ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৬৩
তাজরীন ফাতিহা
জিনান কল কেটে ডাইনিংয়ে আসতেই দেখল ইরা উল্টো ফিরে কি যেন করছে। সে তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে পিছন থেকে উঁকি দিতেই দেখল ইরা তার রেখে যাওয়া আইসক্রিমের মাঝ বরাবর কামড় দিয়ে আরামছে চিবুচ্ছে। জিনান হতভম্ব গলায় বলল,
“আশ্চর্য ইরা তোমার সমস্যা কী?”
ইরা কেঁপে উঠে পিছু ঘুরে মুখটা ইনোসেন্ট করে বলল,
“কই কোনো সমস্যা নেই তো।”
জিনান অর্ধ কামড়ানো আইসক্রিমটা উঁচু করে ধরে বলল,
“সমস্যা না থাকলে এগুলো কী? তোমার জন্য আনা সব আইসক্রিম খেয়েছ এখন আবার আমার আইসক্রিম ইঁদুরের মতো কামড়ে খেলে কেন?”
ইরা ঠোঁট উল্টে বলল,
“স্বামীর খাবারে স্ত্রীর হক আছে তাই।”
জিনান কপালে আঙুল ঘষে বলল,
“উফফ তুমি আমাকে শান্তি কবে দেবে?”
“প্রতিদিনই তো দেই।”
জিনান এগিয়ে এসে রাগান্বিত গলায় বলল,
“তুমি আমার মানিব্যাগ থেকে টাকাও নাও। সেদিন ঘড়ি কিনতে গিয়ে দেখি টাকা শর্ট। এসব হাতাহাতির স্বভাব কোথা থেকে পেয়েছ তুমি? আমার কাছে চাইলে আমি তোমাকে দেই না? আর তোমার কি টাকার অভাব?”
ইরা জিনানকে রেগে যেতে দেখে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“স্বামীর পকেট হাতানো স্ত্রীর অধিকার।”
জিনান কোমরে হাত বলল,
“আচ্ছা? তা কোন আইনে এসব আজগুবি অধিকার আছে? নাম বলো।”
“Eira’s Law-তে।”
জিনান ইরার ঘাড় ধরে বলল,
“জানতাম এরকম বাকওয়াস আইনেই থাকবে।”
ইরা বলল,
“মারছ কেন? আমি কি বলেছি আমার কোনো দুষ নাই , আমি নির্দুষ?”
জিনান চোখ রাঙিয়ে বলল,
“আবার ফাতরামি করছ?”
ইরা হাসতে হাসতে বলল,
“আউ কাতুকুতু লাগে। ঘাড় থেকে হাত সরাও। একটু আইসক্রিম খেয়েছি দেখে স্ত্রী নির্যাতন করছ তুমি? তোমার নামে মামলা হবে।”
“মামলা তো তোমার নামে দেব ইঁদুরের বাচ্চা।”
ইরা মন খারাপ করে মুখ নামিয়ে নিল। জিনান ঘাড় ছেড়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি হলো?”
ইরা কিছু বলল না। চুপচাপ হেঁটে রুমে চলে গেল। জিনান অর্ধকামড়ানো আইসক্রিমটা ফ্রিজে রেখে রুমে এসে দেখল ইরা চুপচাপ শুয়ে আছে। সে কিছু না বলে মানিব্যাগ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। ইরা দরজা খোলার শব্দে বুঝল জিনান বাইরে গেছে। সে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপচাপ পড়ে রইল। একটু পরে আবারও গেট খোলার শব্দে ইরা বুঝল জিনান এসেছে। হঠাৎ পিছন থেকে জিনান বলল,
“এই ছোঁচা ইঁদুর?”
ইরা ঘাড় ফিরিয়ে চাইল। জিনান এগিয়ে এসে বলল,
“নাও যত ইচ্ছে কামড়াও। কেউ বাঁধা দেবে না। খবরদার রাত বিরেতে কাশির কোনো শব্দ যেন আমার কানে না পৌঁছায়।”
পলিথিন ব্যাগ ভর্তি আইসক্রিম, চকলেট দেখে ইরার চোখ চকচক করে উঠল। সে কিছু বলল না তবুও। মুখ ঘুরিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
“তোমারটা কোনটা?”
জিনান কপাল ভাঁজ করে বলল,
“আমারটা মানে?”
ইরা শুয়ে থেকেই মুখ গম্ভীর রেখে বলল,
“মানে তুমি কোনটা খাবে?”
“আমারটা দিয়ে তোমার দরকার কী? ছোঁচামি করো তাই এনেছি। খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো।”
“তুমি যেটা খাবে আমিও সেটাই খাব। না খেলে আমিও কোনোটা খাব না। বাইরে ফেলে দেব।”
জিনান মুখ শক্ত করে আইসক্রিম, চকলেট সব ফ্রিজে রেখে দিল। এমন ত্যাদড় মেয়ে কস্মিনকালেও দেখেনি সে। পাশের রুমে এসে ল্যাপটপ খুলে কাজে মনোযোগ দিল। জিনান যেতেই ইরা উঠে বসল। খিটমিট করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে এল। আইসক্রিম, চকলেট বের করে পাটায় ছেঁচতে লাগল। জিনান শব্দ শুনে বেরিয়ে এসে এসব দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। এই মাথা পাগল নারী যে আসলেই এমন করবে এটা তো জানা ছিল না। জিনান কড়া গলায় বলল,
“কী করছ তুমি?”
ইরা প্রত্যুত্তর করল না। জিনান ইরাকে চুপ থাকতে দেখে ভীষণ রেগে গেল। এগিয়ে এসে ঘাড় ধরে বলল,
“এই পাগলা ইঁদুর কী করছ?”
ইরা নিজের কাজ না থামিয়ে বলল,
“ছেঁচতেছি।”
“কেন?”
“মন চেয়েছে।”
জিনান অদ্ভুত চোখে চেয়ে বলল,
“তোমার মন এসব উদ্ভট জিনিসই কেন চায়?”
“আমার মন তাই।”
জিনান এবার গলার স্বর উঁচু করে বলল,
“ইরা।”
ইরার প্রত্যুত্তর না পেয়ে জিনান বিরক্তি নিয়ে কিচেন থেকে প্রস্থান করল।
জিনান বিকেলে সব কাজ শেষ করে লম্বা একটা ঘুম দিয়েছিল। এখন সন্ধ্যা রাত। সে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধৌত করে ডাইনিং রুমে আসতেই দেখল ইরা খুবই মনোযোগের সহিত একটা কেক ডেকোরেট করছে। জিনান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব পর্যবেক্ষণ করল। ইরার মাথায় খোঁপা কাঠি দিয়ে বাধা। পরনে ঢিলেঢালা টপস আর টাউজার। যেটা মাটিতে লেটকে আছে। আশেপাশের কোথাও ধ্যান জ্ঞান নেই তার। ডেকোরেশন শেষ হতেই কপালের ঘাম মুছল। হাত ঝাড়ল। বোঝাই যাচ্ছে পুরো হাত ব্যথা হয়ে গেছে। জিনান এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। ইরা তাকে দেখেও ইগনোর করল। চেয়ার টেনে বসে ছুরি দিয়ে এক পিস কেটে প্লেটে নিল। চামচ দিয়ে কেটে কেটে মজা করে খেতে লাগল। জিনান বলল,
“একা একাই খাচ্ছ?”
ইরা চোখ ঘুরিয়ে এমনভাবে চাইল যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য শুনে ফেলেছে। পরমুহুর্তে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“আমার মতো পাগলের সাথে দোকা পাব কোথায়?”
জিনান কথা না বাড়িয়ে এক টুকরো নিতে চাইলে ইরা সরিয়ে দিল। জিনান কপাল কুঁচকে বলল,
“এটা কী হলো?”
কেকে কামড় বসিয়ে ইরা ডোন্ট কেয়ার মুডে বলল,
“সরিয়ে ফেলা হলো।”
“কারণ?”
“কারণ আমার হাতে, মুখে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বসবাস। আমার হাতের কিংবা মুখের খাবার খেলে তোমাকে সেসব সংক্রমণ করবে।”
“এসব কে বলেছে?”
ইরা যেন হুট করেই রেগে গেল। চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে জিনানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
“কারো বলতে হবে কেন? আমি কি অবুঝ? বউয়ের মুখের খাবার খেতে যে পুরুষের লজ্জা, আনইজি লাগে তাকে কি বলতে হবে?”
জিনান কপাল ভাঁজ করে বলল,
“কী হলো আবার?”
“আইসক্রিম, চকলেট সব ফেলে দিয়ে এসেছি ময়লার ড্রামে।”
জিনান ইরার বাচ্চামি দেখে বেশ রাগলো। গম্ভীর গলায় বলল,
“ইরা তোমার কি মনে হয়না তুমি বেশি বেশি করো? টাকা কি গাছে ধরে? যখন যা ইচ্ছে করবে তুমি? পাগল তুমি? দিনদিন ছোট হচ্ছ নাকি বড়? মানুষ পড়াশোনা করে ম্যাচিউর হয় আর তুমি হও ইমম্যাচিউর।”
ইরা শান্ত গলায় বলল,
“আইসক্রিম, চকলেট দিয়ে কেক বানিয়েছিলাম। আজকে আমাদের অ্যানিভার্সারি ছিল সেজন্য। ভেবেছিলাম প্রথম অ্যানিভার্সারি একটু স্পেশাল করতে তাই নিজের হাতে ভিন্ন স্বাদের কেক বানিয়েছি। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে ফ্রিজে রেখেছি। ভেবেছি বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে আইসক্রিম, চকলেট এনেছ। রাতে আরও সারপ্রাইজ দেবে ভেবেছি। দুঃখিত টাকার হিসেব তো করিনি। তুমি ঠিকই বলেছ, আমি আসলেই ইমম্যাচিউর।”
কথাটুকু বলে ইরা অর্ধ খাওয়া কেক প্লেটে রেখে হাত ধুয়ে রুমে চলে গেল। জিনান সেখানেই স্থির দাঁড়িয়ে কপালে হাত ঘষতে লাগল। সে একটু বেশিই করে ফেলেছে। আজকে যে তাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী সেটা ভুলে গিয়েছিল। এত কাজের প্রেশার থাকে কোনো কিছু মনে রাখার সময় কই? ফ্রিজ খুলে দেখল কেক রাখা। সম্ভবত দুটো বানিয়েছিল। একটা এখন কেটে সবাইকে দিতে চেয়েছিল। আর এটা স্পেশাল বোঝা যাচ্ছে। উপরে সুন্দর করে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে লেখা Jiham Avro & Eira Hasan’s 1st Anniversary।
তৎক্ষণাৎ রুমে এসে দেখল ইরা ব্ল্যাংকেট গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে। জিনান জানে ইরা কাঁদছে। ছোট থেকে ওকে কেউ একটু রূঢ় ভাষায় কথা বললে কেঁদে কেটে পুরো বাড়ি মাথায় উঠিয়ে ফেলতো। তারপর অনেকক্ষণ আদর করার পর কান্না থামাতো। জিনান এগিয়ে এসে চট করে ব্ল্যাংকেট সরাতেই দেখল ইরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চোখ মুখ ফুলে একাকার হয়ে আছে। তাকে দেখতে পেতেই মুখ ঘুরিয়ে অপরপাশ ফিরল। জিনান পাশে বসে তাকে ধরতে গেলেই কারেন্টের শক লাগল মনে হয়। এমনভাবে হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়েছে যেন শক লেগেছে। জিনান ইরার গালে ঠোঁট চেপে ধরে রাখল। ইরা সরিয়ে দিতে গেলে জিনান শক্ত করে চেপে চুমু দিয়ে বলল,
“থাক কাঁদে না। আরও চুমু লাগবে?”
__
নাহওয়ানের সব জামাকাপড় খুলে বাথরুমে নিয়ে গায়ে পানি ঢাললো মারওয়ান। নিশাত গেছে বাজারে। গায়ে পানি পরতেই বাচ্চাটা শিউরে উঠলো। কিছুক্ষণ পানি গায়ে ধাতস্থ হতেই লাফাতে লাগল। মুখ দিয়ে বুদবুদ বের করে বলল,
“ইট্টু গুচুল কলি।”
মারওয়ান চোখ রাঙিয়ে বলল,
“লাফাচ্ছিস কেন পটলের বাচ্চা?”
নাহওয়ান দাপাতে দাপাতে ফিক করে হেসে বলল,
“গুচুল মুজা মুজা।”
“আবারও?”
নাহওয়ানকে গোসল করাতে গিয়ে মারওয়ান ভিজে একাকার হয়ে গেছে। ওকে দুই মগ পানি ঢেলে বাথরুম থেকে বের করে দিল। মাথা মুছিয়ে বলল,
“এখানে দাঁড়িয়ে থাক। আমি ঝট করে গায়ে পানি ঢেলে বেরোচ্ছি।”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। মারওয়ান পাঁচ মিনিটের মাথায় গোসল করে বেরোলো। নাহওয়ান খালি গায়ে খেলছে। দরজায় টোকার আওয়াজে মাথা মুছতে মুছতে গেট খুলল। নিশাত বাজার নিয়ে দাঁড়ানো। নিশাত ঘরে ঢুকতেই নাহওয়ান গুলুমুলু কাপড়বিহীন শরীরটা নিয়ে দৌঁড়ে এসে বলল,
“মা গুচুল কচ্চি।”
নিশাত বাজার রেখে বলল,
“বাহ্। তা এমন লেংটু কেন? জামা কই?”
নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেসে বলল,
“জামা নাই। নাঙ্গা মুজা মুজা।”
মারওয়ান পিছন থেকে বলল,
“আবার বলে মুজা মুজা। শরম নাই?”
“চলম গুমায়।”
মারওয়ান লুঙ্গিতে গিট্টু দিয়ে বলল,
“আরে বাহ, থাক জাগাস না।”
নিশাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“যান জামাকাপড় পরে আসুন। লেংটু থাকা ভালো না।”
নাহওয়ান ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“পুক্কি সুকাই।”
নিশাত নাক কুঁচকে বলল,
“তোমাকে এসব কে শিখিয়েছে?”
নাহওয়ান ফিচ করে হেসে বলল,
“বাবা।”
নিশাত মারওয়ানের দিকে কড়া চোখে চাইতেই মারওয়ান হাই তুলে বলল,
“আশ্চর্য এভাবে তাকানোর মানে কী? গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস শুকাচ্ছে বাঁধা দিচ্ছ কেন?”
নিশাত কোমরে হাত রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
“বাচ্চাদের এতে শরম ভেঙে যায়।”
“এইটুকু আন্ডার আবার কিসের শরম? তার উপর ব্যাটা ছাও। ল্যাংটা হেঁটে যাবে হু কেয়ারস?”
নিশাত বুঝল এখানে কথা বলা মানে বেকার খাটুনি। তাই কথা না বাড়িয়ে ছেলেকে কোলে নিয়ে রুমে আসল। নাহওয়ানকে পাতলা সেন্ডুগেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরিয়ে দিল। নাহওয়ান গেঞ্জি উঠিয়ে বলল,
“জামা মুজা না, নাঙ্গা বিশি মুজা।”
নিশাত বোরকা খুলে বলল,
“হ্যাঁ নাঙ্গা তো মজা হবেই। বাপের স্বভাব পেয়েছেন না?”
মারওয়ান পেছন থেকে হতবাক গলায় বলল,
“আশ্চর্য আমি আবার কবে নাঙ্গা ছিলাম?”
নিশাত রুম থেকে বেরোনোর সময় মারওয়ানকে সরিয়ে বলল,
“ছোটবেলায় ছিলেন কিনা কে জানে? নাহলে এসব উদ্ভট কথা মাথায় আসে কিভাবে? কেমন কথা, ল্যাংটা হেঁটে যাবে হু কেয়ারস? আমার বাচ্চাটার শরম ভাঙিয়ে ফেলছে বদ লোক কোথাকার।”
মারওয়ান নিশাতের পিছু পিছু রান্নাঘরে এসে গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করতে পারো না লিলিপুট? আমি কোনোকালেই উদোম থাকতাম না। এমনকি মায়ের পেট থেকেও বেরিয়েছি জামা কাপড় পরে।”
নিশাত ঘুরে বলল,
“তা সেখানে আপনাকে জামা কাপড় পরিয়েছে কে?”
“আরে এটা তো কথার কথা।”
নিশাত বলল,
“বাজে কথা বন্ধ করবেন? আমি রান্না করব বের হন এখান থেকে।”
দরজায় করাঘাতের শব্দে মারওয়ান এসে দরজা খুলল। অপরপাশের ব্যক্তিটি বলল,
“হ্যালো ইয়াং ম্যান, মে আই কাম ইন?”
“নো, হোয়াই আর ইয়্যু লেইট ওল্ড ম্যান?”
ব্যক্তিটি মারওয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ইচ্ছে করেই এসেছি রে। গাড়িতে জিনিসপত্র আছে। হেল্প লাগবে। আমার সঙ্গে আয়।”
কথাটা বলেই মেজবাহ আহমেদ ওরফে মার্ভ জেন নিচে নামতে লাগলেন। মারওয়ান চাচার পিছু পিছু গিয়ে নিচ থেকে সবগুলো ব্যাগ ভেতরে এনে বলল,
“এতকিছু কেন এনেছ চাচ্চু?”
মেজবাহ আহমেদ রুমে ঢুকে বিছানায় বসলেন। ফ্যানের বাতাস খেতে খেতে বললেন,
“কি বলিস? নাতিকে দেখতে এসেছি খালি হাতে আসব নাকি?”
মারওয়ান বলল,
“তাই বলে এত কিছু?”
“হ্যাঁ। নাতিটার জন্য জামা কিনেছি। পরিয়ে দেখিস লাগে কিনা? তোর আর তোর বউয়ের জন্য কিছু কিনিনি। তোরা নিজেরা কিনে নিস। নাতি কই?”
“ওর মায়ের কাছে। তোমাকে ভয় পাচ্ছে।”
“আরে নিয়ে আয়। ভয় কিসের? সাহসী বাপের ছেলে এমন ভীত হবে কেন? নিয়ে আয় সাহস শিখিয়ে যাব।”
মারওয়ান নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে রুমে ঢুকতেই বাচ্চাটা মেজবাহ আহমেদকে দেখে বাবার গলা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। মেজবাহ আহেমদ উঠে এসে নাহওয়ানের গাল টেনে আদর করতে করতে বললেন,
“আরে এটা কে? ডুপ্লিকেট জাদ দেখি।”
নাহওয়ান মারওয়ানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাবা মাচ্চে।”
মারওয়ান বলল,
“কোথায় মেরেছে? উনি তোমার একজন দাদা।”
নাহওয়ান তবুও বাবার শার্ট চেপে মুখ লুকিয়ে রাখল। মেজবাহ আহেমদ জোর করে নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে বলল,
“এই গোয়েন্দার ব্যাটা, তোকে মেরেছি কখন?”
নাহওয়ান হাপুস গলায় কাঁদতে কাঁদতে মারওয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। মারওয়ান তা দেখে বলল,
“থাক আর কাঁদিও নাতো। তুমি ফ্রেশ হও গিয়ে।”
মেজবাহ আহমেদ মারওয়ানের কথা পাত্তা না দিয়ে নাহওয়ানের ফুলো ফুলো গালে ঠেসে ঠেসে চুমু দিতে লাগলেন। নাহওয়ান চুমু খেয়ে বাবার দিকে চেয়ে বলল,
“বাবা চুমা ডিচে। বিশি বিশি ডিচে। “
মারওয়ান বলল,
“ভালো তো।”
“ইননা। চবাই চুমায়। উফফু।”
বলতে বলতে নাহওয়ান তার গুলুমুলু ছোট্ট হাত দুটোর সাহায্যে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মেজবাহ আহেমদের ঠোঁট সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু একটুও নড়াতে পারল না। নাহওয়ান গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলেই মারওয়ান এগিয়ে এসে কোলে নিল। মেজবাহ আহমেদ বললেন,
“বাপরে একটু চুমু দিয়েছি এতেই এতো রাগ?”
মারওয়ান কোলে নিতেই নাহওয়ান শান্ত হয়ে গেল। মারওয়ান বলল,
“ও চুমু পছন্দ করেনা। কেউ চুমু দিলেই বিরক্ত হয়।”
মেজবাহ আহমেদ বললেন,
“বাব্বাহ এখনই স্কিনের প্রতি এত যত্ন?”
মারওয়ান ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল,
“তো ছোট দেখে কি আমার ছাওয়ের স্কিনের দাম নেই?”
মেজবাহ আহমেদ হেঁসে ফেললেন। নাহওয়ানকে কান্না থামিয়ে ফেলতে দেখে বললেন,
“ওরে ব্রিটিশ, বাপের কোলে যাওয়ার জন্য কান্নার অভিনয় করছিলি?”
নাহওয়ান এদিকে ফিরে মেজবাহ আহমেদের দিকে আঙুল তাক করে কান ডলতে ডলতে বলল,
“বাবা মালো। বিশি বিশি মাব্বে।”
মারওয়ান বলল,
“এসব বলেনা ফাইয়াজ।”
মেজবাহ আহমেদ বললেন,
“কি সাংঘাতিক, বাপকে মারতে শিখিয়ে দিচ্ছে! তোর বাপ মারতে পারবে না। আয় তুই আর আমি মারপিট করি।”
নাহওয়ান মুখ ফিরিয়ে মারওয়ানের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফেলল। মারওয়ান বলল,
“থাক আর জ্বালিও না। তুমি ফ্রেশ হও।”
মেজবাহ আহমেদ খুব আয়েশ করে পোলাও, রোস্ট, মাছ ভাজা, গরুর গোশতের কষা দিয়ে ভাত খাচ্ছেন। মারওয়ান পাশেই ছেলেকে কোলে নিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। মেজবাহ সাহেব মাছের মাথায় কামড় বসিয়ে বললেন,
“রান্নাটা মারাত্মক হয়েছে রে। মেইডদের রান্না খেতে খেতে মুখ পানসে হয়ে গেছে। বৌমার রান্নার হাত বেশ ভালো। চমৎকার রাঁধে। প্রতিমাসে রান্নার জন্য কত নেবে জিজ্ঞেস করিস তো? চিন্তা করিস না ডেলিভারি চার্জ সহ দেব।”
মারওয়ান ছেলের মুখে খাবার তুলে বলল,
“তোমার টাকা দিতে হবে কেন? বললে এমনিতেই রেঁধে দেব তোমাদের বৌমা। মানব দরদী রমণী কিনা।”
মেজবাহ আহেমদ লোকমা মুখে পুরে বললেন,
“পাগল নাকি? মেয়েটা কষ্ট করবে আর আমি চাচা শ্বশুর হয়ে গান্ডেপিণ্ডে গিলব? কাভি নেহি।”
খাওয়ার পাট চুকিয়ে মেজবাহ আহমেদ কিছুক্ষণ ঘরের এমাথা ওমাথা পায়চারি করলেন। তিনি প্রচুর স্বাস্থ্য সচেতন। এ বয়সেও ফিটফাট। সবকিছু মেইনটেইন করে চলেন। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান, অতিরিক্ত ওয়েলি খাবার এভয়েড করে চলেন। পায়চারি শেষে একটু বিছানায় হেলান দিয়ে বসলেন। ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে লাগলেন। এ বয়সেও তিনি চশমা ছাড়া বই পড়তে পারেন। বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে খেয়াল করলেন রুমের দরজায় টানানো পর্দা নড়ছে। তিনি একটু ভালোভাবে তাকাতেই খেয়াল করলেন ছোট্ট ছোট্ট দুটো কচি পা দেখা যাচ্ছে। সে পা টিপে টিপে বিছানা থেকে নামলো। পর্দা সরিয়ে গপাত করে নাহওয়ানকে ধরে বলল,
“দেখে ফেলেছি গোয়েন্দার ব্যাটা। গোয়েন্দাগিরি হচ্ছে?”
নাহওয়ান ভয়ে কাঁদতে চাইলে মেজবাহ আহেমদ বললেন,
“কাঁদলেই চুমু খাব।”
নাহওয়ান ছলছল চোখে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“ইননা।”
মেজবাহ আহমেদ অনেক্ষণ নাহওয়ানকে দেখলেন। এ যেন ছোটবেলার আজাদ। পুরোই মিনি জাদ। জাদও এমন ঠোঁট ফুলাতো। গোলগাল ছিল। মেজবাহ আহেমদ নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে বিছানায় বসে বললেন,
“এই বুটুস বুটুস, বাবা কই?”
নাহওয়ান ইনোসেন্ট মুখ করে বলো,
“বাবা গুমায়।”
“তুই ঘুমাস না?”
“গুম ভাঙি গেচে।”
মেজবাহ আহমেদ বললেন,
“এজন্য এসে আমাকে পাহারা দিচ্ছিলি?”
নাহওয়ান ঠোঁট উল্টে বলল,
“ডিসুম ডিসুম ডিব।”
মেজবাহ আহেমদ ভয় পেয়ে বললেন,
“ওরে বাবা ভয় পেয়েছি। দাদার সাথে মারপিট করতে এসেছেন?”
নাহওয়ান ঘাড় নাড়ালো। মেজবাহ আহেমদ ওকে নামিয়ে শার্টের হাতা কুনুই পর্যন্ত গোটালো। বলল,
“চলুন এক দান হয়ে যাক।”
নাহওয়ান খুশি হয়ে বিছানায় দাঁড়ালো। মেজবাহ আহেমদ বসে বসেই নাহওয়ানের গায়ে আলতো করে চাপড় দিলেন। নাহওয়ান পাল্টা সর্বশক্তি দিয়ে জোরে চাপড় দিল। মেজবাহ আহেমদের গায়ে একটুও লাগলো না। এমন অনেক্ষণ দাদা নাতির ফাইট গেল। শেষে মেজবাহ আহেমদ অভিনয় করে শুয়ে বললেন,
“ওহ্ ব্যথা পেয়েছি।”
নাহওয়ান কিল দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। এগিয়ে এসে বলল,
“বেতা পেয়েচ?”
“হ্যাঁ।”
নাহওয়ান পাশে বসে কিল দেয়া স্থানে ডলে দিতে লাগল। মেজবাহ আহেমদ শিশুটির নিষ্পাপ মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তার জাদের রক্ত। এজন্যই বোধহয় এত টান অনুভব করছেন তিনি। তিনি হুট করে নাহওয়ানকে বুকে টেনে এনে বললেন,
“আপনি পঁচা? দাদাভাইকে মেরেছেন?”
নাহওয়ান ঠোঁট ফুলিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“মাচ্চি?”
মেজবাহ আহেমদ নাহওয়ানকে আদর করে বললেন,
“আরে কিচ্ছু হয়নি। আমার সোনা ভাই।”
নিশাত এতগুলো রান্না করে ক্লান্ত হয়ে দুপুরের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেল হয়ে গেছে এখনো ঘুম ভাঙেনি তার। ক্লান্তিতে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে সে। ইতোমধ্যে মারওয়ানের ঘুম ভেঙে গিয়েছে। মুখ ধুয়ে পাশের রুমে উঁকি দিয়ে দেখেছে নাহওয়ান মেজবাহ আহমেদের বুকে ঘুমাচ্ছে। তাই আর না ডেকে রুমে এসে নিশাতের শরীরে হাত দিয়ে ডাকলো,
“নিশাত।”
নিশাতের ঘুম ভাঙতেই সম্মুখে চোখ যেতেই দেখল মারওয়ান তাকে ডাকছে। সে মোড়ামুড়ি করতে করতে উঠে বসল। ঘড়িতে সময় দেখল সন্ধ্যা হতে আর বেশিক্ষণ নেই। দ্রুত ওযু করে নামাজ পড়ল। নামাজ শেষে জায়নামাজ ভাঁজ করে বলল,
“এই শুনুন, চাচ্চু বিকেলে কি খাবেন?”
মারওয়ান বলল,
“তোমার কিছু করতে হবেনা। বাইরে থেকে পুরি, সিঙ্গারা, পিঁয়াজু নিয়ে আসবো নে। তুমি শুধু চা বসাও।”
নিশাত এগিয়ে এসে বলল,
“কি বলেন? বাইরের খাবার খাওয়াব কেন? আমি নিজেই তো এসব বানাতে পারি।”
মারওয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
“চাচ্চু তৈলাক্ত খাবার বেশি খান না। অল্প আনব। তোমার এত ঝামেলা করার দরকার নেই।”
নিশাত পাশে বসে বলল,
“তবুও আমার কেমন যেন লাগছে। এই প্রথম ভাতিজার বাসায় এসেছেন। বাইরের খাবার খাওয়াতে চাচ্ছি না। এমনিতে বেচারা বাইরের খাবার, মেইডদের খাবার খেয়ে খেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন। এখানে এসেও যদি এসব খান তাহলে কেমন হলো? আপনি এক কাজ করুন আমাকে নুডুলস এনে দেন। ওটায় বেশি তেল লাগবেনা। অন্যভাবে রান্না করে দেবনি।”
মারওয়ান আলসেমি করে বলল,
“আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।”
নিশাত তাকে শোয়া থেকে টানতে টানতে বলল,
“উঠুন বলছি, নাহলে কিন্তু কামড় দেব।”
মারওয়ান বিরক্তি নিয়ে উঠে বসে বলল,
“হ্যাঁ তুমি তো শিখেছ ওই একটা জিনিসই। কথায় না পারলেই কামড়।”
নিশাত কোমরে হাত রেখে বলল,
“তো কি চুমু দেব?”
মারওয়ান মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“কই দাও তো না।”
নিশাত মুখ টিপে বলল,
“চুমু দেয়ার কি কাজটা করেছেন জনাব?”
মারওয়ান গম্ভীর গলায় শুধালো,
“স্বামীকে চুমু দিতে আবার কারণ লাগে নাকি?”
“স্বামীকে চুমু দিতে কারণ না লাগলেও আপনাকে চুমু দিতে অবশ্যই কারণ লাগবে।”
মারওয়ান কপাল ভাঁজ করে বলল,
“কেন?”
নিশাত মারওয়ানের নাক টেনে বলল,
“কারণ মানুষটা আপনি। দ্যা গ্রেট মারওয়ান আজাদ।”
কথাটা বলেই নিশাত চলে যেতে উদ্যত হতেই মারওয়ান পিছন থেকে বলল,
“আমি না হয়ে অন্য কেউ হলে দিতে?”
নিশাত মুখ টিপে ঘুরে মারওয়ানের চোখের দিকে চেয়ে বলল,
“দিতাম বোধহয়।”
মারওয়ান বিছানা থেকে চট করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি পরপুরুষকে এসব ইয়ে টিয়ে দিতে?”
নিশাত অবাক গলায় বলল,
“ওমা তখন তো আর পরপুরুষ থাকত না।”
মারওয়ান সিনা টানটান করে বলল,
“আমি তো তোমাকে স্বামী উল্লেখ করে দেইনি। অন্য কেউ বলেছি।”
নিশাত ঘাড় নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ আমিও তো সেটাই বললাম। দ্রুত নুডুলস নিয়ে আসুন যান।”
বলেই নিশাত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। চুলোয় চায়ের পানি বসিয়ে দিল। মারওয়ান পিছু পিছু এসে বলল,
“তোমার লজ্জা টজ্জা গেছে কোথায়?”
নিশাতের কেন যেন হাসি পেল। ইনোসেন্ট মুখ করে বলল,
“কোথাও যায়নি তো।”
“অবশ্যই গেছে। কিসব বলে গেছ তুমি জানো? তোমার থেকে এসব আশা করিনি।”
বলেই দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৭+১৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৯+২০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১১+১২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৯,১০)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৫+৩৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৯+৪০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪