আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা১০
একটা বিশাল থালায় পোলাও, কোরমা, খাসির রেজালা, কাবাব, আস্ত দুটো মুরগীর গ্রিল, ঘন ডাল, সালাদ, মিষ্টি সবকিছু সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নতুন বর সাইবানের সঙ্গে খেতে বসেছে তার বন্ধুরাও। গরুর মাংসের তরকারিটা আলাদা রাখা হয়েছে অনুরাগের কথা চিন্তা করে। কার্পেটের উপর পাত পেড়ে খেতে বসেছে সকলে, এক থালাতেই। নীরব এত বড় সাইজের গ্রাস মুখে তুলছে যেন তার খাবার কেউ টেনে নিয়ে যাবে। আফনান ছাগলের মতন কচকচ করে কাঁচা মরিচ খেয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে বন্ধুদের মাঝে হাসাহাসির কমতি নেই। এখানে শুধু পুরুষেরা আছে। মেয়েদের খাবারের ব্যবস্থা আলাদা করে গেস্ট উইংয়ে করা হয়েছে।
খেতে খেতে সবার প্রথমে নীরব বলে উঠল,
“ভাই। কে যেন এককালে বলেছিল আমাদের মেয়েদের সুগার ড্যাডি হবে?”
“খুঁজিস না। এখন সে এক বাচ্চার ড্যাডি হয়ে গেছে!”
অট্টহাসি হেসে বলে উঠল আফনান। নীরব বন্ধুর সঙ্গে তাল মেলালো,
“আবার কি বলে? কবর অবধি কবুল! ওমা গো, টুরু লাভ!”
“শ্যাষ! গুরু তুই শ্যাষ!”
তরকারির ঝোল মাখা হাতটাই চটাশ করে আফনানের গালে বসিয়ে দিল সাইবান। খিলখিল করে হেসে উঠল সকলে। অনুরাগ অবধি আজ মজা নিতে ছাড়লনা।
“এই। তোরা ওকে এত জ্বালাতন করিস না। এমনিতেই সবে জ্বালাতনের দায়িত্ব শুরু হয়েছে। একটা বাচ্চা পালা কি কম? ভরণ পোষণ, শিক্ষা দীক্ষা সব দিকটাই তো ওকে দেখতে হবে বল?”
সবথেকে কাছের বন্ধু অনুরাগ অবধি পল্টি খেয়েছে দেখে সাইবান তেঁতে উঠল। তবে রাগটা দেখালনা। বরং আস্ত মুরগি থেকে লেগপিস ছিঁড়ে নিয়ে বিশাল এক কামড় দিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল,
“অবশ্যই। শিক্ষা দীক্ষা সবই দিতে হবে। ব্যঞ্জনবর্ণ শেখানো শুরু করে দেব, এক বছরের মধ্যেই গড়গড় করে কথা বলতে শুরু করবে দেখবি।”
নীরব একটা আস্ত গোলাপ জামুন মুখে দিয়ে প্রায় না চিবিয়েই গিলে নিয়ে শুধাল,
“ছেলেকে শুধু ব্যঞ্জনবর্ণ শেখাবি কেন? স্বরবর্ণ কি দোষ করেছে?”
“স্বরবর্ণ শুধু বউয়ের জন্য বরাদ্দ।”
সাইবানের বেফাঁস কথায় অনুরাগ প্রায় মুখের খাবার ফেলে দিচ্ছিল, কোনমতে হাত চেপে নিজেকে থামাল। কেশে ফেলল বেচারা। অপরদিকে হাতের লোকমা হাতে নিয়েই জমে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে সাইবানের দিকে চেয়ে রইল আফনান এবং নীরব। সাইবানের কোনো হেলদোল নেই, সে নিশ্চিন্তমনে বিরাট কোল্ড ড্রিংকসের গ্লাসে চুমুক দিয়েছে। অনুরাগ বাম হাতে একটা থাপ্পড় দিল তার পিঠে,
“তুই কি কোনোদিন শুধরাবি না? বিয়ে হয়েছে তবুও এই শয়তানি গেলো না!”
“শয়তান শুধরে গেলে পৃথিবীতে তোর মতন সন্ন্যাসীদের কি কাজ?”
বাঁকা হেসে জবাব দিল সাইবান। আর পারলনা আফনান আর নীরব। উভয়ে হাসতে হাসতে ফ্লোরেই গড়াগড়ি খেতে লাগল।
অপরদিকে ইরাম ইযানকে নিয়েই ব্যস্ত। খেতে বসেনি সে এখনো। ছেলে ঘুমাবে, ঢুলুঢুলু চোখে তার বুকে লেপ্টে আছে। তাকে নিয়েই হাঁটাহাঁটি করছে সঙ্গে সকলে ঠিকমত খাচ্ছে কিনা সেই বিষয়টাও তদারকি করছে। চোখের কোণে সে খেয়াল করল রাহাত আর ইহান দুইজনই বাড়ির চৌকাঠ বেয়ে নেমে যাচ্ছে। আর অপেক্ষা করলনা ইরাম। দ্রুত হেঁটে বেরিয়ে গেল বাইরে। ইযানকে নিজের বুকে সাবধানে আড়াল করে রেখে ভাইদের পিছু নিল সে। মেইন গেটের কাছাকাছি গিয়ে থামাল তাদের।
“ভাই?”
ইহান থামল আগে। ঘুরে ইরামকে দেখেই বোনের দিকে ছুটে গেল। রাহাত খানিকটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দূরেই দাঁড়িয়ে রইল।
“আপু।”
ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে খানিক আদর করে দিয়ে ইরাম শুধাল,
“খেয়েছিস?”
“হুম।”
“তোর গালে কি হয়েছে?”
ব্যান্ডেজ লাগানো গালটা হালকা একটু ঘষে ভ্রু কুঁচকে ফেলল ইহান।
“ইঁদুর কামড়েছে।”
“ইঁদুর?”
চোখ কপালে উঠে গেল ইরামের। হতবাক নয়নে চেয়ে রইল ছোট ভাইয়ের মুখপানে।
“ইঁদুর এলো কোথা থেকে?”
“জানিনা। আমার রুমে তেলাপোকা ছিল, ইঁদুর না। কিন্তু গতকাল রাতে কোত্থেকে যেন এলো। পালিয়েও গেলো, ঠিকমত দেখতে পাইনি। ধরতে পারলে পিষে ফেলতাম শালাদের!”
“ডাক্তার দেখিয়েছিস? টিটেনাস ইনজেকশন?”
“চিন্তা করোনা। ইনজেকশন দেয়াই আছে। ফার্মেসীতে দেখিয়েছি সকালে। লাল দাগ হয়ে গিয়েছে। বলেছে কয়েকদিন গরম পানির সেঁক দিলে ঠিক হয়ে যাবে।”
গজগজ করে বলল ইহান। ছোট ভাইয়ের রুমে ইঁদুর ঢোকার রহস্য ইরাম ধরতে পারলেও বিশেষ কোনো মন্তব্য করলনা। ইহানও সেই বিষয়ক কথা বাড়ালনা। বরং আগ্রহ নিয়ে তাকাল ইযানের দিকে। গাল টেনে দিল,
“আমার মামাটা কেমন আছে? হুম?”
ইযান কুইকুই করে আবার মায়ের বুকে মাথা গুঁজে ফেলল। হাসল ইহান,
“আহারে, শরম পেয়েছে বেচারা।”
পরক্ষণেই সেই হাসি মুছে গেল তার। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে দেখল ইরামকে।
“তুমি এমনটা কেন করলে আপু? আমি কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিনা। ওদের সঙ্গে তুমি? ওই লোকগুলো…”
“হুশ। তোকে বলেছি তো ভাই। আমি যা করছি সুস্থ মস্তিষ্কে ভেবেচিন্তে করছি, ভবিষ্যতেও করব।”
ইরামের হাতটা নিজের সুস্থ গালে চেপে ধরে মাথা নেড়ে ইহান বলল,
“ঠিক আছে। তোমার কথাই সই। তবে তুমি আমাকে প্রমিজ করো, যদি ওরা তোমাকে তিল পরিমাণও কষ্ট দেয়, তুমি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলবে। আগের বারের মতন চুপ করে সহ্য করে যাবেনা। কথা দাও আমাকে আপু, প্লীজ!”
মৃদু হাসল ইরাম। ঝুঁকে এসে ছোট ভাইয়ের কপালে কপাল ঘষে বলল,
“আমার কিছু হবেনা ভাই। আমি ঠিক নিজের খেয়াল রাখব। চিন্তা করিস না। আজকে আসার জন্য তোদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি সত্যিই তোদের খুব মিস করি রে।”
চোখ বুঁজে মা তুল্য বড় বোনের অস্তিত্বটুকু অনুভব করল ইহান প্রাণভরে। তবে বেশিক্ষণ পারলনা। পিছন থেকে ডাক ভেসে এলো,
“ইহান, দেরী হয়ে যাচ্ছে আমাদের।”
রাহাত তাড়া দিচ্ছে। ইহানকে বেশ অসহায় দেখাল। করুণ চোখে একবার ইরামের দিকে চেয়ে সে পিছিয়ে গেলো। ইরাম দৃপ্ত দৃষ্টিতে দেখল রাহাতকে। পায়ে পায়ে হেঁটে কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“আমার সঙ্গে কথা না বলেই চলে যেতে চাচ্ছিস?”
“কথা বলার মতন মুখ তো তুমি রাখোনি আমাদের, আপু। মহল্লায় এর মধ্যেই ছি ছি পরে গিয়েছে। সারাদিন ওই বাড়ির ভেতর বসে থাকলে জানবে কীভাবে?”
রাহাতের কাটকাট কথায় এবার আর কষ্ট হলোনা ইরামের।
“ঠিকই। নাক কেটে ফেলেছি তোদের, তাইনা?”
“হ্যাঁ। ভাবলেই আমার লজ্জা লাগছে তুমি নিজের হাঁটুর বয়সী একটা ছেলের সাথে বিয়ে করেছ! তাও আবার ওই, কি যেন ফি জে না ডি জে, নেশা আর পার্টি করে বেড়ায়, আধপাগলা বেয়াদব ছেলে একটা!”
“দুলাভাইকে নিয়ে ভদ্রভাবে কথা বলবি!”
ইরামের হঠাৎ প্রতিবাদে থমকে গেলো রাহাত। প্রসারিত নয়নে চেয়ে রইল বড় বোনের দিকে। ইরাম তার মুখোমুখি হলো বিনা দ্বিধায়।
“বোনকে যখন সামান্য আশ্রয়টুকু দিতে পারিসনি তখন তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কথাও বলতে আসবিনা। আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা।”
ইযান ঘুমিয়ে গিয়েছে বুঝতে পেরে ছেলেকে কাঁধের উপর তুলে নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে নিজে ইরাম দৃঢ় গলায় বলল,
“মায়ের সম্পত্তিতে মেয়েদের ভাগ আছে। মুন্সীবাড়িতে আমার যে ভাগ, সেই ভাগ আমায় বুঝিয়ে দিবি। নাহলে সমপরিমাণ টাকা দিয়ে সেই ভাগ আমার থেকে কিনে নিবি। দুই মাস সময় দিচ্ছি। কি করবি ভেবে আমাকে জানাস।”
আর দাঁড়ালনা ইরাম। হতবাক রাহাতকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে ইহানকে শেষ একবার নরম দৃষ্টিতে দেখে হনহন করে হেঁটে সে বাড়ির ভেতর চলে গেলো। ইহান নিজের জিন্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে তীর্যক হেসে বড় ভাইকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলল,
“সারাজীবন বিড়াল দেখতে দেখতে একদল ভুলেই গিয়েছিল বিড়াল কেন বাঘের মাসি হয়।”
─────────────────────────────
রাত ৯ টা।
সারাদিনের হট্টগোল আর ক্লান্তির পর অবশেষে ইরামের বিশ্রামের সুযোগ হয়েছে। এত সময় যাবৎ তেমন কিছু মনে না হলেও এখন বাস্তবতা সম্পূর্ণরূপে ইরামমে ঘিরে ধরেছে। কারণ গেস্ট রুমের বদলে তার ঠাঁই হয়েছে সাইবানের বেডরুমে।
রুমটা আধুনিক। অতিরিক্ত আসবাবের বালাই নেই। যেটুকু আছে, তাও মডার্ন ডিজাইনের। কালো ধাতুর তৈরি। বিছানার বেডশিট অবধি কালো রঙের। সিল্কের কাপড়ের উপর লাল গোলাপের পাঁপড়ি ছড়িয়ে রাখা। ইতিউতি বেশ কয়েকটি তাজা রজনীগন্ধার ছড়া। মোহনীয় ঘ্রাণে মাতোয়ারা করে তুলেছে রুমটাকে। তবুও এর মালিকের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যটাকে পুরোপুরি ঢাকতে পারছেনা। দেয়ালে মাইকেল জ্যাকসন আর চায়নিজ কিংবা কোরিয়ান কোনো বয় ব্যান্ডের পোস্টার টাঙানো। আরও কয়েকজনের চেহারা আছে, তবে এই সেলিব্রিটিদের ইরাম চেনে না। দেয়ালের একপাশে সাউন্ডের বেশকিছু যন্ত্রপাতি, সঙ্গে ছোট কন্ট্রোল বোর্ড। এক কোণায় ট্রিপল মনিটরের গেমিং সেটাপ। কাউচের উপর অবহেলায় দুটো দশ কেজির ডাম্বেল পরে আছে। একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ইরাম। নিজের সঙ্গে এই অস্তিত্বের সামান্যতম মিলও খুঁজে পেলনা। তার ভালো লাগে বই, খোলামেলা পরিবেশ, বেশি হলে একটা ঝুল দোলনা, মাঝে মধ্যে গান শোনার জন্য অ্যান্টিক রেডিওসেট। এইতো, খুব বেশি চাহিদা তার কোনোকালেই ছিলনা।
সে সত্যিই সাইবান আলাদিনের সঙ্গে এক সূত্রে বাঁধা পড়েছে এই রুমটাই তার প্রমাণ। ক্ষণস্থায়ী হলেও এই রুমটাই আপাতত তার ঠিকানা।
হিসাবমতে আজকে ইরামের বাসররাত। তবে এই রাত নিয়ে কোনোপ্রকার আগ্রহ, আকাঙ্ক্ষা কিংবা ভাবার ইচ্ছাটুকুও তার মাঝে নেই। ইযানকে আজ কৌশলে সামিয়া নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। মুখে না বললেও ইরাম বুঝতে পেরেছে, তাদের প্রাইভেসি দিতে। যার আদতে কোনো প্রয়োজন ছিলনা। এমন কিছু এখানে হতে যাচ্ছেনা। তবে সেই কথা শুধু সে আর সাইবানই জানে।
নিজের শাড়ি বদলানোর কথা ভাবলো ইরাম। তবে সঙ্গে করে কাপড় আনতে তো ভুলে গিয়েছে। দরজা খুলে বাইরে গিয়ে আবার নিয়ে আসবে? এত কাহিনী কে করবে? তার থেকে গয়না খুলে একটু ফ্রেশ হওয়া যাক। ভেবে ইরাম গলা আর কান থেকে হালকা গহনাগুলো খুলে রাখল। রুমের একপাশে লাগোয়া বারান্দা। অন্যপাশে আরেকটা দরজা, বাথরুমই হবে। ভেবে স্লাইড করে কাঁচের দরজাটি খুলে ইরাম ভেতরে পা রাখল। তবে সামনের দৃশ্য তাকে জমিয়ে দিল।
জায়গাটাকে বাথরুম বলবে না অন্যকিছু ইরাম কয়েক লহমা ভেবেই পেলনা।
হঠাৎ করে কেউ দেখলে মনে করবে বুঝি জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে। দেয়ালে তেমনি গাছপালার ডিজাইন। মেঝের মাঝ বরাবর ফাঁকা। সত্যিই ফাঁকা। পুলও নয়, বাথটাবও নয়। যেন জঙ্গলের গাছপালার মাঝে একটি প্রাকৃতিক পুকুর। আশেপাশে পাথরের দেয়াল তুলে দেয়া। তাতে টলটলে পানি ভাসছে। সিলিংয়ের সঙ্গে লাগোয়া ঝর্ণা বেয়ে বৃষ্টির মতন ঝিরিঝিরি পানি ঝরছে পুকুরের ন্যায় স্থানটির উপর। পাথরের সিঁড়ি নেমে গিয়েছে কয়েক ধাপ, ভেতরে যাওয়ার জন্য। ইরাম হা করে তাকিয়ে রইল রীতিমত। সে একটুখানি হাতমুখ ধোবে। কিন্তু এমন জায়গায় তো হাতমুখ ধুতে মনে চায়না, শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা হয়। যেন ছুঁয়ে দিলেই জাদুকরী জায়গাটার মায়া কেটে যাবে।
“এটা কেমন বাথরুম?”
“এটাকে বলে জাকুযি।”
অস্ফুট স্বরে ইরাম বলে উঠেছিল, এমন স্পষ্ট জবাব আসবে ভাবেনি। ঝট করে পিছন ফিরে তাকাল সে। ঠিক দরজার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাইবান। ভেস্ট খুলে ফেলেছে, শুধু শার্ট আর প্যান্ট পরনে। শার্টের উপরের বেশ কয়েকটা বোতাম খোলা থাকায় মাংসল বুকের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। ইরাম দ্রুতই দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
“বাড়ির ভেতর এই জিনিস করার আইডিয়া কে দিল?”
হাসল সাইবান। ভেতরে ঢুকে আশেপাশে তাকাল, স্বগর্বে নিজের তৈরিকে দেখে বলল,
“বাড়ির ভেতর রিল্যাক্স করার মতন জায়গা দরকার তাই। এটা গত বছর ইনস্টল করেছি। বাড়ির এই দিকটা ভেঙে অনেককিছু ঠিকঠাক করতে হয়েছিল।”
“তোমার মাঝে নরমাল কিছু আছে, আলাদিন?”
“নরমাল বাথরুম টয়লেটও আছে। আপনি ভুল জায়গায় ঢুকে পড়েছেন।”
বিস্তৃত হাসি নিয়েই জবাব দিল সাইবান। তারপর পায়ে পায়ে এগোতে লাগল ইরামের দিকে।
“জায়গাটা রোম্যান্টিক না? মনে হবে যেন গভীর বনের মাঝে বসে কোনো পুকুরে শরীর ডুবিয়ে আরামে আকাশের তারা দেখছেন।”
ইরাম জানে না কেন তার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে উঠল। আজ তাদের বাসর রাত, এই বিষয়টাই তার অনুভূতির সঙ্গে বেশ বাজেভাবে খেলতে শুরু করে দিয়েছে। অজান্তেই পিছিয়ে পড়ল সে। পানির একদম কিনা পাথরের কাছে গিয়ে থামল। সাইবান রীতিমত নির্লজ্জ্বভাবেই তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল। ইরাম আর ঘোমটা দিয়ে নেই। গাঢ় জলপাই বর্ণের চকচকে শাড়িটা তার শরীরে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সাইবান এতদিন ভালো করে দেখেনি, কিংবা সংকোচ করেছে। অথচ আজ তার দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র সংকোচ রইলনা। কবুল পড়ে বিয়ে করা বউ তার সামনে দাঁড়িয়ে। ভাবতেই অদ্ভুতুড়ে একটা উষ্ণতা এবং ভীষণ রকমের অন্তর্জ্বালা ছড়িয়ে পড়ল সাইবানের বুকে।
ইরাম তার গভীরতম দৃষ্টিকে খেয়াল করল, জিজ্ঞেস করে বসল,
“আজ কাজী সাহেবের সামনে হঠাৎ, ওভাবে বললে কেন?”
থমকাল সাইবান। দৃষ্টি তুলে ইরামের মুখ দেখল, অতঃপর বাঁকা হাসি ছুঁয়ে গেলো তার ঠোঁটজুড়ে।
“কীভাবে বলেছি?”
“কবর অবধি কবুল কথাটার মানে কি?”
“এটাই যে আপনাকে বিয়ে করে নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি আমি।”
ইরামের খুব কাছে এসে পড়ল সাইবান। রমণী জমে গেল। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সাইবান বুঝি তাকে ছুঁয়ে দেবে, প্রগাঢ়ভাবে। আর সে আটকাবে কি করে? এতদিন ছেলেটা ছিল পরপুরুষ, আজ থেকে স্বামী। ঠিক কত পর্যায় অবধি ইরাম তাকে থামিয়ে রাখতে পারবে? অথচ সাইবান তাকে ছুঁয়ে দিলনা। শুধু দেখেই গেলো। গলা, বুক, উদর পেরিয়ে এসে তার নিগূঢ় কালো নয়নজোড়া থামল বরাবর ইরামের কোমরে। আর তৎক্ষণাৎ মুগ্ধতার দৃষ্টিটা বদলে গেলো তীব্র কৌতূহলে। বাজে রকমের কৌতূহল। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সাইবান। এতক্ষণ স্পর্শ না করেও এবার হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলে ইরামের কোমরের ত্বকে ফুটে থাকা একটা খয়েরী দাগ ছুঁয়ে দিল সে।
“এটা কিসের দাগ?”
সাইবানের প্রশ্নে ঝাঁঝ টের পাওয়া গেলো স্পষ্ট। ইরাম জবাব দেয়ার সুযোগ পেলোনা। এর আগেই রুমের দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ ভেসে এলো।
“আমি দেখছি কে এসেছে!”
রীতিমত চোরের মতই ছুটে পালিয়ে গেলো ইরাম। এক হাতে আঁচল টেনে কোমরের অংশটা সন্তপর্নে ঢেকে নিল। সাইবান কয়েক সেকেন্ড আহাম্মকের মতন দাঁড়িয়ে থাকল। পরমুহূর্তেই হতাশাবোধক একটি শব্দ করে উল্টো ঘুরে রুমের ভেতর চলে এলো।
ইরাম ততক্ষণে দরজা খুলে দিয়েছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সারিকা। তার হাতে ধরা ছটফট করে কাঁদতে থাকা ইযান।
“আমি আর মম মিলে অনেক চেষ্টা করেছি। আপনাকে ছাড়া শান্ত হবে বলে মনে হয়না।”
খানিকটা বিরক্তি নিয়েই বলল সারিকা। ইরাম দ্রুত নিজের হাত বাড়িয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। সারিকা অপেক্ষা অবধি করলনা। যেমন হঠাৎ এসেছিল, তেমন হঠাৎ করেই চলে গেলো। একটি নিঃশ্বাস ফেলে দরজা আটকে চিৎকার করে কাঁদতে থাকা ইযানকে নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল ইরাম।
“এইযে না না, সোনা আমার, কুচুপু আমার। এইতো আম্মু এখানে, আম্মু কোথাও যায়নি। এইযে সোনা, এইযে আমার বাবাটা।”
ছেলেকে দুলিয়ে দুলিয়ে শান্ত করতে চাইলো ইরাম। অথচ কোনো কাজ হলোনা। বরং সময়ের সাথে সাথে আরও জোরে তারস্বরে কেঁদে যেতে লাগলো ইযান। ছোট্ট শিশুটির মুখ লালচে হয়ে উঠেছে কান্নার কারণে। ইরাম সইতে পারলনা। বুকে আঁকড়ে ধরলো ছেলেকে।
“না না, কাঁদেনা আব্বু, আর না। আম্মুর কষ্ট হয় তো, কুচুপু।”
প্রথমটায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে মনিটরের সামনের গেমিং চেয়ারে বসে মোবাইল স্ক্রল শুরু করেছিল সাইবান। বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভীষণ তীক্ষ্ণ, তার কানে লাগছে বাজেভাবে। তবে যখন প্রায় বিশ মিনিট পরেও কান্না থামার নামগন্ধ হলোনা, তখন মোবাইল রেখে উঠল সাইবান। খানিকটা তেজী কণ্ঠেই বলল,
“কি সমস্যা? এমন ভ্যাকভ্যাক করে কাদঁছে কেন পোটলাটা? হাগু পেয়েছে আবার?”
ইরাম হাসলনা। বরং খানিকটা অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“বুঝতে পারছিনা। কান্না করে অনেক, কিন্তু এতক্ষণ ধরে একটানা কোনোদিন করেনি। কোথায় সমস্যা হচ্ছে বাবাটার? আম্মু বুঝতে পারছেনা, আম্মু পঁচা!”
ইরামের চোখ ছলছল করে উঠল। ছটফট করতে থাকা ইযানকে বুকে চেপে রাখল সে। দৃশ্যটা দেখে কেন যেন ভীষণ অশান্তি অনুভব করল সাইবান।
“আমি জানি পোটলার কান্না কীভাবে থামাতে হয়।”
হঠাৎ করে বলেই দেয়ালে ঝুলন্ত টিভি রিমোট দিয়ে অন করল সাইবান। ইরাম ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল। সাইবান ততক্ষণে মেঝের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। টিভির ভলিউম বাড়িয়ে সে একটা গান ছাড়ল। তারপরই রিমোটটা ছুঁড়ে ফেলে দুই পা ছড়িয়ে দাঁড়াল।
“ওয়াচ দিস পোটলা!”
~দিলবার দিলবার!~
গানের তালে তালে কোমর দুলিয়ে সাইবান এমন অদ্ভুতুড়ে অঙ্গভঙ্গি করে উঠল যে ইরামের হাসিচাপা দিতে মুখে হাত চাপতে হলো। অথচ অবিশ্বাস্য ব্যাপার, সাইবান নাচতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে ইযানের কান্না থেমে গিয়েছে। নাক টেনে অশ্রুসজল চোখে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এখন সাইবানের নাচ।
~আব তো হোশ না খাবাড় হ্যায়, ইয়ে ক্যায়সা আসার হ্যায়
তুমসে মিলনেকে বাদ দিলবার~
সাইবানের কোমর দোলানো নাচের তালে তালে আচমকা ইযান হাতে তালি মেরে বুঝি গেয়ে উঠল,
“আই ইয়া…!”
ইরাম না পারতে হেসে ফেলল এবার। তার চোখের পানি হুট করে শুকিয়ে গিয়েছে। সাইবানের নাচের সাথে সাথে ইযানের সব ভুলে লাফিয়ে ওঠাটা তার মনে দাগ কেটে গিয়েছে। অজান্তেই সে জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে দেখল সামনের মানুষটাকে।
পাগলাটে একটা ছেলে। একদম লাগামহীন ঘোড়ার মতন। বেশরমের মতন কোমর দুলিয়ে যাচ্ছে। ভালোই দোলাচ্ছে যদিও! ইরাম লজ্জাবোধ করল, কি ভাবছে সে? তবে তার বিশেষ কোনো সন্দেহ রইলনা। এই বিবাহিত জীবনটাকে যত কঠিন হবে বলে সে ভেবে এসেছে, ততটা কঠিন নাও হতে পারে।
─────────────────────────────
পরদিন সকাল।
একদম ভোরে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে সাইবান। ফ্রেশ হয়ে জিমরুম থেকে এক ঘণ্টা ওয়ার্কআউট করে সাউন্ড রুমের কিছু যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক করে এসেছে। বাড়ির সবাই এখনো ঘুমে। শুধু সুগন্ধা উঠেছে বোধ হয়। নিচতলার কিচেন থেকে থালাবাসনের শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছে। ঘেমে একাকার হয়ে গিয়েছে সাইবান। বাথরুম থেকে সংক্ষিপ্ত একটা গোসল সেরে তোয়ালেতে মাথা মুছতে মুছতে যখন সে বেরোলো তখন ঘড়িতে সময় সাড়ে আটটা। তোয়ালেটা বারান্দায় ঝুলিয়ে সে যখন রুমের ভেতর ফিরে এলো তখন ভীষণ অপ্রত্যাশিত একটি দৃশ্য তাকে স্বাগত জানালো।
তার বিছানার উপর পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে ইরাম। রমণীর বুকের সাথে ঘেঁষে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইযান। গতকাল প্রায় ভোরের দিকে ঘুমানোর সুযোগ হয়েছিল। সারাটা রাত থেকে থেকে জেগে উঠে মাকে জ্বালিয়েছে সে। সাইবান মরার মতো সোফায় পড়েছিল। বালিশ চাপা দিয়ে রেখেছে কানে। হাতে গোণা কিছু ঘণ্টা হয়ত ঘুমিয়েছে, আবার সাতটার আগেই উঠে পড়েছে। গভীর দৃষ্টিতে দেখল সে। বিছানায় থাকা মা সন্তান উভয়ের উপর সকালের স্নিগ্ধ আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে একটা স্বর্গীয় ভাব সৃষ্টি করেছে। সাইবান নিষ্পলক চেয়ে রইল, কতক্ষন যাবৎ নিজেও বলতে পারবেনা। তার ভাবতেও অবাক লাগছে বিছানায় শুয়ে থাকা রমণী এবং ছোট্ট নাজুক প্রাণটি এখন তারই পরিবারের অংশ।
পায়ে পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এলো সাইবান। গতকালের ক্লান্তি তাকে ঘুমাতে দেয়নি, অপরদিকে ইরামকে জড়িয়ে রেখেছে গভীর ঘুমের চাদরে। অজান্তেই হাঁটু মুড়ে বিছানার পাশের কার্পেটের উপর বসে পড়ল সে। ইরামের একটা হাত লম্বা করে রাখা, অপর হাতটা ইযানের শরীরের উপর। দুই হাতেই টকটকে মেহেদী। সেই মেহেদী দেখেই কিছু একটা মাথায় এলো সাইবানের। ঝুঁকে এলো সে। লম্বা করে রাখা হাতটার উপর ঝুঁকে অতি মনোযোগ নিয়ে দেখতে লাগলো। সিম্পল অথচ বেশ সুন্দর কারুকার্য। জ্বলজ্বল করছে যেন রত্নের মতন। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো সাইবানের, হন্যে হয়ে সে খুঁজে বেড়ালো। কোথায়? কোথায় আছে? আছে কি নেই?
অবশেষে সাইবানের খোঁজ থামল। দৃষ্টি প্রসারিত হলো, সঙ্গে ঠোঁটে ফুটল এক পরিতৃপ্ত মায়াবী হাসি।
“গচা!”
বিড়বিড় করল সে আপনমনের। ইরামের হাতের মধ্যমা এবং অনামিকা আঙুলের ঠিক মাঝখানে, চাপা জায়গাটায় প্যাঁচানো অক্ষরে লিখা—
“আমার আলাদিন…”
ফিসফিস করে উচ্চারণ করল সাইবান। জানেনা কেমন অনুভূতি হলো বুকের ভেতর। নিষ্পলক চেয়ে রইল, একনাগাড়ে সে। ইচ্ছা হচ্ছেনা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে। ইরামের প্রশান্তিতে ছাওয়া ঘুমন্ত মুখটা দেখল সে অত্যন্ত আবেগ নিয়ে। তারপর আবারও দেখলো আঙুলের ফাঁকে লুকিয়ে রাখা নামটাকে। নিজের ফোন বের করে নিঃশব্দে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল সাইবান। কেন সে নিজেও জানেনা। ফোন রেখে সে ঝুঁকে এলো। সাবধানী আঙুলে ছুঁয়ে দিলো মেহেদীর রঙে রেঙে থাকা আঙুলটাকে। ইরাম সামান্য নড়েচড়ে উঠতেই জমে গেলো সে। অথচ রমণীর ঘুম ভাঙলনা। শুধু ছেলেকে ঘুমের ঘোরে নিজের আরও খানিকটা কাছে টেনে পুনরায় নিদ্রায় নিমজ্জিত হলো সে। বুকের ভেতর আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়ল সাইবান। অতি সাবধানে নিজের নাম লিখা ইরামের আঙুলটা তুলে নিলো সে। কি হলো সে বলতে পারবেনা। ঝুঁকে গেলো। সেই নরম আঙুলের ডগায় আলতো করে স্পর্শ করল নিজের ঠোঁট। অতি ক্ষীণ এক মুহূর্তের আলতো ছোঁয়া, চোখ বুঁজে নিল সাইবান। আনমনে ফিসফিস করল,
“আপনার আলাদিন।”
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৪
-
আমার আলাদিন গল্পের লিংক
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ১২
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ১১
-
আমার আলাদিন পর্ব ৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৯
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৫