Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ৯


#কালারব্লাইন্ড — ০৯

#সোফিয়া_সাফা

পুরো এক ঘণ্টা ধরে পাঞ্চিং ব্যাগে ঘুষি চালানোর পর রাগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে রঞ্জকের। তবু বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা পুরোপুরি কমেনি। কপাল আর কানের পাশ বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। গায়ের শার্টটা শরীরের সঙ্গে এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেন দীর্ঘক্ষণ পানিতে ডুবে ছিল সে। উত্তপ্ত শরীর থেকে তখনও তাপ বেরোচ্ছে; মনে হচ্ছে ত্বকের নিচে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। শ্বাসটাও স্বাভাবিক হতে সময় নিচ্ছে।

​হাতের আঙুলের গাঁটগুলো আঘাতে ফুলে থেঁতলে যাওয়ার উপক্রম। হ্যান্ড র‍্যাপ পেঁচিয়ে নিলে হয়তো এই ক্ষতি এড়ানো যেত। কিন্তু রাগের মাথায় সেদিকেও খেয়াল ছিল না।

​শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে পাঞ্চিং ব্যাগটার কাছ থেকে সরে এলো রঞ্জক। এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে গভীরভাবে শ্বাস নিল। তারপর ক্লান্ত, ভেজা শরীর নিয়ে বেডরুমের দিকে এগোল।

​বেডরুমে ফিরে তুষারকে পেল না সে। ছেলেটা হয়তো বন্ধুর ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছে। তাই তো এভাবে চলে গেল কিছু না বলেই। রঞ্জকের ভেতরে জ্বলতে থাকা আগুন নিভে গেল দমকা হাওয়ায়। তুষার হয়তো খুব ব্যথা পেয়েছে, তাকে এভাবে ঘুষি মারাটা একদমই ঠিক হয়নি। ছেলেটা তো আর জানে না যে ওই পান্না চোখের মেয়েটা রঞ্জকের বিয়ে করা বউ—যাকে সে মেনে নিতে পারছে না।

​“হ্যাঁ, আমি মেনে নিতে পারছি না। তাহলে আমার গায়ে কেন লাগবে? তুষার যা ইচ্ছা বলুক, তাতে আমার কী? ওর সাথে ওমন আচরণ করা ঠিক হয়নি।”

​ভেজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল রঞ্জক। দ্বিতীয়বার গোসল সেরে রুমে ফিরতেই দেখল, ফুপু আরজু বেগম এসেছেন। 

রঞ্জককে দেখেই তিনি বলে উঠলেন, “এই তো, আজ তোকে পেয়েই গেছি! চল, আগে লাঞ্চ করবি, তারপর যেখানে খুশি যাবি।”

​রঞ্জক কোনো কথা বলল না। ফুপুর সঙ্গে চলে গেল খাবার খেতে। ডাইনিং টেবিলে বাড়ির সবাই উপস্থিত থাকলেও আলতা আর আরিজ মাহতাবির ছিল না। যদিও আলতাকে এ বাড়ির সদস্য বলে কেউ গণ্যই করে না।

রঞ্জক চেয়ার টেনে বসতেই ধারার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে চটপট নিজের হাতে রান্না করা খাবারগুলো রঞ্জকের পাতে তুলে দিতে দিতে বলল, “আজ আমি মুগের ডাল আর চিকেন কোপ্তা রান্না করেছি। খেয়ে দেখ তো, কেমন হয়েছে?”

​ফারিশ আঁড়চোখে বড়বোনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “আমাকে তো কোনোদিন এমন হেসে হেসে খাবার পরিবেশন করিস না!”

​ধারা সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে মুখ বাঁকাল। টেবিলে বসে থাকা ধারার মেয়ে ইরা বলে উঠল, “কারণ তুমি তো কখনো খাবার খেয়ে মায়ের প্রশংসা করো না, ছোট মামা! তাই মা-ও তোমাকে হেসে হেসে খাবার দেয় না।”

​ধারা ভ্রূ নাচিয়ে মেয়ের কথায় তাল দিল, “বুঝলি ইরা, তোর ফারিশ মামা প্রশংসা করতেই জানে না। জানলে ওর পাতেও আমি হাসতে হাসতে খাবার তুলে দিতাম।”

​ফারিশ চোখ উল্টে বলল, “প্রশংসার যোগ্য হলে তো করব! ফারিশের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া কি এতই সহজ? রান্নায় আরও এফোর্ট দে, বলা তো যায় না, কোনো একদিন হয়তো করেও ফেলতে পারি।”

​“এ্যাঁহ! তোর প্রশংসা শোনার জন্য আমি রান্না করি নাকি? আমার ভালো লাগে, তাই করি। নিজে তো খাবার দেখলে লোভ সামলাতে পারিস না। নেহাত অন্যদের পেট ব্যথা করবে তাই তোকে খেতে দিই, নইলে তোকে খেতে কে দেয়, হুহ!”

​কথাটা গায়েই মাখল না ফারিশ, নির্ভাবনায় খেতে লাগল। ধারা ভাইকে জ্বালানোর সুযোগ পেয়ে আবার বলল, “কত বড় নির্লজ্জ দেখেছ, এখনো ঠুসেই যাচ্ছে! একটাবার প্রশংসা করলে যেন ওর জাত চলে যাবে!”

​“পরেরবার চেষ্টা করব। এখন খেতে দে তো! খাওয়ার সময় এত কথা বলতে নেই, খিদে মরে যায়।”

​“অলওয়েজ এটাই বলিস…”

ধারা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ রঞ্জকের হাতের দিকে নজর পড়তেই থমকে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হাতের এ কী অবস্থা করেছিস, আরএম?”

রঞ্জক প্লেটে হাত দিতে যাবে, তার আগেই আরজু বেগম তার হাতটা ধরে ফেললেন, “কই, কী হয়েছে দেখি?”

​“তেমন কিছুই হয়নি, ফুপি। সামান্য চোট পেয়েছি, সেরে যাবে।”

​আরজু বেগম আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। কী-ই বা প্রশ্ন করবেন? বক্সারদের হাতের অবস্থা এমন হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। এর চেয়েও অনেক বড় বড় ব্যথা পাওয়ার ইতিহাস আছে তার!

“আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”

​“আমিই খেতে পারব, ফুপি। ব্যথা তো হাতের ওপরের অংশে পেয়েছি।”

​“হাতটাকে একটু বিশ্রাম দে!” বলতে বলতেই আরজু বেগম ভাত মেখে রঞ্জকের মুখের সামনে ধরলেন।

​রঞ্জক হাঁ করতে যাবে, তার আগেই তাঁরা বলে উঠল, “যে রান্না করেছে আর যে খাইয়ে দিচ্ছে, দুজনেই কিন্তু তোমার বউকে স্পর্শ করেছিল, আরএম ব্রো!”

​চমকে তাকাল রঞ্জক। তাঁরা নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে খাবার চিবোতে চিবোতে কথাটি বলল। রঞ্জক এবার তাঁরার দিক থেকে চোখ সরিয়ে একনজর ধারার চুপসে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল। তারপর চোখ ফেরাল ফুপুর দিকে।

​আরজু বেগম নিচু স্বরে বললেন, “তখন তো আমরা জানতাম না যে তুই ওকে মেনে নিবি না! তুই নিষেধ করার পর আমরা কেউ আর ওর ধারেকাছেও যাইনি।”

​অজান্তেই রঞ্জকের বাঁ হাতের তালু চুলকাতে শুরু করল। মনে পড়ে গেল শপিংমলের ঘটনাটা, সে নিজেও তো মেয়েটাকে ছুঁয়ে ফেলেছিল! চোখ বুজে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করতে লাগল সে। 

আরজু বেগম ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত চোখে তাকালেন তাঁরার দিকে। তাঁরা খেতে খেতেই চোখাচোখি করল ফুপুর সঙ্গে, তারপর উপহার দিল মিষ্টি একটা হাসি। গা জ্বলে গেল আরজু বেগমের। তাঁরা মেয়েটা সবকিছুতে বাড়াবাড়ি করে আনন্দ পায়। খোঁচাখুঁচি না করলে যেন গলা দিয়ে খাবারই নামে না মেয়েটার।

​রঞ্জক কিছুক্ষণ স্থির থেকে চোখ মেলে বলল, “খাইয়ে দিলে দাও, নয়তো যেতে দাও আমাকে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে।”

​আরজু বেগম একটু থতমত খেয়ে গেলেন। তারপর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রঞ্জকের মুখে খাবার তুলে দিলেন। তাঁরার মুখের হাসিটা নিমেষেই মিলিয়ে গেল; আর তা দেখে ধারা না হেসে পারল না।

​ধারার মা সালিহা খাতুন টেবিলে থাকলেও তেমন কোনো কথা বলছেন না। ছেলেমেয়েদের খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। 

এমন সময় হঠাৎ আরিজ মাহতাবিরের গলা ভেসে এল, “সালিহা! মালেকা! আরজু! কোথায় তোমরা? এদিকে এসো দ্রুত!”

​মালেকা বেগম তখন খেতে বসেছিলেন, আর আরজু তো রঞ্জককে খাইয়ে দিচ্ছেন। বাকি রইলেন সালিহা খাতুন। তিনি এগিয়ে গেলেন ড্রয়িংরুমের দিকে। সেখানে আরিজ মাহতাবিরের পাশে এক মধ্যবয়সী পুরুষ ও মহিলাকে দেখে সামান্য অবাক হলেন। 

পুরুষটি বিস্ফারিত চোখে চারপাশে তাকিয়ে চলেছেন, আর মহিলাটি ভদ্রতা সামলানোর চেষ্টায় বারবার নিজের সাধারণ শাড়ির আঁচল ঠিক করতে ব্যস্ত।

​সালিহা খাতুনের দৃষ্টি আটকে গেল মহিলাটির ওপর। তার চাউনি দেখে মহিলাটি দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে আরও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। 

আরিজ মাহতাবির পরিচয় করিয়ে দিলেন, “উনি হলেন আলতার বাবা, জনাব মাহমুদ রেহবার। আর উনি হলেন আলতার মা, ইছাপূর্ণা।”

​শেষের নামটা কর্ণগোচর হতেই বড় বড় হয়ে গেল সালিহা খাতুনের চোখজোড়া। বিস্ময় চেপে বললেন, “তাই তো বলি, বউমাকে এত চেনা চেনা লাগছিল কেন! আলতা তাহলে পূর্ণার মেয়ে? পূর্ণা, তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না! এ কী হাল করেছ নিজের?”

​আরিজ মাহতাবির একবার তাকালেন ইছাপূর্ণার দিকে। ইছাপূর্ণা যেন আরও খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে গেলেন। তবুও কণ্ঠস্বর সোজা রেখে বললেন, “বয়স বেড়েছে তো সাহেবা, তাই হয়তো এমন দেখাচ্ছে।”

সালিহা খাতুন কথাটা মানতে পারলেন না, “বিশ্বাস করো, শুধু তোমার চোখ দুটোই যা চেনা যাচ্ছে! পরিচয় না দিলে একদম চিনতেই পারতাম না। বউমাকে দেখার পর থেকেই তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। বলতেই হচ্ছে, বউমা যেন তোমারই যুবতীকালের প্রতিচ্ছবি।”

​কথাটা বলে চওড়া হাসলেন সালিহা খাতুন। আরিজ মাহতাবির গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন। সালিহা খাতুন জিভ কেটে চট করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললেন, “ভাইয়া, আপনি আগে কেন বললেন না যে আলতা পূর্ণার মেয়ে?”

“ভেবেছিলাম ওনার কথা তোমাদের মনে নেই তাই আর বলিনি।”

​“কী যে বলেন ভাইয়া! পূর্ণার সঙ্গে আমাদের পরিচয় কি এক-দুদিনের যে ভুলে যাব?”

​“তাও ঠিক। মালেকা আর আরজু কোথায়?”

​“ওরা ডাইনিংয়ে খাচ্ছে। আপনারা ভেতরে এসে বসুন, আমি সবাইকে ডেকে আনছি।”

​বলেই সালিহা খাতুন ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু ইছাপূর্ণা ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলেন, “আমি আমার মেয়ের কাছে যেতে চাই! ও এখন কোথায়? আমাকে আগে ওর কাছে নিয়ে চলুন।”

​সালিহা খাতুন সৌজন্যমূলক হেসে বললেন, “বউমার সঙ্গে তো দেখা হবেই! আপনারা আগে সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিন, কিছু খাওয়াদাওয়া করুন। বাড়ির সবাই এখন একসঙ্গেই আছে, কিছুক্ষণ পরই আবার ছেলেরা নিজ নিজ কাজে বেরিয়ে যাবে।”

​মাহমুদ রেহবার যেন উক্ত কথাটার জন্যই ওত পেতে ছিলেন! তিনি অতশত না ভেবে একগাল হেসে বলে উঠলেন, “হ, আমার মেলা ক্ষুধা লাগছে! আগে খাইয়া লই, হেরপর মাইয়ার লগে দেহা করতে যামুনে।”

​সালিহা খাতুনের মুখের হাসি ম্লান না হলেও ইছাপূর্ণার মুখ এক লহমায় ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কত বুঝিয়ে-শুনিয়ে যে লোকটাকে তিনি এখানে নিয়ে এসেছেন! অথচ লোকটা নিজেকে সংযত রাখতেই পারলেন না।

​“হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলুন আগে। কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।”

​সালিহা খাতুনের পিছু পিছু মাহমুদ রেহবার হাঁটা শুরু করতেই পেছন থেকে ইছাপূর্ণা খপ করে টেনে ধরলেন স্বামীর হাত। মুহূর্তেই লোকটা ঘাড় বাঁকিয়ে আক্রমণাত্মক দৃষ্টিতে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। ইছাপূর্ণা ঘাবড়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিলেন হাতটা। 

দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করে আরিজ মাহতাবির আশ্বাসের সুরে বললেন, “ওনাকে যা খুশি করতে দিন, আমি দেখছি বাকিটা। আর আপনিও চলুন, সময় তো কম হলো না, দুপুরের খাবারটা সেরে নেওয়া দরকার।”

​কথার শব্দ পেয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা সবার নজরই তখন ড্রয়িংরুমের দিকে। রঞ্জকের দৃষ্টিও সেদিকেই ছিল। সে আনমনে মুখের খাবার চিবোতে চিবোতে তাকিয়ে ছিল। 

চোখের পলকেই মাহমুদ রেহবার আচমকা একটা চেয়ার টেনে খেতে বসে পড়লেন। সবাই হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকাল। কোনো কথা নেই, বার্তা নেই—হুট করে কেউ এভাবে খেতে বসে পড়লে অবাক হওয়ারই কথা! মুখের খাবারটুকু আর গলাধঃকরণ করতে পারল না রঞ্জক। 

নিজের শ্বশুরকে চেনে সে, বিয়ের দিন দেখেছিল। তবে লোকটাকে এভাবে আগ বাড়িয়ে খেতে বসে পড়তে দেখে একদম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে সে।

​আরিজ মাহতাবির নিজে একটি চেয়ার টেনে ইছাপূর্ণাকে বসতে ইশারা করলেন। কিন্তু মহিলা বসলেন না; স্বামীর এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে ততক্ষণে লজ্জায় হাঁসফাঁস অবস্থা তার। 

আরিজ মাহতাবির পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে বললেন, “ওনারা আলতার বাবা-মা। পরিচয় জেনে নিয়েছো? এবার সবাই খাওয়ায় মন দাও।”

সকলে খাওয়ায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলেও আড়চোখে রঞ্জকের মুখের দিকে তাকাল। নিজের ওপর সবার এই চাউনি কেমন যেন বিদ্রুপাত্মক ঠেকলো রঞ্জকের কাছে। সে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে প্রস্থান করতে উদ্যত হলো। 

ইছাপূর্ণা অসহায় চোখে তাকালেন তার দিকে; যেন তিনি রঞ্জকের অসন্তোষ টের পেলেন। কিছু কথা তার গলা অবধি উঠে এলেও মুখ ফুটে বলতে পারলেন না।

​“রঞ্জক! ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসো, তোমার শাশুড়ি তোমাকে কিছু বলতে চাইছেন।” বলে উঠলেন আরিজ মাহতাবির।

​বাবার কথায় তীক্ষ্ণ চোখে একবার তাকাল রঞ্জক। তারপর চুপচাপ ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল। ইছাপূর্ণা খানিকটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন। তিনি কিছু বলতে চান, এটা আরিজ কীভাবে বুঝলেন? তার মনের ভাব কি এতটাই সুস্পষ্ট?

​“আপনি আসার সময় বলেছিলেন রঞ্জককে কিছু দিতে চান, সেইজন্যই ওকে বসতে বললাম।” আরিজ মাহতাবিরের এই কথায় যেন একটু স্বস্তি পেলেন ইছাপূর্ণা।

​আরিজ সবার অগোচরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলতার বাবার দিকে তাকালেন। লোকটা এমনভাবে গোগ্রাসে গিলছে, যেন খাবার খাওয়ার ন্যূনতম ভদ্রতাটুকুও তার জানা নেই! দুজন গৃহকর্মী একযোগে খাবার পরিবেশন করতে গিয়েও হিমশিম খাচ্ছেন।

​অনেকবার খেতে বলার পরও ইছাপূর্ণা সবার সঙ্গে টেবিলে বসে খেতে রাজি হলেন না। তিনি কীভাবে সবার সঙ্গে একই টেবিলে বসে খাবেন? যেখানে এক সময় তিনি এই বাড়ির গৃহকর্মী ছিলেন! আজ না হয় আত্মীয়ের পরিচয় তৈরি হয়েছে, কিন্তু নিজের অবস্থান ভুলে যাননি তিনি।

​রঞ্জক জানে না ঠিক কী শোনার জন্য সে ড্রয়িংরুমে এসে বসেছে। শুধু জানে, বিষয়টা এড়িয়ে যেতে পারছে না সে। খাবার খেতে অনাগ্রহী ইছাপূর্ণাকে নিয়ে আরিজ আর দেরি না করে রঞ্জকের সামনে হাজির হলেন। তিনি অবশ্য ততটা আশা রাখেননি যে রঞ্জক ইছাপূর্ণার কথা শুনতে আগ্রহ দেখাবে। তাই ছেলেকে ড্রয়িংরুমে অপেক্ষা করতে দেখে মনে মনে কিঞ্চিৎ খুশি হলেও মুখে তা প্রকাশ করলেন না।

ইছাপূর্ণা বুঝে উঠতে পারলেন না কীভাবে কথা শুরু করবেন। রঞ্জকও আগ বাড়িয়ে কিছু বলছে না। আরিজ মাহতাবির তাদের মাঝখানে হস্তক্ষেপ করলেন না; ইছাপূর্ণার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তাদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রঞ্জকের দৃষ্টি আচমকা স্থির হলো। ছেলের তাকানো দেখে আরিজ মাহতাবির দূরত্ব বাড়িয়ে দাঁড়ালেন। 

রঞ্জক বেশিকিছু ভাবতে যাবে তার আগেই আরিজ মাহতাবির বললেন, “আপনি বসুন না বেয়াইন সাহেবা! দাঁড়িয়েই কথা বলবেন নাকি?”

​ইছাপূর্ণা একবার সোফার দিকে তাকালেন। এত দামি সোফায় বসতে হয়তো কুণ্ঠাবোধ হচ্ছিল তার। তবুও রঞ্জকের সামনে নিজের অস্বস্তি প্রকাশ করলেন না। রঞ্জকের পাশেই একটা আসন খালি রেখে বসে পড়লেন। রঞ্জক শুধু তাকিয়েই রইল একটা শব্দও উচ্চারণ করল না।

​“কেমন আছ, বাবা?” ইতস্তত করে প্রশ্ন করলেন ইছাপূর্ণা।

​“যেমন রেখেছেন আপনারা।”

​এমন উত্তরে আরও বিবর্ণ হয়ে গেল আলতার মায়ের মুখশ্রী। বলার মতো আর কিছুই খুঁজে পেলেন না তিনি।

রঞ্জক খানিকক্ষণ নীরব থেকে বলল, “আপনার আর কিছু বলার না থাকলে আমি উঠি?”

​ইছাপূর্ণা তড়িঘড়ি করে কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগটার চেইন খুলে ভেতরে হাতড়াতে লাগলেন। রঞ্জক উঠতে গিয়েও শাশুড়ির এমন তৎপরতা দেখে থমকে গেল। ইছাপূর্ণা চটজলদি ব্যাগ থেকে একটা ওয়াচবক্স বের করে রঞ্জকের সামনে তুলে ধরে বললেন, “এই সামান্য উপহারটি আমি তোমার জন্য এনেছি বাবা। যদি তুমি নাও তাহলে আমি খুব খুশি হবো।”

​রঞ্জক চোখ নামিয়ে ওয়াচবক্সের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কাচের বাক্সের ভেতরে ঝকঝক করছে একটি কালো চেইনের হাতঘড়ি। ওপর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঘড়িটা মোটেও সস্তা নয়, রীতিমতো দামি ব্র্যান্ডের রিস্টওয়াচ।

​“নিয়ে নাও, রঞ্জক।” বাবার কথায় ধ্যানভঙ্গ হলো তার। 

কেমন যেন দোটানায় পড়ে গেল রঞ্জক। নেবে, নাকি নেবে না? কীভাবে ফিরিয়ে দেওয়া যায় ভাবতে ভাবতেই আরিজ আবারো তাড়া দিলেন, “তোমার না কাজ আছে? তাহলে দেরি করছ কেন? তাড়াতাড়ি নিয়ে নাও।”

​“এসবের কোনো দরকার নেই।” মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে শীতল গলায় বলে দিল রঞ্জক। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একপ্রকার পালিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন আরিজ মাহতাবির। ফিসফিস করে বললেন, “তুমি ওটা না নিলে ওনার ভীষণ খারাপ লাগবে, রঞ্জক। উনি হয়তো অনেক কষ্ট করে তোমার জন্য ওটা জোগাড় করে এনেছেন। না নিলে ওনার সব কষ্ট বিফলে যাবে।”

রঞ্জক চাপা স্বরে বলল, “তো আমি কি ওনাকে আনতে বলেছি?”

​“তুমি বলোনি, কিন্তু উনি ওটা তোমার জন্যই তো এনেছেন! চুপচাপ নিয়ে নাও রঞ্জক, সামান্য একটা বিষয় নিয়ে আমি কোনো সিন ক্রিয়েট করতে চাইছি না।”

​মেজাজ চড়ে গেল রঞ্জকের। তবুও ব্যাপারটা বেশিদূর গড়াতে দিল না। সামান্য একটা ঘড়িই তো নিতে হবে, নিয়ে নেবে সে।

​“একবার শুধু এমপি হয়ে নিই, তারপর তোমাকে দেখে নেব আমি! আমাকে যতটা জ্বালাচ্ছ, এর চেয়ে যদি ১০০ গুণ বেশি না জ্বালিয়েছি তোমায়, তবে আমার নামও রঞ্জক মাহতাবির নয়!” বিড়বিড় করে কথাটা বলে শাশুড়ির দিকে ফিরে তাকাল রঞ্জক।

​ইছাপূর্ণার মুখটা শুকিয়ে একেবারে এতটুকু হয়ে গেছে। মহিলার চেহারার এই দশা দেখে রঞ্জকের বিরক্তির পারদ আরও চড়ল। ওটা না নেওয়াতে মহিলা এতোটা কষ্ট পাবেন এ তার ধারণার বাইরে ছিল। আজব তো! এখানে কষ্ট পাওয়ার কী আছে? ইছাপূর্ণা কি জানেন না রঞ্জক এই বিয়েতে খুশি নয়? খুশি না হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়? তারপরও কেন এসব আনতে গেলেন?

ইছাপূর্ণা জেনেশুনে রঞ্জকের কাটা ঘায়ে নুন ছিটাবে তাতে কোনো দোষ নেই, এখন রঞ্জক চেঁচিয়ে উঠলেই সব দোষ তার? এটাই জগতের নিয়ম তুমি ঠিক ততোক্ষণ ভালো থাকবে যতক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করে নেবে। কিচ্ছুটি বলবে না, কোনো প্রতিবাদও করবে না।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই রঞ্জক এগিয়ে গেল শাশুড়ির দিকে। সে যতোই এগিয়ে যাচ্ছে ইছাপূর্ণার মুখ পুলকিত হয়ে উঠছে। অকারণেই ইছাপূর্ণার মুখের এই পরিবর্তনটুকু রঞ্জককে অস্বস্তিতে ফেলল। সে চোখ সরিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল ঘড়িটা নেওয়ার জন্য। কিন্তু ইছাপূর্ণা নিজের হাতে ঘড়িটা পরিয়ে দিতে চাইলেন। তিনি বক্স খুলে ঘড়িটা বের করলেন। রঞ্জকের হাতটা ধরে উল্টো করতেই রঞ্জক চমকে তাকাল। সে ভাবতেও পারেনি ইছাপূর্ণা হুট করে এভাবে হাত ধরবে তার। 

​“একি, তোমার হাতের এই অবস্থা কেন?” ইছাপূর্ণার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা উপচে পড়ল।

ইছাপূর্ণার উৎকণ্ঠা দেখে আরিজ মাহতাবিরও উঁকি দিয়ে ছেলের হাতটা দেখলেন। রঞ্জক শুকনো ঢোক গিলল। অবাক হয়ে চেয়ে রইল বাবার দিকে। এর আগে এভাবে তাকে নিজের কোনো বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে দেখেনি সে।

“তোমার নিশ্চয়ই খুব ব্যথা করছে?” ইছাপূর্ণা মমতা মাখা কণ্ঠে প্রশ্নটা করলেন।

​রঞ্জক বাবার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেই জবাব দিল, “খুব…”

​আরিজ মাহতাবির ছেলের জবাব শুনে নজর ফেরালেন তার দিকে। চোখে চোখ মিলতেই দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি অন্যদিকে সরে দাঁড়ালেন।

​রঞ্জক তাচ্ছিল্যের হেসে নিজের কথা সম্পূর্ণ করল, “বেশি নয়। বলা যায়, একটুও ব্যথা করছে না।” 

‘যাদের জিজ্ঞেস করার কেউ থাকে না, তাদের একটুও ব্যথা করে না। কারণ ব্যথারাও তাদের দিকে ফিরে তাকায় না।’ এ কথাগুলো মনে মনেই আওড়াল সে। 

আরিজ মাহতাবির তাড়া দিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি করুন। ওর কাজ আছে।”

“কিন্তু… তোমার চিকিৎসার প্রয়োজন।”

রঞ্জক নিজেকে সামলে এবার একটু নরম সুরে বলল, “আমার সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে। আপনি এই হাতে পরাতে না চাইলে থাকুক। আমাকে এখন বেরোতে হবে।”

ইছাপূর্ণা যেন একটু সাহস পেলেন রঞ্জকের কথায়। তিনি যত্নসহকারে ঘড়িটা রঞ্জকের হাতে পরাতে পরাতে বললেন, “আমাদের গাঁয়ে রীতি আছে মেয়ের জামাইকে ঘড়ি ও আংটি দিতে হয়। তোমার আঙুলের মাপ আমি ঠিক অনুমান করতে পারিনি তাই শুধু ঘড়িই এনেছি। এটা ছোট বড় করা যায় তবুও নিজেই পরিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হতে চাইছিলাম। কারণ তুমি যদি ব্যবহার করতে না পারো তাও হয়তো আমাকে বলবে না, তাই না?”

​রঞ্জক ভেবে পেল না উত্তরে তার কী বলা উচিত। তবে যেটুকু বুঝল, সুযোগ পেলে তার শাশুড়ি অনেক গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। তবে কি শাশুড়ির মেয়েটাও সুযোগ পেলে তার সঙ্গে অনেক কথা বলবে? নিজের ভাবনায় ধিক্কার জানালো রঞ্জক। সে এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেই বা কেন?

ঘড়ি পরানো শেষ হওয়া মাত্রই রঞ্জক দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল। তারপর কী যেন ভেবে পেছনে ফিরে বলল, “ধন্যবাদ।”

​“তোমার পছন্দ হয়েছে তো, বাবা?” প্রচণ্ড দ্বিধা নিয়েই প্রশ্নটা করে ফেললেন ইছাপূর্ণা।

​রঞ্জক উত্তরে কেবল মাথাটা একটু কাত করে সায় জানালো। তার ইতিবাচক ইঙ্গিতে খুশি হলেন আলতার মা। 

“হাতের চিকিৎসা করিয়ে নিতে ভুলো না।”

রঞ্জক বলল না কিছুই। একপলক বাবাকে দেখে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

​সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখল রঞ্জক। তারপর তুষারকে ফোন করল, কিন্তু ওপাশ থেকে তুষার কল রিসিভ করল না। রঞ্জক বুঝতে পারল তুষার এবার খুব অভিমান করেছে। আজকের মতো কাজ গুটিয়ে সে বাইক ছুটিয়ে চলে এলো নিজেদের আড্ডাস্থলে—যেখানে সে আর তুষার মাঝেমধ্যেই এসে বসে। জায়গাটা শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবনের ছাদ। বেশ বিপজ্জনক স্থান হওয়াতে এখানে সাধারণ মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। এখান থেকে আলো ঝলমলে রাজধানীর উঁচু-নিচু দালানগুলোকে ঠিক ছোট ছোট খেলনার মতো দেখায়।

রঞ্জক ঠিকই ভেবেছিল, এখানে এলেই তুষারের দেখা পাবে সে। অভিমানী বন্ধুটা ছাদের কিনারায় বসে এক পা নিচে ঝুলিয়ে রেখেছে। রঞ্জক নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে গিয়ে একদম তার গা ঘেঁষে বসল। বেশ অনেকক্ষণ নীরবে বসে রইল দুজনেই। তারপর রঞ্জক সামনে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল, “কেউ একজন তোকে সরি বলতে এসেছে।”

তুষার কথাটা শুনলো ঠিকই কিন্তু কিছুই বলল না। রঞ্জক পকেটে থেকে একটা সিগারেট বের করে তুষারের দিকে এগিয়ে দিল। তুষার শান্ত গলায় বলল, “লাইটার নেই।”

রঞ্জক দ্রুত নিজের বুকপকেট হাতড়ে লাইটার বের করে সিগারেট জ্বালিয়ে দিল। তুষার সেটা নিতে এবার রঞ্জকের দিকে ফিরল। রঞ্জক দেখল, ঘুষির আঘাতে তুষারের জ-লাইনটা ফুলে লাল হয়ে আছে। তুষার কিছু বলল না। স্রেফ সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো ছেড়ে দিতে লাগল।

রঞ্জক মিনমিনিয়ে বলল, “সরি ইয়ার, আমি তোকে ব্যথা দিতে চাইনি। শুধু রাগ উঠে গিয়েছিল তাই…”

“ইটস ওকে।” তুষার সংক্ষেপে বলল।

রঞ্জক চোখ বুজে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে একটা ব্যান্ডেজ বের করে আওড়াল, “দেখি, এদিকে ঘোর।”

​তুষার ধীরে ধীরে মুখ ফেরাতেই রঞ্জক তার গালে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিল। অতঃপর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

হঠাৎ তুষার জিজ্ঞেস করল, “তুই রেগে গিয়েছিলি কেন?”

​রঞ্জক শূন্যে দৃষ্টি রেখে বলল, “জানি না।”

“পান্না চোখের মেয়েটাকে কি তোর ভালো লাগে?”

রঞ্জক চমকে তাকাল, “এটা কেমন প্রশ্ন?”

“উত্তর দে।”

“যা আমি দেখতেই পাই না তা আবার কীভাবে ভালো লাগবে?”

​“যেভাবে লাল রঙের মাছ আর সবুজ গাছপালা তোর ভালো লাগে, ঠিক সেভাবে।”

রঞ্জক থতমত খেয়ে গেল, “তুই ভুল অনুমান করছিস। ওই মেয়েটার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও আমি ঠিক তেমনই রিয়্যাক্ট করতাম।”

“ও আচ্ছা, কঙ্কার চোখদুটোও কিন্তু সুন্দর। একেবারে গোল্ডের মতো। চুলগুলোও কতো সুন্দর।”

কথাটা শুনে রঞ্জক ভ্রূ তুলে তাকালো, “তো আমি কী করবো? তুই এসব আমাকে কেন বলছিস? ভালো লাগলে সোজা ওকে গিয়েই বল না।”

তুষার মিষ্টি করে হাসলো। কনুই দিয়ে রঞ্জকের কাঁধে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, “ঠিক এভাবেই আমি পান্না চোখের মেয়েটার প্রশংসা করেছিলাম, দোস্ত।”

রঞ্জক কথা হারিয়ে ফেলল। আসলেই কি এভাবেই বলেছিল? অদ্ভুত! তাহলে তখন তার খারাপ লেগেছিল কেন? এখন তো কঙ্কাকে নিয়ে বলায় একটুও খারাপ লাগেনি।

“দেখ, ওই টপিকটা বাদ দে।”

“তুই কি জানিস পান্না চোখের মেয়েটার কথা এলেই তুই প্রোটেক্টিভ হয়ে পড়িস?”

রঞ্জকের শরীর আবারও জ্বলতে শুরু করল, “আমি বাদ দিতে বলেছি তুষার।”

“পারছি না তো দোস্ত। আমি বাদ দিতে পারছি না। মেয়েটাকে দেখার পর থেকে সারাক্ষণ ওর কথাই মাথায় ঘুরছে। মনে হচ্ছে আমি ক্রাশ খেয়েছি। তার ওপর তোর এমন অদ্ভুত আচরণ আমার অনুভূতিকে আরও উস্কে দিচ্ছে।”

রঞ্জক আর সহ্য করতে পারল না। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো তার, “এনাফ ইজ এনাফ। আবারও মার খেতে না চাইলে এখানেই থেমে যা।”

“এমন কেন করছিস? তুই বন্ধু হয়ে যদি বন্ধুর অবস্থা না বুঝিস তাহলে আর কে বুঝবে? আমাকে সাহায্য কর না দোস্ত। আমি মেয়েটার সাথে কথা বলতে চাই।”

“কী বলবি আগে শুনি।”

“কী আর বলবো? বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করব। আমি তাড়াহুড়ো করতে চাই না। আগে বন্ধু হবো তারপর যদি সব ঠিকঠাক থাকে ওকে নিজের গার্লফ্রেন্ড বানাবো।”

“সব ঠিকঠাক বলতে?”

“এই ধর ওর কোনো বয়ফ্রেন্ড না থাকলে।”

রঞ্জক মুখটাকে পাংশুটে করে বলল, “হাজব্যান্ড থাকলে চলবে?”

আঁতকে উঠল তুষার, “হাজব্যান্ড থাকার প্রশ্ন আসছে কেন? মেয়েটা তো খুব ছোট। আমি হলফ করে বলতে পারি ওর এখনো বিয়ের বয়স হয়নি।”

বাঁকা হাসলো রঞ্জক। পরক্ষণেই মুখের ভাব স্বাভাবিক করে বলল, “সরি দোস্ত, কথাটা শুনে তোর হয়তো খারাপ লাগবে। কিন্তু বলতেই হচ্ছে, মেয়েটা সত্যিই বিবাহিতা।”

তুষারের মুখটা কাঁদোকাঁদো হয়ে গেল, “তুই মিথ্যা বলছিস তাই না?”

“মিথ্যা বলব? কেন মিথ্যা বলব? মিথ্যা বলে আমার লাভ কী?”

তুষার আর কিছু বলতে পারলো না। আধপোড়া সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিল। 

“ধ্যাৎ, এটা কোনো কথা? মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিল।”

রঞ্জক স্বান্তনার সুরে বলল, “থাক মন খারাপ করিস না দোস্ত। তুই তোর স্পেশাল সামওয়ানকে একদিন ঠিকই খুঁজে পাবি।”

কথাটা তুষারের ভালো লাগল না। মুখটা আরও গম্ভীর হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি বাড়িতে যাচ্ছি। কাল অফিস আছে।”

তুষার একপ্রকার হন্তদন্ত হয়ে স্থান ত্যাগ করল। রঞ্জক বসে রইল একা একাই। 

​রাত গভীর হলো। আলতার ঘরে তখন বসে আছেন তার মা ইছাপূর্ণা। আলতা বিছানার হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাঁটু বুকে জড়িয়ে চুপচাপ বসে আছে। ইছাপূর্ণা সেই কখন থেকে মেয়ের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু আলতা একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছে না। 

ইছাপূর্ণা কাছে এগিয়ে গেলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “জামাই তোকে মেনে নিতে পারেনি তাই তো?”

আলতা নিরুত্তর। কোনো কথা বলবে না বলেই যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সে। বলবেই বা কেন? তাকে যখন একটা বুড়ো লোকের সাথে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তখন তার মাও তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেননি। উলটো তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছিলেন। 

“আমি শুধুমাত্র তোকে ওই নরক থেকে বের করতে চেয়েছিলাম মা। আমাকে তুই ভুল বুঝিস না।”

আলতা ঠোঁট চেপে চুপ রইল। তন্মধ্যে একজন গৃহকর্মী খাবার নিয়ে এল তাদের মা-মেয়ের জন্য। খাবার দিয়ে গৃহকর্মী চলে যেতেই ইছাপূর্ণা মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “তোকে যে করেই হোক এই বাড়িতেই থাকতে হবে বুঝলি?”

আলতা এবার মুখ তুলে তাকাল। ইছাপূর্ণা স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন, “রঞ্জক শিক্ষিত ছেলে, একদিন ঠিকই বুঝতে পারবে সবটা।”

“কী বুঝবেন উনি? এটাই যে আমার কোনো দোষ ছিল না? আচ্ছা এটা বুঝতে পারলেই কি উনি মেনে নেবেন আমাকে?” আলতা প্রশ্নটা করেই ফেলল।

“তা বলতে পারবো না। শুধু জেনে রাখ, মাটি কামড়ে হলেও তোকে এই বাড়িতেই পড়ে থাকতে হবে। রঞ্জক তোকে ছেড়ে দিতে চাইলেও তুই মোটেও ছাড়বি না ওকে।”

আলতা মায়ের হাতটা সরিয়ে দিল, “উনি আমাকে ছেড়ে দিতে চাইলে আমিও বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দেবো ওনাকে।”

ইছাপূর্ণা মনে মনে অসন্তুষ্টি হলেন, “বোকার মতো কথা বলিস না। ওকে মুক্তি দিয়ে কোথায় যাবি তুই? যাওয়ার মতো জায়গা আছে কি তোর? যেই একটা বাপের ঘরে জন্মেছিস…”

“চিন্তা কোরো না আমি আর তোমাদের বোঝা হবো না।”

“তাহলে কোথায় যাবি শুনি?”

“তা তোমাকে জানতে হবে না।”

​কথাটা শেষ করেই হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে ফেলল আলতা, অবরুদ্ধ কান্নায় কেঁপে উঠল তার দুই কাঁধ। ইছাপূর্ণা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না; টেনে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় কয়েকটা চুমু এঁকে দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। আর কোনো কথা বললেন না।

খানিকক্ষণ পর ইছাপূর্ণা নিজ হাতে আলতাকে খাইয়ে দিচ্ছিলেন। কেঁদেকেটে আলতা ততক্ষণে ফের শান্ত হয়ে গেছে। খাবারের স্বাদ-গন্ধের তোয়াক্কা না করে নিষ্পলক চোখে খেয়ে যাচ্ছে সে।

“জুবাকে দেখছি না যে কোথায় ও?” মায়ের প্রশ্নে আলতা খাবারটুকু গিলে উত্তর দিল,

“ওনার ঘরে।”

“ওনার মানে কার?”

আলতা ভেবে পেল না কীভাবে বোঝাবে। ইছাপূর্ণা বুঝতে পারলেও বিশ্বাস করতে পারলেন না, “রঞ্জকের ঘরে?”

আলতা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল। ইছাপূর্ণা বিস্মিত গলায় বললেন, “জুবা ও ঘরে গেল কীভাবে?”

“উনি ওকে আটকে রেখেছেন।”

“কেন?”

“আমি কীভাবে বলবো? কয়েকবার আনতে গিয়েছিলাম, উনি দেননি।” আলতার কথায় ইছাপূর্ণা ভাবনায় পড়ে গেলেন।

এদিকে খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে রঞ্জক। আজ সে ভেন্যুতে যায়নি। সোজা বাড়িতেই চলে এসেছে। পুরো ঘরজুড়ে নীলচে মৃদু আলো। 

জুবা সেই কখন থেকে একটানা আলতার নাম জপে চলেছে! রঞ্জক বিরক্ত হয়ে এবার উঠে বসল। জুবার খাঁচার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তোমার নতুন মালিক আমি তাই আমার নাম ধরে ডাকো। বলো, রঞ্জক!”

“জুবা আলতা যাবে। আলতা কোথায়।” 

“আবারও একি কথা বলছো। তোমাকে বলেছি না রঞ্জক বলতে?”

“আলতা কাঁদে! আলতা কাঁদে। জুবা আলতা যাবে!”

রঞ্জক ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। জুবা ফের বলে উঠল,

“আলতা! আলতা।”

রঞ্জক প্রচুর বিরক্ত হলো, “চুপ করো। আমি এখন ঘুমাবো। বিরক্ত করলে কাল সারাদিন না খাইয়ে রাখবো।”

জুবা চুপ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। রঞ্জকও বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু হঠাৎ এই নিস্তব্ধতা তার ভালো লাগলো না। এই নিস্তব্ধতা দূরীকরণেই তো জুবাকে বেডরুমে রেখেছে সে। রঞ্জক পুনরায় উঠে বসল। 

​জুবার খাঁচাটা নিজের একটু কাছে টেনে এনে বলল, “এই জুবা! চলো তো, আমার নাম ধরে ডাকো। বলো, রঞ্জক!”

“জুবা আলতা যাবে।”

“উঁহু, জুবা কোথাও যাবে না। জুবা এখন বলবে রঞ্জক!”

“আলতা!”

“রঞ্জক কি খুব কঠিন নাম? যে তুমি পারছোই না। বলো না রঞ্জক!”

“আলতা! আলতা!”

“চেষ্টা করো, পারবে তুমি। বলো রঞ্জক!”

“আলতা!”

“তুমি খুব জেদি জুবা। এমন অভদ্রের মতো আচরণ করতে কি তোমার মালিক শিখিয়েছে তোমায়?”

“আলতা মা।”

রঞ্জক অদ্ভুত চোখে তাকাল। কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে মাথা নেড়ে বলল, “মোটেই না। তোমার মতো অভদ্র পাখির বাপ হওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই আমার।”

কথাটা জুবা বুঝল না। আলতা তাকে যা বলতে শিখিয়েছে, জুবা তো মূলত সেগুলোই বলে। মাঝে মাঝে অবশ্য নিজে থেকেও দু-একটা কথা বানিয়ে ফেলে। কিন্তু মানুষের মতো সব কথার অর্থ বোঝার ক্ষমতা কি তার আছে?

এদিকে নিজের মুখ থেকে এমন একটা কথা বেরিয়ে যাওয়াতে রঞ্জক চরম বিস্মিত হলো। কয়েক মুহূর্ত বিস্ময়ে কোনো কথাই খুঁজে পেল না সে। ভাগ্যিস জুবা কথাটার মানে বুঝতে পারেনি।

“বাপ! বাপ!” জুবা চেঁচিয়ে উঠল। 

রঞ্জক হতবিহ্বল হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও সে নিজের নামটা বলাতে পারেনি। অথচ মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া অনভিপ্রেত শব্দটাই জুবা দিব্যি আওড়াতে শুরু করেছে। রঞ্জক ডানে বাঁয়ে একবার তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ভাগ্য ভালো আশেপাশে সে ব্যতীত অন্য কেউ নেই। 

“হিশশ! ডোন্ট কল মি দ্যাট। বলো, রঞ্জক।”

“আলতা! আলতা!”

রঞ্জক চুপ হয়ে গেল। যাক, আলতাতেই আটকে থাকুক। ‘বাপ’ শব্দটা আবার না বললেই হলো।

চলবে… 

সব্দসংখ্যা: ৪০০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply