কাছেআসারমৌসুম__(৭২.২)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
লিপস্টিকে রাঙা দুটো পুরন্ত ঠোঁট ফাঁকা করে চেয়ে রইল তুশি। চোখেমুখে ধাঁধিয়ে যাওয়া বিস্ময় তার। কিছুটা অবিশ্বাস সাথে! সার্থ এলো কখন? ঢুকল কখন বাড়িতে?
মেয়েটার এই মূক বনে চেয়ে থাকার মাঝেই,গিটারটা পাশে নামিয়ে রাখল সার্থ। বসা থেকে উঠে এলো পরপর। খালি বাড়িতে তার একেকটা পা ফেলার ঠকঠক আওয়াজ তুশির হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলল। গলা শুকালো জলের অভাবে ভোগা তপ্ত মরুর ন্যায়। এলোমেলো হয়ে আসা চোখদুটো তৎপর নামিয়ে নিলো তুশি।
ততক্ষণে মানুষটা এসে মুখোমুখি থেমেছে। পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট! আগাগোড়া মোড়ানো কালোর ভিড়ে সার্থর হলদে মুখটা সুতনু লাগছে খুব। কিন্তু তার মনোযোগ তো নিজের তরে নয়! সম্মুখে দাঁড়ানো সাজগোজ আর মেক-আপে ফুটে ওঠা সুরুপার মুখশ্রীতে চেয়ে চেয়ে এক অতল নেশায় তলিয়ে গেল মানুষটা। এত সুন্দর লাগছিল তুশিকে,মেয়েটার গোটা চেহারায় চোখের মনিদুটো একবার ঘুরিয়ে আনল সার্থ। তুশির আনচান করা বাড়ল এতে। সোজাসুজি না তাকালেও বুঝল,লোকটা ওকেই দেখছে। ঢোক গিলে হাত দিয়ে নাকের ডগায় জমা ঘামের কণা মুছল এক ডলায়।
সার্থ গভীর স্বরে ডাকল সেসময়,
“ তুশিইইইই!”
তুশির বুকের ধার ছলকে ওঠে। তাকায় মুখ তুলে। সার্থ অনেক লম্বা হওয়ায় ঘাড়টা একটু ঝুঁকিয়ে এনে থামল ওর কপালের ওপর। কণ্ঠস্বর খাদে নিয়ে বলল,
“ আমি তোমায় কিছু বলতে চাই!”
তুশির কণ্ঠ কাঁপছিল। তিরতির করছিল চোখের পাতা। জিজ্ঞেস করল – “ ক-কী?”
তুরন্ত দুই হাঁটু মুড়েই ওর সামনে বসে পড়ল সার্থ। চমকে গেল তুশি। এক পা পিছিয়ে যাওয়ায় পিঠটা লাগল অ্যাকোরিয়ামের সাথে। সার্থ আজ রাখ-ঢাক রাখল না। না রাখল নিজের কঠোরতা। সোজাসুজি বলল,
“ আজ প্রথম বার কোনো পুলিশ অফিসার এক চোরের কাছে স্বেচ্ছায় সারেন্ডার হতে এসেছে। নিংড়ে দিতে এসেছে তার ভেতরের সবটুকু! বলতে এসেছে,তার ব্যক্তিগত চোরকে –
“ তুশি, আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
তুশির অস্থির চোখ থমকায়। চমকায় আরেক চোট।
সার্থ বলেই গেল,
“ প্রতিটি মহাবিশ্বের প্রতিটি সম্ভাবনায়,প্রতিটি ব্যাখার প্রতিটি লাইনে হাজার রূপে,হাজার ভাবে আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি!”
“ তুমি আমার জীবনে উপন্যাসের সেই শেষ পাতা হও,যা পড়ার পর প্রত্যেকটা মানুষ সুখের নিঃশ্বাস নেয়। আমার জীবনের ধুলোমাখা-ভাঙা পথটায় সেই ফুল হও,যার স্নিগ্ধতায় পথের সৌন্দর্য বদলে যায়! আরো একবার সব ভুলে,সব ছেড়ে, সব নিষেধ মাড়িয়ে সার্থ-র জীবনের সার্থ(সঙ্গী) হও। ”
একটু থামল সার্থ। বলল,
“ আমি জানি,তোমার প্রতি আমার অন্যায় আছে, অনেক ভুল আছে। কিন্তু, সেসব অন্যায় জমিয়ে যদি একটা নদী হয়, আমার ভালোবাসা জমালে সমুদ্র হবে তুশি। যার কূল নেই,পাড় নেই। শুধু উত্তাল ঢেউ আছে। যারা তোমাকে আমার ভালোবাসায় ভাসিয়ে দিতে চায়। তুমি যাবে তুশি? আরেকবার,নতুন ভাবে নতুন করে আমার সাথে, যাবে?”
তুশি চুপ করে চিবুক নুইয়ে রাখল। দুগালে চোখের জলটা টুপ করে পড়ল মূহুর্তে।
নড়ল না মেয়েটা। কথাও বলল না। সার্থ নিজেই উঠে দাঁড়াল। কাছে এসে দুগাল ছুঁয়ে বলল,
“ এখনো এত অভিমান?”
মুখটা তুলতে চাইলে তুশি মাথা শক্ত করে রাখল। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সার্থ,
শুধাল,
“ কী হয়েছে? বলো আমাকে!”
জবাব এলো না। বরং হাতের তালুতে তুশির চোখের জল পড়ল। সার্থ উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ আমি সরি তো। সব কিছুর জন্যে সরি! তোমাকে রাগের মাথায় যা যা বলেছি সেজন্যে সরি। যখন যা কিছু নিয়ে কষ্ট দিয়েছি সেজন্যে সরি। সরি ফর এভ্রিথিং!”
তুশি তাকানোর বদলে গাল থেকে হাত সরিয়ে দিলো ওর। সার্থ এমনিই রগচটা মানুষ! এটুকু অবজ্ঞাতেই মাথা চটে গেল। অমনি খ্যাক করে বলল,
“ এখন কি তোমার পা ধরব?”
“ কথা বলছো না কেন?”
তুশি শক্ত চোখে চাইল,বলল,
“ কী বলব? বাড়ি ফাঁকা,কেউ নেই। এই মূহুর্তে আপনি সরি বলছেন,আমি কী বলব এটা নিয়ে?”
সার্থর কপাল গুছিয়ে যায়,
“ কীহ?”
“ আগে তো সরি বলেননি। এক ঘরে থেকেও বলেননি। তাহলে আজ কেন বলছেন? নিশ্চয়ই এতদিন যা চেয়েছেন তা পাওয়ার সুযোগ এসছে বলে?”
তুশির চটাংচটাং কথা।
সার্থ নিস্তব্ধ হয়ে বলল,
“ তুমি আমাকে এমন ভাবো?”
“ না ভাবার কী আছে? আপনার মতো একজন পুলিশ অফিসার,আমার মতো মূর্খ মেয়েটাকে হুট করে ভালোবেসে ফেলল? এত সহজ! নাকি আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিছানায় নেয়ার ফন্দি এসব?”
সার্থর চেহারার রং বদলে গেল অমনি। এতক্ষণের শান্ত কোমল চোখগুলোয় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। কপালের শিরা দেখা গেল,
প্রখর ক্ষুব্ধতায় চিবুক ফুটিয়ে দুম করে লাথি মারল অ্যাকোরিয়াম রাখা টেবিলের পায়ায়।
তুশির বুক কাঁপে। গুটিয়ে যায়। অ্যাকোরিয়াম কাঁপতে কাঁপতে পড়তে নিলে ধড়ফড় করে আগলে ধরে দুহাতে।
ততক্ষণে হনহন করে বেরিয়ে গেল সার্থ। একেবারে সদর দরজা পেরিয়ে চলে গেল বাইরে। তুশির সারামুখে অন্ধকার নেমে এলো সহসা। জিভ কেটে নিজের মাথায় নিজেই চড় মারল। এই রে,বেশি বলে ফেলল? বিটকেলটা ওর এতটুকু কথা সহ্য করতে পারে না, নিজে যে কত কী শোনায়! রাগ ভাঙাতে এসে নিজেই রেগে গেল! এমা, বাইরে তো বৃষ্টি পড়ছে, এর ভেতর যাচ্ছে কোথায় লোকটা?
তুশি শাড়ির কুচি ধরে পিছু ছুটল অমনি। তবে সার্থর লম্বা পায়ের সাথে কুলোতে পারল না!
তক্ষণে সুইমিংপুলের লনে চলে গেছে সে। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি তখন। ঝোড়ো হাওয়ায় বড়ো বড়ো গাছের ডগা দুলছে। একটার ওপর এসে হেলে পড়ছে আরেকটা। তুশি উত্তেজনায় খেয়ালই করল না সারাবাড়ি অন্ধকার থাকলেও,বাইরের উঠোন জোড়া ঝকঝকে আলো। ও ছুটল পায়ের গতি বাড়িয়ে। সার্থ সুইমিংপুলের পাড়ে থাকা বেঞ্চের ওপর বসেছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দেখেই বোঝা গেল কী মারাত্মক চটেছে মানুষটা। তুশি ছাউনির তলে দাঁড়িয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে ডাকে, “ শুনছেন,শুনুন না!”
সার্থ শুনলো না,তাকালোও না। তুশি নিজেই আঁচলটা মাথার ওপর ধরে দৌড়ে এলো। ভিজে গেল মূহুর্তেই। বেঞ্চের পাশে দাঁড়াতেই মুখ ফিরিয়ে নিলো সার্থ। তুশি মিনমিন করে বলল,
“ ইয়ে মানে, ওগুলো আমার মনের কথা ছিল না। আমি আসলে মজা করছিলাম। ”
চকিতে ফিরল সার্থ,তাজ্জব হয়ে বলল,
“ মজা!”
“ হহুউউ,কিন্তু আপনি তো উলটো রেগে গেলেন। এত মাথা গরম!”
তারপর চোখ নুইয়ে বলল,
“ আমি একটু পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আপনাকে ক্ষ্যাপাব,আর আপনি আমার কথা শুনে রেগেমেগে আবার আমাকে আগের মতো উলটোপালটা কথা শোনান কিনা! তাহলে বুঝতাম আপনি ভালো হননি।”
সার্থ আশ্চর্য চোখে চেয়ে রইল কিছু পল। তব্দা খেয়ে গেছে। তুশি হাতের আঙুল কচলাতে কচলাতে বলল,
“ সরি!”
অমনি ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল ও,
“ কীসের সরি? হ্যাঁ, কীসের সরি?”
তুশি কেঁপে উঠল। তাকাল বড়ো বড়ো চোখে। সার্থ বলল,
“ তুমি আমার চরিত্র নিয়ে আঙুল তুলেছ! ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে আমাকে ক্যারেক্টরলেস বলেছ। যেখানে আমি একটা প্রেম করিনি কখনো, কোনো বাজে রেকর্ড আমার নেই। স্টিল ভার্জিন একটা ছেলেকে তুমি প্রশ্নবিদ্ধ করে বলছো মজা?”
তুশি মহাবিপন্ন হয়ে বলল,
“ ভা-র-জিন কী?”
“ যেটা আমি থাকতে চাচ্ছি না,কিন্তু তোমার জন্যে হচ্ছে না।”
তুশির মুখ দেখে মনে হলো এর চেয়ে অপরাধ আর হয় না। ফের মাথা নুইয়ে বলল
“ সরি বললাম তো। আর করব না। ঘরে আসুন না। যেভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে,মাথায় একটা বাঁজ পড়লে দুজনেই মরব।”
সার্থ শক্ত গলায় বলল,
“ যাব না।”
“ বললাম তো সরি।”
সার্থ ফুঁসছে। তুশি কাঁদোকাঁদো হয়,
“ সরি তো।”
“ এভাবে না, কান ধরো।”
“ হ্যাঁ?”
“ কান ধরে তিনবার ওঠবস করবে। প্রতিবার বলবে,
“ আই লাভ ইউ!”
তুশি আহাম্মক বনে বলল,
“ কীহ? মাথা খারাপ নাকি! বোকা পেয়েছেন? এটার মানে আমি জানি। ”
“ সো হোয়াট? না বললে নেই।
আমি আজকে বৃষ্টিতেই ভিজব। কী এমন হবে,জ্বর আসবে, জ্বর থেকে টাইফয়েড হবে। তাছাড়া এমনিতেই আমার ঠান্ডা লাগলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়!”
তুশি বুঝল ওকে ভয়ানক ভাবে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করা হচ্ছে। রাগ হলেও,গাইগুই করতে পারল না। বউয়ের দরদি মন তো,যদি সত্যিই জ্বর টর বাঁধে?
ফুঁসতে ফুঁসতে দুকানে হাত দিলো। খিটমিট করে বলল,
“ আল্লাহর গজব পড়বে আপনি যা শুরু করেছেন।”
তারপর তুশি বসল। রাগের মাঝেও গাল লাল হয়ে গেল ঐ কথা বলতে। চোখের পাতা এলোমেলো ঝাপ্টে, এদিক ওদিক চেয়ে বলল,
“ আই লাভ ইউ!”
উঠল আবার। বলল,
“ আই লাভ ইউ…”
সার্থ পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যদিক চেয়ে বড্ড গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,
“ আরও একবার।”
তুশি মুখ ফুলিয়ে বসতে বসতে বলল,
“ আই লাভ ইউ! হয়েছে,শেষ।”
কান থেকে হাত নামায় ও। সার্থ চাইল এবার,সোজাসুজি। তুশির শাড়ি ভিজে চপচপ করছে। পাতলা কাপড় গায়ে লেগে গেছে পুরো। মসৃণ পেট, বুক, বাঁকানো কোমর স্পষ্ট সব! আপাদমস্তক মেয়েটাকে চিলের নজরে দেখে ঢোক গিলল সার্থ। এক পা এগোলো, দুরুত্ব কমাল কিছুটা। তবে এর বেশি এগোনোর আগেই, তুশি উল্টোঘুরে ছুটে ঢুকে গেল বাড়িতে। সার্থ বোকা বনে যায়! তবে থামে না আজ। ‘অ্যাই চোর, শোনো’ বলতে বলতে নিজেও ধাওয়া করে পেছনে।
তুশি ভেবেছিল দাদির ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেবে। কিন্তু হঠাৎ পা জোড়া থামল কোনো শব্দে। কেউ একজন খুব জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে। এই বাড়ির শেষ ঘরটা থেকে আসছে সেই শব্দ। সাথে ডাকছে গলা ফাটিয়ে,
“ আফা ও আফা… আফাগো আমারে বাইর করেন ও আফা!
তুশি ভড়কে গেল বিহ্বলতায়। আসমা? আসমা ডাকছে না? কিন্তু বাড়িঘর অন্ধকার,কোনদিকে যাবে ও?
ঢুকেছে তো হাতড়ে হাতড়ে। টেবিলের ড্রয়ারে মোমবাতি থাকবে ভেবে তুশি আবার হাতানো শুরু করল,তক্ষুনি আলোয় আলোয় ঘর ছেঁয়ে যায়। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মেয়েটা। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পাশ থেকে হাচির শব্দ এলো। একটু চমকে ফিরল তুশি। চোখ পড়ল সার্থর ওপর। কিন্তু ওকে নিয়ে এখন তো ভাবার সময় নেই। আসমা দোর ধাক্কাতে একটুও বিশ্রাম নিচ্ছে না। ওকে আগে বের করতে হবে। তুশি সেই পথে ছুটল নিমিষে।
ঘরের দরজা বাইরে থেকে লাগানো। তুশি মহা তাজ্জব হয়ে গেল। কে লাগাল এটা? ছিটকিনি টেনে সরাতেই ঘামে জবুথবু আসমা বেরিয়ে এলো হন্তদন্ত ভঙিতে। অমন হড়বড়িয়ে বলল,
“ আফা, এই বাড়িত জ্বীন আছে! জ্বীন আমারে আটকাইয়া থুইছে।”
পরপর ওর চোখ গেল তুশির পেছনে। কাকভেজা সার্থকে দেখেই সুর দিয়ে বলল,
“ ও ভাইজান গো, আমনে গো বাড়িতে দোষ আছে ভাইজান। আমারে আটকাইয়া থুইছে রে….”
বলতে বলতে ভ্যায়ায়া করে কেঁদে দিলো আসমা। তুশি বিচলিত হয়ে বলল,
“ আহা শান্ত হও। কী হয়েছিল? তুমি না ঘরের জানলা আটকাবে বলে গেলে? এখানে আটকা পড়লে কী করে?”
আসমা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
“ আমি কি আটকা পড়ছি আফা? আমি তো কামেই আইছেলাম। জানলা আটাকাইতে আইছি না? হুট কইরা কেডা জানি দরজা টাইনা লাগাই দিছে। আমি দৌর দিছি পায়ে লাইজ্ঞা টেবিলের উপ্রে দিয়া গেলাস পইরা গেছে। আমি তো ডরে শ্যাষ। দরজা ধাক্কাইতে গেছি, তহন আবার কারেন্ট চইলা গেছে।”
আসমা আবার ভ্যায়ায়ায়ায়া করে উঠল। অথচ ঘাড় ডলতে ডলতে মাথা নুইয়ে গালের ভেতর জিভ ঠেলে হাসল সার্থ। তুশি ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ এত কিছু হয়ে গেল? আমাকে ডাকোনি কেন?”
“ ডাকমু কেমনে, আফা? আমি তো ডরে অগ্যান হইয়া গেছিলাম। বুঝছি, জ্বীন মনে হয় আমারে আইজকা মাইরাই ফালাইব,আমার তো অহনও বিয়াশাদী কিচ্ছু হইল না।”
“ উফ হো এ বাড়িতে এসব নেই। ভয় পেও না।”
সার্থ মুখ খুলল এতক্ষণে,এক কদম এগিয়ে এসে বলল,
“ কে বলল নেই? কতদিন এসছো তুমি? প্যারানরমাল কিছু থাকলেও থাকতে পারে।
আসমা এক কাজ করো, ঘরে গিয়ে ভালো করে দরজা আটকে ঘুমিয়ে যাও। কিছুতেই বের হবে না। কেউ ডাকলেও না। “
“ ভূত বিত্রে যাইব না ভাইজান?”
“ দোয়া পড়লে যাবে না।”
“ সত্য?”
“ আমি কি মিথ্যে বলব?”
আসমা ঘাড় নাড়ল,
“ আইচ্ছা ।”
ওরনায় চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল ও।
তুশি কোমরে হাত দিয়ে তাকাল সার্থর দিকে।
মেজাজ নিয়ে বলল,
“ এটা নিশ্চয়ই আপনার কাজ? আপনি ওকে আটকে রেখেছিলেন তাই না?”
সার্থ কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
“ হতেও পারে।”
কথা শেষ করে আবার হাঁচি দিলো ও । পটাপট তিনটা হাঁচিতে ঘাবড়ে গেল তুশি। উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ এমা, আপনার তো মনে হয় ঠান্ডা লেগে গেছে। বলেছিলাম, না ভিজতে। ভালো হয়েছে, সব সময় জেদ, চলুন।”
সার্থর ফোনে কল এসেছে। ও ওয়াশরুমে থাকায় ধরল তুশিই।
“ হ্যাঁ বাবা,কখন আসবে তোমরা? বাইরে তো খুব ঝড় হচ্ছে।”
সাইফুল বললেন,
“ সেজন্যেই ফোন করলাম। সার্থ বাড়ি গিয়েছে কিনা জানতে। শোন মা,তোরা তো আসতে পারলি না। আর এই ঝড়ের মধ্যে নাসীররা কেউ ছাড়তে চাইছে না আমাদের। বলছে, অত দূরের পথ ঝড় বন্যা ডিঙিয়ে এত রাতে যাব! বিপদ আপদ হলে? ওদিকে তোরাও আবার একা।”
“ আমাদের চিন্তা করো না,আমরা তো বাড়িতেই আছি। ওনারা ঠিকই বলছেন। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না। চারদিকে যা সব ডাকাতি হচ্ছে। এত রাতে তো আর কেউ থাকবেও না। সত্যিই যদি ভালো-মন্দ কিছু ঘটে যায়।”
“ আচ্ছা তাও অপেক্ষা করি। দেখি বৃষ্টিটা কমে কিনা!”
বাবার সাথে কথা বলার মাঝেই চেঞ্জ করে বেরিয়ে এলো সার্থ। হাঁচি দিলো আবার। নাকমুখ ডলতে ডলতে ধীরুজ পায়ে হেঁটে এসে বসল বিছানায়। তুশি চেয়ে দেখল ওর সারামুখ লাল হয়ে গেছে। গায়ের ফরসা চামড়া ফ্যাকাশে লাগছে হালকা। তার মধ্যেই ফের হাঁচি দিলো দুটো। চপল চিত্তে এগিয়ে এলো তুশি। চিন্তিত সে,জিজ্ঞেস করল,
“ আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
“ একটু!”
পরপর নিচু চোখ দুটো তুলে চাইতেই আঁতকে উঠল মেয়েটা।
“ এ কী! চোখ এমন লাল হয়ে গেছে কেন?”
তুশি চট জলদি ওর কপালে হাত রাখল। গরম তাপে আর্তনাদ করে বলল,
“ আল্লাহ,জ্বর এসেছে। কী করি এখন! জলপট্টি দেব? ওষুধ,ওষুধটা…”
তুশি অস্থির হয়ে ড্রয়ার থেকে ওষুধের বাক্স বের করল। জ্বরের ওষুধ কে না চেনে! কিন্তু পাতা থেকে খুলতে গিয়েও বলল,
“ আপনি তো কিছুই খাননি তাই না? খালি পেটে তো ওষুধও দিতে পারব না। আপনি, আপনি একটু শুয়ে থাকুন,আমি এক্ষুণি কিছু একটা বানিয়ে নিয়ে আসছি।”
সার্থ কিছু বলতে চাইছিল,কিন্তু শুনল না তুশি। ভেজা শাড়িটা এখনো ওর পরনেই,ওইভাবেই ছুটে গেল নিচে।
তুশি রান্নাঘরে এলো। কী বানাবে এত অল্প সময়ে,কিছু জানে না। ওর তো কোনো যোগ্যতাই নেই। মাথায় এলো স্যুপের কথা। এটা বানানো সহজ! তুশি স্যুপের প্যাকেট নেয়। ফ্রিজ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে। প্যাকেটের গায়ে রন্ধণপ্রণালীটা পড়তে গিয়ে ওর দাঁত খুলে যায়। তাও ব্যস্ত হাতে সব করার চেষ্টা করল মেয়েটা। শাড়িটা কতবার কোমরে গুজলো, থাকছেই না। এত পিচ্ছিল!
তুশি ছুরি নিয়েছে মাংস কাটবে বলে, আচমকা দুটো শক্ত-তপ্ত হাত পেছন থেকে এসে কোমর জড়িয়ে ধরল। তুশি চমকে উঠল বজ্রের ন্যায়। ঘুরে তাকানোর আগেই ঘাড়ে গরম ঠোঁটজোড়া গুঁজে দিলো সার্থ। কাঁধের মসৃণ ত্বকে চুমু খেতে খেতে, সেই নির্বাধ স্পর্শ ঢুকল চুলের ভাঁজে। তুশির ব্যস্ত হাত থেমে যায়। শরীর জমে আসে তুষারের মতো। সার্থ ঘাড় থেকে চুল সরিয়ে অন্য পাশে রাখল। ব্লাউজের গলা বড়ো থাকায় বেরিয়ে এলো তুশির ফরসা-নগ্ন পিঠের হাড়। সেখানেও গভীর ভাবে ঠোঁট রাখল সে। পরপর ফিতেয় হাত দিতে গেলেই চট করে ঘুরে গেল মেয়েটা। নিচু স্বরে বলল,
“ কী করছেন? এখানে এসেছেন কেন? আপনাকে না বললাম শুয়ে থাকতে?”
সার্থর চেহারা পাংশুটে। চোখ লাল । জ্বর জেঁকেছে ভালোই। অথচ সব ছাপিয়ে গেল ওর চোখের নেশা। কামনার এক অদম্য জোয়ারে ফেঁপে উঠল সব। কথা ছাড়াই আচমকা তুশিকে সানসেটের গায়ে ঠেসে ধরল সার্থ। তোড়ে কয়েকটা বাসন নিচে পড়ে গেল। গলায় নাক ঘষতেই চোখ খিচে ওর কাঁধের শার্ট খামচে ধরল তুশি। কী উত্তপ্ত স্পর্শ এটা! তোড়ে যেন পুড়ে গেল তুশি। পরপর কানে এলো সার্থর জড়িয়ে যাওয়া গলার স্বর,
“ শোবো তো।
তোমায় নিয়ে।”
তুশির নিঃশ্বাস ভারি। লজ্জায় ওষ্ঠাগতপ্রাণ। খুব কষ্টে মানুষটাকে ঠেলে সরাল নিজের থেকে। ঢোক গিলে বলল,
“ আপ,আপনার জ্বর কি বেড়েছে?”
সার্থ অমনি ওর ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ধরল। লাল চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ আজ কোনো কথা বলবে না তুশি। যাই হোক, চুপ থাকবে।”
“ কেন,ক-কী হবে?”
সার্থ স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলটা ওর ঠোঁটে স্লাইড করল। আরেক হাত নিঃসঙ্কোচে ঢুকল শাড়ির ভাঁজে। কোমর খিচে টেনে এনে, শীর্ণ শরীর মেশাল বুকের সাথে। বলল ভণিতাহীন,
“ যা আরো আগে হওয়ার কথা!”
তুশির হাত-পা কাঁপছে। নেমে যাচ্ছে শ্বাস। লজ্জায় চোখ তোলা দুঃসহ। সার্থ এক আঙুলে ওর নত চিবুক তুলে আনে। চোখটা বুজে নেয় তুশি। নাকের ডগায় চুমু খায় সার্থ। হিঁসহিঁসে কণ্ঠ নামিয়ে বলে,
“ তোমাকে একবার ছুঁলে নিজেকে আর আটকানো যায় না। তারওপর শাড়ি পড়েছ,ভেজা শরীরে ঘুরছো আমার সামনে।
সো ইউ আর দ্য রিজন,আম লসিং মাই কন্ট্রোল টোনাইটস।
তুশির গলা বসে গেল। কোনোরকমে বলল,
“ আপনার শরীর মনে হয় বেশি খা-খারাপ!”
তক্ষুণি ঝট করে মেয়েটাকে দুহাতে তুলে ফেলল সার্থ। তুশির মাথা সুদ্ধ অবশ হয়ে যায়। হাত-পা নাড়ানোর শক্তি হারায় সঙ্গে। নামাতে বলবে, না ছটফট করবে? বিকল মাথায় কিচ্ছু যেন এলো না। সার্থর সারা শরীর আগুনের মতো গরম। যে কেউ বুঝবে জ্বর এসছে কতটা! অথচ দিব্যি একটা আস্ত মেয়ে মানুষ কোলে নিয়েই বাইশটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল সে। ঢুকলো নিজের ঘরে। দরজাটা পা দিয়ে ঠেলতেই খট করে শব্দ হয়,সেই শব্দে যেন হুশ ফিরল তুশির। অমনি নড়েচড়ে উঠল মেয়েটা। অথচ ভালো করে তাকানোর আগেই ওর ভেজা শরীরটা উড়ে এসে আছড়ে পড়ল খাটে। এক রকম ছুড়ে ফেলেছে সার্থ। মেয়েটার মুখ শুকিয়ে গেল, মানুষটার মনে কী আছে ভেবে!
তুশি বসে বসে দুহাতের ভরে পিছিয়ে যেতে নেয়,অমনি ওর এক পায়ে হ্যাঁচকা টান মেরে শুইয়ে দিলো সার্থ। মাথা সহ শরীরখানা সপাটে বিছানায় লেপ্টে গেল তুশির। কিছু বোঝার আগেই ওই শীর্ন দেহের ওপর বলিষ্ঠ শরীরটা সমেত আধশোয়া হলো সার্থ। ওর দুইহাত নিয়ে ক্রস চেপে ধরল মাথার ওপর।
তুশি ছটফট করে বলল,
“ এটা, এটা তো কথা ছিল না। আপনি না বললেন কিছু…”
অনবরত নড়তে থাকা ঠোঁটজোড়া থামাতে ঝট করে নিজের ঠোঁট গুজে দিলো সার্থ। চোখের মণি থমকে গেল তুশির। এক আদিম, গভীর দম বন্ধকর চুমু শেষে মাথা তুলল সার্থ। একটু সুযোগ দিলো মেয়েটাকে শ্বাস নেয়ার। তুশি হাঁপাচ্ছিল,তবে ধাতস্থ হতে পারল না। কিছু বলতে যায়,সার্থ চুমু খায় ফের। তবে ছোটখাটো এটা! পরপর এক হাত দিয়ে ওর কপালের চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ এত কথা বলো কেন?”
তুশি হাঁ করতে গেল,ফের চুমু খেল সার্থ। আজকের মতো থামিয়ে দিলো ওর সব কথা। বেশামাল আফিম চোখে মিশিয়ে বলল,
“ ইয়র লিপস আর লাইক পয়জন!
পৃথিবীর সব থেকে সুমিষ্ট বিষ এই ঠোঁট! আর আমি এক নিঃশ্বাসে রাজি এমন বিষ খেয়ে মরতে।”
তুশি হাঁ করে শুনল এসব। আজ এক নতুন সার্থ চোখের সামনে। উন্মত্ত,অশান্ত আর অস্থির খুব! যে আজ ওকে পাওয়ার যুদ্ধে জিততে মরিয়া।
সার্থ বরফ-ছুরির মতো ঠান্ডা চোখটা মেলে চেয়ে রইল দু সেকেন্ড। তারপর আর থামল না। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ফের ঠোঁট বসাল ঘাড়ের ভাঁজে। ভয়ানক দাঁতের প্রহারে যন্ত্রণায় চোখ বুজে নিলো তুশি। কার্নিশ ছুঁয়ে এক ছটা জল বেয়ে নেমে বালিশে গিয়ে লাগল। সার্থর হাবভাবে মনে হলো কদিনের ক্ষুধার্ত বাঘ,সদ্য হরিণ শিকার করেছে। তুশি হাত-পা ছেড়ে দিলো এবার। গুঙিয়ে উঠল আস্তে।
কানে এলো মাদক মেশানো শিরশিরে স্বর,
“ আমি আজ ঝড় হব। কষ্ট হলেও, একটু সামলে নিও তুশি!”
সার্থ বুকের ওপর থেকে শাড়ি আঁচলটা এক থাবায় সরিয়ে আনতেই, মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল তুশির। বুঝে নিলো ধরা দেয়ার সময় এসেছে আজ। ছাড়া পাওয়ার কোনো উপায় নেই। মানুষটার ছোঁয়া বাড়ছে। খসখসে অবাধ্য হাত চলে যাচ্ছে নিষিদ্ধ কোনো স্থানে। তার ঠোঁটের স্পর্শে ডুবছে ওর শরীর। দাঁতের প্রহার পড়ছে বারবার। বুকের সেই তিলটা অবধি দগ্ধ হলো তাপে।
লোমকূপগুলোও নিস্তার পেলো না।
এই স্পর্শ যেন মরণঘাতী অস্ত্র। দম আটকে মরছিল তুশি। অথচ ভালোবাসার তৃষ্ণায় ওকেও আজ স্বায় মেলাতে হলো। ভেসে যেতে হলো সার্থর অদম্য, অসভ্য আদরের সাথে। এতগুলো দিনের সব মনোমালিন্য ধুয়েমুছে সাফ হওয়ার সঙ্গে, এই প্রথমবার দুটো শরীরী ভাষা একে অন্যতে মিশে গেল আজ। নেশায় নেশায় মাতাল হয়ে পড়ল দুজন। তুশির ভেতরের মেয়েলি উত্তালতা ঠিকড়ে এলো বাইরে,সারা ঘরময় তারা ফিসফিস করে বলল,
“ বাতাসে গুণগুণ,
এসেছে ফাগুন,
বোঝেনি তোমার,
শুধু ছোঁয়ায় এত যে আগুন!’’
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৮(ক+খ)
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৭