Golpo romantic golpo নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪১


#নাজনীন_নেছা_নাবিলা

#পর্ব_৪১

অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌❌❌

বন্ধুত্ব জিনিসটাই বোধহয় এমন এক ফালি রোদ্দুর আর এক আকাশ মেঘের লুকোচুরি। এই যে যেমন একটা সময় মিহাল আর মুনভির বন্ধুত্ব ছিল ইস্পাতকঠিন, ঠিক যেন এক বৃত্তের দুটি পরিপূরক অংশ। তারপর হঠাৎ করেই জীবনে এক কালবৈশাখী ঝড় এসে তাদের সাজানো সম্পর্কের সবকিছু ওলটপালট করে দিল। অথচ, এত ঝড়-ঝাপটা আর ভুল বোঝাবুঝির পরও কেউ কখনো কারও পাশ থেকে এক চুলও সরে যায়নি। মাঝখানে এক অদৃশ্য ও দুর্ভেদ্য দেয়াল খাড়া হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা দুজনেই সেই দেয়ালের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়েও একে অপরের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেনি।

ইরফানের কুৎসিত কারসাজি আর চক্রান্তের কারণে হয়তো সাময়িকভাবে তাদের গভীর সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল, কিন্তু তাদের আত্মিক বন্ধনটাকে দুর্বল করতে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আর সেই সত্যটাই আজ প্রস্ফুটিত হলো এই ঘরের চার দেওয়ালে। তাই তো সব অভিমান আর জড়তা ঝেড়ে ফেলে আজ মিহাল আর মুনভি একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।

দুজনেরই চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তপ্ত অশ্রুধারা, তবে তা কোনো বেদনার নয়, বরং পরম আনন্দের। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ভুল বোঝাবুঝি ধুয়ে-মুছে যাওয়ার আনন্দ। সব দূরত্ব ঘুচিয়ে প্রিয় বন্ধুত্বটাকে আবার আগের মতোন, ঠিক আগের সেই চেনা ছন্দে ফিরে পাওয়ার অকৃত্রিম আনন্দ।

মিহাল আর মুনভি তখন নিজেদের আবেগে এতটাই মগ্ন যে তারা টেরই পেল না তাদের এই মধুর মিলনমুহূর্তটি আড়াল থেকে আরও দুটি জোড়া চোখ পরম মুগ্ধতায় প্রত্যক্ষ করছে। নিবিড় বন্ধুত্বের এই পুনরুত্থানে শুধু যে তাদের চোখের কোণ ভিজে উঠেছে তা নয়, দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীলা আর ইকরার চোখও তখন পরম তৃপ্তিতে ছলছল করে উঠেছে।

আসলে এই দৃশ্যপটের পেছনে একটা ছোট্ট ঘটনা ছিল। মিনা মির্জা যখন নীলাকে সাথে নিয়ে খাবার টেবিলে রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা গরম নাস্তা তৈরি করে টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা খাবারগুলো সামনে এলেন, তখন সেখানে তিনি কাউকেই দেখতে পেলেন না। ড্রয়িংরুমে কাউকে না পেয়ে মিনা মির্জা নীলার দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন__

“কিরে, টেবিলে তো কেউ নেই। তুই এক কাজ কর, ইকরা, মুনভি আর মিহালকে জলদি ডেকে নিয়ে আয় তো।”

শ্বাশুড়ির উরফে ফুফুর কথামতো নীলা ডাইনিং রুম থেকে বের হতেই তার সাথে দেখা হয়ে গেল ইকরার। তারা দুজনে মিলে ঠিক করল একে একে মিহাল এবং মুনভি কে ডেকে আনবে। প্রথমে মুনভিকে, তারপর মিহালকে। দুজনে মিলে যখন পা টিপে টিপে মুনভির ঘরের দিকে যাচ্ছিল, তখনই ইকরা ফিসফিসিয়ে নীলাকে জানাল__

“আচ্ছা নীলা, আমি কিন্তু একটু আগেই মি জেন্টালম্যান কে ছাদে দেখেছি। তার মানে এতক্ষণ যাবত উনি নিশ্চয়ই আর ছাদে নেই।”

ইকরার কথায় নিশ্চিত হয়ে তারা দুজন মুনভির ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু ভেতরে উঁকি দিতেই দেখল ঘরটা একদম ফাঁকা, মুনভি সেখানে নেই। ব্যস, বুদ্ধিমান দুই বান্ধবীর আর বুঝতে বাকি রইল না যে, এই সাতসকালে মুনভি এখন ঠিক কোথায় থাকতে পারে।

মুচকি হেসে দুজন মিলে এবার দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল মিহালের ঘরের উদ্দেশ্যে। আর মিহালের ঘরের আধখোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই চিরকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটি দুই বাল্যবন্ধুর সমস্ত অভিমান ভুলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে থাকার সেই পরম মুহূর্ত। দুই বন্ধুর এই পুনর্মিলন আর চোখের আনন্দাশ্রু দেখে নীলা আর ইকরার বুকটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল, যা তাদের হৃদয়ের কোণকে এক নিমেষে জুড়িয়ে দিল।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নীলা আর ইকরা আর কতক্ষণ নিজেদের লুকিয়ে রাখবে? ইকরা হঠাৎ করেই একগাল হেসে একটা হালকা কাশির শব্দ করল। সেই শব্দে মিহাল আর মুনভি যেন ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এল। চমকে উঠে তারা একে অপরকে ছেড়ে তড়িৎ গতিতে কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। দুই যুবকের মুখেই তখন ধরা পড়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত চোর-চোর ভাব, যা দেখে নীলা আর ইকরা আর নিজেদের হাসি চেপে রাখতে পারল না।

ইকরা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ কৌতুকভরে চোখ নাচাল। তারপর মুনভির দিকে তাকিয়ে রসিকতার সুরে বলল__

“বাহ্! আপনাদের এই ব্রোম্যান্স তো বেশ জমে উঠেছে দেখছি! আমরা কি ভুল সময়ে ভুল জায়গায় চলে এলাম?”

ইকরার মুখে এমন চুটকি শুনে মুনভির ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে চটজলদি নিজের মাথার চুল চুলকাতে চুলকাতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, যেন ঘরের মেঝেতে কোনো লুকোনোর জায়গা খুঁজছে। মিহাল অবশ্য নিজের প্রফেসর সুলভ গাম্ভীর্যটা চট করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। সে গলার আওয়াজটা একটু পরিষ্কার করে নীলার দিকে তাকিয়ে বলল__

“আরে না, তোমরা ভুল ভাবছ। আমরা আসলে জাস্ট একটা পুরনো ইকোনমিক থিওরি নিয়ে আলোচনা করছিলাম, তাই না মুনভি?”

মুনভি মিহালের এই খোঁড়া যুক্তিতে সায় দিয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল__

“হ্যাঁ, হ্যাঁ! একদম ঠিক। আমরা আসলে… ওই… কী যেন বলে, বাজারের চাহিদা আর জোগানের ভারসাম্য নিয়ে কথা বলছিলাম।”

নীলা তার হাতের বাহু দুটি বুকের ওপর ভাঁজ করে বাঁকা হাসল। মিহালের দিকে এগিয়ে এসে বলল__

“তা চাহিদা আর জোগানের ভারসাম্য মেলাতে গিয়ে ইকোনমিক্সের প্রফেসরের চোখে জল চলে আসে বুঝি?

তারপর মিহালের কানের কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে বলল__

” আর আপনার গোসলের কী হলো? ঝর্নার সাথে রোমান্স করা শেষ?”

নীলার এই প্রকাশ্য খোঁচায় মিহাল এবার সত্যিই আমতা আমতা করতে লাগল। অন্যদিকে ইকরা আর মুনভির মধ্যে এক নীরব চোখের খেলা জমে উঠেছে। মুনভি আড়চোখে ইকরাকে দেখছে, আর ইকরাও সেই চাউনি টের পেয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। ঘরের ভেতরের এই মিষ্টি ও মধুর পরিবেশটা যেন পুরো বাড়ির থমথমে ভাবটাকে এক লহমায় কাটিয়ে দিল।

মিহাল নীলার কথা শুনে বাঁকা হেসে ফিসফি বলল __

“বউ থাকতেও যদি ঝর্নার সাথে রোমান্স করতে হয় তাহলে আমার গোসল করাই ছেড়ে দিতে হবে। আর আমি তো চাই ঝর্ণার নিচে তোমার সাথে রোমান্স করতে।”

নীলার চোখ বের হয়ে আসার উপক্রম মিহালের কথা শুনে। কিন্তু সে এখন কোন প্রতিবাদও করতে পারছে না কারণ খোঁচাটা সেই আগে মেরেছিল। কিন্তু অবশেষে নীলাই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে মিনা মির্জার তাগাদার কথা মনে করিয়ে দিল। সে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল__

“আচ্ছা, আপনাদের এই জরুরি তত্ত্বীয় আলোচনা এবার বন্ধ করুন। ফুফু নিচে ডাইনিং টেবিলে নাস্তা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। কাল রাত থেকে কারও পেটে ঠিকমতো দানাপানি পড়েনি। এবার জলদি চলুন, তা না হলে খাবার সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। আর সব থেকে বড় কথা আপনাদের দুই বন্ধুর মাঝে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে এটাই খুশির বিষয় এখন। বন্ধুত্ব এমন হওয়া উচিত।”

নীলার কথা শুনে সবার ঠোঁটেই হাসি ফুটে উঠল। সবাই মিলে যেই না মিহালের রুমের থেকে বের হতে নিলেই পেছন থেকে মিহালের আকস্মিক কণ্ঠস্বর যেন সবাইকে এক জায়গায় জমিয়ে দিল। মিহালের প্রশ্নটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে, নীলা তো বটেই, তার সাথে সাথে ইকরা আর মুনভিও যেখানে ছিল সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

মিহাল বেশ শান্ত কিন্তু গভীর চোখে নীলার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটি করেছিল__

“বন্ধুত্ব বিষয়টাও আসলেই খুব সুন্দর, তাই না নীলাঞ্জনা? আচ্ছা, তুমিও কি ইকরাকে ঠিক নিজের তেমনই একজন প্রিয় বন্ধু বা বেস্ট ফ্রেন্ড মানো?”

প্রশ্নটি শোনার সাথে সাথে ঘরের ভেতরের আনন্দময় পরিবেশটা যেন এক নিমেষে এক গুরুগম্ভীর স্তব্ধতায় রূপ নিল। নীলা চোখের পলক না ফেলে মিহালের দিকে তাকিয়ে রইল, তার মনের ভেতর তখন এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইকরাও এই প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক ঢিপঢিপানি অনুভব করতে লাগল। আসলে, এই একই প্রশ্ন ইকরা নিজেও কতদিন যাবৎ নীলাকে করতে চেয়েছিল, কিন্তু বুক ফেটে গেলেও মুখ ফুটে কখনো তা বলতে পারেনি। সে খুব ভালো করেই জানে নীলার অতীত কতটা ক্ষতবিক্ষত। অতীতে বন্ধুত্বের নামে কীভাবে চরমভাবে ঠকেছিল নীলা, কীভাবে তার সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে আঘাত করা হয়েছিল, সেই ইতিহাস ইকরার অজানা নয়। আর ঠিক সেই কারণেই ইকরা সবসময় নীলার পাশে এমন এক ছায়া হয়ে থাকতে চেয়েছিল, যেন নীলা তাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারে। সে নীলার সেই পুরোনো ক্ষতে বন্ধুত্বের প্রলেপ দিতে চেয়েছিল।

নীলা বেশ কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে রইল। ঘরের চার দেওয়ালে তখন পিনপতন নীরবতা। প্রত্যেকেই অধীর আগ্রহে আর চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে নীলার উত্তরের অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ইকরার বুকের ভেতর তখন যেন একটা কামারশালার মতো হাতুড়ি পিটছে।

কিছুটা সময় পার হওয়ার পর নীলা নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে নিল। মনের ভেতরের গভীর ভাবান্তর আড়াল করে, ইকরার চোখের দিকে সটান তাকিয়ে অত্যন্ত নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল__

“না, ও তো আমার বন্ধু না।”

নীলার মুখ থেকে উচ্চারিত এই একটিমাত্র বাক্য যেন ঘরের ভেতরের পুরো বাতাসটাকে বিষাক্ত করে তুলল। মিহাল আর মুনভি চরম বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকাল। তারা কিছুতেই ভেবে পেল না নীলা এই মুহূর্তে এমন একটা রুক্ষ কথা কীভাবে বলতে পারল! আর ইকরা? সে যেন আকাশের মেঘ ভেঙে মাথায় পড়ার মতো এক তীব্র আঘাত পেল। তার পায়ের তলার মাটি যেন এক লহমায় সরে গেল। সে তো এই কটা দিন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছে নীলার মন জয় করার, তার বিশ্বাস আর ভালোবাসার যোগ্যতা অর্জন করার। সে তো সত্যি মন থেকে নীলাকে নিজের বোনের চেয়েও বেশি আপন, নিজের পরম বান্ধবী হিসেবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু নীলা এখনো তাকে নিজের বন্ধু বলে স্বীকার করতেই পারছে না! এই নির্মম সত্যটা ইকরার কোমল মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না। অপমানে, অভিমানে আর তীব্র যন্ত্রণায় তার দুই চোখ উপচে জল চিকচিক করে উঠল, যা সে কোনোভাবেই আর আড়াল করতে পারল না।

“ইকরা আমার বোনের মতন, হয়তো আপন বোনের থেকেও বেশি কিছু। আমার কোনো বোন নেই, তাই ইকরাকে আমি আমার বোনের আসনেই বসালাম। বন্ধুত্ব নামটা দিলে হয়তো কখনো কোনো ভুল বোঝাবুঝিতে একে আমি হারিয়ে ফেলব। আর ইকরাকে আমি কোনোভাবেই হারাতে চাই না। তাই তাকে নিজের বোনের স্থানে চিরকালের জন্য জায়গা দিয়ে দিলাম।”

কোনো রকম দ্বিধা বা সংকোচ না রেখে নীলা একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল। তার প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল এক অদ্ভুত আন্তরিকতা আর নিখাদ ভালোবাসা।

নীলার এই অপ্রত্যাশিত কিন্তু ভীষণ সুন্দর কথাটি শুনে মিহাল এবং মুনভির ঠোঁটে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। এতক্ষণের থমথমে ভাবটা যেন এক পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। আর ইকরা? সে তো খুশিতে এবং আবেগে কেঁদেই দিল। এতক্ষণ যে চোখের জল ছিল অপমানের, এখন তা রূপ নিল পরম আনন্দের অশ্রুতে। সে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে পেছন থেকে নীলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দুই বান্ধবীর—না, এখন থেকে দুই বোনের এই মিলন দেখে নীলাও আর গম্ভীর থাকতে পারল না, সেও শব্দ করে হেসে উঠল।

মিহাল আর মুনভি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এই অপূর্ব ও সুন্দর মুহূর্তটি পরম তৃপ্তি নিয়ে উপভোগ করতে লাগল। তাদের নিজেদের বন্ধুত্বের ভাঙন জোড়া লাগার পর, মেয়ে দুটির এই আত্মিক বন্ধন যেন ঘরের পুরো আবহাওয়াটাকেই ভালোবাসায় ভরিয়ে দিল।

দুই বান্ধবীর এই পরম আবেগঘন মুহূর্তের মাঝখানেই মিহাল হঠাৎ বেশ কৌতুকভরে রসিয়ে বলে উঠল__

“ভারী অন্যায় কথা! একটু আগে আমাদেরকে ব্রোম্যান্স নিয়ে অমন খোঁচানো হলো, অথচ এখন নিজেই একজনকে ওভাবে জড়িয়ে ধরে আঠার মতো চিপকে আছে!”

মিহালের এমন আকস্মিক ফোড়ন কাটা শুনে মুনভি আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, সে হো হো করে হেসে উঠল। অন্যদিকে নীলা আর ইকরাও অপ্রস্তুত হয়ে একে অপরকে আলতো করে ছেড়ে দিল। নীলা অত্যন্ত পরম যত্নে আর স্নেহে ইকরার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু নিজের হাত দিয়ে মুছিয়ে দিল। তারপর মিহালের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখের মণি নাচিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল__

“আজকাল আপনি বড্ড বেশি কথা বলছেন, প্রফেসর সাহেব! মনে আছে তো, আপনার একটা হাতে কিন্তু এখনো ব্যথা? বেশি কথা বাড়ালে ওই ব্যথার জায়গাতেই একদম শক্ত করে কামড় বসিয়ে দেব!”

নীলার এই চিলতে হুমকির মুখে মিহাল বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। উল্টো সে এক অদ্ভুত লাজুক ও রসিক ভঙ্গি করে, চোখের কোণে দুষ্টুমির ইশারা ফুটিয়ে বলল__

“আরে, তুমি যদি এখন আমার এই বেস্ট ফ্রেন্ড আর তোমার ওই বোনের সামনে দাঁড়িয়ে এত বড় ঘোষণা দিতে পারো যে তুমি আমাকে লাভ বাইট দেবে… তাহলে সেই লাভ বাইট হাসিমুখে গ্রহণ করতে আমার বিন্দুমাত্র কোনো আপত্তি থাকবে না, বিবিজান!”

মিহালের মুখ থেকে ভরা মজলিশে এমন লাগামহীন ও সাহসী কথা শুনে ইকরা আর মুনভির মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। তাদের দুজনের চোখ যেন কপালে ওঠার জোগাড়! ঘরের ভেতরের রোমান্টিক ও দুষ্টুমির পারদ এতটা ওপরে উঠে যাবে, তা তারা কল্পনাও করেনি। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা নিঃশব্দে একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে, চোরের মতো পা টিপে টিপে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

এদিকে নীলা তো থতমত খেয়ে পুরো অবাক।মিহালের এই চরম রসিকতায় লজ্জায় আর অপমানে তার কান দিয়ে যেন সত্যি সত্যি গরম ধোঁয়া বের হতে লাগল। ঘরের বাকি দুই মানুষের সামনে মিহাল যে এমন একটা বেহায়া মার্কা কথা অবলীলায় মুখ ফুটে বলে দিতে পারে, তা নীলার চেনা ধারণার বাইরে ছিল। লজ্জায় তার ফর্সা মুখমণ্ডল তখন লাল টুকটুকে আনারসের মতো হয়ে উঠেছে।

মিহালের এমন লাগামহীন কথায় নীলার এবার সত্যি সত্যি ইচ্ছে করছিল তার ওই ব্যথার হাতটাতে কষে একটা কামড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল, যার পেছনে মূলত দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, সে যদি এখন কামড় দিতে যায়, তবে মিহালের বলা সেই লজ্জাজনক ‘লাভ বাইট’-এর কথাটিই সত্য প্রমাণ হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো—মুখে সে যতই রাগ দেখাক না কেন, মনের অবচেতনে সে কিছুতেই চায় না তার এই প্রিয় ‘প্যারেলাল’ কোনোভাবে একটুও ব্যথা পাক। তাই আর কথা না বাড়িয়ে, মিহালের দিকে এক জোড়া বড় বড় চোখ পাকিয়ে শাসনের ভঙ্গিতে সে যেই না ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, অমনি মিহাল চট করে তার নরম হাতটি ধরে ফেলল।

হাতটা আলতো করে চেপে ধরে মিহাল মুখটা কিছুটা নরম করে শুধাল__

“রাগ করলা?”

নীলা ঝটকা দিয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল না ঠিকই, তবে মিহালের দিকে তাকিয়ে মুখের সবকটি দাঁত বের করে এক কৃত্রিম ও সস্তা হাসি দিয়ে বলল__

“না না, রাগ করতে যাব কেন? আমার তো বেশ মজাই লেগেছে! বিশেষ করে যখন আপনি সবার সামনে আমার মান-ইজ্জতের পুরো ফালুদা বানিয়ে দেন, তখন তো আমার আনন্দে আত্মহারা হওয়ার দশা হয়। এখন তো মনে হচ্ছে ইজ্জতের সাথে সাথে আমি নিজেও আস্ত একটা ফালুদা হয়ে যাচ্ছি!”

নীলার এমন ত্যাড়াবেঁকা উত্তর শুনে মিহাল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার চোখের মণি দুটো তখন নীলার মুখের ওপর স্থির। আচমকাই তার মাথায় নতুন কোনো দুষ্টু চিন্তা খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চতুর ও বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সে নীলার একদম কাছে এসে বলল__

“অ্যাকচুয়ালি আমি খুব একটা মিষ্টি জিনিস পছন্দ করি না, বলতে গেলে একদমই পছন্দ করি না। কিন্তু এখন কেন যেন মনে হচ্ছে, আজ থেকে আমাকে ফালুদা খাওয়া শুরু করতেই হবে। আই উইল জাস্ট লাভ ফালুদা!”

কথাটি শেষ করেই মিহাল আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। নীলাকে নিজের মনের ভাব প্রকাশের কোনো সুযোগ না দিয়েই সে গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

এদিকে নীলা ঘরের মাঝখানে একাই পাথরের মতো থ মেরে দাঁড়িয়ে রইল। মিহাল এত চটজলদি কী বলে চলে গেল, তার সেই গভীর অর্থ প্রথমে নীলার সাধারণ মাথায় চট করে ঢুকল না। কিন্তু শূন্য ঘরে একা দাঁড়িয়ে যখন সে মিহালের বলা শেষ বাক্যটি মনে মনে দু-তিনবার আওড়াল, তখনই হুট করে তার মাথায় কথাটির আসল ও অন্তর্নিহিত মানেটা পরিষ্কার হয়ে ধরা দিল। মিহাল তাকে পরোক্ষভাবে ‘ফালুদা’ সম্বোধন করে ভালোবাসার কথা বলে গেছে!

আসল মানেটা বুঝতে পারার সাথে সাথেই লজ্জার এক তীব্র লাল আভা নীলার পুরো মুখমণ্ডল, কান আর গলা অব্দি ছেয়ে ফেলল। লজ্জায় আর সংকোচে সে যেন নিজের ভেতরেই নিজে কুঁকড়ে যেতে লাগল। বুকের ভেতর হূৎপিণ্ডটা তখন লাফাচ্ছে প্রবল বেগে। মনে মনে সে এক চরম বিপাকে পড়ল এখন এই মুখ নিয়ে সে সবার সামনে, বিশেষ করে মিহালের মুখোমুখি দাঁড়াবে কী করে? এই মুহূর্তে তার তীব্র ইচ্ছে করছে ড্রয়িংরুমে না গিয়ে, নিজেকে এই ঘরের ভেতরেই আজীবনের জন্য বন্দি করে রেখে দিতে।

__________________

মির্জা পরিবারে যেন আজ উৎসবের আমেজ, আনন্দের কোনো শেষ নেই। কত বছর পর বাড়ির সবাই মিলে তাদের বড় মেয়ের সাথে আবার যোগাযোগ করতে পেরেছে, সেই খুশিতে প্রতিটি মানুষের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কত বছর ধরে তিন ভাই মিলে মনে মনে এক চরম অনুশোচনায় ভুগছিলেন,কেন তারা এতদিন ধরে নিজেদের একমাত্র বোনের সাথে ভুল বোঝাবুঝিগুলো মিটিয়ে সম্পর্কটা ঠিক করতে পারলেন না।

সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন ইমরান মির্জা। প্রথমত, অনেক বছর পর নিজের আদরের বোনের সাথে তার অভিমানের দেয়াল ভেঙে সম্পর্কটা আগের মতো মধুর হয়েছে। তার ওপর বোন-জামাই, যে কিনা একাধারে উনার নিজের পরম বন্ধু বা বেস্ট ফ্রেন্ড, তার সাথেও পুরনো সমস্ত তিক্ততা ধুয়ে-মুছে এক হয়ে গেছে। তবে উনার মনের কোণে আরও একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল। তিনি মনে মনে ভীষণভাবে চেয়েছিলেন যেন উনার আদরের ভাতিজি নীলার সাথে উনার বোনের সুযোগ্য ছেলে মিহালের বিয়েটা হয়। ভাগ্যের কী অপূর্ব লিখন, শেষমেশ সেই অসম্ভবটাও সম্ভব হয়ে গিয়েছে! সব মিলিয়ে মনের সবকটি ইচ্ছা একসাথে পূরণ হওয়ায় ইমরান মির্জার আনন্দের সীমা রইল না। আর এই মহামিলনের খুশিতেই বাড়ির সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, আজ তারা পুরো পরিবার এক হয়ে বাড়িতেই একটা বড়সড় বনভোজনের আয়োজন করবে। সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও, ভিডিও কলের ওপারে থেকে অন্তত মেয়ের বিয়েটা তো তারা নিজেদের চোখে দেখতে পেরেছে! এটাই বা কম কীসে?

তবে এই সার্বিক আনন্দের জোয়ারের মাঝেও নীলার মায়ের মনটা এক অজানা ও তীব্র দুশ্চিন্তায় দুলছিল। মা বলে কথা, নিজের কলিজার টুকরো মেয়েটার জন্য উনার এমন ব্যাকুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা, হঠাৎ করে এক রাতের ব্যবধানে মেয়ের যার সাথে বিয়ে হয়ে গেল, সেই ছেলেটাকে তিনি এখনো ভালো করে চেনেনই না। অতীতে ইরফানকে তারা ছোটবেলা থেকে চিনেছেন, জেনেছেন, ঘরের ছেলের মতো বড় হতে দেখেছেন, তবুও সেই ইরফান শেষ মুহূর্তে এসে উনার সরল মেয়েটাকে এমন জঘন্যভাবে ধোঁকা দিতে পেরেছে। আর সেখানে তো এই ছেলেটি উনার স্বামীর বোনের ছেলে, যাকে তিনি কোনোদিন সামনাসামনি ভালো করে দেখার সুযোগই পাননি। সেই সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা একটা ছেলের সাথে এভাবে হুট করে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল, এই চিন্তাই উনার মাতৃমনকে বারবার কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। নতুন জামাই কেমন হবে, সে আদেও নীলাকে ভালো রাখবে কি না—এমন হাজারো প্রশ্ন উনাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলছিল।

স্ত্রীর মনের এই ব্যাকুলতা আর অস্থিরতা নিলয় মির্জার চোখ এড়াতে পারল না। তিনি পরম মমতায় স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন। উনার চোখেমুখে তখন একজন অভিজ্ঞ বাবার শান্ত ও গভীর আত্মবিশ্বাস। তিনি স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললেন__

“দেখো, ইরফানকে আমরা ছোটবেলা থেকে এত চিনেও লাভ হয়নি, সে শেষমেশ ধোকাঁই দিয়েছে। মানুষের চেনা বা অচেনার ওপর বিশ্বাস ধরে রাখা যায় না। এমনও তো হতে পারে, মিহালকে আমরা আজ ভালো করে না চিনলেও, সে কখনো আমাদের মেয়েকে ধোঁকা দেবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা কী জানো? যে মেয়ে নিজের বিয়ের দিন নিজের ভালোবাসার মানুষ এবং বেস্ট ফ্রেন্ডের কাছ থেকে অমন চরম ধোঁকা পেয়েও সবার সামনে ভেঙে পড়েনি, এক ফোঁটা কান্না করেনি, সেই মেয়ে আর যাই হোক বোকা নয়। তার ভেতরের মানসিক শক্তি অনেক বেশি। তাই সে যদি হুট করে এই বিয়েটা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তার মানে অবশ্যই সে সবকিছু বুঝে-শুনে আর ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

নিলয় মির্জা একটু থামলেন, তারপর স্ত্রীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আবার বলতে লাগলেন__

“সবচেয়ে বড় কথা, যে ছেলেটির সাথে আমাদের মেয়ের বিয়ে হয়েছে, সেই ছেলেটি এই মুহূর্তে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত না হলেও সে আমাদের পরম আত্মীয়। আমার নিজের আপন বোন তাকে নিজের আদর্শ দিয়ে মানুষ করেছে। আমার বোনের রক্ত আর শিক্ষা যার ভেতর আছে, সেই ছেলেটি আর যাই হোক কখনো ধোঁকাবাজ হতে পারে না। তাই নিজের মনের ওপর একটু বিশ্বাস রাখো। দেখবে আমাদের মেয়ে খুব সুখী থাকবে।”

স্বামীর এই যুক্তিপূর্ণ ও গভীর ভরসা জাগানো কথাগুলো শুনে নীলার মায়ের ব্যাকুল মনটা যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতর চেপে থাকা ভারী পাথরটা নেমে যাওয়ার পর তিনি মনে মনে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলেন। স্বামীর বুকে মাথা রেখে উনার মনে হলো, সত্যিই তো, মিনা মির্জার ছেলে কখনো খারাপ হতেই পারে না।

এই দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে যাওয়ার পর মির্জা বাড়িতে আবার পুরোদমে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করল। সবাই মিলে হইচই করে রাতের সেই বিশেষ বনভোজনের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

পুরো বাড়ির আকাশে-বাতাসে যখন এই পুনর্মিলন আর সুখের সানাই বাজছে, ঠিক তখনই এই অপার আনন্দ আর হাসিমুখ দেখে এক কোণে বসে ঈর্ষায় ও ক্ষোভে ভেতরে ভেতরে পুরে খাক হয়ে যাচ্ছিল অন্য দুটি মানুষ। তারা আর কেউ নয়—বিশ্বাসঘাতক ইরফান এবং আরশি। নীলাকে এভাবে এক রাতের ব্যবধানে রাজকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে আর মির্জা পরিবারের এই বাঁধভাঙা সুখের আবহ দেখে তাদের বুকটা হিংসার আগুনে জ্বলতে লাগল। তারা ভেবেছিল নীলা হয়তো ঘরের কোণে বসে কাঁদবে, কিন্তু নীলার এই রাজকীয় সুখ যেন তাদের চক্রান্তের মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত হয়ে দাঁড়াল।

ইরফান কিছুতেই মির্জা পরিবারের এই আনন্দ আর নীলার এই নতুন জীবন মেনে নিতে পারছিল না। তার ভেতরের পুরুষ অহংকার আর লোভ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সে ভেবেছিল তার দেওয়া ধোঁকা খাওয়ার পর নীলা হয়তো চিরতরে ভেঙে পড়বে, লোকসমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। কিন্তু তার চক্রান্তের ছাইপাঁশ থেকে নীলা যেভাবে এক রাতের ব্যবধানে ফিনিক্স পাখির মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে ডানা মেলে ঘুরে দাঁড়াল, তা ইরফানের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল। তার ওপর আরশির মতো একটা কুটিল মেয়ের সাথে জড়িয়ে সে এখন নিজেই এক অদৃশ্য ফাঁদে বন্দি বোধ করছে।

ইরফান যে সুযোগের সন্ধান করছিল, সেই সুযোগের শেষ আশাটুকুও যে সে নিজের বোকামিতে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে, তা এখন তার নিজের কাছেও পরিষ্কার। এখন আর নীলাকে নিজের করার কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই। আর এই ব্যর্থতার চেয়েও এক চরম ও ভয়ঙ্কর ভয় এখন ইরফানের বুকটাকে আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরেছে। তার প্রতিনিয়ত মনে হচ্ছে, মিহাল যদি কোনোভাবে নীলার সামনে পুরো সত্যটা ফাঁস করে দেয়, তবে এই মির্জা পরিবারে তার থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকুও আর থাকবে না। সে খুব ভালো করেই জানে, নীলা নিজের সাথে হওয়া ব্যক্তিগত ধোকা বা অন্যায় হয়তো এক বুক কষ্ট চেপে মেনে নিলেও নিতে পারে, কিন্তু নিজের পরিবারের সাথে কোনো রকম প্রতারণা বা ধোকা সে কখনোই মেনে নেবে না।

আর ইরফান তো শুধু নীলাকে ঠকায়নি, সে তো এখন পুরো পরিবারের বিশ্বাসের সাথে এক বিরাট কারসাজি করেছে। এবার সে এমন এক জালে জড়িয়ে পড়েছে যেখান থেকে মাথা তুলে বাঁচার আর কোনো সহজ উপায় তার জানা নেই। একদিকে নিজের কৃতকর্মের এই তীব্র ভয় আর দুশ্চিন্তা তার মাথাটাকে পাগল করে তুলছিল, তার ওপর মির্জা বাড়ির মানুষের এই বাঁধভাঙা আনন্দ আর উৎসবের আমেজ তার কাছে এক চরম অসহ্য যন্ত্রণা বলে মনে হচ্ছিল। চারপাশের প্রতিটি হাসিমুখ যেন তার ভেতরের অপরাধবোধ আর ব্যর্থতাকে আরো বড় করে খোঁচা দিচ্ছিল।

তার এই অশান্ত ও দগ্ধ মনে আরশি তো আছেই যেন প্রতিনিয়ত রাগের আগুনে ঘি ঢালার জন্য প্রস্তুত। একসময় এই আরশিকেই সে কতটা অন্ধের মতো ভালোবাসত, তার জন্য নিজের সাজানো জীবনটাকেও বাজি ধরতে দ্বিধা করেনি। কিন্তু আজ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, সেই আরশিকে এখন চোখের সামনে দেখলেই ইরফানের পুরো গা জ্বলে ওঠে। তার মনে হয় আরশিই তার জীবনের সমস্ত ধ্বংসের মূল কারণ। ভালোবাসা তো বহু দূরের কথা, দুজনের মধ্যে এখন শুধুই একরাশ তিক্ততা আর অবহেলা। যার কারণে এখন সকাল-সাজ প্রতিদিন তাদের মাঝে এক অশান্ত লড়াই আর ঝগড়া লেগেই থাকে।

আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সকাল হতেই আরশির কোনো একটা খিটখিটে কথা বা উস্কানিতে দুজনের মাঝে এক তীব্র বাকবিতণ্ডা আর ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। ঘরের চার দেওয়ালে তখন শুধু একে অপরের প্রতি ঘৃণা আর চিৎকার আছড়ে পড়ছিল, যা ইরফানের ভেতরের নরকযন্ত্রণাটাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।

___________

লিসা নিজের ঘরের সোফাটায় বসে তীব্র অস্থিরতায় নখ কামড়াচ্ছে। তার ভেতরের আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা এখন চরমে পৌঁছেছে, কারণ এতক্ষণে সে নিজের করা ভয়ঙ্কর ভুলের গভীরতা পুরোপুরি টের পেয়ে গেছে।

সেদিন সন্ধ্যার পর যখন সে চুপিচুপি নিচের অন্ধকার গোডাউনটার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল, তখন তার বুকটা এক অদ্ভুত প্রতিহিংসার আনন্দে কাঁপছিল। কিন্তু ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই লিসার পুরো শরীর যেন জমে বরফ হয়ে গেল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর পুরো জায়গাটা একদম জনমানবহীন, শূন্য। অথচ সেখানে নীলাকে শক্ত করে বেঁধে রাখার কথা ছিল!

লিসার নিজের ফোনটা এতক্ষণ বন্ধ ছিল, কারণ ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় সে ওটা ঘরে চার্জে বসিয়ে রেখেছিল। চার্জ থেকে ফোনটা খুলেই সে উত্তেজনায় সোজা গোডাউনের দিকে ছুটে এসেছিল, এর মাঝে একবারের জন্যও ফোনটা অন করে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। তার মনে তখন কেবল একটাই তীব্র নেশা কাজ করছিল—নীলাকে অসহায় অবস্থায় বন্দি দেখার পৈশাচিক আনন্দ। আর সেই আনন্দ উপভোগ করতেই সে এতটা পথ দৌড়ে এসেছিল। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরের মেঝেতে নীলার কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট ছিল না। চারপাশটা এমন ভুতুড়ে আর শূন্য দেখে লিসার মাথাটা মুহূর্তের মধ্যে গরম হয়ে উঠল। একরাশ হতাশা আর রাগে তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। সে আর কালবিলম্ব না করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে অন করল। আর স্ক্রিনটা সচল হতেই লিসার চোখের সামনে ভেসে উঠল একের পর এক মিসড কলের নোটিফিকেশন। তার নিজের বিশ্বস্ত গার্ডরা তাকে অনেকগুলো জরুরি কল করেছিল। এতগুলো মিসড কল একসাথে দেখে লিসার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, ভয়ের এক শীতল স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। শুকিয়ে আসা গলাটা দিয়ে কোনোমতে একটা শুকনো ঢোক গিলল সে। চারপাশের এই নীরবতা আর গার্ডদের এই ঘনঘন ফোন করার একটাই অর্থ হতে পারে—লিসার এত নিখুঁতভাবে সাজানো কারসাজিতে কোথাও না কোথাও খুব বড় ধরনের কোনো গড়বড় হয়ে গেছে। নীলা তার হাত থেকে ফসকে গেছে, আর সেই সাথে লিসার সমস্ত পরিকল্পনা এখন ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে।

লিসা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে কাঁপতে থাকা আঙুলে তার প্রধান বডিগার্ডের নাম্বারে কল দিল। ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হতেই বডিগার্ড আর কোনো কিছু আড়াল না করে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব কথা একনাগাড়ে খুলে বলতে লাগল।

ফোনের ওপার থেকে যখন লিসা শুনতে পেল যে তার মূর্খ গার্ডরা সেদিন নীলাকে অপহরণ করার বদলে সম্পূর্ণ ভুল করে এক পুরুষকে, অর্থাৎ স্বয়ং মিহালকে কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছিল, তখনই যেন লিসার চোখের সামনে আস্ত দুনিয়াটা উল্টে গেল। তার পুরো শরীর মুহূর্তের মধ্যে অবশ হয়ে এল। কিন্তু তার থমকে যাওয়া দুনিয়াটাকে আরও জোরালো ঝাঁকুনি দিয়ে বডিগার্ড যখন তার পরের কথাটি বলল, তখন লিসার হৃৎপিণ্ড যেন স্তব্ধ হওয়ার জোগাড় হলো। বডিগার্ড জানাল, সেই দিনেই গোডাউনে নাকি আচমকা নীলা নিজে এসে হাজির হয়েছিল এবং একা লড়ে মিহালকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে গেছে! শুধু তাই নয়, নীলার সেই মারমুখী রূপের সামনে টিকতে না পেরে লিসার নিজের হৃষ্টপুষ্ট গার্ডরা এখন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছে।

ব্যস, এইটুকু শোনার পর লিসার চারপাশের সবকিছু বনবন করে ঘুরতে শুরু করল। এসব কথা আবার মনে পড়তেই সে কোনোমতে সোফার হাতলটা চেপে ধরে বসে রইল। ফোনের ওপার থেকে গার্ডরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে এটাও বলছিল যে, তারা যাওয়ার আগে মিহালকে ধারালো ছুরি দিয়ে শক্ত আঘাত করতে পেরেছিল—কিন্তু এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি লিসার কান অব্দি পৌঁছালেও তার মগজ যেন তা গ্রহণই করতে পারল না। তার মাথায় তখন অন্য কোনো কথা ঢুকছিল না। সে বারবার নিজের মাথায় হাত দিয়ে বিড়বিড় করে কেবল একটাই কথা বলতে লাগল যে, এবার আর তার এই সমাজ ও আইনের হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।

ভুলবশত যদি মিহালের পরিবারের কেউ জেনে যায় যে এই পুরো অপহরণ নাটকের নেপথ্যে লিসা নিজে ছিল, তবে চোখের পলকে সব শেষ হয়ে যাবে। পুলিশ কেস, লোকলজ্জা আর আইনি মারপ্যাঁচে জড়িয়ে তার এতদিনের চিলতে চিলতে করে গড়ে তোলা পুরো ক্যারিয়ারটা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এই চরম সত্যটা অনুধাবন করতেই লিসার কপালে ভয়ের ঠাণ্ডা ঘাম জমতে শুরু করল।

চলবে??? বেশ বড় দিচ্ছি কিন্তু পর্ব গুলো। আর এবার তাড়াতাড়ি দিলাম। আরো দেরি করে দেই 🙂 দিন যত যাচ্ছে পরীক্ষা তত কাছিই আসছে।রিচেই দেওয়ার সময় পাইনি নিজে। তাই ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন।

Se

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply