কানুন_ভিলা
ফারহানাকবীরমানাল
২.
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। জানালা গলে গাঢ় অন্ধকার ঘরের ভেতর ঢুকছে। তোহা বিছানা থেকে নেমে জানালা বন্ধ করে দিলো। তার মন ভালো নেই। দুশ্চিন্তায় পা’গ’ল পা’গ’ল অবস্থা। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ে সোহেলের সাথে তার বিয়ে হয়। সেবার আফজাল হোসেন এতিমখানায় অনুদান দিতে গিয়েছিলেন। তোহাকে দেখেই পছন্দ করে ফেললেন। এতিম মেয়ে, তিন কূলে কেউ নেই। তবুও তিনি রাজি ছিলেন। কথাবার্তা বলে বিয়ে ঠিক হলো। বিয়ের দু’দিন আগে সোহেল তাকে দেখতে গেল।
এতিমখানার সামনে একটা বকুল গাছ আছে। তোহা বকুল গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। নরম গলায় বলল, “ম্যাডাম আপনাকে ভেতরে ডেকেছে।”
“আমি তো তোমার ম্যাডামের সাথে দেখা করতে আসিনি।”
সোহেলের গলার স্বর ঠান্ডা এবং কোমল। তোহা ঘাবড়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, “না, মানে আসলে।”
“না, মানে আসলের কিছু নেই তোহা। আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি। তুমি এসেছ, এটাই যথেষ্ট।”
“আমাকে কিছু বলতে চান?”
“না, কিছু বলতে চাই না। আমি তোমাকে দেখতে এসেছি।”
“আমাকে!”
তোহা বিস্মিত হলো। থেমে থেমে বলল, “কী দেখতে এসেছেন?”
সোহেল বলল, “তোমার বাম চোখের নিচের তিলটা দেখতে এসেছি। সেদিন নিকাব পরে ছিলে, ভালোমতো দেখতে পারিনি।”
“কোন দিনের কথা বলছেন?”
“উঁহু! তুমি আমাকে চিনতেই পারোনি। বড়ই আফসোসের কথা!”
“আমাদের কী আগে দেখা হয়েছে?”
“হয়েছে। সেদিন অটোতে তোমার সাথের ছেলেটা আমি। তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকাওনি। তবে আমি তোমায় দেখেছি। খুব ভালো করে দেখেছি।”
তোহার সেদিনের কথা মনে পড়ল। ম্যাডামের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সে কাপড়ের দোকানে গিয়েছিল। তার সাথে আরও দু’জন মেয়ে ছিল। ফেরার পথে বৃষ্টি শুরু হলো। তোহারা একটা অটোরিকশায় বসে আছে৷ অটো ছাড়বে, এমন সময় একটা ছেলে লাফিয়ে তাদের অটোতে উঠে বসল। হড়বড়িয়ে বলল, “সামনে নেমে যাব।”
ছেলেটা সামনে নেমে গিয়েছিল। তোহারা ভাড়া দিতে গিয়ে ভীষণ অবাক। ছেলেটা তাদের ভাড়া দিয়ে গেছে। মেয়েরা নিজেদের মধ্যে খোঁচাখুঁচি শুরু করল। সেই ঘটনা বিয়ের প্রস্তাব পর্যন্ত গড়াতে পারে ধারণা ছিল না তোহার।
সোহেল তোহার চোখের সামনে হাত নাচালো। সরু গলায় বলল, “কী ভাবছ? মনে পড়ল আমার কথা?”
“হ্যাঁ, মনে পড়েছে।”
“সত্যি বলতে ওইদিন তোমাকে দেখতেই অটোতে উঠে বসেছিলাম। যাতায়াতের জন্য আমার নিজস্ব গাড়ি আছে।”
তোহা কী বলবে বুঝতে পারল না। সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। সুন্দর স্বপ্ন, খুব সুন্দর। ঘুমের ভেতর চোখে পানি এসে যায় এমন সুন্দর। তোহা চোখ মুছে ফেলল।
সোহেল বলল, “একি! তুমি কাঁদছ কেন? আমার কথায় কষ্ট পেয়েছ?”
“না, আপনার কথায় কষ্ট পাইনি।”
“তাহলে? তাহলে কাঁদছ কেন?”
তার কথায় ব্যস্ততা স্পষ্ট। তোহা বলল, “আমার কিছু নেই। বাবা মায়ের কথা মনে করতে পারি না। নানি আছে শুধু। সেবার আমাদের ঘর পু’ড়ে গেলে নানি আমাকে এতিমখানায় রেখে গেল। সে এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করে। সেখানেই থাকে। আমার মতো এমন চালচুলোহীন মেয়েকে কেউ এভাবে পছন্দ করবে কল্পনা করতে পারিনি। তার চোখে পানি এসে গেল।”
“বোকা মেয়ে! আমাদের কল্পনার বাইরে আল্লাহর পরিকল্পনা থাকে। আল্লাহর পরিকল্পনা সবসময়ই পারফেক্ট। যখন আমরা খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাই এটাও পারফেক্ট। এটাও পারফেক্ট একটা পরিকল্পনা অংশ। আমরা পুরো ঘটনা দেখতে পারি না, শুধু আল্লাহই তা দেখতে পারে। বোঝা গেল?”
তোহা ভেজা চোখে তাকালো। সোহেল বলল, “সবকিছু ঠিক থাকলে দু’দিন পর আমাদের বিয়ে। তোহা, তোমার আমাকে পছন্দ হয়েছ তো?”
তোহা বুকের সাথে চিবুক মিশিয়ে রইল। লজ্জায় মাথা তুলতে পারল না। সোহেল তার হাতে একজোড়া বেলি ফুলের মালা ধরিয়ে দিলো। অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “ইচ্ছে করলে সোনা গহনা উপহার দিতে পারতাম। তবে কী জানো? আমার মনে হয় প্রাকৃতিক জিনিসে যে মায়া মিশে থাকে, সে মায়া ওই ধাতুর অলংকারে পাওয়া যায় না। আমি চাই আমাদের সম্পর্ক শুরু হোক নির্মল নির্ভেজাল অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে।”
তোহার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। এতদিন আগের কয়েক মিনিটের সাক্ষাৎ। সেই সাক্ষাতের কথা মনে পড়লে আজও তার ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। মনের ভেতর অদ্ভুত ভালোলাগা খেলা করে যায়। যে মানুষটা এত যত্ন নিয়ে সম্পর্ক শুরু করেছিল সে কীভাবে তার সম্মান নষ্ট করতে পারে? নাহ! সোহেল কিছু করতে পারে না। যা করার ওই দারোয়ান করছে। যে করেই হোক দারোয়ানকে খুঁজে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে হবে। সীমানার বাইরে কিছুই ঠিক না। সীমানা পেরিয়ে গেলে অতি সুন্দর জিনিসও কুৎসিত হয়ে যায়।
তোহা বিছানা ছেড়ে নামবে ঠিক সেই মুহূর্তে তার শাশুড়ি ঘরের ভেতরে ঢুকল। বিছানায় বসতে বসতে বলল, “কোথায় যাচ্ছো?”
“আপনার কাছে যাচ্ছিলাম। ভালো করে কথাবার্তা বলা হয়নি। হুট করে ফিরে এলেন। কোন সমস্যা হয়েছে?”
মাহিরা চমকে তোহার দিকে তাকাল। তরল গলায় বলল, “হঠাৎই তোমার শ্বশুরের খুব জরুরি একটা কাজ পড়ে গেছে। তাই তড়িঘড়ি করে ফিরে আসতে হলো।”
“ওহ আচ্ছা!”
সে খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আম্মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। বলো না, কী বলবে?”
“আমাদের বাড়ির দারোয়ান বদলাতে হলো কেন? না মানে, উনি তো অনেকদিন ধরে আপনাদের সেবা করছে। সোহেলের কাছে শুনেছি– প্রায় বারো বছর ধরে এখানে। হুট করে কী এমন হলো যে উনাকে চলে গেলেন?”
“সে কথা আর বলো না মা! গরিব মানুষ যে কোন সময়ে নিজের রূপ বদলে নিতে পারে। তুমি তো জানো দারোয়ানের বাড়ির ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। ওই রাসকেলটা তোমার শ্বশুরের রুমে ঢুকে পঁচিশ হাজার টাকা চু’রি করেছে। আরও যে-সব অকাম কুকাম করেছে তা তোমাকে বলতে পারব না।”
তোহা পাংশুমুখে তাকাল। মাহিরা বলল, “রাসকেলটা আলমারি খুলে আমার কাপড়-চোপড় নিয়ে গেছে। সেগুলো নিজের বাথরুমে ঝুলিয়ে রেখেছে। বুঝতে পারছ ওর মানসিকতা কতটা বিকৃত?”
তোহা কথার জবাব দিলো না, সরল চোখে তাকিয়ে রইল। মাহিরা বলল, “ওর মতো মানুষকে বাড়িতে রাখা নিরাপদ না। ওর কথা ভুলে যাও। খেতে এসো। তোমার শ্বশুর নিজের হাতে রাতের রান্না করেছে। চিংড়ি পোলাও। এটা ওর স্পেশাল ডিস।”
মাহিরা চলে গেল। তোহা খেতে বসল না। সোহেল বাড়িতে নেই। সে কখনো সোহেলকে রেখে খেতে বসে না। আজও বসল না। খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
রাত বাড়ছে। সোহেল এখনও ফেরেনি। তোহার মস্তিষ্ক ঘোলাটে হয়ে আছে। দারোয়ান চু’রি করা টাকা তাকে দিয়ে গেছে, ওইসব ছবি দিয়েছে। সে আসলে কী করতে চাইছে? তোহার শরীর কেঁপে উঠল।
ফোন বাজছে। অচেনা নম্বর। তোহা কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে গলার স্বর শোনা গেল।
“মা রে, আমি তোর বাপ রে মা। অনেক কষ্টে তোকে খুঁজে পেয়েছি।”
“কে আপনি? কে কথা বলছেন?”
“আমি তো বাপ রে মা। পরিচয় দেওয়ার ভয়ে ওরা আমাকে তোর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এটা ওদের যড়যন্ত্র। ওদের কথা বিশ্বাস করিস না রে মা।”
“কীসব ভুলভাল কথা বলছেন? কে আপনি?”
“আমার কথা বিশ্বাস কর মা। সোহেলকে যেমন দেখা যায় সোহেল তেমন না।”
“রাত দুপুরে ম’দ গাঁ’জা খেয়ে মানুষকে বিরক্ত করবেন না। আমার স্বামীকে আমার চেনা আছে।”
“তাই? সত্যি? তাহলে তোর স্বামী এখন কোথায়? বাড়িতে আছে?”
তোহার মনে ভয় ঢুকে গেল। সে শুকনো ঢোক গিলে চুপ করে রইল। লোকটা বলল, “আমার কথা বিশ্বাস না হলে তোকে একটা ঠিকানা দিচ্ছি। সেখানে গিয়ে দেখ, তোর স্বামী সোহেল এক মেয়ের সঙ্গে আছে।”
তোহা খুব কঠিন কয়েকটা কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল। কল কে’টে গেছে। ফোনের গলাটা তার চেনা। দারোয়ানের গলা। এতদিন ধরে শুনছে। ভুল হতে পারে না। সে ড্রাইভারকে কল দিয়ে গাড়ি বের করতে বলল। মনের ভেতরে খচখচানি নিয়ে নিঃশ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হয়। সে এই কষ্ট সহ্য করতে পারছে না।
চলবে
Share On:
TAGS: কানুন ভিলা, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৩১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৮
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৬
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৪
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৩৩(শেষের প্রথমাংশ)
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৩
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি গল্পের লিংক
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১০