#অন্তিম_পর্ব
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
(প্রায় ৬ হাজার শব্দ তাই সরাসরি ফেসবুক অ্যাপ থেকে পড়ার চেষ্টা করবেন।)
★★★
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের আঁধার এখন আরও ঘনীভূত হয়েছে। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা এক গভীর, নিথর নীরবতায় নিমজ্জিত। ঘরের ভেতর বিছানায় পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে আরিয়ান আর ছোট্ট রোদ্দুর। কিন্তু সেই শান্তির ছোঁয়া স্পর্শ করতে পারেনি তৃণাকে। সে একা, নিঃসঙ্গ অবস্থায় বেলকনির কোণে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে আছে। তার পরনের শাড়ির অবাধ্য আঁচলটা মাটির সাথে লুটোপুটি খাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। আকাশের রূপোলি জোছনার আলো এসে পড়েছে তার মুখের ওপর, আর সেই মায়াবী আলোয় তার চোখের কোণে জমে থাকা জলবিন্দুগুলো হিরের টুকরোর মতো চিকচিক করছে।
তৃণার কাঁপতে থাকা দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা আছে একটি কাঠের ফটোফ্রেম। ফ্রেমের ওপাশে বন্দি হয়ে আছে দুটো চেনা মুখ তার বাবা উমর হাওলাদার এবং বড় বোন রিনি। এই একটিমাত্র ছবি হয়তো রিনি ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে কোনো এক আকস্মিক টানে তুলেছিল। দেখতে দেখতে রিনির এই পৃথিবী ত্যাগ করে অন্য এক না-ফেরার দেশে চলে যাওয়ার দুটো মাস পার হয়ে গেল। কিন্তু সময়ের চাকা ফুরোলেও তৃণার ভেতরের ক্ষতটা এতটুকু উপশম হয়নি। সে ছবির ভেতরের রিনির সেই চেনা মুখটার ওপর আঙুল বোলাতে লাগল, আর তার চোখ বেয়ে অজোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল সেই কাঁচের ফ্রেমটার ওপর। চোখের জলে রিনির অবয়বটা বারবার ঝাপসা হয়ে আসছিল তার।
ঠিক দুই মাস আগের সেই অভিশপ্ত দিনটার কথা মনে পড়তেই তৃণার বুকটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। ফ্রান্সের চার্লস দ্য গল বিমানবন্দর থেকে লুসি নামের সেই অচেনা মেয়েটি যখন উমর হাওলাদারের ফোনে কল করে জানায় যে ওনার সৎ মেয়ে ফ্রান্সের মাটিতেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, তখন মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবারে এক প্রলয় নেমে এসেছিল। এই আকস্মিক ও নির্মম খবরটা সহ্য করার ক্ষমতা ওনার বৃদ্ধ হৃদযন্ত্রের ছিল না। খবরটা শোনামাত্রই উমর হাওলাদার হার্ট অ্যাটাক করেন। কোনো কিছু ভাবার সময় না দিয়ে ওনাকে ইমিডিয়েটলি আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল।
একদিকে বাবার মৃ*ত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া, অন্যদিকে রিনির সেই কফিনবন্দি দে*হের জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা তৃণা যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল সেদিন। অবশেষে রিনি দেশের মাটিতে ফিরেছিল ঠিকই, কিন্তু লোহার ওই শীতল কফিনে বন্দি হয়ে। কফিনের ঢাকনাটা যখন সরানো হয়েছিল, তখন রিনির সেই ফ্যাকাশে অথচ শান্ত মুখটা দেখে কেউ প্রথম নজরে বুঝতেই পারত না যে এই প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটা আজ আর বেঁচে নেই। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই হালকা হাসির রেশটুকু দেখে মনে হচ্ছিল বিদেশের সমস্ত ক্লান্তি আর মনের সব অপরাধবোধের অবসান ঘটিয়ে রিনি যেন কোনো এক মায়াবী চিরনিদ্রায় তলিয়ে গেছে।
তৃণা ছবিটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে অন্ধকারের মাঝে ফুঁপিয়ে উঠল। যে বোনকে সে একসময় মন থেকে ঘৃণা করতে চেয়েছিল, আজ তার এই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া যেন তৃণার জীবনের একটা বড় অংশকে চিরকালের জন্য শূন্য করে দিয়ে গেল। বারান্দার ঠান্ডা হাওয়া এসে তার চুলগুলোকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর তৃণা শুধু এক বুক হাহাকার নিয়ে জোছনাঘেরা আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলতে লাগল ‘আপু, তুমি বড্ড দেরিতে ফিরলে, বড্ড অভিমান নিয়ে চলে গেলে।’
রিনির ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছিল ফ্রান্সে পা রাখার ঠিক তিন মাস পরেই। এই মরণব্যাধি ভেতর থেকে তিল তিল করে তার সমস্ত রক্ত শুষে নিচ্ছিল, অথচ সে একটিবারের জন্যও দেশের কাউকে জানতে দেয়নি যে সে কতটা অসুস্থ। নিজের ভেতরের সব যন্ত্রণা, সব কষ্ট সে একা বুকেই চেপে রেখেছিল। একমাত্র লুসি ছাড়া এই সত্যের ভাগীদার আর কেউ ছিল না। মেয়েটার মনে কি এতই অভিমান জমেছিল যে, জীবনের শেষ দিনগুলোয় নিজের আপন মানুষদের একটুখানি সান্ত্বনা কিংবা একটু ছোঁয়া পাওয়ার প্রয়োজনটুকুও সে বোধ করেনি? নাকি তীব্র অপরাধবোধ আর লজ্জাই তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল?
দুই মাস আগের সেই দিনটার কথা মনে পড়লে আজও তৃণার শরীর শিউরে ওঠে। কফিনটা যখন উঠোনে রাখা হয়েছিল, তখন ছোট তূর্ণা রিনির সেই শান্ত, নিথর দেহের ওপর আছড়ে পড়ে পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদেছিল। সে বারবার অবুঝের মতো রিনির গাল দুটো ধরে ঝাঁকিয়েছিল, আকুল কণ্ঠে হাজারো বার ‘আম্মু, আম্মু’ বলে ডেকেছিল। কিন্তু রিনি আর ওঠেনি। তার সেই প্রিয় ‘আম্মু’ ডাক চিরকালের জন্য বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তনটা ঘটেছিল রৌশনারা বেগমের। রিনির লাশটা দেখে সেই যে তিনি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, পাথর বনে গিয়েছিলেন, আজ দুটো মাস পেরিয়ে গেলেও সেই মহিলা আর একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন, তীব্র মানসিক আঘাতে তিনি প্যারালাইসড হয়ে গিয়েছেন। যে মা সারাজীবন রিনিকে শুধু অবহেলাই করে গেছেন, মেয়ের এই করুণ পরিণতি দেখার পর তার অবচেতন মন হয়তো এই নির্মম সত্যটা আর নিতে পারেনি। আর মেহরাব দেওয়ান? তিনি সেদিন রিনির লাশটার দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছিলেন। ওনার সেই পাথুরে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়াটা যেন এক নীরব কান্নার ইতিহাস হয়ে আছে।
কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা তো সেখানেই শেষ হয়নি। রিনি মারা যাওয়ার ঠিক সাতদিন পরেই, হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লড়তে উমর হাওলাদারও চিরকালের জন্য পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
পরপর এই দুটো মস্ত বড় শোকের ধাক্কা তৃণা এখনও কোনোভাবেই সামলে উঠতে পারছে না। বুকের ভেতরটা সবসময় এক গভীর শূন্যতায় টনটন করে। এই কারণেই ইদানীং তার বেশিরভাগ রাতগুলো কাটে একদম নিদ্রাহীন, চোখের জলে বারান্দার দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে।
হঠাৎ করেই বারান্দায় মৃদু পায়ের শব্দ হলো। আরিয়ান এসে খুব আলতো করে তৃণার ঠিক পাশে বসল। তৃণা ঝাপসা চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়েও কিছু বলল না, আবার ছবির ফ্রেমটার দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল।
আরিয়ান পরম মমতায় তৃণার কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত ধীর, মায়াবী কণ্ঠে বলল,
“চলো শ্যামলিনী, অনেক রাত হয়েছে। এবার একটু ঘুমাবে চলো। ওঠো সোনা।”
স্বামীর এই আদুরে ডাকটাই যেন তৃণার ভেতরের বাঁধভাঙা কান্নার দুয়ার খুলে দিল। সে ছবির ফ্রেমটা বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“সবাই আমাকে ছেড়ে কেন চলে যায়, আরিয়ান? কেন সবাই এভাবে একা করে দিয়ে চলে যায়? আমার নিজের মা সেই কতগুলো বছর আগে আমাকে এই দুনিয়ায় রেখে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল। তারপর… তারপর আমার বোনটা, এত অভিমান বুকে নিয়ে এই সুন্দর পৃথিবীটাই ত্যাগ করল। আমার আব্বু ছিল এই পৃথিবীতে আমার শেষ আশ্রয়, শেষ ভরসা, সে-ও আমাদের সবাইকে ছেড়ে হারিয়ে গেল! কেন হয় আমার সাথে এমন? কেন আল্লাহ আমার কপালে এত শূন্যতা লিখে দিলেন? কেন? কেন?”
বলতে বলতেই তৃণা আরিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে, তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার পুরো শরীরটা তখন অপূর্ণতার এক গভীর কাঁপুনিতে কাঁপছে। আরিয়ান কোনো কথা বাড়াল না। সে তৃণাকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে টেনে নিয়ে পরম শক্তিতে জড়িয়ে ধরল। তার নিজের চোখ দুটোও তখন ভিজে উঠেছে। এই মুহূর্তে স্ত্রীকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে, কোন মন্ত্রে তার এই বুকচেরা হাহাকার শান্ত করবে তা আরিয়ান নিজেও বুঝে উঠতে পারল না। সে শুধু তৃণার মাথায় নিজের চিবুক ঠেকিয়ে, তাকে বুকের ভেতর আরও একটু আড়াল করে এক অলিখিত প্রতিজ্ঞায় চোখ বন্ধ করে নিল পৃথিবীর সবাই চলে গেলেও, এই বুকে তার শ্যামলিনীর আশ্রয় কোনোদিন ফুরোবে না।
★★★
হাওলাদার বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে একটা মৃদু শব্দ করে থামল মেহরাব দেওয়ানের কালো রঙের গাড়িটা। গাড়িটা থামতেই পেছনের দরজা খুলে নেমে এল নীল আর সাদা রঙের স্কুল ড্রেস পরা তূর্ণা। তার কাঁধে তখনো ঝুলছে স্কুলের ভারী ব্যাগটা। সে বাড়ির ভেতরে না গিয়ে সোজা ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল হাওলাদার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানের সামনে।
সেখানে সবুজে ঘেরা ছায়াশীতল পরিবেশের মাঝে একদম পাশাপাশি নতুন দুটি কবর মাথা তুলে আছে। কবর দুটোর চারপাশটা বেশ যত্ন করে বাঁধানো। তার মধ্যে একটি কবরের শ্বেতপাথরের ফলকের ওপর স্পষ্টাক্ষরে খোদাই করে লেখা রয়েছে রিনি হাওলাদার।
তূর্ণা খুব ধীর ও শান্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে রিনির সেই চিরনিদ্রায় শায়িত কবরটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর নিজের স্কুল ড্রেসটার তোয়াক্কা না করে, হাঁটু ভেঙে কবরের পাশের নরম সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়ল। গত দুটো মাস ধরে এটাই তূর্ণার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তাহে অন্তত এক-দুবার সে এখানে আসবেই। আর এখানে এলেই তূর্ণা যেন এক অন্য মানুষ হয়ে যায়, সে কবরের মাটির দিকে তাকিয়ে তার স্কুলে কী হলো, কে কী বলল, সব বিষয়ে একনাগাড়ে আলাপ করতে থাকে। তার মনে গভীর বিশ্বাস তার আম্মু মাটির নিচে শুয়ে শুয়ে ওনার এই ছোট্ট রাজকন্যার সব কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন।
তূর্ণা আজও ঘাসের ওপর দু-হাত রেখে কবরের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল। তার মিষ্টি ফর্সা মুখে এক চিলতে মায়াবী হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“জানো আম্মু? আজ না স্কুলে পড়া দেওয়ার সময় আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। ওই যে সেদিন নতুন একজন ম্যাম জয়েন করলেন না, ওনার নামটাও ‘রিনি’। মিস রিনি যখন ক্লাসে রোল কল করছিলেন, আমার শুধু তোমার কথা মনে পড়ছিল। আর এই অন্যমনস্ক থাকার অপরাধে ওই নতুন ম্যামটা আজ আমাকে পরপর দুটো স্কেল দিয়ে হাতে আঘাত করেছেন। জানো আম্মু, ওই ম্যামটার নামটাই শুধু তোমার সাথে মিল, কিন্তু ওনার মনটা ভালো না। তুমি হলে কি আমাকে কখনো এভাবে স্কেল দিয়ে মারতে? বলো আম্মু?”
তূর্ণা একটু থামল। হয়তো সে মাটির নিচ থেকে কোনো উত্তরের অপেক্ষা করছিল। উত্তর না পেয়ে সে চট করে নিজের স্কুলের পিঠব্যাগটা সামনে টেনে আনল। চেইনটা খুলে ভেতর থেকে একটা আস্ত কিটকাট চকলেটের প্যাকেট বের করে আনল। রিনির কবরের ফলকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি না এই চকলেটটা ভীষণ পছন্দ করতে আম্মু? আজ খাবে আমার সাথে? দাঁড়াও, আমি প্যাকেটটা ছিঁড়ে দিচ্ছি।”
বলেই তূর্ণা চকলেটটার ওপরের রাংতা প্যাকেটটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর একটা টুকরো কবরের মাটির খুব কাছে এগিয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, “এই নাও, খাও আম্মু।”
বেশ কয়েক সেকেন্ড সে হাতটা ওভাবেই শূন্যে ধরে রাখল। তার অবুঝ, নিষ্পাপ মন ততক্ষণে ধরে নিয়েছে যে ওপাশ থেকে অদৃশ্য কোনো হাত এসে চকলেটের স্বাদ গ্রহণ করে নিয়েছে। তূর্ণা নিজের তৃপ্তির জন্য চকলেটটায় একটা ছোট্ট কামড় দিল। তারপর চিবোতে চিবোতে আবার বলল, “জানো মা… আজ না ক্লাসের ওই যে মেয়েটা সেকেন্ড হয়েছে, ও আবারও সবার সামনে আমাকে খুব পচা একটা কথা বলেছে। ও আজ টিফিনের সময় সবার সামনে এসে বলল ‘তোর মা কোথায় তূর্ণা? তোর মা কি তোকে ভালোবাসে না যে তোকে স্কুলে নিতে আসে না?’ অথচ আম্মু, ও কিন্তু খুব ভালো করেই জানে যে আমার মা এই পৃথিবীতে আর বেঁচে নেই! তবুও ও আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বারবার জিজ্ঞেস করে, আমার মা কোথায়। আজ যখন ও কথাটা বলল না মা, ওকে কোনো জবাবও দিতে পারিনি। আমার কেমন যেন চারপাশটা ঝাপসা ঝাপসা মনে হচ্ছিল…”
বলতে বলতে তূর্ণার গলার স্বরটা বুজে এল। এতক্ষণ ধরে মুখে জোর করে ফুটিয়ে রাখা সেই চিলতে হাসিটা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। তার ডাগর ডাগর চোখ দুটো নোনা জলে ভরে উঠল, আর পরমুহূর্তেই গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা তপ্ত জল টুপটুপ করে ঝরে পড়ল কবরের ওই সবুজ ঘাসগুলোর ওপর।
আকাশের বুক চিরে মেঘেরা গম্ভীর আওয়াজে গর্জন করে উঠল। চারপাশটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে গাড়িতে হেলান দিয়ে তূর্ণার প্রতিটি কথা শুনছিলেন মেহরাব দেওয়ান। মেয়ের এই অবুঝ আকুতি ওনার ভেতরের শক্ত পুরুষ মানুষটাকে এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। ওনার চোখ বেয়ে বারবার নোনা জল গড়িয়ে পড়ছিল। আকাশের অবস্থা ক্রমশ বেগতিক দেখে মেহরাব দেওয়ান চোখের জল মুছে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। তূর্ণার কাঁধে একটা হাত রেখে অত্যন্ত নরম গলায় বললেন,
“চলো তূর্ণা, এবার উঠতে হবে মা। আকাশের অবস্থা ভালো না, এখনই মস্ত বড় বৃষ্টি নামবে।”
তূর্ণা কবরের মাটির দিকে তাকিয়েই দুই পাশে মাথা নেড়ে বলল, “আরেকটু থাকি পাপা, প্লিজ! তুমি দেখো না আমি এত কথা বলছি, অথচ আম্মু একটা কথাও বলছে না। আম্মু মনে হয় আমাদের ওপর বড্ড রাগ করে আছে। পাপা, তুমি একবার আম্মুকে ‘সরি’ বলে দাও না? তুমি বললে আম্মু নিশ্চয়ই রাগ ভেঙে কথা বলবে।”
মেহরাব দেওয়ান আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি তূর্ণার পাশে ভেজা ঘাসের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। রিনির শ্বেতপাথরের ফলকটার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত রুদ্ধ, ধীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“এভাবে আমাদের সবাইকে একা ফেলে, এত বড় শাস্তি দিয়ে না গেলেও তো পারতেন রিনি…” ওনার চোখ বেয়ে এবার টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল রিনির কবরের ওপর। ওনার কণ্ঠরোধ হয়ে এল, বুকের ভেতরটা এত ভারী হয়ে উঠল যে এর পর আর একটি শব্দও ওনার মুখ দিয়ে বের হলো না।
ঠিক তখনই মেঘ ভেঙে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মেহরাব দেওয়ান কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে তূর্ণার হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন,
“চলো সোনা, খুব বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের তাড়াতাড়ি গাড়িতে ফিরতে হবে, চলো।”
কিন্তু তূর্ণা এবার মেহরাব দেওয়ানের হাত থেকে এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। সে রিনির ভেজা কবরের ওপর ডুকরে কেঁদে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিজের দুটো ছোট হাত দিয়ে পুরো কবরটাকে শক্ত করে জাপ্টে ধরে সে চিৎকার করে বলে উঠল,
“পাপা, দেখো কত বৃষ্টি হচ্ছে! আমার আম্মু তো একা একা এখানে পুরো ভিজে যাবে! আমি যাব না পাপা, আমি আম্মুকে ধরে এখানে একটু থাকি। বৃষ্টিটা কমলেই চলে যাব। এভাবে ভিজলে তো আমার আম্মুর খুব ঠান্ডা লেগে যাবে পাপা! আমি আম্মুকে ছেড়ে কোথাও যাব না, কিচ্ছুতেই যাব না!”
মেহরাব দেওয়ানের চোখ দুটো আবার জলে ভেসে গেল। বৃষ্টির জল আর চোখের জল একাকার হয়ে ওনার গাল বেয়ে পড়তে লাগল। তিনি তূর্ণাকে কবর থেকে টেনে তুলে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলেন। ওনার অবুঝ মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
“আমার সোনা মা আমার, চলো লক্ষ্মীটি। পরে আমরা আবার আসব, আম্মুকে আবার দেখে যাব। তুমি এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে যে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়বে সোনা। আর তুমি অসুস্থ হলে কিন্তু তোমার এই আম্মু উপর থেকে খুব বকবে তোমাকে, তোমার ওপর মস্ত বড় অভিমান করবে।”
বাবার মুখে ‘আম্মু রাগ করবে’ কথাটা শুনে তূর্ণা ওনার বুকের ভেতর থেকে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখ দুটো তখনো অশ্রুসজল। সে মলিন মুখে জিজ্ঞেস করল, “আমি ভিজলে আম্মু সত্যি রাগ করবে, পাপা?”
মেহরাব দেওয়ান মেয়ের কপালে একটা চুমু খেয়ে আলতো করে মাথা নেড়ে বললেন, “হুম, খুব রাগ করবে।”
আম্মুর রাগ করার কথা শুনে তূর্ণা আর কোনো বাধা দিল না। সে নিস্পৃহের মতো বাবার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। মেহরাব দেওয়ান তূর্ণাকে আগলে ধরে নিয়ে গিয়ে সাবধানে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে দিলেন।
জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। চাকার নিচে বৃষ্টির পানি ছিটিয়ে গাড়িটা ধীরে ধীরে হাওলাদার বাড়ির চত্বর ছেড়ে চেনা রাস্তার দিকে চলতে শুরু করল। তূর্ণা গাড়ির ভেতরের কাঁচ সরিয়ে পেছনের দিকে মুখ ফিরিয়ে হাত নাড়তে লাগল। ঝাপসা বৃষ্টির আবছায়ার মাঝে তূর্ণার নিষ্পাপ মন হঠাৎ এক অলৌকিক দৃশ্য দেখতে পেল, সে স্পষ্ট দেখল, কবরের পাশে রিনি দাঁড়িয়ে আছে। রিনির মুখে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো অসুখ নেই। রিনিও তার দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি করে হাসছে আর পরম মমতায় হাত নাড়িয়ে ওনার ছোট্ট রাজকন্যাকে বিদায় জানাচ্ছে।
তূর্ণার ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে এক টুকরো শান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে হাত নাড়তেই থাকল, যতক্ষণ না রিনির সেই মায়াবী অবয়বটা বৃষ্টির কুয়াশায় পুরোপুরি মিলিয়ে গেল।
(প্রিয় পাঠক এই অংশটা পড়ে মন খারাপ হলে আমি বলব কয়েকমিনিট এই পর্বটা পড়া থেকে বিরতি নিয়ে তারপর গল্পের বাকি অংশ পড়ুন।)
★★★
মির্জা বাড়ির সুপরিসর ড্রয়িংরুমে তখন ভরপুর পারিবারিক আড্ডার আসর বসেছে। আড্ডার চেনা হাসির রোলে পুরো ঘরটা মুখরিত। মিতু আর রোহানের বিয়ের এতগুলো বছর কেটে গেলেও আজও তাদের কোনো সন্তান হয়নি। তবে এই নিয়ে মিতুর মনে যে তীব্র আফসোস আর আক্ষেপ ছিল, সময়ের সাথে সাথে তা যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে। এখন আর সে এসব নিয়ে আগের মতো মন খারাপ করে বসে থাকে না। থাকবেই বা কেন, রোদসী একাই তো পুরো মির্জা বাড়ি নিজের চঞ্চলতায় সারাদিন মাতিয়ে রাখে!
ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় আদনানের গা ঘেঁষে বসে খুব গম্ভীর মুখে কী যেন আলোচনা করছে ছোট রোদসী। সে আদনানকে মিষ্টি গলায় ‘আদু চাচ্চু’ বলে ডাকে। এই অদ্ভুত সুন্দর আর আদুরে ডাকটা তাকে আর কেউ নয়, স্বয়ং নৌশিই শিখিয়েছে।
হঠাৎ রোদসী আদনানের শার্টের হাতাটা টেনে ধরে আবদারের সুরে বলল,
“আদু চাচ্চু, আমাকে একটু গল্প তোনাবে? এতটা থুন্দর গল্প বলো না!”
আদনান কিছুটা সময় গম্ভীর হওয়ার ভান করে ভাবল। তারপর রোদসীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে অত্যন্ত রসিয়ে রসিয়ে বলতে শুরু করল,
“শোনো তবে রোদ সোনা, এক দেশে ছিল এক মস্ত বড় কালনাগিনী! সেই কালনাগিনী দেখতে কিন্তু ছিল ভীষণ সুন্দর, একদম পরীর মতো। কিন্তু ওই যে বলে না রূপ থাকলে কী হবে, ভেতরের বিষ তো আর সহজে যাবে না! ওরে বাবা, সে কী বিষাক্ত সাপের মতো সবসময় ফোঁস ফোঁস করতেই থাকত! কথায় কথায় নিজের বেচারা স্বামীকে বিছানা থেকে লাথি মেরে নিচে ফেলে দিত। তো একদিন হলো কী…”
আদনানের মুখের কথা আর শেষ হলো না! ঠিক তার পরের মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমের অন্য প্রান্ত থেকে সোফার কুশন তীব্র গতিতে ছুটে এসে সরাসরি আদনানের মুখের ওপর আছড়ে পড়ল। আদনান মুখ থেকে বালিশটা সরিয়ে দেখল সামনে নৌশি দুই কোমরে হাত দিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর সেই রণচণ্ডী রূপ দেখে পাশে বসা ছোট রোদসী খিলখিল করে হাসতে লাগল। আদনান নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে নওশীনের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী রে রাক্ষসী! এই বালিশটা এভাবে ছুঁড়ে মারলি কেন আমার সুন্দর মুখটায়?”
“মারব না তো কী করব? আমার নামে এই ড্রয়িংরুমে বসে এসব কী আজেবাজে গল্প বলা হচ্ছিল শুনি?” নৌশি চোখ বড় বড় করে তর্জনী উঁচিয়ে বলল।
আদনান ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে রোদসীর দিকে তাকাল। তারপর বলল,
“রোদ সোনা, আমরা এখানে কাকে নিয়ে গল্প বলছিলাম বলো তো?”
রোদসী দুই হাত তুলে সানন্দে বলল, “কালনাগিনীকে লিয়ে!”
“তার মানে কী বুঝলে ম্যাম?” আদনান নৌশির দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বলল। আর বলামাত্রই আদনান আর রোদসী দুজন মিলে একে অপরের হাতের তালুতে হাই-ফাইভ দিয়ে ‘হায় হায়’ করে একজোটে হেসে উঠল।
নৌশি এবার চরম রেগে গিয়ে আদনানকে শায়েস্তা করার জন্য এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেন একটা খুঁজতে লাগল। ফুপির সেই মারকুটে চাউনি দেখেই রোদসী সোফার ওপর দাঁড়িয়ে দুই হাত নেড়ে চিৎকার করে উঠল,
“নাদান ফুপি ক্ষ্যাপে গেছে! পালাও আদু চাচ্চু, তলদি পালাও!”
রোদসীর এই ওয়ার্নিং শোনা মাত্রই আদনান এক লাফে সোফা থেকে মেঝেতে নামল। ততক্ষণে নৌশি নিজের পায়ের চটি জুতোটা হাতে তুলে নিয়েছে। ব্যস! জুতো হাতে নৌশি আর আগে আগে প্রাণভয়ে আদনান দুজনে মিলে পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে গোল হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। হঠাৎ দৌড়াতে দৌড়াতে আদনান সামনে যাকে পেয়েছে, এক ঝটকায় লাফ দিয়ে সরাসরি তার কোলেই উঠে গেল। ড্রয়িংরুমের সবাই এক মুহূর্তের জন্য একদম অবাক, স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ওনাদের দিকে।
নৌশির হাতের জুতো উঁচানো দৌড়টাও ওখানেই আচমকা থমে গেল। কারণ, আদনান যার কোলে লাফ দিয়ে উঠেছে, সে আর কেউ নয় সরাসরি নির্জন! ঠিক তখনই নির্জন আর নুসরাত ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করছিল, আর ঠিক সেই মোক্ষম সময়েই আদনান এই কাণ্ডটা ঘটিয়ে বসল।
আদনান পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নির্জনের কোল থেকে এক লাফে মেঝেতে নেমে নিজের শার্টটা টেনেটুনে ঠিক করে নিল। নির্জন কপালে ভাঁজ ফেলে আদনানের কানটা চেপে ধরে টেনে দিয়ে বলল,
“পড়াশোনা শেষ করে এখন দিব্যি একটা চাকরি করছিস, বড় হয়েছিস, তাও কি তোর এই ভণ্ডামি আর বাঁদরামিগুলো ছাড়বি না, আদনান?”
আদনান কানের ব্যথায় একটু উঁহু করে উঠেও নিজের স্বভাবসুলভ বাঁকা হাসি হেসে বলল,
“সব কিছু ছেড়ে দিতে পারি ভাইয়া, তবে এই এক জীবনে ভণ্ডামি আমি ছাড়তে পারব না। ভণ্ডামি জিনিসটা আমার
রক্তে মিশে গেছে, বুঝলে?”
এদিকে নুসরাত এগিয়ে এসে নৌশির কানটা আলতো করে টেনে ধরে হেসে বলল, “আর তুই? এই সব দুষ্টামি একটু রেখে এবার একটু নিজের সংসারে মন দে তো দেখি!”
নৌশি আর এক মুহূর্তও রাগ ধরে রাখতে পারল না। সে জুতোটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে নুসরাতকে আদরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নুসরাত এখন সন্তানসম্ভবা, ওনার পেটটা বেশ খানিকটা বড় হয়েছে। নৌশি নুসরাতের পেটের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী চোখে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা আপু, তোমার পেটের এই পিচ্ছি আণ্ডাটা কবে নাগাদ এই দুনিয়ায় আসবে বলো তো? আমার তো আর তর সইছে না!”
নুসরাত নৌশির কপালে একটু টোকা দিয়ে হেসে বলল, “দেরি আছে এখনো, অত তাড়াহুড়ো করতে হবে না।”
নির্জন আর নুসরাত এরপর ড্রয়িংরুমের সবার সাথে একে একে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল। এতক্ষণ পর আরিয়ান এসে ড্রয়িংরুমের সোফাটায় একটু ক্লান্ত হয়ে বসল। সে চোখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখল তৃণা আর মিতু ওরা রান্নাঘরে রাতের খাবারের তদারকি করছে।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে তৃণার কড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“রোদ্দুরের কপালে আজ শনি আছে! সকাল থেকে মেয়েটা কিচ্ছু মুখে দেয়নি। সারাদিন শুধু দুষ্টুমি করা।”
পাশে দাঁড়িয়ে মিতু মৃদু হেসে আদুরে গলায় বলল,
“ বকো না তো তৃণা! ছোট বাচ্চা, ও একটু পরেই খেয়ে নেবে। এসো তো সোনা, আমি নিজে তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি।”
তৃণা রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে একটু রেগে মুখ বাড়িয়ে বলল, “তোমাদের সবার এই অতিরিক্ত আদরে আদরেই রোদ্দুর দিন দিন একদম বাঁদর হয়ে যাচ্ছে! সারাক্ষণ শুধু দুষ্টামি আর দুষ্টামি, কোনো প্রহরে ও শান্ত থাকে না।”
মায়ের এই কড়া শাসন আর বকুনি শুনে ছোট্ট রোদ্দুর আর দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ মনে করল না। সে গুটিগুটি পায়ে আরিয়ানের কাছে গিয়ে সোজা কোলে উঠে বসল। তারপর আরিয়ানের শার্টের কলারটা ধরে গম্ভীর মুখে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“পাপা… আম্মু কি তোনার তৎ বউ? দেখেছ, আনাকে তকাল-বিকাল কীভাবে বকে! শুধু আনাকেই নয়, মাতে মাতে (মাঝে) তো দেখি তোনাকেও কেমন বকে!”
রোদ্দুরের এই পাকা পাকা কথা আর নিষ্পাপ মুখের প্রশ্ন শুনে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত নির্জন, নুসরাত, আদনান থেকে শুরু করে প্রত্যেকে একযোগে হো হো করে হেসে উঠল।
আরিয়ান এবার রোদ্দুরের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একটু মলিন হেসে বলল,
“আসলে কী হয়েছে জানো রোদ্দুর? তোমার আম্মুর পাপা, একমাত্র বড় বোন তারা সবাই না খুব অল্প সময়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। সেই প্রিয় মানুষগুলোকে হারানোর গভীর কষ্টেই তোমার আম্মুর মেজাজটা সবসময় একটু খিটখিটে থাকে সোনা।”
রোদ্দুর বাবার কথা শুনে নিজের বড় বড় চোখ দুটো গোল গোল করে জিজ্ঞেস করল, “আম্মু কি কাঁদে, পাপা?”
“হুম, বড্ড কাঁদে।” আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
রোদসী এবার খুব ভাবুক আর গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা… তাই বুঝি!”
এরই মাঝে মিতু প্লেটে করে রোদসীর জন্য গরম গরম খাবার নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসল। মিতু আর রোহানের কোনো সন্তান না হলেও, মিতু যেন এই রোদসীকেই নিজের গর্ভজাত সন্তানের মতো মনে করে। রোদসীর সামান্য কিছু হলে, একটা আঁচড় লাগলে সবার আগে মিতুই উন্মাদের মতো উতলা হয়ে পড়ে। আর তাদের ঠিক পাশেই মিহু এবং লিলি দুই পোষা বিড়াল পরম আনন্দে খুনসুটি করে বেড়াচ্ছে। মিহু তো এখনো সেই আগের মতোই তৃণা-নেউটো হয়ে আছে, সারাক্ষণ ছায়ার মতো তৃণার পিছু পিছু ঘোরে সে। আরিয়ান সেই নিয়ে জেলাসি করতে ভুলে না।
রান্নাঘরের কাজ শেষ করে তাদের পাশে এসে এবার তৃণাও বসল। সবাই মিলে বেশ চমৎকার এক আড্ডার আসর জমিয়েছে। ঠিক তখনই আরিয়ান সবার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চিলতে হেসে বলে উঠল,
“শোনো সবাই, তোমাদের সবার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে!”
আরিয়ানের কথা শুনে আদনান, নৌশি থেকে শুরু করে সবাই কৌতূহলী হয়ে একসাথে বলে উঠল,
“কী সারপ্রাইজ ভাইয়া? বলো না, কী রকম?”
আরিয়ান তৃণার দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“আমি প্ল্যান করেছি, আগামী সপ্তাহে আমরা সকলে মিলে একসাথে পাহাড় দেখতে যাব। অনেক দিন তো হলো, এবার সবাই মিলে একটু ঘুরে আসা যাক।”
পাহাড় ভ্রমণের কথা শুনে ড্রয়িংরুমের সবাই এক নিমেষে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। কিন্তু সবার সেই আনন্দের মাঝেই তৃণা একটু নিচু স্বরে বলল,
“তোমরা সবাই মিলে ঘুরে এসো, আমি না হয় অন্য একসময় যাব। এই মুহূর্তে আমার ঠিক ভালো লাগছে না।”
তৃণার এই একটি কথায় ড্রয়িংরুমের চেনা আনন্দের আবহটা দপ করে নিভে গেল, সবার মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মুড অফ হয়ে গেল। তৃণা এখনো তার বড় বোন রিনি আর বাবা উমর হাওলাদারকে হারানোর সেই গভীর শোক ও কষ্ট মন থেকে পুরোপুরি ভুলতে পারেনি, তাই কোনো উৎসব বা ভ্রমণ তাকে টানে না। সবার মলিন মুখের অবস্থা দেখে তৃণা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“এ কী! সবার মুখের অবস্থা এমন হয়ে গেল কেন? তোমরা সকলে ঘুরে আসো না, প্লিজ! আমি না হয় অন্য কোনো এক সময় সুযোগ বুঝে যাব।”
ঠিক তখনই ছোট রোদসী গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে তৃণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের মায়াবী গলায় বলল, “তলো না আম্মু, আমরা তবাই যাই! আনি কখনো তামনাতামনি পাহাড় দেখিনি। ওই দিন আদু চাচ্চু আনাকে বলল পাহাড়ে নাকি যেখানে-সেখানে মানুষ প্রকৃতির কাজ সেরে, পেট পরিষ্কার করতে পারে! ওই বড় বড় পাহাড়ের আড়ালে নাকি বাথরুম করতে খুব মজা!”
রোদসীর মুখে পাহাড়ের এমন অদ্ভুত ও লজ্জাজনক বর্ণনা শুনে ড্রয়িংরুমের সবাই এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, তারপরই সবার তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে পড়ল আদনানের ওপর। আদনান পরিস্থিতি বেগতিক দেখে লজ্জায় লাল হয়ে রোদসীকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“হায় রে আমার কপাল! তুই সবার সামনে এভাবে আমার মান-ইজ্জতের ফালুদা বানাতে পারলি, রোদ সোনা?”
নৌশি এবার সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কোমর বেঁধে বলল, “দেখলে ? দেখলে তোমরা ? এই কারণেই এই আদুর বাচ্চার ওপর আমার সারাক্ষণ এত রাগ হয়! আমাদের এতটুকু নিষ্পাপ রোদ সোনাকে ও কীভাবে পাহাড়ের বর্ণনা দিয়েছে দেখেছ? ও নিজে একটা আস্ত গোঁয়ার, তাই পাহাড়ের সৌন্দর্য বাদ দিয়ে ও বাথরুমের গল্প শোনায়!”
আদনান আর নৌশির এই চিরচেনা কাণ্ড দেখে ড্রয়িংরুমের বাকিরা হাসবে নাকি কাঁদবে, তা যেন ভেবেই পাচ্ছিল না। হাসির একটা হালকা হাওয়া আবার পুরো ঘরে বইতে শুরু করল। সবাই যখন শান্ত হলো, আরিয়ান এবার তৃণার খুব কাছে এসে বসল। অত্যন্ত মায়াবী ও মৃদুস্বরে বলল,
“চলো না তৃণা, সবাই মিলে যাওয়া যাক একবার। তোমাকে সাথে নিয়ে মেঘে ঢাকা পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটার বড্ড শখ আমার। তোমার মনটাও একটু ভালো হবে।”
স্বামীর চোখের সেই গভীর ভালোবাসা আর আকুলতার দিকে তৃণা কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর সবার ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরের কষ্টটাকে একটু আড়াল করে মৃদু হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, চলো। তোমরা যখন এত করে বলছ, আমি যাব।”
তৃণার মুখ থেকে এই হ্যাঁ-সূচক শব্দটা শোনার সাথে সাথেই পুরো ড্রয়িংরুমের সবাই একসাথে ‘হৈ হৈ’ করে মেতে উঠল। আদনান আর রোদসী তো খুশিতে সোফার ওপরই নাচতে শুরু করে দিল। পরপর ঘটে যাওয়া অতলান্ত শোকের কালো মেঘ কাটিয়ে মির্জা পরিবারে যেন আবার এক ফালি সোনালী রোদ্দুর এসে উঁকি দিল।
★★★
প্রকৃতির ক্যানভাসে যেন কোনো এক অপার্থিব মায়ার কারিগরি। দুই পাশে আকাশ ছোঁয়া অহংকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুগম্ভীর সবুজ পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের সেই গাঢ় সবুজের চাদর ছুঁয়ে ওপরে বিছিয়ে আছে এক চিলতে মেঘ, শান্ত নীল আকাশ। নীল আর সবুজের এই যে মিতালী, তা যেন হলিউড বা বলিউডের যেকোনো কাল্পনিক সিনেমার দৃশ্যকেও অনায়াসে হার মানায়। সৃষ্টিকতা যেন পরম যত্নে এই উপত্যকাটিকে সাজিয়েছেন। পাহাড়ের বুক চিরে সর্পিল গতিতে এঁকেবেঁকে চলে গেছে মসৃণ পিচঢালা পথ। সেই পথের দুই পাশে শুধু চোখ জুড়ানো সবুজই নয়, মেলা বসেছে রঙের উৎসবের। বুনো লতা আর সুবিন্যস্ত গাছের ডালে ডালে ফুটে আছে নাম না জানা হাজারো লাল, হলুদ আর বেগুনি ফুলের বাহার। পাহাড়ি হাওয়া যখন সেই ফুল ছুঁয়ে বয়ে যায়, তখন পুরো উপত্যকায় যেন এক মাদকতাময় সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।
এমন দৃশ্য, যেখানে একবার চোখ পড়লে আর চোখ ফিরিয়ে নেওয়া মুশকিল, পলক ফেললেই যেন মনে হয় জীবনের সেরা কোনো মুহূর্ত মিস হয়ে যাবে। আর এই অপার্থিব সৌন্দর্যের বুক চিরে, রূপকথার রাজকীয় রথের মতো ধীরলয়ে ছুটে চলেছে একটি বিলাসবহুল ভিআইপি বাস। বাসের বিশাল কাচের জানালার ওপাশে তখন মোহাচ্ছন্ন এক নীরবতা। সেই বাসের নরম, আরামদায়ক আসনে বসে আছেন মির্জা পরিবারের সকল সদস্য।
আরিয়ান হঠাৎ গাড়িটা থামতে বলল। গাড়ি থেমে গেল। একে একে সকলে বাস থেকে নেমে গেল। বাড়ির চার জুটি সবাই এসেছে। তবে এই পাহাড়ে বয়স্করা কেউ আসেনি। সকলে মুগ্ধ প্রকৃতির এত সুন্দর রুপ দেখে। রোদসী তার পাপার হাত ধরে আছে বারবার জিজ্ঞেস করছে এটা কি সেটা কি। নুসরাত নির্জন হাত ধরে হাঁটছে। রেহান, মিতু সকলের চোখে মুখে আনন্দ উচ্চাস ভালোবাসা।
আর অন্য দিকে আদনান আর নৌশি ওরা দুজন রাস্তার পাশে এটা-ওটা দেখে একেকবার একদম বাঁদরের মতো লাফাচ্ছে। কখনো সুন্দর কোনো পাহাড়ি পাথর দেখে আদনান নৌশিকে দেখাচ্ছে, তো পরমুহূর্তেই আবার কোনো একটা সামান্য বিষয়ে দুজনের মাঝে ধুন্ধুমার ঝগড়া লেগে যাচ্ছে। ওদের এই মিষ্টি আর চিরচেনা খুনসুটি দেখে পুরো ট্যুরটাই যেন বাকি সবার কাছে আরও বেশি প্রাণবন্ত আর সুন্দর হয়ে উঠছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আদনানের চোখ গেল পাহাড়ের ঢালে ফোটা এক অদ্ভুত সুন্দর বুনো ফুলের দিকে। ফুলগুলোর গঠন বেশ চমৎকার একটি বড়, চওড়া পাতার আবরণের ঠিক ভেতর থেকে মোচার মতো বা একটা লাঠির মতো পুংকেশর সোজা হয়ে বেরিয়ে এসেছে। ফুলগুলো দেখতে একদম গাঢ় হলুদ রঙের, পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
সৌন্দর্যপ্রেমী আদনান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। নৌশিকে ইমপ্রেস করার জন্য সে রাস্তার পাশ থেকে কসরত করে সেই হলুদ ফুলটা টেনে তুলে নিল। তারপর বেশ একটা বীরত্বের ভাব নিয়ে এসে দাঁড়াল নৌশির ঠিক সামনে। আদনানের হাতে ওই রকম সুন্দর একটা পাহাড়ি ফুল দেখে নৌশির ফর্সা মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই আদনান হিরোদের মতো এক হাঁটু গেঁড়ে মাটির ওপর বসে পড়ল। ফুলটা নৌশির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত নাটকীয় কণ্ঠে বলে উঠল,
“প্রিয় নাদান বউ আমার! এই অধমের হাতের বুনো ফুলটা গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করুন।”
নৌশি তো তখন আনন্দে একদম আত্মহারা। সে আদনানের এই রোমান্টিক রূপ দেখে গলে জল হয়ে হাত বাড়িয়ে ফুলটা যেই না নিতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে মিতু ওনাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
“ নৌশি, হাত দিয়ো না! ওটা বুনো কচু গাছের ফুল! হাত দিলেই কিন্তু সারা শরীর চুলকানি আরম্ভ হয়ে যাবে!”
মিতুর মুখ থেকে ‘কচু ফুল’ আর ‘চুলকানি’ শব্দটা শোনামাত্রই আদনানের ভেতরের সমস্ত রোমান্স এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে গরম ছ্যাঁকা খাওয়ার মতো হাতের ফুলটা এক ঝটকায় দূরে ছুঁড়ে মারল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে! বুনো কচুর কষ ওর হাতে লেগে গেছে এবং সত্যিই হাতটা তীব্রভাবে চুলকাতে শুরু করেছে।
আদনান এবার উন্মাদের মতো এক হাত দিয়ে অন্য হাত চুলকাতে চুলকাতে বাঁদরের মতো লাফালাফি শুরু করে দিল, “উফ! ওরে বাবারে, মরে গেলাম রে! এ তো দেখি আসলেই মারাত্মক চুলকাচ্ছে!”
এদিকে নৌশি তো আদনানের এই আকস্মিক হাল দেখে হাসতে হাসতে একদম শেষ! সে পেটে হাত দিয়ে রাস্তার ওপর বসে পড়ার মতো অবস্থা। আদনান চুলকানির চোটে অস্থির হয়ে নৌশির দিকে বড্ড অসহায় আর করুণ চোখে তাকিয়ে বলল,
“তোর স্বামী এখানে চুলকে মরে যাচ্ছে, আর তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছিস?”
স্বামীর ওই রকম কাঁচুমাচু আর অভাগা মুখটা দেখে এবার নৌশির মনে একটু মায়া হলো। সে নিজের হাসিটা কোনোমতে চেপে ধরে এগিয়ে এল। আদনানের সেই চুলকানো হাতটা আলতো করে নিজের দুই হাতের মুঠোয় টেনে নিল। তারপর হাতের তালুতে খুব যত্ন করে মুখ নামিয়ে ‘ফুঁ’ দিতে লাগল, যেন পাহাড়ি হাওয়ার সাথে মুখের ফুঁ আদনানের চুলকানিটা একটু কমিয়ে দেয়।
ঠিক তখনই, আদনানকে একদম চমকে দিয়ে নৌশি হাতের অঞ্জলিতে হঠাৎ নিজের নরম ওষ্ঠ স্পর্শ করাল এক পরম ভালোবাসার আলতো চুমু এঁকে দিল আদনানের হাতে।
নৌশির এই আকস্মিক ও অতর্কিত ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়ে আদনান এক পরম শান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। মনে হলো হাত চুলকানো তো দূর, এই ছোঁয়ায় দুনিয়ার সমস্ত কষ্ট এক নিমেষে গায়েব হয়ে যেতে পারে। আদনান চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ওনার চেনা বাঁকা হাসি হেসে ফিসফিস করে বলল,
“এই তো আদনান মির্জা এই নাদান বউয়ের ভালোবাসার সাগরে ডুবে মরে গেল রে!”
আদনানের এই চিরচেনা ফ্লার্ট করার সংলাপ শুনে নৌশি লজ্জায় লাল হয়ে ওনার বুকে একটা মৃদু চাপড় দিয়ে খিলখিল করে হেসে দিল। পাহাড়ের বুকে ওনাদের এই অমলিন হাসির শব্দটা যেন বুনো ফুলের সুবাসের সাথে মিশে চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি মধুর করে তুলল।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টির এক মায়াবী পর্দা নেমে এল পুরো পাহাড়ি উপত্যকা জুড়ে। অথচ কয়েকবছর আগের সেই দিনটার মতো কোনো আতঙ্ক বা হাহাকার নেই; আজ তৃণা যেন এই বৃষ্টিকে পরম সানন্দে, এক বুক ভালোবাসা দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে। বিগত দুই-তিনটে মাস ধরে যে মেয়েটার মলিন মুখে এক চিলতে হাসির রেখা পর্যন্ত দেখা যায়নি, আজ সে প্রকৃতির এই বৃষ্টির ছোঁয়ায় প্রাণ খুলে হাসছে। ঠিক এই সর্পিল পাহাড়ি রাস্তাটায় দাঁড়িয়েই আরিয়ান প্রথমবার দেখেছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার, তার এই ‘শ্যামলিনী’কে। আরিয়ান তখন ছোট্ট রোদসীর একটা আঙুল পরম আদরে ধরে রেখেছিল। তৃণার পরনে ঠিক সেই প্রথম দেখার দিনটার মতোই আজও জড়িয়ে আছে এক চমৎকার নীল রঙের গাউন জামা। লম্বা, রেশমি কালো চুলগুলো কাঁধ বেয়ে পিঠ ছুঁয়ে কোমর অবধি ছড়িয়ে আছে, যা বাতাসের দোলায় আলতো করে উড়ছে।
হঠাৎ করেই যেন তৃণার ভেতরের জমানো সব মেঘ কেটে গিয়ে আনন্দটা আকাশছোঁয়া হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় আরিয়ানের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে, দুই হাত ডানা মেলার মতো মেলে দিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তে ছুটে গেল। আকাশের দিকে মুখ তুলে, বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটার ছন্দ আর সুরের সাথে তাল মিলিয়ে তৃণা আনন্দের আতিশয্যে গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। আরিয়ান এক মায়াবী মোহাচ্ছন্নতায় পলকহীন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক এই একভাবেই তো সেদিনও তৃণা নেচেছিল, কিন্তু সেদিন আরিয়ানের অধিকার ছিল না ওকে ছোঁয়ার, আর আজ সে তার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে ঠিক সামনেই ডানা মেলেছে।
আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোদসীকে নিজের শক্ত তুলে নিল। রোদসীও তার পাপার গলা জড়িয়ে ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার মায়ের এই অপরূপ জলপরী রূপ দেখছে। আরিয়ান তৃণার দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো চকচক করে রোদ্দুরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“রোদ্দুর সোনা দেখেছ, তোমার আম্মু কত সুন্দর!”
রোদ্দুর মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে পাপার মতোই এক সুরে বলল, “আম্মু এত্ত তুন্দর কেন, সেটা কিন্তু আনি খুব ভালো করেই জানি, পাপা।”
আরিয়ান একটু অবাক হয়ে রোদসীর মিষ্টি নাকটা টেনে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাই নাকি? কেন বলো তো সোনা?”
“ওই দিন নাদান ফুপি আনাকে গোপনে বলেছে, তুনি নাকি আম্মুকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেতি ভালুবাসু, আর পাপার ভালুবাসার ম্যাজিক আছে বলেই আমার আম্মু দিন দিন এত বেশি তুন্দর হয়ে যাচ্ছে!”
রোদ্দুরের মুখে নৌশির শেখানো এমন কথা শুনে আরিয়ান আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। রোদ্দুর এবার একটু গম্ভীর হয়ে, মুখটা গোল করে আবার বলল,
“জানো পাপা আনাদের পাশের বাড়ির ওই যে পচা বাচ্চাটা আছে না? ও সেদিন আনাকে বলল ‘তোর আম্মু দেখতে একদম তুন্দর না, তোর আম্মু কালো!’ ও আমার এত তুন্দরী আম্মুকে কালো বলেছে, এই জন্য আমি রেগে গিয়ে ওর চোখে গুঁতো দিয়ে দিয়েছিলাম! ওর চোখটা মোটেও ভালো না, তাই আমার আম্মুকে ও কালো দেখে!”
আরিয়ান এবার একটু শাসনের সুর এনে, চোখ বড় বড় করে বলল, “একদম না সোনা! ওভাবে কারও চোখে আঘাত করে না। এই রকম দুষ্টুমি আর কখনো করবে না, কেমন?”
রোদ্দুর বাবার শাসনের চোটে একটু ধীর ও জেদি কণ্ঠে ওনার বুক ঘেঁষে বলল,
“আমি এমনি এমনি তো মারিনি পাপা। আমার আম্মুকে নিয়ে কেউ কোনো আতেবাতে (আজেবাজে) তথা বললে আমি তো তাকে ছাড়ব না, বারবার বলব!”
মেয়ের এই মা-ভক্ত আর পাকা পাকা কথা শুনে আরিয়ান মনে মনে হাসলেও মুখে আর কিছু বলতে পারল এরই মাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি রূপ নিল বড় বড় ফোটার মুষলধারে। মিতু দূর থেকে আঁচল মাথায় দিয়ে দৌড়ে কাছে এসে উদগ্রীব হয়ে বলল,
“আর ভিজো না আরিয়ান! রোদ্দুর সোনা, এসো জলদি। এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে কিন্তু তোমার রাতেই ধুম জ্বর চলে আসবে। চলো লক্ষ্মী মা আমার!”
মায়ের মতো যত্নশীল মিতুর কথা রোদ্দুর আর অমান্য করল না। সে এক বাধ্য মেয়ের মতো আরিয়ানের কোল থেকে নেমে মিতুর হাত ধরে হনহন করে গিয়ে বাসের আরামদায়ক সিটে গিয়ে বসল। আর আরিয়ান তখনো বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে নীল গাউন পরিহিত শ্যামলিনীর দিকে চেয়ে রইল, যে আজ সব শোক ভুলে মেঘেদের দেশে ডানা মেলেছে।
আরিয়ান প্যান্টের পকেটে দুটি হাত ঢুকিয়ে দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল রাস্তার অপর প্রান্তের ভেজা সবুজ ঘাসগুলোর ওপর। সেখানে কোনো এক অপার্থিব ঘোর নিয়ে পরম আনন্দে বৃষ্টিবিলাস করছে তৃণা। তাদের থেকে বেশ খানিকটা দূরে পাহাড়ের বাঁকে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিলাসবহুল বাসটি।
ঠিক এই মুহূর্তে আরিয়ানের মনে হলো, সময়ের চাকা যেন উল্টো ঘুরে আজ থেকে ঠিক সাত-আট বছর আগের সেই জাদুকরী দিনটায় এসে থমকে গেছে। সেদিনও ঠিক এই পাহাড়ের বুকেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছিল, আর আজও ঠিক একইভাবে আকাশ ভেঙে শ্রাবণের ধারা নামছে। সবচেয়ে বড় বিস্ময়, সেদিনও তৃণার পরনে ছিল এক আকাশ-নীল গাউন জামা, আর আজও সে ঠিক একই পোশাকে মেঘের দেশের এক নীলপরী হয়ে ডানা মেলেছে।
স্মৃতির এই আকস্মিকতা আর তৃণার মুখের ওই বাঁধভাঙা প্রাণখোলা হাসি দেখে আরিয়ানের চোখের কোণ বেয়ে হঠাৎ করেই কয়েক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। এ জল কোনো কষ্টের নয়, এ হলো এক বুক পরম শান্তি আর প্রাপ্তির আনন্দের অশ্রু। সে ধীর পায়ে বৃষ্টির জল ডিঙিয়ে তৃণার দিকে এগিয়ে গেল। তৃণার থেকে ঠিক ততটুকুই দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল, যতটুকু দূরত্বে দাঁড়িয়ে আজ থেকে বছরসাতেক আগে এক অচেনা ছটফটে মেয়েকে প্রথমবার দেখেছিল সে।
সেদিন বুকের ভেতর যে কথাটা শুধুই এক অতৃপ্ত আকুলতা হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, আজ আরিয়ান সমস্ত অধিকার আর ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে ঠিক সেই একই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“এই মেয়ে, কে তুমি? এত মায়া, এত জাদু কেন তোমার মাঝে?”
আরিয়ানের সেই চেনা কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছামাত্রই তৃণা মায়াবী নাচ থামিয়ে দিল। সে আলতো করে নিজের ঘূর্ণন থামিয়ে আরিয়ানের চোখের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকাল। চারদিকের বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দের মাঝেই সে ঠোঁটের কোণে স্মিথ হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর অথচ প্রেমময় কণ্ঠে জবাব দিল
“আমি এক মহাপুরুষের অর্ধাঙ্গিনী।”
তৃণার মুখের এই একটি লাইন শোনামাত্রই আরিয়ানের সমস্ত গাম্ভীর্য ভুলে হো হো করে শব্দ করে হেসে উঠল। এ এক অদ্ভুত আনন্দের হাসি! এতটা খুশি, এতটা গভীর মায়া বুঝি এই এক জীবনে খুব কম মানুষের ভাগ্যেই জোটে। আরিয়ান এবার তাদের মাঝের শেষ সীমানা টুকুও পেরিয়ে তৃণার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। বৃষ্টির প্রচণ্ড ছাটে ওনার গায়ের শার্ট ততক্ষণে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে।
তৃণার চোখের গাঢ় কাজল বৃষ্টির নোনা পানিতে কিছুটা লেপ্টে গিয়ে মায়াবী চোখে এক বুনো মাদকতা এনে দিয়েছে। ভেজা রেশমি চুলের কিছু অবাধ্য গোছা কপালে আর গালে এসে লেপ্টে আছে। আরিয়ান পরম মমতায় তৃণার সেই ভেজা মুখপানের দিকে তাকিয়ে চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“এই হরিণীর মতো সর্বনাশী চোখ দুটোই আমার ইহজীবনের সমস্ত সর্বনাশের মূল কারণ, ওগো আমার শ্যামলিনী কন্যা!”
আরিয়ানের এই স্বীকারোক্তি শুনে তৃণা এবার আর নিজের ভেতরের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারল না। সে আরিয়ানের বুকের ওপর দুই হাত রেখে প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ল। ঠিক একই মেঘলা লগ্নে, একই পাহাড়ি উপত্যকার বুকে যেন নতুন করে আরও একবার মিলন হলো আরিয়ান আর তৃণার দুটি আত্মার এক অভিন্ন মোহনায়। সবুজ পাহাড়ের কোলে বৃষ্টি তখনো ঝমঝমিয়ে ঝরছে, যেন এক অলিখিত ভালোবাসা হয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে মির্জা পরিবারের প্রতিটা মানুষকে।
পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায় কতগুলো মানুষের জীবন কত-শত হাসি, কান্না, দুঃখ, গভীর বেদনা আর তীব্র অভিমানে ওলটপালট হয়ে গেছে। নিয়তির কী অদ্ভুত লিখন! কারও জীবনের খাতায় নির্মম অপূর্ণতার চাদর ভেদ করেও আজ পরম পূর্ণতা এসে ধরা দিয়েছে; আবার কারও জীবনে সমস্ত সুখের মাঝেও এক চিলতে অপূর্ণতা আজীবন এক অলিখিত শোকগাথা হয়ে রয়ে গেছে। জীবনের ক্যানভাসে যদি তীব্র দুঃখ আর অন্ধকারের কালো মেঘ না থাকে, তবে কখনোই পরম সুখের সেই সোনালী আলোর স্বাদ এই ইহজীবনে পাওয়া সম্ভব না।
অতঃপর… এই তীব্র রোদ আর জমাট বাঁধা মেঘের ছায়া, অন্তহীন সুখ আর চাপা দীর্ঘশ্বাসের এক অপূর্ব কোলাজ মিলিয়ে মানুষের জীবন ঠিক যেন—রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র। যেখানে প্রতিটা ছেঁড়া পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে বেঁচে থাকার এক নতুন উপাখ্যান।
(সমাপ্ত)
(প্রিয় পাঠক আপনারা অনেকে জানেন পবিত্র ঈদের পরই ইনশাআল্লাহ “রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র” বইয়ের পাতায় জায়গা পাবে। এতদিন গল্পটার সাথে থাকার জন্য সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা। ভালো খারাপ মিলিয়েই গল্প, হয়তো গল্পটা কোনো জায়গায় আপনার মন মতো হবে না, তবে সেটা কল্পনায় নিজের মতো করে সাজিয়ে নিলেই সেটা সুন্দর রুপ ধারণ করতে সক্ষম। সকলে এভাবেই আমার পাশে থাকবেন। ইনশাআল্লাহ এরচেয়েও ভালো কিছু আপনাদের উপহার দেওয়ার চেষ্টা করব। সবশেষে একটা কথাই বলতে চাই আমি আমার পাঠকদের ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভীষণ রকমের ভালোবাসি।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪১ (স্পেশাল)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬২ ( বর্ধিতাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১