Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬০


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৬০]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় ।)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

রুমে না গিয়ে ডিরেক্ট স্টাডি রুমে এসেছে আফরিদ।

তার হাতে ছিল উষ্ণ সেঁক দেওয়ার হট প্যাক, ব্যথানাশক বাম ও কয়েকটি পেইন কিলার। মুখাবয়বে বিরাজমান ছিল অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য।

“এটা খেয়ে নাও।”

নিম্নস্বরে উচ্চারিত বাক্যের সাথে ওষুধটি ন্যান্সির দিকে বাড়িয়ে দিল সে। কোনো প্রতিউত্তর না করে নীরবে সেটি গ্রহণ করল ন্যান্সি।

পরক্ষণেই আকস্মিকভাবে ন্যান্সির পরিহিত হালকা গোলাপি আভাযুক্ত শাড়ির আঁচল টেনে ধরল আফরিদ। আচমকা ঘটনায় শিউরে উঠল মেয়েটি। বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে কড়া কণ্ঠে বলে উঠল,

“দেখুন, একদম সীমালঙ্ঘনের কথা ভাববেন না বলে দিচ্ছি!”

আফরিদের অধরে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল তীক্ষ্ণ, কৌতুকমিশ্রিত হাসি। সে আদতে কিছুই করবে না অন্তত নিজের মনকে সে তাই বোঝায়। তথাপি ন্যান্সিকে বিব্রত করার দুর্বিনীত আকাঙ্ক্ষায় সে মৃদুস্বরে বলল,

“শাড়ি পরে সামনে এসে দাঁড়াবি, আর আফরিদ এহসানের স্পর্শ এড়িয়ে যাবি। এত সহজ নাকি?”

বাক্যটি শুনে মুহূর্তেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ন্যান্সি। নিজের শাড়ি পরিধানের সিদ্ধান্তকেই যেন হঠাৎ ভীষণ ভুল মনে হতে লাগল তার। জ্ব’লে ওঠা দৃষ্টিতে তাকাল সে আফরিদের দিকে। কণ্ঠ কঠোর করে বলল,

“ফাজলামিরও একটা লিমিট থাকে, আফরিদ।”

“আমার নেই। আমি আনলিমিটেড।”

ন্যান্সি বাকরুদ্ধ। চক্ষু্দ্বয় ক্রোধা’গ্নিতে জ্বল’ছে।

“কিন্তু আমি মানি না!”

পরবর্তী মুহূর্তেই ঝড়ের ন্যায় দ্রুততায় এগিয়ে এল আফরিদ। বুকশেলফের সাথে ন্যান্সিকে আবদ্ধ করে ফেলল সে। ঘটনাটির আকস্মিক অভিঘা’তে সম্পূর্ণ হতবিহ্বল হয়ে পড়ল ন্যান্সি; তার নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতরেই থমকে

“আফরিদ, প্লিজ দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি অসুস্থ। এমনিতেই সমগ্র দেহযন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। সরে দাঁড়ান।”

কাতর অথচ বিরক্তিতে ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করল ন্যান্সি।

আফরিদ নির্বিকার ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোয়াল শক্ত করে অত্যন্ত স্থির স্বরে বলল,

“সরব না।”

মুহূর্তেই ক্ষোভে জ্ব’লে উঠল ন্যান্সি। অপমান, যন্ত্র’ণা ও রাগ মিলেমিশে তার কণ্ঠকে করে তুলল তীক্ষ্ণ ও কাঁপা।

“নির্দয় মানুষ! আমার সান্নিধ্যে এলে প্রাণটাই কেড়ে নেব আমি। স্পর্শ করার সাহসও দেখাবেন না!”

ন্যান্সির ক্রুদ্ধ উচ্চারণ শুনে আফরিদের অধরে ফুটে উঠল চাপা, বিপজ্জনক এক হাসি। নিম্ন অথচ প্রশান্ত কণ্ঠে সে বলল,

“একটু স্থির থাকিস তো। সবসময় এত ছটফট করিস কেন? চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।”

বাক্য সমাপ্ত করেই সে হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপর রাখা উষ্ণ হট প্যাকটি তুলে নিল। পরম সতর্কতায় সেটি ন্যান্সির ব্যথিত কোমরের কাছে চেপে ধরতেই আচমকা কেঁপে উঠল মেয়েটি। জ্বা’লাময় ব্যথার স্থানে উষ্ণতার স্পর্শ পেয়ে অবচেতন প্রতিক্রিয়ায় আফরিদের টি-শার্ট মুঠোবদ্ধ করে আঁকড়ে ধরল সে।

আফরিদ ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনল তার মুখের সন্নিকটে। নাকের অগ্রভাগ স্পর্শ করল ন্যান্সির নাক। মুহূর্তেই শিহরণ বয়ে গেল মেয়েটির সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। ভারী হয়ে এলো তার আঁখিপল্লব; নিঃশ্বাস হয়ে উঠল অস্থির।

আফরিদ কর্কশ তবে কিছুটা মাদকতাময় স্বরে ফিসফিস করে বলল,

“আজ শাড়িটা পরার প্রয়োজন কী ছিল? আমাকে হৃদরোগে আক্রান্ত করার পরিকল্পনা করেছিস নাকি? তোকে দেখার পর থেকেই প্রেসার স্বাভাবিক নেই শেষপর্যন্ত এভাবেই মৃত্যু’দণ্ড দিতে চাস আমাকে?”

সে আরও ঝুঁকে এল, দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল ন্যান্সির কাঁপতে থাকা মুখাবয়বে।

“বল, কেন পরেছিলি শাড়ি?”

মুদিয়ে আঁখি জোড়া মেলে তাকাল ন্যান্সি। ফাঁকা ঢোক গিলে নীলাভ চোখের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল।

“শাড়ি কেন পরে মেয়েরা?”

আফরিদ মুচকি হাসে, প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন ইশ্ বউটা তার চালাক হয়ে গেছে!

কদর্য হেসে বলল আফরিদ।

“মেয়ে মানুষ দুটো কারণে শাড়ি পরে। এক মন ভালো থাকলে, ফুরফুরে থাকলে। আর দুই স্বামী কে খুশি করতে। এখন আমি শিওর তুই আমাকে খুশি করতে অবশ্যই শাড়ি পরিসনি। তবে কি মনটা ভালো তাই? ইশ্ কাল রাতে না তোকে আদর করলাম সেই কারণে মন ভালো?”

চোখ সংকুচিত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ন্যান্সি। মুখাবয়বে বিরাজ করছিল দমিত বিরক্তি। গুরুগম্ভীর স্বরে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,

“আপনার সোহাগে বিমোহিত হয়ে শাড়ি পরার মতো ইচ্ছে কিংবা শখ কোনোটাই আমার নেই।”

আফরিদের ওষ্ঠপ্রান্ত সামান্য বেঁকে উঠল। কৌতুকমিশ্রিত সেই হাসিতে যেন দম্ভের ছায়া স্পষ্ট। সে ধীরে ধীরে হট প্যাকটি কোমরের ডান পাশে চেপে ধরে নিম্নস্বরে বলল,

“তাহলে কি ধরে নেব, আমাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন?”

ন্যান্সি মুহূর্তেই জ্বলে উঠল। ক্ষোভে তার কণ্ঠ আরও কঠোর হয়ে উঠল।

“আপনাকে খুশি করার কথা আমি জীবনে কল্পনাও করব না। বরং আপনি এমন এক ভাইরাস, যে মানুষের সুখটুকুও গ্রাস করে নেয়।”

আফরিদ আরও খানিকটা ঝুঁকে এলো। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল ন্যান্সির উত্তপ্ত, লালাভ গালে। পরক্ষণেই দাঁতের হালকা স্পর্শ রেখে অত্যন্ত নিম্ন, কর্কশ স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল এমন এক স্বরে, যা কেবল ন্যান্সির কর্ণগোচর হওয়ার জন্যই উচ্চারিত।

“তুই-ই আমার অস্তিত্বের একমাত্র সম্বল

তোর অনুপস্থিতিতে আমি নিঃস্ব, শূন্যতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত এক প্রাণ।

এই গভীর সত্যটুকু কি কখনো অনুভব করিস? অর্থ বুঝিস? হুঁ বুঝিস?”

ন্যান্সি নির্বাক। হ্যাঁ সে বুঝে তো। আফরিদের জন্য ন্যান্সির গুরুত্ব ঠিক কতখানি!

“আমি সত্যিই ভাইরাস ভয়ংকর এক ভাইরাস। তবে অন্য কারও নয় ,ধীরে ধীরে শুধু তোর ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ছি আমি।”

ন্যান্সি দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস টেনে নিল। আফরিদের উষ্ণ নিশ্বাস যেন অজান্তেই নিজের মধ্যে গ্রহণ করে নিচ্ছিল সে। বাহ্যিকভাবে অনুভূতিশূন্য দেখালেও অন্তর্গত স্তব্ধ অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল; জমাটবাঁধা আবেগ অশ্রুরূপে চোখের কিনারা বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল।

আফরিদ তা লক্ষ্য করল। তবুও কোনো মন্তব্য করল না। নীরবে হট প্যাকের উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল ন্যান্সির কোমরের চারপাশে।

তার মনে এক অদ্ভুত আত’ঙ্ক দানা বাঁধল। তার জানকি সত্যিই অসুস্থ। আর সেই কারণেই আফরিদ এহসান আজকাল স্পর্শ করতেও ভয় পায়। যদি তার পাপমাখা স্পর্শে এই নিষ্পাপ, পবিত্র সত্তাটি একদিন ঝরে যায়?

তাহলে কাকে ঘিরে উ’ন্মাদ হবে সে? কাকে ‘মাতারি’ ‘বান্দি’ বলে বিরক্ত করবে অবিরত?

কণ্ঠের দৃঢ়তা খানিকটা নরম হয়ে এলো তার।

“খুব ব্যথা করছে?”

আফরিদের কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট থাকলেও ন্যান্সি নীরবই রইল। ধীরে ধীরে তার হাত সরিয়ে নিল নিজের কাছ থেকে। আফরিদও বাধা দিল না; সরে দাঁড়িয়ে পথ করে দিল।

দু’পা এগোতেই কাইট্যানকে দেখতে পেল ন্যান্সি। মুহূর্তেই ঝুঁকে বিড়ালছানাটিকে কোলে তুলে নিল সে।

দৃশ্যটি দেখে আফরিদের কপালের মাঝখানে বিরক্তির ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠল। অত্যন্ত অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

“আমার বাবুটাকে কোলে নেওয়ার কথা, আদর চাওয়ার কথা। তা না করে সারাক্ষণ ওই বিড়ালের বাচ্চা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ধ্যাত!”

ন্যান্সি এক নিমেষে রঙ বদলে ফেলল। যেন মুহূর্তে মুহূর্তে রূপান্তরিত হওয়া কোনো গিরগিটি। আফরিদ সিগারেট ধরালো। সেটাই ঠোঁটে গুঁজে দুবার টান দিলো।

আফরিদ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর হঠাৎই অত্যন্ত নিচু, মগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল,

“এভাবে তাকাস না, পুরো শরীরের সিস্টেমে যেন কারেন্ট লাগে।”

ন্যান্সি ‘চ’ বর্গীয় শব্দে বিরক্ত প্রকাশ করলো। কাউচের উপর গিয়ে বসতেই টের পেলো রুম জুড়ে আফরিদের পারফিউমের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে। লম্বা একটা নিঃশ্বাস টানলো ন্যান্সি। ঘ্রাণ টা অন্য রকম। কাইট্যানের পিঠে হাত বুলাতে ব্যস্ত ন্যান্সি।

ইদ্রান নেই এই বাড়িতে ,ওর থাকাটা খুব প্রয়োজন এই মূহুর্তে! ইদ্রানের থেকে ট্যাটু সম্পর্কে জানা টা দরকার। না হলে সে আগুন্তক কে খুঁজবে কি করে?

“পায়ে খুব ব্যথা করছে?”

আচমকাই ন্যান্সির দু’পা টেনে এনে নিজের কোলে স্থাপন করল আফরিদ। ঘটনাটির আকস্মিকতায় সামান্যও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করল না ন্যান্সি; বরং নিরাবেগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

আফরিদ ধীরস্থির ভঙ্গিতে সিগারেটে পরপর দু’বার টান দিল। অতঃপর জ্ব’লন্ত অংশটিকে পায়ের নিচে নির্মমভাবে পিষে ফেলে ধোঁয়া ছেড়ে দিল নাক ও ওষ্ঠপথে। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল ন্যান্সির মুখাবয়বে।

“কিছু জিজ্ঞেস করলাম। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিস না?”

ন্যান্সি এবারও নীরব।

আফরিদ গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে তার পায়ের উপর হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। কখনো ডান পা, কখনো বাম অত্যন্ত সতর্কতায় আঙুলের চাপ প্রয়োগ করে ব্যথিত অংশ টিপে দিচ্ছিল সে। তার আচরণে ছিল অদ্ভুত এক সংযমী কোমলতা, যা তার স্বভাবসিদ্ধ নিষ্ঠুরতার সঙ্গে বেমানান।

স্টাডি রুমের পাশ দিয়ে কফির কাপ হাতে অতিক্রম করছিল স্মাইলি। অন্যমনস্ক দৃষ্টি হঠাৎ কক্ষের অভ্যন্তরে স্থির হতেই বিস্ময়ের তীব্র অভিঘা’তে থমকে দাঁড়াল সে।

মাফিয়া কিং আফরিদ এহসান নিজের স্ত্রীর পা টিপে দিচ্ছে?

চোখকে যেন বিশ্বাসই করাতে পারছিল না স্মাইলি। হতবুদ্ধির মতো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ভেতরের দৃশ্যপটে। ঠিক সেই সময় করিডোর অতিক্রম করছিল তিতলি। স্মাইলিকে এভাবে থমকে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে?”

স্মাইলি নির্বাকভাবে স্টাডি রুমের দিকে ইঙ্গিত করতেই তিতলির অধরে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

“এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আফরিদ ভাই এমনই। ইলহাম আপুকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। আপুর সামান্য কষ্টও সহ্য করতে পারে না।”

স্মাইলি ধীরে ধীরে দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল তিতলির দিকে।

তিতলি পুনরায় বলল,

“ঈশান বলেছিল, পৃথিবীর সবার কাছে আফরিদ ভাই যতটা ভয়ংকর, ইলহাম আপুর কাছে ঠিক ততটাই শিশুসুলভ। সারাক্ষণ আপুকে জ্বা’লাতন করে, খুনসুটি করে। কিন্তু আপুর জন্য পুরো পৃথিবী উল্টে ফেলতেও একবার ভাববে না।”

স্মাইলির চোখে তখন অদ্ভুত এক মুগ্ধতা। অত্যন্ত মৃদুস্বরে সে বলল,

“খুব ভালোবাসেন উনি।”

তিতলির হাসি আরও প্রসারিত হলো।

“হ্যাঁ, ভীষণ ভালোবাসে। রোমিও-জুলিয়েটকে আমি কখনো দেখিনি, কিন্তু আফরিদ আর তার অ্যাঞ্জেলিনাকে দেখেছি। যারা একে অপরকে নিঃশব্দে ভীষণ ভালোবাসে। ইলহাম আপু হয়তো মুখে স্বীকার করে না, কিন্তু মনের গভীরে ঠিকই ভালোবাসে ভাইয়াকে।”

স্মাইলি ক্ষীণ হাসল।

“আমারো এমন ভালোবাসা প্রয়োজন।”

আপন মনে বিড়বিড় করল তবে তা শুনতে সক্ষম হয়নি তিতলি।

তিতলি তখন হাতে ধরা ছোট্ট বোয়ামটি সামলে নিয়ে বলল,

“চলো, এবার ঘুমিয়ে পড়ো।”

“আর ওরা?”

তিতলি ওষ্ঠ বাঁকিয়ে দুষ্টু হাসল।

“ওদের ঘুমোতে এখনো অনেক দেরি। ভাইয়া আর কতক্ষণ জ্বা’লাবে, সেটা আল্লাহই জানেন। তুমি বরং গিয়ে ঘুমাও।”

কথা শেষ করেই তিতলি ধীর পদক্ষেপে সরে গেল সেখান থেকে।

স্মাইলি তৃতীয়বারের মতো দৃষ্টি ফেরাল স্টাডি রুমের অভ্যন্তরে।

ভাবতেই বিস্ময় জাগে এই মেয়েটিই নাকি একসময় তার বডিগার্ড ছিল! আফরিদ এহসানের প্রাণপ্রিয় মানুষ, তার সাম্রাজ্যের একমাত্র রানী সেই ইলহামই একদিন স্মাইলির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। জীবন সত্যিই বিস্ময়কর বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ।

🌿________________🌿

“তুই কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসিস না, জানকি বাচ্চা?”

নিম্ন, ভারাক্রান্ত কণ্ঠে প্রশ্নটি উচ্চারণ করল আফরিদ। বাক্যের শেষপ্রান্তে এসে সে ধীরে ধীরে ন্যান্সির পায়ের পাতায় ওষ্ঠ স্পর্শ করাল। স্পর্শটুকু ছিল আশ্চর্যরকম কোমল, অথচ তার অন্তর্গত আকুলতা ছিল ভয়াবহ গভীর।

এতক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও এবার চোখ ফিরিয়ে নিল ন্যান্সি। মুখাবয়ব নিস্তেজ, অনুভূতিহীন।

আফরিদ তার উত্তরের প্রতীক্ষায় রইল। ন্যান্সি পা সরিয়ে নিতে চাইলে বুঝতে পারল, আফরিদের আঙুলের দৃঢ় আবরণ এখনো তাকে আটকে রেখেছে।

অবশেষে অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ন্যান্সি মলিন কণ্ঠে বলল,

“আপনাকে ভালোবাসার মতো কী করেছেন আপনি এখন পর্যন্ত?”

প্রশ্নটি শুনে আফরিদ স্তব্ধ হয়ে গেল না; বরং অপলক তাকিয়ে রইল তার জানকির মুখপানে। সেই দৃষ্টিতে ছিল নিঃশব্দ ক্লান্তি, দহন আর অস্বীকারহীন আসক্তি।

ন্যান্সি পুনরায় বলল,

“আপনার আর আমার মিলন কোনোদিনও সম্ভব নয়। আপনি একজন অপরাধী। একজন কলুষিত মানুষ। মাফিয়া। মাফিয়ারা কী ভয়ংকর কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকে, আমি সম্পূর্ণ জানি না। আর জানতে চাইও না। কারণ জানলে হয়তো আপনার প্রতি আমার ঘৃণাটুকুও বহুগুণ বেড়ে যাবে।”

আফরিদের অধরে তখন ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে বিদ্রূপের চেয়ে বেশি ছিল ক্লান্ত স্বীকারোক্তি।

“মিলন তো বহুবারই ঘটেছে তোর আর আমার মধ্যে।”

ন্যান্সি কিছুক্ষণ নীরব রইল। এদিকে আফরিদ এখনও তার পায়ের পাতায় নিবিড়ভাবে চুম্বন এঁকে চলেছে।

ন্যান্সি কোলে থাকা কাইট্যানের গালে স্নেহভরা হাত বুলিয়ে অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে বলল,

“শুধুমাত্র দেহের মিলনে কী আসে যায়, যদি দু’টি আত্মার ঐক্যই না ঘটে?”

বাক্যটি শুনে আচমকাই চোখ তুলে তাকাল আফরিদ। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো ন্যান্সির মুখে যেখানে নির্লিপ্ততার আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর অবসাদ।

পরবর্তী মুহূর্তেই আফরিদ ন্যান্সির পা ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর এক টানে কাইট্যানসহ ন্যান্সিকে নিজের বক্ষে তুলে নিল।

তার কণ্ঠ এবার ভারী, রুক্ষ এবং নির্মম সত্যে পরিপূর্ণ।

“মনের মিলন কোনোদিন হবে না সেটা আমি জানি। কিন্তু তোকেও ছাড়া আমার অস্তিত্ব অচল, এটাও জানি। তাই আপাতত এই দেহগত নৈকট্যটুকুই থাক।”

ন্যান্সি নির্বাক। আফরিদ ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনল। সিগারেটের দগ্ধ গন্ধমাখা পুরুষালী ওষ্ঠ স্পর্শ করল ন্যান্সির নরম কপাল। চুম্বনটি ছিল অদ্ভুতরকম দীর্ঘ, যেন এক ক্লান্ত আত্মার নিঃশব্দ প্রার্থনা। অতঃপর অত্যন্ত মৃদু, ভাঙা স্বরে সে উচ্চারণ করল,

“তোকে ভালোবাসি, পরাণ।”

ন্যান্সি সামান্য হাসলো বোধহয়। আফরিদ খৈ হারালো, গুনগুন করে গেয়ে ওঠে।

বলতে গিয়ে মনে হয়

বলতে তবু দেয় না হৃদয়

কতটা তোমায় ভালোবাসি।

একটু থেমে করিডোরের দিকে অগ্রসর হয় আফরিদ, ন্যান্সি গলদেশ আঁকড়ে ধরে তার! আফরিদ গুনগুন করে মাঝখানের আরো কয়েকটি প্যারা খেয়ে উঠল,

মেঘের খামে আজ তোমার নামে

উড়ো চিঠি পাঠিয়ে দিলাম

পড়ে নিও তুমি মিলিয়ে নিও

খুব যতনে তা লিখেছিলাম

মেঘের খামে আজ তোমার নামে

উড়ো চিঠি পাঠিয়ে দিলাম

পড়ে নিও তুমি মিলিয়ে নিও

খুব যতনে তা লিখেছিলাম

ও চায় পেতে আরো মন

পেয়েও এত কাছে

🌿____________🌿

বাইরের নির্জন আউটহাউজের দিকে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেল তিতলি। চারপাশে গভীর নৈঃশব্দ্যের আবরণ; দূরবর্তী বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব যেন অনুভূত হচ্ছিল না।

কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই দৃষ্টিগোচর হলো বিছানার উপর আধশোয়া অবস্থায় রয়েছে ঈশান। মুখাবয়বে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। শরীরের অবস্থা যে ভীষণ শোচনীয়, তা চোখে পড়ার মতোই স্পষ্ট। আফরিদ বহুবার ডক্টরের শরণাপন্ন হতে বলেছিল তাকে, কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ অবহেলায় প্রতিবারই বিষয়টি এড়িয়ে গেছে ঈশান। মুখে “আমি ঠিক আছি” বললেও দেহের প্রতিটি পেশিতে ব্যথার নিষ্ঠুর অভিঘাত সে আর সহ্য করতে পারছিল না।

দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বলল তিতলি,

“ভেতরে আসব?”

তিতলির কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই তৎক্ষণাৎ উঠে বসল ঈশান। ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

“এসো।”

তিতলির হাতে ছোট্ট একটি ওয়েন্টমেন্টের কৌটা। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে ঈশানের সম্মুখে বসল।

“শুনলাম আপনি নাকি অসুস্থ?”

ঈশান নিঃশব্দে মাথা দোলাল।

তিতলি আর দেরি না করে শান্ত কণ্ঠে বলল,

“শুয়ে পড়ুন। আমি হাত-পা টিপে দিচ্ছি।,

বাক্যটি শোনা মাত্র ঈশানের চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। যেন ভয়াবহ কোনো প্রস্তাব শুনেছে সে। পরক্ষণেই দ্রুত শরীর সরিয়ে দূরে সরে গিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল,

“এই যে! রংপুরের ধূর্ত কন্যা, আমার সম্ভ্রম লুণ্ঠনের পরিকল্পনা চলছে নাকি?”

ঈশানের কথায় মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে গেল তিতলি। চোয়াল সামান্য ঝুলে এলো তার। বিরক্ত ও বিস্মিত স্বরে বলল,

“আপনার মধ্যে এমন কী অমূল্য সম্পদ আছে যে আমি তা লুট করতে আসব?”

ঈশান সঙ্গে সঙ্গে গর্বোদ্ধত ভঙ্গিতে বুক সোজা করল। মুখাবয়বে আত্মতৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট।

“আছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বস্তু আছে। যেটা ছাড়া তোমাদের মতো দুআঙুল সমান ক্ষুদ্রকায় মেয়েদের কোনো মূল্যই থাকে না!”

তিতলি মুহূর্তের মধ্যে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর বি’ষমাখা মিষ্টি কণ্ঠে বলল,

“ক্ষেত চাষ করতে হলেও কিন্তু শেষমেশ সেই জমিতেই নামতে হয়। তেমনি আপনার সেই ‘অমূল্য সম্পদ’ও শেষ পর্যন্ত কোনো নারীর কাছেই সমর্পণ করতে হয়। গণ্ডার স্বভাবের মানুষ একটা! আপনার জন্য চিন্তা করতেই আসা উচিত হয়নি আমার।”

চলবে…………।😂

(📌সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করবেন, ভালো খারাপ দুটো দিক জানাবেন। শুধরে নেব।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply