Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ৩০


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৩০

🚫সেনসিটিভ পর্ব‼️

অরণ্যর সঙ্গে বিয়ের প্রথম কয়েক মাস ইরামের কাটল স্বপ্নের মতন। এক জীবনে যা যা তার কোনোদিন পাওয়া হয়ে উঠেনি, অরণ্য সেই সব না পাওয়াদের হাজির করল ইরামের পদতলে। নিজের আগে সবসময় সে ইরামের মুখে ভাতের লোকমা তুলে দেয়। বাইরে গেলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করে। কোথায় যাচ্ছে, কখন ফিরবে, ইরাম খেয়েছে কিনা, ঘুমুচ্ছে কিনা ইত্যাদি চিন্তায় যেন সে নিজের কাজই ঠিকঠাকমত করতে পারেনা। একবার ইরাম সিঁড়িতে পিছল খেয়েছিল বিধায় বাড়ির প্রত্যেকটা সিঁড়ি কার্পেট দিয়ে বাঁধিয়ে ফেলেছে অরণ্য। সে ইরামকে উষ্ণ ভালোবাসার চাদরে গভীরভাবে মুড়িয়ে রেখেছে যেন। পারলে স্ত্রীকে সে শুকনো মাটিতে কষ্ট করে হাঁটতেও দেবে না যেন, আজীবন কোলে কোলে রাখবে।

আজ প্রথমবারের মতন অরণ্যর গাজীপুরের একটি ফ্যাক্টরিতে এসেছে ইরাম। ভীষণ উত্তেজিত সে। বুকভর্তি উচ্ছ্বাস এবং তীব্র আনন্দের জোয়ার। কিছুক্ষণ আগেই সে এমন একটি বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে যা সম্পর্কে জানলে অরণ্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে সে নিশ্চিত। গাড়ি থেকে সাবধানে নামল সে, অজান্তেই একটি হাত এসে থামল নিজের পেটের উপর। মোলায়েম হাসল ইরাম, চোখে জ্বলজ্বল করল তারারা। এই দেহের ভেতর যে ছোট্ট প্রাণটি বেড়ে উঠছে, তার হদিস পেলে অরণ্য কোন ধরণের পাগলামি করবে সেটা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে সে। এর মধ্যেই আন্দাজ করতে পারছে ইরাম। অরণ্য তাকে অঘোষিত লকডাউন দিয়ে বাসায় বসিয়ে ফেলবে। পারলে নিজের অফিস টেনে বাসায় নিয়ে রাখবে। একফোঁটা একলা ছাড়বেনা ইরামকে। এখন তো শুধু সিঁড়িতে কার্পেট মুড়িয়েছে, ভবিষ্যতে গোটা বাড়ির মেঝেটাই মুড়িয়ে ফেলবে। বেডরুমে অব্দি সিসিক্যাম লাগিয়ে রাখবে যেন কিছুতেই স্ত্রী চোখের আড়াল না হয়। এমন ভাবতে ভাবতে ইরাম মহা উৎসাহে ভেতরে ঢুকল। কয়েকজন লোক এদিকে সেদিকে হাঁটাহাঁটি করছে। ইরামকে দেখেই একজন এগিয়ে এলো,

“ম্যাডাম! আপনি এখানে?”

মুচকি হাসল ইরাম।

“অরণ্য কেবিনে?”

“জি ম্যাডাম। স্যার তো মাত্রই সেক্রেটারির সাথে একটা মিটিংয়ের জন্য ঢুকলেন। কাউকে বিরক্ত করতে মানা করেছেন।”

“ব্যাপার না। আমি যাচ্ছি।”

ইরাম নিজেই এগোল। লোকটা তাকে চারতলার কেবিনের ফ্লোর অব্দি পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিল। বেশ জোরেশোরে হেঁটে এগিয়ে গেল ইরাম। তার আর তর সইছেনা। কেবিনের দরজাটা স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি। স্লাইড করে খোলা বন্ধ করা যায়। ইরাম কাছে গিয়ে হাত দিয়ে এক টানে দরজাটা খুলে ফেলল। উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠল,

“অরণ্য….!”

নিজের চোখের সামনের দৃশ্যটি দেখেও বিশ্বাস করতে বেগ পোহাল ইরাম। তার হাসিটা মুছলনা। এতটাই স্তম্ভিত সে, যে অসহায়ের মতন তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলনা।

অরণ্যর অফিসের কেবিনের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে তার সেক্রেটারি। মেয়েটি অর্ধ বিবস্ত্র। অরণ্য তার দুপাশে হাত রেখে টেবিলের উপর ঝুঁকে আছে, যেন ভোজে নেমেছে। মেয়েটির পা দুটো অরণ্যর কোমরের দুপাশে ঝুলছে। উভয়েই জমে গিয়েছে হঠাৎ ইরামের আগমনে। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে তাকাল তারা সামনের দিকে। মেয়েটার মুখ চিনতে ইরামের বেগ পোহাতে হলনা। প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাতায়াত করে, অরণ্যর সেক্রেটারি হিসাবে। মেয়েটিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে অরণ্য স্বয়ং,

“আমার ছোটবেলার বান্ধবী। যখন আমার কেউ ছিল না, তখন থেকেই ও আমার পাশে আছে।”

অরণ্যর কঠিন সময়ে পাশে ছিল বিধায় মেয়েটার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করত ইরামও। কোনোদিন দুজনের মাঝে সে অফিসের কথাবার্তা ছাড়া খুব ব্যক্তিগত কিছু বলতে দেখেনি। বিশেষ করে বিয়ের পর থেকে সেক্রেটারিকে কাজের বাইরে কখনো আলাদা নজরে দেখেনি অরণ্য। অন্তত ইরাম এতদিন তাই জানত, মনে প্রাণে বিশ্বাস করত। অরণ্য অত্যন্ত সুপুরুষ একজন মানুষ। সে যেভাবে ইরামকে নিজের অতি মূল্যবান সম্পদের মতন আগলে রাখে, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ অব্দি পায়নি রমণী। উল্টো এমন কিছু মনে আসলেও সে নিজেকে নিজে ধমকাত। অরণ্য জানলে কি কষ্ট পাবে! তাকে এভাবে অবিশ্বাস করা যায়? ইরাম যা করে এসেছে, তাকে বলে অন্ধবিশ্বাস। সেটা সে ঠিক এই মুহূর্তে এসেই অনুভব করল।

ক্ষণিকের জন্য পায়ের জোর হারিয়ে ফেলল ইরাম। দরজা আঁকড়ে ধরার প্রয়োজন হলো তার নিজের পতন ঠেকাতে। সেক্রেটারি মেয়েটা টেবিল থেকে উঠে পড়তে চাইল,

“শিট! লক তো চাপ দিয়েছিলাম, তাড়াহুড়োয় বোধ হয় ঠিকভাবে চাপ পড়েনি!”

“হুশ…রিল্যাক্স। আমার এখনো শেষ হয়নি।”

অরণ্যর কন্ঠটা অচেনা শোনাল। ভীষণ রকমের অচেনা। ইরাম বিশ্বাস করতে পারলনা নিজের কানকে। যেন তার অরণ্য নয়, ভিন্ন কেউ কথা বলছে ওই খোলসের ভেতর থেকে। নিজের অর্ধাঙ্গিনী সেখানে উপস্থিত দেখেও অরণ্য বিন্দুমাত্র পিছিয়ে এলনা। বরং সেক্রেটারি মেয়েটার পা দুটো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে নিজের কোমরে পেঁচিয়ে কাছে টেনে নিল। মেয়েটা গুঙিয়ে উঠল। শব্দহীন হাসল অরণ্য।

“এসেই যখন পড়েছে, শি ক্যান জাস্ট ওয়াচ হাউ গুড হার হাসবেন্ড ফাকস!”

“আহ্!”

মেয়েটির সীৎকারে ভরে উঠল গোটা কেবিন। ইরাম অবিশ্বাস্য নয়নে অত্যন্ত বিভীষিকাময় দৃশ্যটির দিকে চেয়ে রইল। অসহায়ের মতন দেখল কি ভয়ানকভাবে টেবিলটা কাঁপছে। অরণ্যর ঠোঁটের পৈশাচিক হাসি, মেয়েটির গোঙানি তাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল। দাঁড়ালনা ইরাম। একটা শব্দ অব্দি উচ্চারণ করলনা। উল্টো ঘুরে কাঁপা কাঁপা পায়ে কিছুদূর এগোল। তারপরই ছুট লাগাল। জোরে, জোরে, আরো জোরে দৌঁড়াতে লাগল সে যতক্ষণ না তার বুকটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।

***

আজ পাঁচদিন হয়েছে ইরাম বাপের বাড়ি চলে এসেছে। উঁহু, বাপের বাড়ি তো আর নেই, ভাইয়ের বাড়ি। বাড়ির চিন্তায় তাই আধশুকনো হয়ে গিয়েছে ভাইয়ের বউ মিথিলা। এত কষ্টে যাকে শেষমেষ বিদায় করা গিয়েছিল, সে আবার ঘাড়ে চেপে বসতে চাচ্ছে! আগে তো তাও চাকরি করত, সংসারে টাকা দিত। বিয়ের পর তো সেটাও নেই। ঠিকই তো সংসারে মনোযোগী হয়েছিল। তাহলে কি এমন হলো যে হুট করে সব ছেড়েছুঁড়ে এসে হাজির হলো?

চিন্তায় রাহাতেরও মাথায় হাত। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছেনা কি হয়েছে। ইরাম কিছু বলছে না। খাবার দিলে খাচ্ছে না। সারাদিন শুধু নিজের পুরাতন রুম লক করে বসে থাকে। গতকাল মিথিলা জোর করে খাবার খাওয়াতে গিয়ে দেখে বাথরুমে শাওয়ারের নিচে বসে আছে। কত ঘন্টা কে জানে! পুরো শরীর শীতল হয়ে ছিল। পরে ভাইরা মিলে ধরাধরি করে বিছানায় এনে গরম তেল মালিশ করে কোনমতে ঠিকঠাক করেছে। আজকেও অরণ্যর বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছে সে। দারোয়ান জানিয়েছে ইরাম চলে আসার পর অরণ্যও নাকি আর বাড়িতে ফেরেনি। কোথায় আছে কেউ জানেনা। ফোনটাও বন্ধ। রাহাত পড়েছে এক মহাবিপাকে।

“বেশ ভালোই ঝগড়া হয়েছে মনে হয়।”

অবশেষে মন্তব্য করল মিথিলা। স্বামীকে চা পরিবেশন করল।

“তাইতো দেখছি। দুলাভাই তো এত শক্ত হওয়ার মানুষ না। আপু বলতে সে তো রীতিমত অজ্ঞান। অথচ আজ এতদিন আপু এখানে, একবারও খোঁজ নিতে আসলনা। মামলা ভালোই সিরিয়াস।”

রাহাত চায়ে চুমুক দিল। মিথিলা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসে পড়ল,

“একেই বলে কপালের নাম গোপাল। তাও যা একটু সুখ আপুর কপালে লিখা হয়েছিল, তাও ওনার কপালে সইলনা। এত বড় ঘর, এত ভালো অবস্থা, এত ভালো স্বামী সব ছেড়ে পাগলের মতন চলে এসেছে এখানে। বলি, সংসারে ছোটখাট ঝামেলা একটু হবেই। তোমার আমার কত হয়েছে। আমি কি কথায় কথায় বাপের বাড়ি গিয়ে হাজির হয়েছি? দুলাভাইয়েরও তো আত্মসম্মান আছে। বউ এভাবে না জানিয়ে চলে এসেছে। পুরুষ মানুষ, রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক।”

“আপু তো মুখই খুলছে না। কি হয়েছে না বুঝলে সমাধান করব কীভাবে?”

“বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই আবার এখানে হাজির। সমাজে অলরেডি কথা শুরু হয়ে গিয়েছে। আপাতত তো সবাইকে বেড়াতে এসেছে বলে দমিয়ে রেখেছি। কতকাল রাখব? আপুকে বোঝাও তুমি।”

“ভাইয়া!”

এমন সময় দুই তলা থেকে ইহানের আর্তচিৎকার ভেসে এলো। উভয়ে ঝট করে ফিরে তাকাল। সিঁড়ির উপর থেকে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার দিয়ে ইহান জানাল,

“আপুর গা থেকে র*ক্ত বেরোচ্ছে!”

এক মুহূর্ত বসে থাকতে পারলনা কেউ আর। দৌঁড়ে ইরামের রুমে গেল। সামনের দৃশ্য দেখে না চাইতেও রাহাত এবং মিথিলা জমে গেল। এমন ভয়াল দৃশ্য! ইরাম বিছানার উপরে ছটফট করছে। মলিন চাঁদর টকটকে লাল তরলে ভেজা! রক্তাভ তরল চাঁদর চুঁইয়ে মেঝেতে পড়ছে। আর কেউ না বুঝলেও মিথিলা ঠিকই বুঝল, সে মেয়ে। সে জানে ইরামের সাথে কি হচ্ছে।

“হাসপাতাল! জলদি! আপুর পেটে বাচ্চা!”

***

“মা”— মধুর ডাকটা আর শোনা হলনা ইরামের। একদিনের জন্য হলেও যে আশার স্বপ্ন সে বুনেছিল, তিলে তিলে একটা প্রাণকে গড়ে তোলার যে বাসনা তার বুকে লালিত হয়েছিল, যে স্বপ্নের ভবিষ্যতের আশায় শত কল্পনা বোনা হয়েছিল, সেই প্রাণ যেমন নীরবে এসেছিল, তেমন নীরবেই চলেও গেল। ইরামকে শূন্য করে দিয়ে, তার গর্ভের ভ্রূণ এক পরিপূর্ণ প্রাণের স্বীকৃতি লাভের আগেই বিদায় নিল লম্পট এক দুনিয়া থেকে। একদিক থেকে ইরাম তৃপ্ত। এই কলুষিত দুনিয়া একটি সুস্থ প্রাণ লাভ করার অধিকার রাখেনা।

হাসপাতালের বিছানায় চুপটি করে বসে আছে ইরাম। কোনো নড়চড় নেই। একদম পাথরের মূর্তি। এক সময়কার উজ্জ্বল মুখটা ফিকে হয়ে এসেছে। রুক্ষ হয়ে উঠেছে ত্বক যত্নের অভাবে। চোখের নিচে গাঢ় কালি। একটা হাত পেটের উপর। আজকাল সে এভাবেই বসে থাকে, এভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে, এভাবেই অনুভব করে শূন্যতাকে। হাসে না, কাঁদেনা। কোনো অনুভূতিই আর হয়না। চোখজোড়া শুধু পাথরের বলের মতন একদিকে উদাসীন চেয়ে থাকে। ইরাম জানেনা কত সময় পেরিয়েছে। কতদিন ধরে সে হাসপাতালে আছে। তার সাথে কে কি কথা বলেছে, কে কি করেছে। আর জানতে ইচ্ছাও হয়না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়।

ইরামের কানে একটা মৃদু শব্দ গেল। দরজা খোলার আওয়াজ। তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলনা ইরাম। সে ইতোমধ্যেই জানে নার্স আসেনি, না কোনো ডাক্তার। রাহাত, মিথিলা, ইহান? উঁহু, পরিবারের কেউও নয়। এসেছে ওই লোকটা। তার গায়ের গন্ধ ইরামের খুব চেনা। হাজার মাইল দূর থেকেও বুঝি টের পায়। তার স্বপ্নের ধারক, তার ভাগ্যের শিল্পী। এসেছে অরণ্য। সুস্থির, নিটল। সুদর্শন চেহারায় মলিনতার অভাব। উল্টো জেল্লাদার হয়েছে ভীষণভাবে। ইরাম না তাকিয়েও বুঝতে পারে। ওই অস্তিত্বের প্রতিটা পরিবর্তন তার শরীর অনুভব করার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা লাভ করেছে। অরণ্য ধীরপায়ে এগিয়ে এলো। ইরামের বিছানার কাছে দাঁড়াল। ফিরেও দেখলনা রমণী। আগের মতোই চোখজোড়া কোটরাগত, নিক্ষিপ্ত শূন্যের পানে। অরণ্য ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত রেখে একনাগাড়ে ইরামকে দেখল। প্রতিটা ক্রিয়া। কীভাবে তার পেটের উপর হাতটা চেপে বসেছে সেটা এড়ালনা অরণ্যর দৃষ্টি। তার গভীর কন্ঠ ভেসে এলো ইরামের কানে,

“এটা একটা জঘণ্য মা হওয়ার জন্য।”

উঠল অরণ্যর হাত, সটান ইরামের গালে চড় বসাল সে। ইরামের মাথাটা একদিকে বেঁকে গেল, তার উজ্জ্বল শ্যামলা গালে চার আঙুলের গভীর দাগ ভেসে উঠল দগদগে ঘায়ের মতন। অথচ, ইরামের ব্যথা লাগলনা। গায়ের ব্যথাটা বুঝি মরে গেছে, আর অনুভূত হয়না। মনের ব্যথার যেখানে জয়জয়কার, সেখানে এই বাহ্যিক ব্যথা অতি তুচ্ছ। অরণ্য ইরামের পিছনে সরে দাঁড়াল। ঝুঁকে এসে তার গলা আঁকড়ে ধরে সেই থাপ্পড় দেয়া গালেই ঠোঁট ছুঁয়ে গাঢ় চুমু খেল। অনেকটা সময় নিয়ে, গভীরভাবে। ইরাম নড়লনা, সরলনা, বসে রইল শুধু মূর্তির মতন। গলায় চাপ লেগে তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে, অথচ সেই ছটফটটুকুও করতে সায় দিলনা শরীর। অরণ্য তার কানে ফিসফিস করল,

“আর এটা একজন জঘণ্য স্বামী হওয়ার জন্য।”

নিজের গলায় ঠান্ডা কিছু একটার অস্তিত্ব টের পেল ইরাম। মাথা ঝুঁকিয়ে তাকাল। একটি লকেট ঝুলছে তার গলায়। লাল টকটকে রুবির লকেট। অরণ্য তৎক্ষণাৎ তার পায়ের কাছে বসে পড়ল। ইরামের পা নিজের দুহাতের মুঠোয় সযত্নে তুলে সে নিগূঢ় আবেগ নিয়ে বলল,

“আমিই তোর শুরু, আমিই তোর শেষ। আমি তোর পংক্তি কবিতা। ছন্দ তোর একমাত্র আশ্রয়। বাড়ি চল, আমার কবিতা।”

***

বিয়ের পর মেয়েদের স্বামীর সঙ্গে সবকিছুই ‘অ্যাডজাস্ট’ করে নিতে হয়। স্বামীই বিবাহিতা রমণীর একমাত্র গতি। স্বামী বেচারা পুরুষ মানুষ। একটু আধটু এদিক সেদিক ঝুঁকবেই। বউকে তাই তাকে নিজের আঁচলে বেঁধে রাখতে হবে শক্তভাবে। সব অপরাধই স্বামীর ক্ষেত্রে ক্ষমার যোগ্য, কারণ সে না দেখলে সমাজের আর কেউই বউকে দেখবে না। আপন ভাইও না। তা সে অপরাধ যদি হয় পরকীয়াও। যদিও অরণ্যর ভাষ্যমতে সে পরকীয়া করেনা। কারণ, পরকীয়ার অর্থ ঘরে বউ রেখে বাইরে দ্বিতীয় কোনো রমণীর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক রাখা। কিন্তু সে তো ইরামকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসে না! বাইরের সবাই শুধু শরীর, ভোগের শরীর, আনন্দের আঁধার। এক স্ত্রী বাদে অন্য কোনো রমণীকে সে কোনোদিন দ্বিতীয়বার ভোগ করেনি। তাহলে এটা পরকীয়া কীভাবে হতে পারে? ইরাম শুধু শুনে যায় আজকাল, জবাব দেয়া আর হয়ে ওঠে না।

স্বামীর সঙ্গে একটু আধটু মানিয়ে চলতে হয়। স্বামীর সঙ্গে একটু আধটু মানিয়ে চলতে হয়। স্বামীর সাথে একটু আধটু মানিয়ে…..

মনে পড়ে না ইরামের আর। সারাদিন, সারারাত এই বুলি জপে যায় সে তোতাপাখির মতন। তাহলে হয়ত সমাজ তাকে মেনে নেবে। দেনমোহরের টাকা তুলে দেয়া ভাইগুলোর দিকে অসহায় চোখে বুভুক্ষের মতন তাকিয়ে থাকে সে। রাহাতকে দিয়েছিল, ঘুষ দিয়ে নাকি বড় চাকরি হয়েছে ছেলের। বাকিটা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট, ইহানের ভবিষ্যতের জন্য। নিজের জন্য কেন কোনোদিন ভাবেনি ইরাম? প্রশ্ন ওঠে মাঝে মাঝে মনের ভেতর। এত বিশ্বাস, এত অন্ধবিশ্বাস ছিল তার ভাগ্যের প্রতি? কোনোদিন কিছুই খারাপ হবেনা? কিছুই না? যদি একটু স্বার্থপর হওয়া যেত? যদি পরিবারের আগে নিজের কথা ভাবা যেত? যদি সমাজের আগে নিজের ব্যাপারে ভাবা যেত? তবে কি আজ তার ভ্রূণটা পৃথিবীতে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারত?

স্বামীর সঙ্গে একটু আধটু মানিয়ে চলতে হয়। স্বামীর সঙ্গে একটু আধটু মানিয়ে চলতে হয়…….

ঠিক তখনি ইরামের মস্তিষ্ক দখল করে নেয় বাক্যটি। সমাজের শিক্ষা, মা বাবার শিক্ষা।

ইদানীং অরণ্য ভীষণ গায়ে হাত তোলে। এটাও নাকি তার প্রগাঢ় ভালোবাসা। স্বাভাবিক মিলনে তার আর পোষায় না। ইরামের বুকে সিগারেটের ছেঁকা দেয়া তার অন্যতম প্রিয় একটা কাজ। ছেঁকা দেয়ার পর যখন গাঢ় দাগ হয়, তখন নিজের হাতে মলম লাগিয়ে দেয়। পাগলের মতন অনুভব করে মুগ্ধতা। কি প্রগাঢ়ভাবে ভালোবাসে সে স্ত্রীকে! অর্ধেক দিন প্রায় নগ্ন বিছানায় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে ইরামকে পশুর মতন। কারণ, তার চোখে ইরাম অপ্সরী। তার শরীর, প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের গঠন প্রতিদিন নতুন করে অরণ্যকে প্রেমে ফেলে। ইরামের শরীরে ফুটে ওঠা প্রত্যেকটা দাগ তার বুকে অধিকারবোধ জন্মায়। অতি যত্নে সে নিজের দেয়া দাগের উপর বরফ ঘষে দেয়। এত তীব্র ভালোবাসা কেউ হাজার বছর অপেক্ষা করলেও পায়না। আর ইরামের মত কেউ কেউ না চাইলেও পেয়ে যায়।

ইরামের বাইরে যাওয়া মানা। ভাইদের সাথে যোগাযোগ করা মানা। কোনো পুরুষের দিকে তাকানো মানা। রুম থেকে বারান্দায় যাওয়া মানা, যেতে পারে যদি অরণ্যর কোলে বসে। দোলনায় দুলতে পারে যদি অরণ্যকে সাথে নেয়। অরণ্য নিত্যনতুন উপহারে স্ত্রীকে মাতিয়ে রাখে। নতুন শাড়ি, গহনা, ফুল, প্রিয় বই। ইরামের রুমে এখন ফুলের বাগান আছে, দেয়ালে বইয়ের লাইব্রেরি, আলমারিতে শাড়ির দোকান, লকারে গহনার স্তূপ। অথচ অরণ্যর উপহার ফুরোয় না। ইরামকে সে এক পৃথিবী সমান সুখ দেবে। ইরাম জানেও না কত শত রমণীর ইরামের জায়গায় থাকার স্বপ্ন বোনে। অথচ তাদের জায়গা শুধু অরণ্যর বিছানা অব্দিই সীমাবদ্ধ। যেখানে ইরাম রাজ করে স্বামীর অন্তরজুড়ে। এর নাম ভালোবাসা নয় কি?

অরণ্য প্রতি রাতে চেষ্টা করে। একটা প্রাণের বিনিময়ে আরেকটা প্রাণ। মাতৃত্বের সুখ দেবে সে স্ত্রীকে। যে মাতৃত্বের স্বাদ জীবন ছিনিয়ে নিয়েছে, সেই মাতৃত্বের স্বাদ ইরামকে অরণ্য দেবে, দিয়ে ছাড়বে, যেকোন মূল্যে। তার চেষ্টার কোনো কমতি নেই। দিন দিন সেই চেষ্টা উন্মত্ত হয়, ইরামের শরীরে দাগের সংখ্যা বাড়ে। তাতে কি? ডাক্তার তো ঠিকই আসে পরদিন, স্ত্রীকে সুস্থ রাখার কম চেষ্টা অরণ্য করে না। এর নাম ভালোবাসা নয় কি?

কবিতার জন্য অরণ্য আগাগোড়া একটি ভালোবাসা।

তাইতো আজ রাতে যখন গর্ভবতী ইরাম নিজের হালকা ফোলা পেট নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অরণ্যর কাছে আর্জি জানাল,

“অরণ্য! মুক্তি দিন না আমায়? মুক্তি?”

তখন অরণ্য সইতে পারলনা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পা তুলে ইরামের বুক বরাবর কষিয়ে লাথি দিয়ে সে চিৎকার করে বলল,

“তালাক দিলাম তোকে আমি! তালাক! যাহ দেখি! বাইরে গিয়ে দেখ দুনিয়া কত কঠিন!”

এমন জটিল সময়ে বুকে লাথি দেয়ায় অবশ্য মায়া হলো অরণ্যর। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীকে কোলে তুলে জামা খুলে ঠিকই ওষুধ লাগিয়ে দিল। গালে অসংখ্য স্নেহের চুমু খেতে খেতে সারারাত নিজের বুকে চেপে হাজারবার সরি বলল। অথচ সে জানলনা আজকের রাতের পর থেকে এক রমণীর হিসাব শুরু হয়ে গিয়েছে।

ইরাম ভেবেছিল এই চক্র সে কোনোদিন ভেদ করতে পারবেনা। অরণ্যর ছায়াতলে একটি খেলার গুঁটি হয়ে থেকে যাবে সে আজীবন। তবুও যদি সে নিরালায়, নিভৃতে, একাকী বেঁচে রয় পৃথিবীর কোনো এক কোণায়, তবে অবহেলাই সই। কিন্ত ইরাম সইলনা। মাতৃত্ব তাকে বরণ করার পর থেকে আর সইলনা কিছুই। সন্তানকে নিয়ে সবকিছুর মাঝে, আড়ালে আবডালে বাঁচবে ভেবেছিল সে। যদি অরণ্যর ছায়ায় হয়, তবুও। শুধু লোকটা কোনদিন সন্তানকে কিছু না করলেই হবে। কিন্তু না, হলো না ইরামের। ইযানকে যখন প্রথমবারের বুকের মাঝে চেপে ধরল, যখন ওই নাজুক শরীরের উষ্ণতা তার খাঁ খাঁ মরুভূমি হয়ে থাকা বুক শীতল পানির জোয়ারে ভাসিয়ে দিল, তখন ইরাম টলল। রমণী ইরাম, রাহাত – ইহানের বোন ইরাম, সমাজের গোলাম ইরাম, অরণ্যর স্ত্রী ইরাম কোনোদিন টলেনি ঠিকই। কিন্তু মা ইরাম টলল। রীতিমত দুঃসাহসের ডানায় চড়ে সে উড়াল দিল। ইযানকে নিয়ে প্রতিজ্ঞায় মাতল জননী ইরাম,

আজ থেকে ইরাম স্বার্থপর।

আজ থেকে ইরাম অবিশ্বাসী।

আজ থেকে ইরাম নিষ্ঠুর।

আজ থেকে ইরাম চোখের বিষ।

আজ থেকে ইরাম স্ত্রী, বোন, সমাজ কিছু নয়।

আজ থেকে ইরাম একজন মা। ইযানের মা।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

বর্তমান~

নার্সারি গ্লাইডারে বসে দুলছে ইরাম। চোখজোড়া বাইরের দিকে নিবদ্ধ। সন্ধ্যা নেমেছে জগতে। বারান্দা গলে শীতল বাতাস আসছে। খোলা গায়ে লাগতেই শরীর কেমন শিরশির করে উঠল। অনুভূতিহীন, শীতল ইরাম। নিজের শাড়ির আঁচলটা টেনে ঠিকঠাক করে নিল। পরম যত্নে ঢেকে ফেলল সকল কদর্যতা। ঠিক যেমন করে এতকাল সে ঢেকে এসেছে নিজের সকল না বলা কথা।

“আমার তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, আলাদিন।”

নরম গলায় বলল ইরাম। দুলতে দুলতে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। শূন্য চোখে।

“তুমি আমার কল্পনার চাইতেও বেশি কিছু নিয়ে এই জীবনে পদার্পণ করেছ। আমি চাইনা, তোমার সঙ্গে আমার শেষটা কণ্টকাকীর্ণ হোক। তুমি হয়ত অনেক কিছু ডিজার্ভ করো, বিশ্বাস, ভরসা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। যার কোনোটাই তোমাকে দেয়ার সাধ্য আমার নেই। আমি তোমাকে শুরু থেকেই ব্যবহার করছি, সামনেও ব্যবহার করে যাব। যদি পারো, আমার রহস্যগুলো রহস্য বানিয়েই রেখো। তুমি কাকে ভালোবাসবে, কাকে অনুভূতি দান করবে তোমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তবে আমি যতদিন আছি, একটুখানি সম্মান দিও। ওতেই চলে যাবে আমার।”

ইরাম উঠে পড়তে যাচ্ছিল, এই রুমের ভেতর কেমন দম বন্ধ লাগছে তার। গলা ধরে আসছে। অথচ সে উঠতে পারলনা। দৃষ্টি অন্যদিকে থাকায় এতক্ষণ যাবৎ সে কিছুই খেয়াল করেনি। হুট করে তার কানে ফোঁপানোর মতন শব্দ গেল। ঝট করে ঘুরে তাকাল সে। বিছানার উপর বসে আছে সাইবান। তার সুঠাম শরীরটা সামান্য কাঁপছে। মুখ দুই হাতের মাঝে গুঁজে রাখা তাই দেখা যাচ্ছেনা। ইরাম শুনতে পাচ্ছে শুধু।

কান্নার আওয়াজ। নাকি ইরামের ভ্রম? ভ্রমই মনে হলো। কারণ সেই দলা পাকানো কান্না একেবারে হুট করে মিলিয়ে গেল। এর বদলে জায়গা দখল করে নিল হাসি। অট্টহাসি রীতিমত! সাইবানের শরীর আরও জোরে কেঁপে কেঁপে উঠল। দৃশ্যটা এতটা অশরীরী কেন লাগল ইরাম জানেনা। শুধু অনুভব করল, তার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল আতঙ্কের স্রোত নেমে গিয়েছে।

মুখ তুলল সাইবান। তার চোখজোড়া এমনিতেই কালো। অথচ ইরামের মনে হলো, যেন ওই চোখের মাঝে সাদার আর কোনো অস্তিত্বই নেই। গোটা কালো হয়ে গিয়েছে, মার্বেলের মতন! হাসছে সাইবান। তার ঠোঁটে মাখা বিস্তৃত হাসি, ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামা হালকা লাল তরল! র*ক্ত নাকি? স্তম্ভিত হয়ে গেল ইরাম। গিরগিটিও বুঝি এত দ্রুত রং পাল্টায় না যত দ্রুত সাইবানের চেহারা পাল্টালো। বিষণ্নতা, বিনোদন, অতঃপর…শুধু কালো।

ঘড়ঘড়ে একটা অমানুষিক কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো গোটা রুমজুড়ে,

“কঠিন দুনিয়া দেখে ফেললে আর এপাড়ে কি কাজ? প্রথমে সাড়ে তিন হাত মাটি, তারপর জাহান্নাম দেখা হোক আজ।”

—চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply