#কাছে_আসার_মৌসুম__(৭৮)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
বিয়ে শেষ। ক্লাবের ধকল সামলে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত গড়িয়ে গেল। ফুলে ফুলে সাজানো প্রাইভেট কারটা দোরগোড়ায় ভিড়ল তখনই। গৃহিণীরা আগের গাড়িতে আসায়,পৌঁছেছেন প্রথমে। সেই সাথে দূরের আত্মীয়রাও আজ রয়ে গেছেন এখানে।
সকলে মিলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় বর-বউয়ের জন্যে। গাড়ির হর্ন পেতেই পরিবেশ যেন আরো উদ্বেল হয়ে উঠল।
তনিমা তো আজ বড়ো মা কম, শাশুড়ী বেশি। ছেলের বউকে সাদর আপ্যায়নের জন্যে উতলাও খুব। সার্থটার বিয়ে তো ওভাবে হলো না,এখন ছোটো ছেলেটাই যেন আনন্দের উৎস। ইউশাকে একেবারে হাত ধরে বাড়িতে ঢোকাবেন তিনি। গাড়ি থেকে অয়ন নামল আগে। মাথায় পাগড়ি ছিল না। তবে একটা গোলাপ দিয়ে বানানো মালা ঝুলছে গলায়। ঘুরে এসে ইউশার পাশের দরজা খুলতে গেলেই, বাধ সাধল ওর কাজিনরা। বলল,
“ হাঁটিয়ে নেয়া যাবে না দুলাভাই! এভাবে বোনকে হেঁটে যেতে দেবো না।”
অয়ন বলল,
“ তাহলে?”
“ সেটা আপনার ব্যাপার, আমরা কী জানি!”
এদিকে গাড়ির ভেতর অস্বস্তিতে পিষ্ট হচ্ছে ইউশা! অদ্ভুতুরে কাণ্ড,যে বাড়িতে ও জন্মাল,বড়ো হলো আজ সেই বাড়িতে এসেই ওর কেমন কেমন লাগছে। আগে বাবার বাড়ি ছিল,এবার পাশে শ্বশুর বাড়ি শব্দ যোগ হয়েছে। ইউশা এখানে সংসার পাতবে। এখন চাচা-চাচি ওর শ্বশুর-শাশুড়ি। উফ, কাজিন বিয়ে করলেও বিপদ! ওদিকে কানে আসছে মামাতো ভাইবোনদের মশকরা। ইউশা আরো চুপসে যাচ্ছে তাতে। এখন অয়ন ভাই আবার কী করবেন! ও চাইছে না অয়ন ভাই বিপাকে পড়ে এমন কিছু করুক যাতে ওনারও অস্বস্তি হবে, খারাপ লাগবে। কিন্তু কিছু বলারও উপায় নেই। এখানে অয়নের নানাবাড়ির লোকজন আছেন,দিদুনের বাবার বাড়ির আত্মীয়রাও আছেন, এদের কাছে তো ইউশা নতুন বউই! নতুন বউদের এত কথা বলা মানায়?
মেয়েটা ছটফট করে তুশিকে খুঁজল। তুশি এই গাড়িতে আসেনি। দেখতেও পাচ্ছে না। কোথায় গেল মেয়েটা? গাড়ির দরজাটা অয়ন টেনে খুলল তখনই। নড়ে উঠল ইউশা। পাশ ফিরতেই অয়ন বলল,
“ নাম।”
ইউশা স্বস্তি পেলো। যাক,অয়ন ভাই ঝোঁকের বশে কোনো কাজ করছে না। আস্তেধীরে পা দুটো মাটিতে ছোঁয়াল ও, তবে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগেই চট করে ওকে দুহাতে তুলে ফেলল অয়ন। ইউশা চমকাল খুব! থমকাল তার উশখুশে মণি। এক বাড়ি ভরতি মানুষ, মা – চাচি সবার মধ্যে এই আচমকা কাণ্ডে লজ্জার চেয়েও মেয়েটা অবাক হলো বেশি। প্রথম দফায় ধড়মড়িয়ে অয়নের গলা প্যাঁচিয়ে ধরলেও,হাতদুটো আস্তেধীরে শিথিল হয়ে গেল। অথচ বুক চিতিয়ে হাঁটা ধরল অয়ন। ততক্ষণে পেছনে ছোটোদের হৈচৈ পড়েছে। শিশ বাজাচ্ছে কেউ কেউ।
সব ফেলে অয়ন এগিয়ে চলল সৈয়দ নিবাসের দিকে। তনিমা-রেহণুমা মুখ দেখাদেখি করে হাসলেন। রেহণূমা বললেন,
“ মনে হচ্ছিল জোরাজোরির সংসার হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সময় অনেক কিছু বদলে দেয় আপা!”
“ তা যা বলেছিস। ওরা ভালো থাকলেই তো আমরা ভালো থাকব।”
উঠোন পেরিয়ে সৈয়দ নিবাসের চৌকাঠ ছোঁয়ার পুরো পথ ইউশা চেয়ে রইল অয়নের মুখের দিকে। নিষ্পলক চেয়ে দেখল ওই চিবুক। অয়ন থামল হঠাৎ-ই। ভেতরে না ঢুকে ঠিক দোরের গোড়ায় এসে দাঁড়াল। তারপর তাকাল ওর দিকে। এক যোগে চেয়ে থাকা মেয়েটাকে কেমন করে বলল,
“ আজ একসাথে শুধু বাড়িতে ঢুকব না,বরং আমরণ একটা সফর পাড়ি দেব। তুই শুধু এই সফরের মাঝপথে আমার হাত ছেড়ে দিস না!”
ইউশার বুক ভিজে গেল পশলামাখা প্রেমের বৃষ্টিতে। আকুল হয়ে বলল,
“ আমি কোনোদিনও তোমায় ছেড়ে যাব না!”
নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে হাসল অয়ন। নিশ্চিন্ত হলো হয়ত। তবে খুশির হাসি না শোকের,তা স্পষ্ট ভাবে আলাদা করা গেল না। মূহুর্তেই ডান পা বাড়িয়ে বাড়িতে ঢুকে গেল সে। যেই বাড়িতে মেয়ে ইউশা ,আজ পেলো এক নতুন পরিচিতি! সৈয়দ অয়ন আবসারের স্ত্রী আর এই বাড়ির সেজো বউ।
***
রাত প্রায় একটা বাজে। সুনসান গোটা বাড়ি। অতিথি যারা ছিলেন,ক্লান্ত থাকায় একেক ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন তারা। কোথাও কোনো শব্দ নেই,গান-বাজনা নেই। চারিদিক ভূতুড়ে অন্ধকারের মতো নিস্তব্ধ যেন। মাথার ওপর খোলা,কালো আকাশটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন । ছাদের হাওয়ায় হাওয়ায় সিগারেটের গন্ধ ছুটে বেড়াচ্ছে। ছেলেটা বিচলিত হয়ে পায়চারি করতে করতে সিগারেট টানলো কয়েকবার। স্মোকিং-এর অভ্যেস নেই, না আছে স্বভাবে। সার্থর থেকে পেলো তো পেলো এই বাজে অভ্যাসটাই পেয়েছে ও। মাথায় খুব চিন্তা থাকলে সিগারেটে আরাম পায় সার্থ। অয়নেরও আজ তাই ইচ্ছে করছিল। ব্যাপারটা সত্যিই এরকম ! এই তামাকে চুইয়ে পড়া ধোঁয়া প্রতি টানে ওর সমস্ত দুশ্চিন্তা, দূর্ভাবনাও যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই মূহুর্তে অয়ন যে জায়গায় হাঁটাহাঁটি করছে,ঠিক সেই বরাবর নিচেই ওর ঘর। যেখানে আজ ইউশা আছে, ওর স্ত্রীর রূপে । আজকে ওদের প্রথম রাত! এক কথায় বাসর রাত। অয়ন বুঝতে পারছে না,এই শব্দটাকে ও স্বাভাবিক করবে কীভাবে?
ঘরে গিয়ে কী দেখবে ও? ইউশা এক হাত ঘোমটা দিয়ে খাটে বসে আছে। নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে অয়ন স্বযত্নে ওই ঘোমটা তুলবে। কিন্তু পারবে অয়ন? রুমে ঢোকার আগে বাইরে থেকে ও অনেকের কথাবার্তা শুনেছে। ভেতরে তখন নারীমহলের আড্ডা ছিল। বাসরালাপ নিয়ে এমন এমন কথা বলছিল ইউশাকে,লজ্জায় ওরই থতমত খেয়ে যাওয়ার দশা। তারপর থেকে ঘাপটি মেরে অয়ন ছাদেই বসে আছে। ও হাতঘড়ি দেখল। চল্লিশ মিনিটেরও বেশি সময় শেষ,এবার ফেরা উচিত। অয়ন সিগারেট ফেলল! মাথার চুল বা হাতে ঠেলতে ঠেলতে ভাবল কত কী! জীবনের সমীকরণ মেলাল!
হঠাৎ টের পেলো ধুপধাপ পায়ে এদিকেই আসছে কেউ একজন। চটজলদি নিজেকে ঠিকঠাক করল ও। ভাবল, বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন তো কম নেই, হবে কেউ একটা। পরপর শ্বাস টেনে নিচে নামবে বলে ঘুরলো অয়ন,তক্ষুনি ওপাশ থেকে উঠে এলো তুশি। অমনি মুখোমুখি বিঁধে গেল দুজনে। মেয়েটার দুহাতে একটা বড়ো শীতলপাটি! এমন অপ্রত্যাশিত সামনাসামনি হওয়ায় এক দণ্ড থামল ওরা। চোখে চোখ পড়তেই মাথা নুইয়ে নিলো অয়ন। কিন্তু তুশির মাঝে বিস্ময়! অয়ন এই সময় ছাদে কেন! ইউশা তবে ঘরে একা? তুশির বুক দুরুদুরু করে উঠল এক নতুন শঙ্কার ছোবলে। ওদের দুজনের মধ্যে কি তাহলে কিছু ঠিক নেই? নাকি অয়ন ভাই এখনো সহজ হতে পারছেন না? অয়ন তক্ষুনি পাশ কাটিয়ে নেমে যেতে নেয়। পেছন থেকে তুশি উতলা হয়ে ডাকে,
“ অয়ন ভাই!”
অয়ন থামল,ফিরল না। ও ছটফটিয়ে বলল,
“ ইউশা.. ইউশাকে ভালো রাখবেন অয়ন ভাই। মেয়েটা আপনাকে খুব ভালোবাসে! অনেকে এত ভালোবাসা মাথা ঠুকে মরে গেলেও পায় না।”
শরীরটা ঘুরিয়ে চাইল অয়ন। তুশি ওর উত্তরের আশায় মরিয়া হয়ে চেয়ে। অথচ মেয়েটার মুখে সরাসরি নজর পড়তেই চেহারার রং পালটে গেল তার। বদলাল চোখের গড়ন,চাউনির ধরণ। কেন যেন মনে হল ওর জীবনের এই টানাপোড়েন, এই অস্বস্তিকর অবস্থা, এই দোলাচল সবকিছুর মূলে তুশি। এই মেয়েটার জন্যেই সব হচ্ছে। মেয়েটা যদি শুরু থেকে ওর সাথে না মিশতো! যদি পড়ার ছুঁতোয়, বইয়ের ছুঁতোয় বারবার কাছে না ঘিঁষতো, যদি সেদিন অমন করে না হাসতো অয়ন দূর্বল হতো না। কিংবা বিয়ে করব বলে আশা দেখিয়ে না রাখতো, এতটা বিধ্বস্ত হয়ে পড়তো না অয়ন। নিজেকে সামলানোর একটু শক্তি অন্তত বেঁচে থাকতো হৃদয়ে।
অয়ন কী থেকে কী ভাবল জানা নেই! চোখমুখ শক্ত করে দু সেকেন্ড দেখলই তুশিকে। পরপর দুম করে বলে বসল,
“ তুশি, আমি খুব করে চাই তোমার আর ভাইয়ার একটা ছেলে সন্তান হোক! এই অয়নের মতো হোক সেও। সেও কোনো মেয়েকে প্রচণ্ড ভালোবাসুক। আর তারপর তাকে না পেয়ে পুড়ে মরুক বিরহে!”
এটা কি অভিশাপ ছিল? তুশির বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল ভীষণ জোরে। ততক্ষনে নেমে গেছে অয়ন। কিন্তু তুশি এলোমেলো হয়ে পড়ল। অয়ন ভাই তো সেদিন বললেন, ওর ওপর আর রাগ নেই। তাহলে,আজ আবার এই কথা বললেন কেন? চিঠিতে তো সবটা বুঝিয়েছিল তুশি। তবে আবার ওসব কথা উঠল কেন আজ?
মেয়েটার মুখের সব উচ্ছ্বাস শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সার্থ ওপরে আসছিল,অয়ন মুখোমুখি হলেও থামল না কেউ। তবে ওপরে উঠতে উঠতেও ভাইয়ের ওই তাড়াহুড়ো গতির দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল সে। পরপর চোখ তুলে দেখল মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা তুশিকে। একটু চিন্তা হলো সার্থর। এগিয়ে এলো জলদি। জিজ্ঞেস করল,
“ কোনো সমস্যা?”
তুশি চুপ করে চেয়ে আছে কোথাও। চোখের পাতা পড়ছে না। সার্থ গলা বাড়িয়ে ডাকল,
“ অ্যাই চোর!”
নড়েচড়ে চাইল মেয়েটা।
“ হুঁ? কী? কই, কিছু না।”
সার্থ আর জোর করল না। ছাদের মেঝেতে পা ফেলতে ফেলতে বলল,
“ আমি তোমার চোখ দেখে বুঝতে পারি তুমি মিথ্যে বলছো,না সত্যি! তাহলে কী দরকার লুকানোর?”
তুশি ঠোঁটে টেনে হেসে বলল,
“ ছাডুন না ওসব। এটা কোন দিকে বিছিয়ে দেব বলুন!”
“ আবার আপনি? বলেছি তুমি করে বলতে।”
“ অভ্যেস হয়ে গেছে।”
“ কিন্তু আমার এসব আপনি শুনতে ভালো লাগে না তুশি।”
“ আচ্ছা বেশ, এরপর থেকে তুমি করে বলব।”
“ এরপর না,এক্ষুনি।”
তুশি চোখ বড়ো করে তাকায়। সার্থ তাড়া দিলো,
“ বলো। কই? বলতে বলেছি।”
তুশি মাথা নুইয়ে বলল,
“ কী বলব?”
“ যা ইচ্ছে।”
তুশি কিছুক্ষণ ভেবে ভেবে বলল,
“ তুমি কেমন আছো?”
হেসে ফেলল সার্থ। ছাদের সবথেকে পরিষ্কার দিকটা হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল “ ওখানে।”
ঘাড় নাড়ল তুশি। সেই লোহার দোলনাটাকে পেছনে ফেলে শীতলপাটি বিছিয়ে দিলো সামনে। সার্থর হাতে চায়ের ফ্লাস্ক,আর দুটো কাপ ছিল। ছিল এক ঝুড়ি স্ন্যাক্স। সেগুলো রেখে বসল ও।
তুশি বসতেই চোখের ইশারায় দোলনা দেখিয়ে বলল,
“ এটার কথা মনে আছে? ওখানে বসে আমি তোমাকে প্রথম ছুঁয়েছিলাম। প্রথম শুনেছিলাম তোমার নিশ্বাসের শব্দ।”
সেই দৃশ্য মনে করতেই,তুশির মেয়েলী রন্ধ্রে আরেক চোট ঝাঁকুনি লাগল আজও। লাজুক কণ্ঠে বলল,
“ আর প্রথমবার কোনো পুরুষ মানুষ আমাকে ঐভাবে ধরেছিল। আমার সারা শরীর কাঁপছিল তখন!”
“ সাথে আমার বুকটাও সেদিন প্রথম কাঁপিয়েছ।”
তুশি অবাক চোখে বলল,
“ সেদিনই?”
“ হু। কিন্তু প্রশ্রয় দিতে চাইনি। তুমি আমার অনেক ছোটো! উচ্চতায়,স্বাস্থ্যে,বয়সে সবকিছুতে আমাদের কোনো মিল ছিল না।”
তুশির কথাটা পছন্দ হলো না। উদ্বেগ নিয়ে ঘুরে বসল ওর দিকে। তার চেয়েও বেশি উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ তাতে কী হয়েছে? আল্লাহ আমাকে আপনার…”
সার্থ চোখ রাঙাতেই শুধরে নিলো। তবে একইরকম বিজ্ঞ হাবভাব করে বলল,
“ তোমার চেয়ে আল্লাহ আমাকে একটু খাটো বানিয়েছেন তো কী? বউকে সব সময় স্বামীর কাঁধ অবধিই সুন্দর লাগে। আমি হাই হিল পড়লে তো আপনার, না তোমার কাঁধও পার করে ফেলব। আর লম্বা দিয়ে কী হবে? আপনি, না তুমি কি আমার কাঁধে উঠে আম পাড়বে ? দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য একটা ছোটোখাটো ব্যাপার। এটা তো একদিন বাড়বেই তাই না! একটু ঠিকঠাক খেলেই আমি মোটা হয়ে যাব। বাকি হচ্ছে, তুমি বয়সের কথা বলছেন কেন?
আমি আপনার চেয়ে ছোটো হলেও বা কী এসে যায়? আমি কি তোমার কোলে উঠে বসে থাকি? ফিডার খেতে চাই?”
শুনুন, ওসব দিয়ে কিছু এসে যায় না। আসল হচ্ছে মনের মিল আর ভালোবাসা। আমি অনেক ভালো বউ হচ্ছি না? রান্নাও শিখছি। এরপর থেকে তো তোমার সব কাজ আমিই করে দেবো। আপনার যখন যা লাগবে সব। আমার মধ্যে কত বদল এসেছে জানেন? দরকার হলে আরো বদলে ফেলব নিজেকে। আপনি, না তুমি আমায় নিয়ে কোনো অভিযোগ করতেই পারবেন না। উফ,এই আপনি-তুমি, আপনি-তুমি অসহ্য তো!
সার্থ চুপ করে চেয়ে রইল। তুশির চোখমুখ খুব সিরিয়াস। নাকটা লাল! বোঝাই যাচ্ছে,একটু আগে স্বামীর মুখের ওসব কথায় তার মন ভেঙেছে। সার্থ তুরন্ত হাত বাড়িয়ে ওকে বুকে টেনে আনল।
“ তোমাকে আমার জন্যে চেঞ্জ হতে হবে না,তুশি। তুমি যেমন, আমার তেমনই পছন্দ!”
তুশির হৃদয় জুড়িয়ে গেলেও, খরগোশের মতো মাথা তুলে বলল,
“ তাহলে আপনি করে বলি?”
সঙ্গে সঙ্গে পুরু কণ্ঠের নিষেধ জারি হলো,
“ না।”
***
অয়ন দরজায় দাঁড়িয়ে শ্বাস নিলো। বারবার, কয়েকবার। মাথা চুলকে ভাবল,ঢুকবে কিনা! তারপর টোকা দিয়ে আস্তে করে বলল,
“ ইউশা,আসব?”
“ এসো।”
দরজা খোলাই ছিল। পর্দা ঠেলে ঢুকল অয়ন। চোখটা প্রথমেই পড়ল বিছানার ওপর। রজনীগন্ধ্যার ঘন ফুলের টানেল দিয়ে বাসরের খাট সাজানো। সাদা চাঁদরের ওপর আবার গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে রাখা। অয়ন চোখ খিঁচে নেয়। কী করবে বুঝল না! ঘুরে দরজাটা লাগাল কোনোরকম। ছিটকিনি তুলতে তুলতে পাশ ফিরে চাইল এতক্ষণে। যাক, ইউশা বিয়ের কাপড় পালটে ফেলেছে।
পরনে একটা লাল-কালো মিশেলের কাল্কি সিল্ক শাড়ি। চুল হাতখোপা করা। ঝুঁকে কিছু করছিল। আর তাতেই অয়নের নজর বিঁধল ওর খোলা,ফর্সা পিঠটায়। ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে আনল সে। গলা ঝেরে বলল,
“ কী করছিস?”
ইউশা ব্যস্ত গলায় জানাল,
“ ওই বিয়েতে বড়ো মা শাড়ি কিনল যে,ওগুলো এই ব্যাগটায় ছিল। একটা বের করলাম, এখন আর চেইন আটকাতে পারছি না। এত কাপড় যে কেন কিনেছে!”
অয়ন এগিয়ে এসে বলল,
“ দেখি সর।”
ইউশা এক পাশে সরে এলো। ও এক হাতে দিয়ে লাগেজের ওপরটা চেপে,আরেক হাতে চেইন টানলো চোখের পলকে। সোজা হতেই ইউশা বলল,
“ বাবাহ, আমি এতক্ষণ ঠেসেও পারছিলাম না। আর তুমি ধরতেই হয়ে গেল?”
অয়ন তাকাল। এত কাছ থেকে সোজাসুজি এইবার! ইউশার মুখে সাজগোজ কিছু নেই। বরং ক্লান্ত,ছোট্ট একটা চেহারা। অয়ন হুট করে খেয়াল করল শাড়ি,চুড়ি আর কানে-নাকে-গলার ছোটো-খাটো গয়নায় ইউশাটাকে বউ বউ লাগছে! অয়নের বউ ও? ভাবতেই ছেলেটা
শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াল। জিভে ঠোঁট চুবিয়ে তাকাল এদিক-ওদিক।
ইউশা জিজ্ঞেস করল,
“ ফ্রেশ হবে না?”
“ হচ্ছি।”
অয়ন তোয়ালেতে হাত দিলো। দেখল ভেজা! ইউশা নিজেই আগ বাড়িয়ে বলল,
“ আমার টাওয়ালটা তো আনা হয়নি এ রুমে। তাই তোমারটা ইউজ করেছি।”
“ আচ্ছা,নো ইস্যু!”
ওয়াশরুমে যেতে যেতেও ইউশাকে দেখল অয়ন। মেয়েটা তাহলে সহজ আছে। ক্লাবে যেভাবে কাঁদছিল! শাড়ি পাল্টানোতে ভালোই হলো বোধ হয়। কিন্তু কেন ভালো হলো? ওর কি তবে অয়নের থেকে কোনো প্রত্যাশা নেই? খাতা-কলমে স্বামী-স্ত্রী হলেও ওরা কি আদৌ তা হতে পারছে না? কত কী ভাবতে ভাবতে ভেতরে ঢুকে গেল মানুষটা। ঐ বন্ধ দরজায় চেয়ে ইউশা এতক্ষণের রুদ্ধ দম ফেলল। দূর্বলের মতো শরীর ছেড়ে বসল সোফায়। বিড়বিড় করে বলল,
“ আল্লাহ,একটু শক্তি দিও। একটু ধৈর্য দিও আমায়।”
***
তুশি চায়ে চুমুক দিয়েই নাক কুঁচকে ফেলল।
“ ইস,মজা হয়নি। বললাম রান্নাঘরে গিয়ে বানিয়ে নিয়ে আসি। প্যাকেট চা কি বিস্বাদ রে বাবা!”
“ চায়ে এটেনশান দিচ্ছ কেন?”
“ তাহলে কীসে দেবো?”
“ স্বামীর ওপর।”
তুশি বলল,
“ এই বাজে চা খেলে বুঝতে। আমাদের বস্তির ড্রেনের পানিটাও ভালো এর চেয়ে।”
“ সেটাও খেয়ে দেখেছ?”
তুশি থতমত খেয়ে বলল
“ এমা না,আমি তো একটা উদাহরণ দিলাম। আচ্ছা আপনি,না তুমিই খেয়ে বলো, এই চা মজা কিনা!”
তুশি সার্থর কাপে চা ঢালতে গেল,পূর্বেই ওর কাপটা টেনে নিলো সে। ফটাফট চুমুক দিতেই তুশি উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ এমা, এটাতে তো আমি খেলাম।”
“ তো?”
“এঁটো হয়ে গেল না? আপনার-তোমার তো সব আলাদা।”
সার্থ অন্ধকারের দিকে চেয়ে ঠোঁটের কোণ তুলে হাসল। দুষ্টু হাসি। তুশির মোটামাথা দিয়ে আজকেও সেটা ধরতে পারল না। তবে খেয়াল করল, ঠিক যেখানে ওর লিপবাম লেগেছিল,সার্থ সেখানেই চুমুক দিচ্ছে। কেন যেন ভীষণ লজ্জা পেলো মেয়েটা। আজকের প্রচণ্ড বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে দুলছিল ওর বুকের ধার। আকাশে কোনো তারা নেই, না আছে চাঁদের ছাঁয়া। তুশি তাও চেয়ে রইল সেদিকে। সার্থ খেয়াল করল মেয়েটার উচ্ছ্বসিত দৃষ্টিরা আচমকা কেমন নিস্পন্দ হয়ে গিয়েছে। মৃদূ উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ তুশি, কী হয়েছে?”
তুশি ঢোক গিলে হাসল। সাথে সাথেই বলল,
“ জানেন,আমি না পড়া-শোনায় খুব ভালো ছিলাম। স্কুলে স্যাররা আমার অনেক প্রসংশা করতো। সব থেকে বেশি আদর করতেন,ইংরেজি যিনি পড়াতেন,সেই মুনিয়া ম্যাডাম। মাঝেমধ্যে আমাকে ওনার বাসাতেও নিয়ে যেতেন । উনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন, শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে হয়। বলেছিলেন,বাচনভঙ্গি মানুষের রুচি তুলে ধরে। আবার আমি যাতে বস্তিতে থেকে ভুলে না যাই, তাই বলেছিলেন তুমি তো সিনেমা দেখো,সেখানে সবাই কীভাবে কথা বলে শিখে রাখবে,এরপর একা একা চর্চা করবে। আমিও তাই করতাম। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে? জানুয়ারি মাস। স্কুল থেকে নতুন বই দিলো। আমি বই নিয়ে লাফাতে লাফাতে ঘরে এসে দেখি, দাদি কাঁদছে। হাত-পায়ে মারের দাগ। শুনলাম,চুরির দ্বায়ে তাকে কাজ থেকে মেরে বের করে দিয়েছে। অথচ দাদি চুরি করেনি। সে কিছু জানতোই না। যেখানে খাব কী তারই ঠিক নেই,সেখানে আমার পড়াশোনা! দাদি খুব কষ্ট নিয়ে জানাল, আমাকে আর পড়াতে পারবে না! বইগুলো ফেরত দিয়ে আসতে। আমিও চুপ করে মাথা নেড়ে বললাম, আচ্ছা! ছুটে একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে কাঁদলাম খুব। বইখাতা গুলো মেলে মেলে দেখলাম,হাত বোলালাম। আমার চোখের জলে বই ভিজে গেছিল! আক্ষেপ আর অসহায়ত্বে বাচ্চা তুশি সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছে। কিন্তু মাথায় হাত বুলিয়ে মোছানোর একটা মানুষ ছিল না।”
সার্থর বুক মুচড়ে উঠল। পাংশুটে হলো শক্ত চেহারা। প্রথমেই মাথায় এলো বাবার কথা। বাবার জন্যেই মেয়েটা শৈশবে এত দুঃখ পেয়েছে,এত দূর্ভোগ সয়েছে।
কিন্তু মুখে বলল,
“ খুব কষ্ট হয়েছিল?”
তুশি টলমলে চোখে হাসল ফের। বলল,
“ হয়েছিল। তবে ওই কষ্ট কম। আমি এর চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম যেদিন আপনি আইরিনকে বিয়ে করবেন বলেছিলেন।”
“ ওটা তো মিথ্যে ছিল।”
“ হুহ!”
তুশি মুখ ফিরিয়ে নিলো। সার্থ আবার চিবুক ধরে ফেরাল নিজের দিকে। কপাল গুছিয়ে বলল,
“ সেজন্যে সরি বলিনি? তুমি জানো আমি সহজে কাউকে সরি বলি না। বয়সে বড়ো হলে এক কথা। কিন্তু নিজের চেয়ে এত ছোটো কাউকে ওইদিন প্রথম সরি বলেছি আমি।”
তুশি মিটিমিটি হেসে বলল,
“ সেদিন প্রথম না, আরো একদিন বলেছেন।”
“ কবে?”
“ যেদিন নেশা করে আমার ঘরে ঢুকেছিলেন।”
সার্থ তাজ্জব হয়ে চেয়ে রইল ক সেকেন্ড। তুশি ভীষণ উপভোগ করল ওর চাউনি। খুশিতে খলবলিয়ে বলল,
“ মেঝেতে হাতপা ছড়িয়ে বলেছিলেন,স্যানোরিটা আম সরি। প্রথম তো ভেবেছিলাম কাকে যেন ডাকছেন। পরে যখন আমার কথা বললেন তখন বুঝেছি!”
শেষটুকুতে তুশির চেহারায় তুষ্টির আলো ফুটলো। সার্থ নির্বোধ বনে বলল,
“ মানে,আমি যদি সেদিন সরি বলি, তাহলে তুমি আমার ওপর রেগে ছিলে কেন?”
“ কারণ আপনি আইরিনকে বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন!”
“ তুমি আমাদের বিয়ের পরেও তো রেগে ছিলে।”
তুশি ফটাফট বলল,
“ হুশে থেকে কষ্ট দিয়ে, নেশায় বলা সরি আমি নেব কেন?”
“ খুব চালাক না? বিটকেল বলো আমাকে। কিন্তু তোমার শিরায় শিরায় বিটকেলি বুদ্ধি।”
“ অতটাও না। বস্তিতে বড়ো হয়েছি। একটু শেয়ানা আমি, এই আরকি!”
সার্থ থুতনিতে হাত ঘষতে ঘষতে ভাবছিল। চুমু অবধি মনে আছে ওর,তারপরের টুকু তো মনে পড়ছে না। তক্ষুনি ওর
চওড়া কাঁধে মাথিয়ে এলিয়ে দিলো তুশি। মিহি গলায় বলল,
“ জানেন, আমি যেদিন প্রথম বুঝলাম আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি সেদিন আমি বারবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেছি। আমার কী ভালো,কী খারাপ! সব নিয়ে ভেবেছি। আপনাকে একটু দেখার জন্যে স্টোর রুমের দরজার আড়ালে লুকিয়ে থেকেছি মূহুর্তের পর মূহুর্ত। তখন আমার খুব ইচ্ছে করতো আপনার সাথে কথা বলতে। যে কোনো ছুঁতোয় আপনার পাশে বসে থাকতে। আপনাকে একটু ছুঁতে। আজ আল্লাহ আমাকে চাওয়ার থেকেও বেশি দিয়েছেন। আমি কোনোদিন ভাবিইনি আপনিও আমায় ভালোবাসবেন।
আপনার সাথে রাতের আকাশ দেখার স্বপ্নটাও কেমন পূরণ হয়ে গেল তাই না। আমি একবার বলাতেই আপনি রাজি হবেন জানলে আরো আগে বলতাম।”
সার্থ উত্তর দিলো না। রাতের গায়েবি আলোতে শুধু এক ধ্যানে দেখল তুশির মোমের মত মুখটা। জবাব না পেয়ে তুশি মাথা তুলে চাইল। স্বামীর অপলক দৃষ্টি দেখে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ কী দেখছেন?”
“ তোমাকে!”
তুশি মিইয়ে গেল কিছুটা।
“ রোজই তো দেখেন।”
“ আবার আপনি করে বলছো!”
ও ঠোঁট উলটে বলল,
“ আমার মুখে তুমি আসছেই না।”
সার্থ এই প্রসঙ্গ থেকে রেহাই দিলো বোধ হয়। এক পল চুপ থেকে ডাকল,
“ তুশিইইইই!”
“ হুউউউ।”
“ আমি তোমার প্রেমে এত পাগল হলাম কবে?”
তুশির গালদুটো ফেঁপে উঠল। লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলল,
“ আগে তো আমাকে পাগল বানিয়েছেন। তারপর না!”
সার্থ চট করে উঠে দাঁড়াল। ভারি ব্যস্ত হয়ে বলল,
“ তাহলে চলো।”
“ কোথায়?”
“ রুমে।”
“ কীহ? কেন? আমাদের তো আজকে সারারাত এখানে থাকার কথা। কত কী নিয়ে এলাম সেজন্যে!”
“ ছিল। এখন মন বদলে গেছে। আপাতত অন্য কিছু চাই।”
“ কী চান?”
“ ভেঙে বলব?”
তুশি বিস্মিত হয়ে বলল,
“ পা-গল হলেন! এখানে কী সুন্দর বাতাস! আমি এখন ছাদ থেকে যাবই না।”
“ তাহলে যাও,ঐ চিলেকোঠার আলোটা বন্ধ করে এসো।”
তুশির চোখ কপালে উঠে গেল। ইঙ্গিত বুঝতেই হার মানল বেচারি। হতাশ শ্বাস টেনে দাঁড়াল নিজেও। পরাজয় স্বীকার করে বলল,
“ না থাক,যাচ্ছি।”
****
অয়নের একটু সময় লাগল ফ্রেশ হতে। বাইরে এসে দেখল,ইউশা বিছানা ঝাড়ছে। চাঁদরে থাকা ফুলের পাঁপড়ি সব এখন গড়াগড়ি খাচ্ছে ফ্লোরে। ওকে দেখতেই বলল,
“ নাও, শুয়ে পড়ো। সেই কোন সকালে উঠলে! ঘুম পায়নি?”
অয়ন বিস্ময়াভিভূত হয়ে যায় ওর হাবভাব দেখে। কিছুতেই ভেবে পায় না,ক্লাবে অমন জোরে জোরে কাঁদতে থাকা মেয়েটা এত সহজে স্বাভাবিক হলো কী করে?”
বারান্দার দিকে এগোতে নিলেই ইউশা বাধ সাধল। নিজেই ওর হাত থেকে শেরওয়ানিটা নিয়ে বলল – আমি নেড়ে দিচ্ছি।
অয়ন এসে বিছানায় বসল। পায়ের নিচে নরম ফুলের পাঁপড়ির ছোঁয়ায় টের পেলো,ওর খুব নার্ভাস লাগছে। কেন লাগছে? ইউশাকে ও ছোট থেকে চেনে। বলতে গেলে একই সাথে বড়ো হওয়া! তাহলে হঠাৎ করে মেয়েটাকে নিয়ে এমন যারপরনাই সঙ্কোচ কীসের?
ইউশা ঘরে এসে বলল,
“ আচ্ছা, ঘরে কি এক্সট্রা কোনো টপার বা তোষক আছে?”
“ কী করবি?”
“ নিচে বিছানা করতাম। আমি কাউচে শুতে পারব না। আর ফ্লোর এত ঠান্ডা শুধু চাদরেও হবে না। আবার বাইরে গিয়ে আনতে চাইলে সবাই অনেক প্রশ্ন করবে। মা তো বলে দিয়েছে, বিয়ের প্রথম রাতে একবার বউ ঘরে ঢুকলে আর বের হতে নেই!”
অয়ন বুঝতে পারল মেয়েটা চাইছে কী! ফোস করে শ্বাস ফেলে সরাসরি বলল,
“ ইউশা,এসব করার কোনো দরকার নেই। আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী। আমাদের সেইসব করা উচিত যা আর পাঁচটা স্বামী-স্ত্রী করে।”
“ হ্যাঁ?”
অয়ন থতমত খেয়ে বলল,
“ আই মিন,আই মিন আমরাও স্বাভাবিক হব। তুই বিছানায় শো।”
“ তোমার অস্বস্তি হবে না?”
“ তোর হবে?”
ইউশা গলায় চিবুক নুইয়ে মাথা নাড়ল দুপাশে। বলল,
“ আমার তো সমস্যা নেই!”
“ তাহলে আমারো নেই। আয়!”
অয়ন এই কোণে আধশোয়া ছিল। ইউশা ঘুরে গিয়ে খাটের ওই কোণে বসল। অয়ন বেড সুইচ টিপতেই পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে গেল ঘরটা। ইউশা জড়োসড়ো হয়ে ওপাশ ফিরে শুলো। অয়ন শুলো ছাদের দিকে চেয়ে। পুরো ঘর ছেঁয়ে যাওয়া পিনপতন নীরবতার মাঝেই হঠাৎ ডাকল মানুষটা,
“ ইউশা!”
ইউশা জবাব দেয় আস্তে, ‘’ জি?”
“ তোর টেডি আনিসনি?”
“ মা দিলো না৷ তোমার বেডটা ছোটো তো। কাল,কাল নিয়ে আসব।”
“ টেডি না ধরলে ঘুম হয়?”
“ পারব, সমস্যা নেই।”
“ তুই চাইলে আমাকে জড়িয়ে ধরতে পারিস।”
এতক্ষণ ওইপাশে গুটিয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটা,চমকে ফিরল অমনি। কণ্ঠে অবিশ্বাস নিয়ে বলল,
“ হ্যাঁ?”
অয়ন শুয়ে থেকেই পাশ ফিরে চাইল। শান্ত দৃষ্টি তার,
“ আমি এখন তোর স্বামী,তোর আমাকে ধরার অধিকার আছে।”
“ কিন্তু….”
“ এভাবে দূরে দূরে থাকলে মুভ অন করব কী করে?”
ইউশা চোখ নামিয়ে বলল,
“ আমি একা এগোলে কি হবে? তোমাকেও তো এগোতে হবে।”
মুচকি হাসল অয়ন। শুয়েই একটু এগোলো শরীরটা। ওপাশ থেকে ইউশাও এগোয়। তারপর আরেকটু এগোয় অয়ন। দু-তিনবারের এই পদক্ষেপে মূহুর্তেই মাঝখানে থাকা বিশাল গ্যাপটা মিটে গেল ওদের। খুব কাছাকাছি হয়ে পড়ল দুজন। অয়ন বলল,
“ মাথা তোল।”
বালিশ থেকে একটু করে মাথা তুলল মেয়েটা। নিজের একটা হাত লম্বা করে ছড়িয়ে দিলো অয়ন। ইউশা দুরুদুরু বুক নিয়ে মাথা রাখল তার বাহুতে। তারপর ওর একটা হাত নিয়ে নিজের গায়ে রাখল অয়ন। চোখ বুজে বলল,
“ এবার ঘুমা।”
ইউশার ঘুম আসবে? তাও এই অবস্থায়? ও তো অয়ন ভাইয়ের বুকে ঢুকে আছে। তার আনচানে চিত্তের মাঝে অয়ন ভারি স্বরে বলল,
“ এত জোরে হার্ট বিট করছে কেন? স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।”
ইউশা লজ্জা পেয়ে গেল। মুখ লুকিয়ে রাখল চুপ করে। একটা সময় টের পেলো অয়ন ঘুমিয়ে গেছে। তার দীর্ঘ নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে ঘরে। ইউশা মুখ তুলে চাইল! ঘুমন্ত অয়ন ভাইকে দেখল চেয়ে চেয়ে। দুচোখ ছাপানো তৃষ্ণা তো মিটিয়ে নেয়া চাই! আর সেই তৃষ্ণায় এমন জোর যে, অন্ধকার রাত ফুরিয়ে আলো ফুটল কখন, মেয়েটা টেরই পেলো না!
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৮