“স্যার, আপনার সবগুলো প্রোডাক্ট প্যাক করা শেষ।” কাউন্টারের লোকটির আকস্মিক হস্তক্ষেপে রঞ্জকের ধ্যান ভাঙল। সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে বিল মিটিয়ে দিল। তারপর আলতাকে দেখার জন্য পুনরায় ঘাড় বাঁকাতেই দেখল, পাশে কেউ নেই! কিশোরী যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!

ঝট করে শোরুমের বিশাল কাঁচের দরজার দিকে চোখ ফেরাতেই রঞ্জক হতবাক হয়ে গেল। আলতা তখন শাড়ির কুঁচি ধরে উল্টো মুখে হাওয়ার বেগে দৌড় লাগিয়েছে! আর তার পেছন পেছন হাঁসফাঁস করতে করতে ছুটে যাচ্ছে সেলসওম্যানটি! রঞ্জক থম মেরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। নিজের মাথা খাটিয়েও সে বুঝে উঠতে পারল না, ঠিক কী ঘটে গেল এইমাত্র! মেয়েটা এভাবে কেন দৌড় লাগালো? তাকে কোনোভাবে চিনে ফেলল না তো?

“স্যার, এনিথিং এলস?” সেলসম্যানের প্রশ্নে রঞ্জক চমকে উঠে নিজের ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এলো। তারপর গম্ভীর মুখে শপিং ব্যাগটা তুলে নিয়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল।

অন্যদিকে শপিংমলের মস্ত এক পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল আলতা। রঞ্জককে চলে যেতে দেখে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। পেছনে দাঁড়িয়ে সেলসওম্যান একাধারে প্রশ্নবাণে তাকে জর্জরিত করে চলেছে, “ম্যাম! কী হলো আপনার? এভাবে হঠাৎ ছুট লাগালেন কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?”

আলতা পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিল। তারপর অত্যন্ত নরম স্বরে মিথ্যে বলল, “আ—আসলে, টয়লেটে যেতে হবে।”

​“ওহ! আগে বলবেন তো ম্যাম! চলুন, আমি আপনাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাচ্ছি।”

আলতা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে তার পিছু পিছু চলে গেল।

***

প্রয়োজনীয় মেক-আপ আর প্রসাধনী সরঞ্জাম সংগ্রহ করার পর আলতা আবার আরিজ মাহতাবিরের কাছে ফিরে এলো। আলতাকে সাথে নিয়ে আরিজ মাহতাবির সোজা চলে এলেন ফ্যাশন হাউজের একদম টপ ফ্লোরে অবস্থিত এক আভিজাত্যপূর্ণ রেস্তোরাঁয়। 

​আরিজ মাহতাবির অত্যন্ত নিপুণ হাতে কাঁটাচামচ আর নাইফ দিয়ে খাবার উপভোগ করছিলেন। অন্যদিকে, আলতার চোখ আটকে ছিল প্লেটের পাশে রাখা অদ্ভুত আকৃতির রূপালী কাঁটাচামচটায়। হাতজোড়া কোলে গুটিয়ে রেখে সে চুপচাপ বসে ছিল। তার অভিব্যক্তি খেয়াল করে আরিজ মাহতাবির একপলক তাকালেন। আলতার মাথায় ঘোমটা টানা থাকলেও, তার সুশ্রী মুখখানায় ফুটে ওঠা সংকোচ বেশ স্পষ্ট।

মেয়েটির দ্বিধা বুঝতে পেরে আরিজ মাহতাবিরের চোখদুটো নমনীয় হয়ে এলো। স্নেহমাখা স্বরে বললেন, “তুমি চাইলে হাত ব্যবহার করেই খেতে পারো, বউমা।”

শ্বশুরের কথায় আলতা আশ্বস্ত হয়ে মাথা নাড়ল। চামচটা একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের চিরচেনা অভ্যাসে হাত দিয়েই খেতে শুরু করল সে। তাকে স্বাভাবিকভাবে খেতে দেখে আরিজ মাহতাবিরের মনে স্বস্তি নেমে এলো।

খাবার শেষ করে তিনি আলতাকে নিয়ে এলেন ফ্যাশন হাউজের এক এক্সক্লুসিভ গহনার দোকানে। দোকানের সামনে এসে আলতার চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। স্বর্ণ, রুপা আর হরেক রকমের মূল্যবান রত্নখচিত গহনার আলোকচ্ছটায় পুরো জায়গাটা যেন ঝলমল করছে।

​দোকানের দোরগোড়াতেই আলতার পা দুটো থমকে গেল। অত চকচকে পরিবেশের সামনে নিজের অস্তিত্বকে কেমন যেন বেমানান লাগলো তার। বউমাকে থেমে যেতে দেখে আরিজ মাহতাবির পেছনে ফিরে তাকালেন, “থেমে গেলে কেন, বউমা? ভেতরে এসো।”

​আলতা দ্বিধায় পড়ে আনমনেই প্রশ্ন করে বসল, “এখানে কেন?”

আরিজ মাহতাবির মৃদু হেসে আলতার দিকে দু-পা এগিয়ে এলেন। গলার স্বর আরও নরম করে বললেন, “তেমন কিছুই না বউমা। পুত্রবধূকে ঘরে তুললাম, অথচ এখন পর্যন্ত কিছু দিতে পারলাম না। ব্যাপারটা কেমন দেখায়? তোমার শাশুড়ি থাকলে আমাকে এগুলো নিয়ে ভাবতে হতো না। সে যখন নেই, তখন আমাকেই তো ভাবতে হবে তাই না?”

কথাটা আলতাকে চমকে দিল। এই ভাবনাটা মাথাতেই আসেনি তার। সত্যিই তো, বাড়িতে কত আত্মীয়স্বজনকেই দেখেছে সে। অথচ নিজের শাশুড়িকে কোথাও দেখেনি।

“কোথায় তিনি?” প্রশ্নটা যেন অজান্তেই আলতার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো।

আরিজ মাহতাবির একটু থামলেন। চোখের দৃষ্টি সামান্য দূরে কোথাও আটকে রেখে বললেন, “কে? তোমার শাশুড়ি?”

​আলতা ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। আরিজ মাহতাবিরের মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে গেল। তিনি হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে ধীরকণ্ঠে বললেন, “আমার প্রথম স্ত্রী গুঞ্জনের জন্মের কিছুদিন পরেই মা`রা যান। এরপর তোমার শাশুড়িকে ঘরে আনি। কিন্তু তিনিও রঞ্জক ছোট থাকতেই এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।”

আলতা থমকে গেল। তার মানে, গুঞ্জন আর রঞ্জক একই বাবার সন্তান হলেও তাদের মা আলাদা?

“কী ভাবছো?”

আলতা ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল। আরিজ মাহতাবির তাকে নিয়ে ভেতরে অগ্রসর হলেন। সেখানকার ম্যানেজার যেন আগে থেকেই সব প্রস্তুতি নিয়ে তাদের অপেক্ষায় ছিলেন। আরিজ মাহতাবির এগিয়ে যেতেই তিনি একে একে কয়েকটি বড় বাক্স খুলে সামনে ধরলেন। গহনাগুলো আগেই গড়ানো ছিল; প্রতিটির সূক্ষ্ম কারুকাজ চোখে পড়ার মতো।

আরিজ মাহতাবির গহনার বাক্সের ওপর দৃষ্টি রেখে বললেন, “তোমার বড় শাশুড়ি যখন জানতে পারেন তার কোলজুড়ে ছেলেসন্তান আসছে, তখন থেকেই তিনি হবু পুত্রবধূর জন্য গহনা বানিয়ে রাখতে শুরু করেন। আমি একদিন কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এত তাড়া কিসের?’ তিনি তখন কথাটি হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজ বুঝতে পারি, তার সত্যিই খুব তাড়া ছিল।”

আলতার চেহারার নিস্পৃহ অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন এলো না, তবে সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শ্বশুরের প্রতিটি কথা শুনল। 

আরিজ মাহতাবির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন, “আমি তার রেখে যাওয়া সেই গহনাগুলোর রেফারেন্স দিয়েই এই গহনাগুলো তোমার জন্য বানিয়েছি। দেখো তোমার পছন্দ হয় কী না। যদি মনের মতো না হয়, আমাকে নির্দ্বিধায় বলো, আমি তোমার পছন্দমতো বানিয়ে দেবো। সর্বোপরি গহনা যেহেতু তুমি ব্যবহার করবে, তোমার মনমতোই হওয়া উচিত।”

আলতা বাক্সে থাকা জ্বলজ্বলে গহনাগুলোর দিকে একনজর তাকাল। তারপর একদম ঠাস করে বলে দিল, “আমি এগুলো নিতে পারব না।” 

কথাটা এতোটাই সোজাসাপ্টা আর রুক্ষ ছিল যে ঘরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু আরিজ মাহতাবির শুনেও যেন শুনলেন না। তিনি সম্পূর্ণ শান্ত থাকলেন। কেবল চোখের ইশারায় উপস্থিত দোকানদার ও কর্মচারীদের বাইরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। 

কর্মচারীরা বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই শোরুমের নীরবতা ভেঙে ভারী গলায় আরিজ মাহতাবির বললেন, “আমি চাই না আমার ছোট ছেলের বউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে।”

“কোন অধিকারের কথা বলছেন? আপনার ছেলে তো আমাকে মেনেই নেয়নি। কোনোদিনও মেনে নিতেও পারবে না। আপনি বরং এগুলো তুলে রাখুন সে যাকে পছন্দ করে বিয়ে করে আনবে তার জন্য।” 

আরিজ মাহতাবির অবিশ্বাসভরা চোখে তাকালেন। তিনি ভাবতেও পারেননি আলতা এভাবেও কথা বলতে পারে।

“ভুলে যাও বউমা। ও রাগের মাথায় বলেছে ওসব। ও কোনোদিনও দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না। ভ্যালেনিয়ার পারিবারিক আইন অনুযায়ী দুজনের সম্মতি ছাড়া বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন কার্যকর হয় না। আর প্রথম বউ থাকাকালীন দ্বিতীয় বিয়েকে স্বীকৃতিও দেওয়া হয় না।”

“যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আমি ওনাকে সবসময় মুক্তি দিতে প্রস্তুত।”

আরিজ মাহতাবির বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। “এ তুমি কী বলছ, বউমা?”

“হ্যাঁ, আমি ঠিকই বলছি।” আলতার কণ্ঠস্বর এবার কেঁপে উঠল, “আপনার উচিত হয়নি আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সবকিছু গোপন রেখে ওনাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো।”

​আরিজ মাহতাবির চোখ এড়ানোর চেষ্টা করে বললেন, “বাদ দাও ওসব কথা।”

“আমার মতো একটা মেয়ের জন্য কেন আপনি নিজের ছেলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন?” এহেন প্রশ্নে আরিজ মাহতাবির অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। 

“কারণ তোমার মা তোমাকে এমনি এমনি আমার হাতে তুলে দিতে রাজি ছিল না। তোমাকে রক্ষা করার জন্য আমাকে নিজের ছেলের স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়েছে।”

“তাই বলে একটা বাইরের মেয়েকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের ছেলের স্বার্থ ত্যাগ করবেন?”

আরিজ মাহতাবির শান্ত ভাবে মাথা নাড়লেন, “আমাকে মহান ভেবে ভুল কোরো না। আমি একদমই মহান কেউ নই। শুধু তোমাকে ওমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখার পর মনে হয়েছিল, ওই রকম জীবন তোমার প্রাপ্য নয়।”

আলতার গলা পর্যন্ত কান্না উছলে এলো। শ্বাসনালী যেন বন্ধ হয়ে আসছে; আর একটা শব্দ উচ্চারণ করার মতো শক্তটুকুও হারিয়ে ফেলল সে। কথা বলাও থামিয়ে দিতে বাধ্য হলো। 

আরিজ মাহতাবিরও আর কথা বাড়ালেন না। কর্মচারীকে ডেকে গহনার বাক্সগুলো গুছিয়ে দিতে বললেন। তারপর সেগুলো আলতার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আলতা সেগুলো নিল না। কান্না গুলো গিলে মুখ ফিরিয়ে বলল, “আমার চাই না এসব।”

“এগুলো তোমার, তাই তোমাকে নিতেই হবে।”

“আমার নয়, এগুলো কোনোভাবেই আমার হতে পারে না। উনি যাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবেন, এগুলো শুধুই তার।”

আরিজ মাহতাবির দৃঢ় গলায় বললেন, “তুমিই ওর স্ত্রী। ও তা মানুক কিংবা না মানুক।”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply