শেষপাতায়সূচনা [৫৭.২]
সাদিয়াসুলতানামনি
[ভায়োলেন্স ওয়ার্ড রয়েছে, তাই নিজ দায়িত্বে পড়ুন।]
ঢাকার ব্যস্ত শহর আজ এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী। চারপাশের মানুষ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে বরবেশী এক যুবকের দিকে। গায়ে এখনো বিয়ের শেরওয়ানি, অথচ মুখে নেই কোনো নবদম্পতির উচ্ছ্বাস। বরং তার চোখজুড়ে ছড়িয়ে আছে দিশেহারা এক শূন্যতা, কণ্ঠে লেগে আছে হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক।
সে রাস্তা-ঘাটে যাকেই সামনে পাচ্ছে, তাকেই থামিয়ে কাঁপা কণ্ঠে একটাই প্রশ্ন করছে—
—”আপনারা কি এই গাড়িটাকে যেতে দেখেছেন? এই গাড়িতে আমার প্রেয়সী ছিল…! কেউ কি তার খোঁজ জানেন? আমাকে কি তার কাছে নিয়ে যেতে পারবেন?”
কথাগুলো বলতে বলতেই তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে, চোখ ভিজে উঠছে অশ্রুতে। যেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে জিজ্ঞেস করেও সে নিজের হারিয়ে যাওয়া মানুষটার সন্ধান পাচ্ছে না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, প্রিয়তমাকে হারানোর শোকে সে ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, উন্মাদের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে এক টুকরো আশার পেছনে।
এই উন্মত্ত ছুটে চলার মাঝেই হঠাৎ একটি হাত শক্ত ভাবে তাকে টেনে মাঝ রাস্তা থেকে সরিয়ে নেয়। ঠিক পরমুহূর্তেই বিকট শব্দ তুলে একটি দ্রুতগামী মিনিবাস তার গা ঘেঁষে ছুটে চলে যায়।
চারপাশের মানুষ শিউরে ওঠে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান। হাতটি যদি তাকে না টানত, তবে হয়তো এই মুহূর্তেই রাস্তাটা রঞ্জিত হতো এক বরবেশী প্রেমিকের রক্তে। হয়তো নিজের প্রেয়সীর খোঁজ পাওয়ার আগেই চিরতরে হারিয়ে যেত সে।
কিন্তু যুবকটির সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মৃত্যুর এতটা কাছ থেকে ফিরে এসেও তার চোখ দুটো এখনো ব্যাকুল হয়ে খুঁজে ফিরছে শুধু একজনকেই, তার হারিয়ে যাওয়া প্রেয়সীকে। যেন পৃথিবীর বুকে সেই মানুষটিকে খুঁজে পাওয়ার আগে তার থেমে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই।
পূর্ণতা তার ভাইকে প্রচন্ড রাগ নিয়ে ধমকে বলল–
—”কি করছো ভাই এসব? ভাবতে পারছ কি হতে চলেছিলো? সঠিক সময়ে যদি তোমাকে টান না দিতাম, বুঝতে পারছো, কতবড় একটা এক্সিডেন্ট ঘটে যেতো? তখন তোমাকে নিয়ে হসপিটালে ছুটাছুটি করতাম নাকি আরওয়াকে খুঁজতাম? এক বিপদের উপর আরেক বিপদ এসে জুটতো। “
আরিয়ান নিজেকে আর সামলাতে পারে না। বারংবার ভালোবাসায় পূর্ণতা পেতে গিয়েও, অপূর্ণতা নিয়ে ফিরে আসায় ছেলেটা বড্ড ক্লান্ত আজ। সে মাঝ রাস্তাতেই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে। মুখ দুইহাত দিয়ে চেপে ধরে কেঁদে দেয় ছেলেটি।
পূর্ণতার ভীষণ মায়া ও কষ্ট উভয়ই হয় আরিয়ানের কান্না দেখে। ছেলেটা একটা ঠকে গিয়ে আবারও যখন পূর্ণতা পেতে চলেছিল, তখনই সবকিছু কেমন উলটপালট হয়ে গেলো এক নিমিষেই। ভালোবাসায় সফলতা পাওয়া যেন, আরিয়ানের কাছে এখন আরেকটা অলীক বস্তু।
জাওয়াদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আরিয়ানের কাঁধে হাত রাখল। তার চোখেমুখে ছিল উদ্বেগ, কণ্ঠে ছিল নির্ভরতার আশ্বাস।
—”কেঁদো না, আরিয়ান। এখনই ভেঙে পড়লে চলবে? ভেঙে পড়া মানে তো হাল ছেড়ে দেওয়া, হার মেনে নেওয়া। তুমি কি এত সহজেই হার মেনে নিতে চাও?”
জাওয়াদের কথার জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলল না আরিয়ান। সে মাথা নিচু করে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকে। যেন বুকের ভেতর জমে থাকা তীব্র যন্ত্রণা আর অস্থিরতাকে সামলে নেওয়ার জন্য নিজেকে একটু সময় দিচ্ছে।
অতঃপর কাঁপা হাতে নিজের চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো মুছে ফেলল সে। কিন্তু চোখের পানি মুছে গেলেও বুকের ভেতরের বেদনা তো আর মুছে যায় না।
ভাঙাচোরা হৃদয় আর ক্লান্ত মন নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল আরিয়ান। তারপর ভেজা, ভারী কণ্ঠে বলল—
—”আর কত, ভাইয়া? আর কত কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে আমাকে ভালোবাসায় সফল হওয়ার জন্য?”
সে এক মুহূর্ত থামল। গলার স্বর আরও ক্ষীণ হয়ে এলো।
—”সজ্ঞানে তো কোনোদিন কারও মনে কষ্ট দিইনি। কাউকে অপমান করিনি, কাউকে ঠকাইনি। তাহলে আমার ভাগ্যটা এত নিষ্ঠুর কেন? কেন বারবার আমার সাথেই এমন হয়?”
তার চোখ দুটো আবারও ঝাপসা হয়ে উঠল।
—”কেন আমি প্রতিবার তাকে পেয়েও হারিয়ে ফেলি, ভাইয়া? কেন আমার সুখগুলো ঠিক হাতের নাগালে এসেও ধরা দেয় না? আল্লাহ কি এখনো আমার ধৈর্যের শেষ সীমাটা দেখতে চান?”
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। বুকের ভেতরে জমে থাকা অসহায়ত্ব, অভিমান আর ভালোবাসার সমস্ত আর্তনাদ যেন একসাথে বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠে। সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন বহু আগেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
জাওয়াদ আরিয়ানের কথা শুনে একটা মলিন হাসি দিয়ে বলল–
—”ধরে নাও, এটা তোমার অসীম সুখ পাওয়ার পূর্ব পরিস্থিতি। তুমি বললে না, কঠিন পরীক্ষা দিবে। পরীক্ষায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার পর, যখন একটা ভালো রেজাল্ট করি তখন কি অনাবিল আনন্দই না লাগে আমাদের। তাই না? তোমার বর্তমান সিচুয়েশন ঠিক তেমনই। তুমি শুধু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিও না।”
—”আমার ধৈর্য্যে আর কুলচ্ছে না ভাইয়া। শরীর কেমন নিঃশক্তি হয়ে আসছে। ছয় ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে আরওয়ার নিখোঁজ হওয়ার। এখন অব্দি ওর কোন খোঁজ পেলাম না।
কোথায় আছে ও’? কে বা কারা ওকে কিডন্যাপ করল? কেন করলো কিড/ন্যাপ ওকে? যদি টাকার জন্য করেই থাকে, তাহলে এখনও মুক্তিপণ চেয়ে ফোন কেন দিচ্ছে না কিড/ন্যাপাররা? কি অবস্থায় আছে ও’? এত এত প্রশ্ন, অথচ কোনটিরও উত্তর আমার জানা নেই।”
আরিয়ানের চোখে আবারও অশ্রুরা এসে নিজেদের মেলে ধরতে শুরু করে। এই পর্যায়ে জাওয়াদেরও মায়া হলো ভেঙে পড়া ছেলেটার প্রতি। তারা সবাই সেই দুপুর থেকে ঢাকার শহরের অলিতে-গলিতে চিরুনি তল্লাশি দিয়ে বেড়াচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাদের সাথে পুলিশরাও রয়েছে। কিন্তু আরওয়ার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি এই অব্দি। আরওয়ার বা ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পরেছে। তাকে বাসায় রাসেলের স্ত্রী ও আরিয়ানের মায়ের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।
রাত প্রায় দুটো অব্দি আরওয়াকে খোঁজা-খুঁজি করার পরও যখন তার টিকিটি অব্দি পাওয়া যায় না, তখন সবাই ভেঙে পড়তে থাকে মানসিকভাবে। হঠাৎই আরিয়ানের ফোন বেজে ওঠে সশব্দে। আরিয়ান তড়িঘড়ি করে শেরওয়ানির পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। সে কিয়ৎক্ষণ ব্যয় ব্যতীত ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলে, মেয়েলি কণ্ঠের হিচকির শব্দ শুনতে পায়।
আরিয়ানের এই শব্দের মালিককে চিনতে এক সেকেন্ডও সময় লাগে না। হ্যাঁ, ঠিকই ভেবেছেন। ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটি আরওয়া। ফোনে আরওয়া অনেকটা ফিসফিসিয়ে বলে–
—”আরিয়ান, আরিয়ান কোথায় আপনি? আমায় আপনার কাছে নিয়ে যান আরিয়ান। ও…ওরা আজ ভোরে আমাকে বিদেশে পাচার করে দিবে নারীপাচার চ…চক্রের কা..ছে। আপনি পি..প্লিজ তাড়াতাড়ি আ..সুন।”
—”আরওয়া…জান কোথায় তুমি? আর কারা তোমায় বিক্রি করবে? আমি বেঁচে থাকতে কেউ তোমার সম্মানে আঘাত আনতে পারবে না ইনশা আল্লাহ, তুমি শুধু বলো তুমি এখন কোথায় আছো। একদম ভয় পাবে না…কেঁদো না প্লিজ…প্লিজ কেঁদো না….”
আরওয়াকে কাঁদতে নিষেধ করে আরিয়ান নিজেই কেঁদে দেয় কথা শেষ করে। ওপাশ থেকে আরওয়ার আর কোন শব্দ পাওয়া যায় না। বোধহয় কল কেটে দিয়েছে বা ফোনটা আরওয়ার কাছে আর নেই। আরিয়ান হ্যালো হ্যালো করতে বেশ কয়েকবার কিন্তু কোন রেসপন্স পাওয়া যায় না।
লাইন কেটে যাওয়ায় আবারও কল করে সেই নাম্বারটিতে, কিন্তু এবার নাম্বারটি বন্ধ বলতে থাকে। আরিয়ান ক্ষণিকের মাঝে আবার পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে। তার এই অতিরিক্ত ভয়, দুঃশ্চিন্তা, উত্তেজনার কারণে হঠাৎই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে নিলে, টনি আর জাওয়াদ এসে তাঁকে ধরে ফেলে নিচে পড়ার থেকে।
আরওয়ার সাথে বন্দি থাকা একটি মেয়ের কাছে একটা বাটান ফোন ছিলো লুকায়িত। আরওয়ার বিয়ের সাজ দেখে মেয়েটির ভীষণ মায়া হয় এবং বুঝতে পারে, তাকে বিয়ের দিনই তুলে আনা হয়েছে। মেয়েটির হঠাৎই মনে পড়ে, তার কাছে একটা ফোন আছে। যেটা সে তার কোমড়ে কাছের সালওয়ারে গুঁজে রেখেছি। সে তৎক্ষনাৎ নিজের লুকায়িত ফোনটি বের করে সুযোগ বুঝে আরওয়াকে দেয়। এবং গুন্ডাদের থেকে আরওয়াকে আড়াল করতে অন্যান্য বন্দি মেয়েদের সাহায্য নেয়।
আরওয়া সকলের আড়ালে গিয়ে সর্বপ্রথম কল করে আরিয়ানকে। আরিয়ানকে সে ঐ দুটো কথাই বলতে পারে। হঠাৎই একটা গুন্ডার নজর এসে পড়ে সারি সারি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর দিকে। তার সন্দেহ হয় মেয়েগুলোকে এমনভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে। তাই সে দ্রুত নিজের আরেক সাথীকে উক্ত বিষয়টি জানায়। এবং এরপর তারা কয়েকজন মিলে আরওয়াকে আড়াল করে রাখা মেয়েগুলোর দিকে এগিয়ে আসলে আরওয়ার ফিসফিসানি শুনতে পেয়ে বুঝতে পারে, আরওয়া কারোর সাথে ফোনে কথা বলছে।
গুন্ডাগুলো আর বিন্দু পরিমাণ সময় নষ্ট না করে আরওয়ার থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে, সজোরে সেটা মাটিতে ফিকে ফেলে দেয়। তারপর তারা আরওয়াকে মেয়েগুলোর আড়াল থেকে টেনে বের করে সপাটে কয়েকটা থাপ্পড় মা”রে। শুধু থাপ্পড় মে”রেই ক্ষান্ত হয় না তারা। একজন গিয়ে তাদের বসকে উক্ত ঘটনা বললে, তারা আরওয়াকে টেনেহিঁচড়ে সেখানে থেকে অন্য এক জায়গায় নিয়ে যায়।
দূর্বল, ক্লান্ত ও ভয়ার্ত মনে আরওয়া টলমল পায়ে তাদের সাথে অন্য একটি কন্টেইনারে আসে। তার চুলের খোঁপাটি তখনও একজন গুন্ডার হাতে বন্দি। আরওয়াকে বর্তমানে যেই কন্টেইনারে নিয়ে আসা হয়, সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলো আরওয়াদের গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেব।
গুন্ডাটি আরওয়াকে ধাক্কা দিয়ে চেয়ারম্যানের পায়ের সামনে ফেলে। ধাক্কা খেয়ে আরওয়া নিচে পড়ে গিয়ে পায়ে বেশ ভালোই ব্যথা পায়, কিন্তু সে নিজের ব্যথা বা দুর্বলতা প্রকাশ করে না। বরংচ, সে তীব্র আক্রোশ ও রাগ নিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের উদ্দেশ্যে বলল–
—”এখনও সময় আছে চেয়ারম্যান সাহেব, আমায় ছেড়ে দিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে দিন। অন্যথায় আমার আরিয়ান আসলে আপনারা সকলে জেলে তো যাবেনই, কিন্তু আপনার হাল যে কি হবে সেটা ভেবেই আমি ভয় পাচ্ছি।”
চেয়ারম্যান বুড়ো শালা আরওয়ার হুমকিতে বিন্দুমাত্র ভয় তো পায়ই না, উপরন্তু সে সহ সেখানে উপস্থিত সকলে কিটকিটিয়ে হেঁসে ওঠে।
চেয়ারম্যান বুড়ো আরওয়াকে ব্যঙ্গ করে মিছে ভয় পাওয়া মুখ করে বলল–
—”ওরে বাবা রে! আরওয়া ম্যাডামের হুমকিতে ভয়ে তো আমি প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললাম। কি ভয়! কি ভয়!”
আরওয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে তার কথার প্রতিত্তোরে বলে–
—”প্যান্ট ভিজাতেই পারেন, বয়স তো আর কম হলো না। সুগারের ঔষধ নেন নি বুঝি আজ, তাই এত অল্পতেই প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললেন।”
আরওয়ার কথা শুনে চেয়ারম্যানের দলের লোকেরাই হেঁসে দেয়। এতে চেয়ারম্যান বুড়ো ভীষণ অপমানবোধ করে। তীব্র আক্রোশ নিয়ে সে আরওয়ার চুলের খোঁপাটা চেপে ধরে আরওয়াকে নিচে থেকে তুলে কতগুলো থাপ্পড় মারে। পুরুষ মানুষের হাতের ১০/১২ টার মতো থাপ্পড় খেয়ে আরওয়ার দিন-দুনিয়া ঘুরতে থাকে ভো-ভো করে। সে দূর্বলতায় হেলে পড়ে যেতে নিলে চেয়ারম্যান তার চুলের মুঠি ছাড়ে না।
চেয়ারম্যান রাগে হিসহিসিয়ে আরওয়াকে বলে–
—”ভালো মেয়ের মতো আমার ছেলের কথা শুনলে, তোকে শুধু আমার আর আমার ছেলের নিচে শুতে হতো। কিন্তু তুই তো বেশি ঝাঁঝ ওয়ালা মা। এখন দেখ তোকে আমি রোজ কত পুরুষের নিচে শোয়াই।
আমার ছেলের পুরুষত্বহীন করে নিজেকে যে, অনেক বড় মহীয়সী নারী ভাবছিস, তা আমি বেশ ভালোই বুঝতে পারছি। কিন্তু তোর মতো মেয়েদের ঝাঁঝ কীভাবে কমাতে হয় তা আমার বেশ ভালো করেই জানা আছে।”
চেয়ারম্যান বুড়ো আরওয়ার থেকে চোখ সরিয়ে তার দলের ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলে–
—”রাত তিনটায় মানে যেই কন্টেইনার দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে ছাড়বে, ঐটায় এই শালিকে ভর যা। আর ভোরের আগে বাকি মেয়েগুলোকে বেনাপোল বন্দরের ডেরায় নিয়ে যা।
আমার মন বলছে, পুলিশের রেট পড়বে কিছু সময়ের মাঝে। তাই যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। সবগুলোকে ড্রা/গ”স দিয়ে বেহুশ করে ফেল। যা, যা জলদি কাজে লেগে যা। আর এটাকেও সাথে করে নিয়ে যা।”
চেয়ারম্যান বুড়ো বহুবছর ধরেই এই নারীপা”চার চক্রের সাথে জড়িত। গ্রামের গরির ঘরের মেয়েদের ভালো কর্মসংস্থানে চাকরি দেওয়ার নাম করে, তাদের সিলেট থেকে ঢাকায় এনে চড়া মূল্যে পা”চার করে দিতো বিশ্বের দেশে। তার এই কাজের আরেকজন সাথী ছিল তার ছেলে।
চেয়ারম্যান বুড়ো আরওয়াকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ছুঁড়ে মারে। অর্ধ অচেতন আরওয়া নিচে পড়ার আগেই একটি শক্ত-পোক্ত হাত এসে তাঁকে আগলে নেয় নিজের সাথে। আরওয়ার আর সেই হাতের মালিককে দেখার সময় হয়ে ওঠে না। সে পুরোপুরি অচেতন হয়ে ঢলে পড়ে লোকটির বুকের উপর। অন্যদিকে আরওয়াকে নিজের বুকে ঠায় দেওয়া লোকটি একদৃষ্টিতে আরওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
—”তোমরা ছাড়ো আমাকে…আমাকে আমার আরুর কাছে যেতো দাও প্লিজ তোমরা। ও আমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। সরো তোমরা সরো…আমি একদম ঠিক আছি।”
—”না বাবা, তুই ঠিক নেই। তোর মানসিক-শারীরিক অবস্থা একটুও ভালো না। ডাক্তার তোকে বেড রেস্টে নিতে বলেছে।”
অজান্তা বেগম আর আহনাফ সাহেব মিলে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সে কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না জ্ঞান ফেরার পর থেকে। তখন আরওয়ার ফোন পাওয়ার পর আরিয়ানের প্যানিক অ্যাটাক হয়েছিলো। তাকে তৎক্ষনাৎ হসপিটালে নিয়ে আসা হলে ডাক্তাররা তাঁকে
অল্প ডোজের একটা ঘুমের ইনজেকশন আর সেলাইন দেয়। দুই ঘন্টার মতো ঘুমানোর পর, ভোর চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠেই আরিয়ান পাগলামি শুরু করে দেয় আরওয়ার কাছে যেতে, আরওয়াকে খুঁজতে।
আরিয়ানের পাগলামির মাঝেই সেখানে আসে পূর্ণতা আর জাওয়াদ। আজ তারা কেউই বাসায় যায় নি। আরিয়ান ও আরওয়াকে নিয়ে টেনশন করতে করতেই তাদের রাত কেটে যায়। জাওয়াদ তার পুলিশ বন্ধু শারাফাত মির্জাকে তখন আরিয়ানের ফোনে কল আসা নাম্বারটা দিয়ে সেটার লোকেশন ট্র্যাক করতে বলে। শারাফাত ট্র্যাক করে জানায়, নাম্বারটি বর্তমান লোকেশন গাজীপুরের ভাওয়াল অঞ্চলে। জাতীয় উদ্যানের সীমানা ঘেঁষা একটা প্রত্যন্ত এলাকায় নম্বরটার সর্বশেষ অবস্থান পাওয়া গেছে।
কথাটা শোনা মাত্রই জাওয়ােদর বুক ধক করে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক নির্জন, জনমানবহীন, পরিত্যক্ত এলাকার চিত্র। এখানে সে স্টুডেন্ট লাইফে গিয়েছিল একবার বন্ধুদের সাথে। কিন্তু সেখানে গিয়ে এমন একটা ঝামেলায় পড়েছিল যে, সে যাত্রায় জীবনটা নিয়ে বাড়ি ফেরাটাকেই অলৌকিক ঘটনা মনে হয়েছিল তার।
ভাওয়াল! ঢাকার এত কাছে হয়েও জায়গাটা যেন অন্য এক জগৎ। বিস্তীর্ণ শালবন, দীর্ঘ নির্জন রাস্তা আর লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য পরিত্যক্ত জমি ও পুরোনো স্থাপনা। কাউকে গোপনে আটকে রাখা বা যে-কোন খারাপ কাজ করার জন্য এর চেয়ে সুবিধাজনক জায়গা খুব কমই আছে।
শারাফাত ইতিমধ্যে সেখানকার থানার ইন্সপেক্টরের সাথে কথা বলে, তাদের ফোর্স পাঠিয়ে দিয়েছে। এবং সে নিজেও রওনা দিবে বলেছিল ফজরের আজানের পরপরই। কিন্তু এরই মাঝে একটা সুসংবাদ পেয়ে সে আপাতত নিজের যাওয়াটাকে স্থগিত রাখে।
জাওয়াদরা কেবিনে এসে দেখে আরিয়ান অতিরিক্ত পাগলামি করছে। তাকে কিছুতেই শান্ত করা যাচ্ছে না। জাওয়াদ বড় বড় কদম ফেলে আরিয়ানের কাছে আসে। জাওয়াদকে দেখে আরিয়ান অস্থির হয়ে বলল–
—”জাওয়াদ ভাই, দেখেন না বাবা আমাকে কিছুতেই আরুর কাছে যেতে দিচ্ছে না। আপনি বাবাকে একটু বলেন না আমাকে যেতে দিতে। মেয়েটা কি কাঁদছিল ফোনে আপনি তো জানেনই না।
ওকে নাকি পা”চার করে দিবে বিদেশে এটাও বলেছিল। আপনি আমায় একটু সাহায্য করেন না ভাই ওর কাছে যাওয়ার। আমি তো একসময় আপনাকে সাহায্য করেছিলাম, আমার বোনের কাছাকাছি পৌঁছানোর। সেই কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই নাহয় সাহায্য টুকু করেন।”
কথাগুলো বলার সময় আরিয়ানের চোখ ছিল ভেজা। কণ্ঠস্বরে ছিল করুণ আর্জি। আরিয়ান কি বলতে কি বলছে, তা হয়ত সে নিজেই বুঝতে পারছে না। কারণ, তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, সে কীভাবে আরওয়াকে উদ্ধার করবে? কীভাবে তাকে পৌঁছাবে।
জাওয়াদ আরিয়ানের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে আরিয়ানের কাঁধে আশ্বাসসূচক হাত রেখে বলল–
—”তোমার সেই সময়কার সাহায্যের জন্য আমি আজীবন তোমায় সাহায্য করতে কার্পণ্য করব না। কিন্তু আজ সেই সাহায্যে দোহাই না দিলেও, তোমাকে আমি আরওয়া অব্দি পৌঁছে দিতাম।
তুমি একটু শান্ত হও আরিয়ান। আরওয়াকে পাওয়া গিয়েছে। ও এখন সেইফ আছে।”
জাওয়াদের বলা শেষ দু’টো লাইন আরিয়ানের কানে বারংবার বাজতে থাকে। “আরওয়াকে পাওয়া গিয়েছে, ও এখন সেইফ আছে” —কথাটা যেন নিমিষেই আরিয়ানের সকল উন্মাদনা, অস্থিরতা, ভয় গায়েব করে দেয়। আরিয়ান জাওয়াদের চোখ চোখ রেখে তাকিয়েছিল বলে, সে জাওয়াদের চোখ দেখেই বুঝে যায়, জাওয়াদ তাকে শান্ত করতে কোন মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। বরং জাওয়াদের বাচনভঙ্গি ও চোখের দৃঢ়তা তার কথাগুলোকে সত্য প্রমাণিত করছে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২২৩৭
চলবে?
[আজকের পর্বে আরিয়ানকে ভীষণ দুর্বল সত্ত্বার অধিকারী মনে হতে পারে। কিন্তু তার জায়গাটা একবার বিবেচনা করল, আপনারাই বুঝতে পারবেন আরিয়ানের এমন ভঙ্গুর মন-মানসিকতাই সঠিক। পেয়েও বারংবার হারিয়ে ফেলার কষ্ট সত্যিই ভীষণ করুণ হয়।
আজকের পর্বটা কেমন হয়েছে? আমি সত্যি প্রচণ্ড রাইটিং ব্লকে ভুগছি। এতমাস ধরে লিখছি গল্পটা, তাই শেষ পর্যায়ে এসে তাড়াহুড়ো করে এলোমেলো করে দিতে চাইছি না। আপনাদের মন ভালো করার জন্য সামনে কিছু চমৎকার পর্ব আসতে চলেছে।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ] See less
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৭.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪০.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.২