–
সূর্য ডুবেছে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে আওয়াজ বাড়ছে ক্রমশ। বাতাসটা ভারী হয়ে এসেছে। বিদঘুটে এক গন্ধ আশেপাশে। নাসির শিকদার দাঁড়িয়ে আছেন সরু রাস্তার এককোণে। তার মেরুদণ্ড টানটান। পিঠে হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ। শীতল দৃষ্টি সোজা ওই অমসৃণ, সরু, ফাঁকা পথেই। কিছুক্ষণ আগেই ছেলে তার বিদায় নিয়েছে। চলে গিয়েছে সদ্যবিবাহিত স্ত্রী নিয়ে। কতক্ষণ হবে গিয়েছে ছেলেটা? কুড়ি মিনিট? হতে পারে! এতক্ষণ যাবত ভদ্রলোক স্থির হয়ে, একইরকম ভাবে আছেন। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন কাওসার আহমেদ। নাসির সাহেবের অবশ মুখের দিকে তাকালেন। ফেললেন তপ্ত শ্বাস। মনের কথাগুলো আস্তে করেই বলে ফেললেন। বরাবরই তিনি ভালো চান যে –
‘নাসির! কী দরকার এতো ভয়ংকর পথে চলার? খারাপের একটা সীমা থাকে তো নাসির। থাকে না তুমিই কউ? তোমার কি মনে হয় না ওই সীমা পার কইরা ফেলছো? আর কতো? এই ভয়ংকর পথ থেইকা ফিরা আসো। চাচার কথা শোনো। যেই পথে পদে পদে মৃ ত্যুর ঘণ্টা বেজে চলে.. ওইখানেই কেনো?’
নাসির শিকদাদের দৃষ্টি নড়ল না। অঙ্গভঙ্গিতে এলো না বিন্দুমাত্র পরিবর্তন। সরু পথে থাকা অনড় দৃষ্টিটুকুর উদ্দেশ্য শুধু শূন্যতে রূপান্তরিত হলো। চাপা, গম্ভীর কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা কথাগুলো বড্ড অমানবিক, শক্ত, পাষাণ্ড শোনাল –
‘চাচা – খারাপ পথে যে একবার হাঁটে তারে সারাজীবনের জন্য খারাপ পথেই হাঁটতে হয়। তার লইজ্ঞা আর কোনো বাছবিচার থাকে না। থাকলেও আমি করতে চাই না।’
নাসির শিকদার দৃষ্টি সরিয়ে এনে ফেললেন কাওসার আহমেদের মুখে। স্নেহের চোখে তাকানো বৃদ্ধার চোখে দৃঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে আওড়ালেন –
‘খারাপের মৃত্যু অনিবার্য না চাচা। খারাপের মৃত্যু তখুনি অনিবার্য হয় যখন সে ভালোর পথে আসতে চায়। চাচা, এই দুনিয়া ভালোর জন্য খারাপ আর খারাপের জন্য ভালো। আমি খারাপ, খারাপই থাকব।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কাওসার আহমেদ। অসহায় হয়ে বললেন –
‘এই গ্রামের জমিদার তুমি নাসির। আর কি চাও? এইবার তো সইরা আসো ওই আদিল মির্জার ছায়া থেইকা। শান্তরে নিয়া আসো। ওই..ওই লোক পাপিষ্ঠ, পাপের সাম্রাজ্য, পাপের রাজা স্বয়ং। কতো ভয়ংকর এই খেলা বুঝবার পারতেসো? ভয়ংকরী বিনাশ ওই মির্জার পাশে থাকলে নিশ্চিত।’
নাসির শিকদার অনেকক্ষণ একটা টু-শব্দ উচ্চারণ করলেন না। কাওসার আহমেদ যখন ভেবে নিলেন হয়তো-বা তার কথা গায়ে মেখে নিয়েছে তখুনি নাসির শিকদার আঁধার রাতের চেয়েও গভীর গলায় বললেন –
‘শিকদার বংশের র ক্তে বেইমানি লেখা নাই চাচা। আমাগো লইগা যে হাঁটু সমান নামে তাগো লাইগা গলা সমান নেমে যাওয়াই আমাগো র ক্ত বইতেসে। এই জীবনে যতদূর আগাইয়া আইছি তার পেছনে যে আছে, তার পেছনে আমরাও সারাজীবন আছি, থাকব চাচা।’
কাওসার আহমেদ চুপ করে গেলেন। আর একটা শব্দ বেরুলো না। ওসমান মির্জার চোখে শিকদার পরিবার পড়ার আগে দারিদ্র্যতায় কতটা ছটফট করেছে শিকদাররা সচক্ষে দেখেছিলেন তিনি। দেখেছিলেন ঔষধের অভাবে কীভাবে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন নাসির শিকদারের মরহুম পিতা রেদোয়ান শিকদার।
-
শান্তর মাথার র ক্ত তখনো টগবগ করছিল। রাগে আশেপাশে কোথাও তাকাচ্ছে না। ভীষণ স্পিডে ড্রাইভ করছে। অন্ধকার, নিরিবিলি রাস্তায় শুধু গাড়ির হেডলাইটের আলো পড়ছে। ডান হাতে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে, বাম হাতে একটা সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে গুঁজে অবশেষে তাকাল পাশে। ঝুমুর গাড়ির সাথে লেপ্টে আছে বধূ বেশে। মেকআপটা এখনো নড়চড় হয়নি। টিকলিটা কপালে দুলছে তালে তালে। গায়ে ভারি, কাজ করা লেহেঙ্গাটা ঝলমল করছে। এতসব ঝামেলা, টগবগিয়ে ওঠা কারণে সদ্য বিয়ে করা বউকে ভালোভাবে বুঝি মাত্রই দেখল শান্ত। ঝুমুর বিড়ালের মতন আড়চোখে চাইছিল এতক্ষণ। যেই শান্তকে ওমন দস্যু চোখে তাকাতে দেখল নড়েচড়ে বসল। বেশ সচেতন দেখাচ্ছে তাকে! শান্ত ডান ভ্রু তুলল। থমথমে গলায় প্রশ্ন করল –
‘ভয় পাচ্ছিস আমাকে? তোর স্বামীকে?’
ঝুমুর মাথা নাড়িয়ে বোঝাল, পাচ্ছে না ভয়। শান্ত অসন্তুষ্টই হলো –
‘মুখ নেই? মুখ খোল! এতো সুন্দর মুখ, এতো সুন্দর ঠোঁট –নাড়াবি না?’
ঝুমুর এবারে আস্তে করে বলল –
‘নানি আমাকে চুপচাপ থাকতে বলে দিছেন। আপনি নাকি খুব রেগে আছেন! বাধ্য থাকতে আমাকে।’
শান্ত আড়চোখে দেখল সুন্দর মুখখানি। নড়তে থাকা টকটকে লাল লিপস্টিকে সজ্জিত ঠোঁটে চেয়ে ঢোক গিলল অগোচরে। অন্ধকার রাস্তায় তাকিয়ে আওড়াল –
‘রাগলে স্বামীর রাগ কীভাবে ভাঙাতে হয় শেখাইনি তা?’
ঝুমুরের সরল মুখ থমকাল বুঝি। লজ্জায় আড়ষ্টও হলো। এলোমেলো দৃষ্টি লুকিয়ে উত্তর দিতে পারল না। শান্তর দৃষ্টি থমকে আছে। হাত দুটোও নড়ছে তো নড়ছে না। বড়ো করে শ্বাস টেনে নিয়ে গাড়িটা হঠাৎ করে থামাল নির্জন, ভূতুড়ে এই রাস্তার একপাশে। কানের ব্লুটুথ হঠাৎ নীল আলোয় জ্বলল। বলল –
‘শোন, আমার দুঘন্টা দেরি হবে ফিরতে।’
কথাটুকু বলে আর প্রত্যুত্তর শুনল না শান্ত। কানের ব্লুটুথ খুলে বন্ধ করে ফেলল কোথাও একটা। ঝুমুর সতর্ক চোখে তাকাতেও পারল না। প্রাকৃতিক বিনাশী ঝড় এসে পড়ল বুঝি তার ওপর। হামলে পড়া শরীরের ভার সামলাতেই হিমশিম খেতে হলো মিনিটখানেক। প্রলয়ঙ্কারী সিগারেটের গন্ধে ভাসা ঠোঁটদুটো যখন তেড়ে এসে ছুঁলো ঝুমুরের নরম, মিষ্টি ঠোঁটজোড়া সে শুধু পাথুরে রূপান্তরিত হয়ে থাকল। স্বামীর এহেন পাগলামির বিপরীতে প্রতিরোধ করতে পারল না দীর্ঘক্ষণ। যখন উত্তপ্ত, ভেজা ঠোঁটজোড়া মুক্তি পেলো আর্তনাদ করল মেয়েটা –
‘কী করছেন মাঝ রাস্তায়!!’
শান্তর পরনে বিয়ের সেই বিখ্যাত লুঙ্গিটাই। ওটার অবস্থা ভয়ানক। ঝুমুর আতঙ্কে নীল হয়ে গিয়েছে। শান্তকে ওমন হন্তদন্ত ভঙ্গিতে পরনের শার্ট খুলে ফেলতে দেখেই ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে গিয়ে পিঠ স্পর্শ করাল কাঁচে। শান্ত উদোম বুকে পুনরায় গায়ে পড়তেই ঝুমুর চেঁচাল –
‘মাথা খারাপ আপনার! সরুন।’
শান্ত মোটেও শুনল না। পুরুষালি দু-হাত ব্যস্ত হলো ঝুমুরের শরীরে। ঝুমুর চোখ বুজে থরথর করে কেঁপে প্রতিরোধ করতে গিয়ে তার নরম, তুলতুলে হাত চলল নিজের অজান্তেই। চড়ের শব্দটা পিনপতন নীরবতায় ঝাঁঝালো শোনালো বেশ। থমকাল নেশায় বুদ হওয়া শান্ত। তার দানবীয় শরীরটা একা স্তব্ধ হয়নি। ঝুমুর চড় মে রে দু-হাতে মুখ ঢেকে বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে আছে। কাঁপা কণ্ঠে আওড়াতে নিলো –
‘ভ..ভু….’
বলতে পারল না আর। শান্ত হঠাৎ করে শব্দ করে হেসে ফেলল। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে দেখল ঝুমুরের ভয়ার্ত মুখখানি। এইপর্যায়ে হাসতে হাসতে ফের ঝাঁপিয়ে পড়ল মেয়েটার ওপরে। মুখ ডোবাল ঝুমুরের গলার ভাঁজে ভাঁজে। কামড় বসাতে নিয়ে আওড়ে গেলো –
‘আমার বাঘিনী! যত ইচ্ছে মা র। আজকের জন্য সব মাফ।’
ঝুমুর ধরে আসা গলায় কোনোরকমে শান্তর মুখটা দু-হাতে ঠেলে সরাতে সরাতে বলে –
‘বা-বাড়ি চলুন —’
‘বাড়ি যেতে যেতে আমি ম রে যাবো।’
ঝুমুরের হাতটা বুকে চেপে ধরে বাদবাকিটুকু কথা ম রতে বসা নাবিকের মতন আওড়ায়, ‘দেখ, দেখ — শ্বাস নিতে পারছি না। দেখছিস? তুই কি বিধবা হতে চাস, হু? আমার লক্ষ্মীটা…স্বামীকে না করতে হয় না। পাপ লাগবে।’
ঝুমুর বলতে চাইল, ‘লাগুক পাপ’ তবে তা আর বলতে পারল কই?
–
প্রবেশদ্বারে আধুনিক লোহার ভারি, দীর্ঘতম, উচ্চতম দরজা দুধারে খুলে ধরেছে বডিগার্ডস। দৃষ্টির সামনে এলো সরু, পাথরের পথ। ড্রাইভওয়ের দু-পাশে আধুনিক ল্যাম্পপোস্ট। একেকটি ল্যাম্পপোস্টের মধ্যে স্থাপিত করা সবুজ গাছ। গাছগুলোর উচ্চতা ছোটো, পাতাগুলো গোল করে ট্রিম করে রাখা। ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয় জ্বলজ্বল করছে পুরোটা পথ। গাড়িগুলো প্রবেশ করল সারিবদ্ধ ভাবে। প্রত্যেকটা গাড়ি ঢুকতে দেরি, তবে দরজাটা বন্ধ করতে সময় নেয়া হয় না। কালো গাড়িটা সোজা এসে থেমেছে বাড়ির সামনে। গাড়ি থামতে দেরি, তিতান – থোরের ছুটে আসতে দেরি হয়নি। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ডেকে যাচ্ছে। গার্ডেন কেয়ারটেকার ইলিয়াস উদ্দিন এসে টেনে ধরেছেন দুটোকে। যেন অতি উত্তেজনায় আবার গায়ের ওপর না চড়ে যায়। ইতোমধ্যে এলেন ব্যাকসিটের ডোর খুলে ধরেছে। আদিল মেয়েকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসতেই দরজাটা লাগাল ফের। তিতান এসে শুয়ে পড়েছে আদিলের পায়ের কাছে। হৃদি মুগ্ধ চোখে দেখছে ওদের। কোল থেকে নামতে চাইলে আদিল নামাল মেয়েকে। হৃদি ঘাসের ওপরে হাঁটু গেড়ে বসে দু-হাতে ওদের আদর করে দিতে নিয়ে উজ্জ্বল চোখে তাকাল বাবার দিকে –
‘ড্যাড, দেখো তিতান – থোর আমাদের কত্তো মিস করেছে।’
আদিল মেয়ের পাশেই দুপায়ের পাতার মাথাটুকুতে ভর দিয়ে বসল। বুলিয়ে দিলো ওদের মাথা। বেশ আরামের সাথে আদর খাচ্ছিল কুকুর দুটো। আরও গভীর ভাবে মিশে যাচ্ছিল রুক্ষ, খসখসে হাতের তালুতে। ইতোমধ্যে সব বডিগার্ডস জড়ো হয়েছে চারিপাশে। একফাঁকে এসে দাঁড়িয়েছেন মরিয়ম বেগম, শাপলা বেগম এসে। আদিল মরিয়ম বেগমকে ইশারা করে বলে –
‘যাও, তোমার ন্যানির সাথে রুমে যাও। ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও।’
হৃদি ফিরে তাকাল গাড়ির দিকে, ‘হোয়াট এবাউট মম?’
মরিয়ম বেগম এগিয়ে এসেছেন। আলতোভাবে ধরেছেন হৃদির হাত। আদিল উঠে দাঁড়িয়েছে। মেয়ের মাথা বুলিয়ে বলে –
‘একটু পরে আসছে। ইউ গো ফার্স্ট, মাই চাইল্ড।’
হৃদি বাধ্য। মরিয়ম বেগমের সাথে প্রবেশ করেছে বাড়ির ভেতরে। চারপাশের বডিগার্ডস একত্রে ডেকে ওঠে –
‘বস!’
আদিল প্রত্যুত্তরে নাকমুখে শব্দ তোলে –
‘হুমমমম, অল ওকে?’
ওরা তালে তাল মিলিয়ে উচ্চস্বরে জানায় – ‘ইয়েসস, বস।’
আদিল ঘুরে দাঁড়াল। এলেন ইশারা বুঝে এলো কাছে। কান পাতল। আদিল প্রশ্ন করল, ভ্রু-দ্বয়ের মধ্যে চিন্তার ভাঁজ ফেলিয়ে –
‘ক্লান্ত, ধ্রুবের কী অবস্থা এখন? হসপিটাল যাবো।’
এলেন ঘড়িতে দৃষ্টি ফেলল। রাতের প্রায় বারোটা। সন্দিহান হয়ে বলে, ‘এখুনি?’
আদিল পরনের ভেস্ট খুলেছে। টাই লুজ করে কদম বাড়িয়েছে গাড়ির দিকে, ‘উইদিন থার্টি মিনিটস।’
এলেন ইতোমধ্যে হাতের ইশারায় সবকটাকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইশারা ছুঁড়েছে। তৎক্ষণাৎ সেনাবাহিনীর মতো সব একসাথে ঘুরে দাঁড়াল। টু-শব্দ হলো না এতে। আদিল ব্যাকসিটের ডোর খুলে ঝুঁকেছে অর্ধেক। রোযা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কোট-টা পুনরায় পড়েছে নিচে। চুলগুলো ছড়িয়ে আছে সিট জুড়ে। প্রথমে চুলগুলো বামহাতের মুঠোয় নিয়ে ঘাড় ধরল। ডান হাত গলাল হাঁটুর নিচে। পাতলা গড়নের শরীরটা তুলে বুকের কাছে নিতেই, রোযা ধড়ফড়িয়ে ওঠে। সদ্য ঘুম ভাঙা চোখজোড়া মেলে তাকিয়েছে সোজা আদিলের মুখে। বিভ্রমে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তবেই যেন মস্তিষ্ক সচল হয়। আদিল ততক্ষণে সোজা হয়ে, দৃঢ়… হিমালয়ের মতন অটল কদম বাড়িয়েছে সামনে। রোযার কণ্ঠ বসে গেছে। ভাঙা শোনাল –
‘নামান, পা ঠিকঠাক আছে আমার।’
আদিল তাকাল না ফিরে। থামাল না কদম। দুয়ারের সিঁড়ি গুলো বাইতে বাইতে ভীষণ সাবলীলভাবেই বলল –
‘পা ভেঙে দিতে হবে তবে?’
রোযা তাকাল, দেখল নির্বিকার মুখখানা। চোয়ালটা শক্ত হয়ে আছে। সবসময়ই থাকে। ধূসর চোখের আপাতত দৃষ্টি সামনে। রোযার চোখে ভাসল তার গলা চেপে ধরার দৃশ্যটুকু। চিনচিন করে উঠল গলাটা। মনে হচ্ছে এখনো দমবন্ধ হয়ে আসছে। মুহূর্তে ক্রোধে চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল –
‘বেশ, দিন। তবে হাত-পা ভাঙার হলে আমার জীবন নষ্ট করলেন কেনো? কেনো এনেছেন? আগেই মে রে ফেলতেন। আপনার শক্তির কাছে তো আমি পিপড়া মাত্র। প্রতিরোধ করার সামর্থ্য নগন্য আমার তো ছিলো না।’
আদিলের কদম থামল। দৃষ্টি ফেলল রোযার রাগান্বিত মুখে। চোখমুখ লাল হয়ে আছে। গলায় বসা পাঁচ আঙুলের দাগ আরও বাজেভাবে দৃশ্যমান। রোযা মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছে। আদিল থমথমে গলায় কেমন আদেশ করল –
‘দু-হাতে গলা জড়িয়ে ধরো।’
রোযা নামার জন্য ছটফট করে উঠল মুহুর্তে। হঠাৎ ওমন ধস্তাধস্তিও আদিলের কদম, বাঁধন হালকা করতে সক্ষম হলো না। একইভাবে চেয়ে থেকে পুনরায় বলল একই ভঙ্গিতে –
‘জড়িয়ে ধরতে বললাম তো রোজ-আ।’
রোযা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। সুন্দর চোখজোড়া র ক্তিম হয়ে আছে। সাপের মতো ফোঁসফোঁস করতেই আদিল ডান ভ্রু তুলে জানাল –
‘ওই ছেলেটার কি করলাম জানতে চাও না? আগ্রহ নেই? গলা জড়িয়ে ধরো।’
রোযা চোখ বুজল। আদিলের বুক ঠেলতে থাকা হাত দুটোকে তুলে এনে রাখল দুকাঁধে। ব্যস, ওতটুকুই। আদিল সন্তুষ্ট হয় না। নড়ল না, ফেরাল না দৃষ্টি। বলে গেলো –
‘জড়াও…’
রোযা দুহাতে জড়িয়ে ধরল গলাটা। সামান্য কাঁপল হাতজোড়া। আদিলের মুখটা ঝড়ের বেগে নামল তার গলার ভাঁজে। দাড়ি ঘষে দিল সংবেদনশীল ঘাড়ে। অজস্র ছোটো চুমু খেয়ে আওড়াল কদম বাড়াতে বাড়াতে –
‘বুদ্ধিমতী আছেন। জানেনই তো কেনো এনেছি। বোঝেন তো। এই রাজার রানি করে রাখতে এনেছি। রানি হয়ে থাকবেন, আমার সাম্রাজ্যের রানি। আমার, শুধু আমার রানি। এই আদিল মির্জার রানি।’
রোযা চোখজোড়া অসহায় ভাবে বুজে এলো। হৃৎপিণ্ডটা অজান্তেই লাফাতে লাগল পাগলের মতন। অনুভব করল, ও শ্বাস নিচ্ছে না অনেকক্ষণ! আদিলের গলা ধরা হাত দুটো ক্রমশ ভীষণ শক্তি নিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে। সিঁড়ি ধরেছে আদিল। সামনে না তাকিয়েই মেপে মেপে, ধীরেসুস্থে উঠছে একেকটা সিঁড়ি। দোতলার করিডর হেঁটে এসে থামল হৃদির রুমের সামনে। রোযাকে একহাতের ওপরে রেখে অন্যহাতে ডোরের নব ঘোরাল। মৃদু আলোয় হৃদিকে দেখা যাচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে বাচ্চাটা। আদিল প্রবেশ করল ভেতরে। রোযাকে হৃদির পাশেচ শুইয়ে দিয়ে ওপর থেকে তৎক্ষণাৎ ওঠে না। উবুড় হয়ে চেয়ে থাকে চোখ বন্ধ করে থাকা রোযার চোখমুখে। ডান হাতটা চলে গেলো গলাতেই। কী সহজে চিকন গলা পুরো এঁটে যাচ্ছে হাতের তালুতে! খসখসে তালুর চামড়া ঘষে, মুখ নিলো কানের কাছটায়। নাকমুখ ঘষে ভীষণ ধীর শব্দে জানাল –
‘আর কখনো যেন ওর নাম না শুনি তোমার মুখে। কানে যাচ্ছে কথা?’
রোযা চোখ মেলে তাকায়। নাক ফুলিয়ে বলে, ‘কী করবেন? পা ভাঙবেন আমার? গলা টিপে ধরবেন? মে রে ফেলবেন?’
আদিলের হাত চলল। পিনপতন নীরবতা ভাঙল থাপ্পড়ের স্পষ্ট শব্দে। আপত্তিকর সেই স্থানে পরপর দুবার আঘাত পড়তেই রোযা আঁতকে ওঠে। ঠোঁট নড়ে, চিৎকার করে পাল্টা আক্রমণ করতে চেয়েও পারে না। আদিল ভীষণ চতুরতার সাথে রোধ করে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ। রোযার নরমসরম হাত দুটো সযত্নে বাম হাতের মুঠোয় ভরে নিয়ে আওড়ায় আদিল –
‘যার জান ভিক্ষা চেয়ে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছো…ওকে জিন্দা মাটিতে পুঁতে ফেলব।’
_________
চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জা’স বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৩
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৩
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৯
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৫
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩২
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৭
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড— ৩৯