Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৬


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৬৬)

সোফিয়া_সাফা

পুরো তিন ঘন্টার ক্লান্তিকর জার্নির পর উদ্যানদের গাড়িটা এসে একটা কেয়ার সেন্টারের সামনে থামল। উদ্যানের প্রশস্ত বুকে চড়ুই ছানার মতো মুখ গুঁজে ফুল তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাকে খুব সাবধানে আগলে রেখেছে উদ্যান। মেয়েটা এতোটাই কাহিল হয়ে গেছে যে বাকিটা পথ ঘুমিয়েই কাটিয়েছে। উদ্যান গন্তব্যে পৌঁছেও ফুলকে ডেকে তুলল না। সেভাবেই বসে রইল।

​ফুলের যখন ঘুম ভাঙল, ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা সাতটা। উদ্যান তাকে ছেড়ে দিয়ে নিঃশব্দে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। ফুল গায়ের সোয়েটার আর ওড়নাটা কোনোমতে গুছিয়ে নিয়ে নিজেও নিচে নামল।
উদ্যান আর লুহান আগে আগে হাঁটছে, ফুল যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো তাদের অনুসরণ করছে। পথিমধ্যে একটা টিউবওয়েল দেখে ফুল হাঁপিয়ে উঠে বলল, “একটু থামুন, আমি চোখেমুখে পানি দিয়ে আসতে চাই।”

উদ্যান পেছনে ফিরে এক পলক তাকাল, তারপর ইশারায় তাকে অনুমতি দিল। ঠান্ডা পানির ঝাপটায় ফুলের তন্দ্রা পুরোপুরি কেটে গেলেও বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা কমলো না।
সে ফিরে আসতেই তারা কেয়ার সেন্টারের ভেতরে ঢুকল। লিফটে চড়ে তারা সরাসরি পঞ্চম তলায় গিয়ে থামল। একটা নির্দিষ্ট কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াতেই ফুলের পায়ের তলার মাটি যেন কাঁপতে শুরু করল। এক অজানা আশঙ্কায় সে প্রশ্ন করল, “কোথায় এসেছি আমরা? কেন বলছেন না?”

“ভেতরে গেলেই দেখতে পারবি।” উদ্যান দরজার হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। লুহান তাকে অনুসরণ করল, কিন্তু ফুল দরজার বাইরেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নিজের অস্থিরতাকে কোনোমতে দমিয়ে যখন সে ভেতরে ঢুকল, অমনি এক হিমশীতল অনুভূতি তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল।

কেবিনের মাঝামাঝি থাকা বেডের ওপর শায়িত আছেন একজন মধ্যবয়সী পুরুষ। তার চেয়েও অবাক করার বিষয় হচ্ছে বেডের পাশেই বসে আছেন রেহানা বেগম। ফুলকে দেখেই তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো উঠে দাঁড়ালেন। আবেগের বশবর্তী হয়ে ফুলকে জড়িয়ে ধরতেই যাবেন তখনই ফুল তাকে থামিয়ে দিল, “ছোঁবেন না আমাকে।”

রেহানা বেগমের বুকটা হু হু করে উঠল। চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে এলেও বুঝে গেলেন মেয়ে তার সব জেনে গেছে। ফুলের চোখও তখন নোনা জলে ভরে উঠেছে, দম নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। তাকে কাঁপতে দেখে উদ্যান দ্রুত এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল এবং এক প্রকার টেনেই নিয়ে গেল বেডের পাশে।

শায়িত লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে ফুল ডুকরে কেঁদে উঠল। এই মানুষটার সাথে তার কী সম্পর্ক, তা আর বুঝতে বাকি রইল না। তবুও তার অবচেতন মন বিশ্বাস করতে চাইল না।

“উনি কে? আপনি কেন আমাকে ওনার কাছে নিয়ে এলেন?” ফুলের কণ্ঠস্বর ভেঙে এল। উদ্যান পেছন থেকে ফুলের দুবাহু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “চিনতে পারলি না? সো স্যাড, ভালো করে দেখ।”

লোকটার ফাঁকা দৃষ্টি দেখে ফুল ঠোঁট চেপে কান্না আটকাল। লোকটার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। গায়ে পেশেন্টের ড্রেস-আপ। গায়ের রঙ ফর্সা হলেও ময়লাটে ভাব স্পষ্ট। আধাপাকা চুল-দাড়ি বলে দিচ্ছে জীবনের অনেকটা চড়াই-উতরাই তিনি পেরিয়ে এসেছেন। ফুল হঠাৎ করে ঘুরে গিয়ে উদ্যানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে ফুপিয়ে উঠল, “আমি ওনাকে চিনতে চাই না, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন… প্লিজ!”

উদ্যান এবার জোর করে তাকে আবারও বেডের দিকে ফেরাল। “তুই এড়িয়ে যেতে পারবি না। আজ তোর জীবনের একটা বিশেষ দিন। যার মাধ্যমে দুনিয়াতে এসে দুনিয়ার বোঝা বাড়িয়েছিস তাকে চিনতে না পারলে হবে?”

ফুল অসহায় হয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল মেয়েটা। উদ্যান তার কানে মুখ নিয়ে বলল, “মিট হিম, উনি তোর বাপ। আমার আদরের শ্বশুরমশাই, যাকে অনেক খুঁজে বের করেছিলাম আমি। ভেবেছিলাম অনেক আদর যত্ন করবো। বাট আনফরচুনেটলি, আমাকে আদর যত্ন করার কোনো সুযোগই দেন নি উনি।”

ফুল ধপ করে বেডের ওপর বসে পড়ল। চিল্লিয়ে বলল, “আমি শুধুমাত্র একটা ভুল ছিলাম আপনার, তাই না? আচ্ছা, আপনি ওনার মায়ের সাথে কী করেছিলেন মনে আছে নিশ্চয়ই? আপনার বউ কী করেছে সেটার সাক্ষীও তো ছিলেন, তাই না? সবকিছু জেনেও কেন তবে জন্মের পরপরই মে’রে ফেললেন না আমায়? আরে আপনাদের রক্তই তো আমার শরীরে বইছে। ভালো মানুষ হবো না সেটা আপনারও অজানা ছিল না। তবে কেন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন? পালিয়ে যাওয়ার আগে মে’রে ফেললে ওনার বাবা আজ সুস্থ থাকতেন। জানেন, ওনার বাবার সাথে কী করেছি আমি? আমি ওনার বাবার অ্যাক্সিডেন্ট করিয়েছি। এটা শুনে খুশি হয়েছেন না আপনি? বলুন হয়েছেন তো? আমি আপনার নাম রেখেছি।”

ফুলের আবোলতাবোল কথা শুনে উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কেন যেন কথাগুলো শুনে অকয়ার্ড লাগছে তার। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সে হটকারিতা করে বলল, “হ্যাঁ, তুই একদম ওনার যোগ্য সন্তান হতে পেরেছিস। তোর মা চেয়েছিল তোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে কিন্তু তুই উল্টো আরও ক্ষতি করে দিয়েছিস আমার।”

ফুলের কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। উদ্যান হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। সে কী ভুল কিছু বলেছে? বলেনি তো! তবে কেন তার মনে হচ্ছে; তার একটু চুপ থাকা উচিত?
“লুহান বাইরে চল, ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।”

লুহান এতোক্ষণ এককোনায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। উদ্যানের কথায় সায় জানিয়ে সে তার পিছু পিছু বাইরে বেরিয়ে গেল।

ফুলের কান্না থামেনি সে ফারহান আমহৃতের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের ওপর অভিযোগ করে যাচ্ছে।
“আমি ওনাকে বড্ড ভালোবাসি। কিন্তু উনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। ওনার ভালোবাসা না পেয়েও অভিযোগ করতে পারি না আমি। কোন মুখে করবো বলুন? আমি ওনাকে বলতেও পারি না আমার ভুল হয়েছে, আমি তখন অবুঝ ছিলাম নইলে মামাকে সেদিকে যেতে বাধ্য করতাম না। কেন আমার দ্বারা এতো বড় ক্ষতি হয়ে গেল ওনার? যদি মামার সাথে তেমন কিছু না হতো, তাহলে হয়তো… হয়তো আমাদের গল্পটা ভিন্ন হতো। কেন এতো অপয়া আমি? কেন এতো দূর্ভাগা?”

ফুল হঠাৎ লক্ষ্য করল, ফারহান আমহৃত তার কোনো কথারই উত্তর দিচ্ছেন না। এমনকি তার চেহারায় কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়াও নেই। শুধু তার চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে।

​“আপনি কথা বলছেন না কেন? বলুন আমাকে, আর কী করলে আপনি শান্তি পাবেন? ওনাকেও কি মে`রে ফেলব?”

রেহানা বেগম আঁচলে মুখ মুছে ফুলের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালেন৷ কাঁপা গলায় বললেন, “ওনার সাথে এভাবে কথা বলিস না ফুল।”

ফুল তার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “কে আপনি হুম? ওনার সাথে কীভাবে কথা বলবো তা আপনি ঠিক করবেন নাকি? আপনিও তো কম দায়ী নোন, একটু অন্তত অনুশোচনা করুন। ওনার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কারণে আমার মায়ের মাঝেও অশুভ শক্তি ভর করেছিল নইলে কেন তার দ্বারা অমন দূর্ঘটনা ঘটবে? আমার দ্বারাই বা কেন ঘটবে? আমি যদি এখন চিৎকার করে বলি আমি জেনেশুনে কিছুই করিনি, তবে কি সব ঠিক হয়ে যাবে? বলুন, উনি কি ওনার বাবা-মা আর বোনকে ফিরে পাবেন?”

রেহানা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন। “উদ্যান তোকে এমন বানিয়ে ফেলেছে ফুল? তুইও ওর মতোই আচরণ করছিস। বুঝতে পারছিস না, মানুষ মাত্রই তো ভুল হয়। আমিও ভুল করেছিলাম। তবে বিশ্বাস কর, কাউকে মে’রে ফেলার প্ল্যান ছিল না আমাদের। তোর বাবাও অনুশোচনার আগুনে পুড়েছেন। আমিও, এমনকি তোর মা-ও। কেউ ভুলের উর্ধ্বে নয়। তবে কেন উদ্যান ক্ষমা করতে পারছেনা আমাদেরকে?”

“ক্ষমা করেনি বলছেন? নিজেকে ক্ষমার যোগ্য বলে মনে করেন? আমি তো করিনা। তবুও আমি জানি উনি ক্ষমা করে দিয়েছেন আপনাদেরকে।”

“এই ওর ক্ষমা করার নমুনা?”

“কেন কী এমন করেছে আপনাদের সাথে? প্রতিশোধ নিয়েছে? নেয়নি তো। একবেলা না খাইয়ে রেখেছে? তাও রাখেনি। তবে?”

রেহানা বেগম থমকে গেলেন। আসলেই উদ্যান তেমন কিছুই করে নি তাদের সাথে। উল্টো কর্মফলই তাদেরকে এতোদূর টেনে এনেছে।

ফুল হঠাৎ জিজ্ঞেসু দৃষ্টে তাকাল ফারহান আমহৃতের দিকে। “ওনার কী হয়েছে, বলবেন?”

রেহানা বেগম জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “উনি এইচডি রোগে আক্রান্ত। কয়েক বছর হলো উনি পুরোপুরি শয্যাশায়ী। হাঁটাচলা কিংবা নিজের হাতে খাওয়া তো অনেক দূরের কথা, উনি এখন কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন।”

ফুলের বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল। সে এই রোগের নাম শুনেছে। কিন্তু বিস্তারিত জানে না।
“ওনার চিকিৎসা হচ্ছে না?”

রেহানা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “এই রোগ পুরোপুরি নিরাময়ের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। শুধুমাত্র কিছুদিনের জন্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চিকিৎসার অছিলাতেই এতো বছর বেঁচে আছেন।”

“এতো বছর মানে? ওনার এই রোগ কবে হয়েছে?”

রেহানা বেগম নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, “এই রোগের কারণে প্রায়ই উনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন। নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার কয়েকদিন আগেই কয়েকটা উপসর্গ দেখে উনি টেস্ট করিয়ে জানতে পারেন ওনার এই রোগ আছে। এটা জেনে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন উনি। একপর্যায়ে সব ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যান।”

ফুল স্তব্ধ হয়ে গেল। “তারপর ওনার খোঁজ আপনি পেলেন কীভাবে?”

রেহানা বেগম শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন, “উদ্যানই খবর দিয়েছিল। ও-ই ওনাকে খুঁজে বের করেছে। যদিও শুরুতে আমি সেটা জানতাম না। একদিন আমার নামে একটা বেনামি চিঠি আসে, যেখানে ওনার শারীরিক অবস্থা আর ঠিকানা লেখা ছিল। পরে আমি তোর বাবার মুখ থেকেই সব জানতে পেরেছি। উনি বলেছিলেন, ওনাকে খুঁজে বের করে আটকে রাখতে চেয়েছিল উদ্যান। পরবর্তীতে উনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এই অসুখের কথা জানতে পারে। তারপর থেকে উদ্যানই ওনার চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করছে। ও সবসময়ই বলে ওর বাবা একদিন সুস্থ হবে সেদিন ও তোর বাবাকে আর আমাকে নিয়ে যাবে তার কাছে। সেখানে গিয়ে নিজের মুখে নিজেদের কৃতকর্মের কথা স্বীকার করতে হবে।”

“উনি কীভাবে স্বীকার করবেন? কথা বলার ক্ষমতাও যে হারিয়ে ফেলেছেন।”

“উদ্যান অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো চিকিৎসাতেই আর সুস্থ করা যায়নি ওনাকে।”

ফুল হেসে উঠল। “উনি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগছে! উনি এতো অদ্ভুত কেন? আমি কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারি না ওনাকে… একটুও না।”

“ও নিজে কি নিজেকে বুঝতে পারে?” রেহানা বেগম বিড়বিড় করলেন। “আমার তো মনে হয় ও নিজেই নিজেকে বোঝে না।”

ফুল হঠাৎ সোজা হয়ে বসল। রেহানা বেগমের চোখের দিকে তাকিয়ে সোজাসুজি প্রশ্ন করল, “আপনি এখনো ফারহান আমহৃতকে ভালোবাসেন, তাই না?”

রেহানা বেগম অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। ফুল আবারও তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ওনার জন্য বিয়েও করেন নি। আমাকেও লালন-পালন করেছেন। জানেন তো, আমি কোনোদিনও দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি যে আপনি আমার মা নন। মানতেই হবে, খুব ভালো অভিনেত্রী আপনি। কখনো বুঝতেই দেননি যে আমার আর আপনার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই।”

রেহানা বেগম ভীষণ কষ্ট পেলেন৷ “এভাবে বলে দিতে পারলি? মা নই আমি তোর? মা কি কেবল জন্ম দিলেই হওয়া যায়?”

ফুল হাসল। “জন্ম না দিয়েও মা হওয়া গেলে মাহবুবা সুলতানাও নিশ্চয়ই তেহজিব খানজাদার মা হতে পারতেন। সুযোগ পেয়ে ওনাকে দূরদেশে পাঠিয়ে দিতেন না।”

রেহানা বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ফুল এবার আরও রূঢ় গলায় বলল, “চুপ হয়ে গেলেন কেন? স্বীকার করে নিন যে শুধুমাত্র ফারহান আমহৃতের প্রতি থাকা আপনার অন্ধ ভালোবাসার খাতিরেই… আপনি আমার মা হওয়ার অভিনয় করেছিলেন। মেনে নিন সেটা। এবার অভিনয় থামিয়ে দেওয়া উচিত।”

রেহানা বেগম জোরপূর্বক হাসলেন। “অভিনয় যে এতো ভালো করি নিজেও বুঝতে পারিনি। তোর আগমনের খবর শুনেই ফারহানের সাথে সম্পর্কের পাঠ চুকিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তোকে প্রথমবার দেখে ভুলেই গিয়েছিলাম সেসব। এতো মিষ্টি একটা মেয়ে ছিলি তুই, কেউ তোকে এড়িয়ে যেতে পারতো না। এমনকি স্বয়ং উদ্যানও না।”

তিনি একটু থেমে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে, যখন ওকে মেক্সিকো পাঠিয়ে দেওয়ার কথা চলছিল, তখন ও জিদ ধরেছিল তোকেও সাথে নিয়ে যাবে। বলেছিল, ‘পারভীন খানজাদা মা`রা যাওয়ার আগে তার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। তাই আমি যেখানে যাব, ও-ও সেখানেই যাবে।’ আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম ওর কথা শুনে। বিশেষ করে আমি তো মারাত্মক রেগে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, ‘ও পারভীনের মেয়ে নয়। এখন থেকে ও আমার মেয়ে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নেবো যে আমার মেয়ে কোথায় থাকবে।”

“বাহ! অভিনয়ের শুরুটা তো দেখছি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। তবে সেই মায়ের রোলে এত দরদ থাকা সত্ত্বেও তার সাথে আমার বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন কীভাবে?”

“উদ্যান আমাকে হুমকি দিয়েছিল। আমি যদি সেই সময় রাজি না হতাম; ও তোর বাবার চিকিৎসা বন্ধ করে দিতো।”

“এর থেকেই তো প্রমাণিত হয়ে যায় যে আপনি আজও ফারহান আমহৃতকেই ভালোবাসেন। সেই জন্যই এতোবছর তার বউ সেজে আমার মায়ের রোল প্লে করে গেছেন।”

রেহানা বেগম এবার সরাসরি স্বীকার করলেন, “হ্যাঁ, আমি আজও ভালোবাসি ওনাকে।”

ফুলের এবার বিতৃষ্ণা জন্মালো। সে উঠে বেরিয়ে এল বাইরে। কিন্তু উদ্যান আশেপাশে কোথাও ছিল না। তাকে খোঁজার তাগিদে করিডোর ধরে কিছুটা এগোতেই একজন মধ্যবয়সী কেয়ারটেকারের সাথে দেখা হয়ে গেল তার। কেয়ারটেকার ভদ্রমহিলা ফুলকে ফারহানের কেবিন থেকে বের হতে দেখেছিলেন, তাই কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি তেইশ নম্বর কেবিনে থাকা রোগীর আত্মীয় হন?”

ফুল বলতে চাইল না। নিচু স্বরে বলল, “না না! এমনি পরিচিত।”

“ওহ, কিছু মনে করবেন না। উনি কয়েকবছর ধরে এখানে আছেন। এই সময়ের মধ্যে দুই-একজন ব্যাতিত তেমন কাউকে আসতে দেখিনি তো, তাই আরকি জিজ্ঞেস করলাম।”

কথাটা শুনে ফুলের বুকের ভেতরটা কেমন যেন টনটন করে উঠল। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে জানতে চাইল, “আচ্ছা, ওনার কি সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই?”

কেয়ার টেকার হালকা হেসে বললেন, “ওনার এইচডি হয়েছে। এই কয়বছর যে উনি বেঁচে আছেন তাও কেবলমাত্র সুচিকিৎসার জোরে। এই রোগ মরণব্যাধি। একবার আক্রমণ করলে মৃ’ত্যু অবধারিত। শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।”

ফুলের আবারও কান্না পেয়ে গেল। যতোই হোক বাবার এই অবস্থার কথা শুনে কোনো মেয়েই স্বাভাবিক থাকতে পারবে না। কেয়ার টেকার তাকে স্বান্তনা দিয়ে বললেন, “ভেঙে পড়বেন না। মানুষ মরণশীল, সবাইকেই ম’রতে হবে। শুনেছি ওনার একটা মেয়ে আছে। আপনি কিছু জানেন তার ব্যাপারে?”

ফুল কাঁদতে কাঁদতেই না জানালো। উল্টো প্রশ্ন করল, “কেন জিজ্ঞেস করছেন ওনার মেয়ের কথা?”

ভদ্রমহিলা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “আসলে এইচডি একটা জেনেটিক বা বংশগত রোগ। বাবা-মায়ের এই রোগ থাকলে সন্তানদের তা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০% থাকে।”

ফুলের অশ্রুসজল চোখে বিস্ময় খেলে গেল। “এটা কি ছোঁয়াচে রোগ? মানে একজনের থেকে কি অন্যজনে ছড়াতে পারে?”

“একদমই না। এই রোগ স্পর্শে, রক্তে কিংবা একসাথে থাকা-খাওয়ার মাধ্যমে কোনোভাবেই ছড়ায় না। এটা পুরোপুরি বংশগত রোগ। একজন এইচডি রোগীর সাথে থাকা কিংবা সম্পর্কে জড়ানোও সম্পূর্ণ নিরাপদ।”

ফুল ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে বোঝা যাবে যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত কি না?”

“দেখুন, আমি তো ডাক্তার নই, তবে কৌতুহলবশত অনেক কিছু জেনেছি। এই রোগ শনাক্ত করার জন্য এক ধরণের বিশেষ জেনেটিক টেস্ট করতে হয়। রক্তে এইচডি জিনের মিউটেশন আছে কি না, তা দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায়। যদি জিনে ওই মিউটেশন থাকে, তবে জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এই রোগ হবেই। আর যদি না থাকে, তবে হওয়ার কোনো আশঙ্কাই নেই।”

​“যখন তখনই কি এই টেস্ট করানো যায়?”

​“হ্যাঁ, যেকোনো বয়সেই…”

“কোন বিষয়ে কথা হচ্ছে?” হঠাৎ উদ্যানের রাশভারি কণ্ঠস্বর শুনে ফুল চমকে উঠল। তবুও নির্লিপ্ত সুরে বলল, “উনি এইচডি রোগ সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত বললেন।”

উদ্যান প্রচন্ড রেগে গেল। ক্ষুব্ধ হয়ে কেয়ার টেকারকে বলল, “এই-যে আপনার খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই? বিনামূল্যে জ্ঞান বিতরণ করতে কে বলেছে?”

ভদ্রমহিলা উদ্যানের এমন ভয়ঙ্কর রূপ দেখে ঘাবড়ে গেলেন। তোতলাতে তোতলাতে বললেন, “না… আমি তো শুধু…”

“ওহ! জাস্ট শাট আপ! মাইন্ড ইয়োর ওন বিজনেস।”

কেয়ারটেকার আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ভয়াতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে কেটে পড়লেন।
উদ্যান ফুলের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “তুই চাইলে এখানে থাকতে পারিস। তারপর নাহয় রেহানা বেগমের সাথে খানজাদা নিবাসে ফিরে যাস।”

ফুল ছলছল চোখে তাকাল। বুকের ভেতরটা গুমরে উঠল তার। “আপনি কি বলতে চাইছেন?”

“বাংলাতেই তো বললাম, তাও বুঝতে পারলি না। আমি তোর সো কল্ড মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছি তোকে।”

ফুল কয়েকপা এগিয়ে এসে অস্ফুটস্বরে আওড়াল, “আপনি মেক্সিকো ফিরে যাবেন?”

উদ্যান সরাসরি উত্তর না দিয়ে কথা ঘুরিয়ে নিল। “তুই থাক তাহলে, আমি এস্টেটে ফিরে যাচ্ছি।”

উদ্যান পা বাড়াতেই ফুল পেছন থেকে ছোঁ মেরে তার হাত টেনে ধরল। “আমি ফিরে যাবো না খানজাদা নিবাসে। আপনি হয় এস্টেটে নিয়ে চলুন, নয়তো অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিন।”

উদ্যান নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে হেঁটে গেল লিফটের দিকে। ফুলও তার পিছুপিছু গেল। উদ্যান অবশ্য বাধা দিল না।

গাড়ি তার আপন গতিতে ছুটে চলছে। ফুল পেছনের সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে পড়ে আছে। তার পাশেই উদ্যান ফোনের স্ক্রিনে মগ্ন। ঘণ্টাখানেক কোনোমতে সহ্য করে নিলেও ফুলের বমিভাবটা আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। অথচ তার পেটে উগরে দেওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। উদ্যান আড়চোখে লক্ষ্য করল, মেয়েটা যন্ত্রণায় হাঁসফাঁস করছে।

উদ্যান পকেট হাতড়ে বমির ঔষধ বের করল। লুহানের কাছ থেকে পানির বোতলটা নিয়ে সে ফুলের দিকে সেটা বাড়িয়ে দিল। ফুল স্থির চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে দেখে ভাঙা গলায় শুধাল, “কিসের… ঔষধ?”

“বমিভাব কাটানোর। খেয়ে নে।”

ফুল হেসে উঠল, “খেয়ে নিলে আমার কষ্ট কমে যাবে। কিন্তু আমি চাইছি না কষ্ট কমে যাক। আপনি তো আমাকে যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে দেখতেই ভালোবাসেন। সেই জন্যই ফেলে রেখে চলে যাবেন। এর চেয়েও অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে আমাকে। যদি কষ্ট কমিয়েই ফেলতে চান তাহলে এই ঔষধ না দিয়ে বিষে এনে দিন। হাসতে হাসতে খেয়ে নেবো।”

উদ্যানের চোখদুটো রাগে জ্বলজ্বল করে উঠল। সে অহেতুক কথা না বাড়িয়ে ফুলের গাল চেপে ধরে জোর করে মুখে ওষুধটা পুরে দিল। ফুল আপ্রাণ চেষ্টা করল গিলতে, কিন্তু ভেতর থেকে সাফসাফ জানিয়ে দিল এখন কোনো কিছুই গিলতে পারবে না সে। ফুলের অবস্থা দেখে উদ্যান স্তব্ধ হয়ে গেল। সে যেটুকু পানি জোর করে খাইয়েছিল, তার দ্বিগুণ পরিমাণ তরল মেয়েটা উগরে দিয়েছে; তাও আবার তারই গায়ের ওপর।

উদ্যান দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল, “গাড়ি থামা লুহান! ড্যাম ইট!”

লুহান গাড়ি থামাতেই উদ্যান ঝড়ের বেগে বাইরে বেরিয়ে হাত ধুয়ে নিল। পরনের জ্যাকেটটা খুলে বিরক্তির সাথে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবারও উঠে পড়ল গাড়িতে। তবে এবার আর ফুলের পাশে নয়, সে গিয়ে বসল সামনের সিটে।

ফুল নিজেকে সামলাতে না পেরে সিটের ওপরেই শুয়ে পড়ে কাতরাতে লাগল।
উদ্যান চোখ বুজে স্থির হয়ে বসে রইল। লুহান স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ওর? এর আগেও তো অনেকবার গাড়িতে উঠেছিল। তখন তো হয়নি এমন।”

উদ্যান চোখ না খুলেই বলল, “কাকে জিজ্ঞেস করছিস? আমি কীভাবে বলবো ওর কী হয়েছে? আমি কি ডাক্তার নাকি?”

“তুই আসলেই জানিস না?”

উদ্যান এবার তড়াক করে চোখ মেলল। থমথমে মুখে প্রশ্ন করল, “কী বলতে চাইছিস তুই?”

লুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “তেমন কিছুই না। জাস্ট লক্ষ্য করলাম, কয়েকদিন ধরে মেয়েটা কিছুই খেতে পারছে না।”

উদ্যান থমকে গেল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “হয়তো অতিরিক্ত মেন্টাল প্রেসারের কারণে শরীর এমন রিয়্যাক্ট করছে। বাই দ্য ওয়ে, তুই আবার ওকে লক্ষ্য করতে শুরু করলি কবে থেকে?”

লুহান আহাম্মক বনে গেল। তবুও একটু সময় নিয়ে বলল, “বিগত কয়েকদিন ধরে ওকে দেখলেই এঞ্জেলের কথা মনে পড়ে যায়।”

উদ্যান নিশ্চুপ হয়ে গেল। লুহানের বোন তাও লুহানকে ভাইয়া বলে ডাকার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তার বোনটা তো এই সুন্দর পৃথিবীটা একনজর দেখার সুযোগটুকুও পায়নি।

“এঞ্জেল চেয়েছিল অনেক বছর বাঁচতে কিন্তু… ওর ভাই ওকে বাঁচাতে পারেনি। একটা সত্যি কথা বলবো?”

উদ্যান প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাতেই লুহান রাস্তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বলল, “আমি হঠাৎই ফুলের মধ্যে এঞ্জেলকে দেখতে পাচ্ছি। আমি এঞ্জেলকে হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু ফুলপরীকে হারাতে পারবো না।”

কথাটা শুনে উদ্যান হাসল বোধহয়, “তুই ওকে এঞ্জেলের সাথে তুলনা করছিস? ও এঞ্জেল নয় লুহান, ও একটা উইচ। তুই এখনো বুঝতে পারিস নি কতোটা আনলাকি ও?”

“তুই আবার কবে থেকে লাকি, আনলাকির মতো শব্দে বিশ্বাস করতে শুরু করলি?”

উদ্যান নিরুত্তর রইল। খানিক বাদে নিচু স্বরে বলল, “প্রে কর, আমার বাবা যেন আরও অনেক বছর বেঁচে থাকেন।”

“আমাদের মতো লোক প্রে করলে আদৌ কোনো লাভ হবে?”

গাড়ি জুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এল। বাকিটা পথ আর কেউ কোনো কথা বলল না। ফুল তাদের কথাগুলো শুনলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় নি। উদ্যান যা বলেছে তা মিথ্যা নয়। সে আনলাকি! সেটা সে নিজেও বিশ্বাস করে।
এস্টেটে ফিরেও ফুল কোনো কথা না বলল। এমনকি কারো দিকে তাকালোও না পর্যন্ত। টলতে টলতেই নিজের ঘরে চলে গেল।
,
,
,
এখন রাত একটা। তাদের ফিরতে দেরি হওয়ার কারণে সোহম আর মেলো ডিনার না করেই অপেক্ষা করেছিল। এখন একসাথে উপস্থিত হয়েছে ডাইনিং হলে।
ফুল কয়েকজন মেইডদের সাথে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল। শরীর খারাপ লাগলেও সে কাউকে বুঝতে দিল না। তখনই সোহম ইশারা করতেই মেলো ফুলকে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিল।
লুহানের ইশারায় একজন মেইড এক বাটি ধোঁয়া ওঠা রুই মাছের ঝোল ফুলের সামনে রাখল। ফুল কিছুটা অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। বাকিরা নিজেদের মতো চেয়ার টেনে বসে পড়ল। সোহম নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল, “আজ বহুদিন পর গ্রেসফুলের সাথে বসে খাবো। ভালো লাগছে।”

ফুল চকিত নয়নে সোহমের দিকে তাকাল। দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, “কী বলছেন, সোহম স্যার? আমি… আমি পরে খেয়ে নেবো। আপনারা খান আগে।”

ফুল উঠে দাঁড়াতে নিতেই মেলো তার হাত চেপে ধরল। “আমরা কেউ কারো জন্মদিন পালন করি না। আসলে, তেহ বাদে জানিও না কার কবে জন্ম হয়েছে। শুনলাম গতকাল তোমার জন্মদিন ছিল। উইশ করার তো সুযোগ পেলাম না। চলো একসাথে খেয়ে সেলিব্রেট করি।”

তন্মধ্যেই উদ্যান হনহনিয়ে এসে নিজের চেয়ারে বসল। তার সাথে চোখাচোখি হতেই ফুল অপ্রস্তুত হয়ে কিছুটা কুঁকড়ে গেল। উদ্যান সেইদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে খাওয়ায় মনোনিবেশ করল। ফুল বুঝতে পারল এখানে বসার কারণে উদ্যান আজ তাকে কিছুই বলবে না।

ফুলের পেটে খুব ক্ষুধা ছিল। তাই সে অতোশতো না ভেবে ফটাফট খেতে লাগল। তাকে এভাবে খেতে দেখে উদ্যান লুহানের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। লুহান নিজেও হাসার চেষ্টা করল। সে যা ভেবেছিল তা সত্যি নয়; হয়তো এটাই উদ্যান চোখ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইছে তাকে।

উদ্যান আগেভাগে খাবার শেষ করে নিজের রুমে চলে গেল। বাকিরা সুযোগ পেয়ে একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল।
লুহান বলল, “নিজের খেয়াল রেখো, ফুলপরী।”

ফুল খাওয়া শেষ করে পানি খেতে যাচ্ছিল, লুহানের কথা শুনে তার হাত থেমে গেল। তার বুক ফেটে কান্না এল। বহু কষ্টে ঠোঁট কাঁপিয়ে বলল, “আপনারাও… আপনারাও নিজেদের খেয়াল রাখবেন।”

মেলো তার বাম হাতের ওপর হাত রেখে বলল, “তেহুর কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই তোমাকে আমরা গিফট গুলো দিয়েছিলাম। তোমার থাকা-খাওয়ার কোনো সমস্যা হবে না। জাস্ট নিজেকে সামলে নিও, তেহুর ওপরে জোর খাটানোর ক্ষমতা যদি আমাদের থাকতো, তাহলে আমরা জোর করে হলেও তোমাকে নিয়ে যেতাম।”

লুহান আর মেলো আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে উপরে চলে গেল। সোহম তখনো ধীরে ধীরে তার খাবার শেষ করছিল। ফুল প্রাণপণে কান্না গিলে পানি খেয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। পরপরই সোহম হাত ধুয়ে এসে স্বাভাবিক দূরত্ব বজায় রেখে ফুলের পাশের চেয়ারটায় বসল।

​কিছুক্ষণ চুপ থেকে সোহম বলল, “আমি জানি না কী বলা উচিত তোমাকে এইমুহূর্তে। প্লিজ তুমি কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিও। বুঝতেই পারছো… তেহ তোমাকে কোনোদিনও একটুও ভালোবাসেনি; এখনো বাসে না। ও শুধুমাত্র তোমাকে কষ্ট দিতেই চাইছে। ও বুঝতেই চাইছে না যে আঙ্কেলের অ্যাক্সিডেন্টটা পুরোপুরি অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। তুমি তো ইচ্ছে করে কিছুই করো নি। কিন্তু তুমি তো বুঝতে পারছো… তাই না? পারছো না বলো?”

ফুল মাথা নিচু করে রেখেছিল। তার গাল বেয়ে ঝরঝরিয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল। সে ভিজে গলায় বলল, “আমি বুঝতে পারছি সোহম স্যার, কিন্তু এটাই বুঝতে পারছি না আমার দ্বারাই কেন তার এতোবড় ক্ষতি হয়ে গেল। আমি কেন এতো আনলাকি? সে একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমার সাথে থাকলে তার আরও ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি চাইনা তার কোনো ক্ষতি হোক। সে সুখে থাকুক, ভালো থাকুক। সব সুখ তার হোক, তার ভাগের সব দুঃখ আল্লাহ আমাকে দিক।”

সোহমের চোখ লাল হয়ে এল। “এভাবে আল্লাহকে বললেই কারো ভাগের দুঃখ নিজের দিকে টেনে নেওয়া যায়?”

“আমি জানি না, সোহম স্যার। আমি কিচ্ছু জানিনা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি মরে যাচ্ছি। আমি বেঁচে থেকেও মৃত্যু যন্ত্রণা অনুভব করছি। সে আমাকে এতোটা কষ্ট না দিয়ে মেরে ফেলতো। আমার আত্মাটা শান্তি পেতো। তাকে বলুন না গিয়ে, সে যেন আমাকে মেরে তবেই মেক্সিকো যায়।”

সোহমের মনে হলো চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আসছে, কোনো অদৃশ্য শক্তি তার শ্বাসরোগ করে ফেলছে। এমন কেন অনুভব হচ্ছে তার? সে দ্রুত উঠে চলে যেতে চাইল। কিন্তু ফুল পেছন থেকে তাকে থামিয়ে দিল।

“কষ্ট কমানোর কি কোনো মেডিসিন আছে সোহম স্যার? আমি শান্তি পেতে চাইছি… তেমনটা নয়। আজ অনেক বেশিই কষ্ট হচ্ছে। আমি হয়তো উল্টো পাল্টা কিছু করে বসবো। সে চলে যাওয়ার আগেই আমি কিছু করে ফেলতে চাইছি না।”

সোহম আর পিছু ফিরে তাকানোর সাহস পেল না। সে প্রায় দৌড়ে উদ্যানের রুমের দিকে ছুটে গেল।

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৫০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply