#আমার_আলাদিন
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২২
“আমি এখনো বলছি, আমরা আগে পুলিশের কাছে যাই, রিপোর্ট করে আসি।”
অনুরাগের কথায় গাড়ির ভেতরে থাকা সবাই প্রতিবাদ করে উঠল। সবথেকে জোরালো প্রতিবাদ জানাল নীরব,
“কিঃ? পুলিশ? পুলিশ ওদের বা** টাও ছিঁড়বে না!”
“সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে দেখিস না মারপিট শেষ হয়ে যাওয়ার পর আসে পুলিশ? তেমনি হবে। ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেলে ডাক্তার দিয়ে চুল ছিঁড়ব আমরা?”
গর্জে উঠল আফনানও। তার হাতে শক্তভাবে ধরে রাখা একটা হকিস্টিক। খবর পেয়েই ছুটে এসেছে। বন্ধুর কথায় তাল মিলিয়ে নীরব আবার বলল,
“তোর এখনো এই দেশের আইনের প্রতি বিশ্বাস আছে জেনে অবাক হচ্ছি।”
“ফালতু কথা বলবি না তো। আইন এমনি এমনি তৈরি করা হয়নি বুঝেছিস? সবাই এমন বিশৃঙ্খলতায় মত্ত হয়ে থাকলে দেশটা অরাজক হয়ে যাবে।”
“দাদাকে বের কর তো গাড়ি থেকে! বের কর। বয়সে একটু বড় বলে দাদাগিরি করে খালি। মান্ধাত্তা আমলের চিন্তাভাবনা যত্তসব। একটা দুধের বাচ্চার গায়ে শালারা অ্যা*সিড মেরেছে আর এই মুরুব্বি পরে আছে আইন আদালত নিয়ে। দাদা আপনি গাড়ি থেকে বের হন!”
আফনান ঝাঁঝ নিয়ে বলল। অনুরাগ বন্ধুদের কথাবার্তা শুনে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করতে পারল। সাইবানদের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়লেও সে তাদের বয়সী নয়। ৩ বছরের ব্যবধান আছে। এর কারণ, দেরিতে স্কুলে ভর্তি। ক্লাস ফোরে একটু খারাপ রেজাল্ট করার কারণে তার বাবা আবার আরেকবছর সেখানেই রেখে দিয়েছিলেন। পরে এক বছর টাইফয়েডে স্কুলমুখো হওয়া হয়নি। বয়সের ফারাক থাকলেও কোনোদিন বন্ধুদের মাঝে সেসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা হয়নি। হ্যাঁ, টিপ্পনী অবশ্যই কাটা হয়। দলের গুরুজন বলে। সে চেষ্টা করে এই ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে দলটাকে একসাথে বেঁধে রাখতে।
গাড়ি চলছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। পিছনে সবাই হাকডাক করে কথাবার্তা বললেও আলোচনায় একদমই অংশ নিচ্ছেনা সাইবান স্বয়ং। একমনে ড্রাইভ করছে। দৃষ্টি রুক্ষ, যেন মরুভূমির উত্তপ্ত রোদে তার ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেছে। ঠোঁটে ঝুলছে একটা সিগারেট। বনবন করে ঘোরাচ্ছে স্টিয়ারিং। আশেপাশের গাড়ির পরোয়া করছেনা। ক্ষণে ক্ষণে তার অসাবধানতার কারণে অন্যান্য বাস, ট্রাক থেকে লোকজন চিৎকার করে গালমন্দ করছে। ওসবের প্রতি দেয়ার মত সময় কারোরই নেই আজ। প্রত্যেকে টগবগ করে ফুটছে প্রতিশোধ বাসনায়। মানুষ হয়ত তারা আলাদা, তবে অনুভূতি এক। একজনের অপমান মানে সবার অপমান। সেখানে আজ সাইবানের পরিবারের সঙ্গে যা হলো, তাতে শুধুমাত্র একটা আদেশের জন্যই ফুঁসছিল সবাই। সাইবান সেই আদেশটা দিতে যা দেরী করেছে, কারো ছুটে আসতে একটুও দেরী হয়নি।
ঠিক কতক্ষণ সময় লেগেছে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে, কেউই বলতে পারবেনা। প্রত্যেকেই একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। শরীরে ফুটতে থাকা শক্তিটুকুর বি*স্ফোরণ হওয়া বাকি আছে শুধু। টায়ারের কর্কশ আর্তনাদ তুলে গাড়িটা কোনমতে থামিয়েই ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে বাইরে লাফিয়ে নামল সাইবান। সামনেই একতলা একটা পুরাতন বাড়ি। সরকারি রাস্তা তৈরির নামে গত বছর এই বাড়ির বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। রাস্তা আর হয়নি, হয়েছে ভোগদখল। এই বাড়িটা এখন শয়তানদের আখড়া। বাড়ি বললেও ভুল হবে, চারপাশের দেয়াল ধ্বসে কোনমতে স্তম্ভমতন দাঁড়িয়ে আছে শুধু। বাকি সবাই গাড়ি থেকে নামতে নামতে সাইবান সুচারু নজরে চারপাশে তাকাল। রাত অনেক হয়েছে। একটা দুটোর কম না। সুনসান নীরবতা। ভাঙাচোরা বাড়ির ঠিক পিছনে একটা ময়লার ডোবা। সেখান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। কোনো বাতি জ্বলছে না কোথাও। শুধু রাতের আকাশের তারাদের আলো ভূতুড়েভাবে চারিদিক আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
“আমি বলছিলাম কি সাইবান, মাথাটা ঠান্ডা করে…”
অনুরাগ শেষ একবার বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বোঝাতে চাইছিল, কিন্তু সাইবান তার বুকে হাত ঠেকিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তাকালনা অবধি। শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা ফেলে আরেকটা নতুন সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে পুরল। তার হাতে কোনো অ*স্ত্র নেই। খালি দুহাত। ওই অবস্থায়ই বাড়ির বাউন্ডারির ভেতর পা রাখল সাইবান। নিঃশব্দে অনুসরণ করল অনুরাগ, নীরব এবং আফনান। হাতের হকিস্টিক বনবন করে ঘোরাতে ঘোরাতে চারপাশ দেখছে আফনান। অপরদিকে নীরব পর্দার স্ট্যান্ড থেকে মোটা লোহার রড খুলে এনেছে। যদিও এই কাজে সায় নেই, তবুও অনুরাগ নেহায়েত খালি হাতে আসতে পারেনি। তার প্যান্টের পকেটে পকেট নাইফ আছে, যেটা খুব বেশি প্রয়োজন না হলে সে ব্যবহার করতে চাইছেনা।
এগোচ্ছে সাইবান। তার চলনে শিকারীর ছাপ। পা দুখানা বাঘের থাবার মতন। মাটিতে লাগছে ঠিকই, অথচ শব্দ হচ্ছেনা। চোখজোড়া অশনি সংকেতের মত জ্বলজ্বল করছে। বাড়ির ভেতর থেকে মানুষের কোনো সাড়াশব্দ আসছেনা। আফনান ফিসফিস করে শুধাল,
“কুত্তাগুলো এখানেই আছে? পালিয়ে যায়নি তো আবার?”
সাইবান তীর্যক হাসল,
“পালিয়ে আর যাবে কোথায়? পাতালে? নাপুরুষটাকে খুঁজতে আমার পাতালও ফুঁড়তেও হবেনা। পাতাল স্বয়ং ওই হিউম্যান ওয়েস্টটাকে ঠেলে আমার পায়ে এনে ফেলবে।”
“টার্গেট কি? মাথা ফাটাব নাকি থোতা?”
নীরব জিজ্ঞেস করল। এই প্রশ্নের উত্তর সাইবান দিলনা। বরং এগিয়ে গেল সামনে, একেবারে বাড়িটার বারান্দার কাছে। কোনো সাবধানতাও নেই তার মাঝে। যেকোন মুহুর্তে ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো জীব তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এই বোধ টুকুর অভাব তার অবয়বে। সিগারেটে লম্বা একটা সুখটান দিয়ে তামাটে ধোঁয়া বাতাসে উড়িয়ে নিজের পরনের জ্যাকেট খুলতে লাগল সাইবান। ঠোঁটের একপাশে সিগারেট রেখে কীভাবে যেন ভারসাম্য রেখেই ঠোঁট নাড়িয়ে সে অদ্ভুতুড়ে একটা কন্ঠে গেয়ে উঠল,
“টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার, হাউ আই নো ইউ আর আ মনস্টার!”
পিছনে অনুরাগরা সকলে থমকে গেল। ভূতের মুভিতে যেমন করুণ সুর শোনানো হয় ভয় দেখানোর জন্য, সাইবানের কন্ঠটা একদম তেমন শোনালো। ফিসফিসে, কাতর, বিষণ্ন, বিনোদিত, সবকিছুর অশরীরী মিশ্রণ। সঙ্গে তার চলার বেপরোয়া ভঙ্গি। অনুরাগ না চাইতে একটা ঢোক গিলল। রাতের হালকা আলো সাইবানের লম্বাটে সুঠাম শরীরে প্রতিফলিত হয়ে এক ভৌতিক আবহ সৃষ্টি করেছে। আফনান আর নীরব হঠাৎ করেই অনুরাগের গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। কেন তারা এই মুহূর্তে নিজের প্রাণের বন্ধুকেই ভয় পাচ্ছে বলতে পারবেনা কেউই।
সাইবান জ্যাকেট খুলে নিতেই ভেতরের ট্যাংক টপ বেরিয়ে এলো। তার শক্তিশালী বাহুর গড়ন স্পষ্টত চোখে পড়ল। সুঠাম, বিস্তৃত পিঠের সাথে কাপড় লেপ্টে থাকায় পেশীর গাঁথুনি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। নড়চড়ের সঙ্গে বাইসেপস ফুলেফেঁপে উঠছে। জ্যাকেটটা নিজের কোমরে বাঁধল সাইবান। তার অশরীরী সঙ্গীত থেমে নেই, শীষ বাজিয়ে বাজিয়ে সে গেয়ে চলল,
“আপ অ্যাবোভ দ্যা হেল সো হাই, আই উইল চেইয ইউ আন্টিল ইউ ডাই!”
সাইবানের গলার স্বর অত্যন্ত কর্কশ হয়ে উঠল। নিশাচরের ঘড়ঘড়ে গর্জনের মতন। পা কাঁপল আফনানের। একপাশ থেকে অনুরাগের বাহু আঁকড়ে ধরে সে ফিসফিস করল,
“ওর উপর জ্বীন আছর করেছে নাকি?”
“ভাই ও যদি উল্টো ঘুরে আমাদের উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে সেটাই করবে!”
নীরব বলতেই অনুরাগ একইসঙ্গে ভীষণ বিরক্তি এবং অস্বস্তি অনুভব করল,
“হে রাম!”
অস্ফুট স্বরে সে বিড়বিড় করল। সাইবান দাঁড়িয়ে নেই। বাড়ির ভাঙা দেয়াল টপকে ইতোমধ্যে ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। পাঁচ মিনিটের মত সবকিছু কেমন থমথমে হয়ে রইল। অতঃপর, পিনপতন নীরবতা। সাইবানের সেই অশরীরী সঙ্গীত আর শীষ দুটোই নাই হয়ে গিয়েছে। অনুরাগের ধার ঘেঁষে তখনো সাবধানী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।
“ব্যাপারটা কি হলো? হঠাৎ এমন পিনপতন নীরবতা?”
“সর। দেখি।”
অনুরাগ দুজনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে এগিয়ে গেল। তারাও পিছু নিল দ্রুতই। সকলে দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকতেই প্রথমে বিকট একটা গন্ধ নাকে এলো। একটা মৃদু আলো জ্বলছে, সাইবানের ফোনের ফ্ল্যাশের। সবাই নাকে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সাইবান মেঝের মাঝ বরাবর উবু হয়ে কি যেন দেখছে। নীরব না পারতে একদলা থুতু ফেলে শুধিয়ে বসল,
“উফ! কি গন্ধ! কি মরেছে?”
“মানুষ।”
সাইবানের অতি শান্ত ভৌতিক উত্তরে লাফিয়ে উঠল আফনান। বেচারা এক লাফে নীরবের কোলে উঠে পড়ল। অনুরাগ আহাম্মকের মতন হা করে রইল কতক্ষন। তবে সাইবানকে দেখে মনে হচ্ছে না সে মজা করছে। মাথা কাত করে বন্ধুদের দিকে জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে সে বলল,
“সাবধানে পা ফেল। র*ক্ত পড়ে আছে।”
অনুরাগ নিচের দিকে তাকাল তৎক্ষণাৎ। আবছায়া আলো আঁধারিতে চোখ সয়ে এসেছে তার। পায়ের নিচে থকথকে জেলির মতন রক্তাভ কিছু। অন্ধকারে অবশ্য কালো দেখাচ্ছে। ঝট করে পিছিয়ে গেল অনুরাগ।
“এ…এ…এসব কি?”
কাঁপা কাঁপা গলায় নীরব বলে উঠল।
“হুশ! যেখানে আছিস ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক। খবরদার এক পাও নড়বিনা।”
ফিসফিস করে উঠে দাঁড়াল সাইবান। ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা চারদিকে ঘুরিয়ে আনল। তখনি দেখা মিলল অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের। বাড়ির অপর পাশের ভাঙা দেয়ালের কাছে, একটা পুরাতন চৌকির উপর তাস ছড়ানো। সেই চৌকির নিচে বস্তার মতন কি যেন পরে আছে। ভালোমত তাকানোর পর বোঝা গেল, কোনো বস্তা নয়। মানুষের লা*শ! উপুড় হয়ে পড়ে আছে। সেটার মাথার দিক থেকে র*ক্তধারা বয়ে গিয়ে অনুরাগের পায়ের কাছ অবধি পৌঁছেছে। এখন জমে থকথকে হয়ে আছে। গা গুলিয়ে উঠল সবার, শরীরে যেন কাটা দিয়ে গেল। মুখ চেপে বমি আটকাল অনুরাগ, নীরব আর আফনান একে অপরকে জাপটে ধরে রাখল। বন্ধুর সামনে মান ইজ্জত চলে যাবে বিধায় ছুটে পালাতে পারছেনা। একমাত্র সাইবান সুঠাম শরীরে দন্ডায়মান। বোটকা গন্ধটা আটকানোর জন্য পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে নাকে চাপল সে।
“কি হয়েছে এখানে?”
অনুরাগ ফিসফসিয়ে উচ্চারণ করল, যেন তার কন্ঠস্বর জোরালো হলে মৃতদের বিরক্ত করা হবে। সাইবান প্রথমটায় জবাব না দিয়ে ফ্ল্যাশলাইট ঘুরিয়ে অন্যপাশে দেখল। একটা নয়, দুটো লা*শ। আরেকটা দেয়ালের কোণায়, শরীর অর্ধউলঙ্গ। মাথাটা বুঝি অর্ধেক মাটির মাঝেই পুঁ*তে রাখা! দৃশ্যটা বীভৎস হওয়ায় সে দ্রুত ফ্ল্যাশলাইট সরিয়ে ফেলল। বন্ধুদের দেখার সুযোগ দিলনা। অবশেষে সে উত্তর করল,
“কি হয়েছে জানিনা। তবে যা হওয়ার, আমরা আসার আগেই হয়ে গিয়েছে।”
সাইবান কথাটা শেষ করতেই বাইরে থেকে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো। তাদের গাড়ি পার্ক করে রাখা, সেক্ষেত্রে সেটা নয়। ভিন্ন কোনো গাড়ি। মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে পড়ল প্রত্যেকে। আফনান কেঁদে উঠল,
“এই ভাই পুলিশ নাকি? আমরা তো কিছুই করলাম না! এখন যদি বিনা দোষে জেলে ভরে দেয়?”
বাইরে গাড়িটা ব্রেক কষে থেমেছে। দরজা খোলার ধুপধাপ আওয়াজ। পদশব্দ। তারপরই এক অতি পরিচিত মেয়েলী কন্ঠস্বর, তেজী এবং আতঙ্কিত,
“আলাদিন!”
এক সেকেন্ডের জন্য জমে গেল সাইবান। মনে হলো, বুঝি তার জগৎ থমকে গিয়েছে। হৃদযন্ত্র অস্বাভাবিকভাবে স্পন্দিত হলো। পায়ের শব্দটা এগিয়ে আসছে। কাছে। বাড়ির বারান্দার ভেতরে উঠে পড়েছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলনা সাইবান। ওই অবস্থায়ই লাফিয়ে সবকিছু টপকে ঠিক প্রবেশমুখের কাছে এসে পড়ল। বাইরে থেকেও ফ্ল্যাশের আলো আসছে। সেই ফ্যাকাশে আলোয় পরিষ্কার হলো ইরামের মুখটা। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে বোঝাই যাচ্ছে। সবুজাভ একটা কামিজ পরনে। ওড়না কাঁধের একপাশে ঝুলছে। চুলগুলো টাইট করে খোঁপা বাঁধা। ইরাম একা নয়, তার পিছনে ইহানের অবয়ব স্পষ্ট। বোনকে এখানে নিয়ে এসেছে সেই, বুঝতে রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই কারো। সাইবানের ভয়ানক রাগ হলো। হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল সে। ভ্রুজোড়ার তীব্র কুঞ্চনে পিয়ার্সিং খানিক দুলে উঠল।
ইরাম ভেতরে ঢুকে খানিকটা আগ্রাসী কন্ঠে বলতে গেল,
“তোমাকে মানা করেছি না? আমার কথা কেন শুনতে চাও না তুমি? বিপদে ঝাঁপানোর এত শখ কেন তোমার? খবরদার বলছি যদি আর একবারও…আহ!”
নিজের বকুনি সম্পূর্ণ করতে পারলনা ইরাম। নাকে বোঁটকা গন্ধটা গিয়ে লাগল। ভেতরে ঠিকঠাক ঢুকতেও পারলনা সে। না দেখে জমাট বাঁধা র*ক্তের উপর পা দেয়ার আগেই হুট করে একটি বলিষ্ঠ বাহু এগিয়ে এলো। কি হলো ইরাম বুঝতেও পারলনা। শুধু অনুভব করল তার পা জোড়া শূন্যে ভাসছে। তারপরই তাকে উপুড় করে সরাসরি নিজের কাঁধে তুলে নিল সাইবান। ইরাম ঝুলে পড়ল, তার পা এবং হাতজোড়া অসহায়ের মতন দুলতে লাগল হাওয়ায়। ছটফট করে উঠল সে। সাইবানের পিঠে কিল বসাতে লাগল,
“এই ছেলে! নিচে নামাও! কি আশ্চর্য্য! নিচে নামাও আমাকে এক্ষুণি!”
সাইবান ইরামকে ভালোমত নিজের কাঁধে চেপে ধরে অন্য হাতে ফ্ল্যাশলাইট ধরে সকলের গর্জে উঠল,
“আউট! রাইট নাউ!”
সে নিজেই সবার আগে ভেতর থেকে লম্বা পা ফেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। ইরামকে এক মুহূর্তের জন্যও নিচে নামাল না, সাবধানে র*ক্ত টপকে বারান্দা বেয়ে শেষমেষ নিচে চলে এলো। ইরাম তখনো তার ঘাড় চেপে ধরে প্রতিবাদ করে যাচ্ছে,
“কি অসভ্য! ছেলে আমার কথা কানে যায়না? নামাও! সভ্যতা তো নেই, এখন লজ্জা শরমও গুলে খেয়েছে। আলাদিন! আমি হাঁটতে জানি, নামাও আমাকে!”
সাইবান হুট করে নিজের অন্য হাতটা তুলে ইরামের কোমর বরাবর আলতো একটা চাপড় দিয়ে বলে উঠল,
“কাদায় পা রাখতে হবে কেন? দরকার হলে ওই পা আমার বুকে রাখুন। তবুও আমার কাঁধে লক্ষ্মীটি হয়ে থাকুন। এই কাঁধজোড়া নিজের দুনিয়ার ভার বহন করতে জানে।”
ইরামের গাল লালচে হয়ে উঠল। এত জরুরী মুহূর্তেও সে কেমন সিধিয়ে গেল সাইবানের স্পর্শ পেয়েই। পিছনে পিছনে ততক্ষণে অনুরাগ, নীরব, আফনান আর ইহানও বেরিয়ে এসেছে। প্রত্যেকের মুখ ভীষণ রকমের থমথমে। ইরাম কোনোভাবে ইযানকে রেখে বাড়ির গাড়ির ড্রাইভার আর ইহানকে নিয়ে সাইবানকে থামাতে এসেছে তা স্পষ্ট।
সাইবান ইরামকে নামালনা, যতক্ষণ না গাড়ির কাছে পৌঁছাল। দরজা খুলে ভেতরের প্যাসেঞ্জার সিটে অর্ধাঙ্গিনীকে বসিয়ে তারপরই ক্ষান্ত দিল সে। জিজ্ঞেস করল,
“পোটলা কার কাছে?”
চোখমুখ কুঁচকে ফেলল ইরাম।
“আম্মু আর সুগন্ধাকে ডেকে রেখে এসেছি। তুমি কি আর আমাকে এক দন্ড শান্তি দিয়েছ?”
“এবার শান্তি করুন।”
সাইবান বাইরে বেরোতে নিচ্ছিল কিন্তু ইরাম তার হাত খামচে ধরল,
“এই! বিষয় বদলাবে না। ওখানে কি করছিলে তুমি? কেউ তো নেই। আর, ওই বিশ্রী গন্ধটা কিসের? এখনো নাকে আসছে আমার, ছিঃ! কি করেছ তুমি সত্যি করে বলো।”
একটা বাঁকা হাসি ছড়িয়ে পড়ল সাইবানের ঠোঁটে। ঝুঁকে এসে ইরামের চোখের পানে চেয়ে আবেশিত মৃদু গলায় সে বলল,
“কিছু না করতে পারার আফসোস করছি।”
“আলা…!”
“হুশ!”
ইরামের ঠোঁটে বৃদ্ধাঙ্গুল চেপে ধরল সাইবান। বরফে পরিণত হলো রমণী। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকল। সাইবানের আঙুল তার ঠোঁট দারুণভাবে স্পর্শ করল, ছোঁয়া বুলিয়ে একেবারে ঠোঁটের কোণে এসে থামল। জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে ঘোষণা করল,
“কোনো অপবিত্র গন্ধের অধিকার নেই আপনার নাকে প্রবেশ করার। আপনার গ্রহণ করা সুবাসে নাম লেখা থাকবে শুধু আমার। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
আরেক দফায় অর্ধাঙ্গিনীকে বাকরুদ্ধ করে দিয়ে সাইবান আলতো করে তার গালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল।
“রিল্যাক্স মাই প্রেশিয়াস, আ’ম রাইট হেয়ার উইদ ইউ।”
ফিসফিস করল সে। অতঃপর গাড়ি থেকে মুখ বের করে বাইরে দাঁড়ানো সকলকে দেখল, তার দৃষ্টি মিলিত হলো অনুরাগের সঙ্গে, গভীর গলায় সে আদেশ ছুঁড়ল,
“পুলিশকে কল কর।”
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ২০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ২১
-
আমার আলাদিন পর্ব ৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ১১
-
আমার আলাদিন পর্ব ২০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৫