Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৫১


#অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

#নুসাইবা_ইভানা

#পর্ব -৫১

বিকেলের আকাশটা আজ অদ্ভুত রকম সুন্দর। গোধূলির সোনালী আভায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। হালকা বাতাসে বারান্দার সাদা পর্দাগুলো উড়ছে। নয়না আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মুচকি হাসি। জীবনে এতদিন পর যেন সত্যি সত্যিই সুখ নামের অনুভূতিটা ধরা দিয়েছে তার কাছে। সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।

হঠাৎ পেছন থেকে দুটো হাত এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। নয়না আয়নায় তাকিয়েই মুচকি হেসে বলল, “মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন? আপনি না আমার প্রতি ভীষণ রেগে আছেন?”

জিয়ান মাথা নামিয়ে নয়নার কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল, “আজ পৃথিবীর সব কাজ বাদ দিয়েও তোমার কাছে আসতে ইচ্ছে করছিল।”

নয়না ধীরকণ্ঠে বলল, “এত খুশি?”

জিয়ান নয়নার পেটের দিকে তাকিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। খুব যত্ন করে হাত রাখল নয়নার পেটের ওপর; তারপর ফিসফিস করে বলল, “এই ছোট্ট মানুষটার জন্য আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বাবা হতে চাই। এই মানুষটা আমাদের পূর্ণ করতে আসছে। আমি স্বামী হিসেবে হয়তো অতটা ভালো না, তবে আমি কথা দিচ্ছি সুনয়না—আমি পিতা হিসেবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পিতা হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”

নয়নার চোখ ভিজে উঠল। মৃদু কণ্ঠে বলল, “আর আমার জন্য?”

জিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলল, “তোমার জন্য আমি পাগল প্রেমিক হতে চাই, যে তোমায় উন্মাদের মতো ভালোবাসবে।”

নয়নার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই জিয়ান নিজের হাতে তা মুছে দিল। এত সুন্দর মুহূর্তগুলোও বোধহয় মানুষকে কাঁদিয়ে দেয়। নয়নার কপালে চুমু দিয়ে সে বলে, “এখন সময় মন খুলে হাসার, কান্নার কোনো অপশন নেই ‘বাটার মাশরুম’। ইশশ, আমার বাটার মাশরুমের কোল জুড়ে একটা মিষ্টি পরী থাকবে—ভাবতেই ভালো লাগা ঘিরে ধরছে।”

🌿

রাতে সবাই একসাথে ডাইনিং টেবিলে খাবার খেতে বসেছে। বহুদিন পর বাড়ির পরিবেশে খানিকটা স্বাভাবিকতা ফিরেছে। জারিফ নিজের হাতে ভাত খেতে খেতে হঠাৎ বলল, “দাদু, আমার একটা বোন হবে তুমি কি জানো?”

সবাই অবাক হয়ে তাকাল। জিয়ান মুচকি হাসছে। সন্ধ্যায় সে জারিফকে বলেছিল যে তার জন্য একটা বোন কিনে আনবে।

নাজিম চৌধুরী বললেন, “দাদুভাই, কে বলেছে তোমাকে এই কথা?”

“পাপা বলেছে পরীর মতো একটা বোন এনে দেবে আমায়।”

নয়না লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। মিতা বেগম বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, “সুনয়না, এটা কি সত্যি?”

জিয়ান মুচকি হেসে নয়নার হাত ধরে বলল, “আমাদের পরিবারে নতুন অতিথি আসছে আম্মু।”

কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ হয়ে গেল। মিতা বেগমের চোখ ভিজে উঠল। কম্পিত কণ্ঠে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ।” এরপর উঠে এসে নয়নার মাথায় হাত রাখলেন। “এত বড় সুখের খবর এতদিন আমার কাছ থেকে লুকিয়ে কেন রাখলি মা?”

নয়না নরম কণ্ঠে বলল, “নিশ্চিত না হয়ে বলতে চাইনি আম্মু।”

জারিফ হঠাৎ চেয়ার থেকে নেমে নয়নার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। “আম্মি, তোমার বেবি কি আমাকে ভালোবাসবে?”

নয়না জারিফকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে তোমাকে।”

জারিফের পাকা কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল। দূরে দাঁড়িয়ে মেহনুর সবকিছু দেখছিল। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত জ্বালা করছে। তার মনে হচ্ছিল এই সুখটা তার হওয়ার কথা ছিল—এই পরিবার, এই ভালোবাসা, এই পূর্ণতা সবকিছু।

জারিফকে নয়নার কোলে হাসতে দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে হঠাৎ কঠিন গলায় বলল, “জারিফ, এখানে কী করছ? আমার কাছে এসো। এত পাকা পাকা কথা তোমাকে কে শিখিয়েছে?”

জারিফ ভড়কে গেল। ধীরে ধীরে নেমে এসে মেহনুরের কাছে দাঁড়াল। মিতা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন, “বাচ্চাটাকে সবসময় এত ভয় দেখাস কেন? ছোট মানুষ, অতোশত বুঝে তো আর বলেনি।”

মেহনুর কোনো উত্তর দিল না। শুধু জারিফের হাত শক্ত করে ধরে নিজের রুমে চলে গেল।

🌿

রাতে জারিফ ঘুমিয়ে পড়ার পর মেহনুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ দুটো লাল। সেই কখন থেকে কান্না করেই যাচ্ছে। ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো যেন ধীরে ধীরে তাকে শেষ করে দিচ্ছে।

পেছন থেকে জিয়ান এসে দাঁড়াল। “তুমি কি কোনোদিন নিজেকে শান্তি দিতে পারবে না মেহনুর?”

মেহনুর তিক্ত হেসে বলল, “শান্তি? আমার জীবনে সেই শব্দটার অস্তিত্ব নেই।”

“তুমি নিজেই নিজের জীবনটা বিষাক্ত করে ফেলছ, সাথে জারিফকেও কষ্ট দিচ্ছ। ও বাচ্চা মানুষ; প্লিজ নিজেকে ভালো রাখো জারিফের জন্য।”

“আমার জন্য ভালো থাকা অসম্ভব, কারণ আমি সব হারিয়েছি!”

জিয়ান বলল, “না, তুমি এখনো অনেক কিছু পেয়েছ। জারিফ আছে, পরিবার আছে। আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।”

মেহনুর ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আর তুমি? তুমি কি আছ?”

জিয়ান থেমে গেল।

মেহনুর ভাঙা কণ্ঠে বলল, “আমি চেষ্টা করেছিলাম তোমাকে ভুলে যেতে, পারিনি। তারপর জাহিনকে মেনে নিতে চেয়েছিলাম, সেখানেও ব্যর্থ হয়েছি। এখন প্রতিদিন তোমাকে আর সুনয়নাকে একসাথে দেখে মনে হয় আমি বেঁচে থেকেও মৃত। আমিও তো এমন একটা জীবন ডিজার্ভ করি। আমিও চাই কেউ আমাকে এভাবে ভালোবাসুক, এভাবেই আগলে রাখুক।”

জিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ভালোবাসা কখনো জোর করে পাওয়া যায় না মেহনুর। আর না পাওয়ার কষ্ট আঁকড়ে ধরে বাঁচলেও জীবন থেমে থাকে না। বরং জীবন যখন যেমন, সেভাবেই মানিয়ে নিয়ে চলতে পারলেই জীবন সহজ।”

মেহনুরের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। “কিন্তু আমি যে আর পারছি না। বড্ড ক্লান্ত আমি।”

জিয়ান ধীরে বলল, “নিজের জন্য না হলেও জারিফের জন্য ভালো থাকার চেষ্টা করো। তোমার কষ্ট একদিন ওর শৈশবটাও কেড়ে নেবে। নয়তো তুমি লন্ডন শিফট হও, তোমার জন্য ভালো হবে। জারিফকেও সেখানে স্কুলে ট্রান্সফার করে নাও। ছুটিতে ছুটিতে আসবে বাংলাদেশ। লন্ডনে আমাদের যে বিজনেস আছে সেটার দেখাশোনার দায়িত্ব তুমি পালন করবে। ভেবে দেখো তুমি কোনটা চাও—একই ছাদের নিচে অন্যের ভালো থাকা দেখে নিজেকে কষ্ট দিয়ে শেষ করবে নাকি ছাদ ভিন্ন করবে।”

মেহনুর কিছু বলল না, শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো সে নিজেও জানে তার ভেতরের অন্ধকারটা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। সব জেনেও সে যেন কিছুই মেনে নিতে পারছে না। জিয়ান চলে এল নিজের রুমে।

নয়না জিয়ানের হাতের ওপর হাত রেখে বলে, “বেশি টেনশন করতে হবে না। মেহনুর একটু বদমেজাজি তবে মনটা খারাপ না।”

জিয়ান নয়নার কোলে মাথা রেখে নয়নার কোমর জড়িয়ে ধরে বলে, “তুমি এত ভালো কেন? আমি যেন প্রতি মুহূর্তে নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ি। কত ভাগ্য করে এমন একজন জীবনসঙ্গিনীকে অর্ধাঙ্গিনী রূপে পাওয়া যায়! আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি সুনয়না। যতটুকু প্রকাশ করি আর যতটুকু প্রকাশ করতে পারি না—সবটা জুড়েই তোমার জন্য ভালোবাসা। তুমি মানুষটাই এমন যে তোমার প্রতি ভালোবাসা কেবল বাড়তেই থাকে।”

“হয়েছে, এত বেশি বেশি বলতে হবে না। আমি শুধু চাই বাকিটা জীবন তুমি ঠিক এভাবেই আমার হয়ে থেকে যাও। আমাদের মধ্যে আর কোনো দূরত্ব, আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি যেন না আসতে পারে।”

জিয়ান নয়নার পেটের ওপর আলতো করে চুমু দিয়ে বলে, “মৃত্যু ব্যতীত আর কোনো কিছু আমাকে তোমাদের থেকে আলাদা করতে পারবে না।”

🌿

অন্তর নিজের রুমে একা বসে আছে। সামনে ছড়িয়ে আছে কিছু পুরনো ছবি। একটা ছবিতে জাহিন হেসে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। এমন অগণিত স্মৃতি জড়ানো ছবি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তার সামনে।

অন্তর ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুই কেন চলে গেলি জাহিন? আমাকে অপরাধী করে কেন চলে গেলি না ফেরার দেশে? সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি নিজেকে কীভাবে ক্ষমা করব? নিজের দৃষ্টিতে আমি নিজে একজন খুনি।”

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনা নিঃশব্দে কাঁদছে। মানুষটা তার এত কাছে থেকেও কত দূরে! ইচ্ছে করছে অন্তরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে, কিন্তু অধিকারের জায়গা কেমন নড়বড়ে।

হয়তো কিছু সম্পর্ক একই ছাদের নিচে থেকেও কোনোদিন এক হয় না। হয়তো কিছু মানুষ সারাজীবন ভালোবাসা খুঁজেই যায়, কিন্তু ভালো থাকা আর খুঁজে পায় না। তবুও ধীরপায়ে এগিয়ে গেল অন্তরের কাছে, তারপর বসে পড়ল অন্তরের মুখোমুখি।

অন্তর মুহূর্তেই জড়িয়ে ধরল নীলাঞ্জনাকে। কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। নীলাঞ্জনা নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে শুষে নিতে চাইছে অন্তরের দুঃখগুলো।

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply