Golpo romantic golpo অর্ধাঙ্গিনী গল্পের লিংক সিজন ২

অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৬


অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)

নুসাইবা_ইভানা

পর্ব -৪৬

বিকেলের দিকে হালকা ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। নয়না একটু শীত শীত অনুভব করছিল। জিয়ানকে বলল, “চলো, এবার ফিরে যাই। আজ রাত ক’টায় ফ্লাইট?”

জিয়ান নিজের শার্ট খুলে নয়নার কাঁধে জড়িয়ে দিল। “আজ রাত সাড়ে ন’টায়। যাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন! আমার তো ইচ্ছে করছে এখানেই থেকে যেতে। চলো না, বাকিটা জীবন এভাবেই কাটিয়ে দেই দু’জনে।”

“তুমি কি জানো, মেয়েমানুষের শান্তি কীসে?”

“তুমি জানালেই তো হয়।”

“সংসারে। মেয়েমানুষ গুছিয়ে সংসার করতে ভালোবাসে। আমি সবাইকে ছেড়ে এভাবে ভালো থাকতে চাই না। আমি সবাইকে নিয়ে একসাথে সুখে-দুঃখে ভালোবেসে ভালো থাকতে চাই। আমি আমার পূর্ণ সংসার চাই।”

জিয়ান নয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যতটা সুন্দর, তার চেয়ে বেশি সুন্দর তোমার চিন্তাধারা। তুমি খুব ভালো মনের একজন মানুষ। আল্লাহ তায়ালার কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া, তোমার মতো একজন অর্ধাঙ্গিনীকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।”

নয়না কথা ঘুরিয়ে বলল, “তোমার ঠান্ডা লাগবে না?”

জিয়ান এক চোখ টিপে বলল, “আমি তো উষ্ণ মানুষ। আবার এমন হট স্পাইসি বউ কাছাকাছি থাকলে দেহমন জুড়ে এক হাজার ডিগ্রির তাপমাত্রা শরীর জুড়ে ঝটকা মারে।”

নয়না নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “বেশরম। এই, তোমার কি একটুও লজ্জা-টজ্জা নেই?”

“আমি কি শহরের দেয়াল জুড়ে বিজ্ঞাপন দেবো যে, আমার বউয়ের সামনে আমি নির্লজ্জ? তার কাছে বাসর রাতেই সব লজ্জা বিসর্জন দিয়ে আমি সব সময় অসভ্য থাকতে চাই।”

নয়না হাঁটা শুরু করল।

জিয়ান পিছু পিছু আসতে আসতে বলল, “একটা কথা বলি?”

“মাত্র একটা কথা বলবে?”

জিয়ান নয়নার হাত ধরে বলল, “এই মুহূর্তটা আমি থামিয়ে রাখতে চাই অন্তকাল ধরে। আমি তোমার-আমার মাঝে আর কোনো দূরত্ব চাই না, বাটার মাশরুম। আমি শুধু তোমার সাথে ভালোবাসায় ভালো থাকতে চাই বাকিটা জীবন।”

নয়না একটু চুপ করে থেকে বলল, “সময় তো থামানো যায় না। তবে মনে রাখা যায়।”

নয়না জিয়ানের হাত ধরে নিজের বুকের বাঁ পাশে রেখে বলল, “এখানে স্মৃতির সৌধ করে রেখে দাও, কখনো হারাবে না। সময় ধরে রাখা না গেলেও ভালো মুহূর্তকে স্মৃতি বন্দি করে রাখা যায়।”

জিয়ান চোখ বন্ধ করে অনুভব করল সেই স্পর্শ।

ঢেউয়ের শব্দ, বাতাস আর দু’জনের নিঃশ্বাস সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ইশ, যদি সময় এখানেও থমকে যেত!

সূর্য ধীরে ধীরে ডুবতে শুরু করেছে। আকাশে লাল-কমলা রঙের সোনালি আভা ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে।

জিয়ান বলল, “চলো, সূর্যাস্তটা একটু কাছে থেকে দেখি।”

দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছে। নয়না আলতো করে মাথা রাখল জিয়ানের কাঁধে।

“জিয়ান…”

“হুম?”

“নিজেকে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।”

জিয়ান মৃদু হেসে বলল, “আমি জানি, কারণ আমিও সেটাই অনুভব করছি।”

ঢেউ এসে আবার ছুঁয়ে গেল তাদের পা। আর সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সব শব্দ যেন মিলিয়ে গিয়ে শুধু তাদের দু’জনের নীরব ভালোবাসা জড়িয়ে গেল অনুভূতি জুড়ে।

🌿

কোনো রকম হইচই ছাড়াই গত শুক্রবার অন্তর আর নীলাঞ্জনার বিয়ে কাজি অফিসে সম্পন্ন হয়েছে। অন্তর তালুকদার বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নীলাঞ্জনাকে তার ছেলেকে সঙ্গে করে নিজের বাসায় নিয়ে এসেছে।

অন্তরের মা হাসিমুখেই সবটা মেনে নিয়েছে। এতেই যদি তার ছেলে সুখে থাকে, তবে সে তাতেই খুশি।

নীলাঞ্জনা নীল রঙের একটা জামদানি শাড়ি পরে অন্তরের ঘরে বসে আছে। অজানা কারণে তার চোখ থেকে অনবরত অশ্রু ঝরে পড়ছে। একটু ভালোবাসার জন্য সে কত কিছু ত্যাগ করেছিল। অথচ তার কপালে না জুটল ভালোবাসা, না জুটল সংসার। আজ এখানে এভাবে বসে থাকতে হবে, সেটা কি কখনো কল্পনায় ছিল? জীবন মানুষকে কখন কোন জায়গায় নিয়ে দাঁড় করায়, মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না।

এ বাড়িতে নীলাঞ্জনার পাঁচটা দিন কেটে গেছে। কেমন দমবন্ধ করা একটা অনুভূতি। এই পাঁচ দিনে অন্তর নীলাঞ্জনার সাথে তেমন কোনো কথা বলেনি। নিহালের সাথে খেলেছে, বা প্রয়োজনীয় যা কথা হয়েছে, ওইটুকুই।

আজ নীলাঞ্জনা রাতের খাবার রান্না করছে। অন্তরের মায়ের কাছ থেকে অন্তরের পছন্দের খাবারের তালিকা নিয়ে, সেখান থেকে বেছে বেছে কিছু আইটেম রান্না করেছে—ভুনা খিচুড়ি, মুরগির রেজালা, চিংড়ি মাছের ভর্তা, বেগুন ভাজা, বিন্নি চালের পায়েস।

রান্না শেষ করে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে সে ঘরে এল। এসে দেখে নিহাল ঘুমিয়ে আছে। অন্তর কপালে হাত দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। নীলাঞ্জনা নিজেকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, অন্তর কি কাঁদছে?”

এরপর হালকা কাশি দিয়ে অন্তরের ধ্যান ভাঙল। অন্তর দ্রুত হাতে চোখের জল মোছার জন্য হাত তুলতেই নীলাঞ্জনা তার হাত ধরে বলল, “এই কাজটা না হয় আমি করে দেই।” বলেই নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে অন্তরের চোখের জল মুছে দিল। তারপর বলল, “তোমার সুখের ভাগী তো হতে পারব না। আমাকে না হয় তোমার দুঃখের ভাগ দিয়ো।”

অন্তর বলল, “আমি কাঁদছিলাম না। চোখে মনে হয় কিছু পড়েছে।”

“আমাকে মিথ্যে বলার কিন্তু কোনো অপশন নেই। কারণ বয়সে কিন্তু আমি তোমার এক বছর দুই মাস তেরো দিনের বড়।”

অন্তর বলল, “খুব খিদে পেয়েছে, খাবার খাব।” বলেই উঠে দাঁড়াল।

নীলাঞ্জনা অন্তরের হাত ধরে বলল, “আমি জীবনে স্বামীর সুখ পাইনি। আচ্ছা, আমার কি স্বামী নিয়ে সুখী হওয়ার ভাগ্য নেই? একটা মানুষ কি এতটা দুর্ভাগা হতে পারে? তুমি আমাকে কেন এই বিয়ে নামক বন্ধনে জড়ালে? আর কেনই বা বারবার আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছ যে, তুমি আমার উপর করুণা করছ?”

অন্তর বলল, “তুমি ভুল ভাবছ, নীলাঞ্জনা।”

“আচ্ছা, এত করুণা যখন করেছ, তবে কি করুণা করে ভালোবাসা যায় না? তুমি না হয় আমায় করুণা করেই ভালোবেসো। তবুও বারবার এটা মনে করিয়ে দিয়ো না যে, তুমি বিয়েটা শুধু সমাজের লোক দেখানোর জন্য করেছ। আমিও মানুষ, আমারও মন আছে। কষ্ট আমারও হয়।”

অন্তর নিজের হাতে নীলাঞ্জনার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল, “আমাকে একটু সময় দাও। আমার জন্য সবকিছু ভুলে নতুন করে শুরু করা এতটা সহজ নয়। আমাকে একটু সময় দাও। আমি তোমাকে নিরাশ করব না।”

নীলাঞ্জনা অন্তরকে জড়িয়ে ধরল। নরম স্বরে বলল, “তুমি যদি এভাবে অতীত স্মরণ করতে থাকো, তবে কখনো সেই দিন আসবে না। আমি জানি, সহজ নয়। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে। আমাকে এভাবে ইগনোর করে, দূরে সরিয়ে রাখলে কি কোনোদিন আমাদের মধ্যে সবকিছু সহজ হবে? যেভাবেই হোক, আমরা একে অপরের মাঝে জড়িয়ে গেছি। আমাকে এভাবে ইগনোর করো না, আমার অনেক কষ্ট হয়। এই বাড়িতে তুমি ছাড়া আমার আপন কে আছে?”

অন্তর নিজের হাত নীলাঞ্জনার পিঠের দিকে এগিয়ে নিয়ে আবার সরিয়ে নিল। দ্বিতীয়বার নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে জড়িয়ে ধরল নীলাঞ্জনাকে। ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমাকে আর ইগনোর করব না। আজ থেকে ধীরে ধীরে চেষ্টা করব তোমার স্বামী হয়ে ওঠার।”

নীলাঞ্জনা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অন্তরকে।

কিছু সময় পর অন্তর বলল, “সিনিয়র বিয়ে করেছিলাম, আমাকে শাসন করে মানুষ করবে বলে। এমা, এখন দেখি আমার সিনিয়র বউ বাচ্চাদের মতো কাঁদে!” অন্তর পরিবেশ স্বাভাবিক করতেই কথাটা বলল।

নীলাঞ্জনা চোখের পানি মুছে বলল, “মেয়েমানুষ কখনো বড় হয় না, জানো না? তবে মেয়েমানুষ যেমন বাচ্চাদের মতো কাঁদতে পারে, ঠিক তেমনি ভালোবাসা দিয়ে পুরুষকে নিজের আঁচলে বেঁধেও রাখতে পারে। আবার ভুল করলে পিটিয়ে সোজাও করতে পারে।”

“বাপরে বাপ! ডেঞ্জারাস সিনিয়র বউ আমার। এবার আমার খুদা নিবারণ করার ব্যবস্থা করো।”

“হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে আসলেই তো হয়।” বলেই নীলাঞ্জনা চলে গেল।

অন্তর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে কিছুটা হালকা করে মনে মনে বলল, “তোকে পারতেই হবে, অন্তর। এটাই বাস্তবতা। এটাকে মেনে নিলেই জীবন সহজ আর সুন্দর হবে।”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply