Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩০


নতুন প্রেমের গান

#পর্ব ৩০

সুপ্রভার চোখ দুটো আপনাআপনি বুজে এলো।

মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক অস্ফুট আর্তনাদ। কিন্তু মাটির কঠোর স্পর্শ তাকে ছোঁয়ার আগেই, দ্রুতগতিতে একজোড়া শক্ত পুরুষালী হাত তাকে শূন্যে থাকা অবস্থাতেই আঁকড়ে ধরল। একটি হাত তার পিঠের ওপর আর অন্যটি তার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল।

সুপ্রভা ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। তীব্র আতঙ্কে তার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছিল। কিন্তু পরক্ষণেই এক চেনা, চওড়া বুকের শক্ত বাঁধন আর অতি পরিচিত পুরুষালী পারফিউমের তীব্র সুবাস তাকে জানান দিল সে মাটিতে পড়েনি। অবশ্য পড়েনি বললে ভুল হবে। তাকে মাটিতে পড়তে দেওয়া হয়নি।

সুপ্রভা ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেলল। শেখ মঞ্জিলের গেটের নিয়ন আলোয় দেখল সিয়াদাতের মুখটা তার মুখের ঠিক এক ইঞ্চি দূরত্বে থমকে আছে। এতটাই কাছে যে সিয়াদাতের তপ্ত নিঃশ্বাস সুপ্রভার ঠোঁটে আর গালে এসে আছড়ে পড়ছে। সিয়াদাতের বুকের দ্রুত ওঠানামা সুপ্রভা নিজের বুকে স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। লোকটা যখন গাড়ি থেকে নেমে সোজা ভেতরে চলে যাচ্ছিল, তখন সুপ্রভার মুখটা নিকষ কালো আঁধারে ঢেকে গিয়েছিল। তার সামান্যতম বিপদের আঁচ পেতেই সে যে এতোটা ক্ষীপ্র গতিতে এগিয়ে আসবে, এটা সুপ্রভার কল্পনাতীত ছিল।

সিয়াদাতের অতীব ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে সুপ্রভার পুরো শরীরে এক তীব্র কাঁপন ধরে গেল। মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোতের মতো বয়ে গেল। তার হাত দুটো আপনাআপনি সিয়াদাতের শক্ত কাঁধ দুটোকে আঁকড়ে ধরল বাঁচার তাগিদে।

কিয়ৎক্ষণ আগেই গাড়ির ভেতর সুপ্রভা তাকে যে চরম অপমান করেছিল, সিয়াদাত এক লহমায় তার সবকিছু ভুলে গেল। তার চোখের সেই বিষাদ আর অভিমান উবে গিয়ে সেখানে এখন কেবলই এক আদিম, তীব্র আকর্ষণ খেলা করছে। সিয়াদাতের জ্বলজ্বলে নেশাক্ত দৃষ্টি সুপ্রভার চোখ থেকে সরে এসে নিবদ্ধ হলো তার কাঁপতে থাকা গোলাপী ঠোঁট দুটোর ওপর। রাতের হালকা আলোয় সুপ্রভার সেই ভেজা, কম্পমান ঠোঁট জোড়া সিয়াদাতের ভেতরের সুপ্ত মত্ততাকে যেন হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল।

সিয়াদাত নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের দৃষ্টি আরও গভীর হলো। মুখের পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠল। সুপ্রভাকে কোমরের বাঁধনে আরও একটু ওপরের দিকে তুলে ধরে সে সম্মোহনী ভঙ্গিতে সুপ্রভার সেই কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তাদের মাঝের ওই এক ইঞ্চির দূরত্বটুকুও মুছে যেতে চাইল। সিয়াদাতের ঠোঁটের উষ্ণতা সুপ্রভা নিজের ঠোঁটের খুব কাছে অনুভব করতে পারল।

ঠিক তখনই সুপ্রভার ভেতরের সুপ্ত সম্বিতটা ফিরে এল। সিয়াদাতের এত কাছে চলে আসা , নিজের অবাধ্য হৃদয়ের এই আত্মসমর্পণ তাকে মুহূর্তের মধ্যে সজাগ করে তুলল। সে বুঝতে পারল, আর একটা সেকেন্ড দেরি হলে সে নিজেকে আর সামলাতে পারবে না।

সুপ্রভা দুই হাত দিয়ে সিয়াদাতের চওড়া বুকে মৃদু ধাক্কা দিল। কাঁপা গলায় বলল,

“ছাড়ুন!প্লিজ ছাড়ুন আমাকে!”

সুপ্রভার কথায় ভ্রূক্ষেপ করলো না সিয়াদাত।সে সুস্থভাবে ছাড়লো না, বরং কোমরের বাঁধন আরও খানিকটা শক্ত করে তাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল। ধীর গলায় বলল,

“বড্ড অহংকার তোমার, তাই না? কিন্তু তোমার এই অহংকার ধরে রাখার জন্যেও যে সিয়াদাত শাহারিয়ার এই শক্ত হাতদুটোর প্রয়োজন, সেটা কখন বুঝবে?”

সুপ্রভা কিছু বলার আগেই সারা এসে উপস্থিত হলো। ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ভাইয়া! ভাবি! তোমরা কি সারারাত এই গেটের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি?”

সারার আকস্মিক উপস্থিতিতে দুজনেই চমকে উঠল।সিয়াদাত এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বুজে নিজেকে সামলে নিল। তারপর সুপ্রভাকে আলতো করে মাটির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে দুকদম পিছিয়ে গেল।সুপ্রভার গাল দুটো লজ্জায় আর সংকোচে লাল হয়ে উঠল।সে তড়িঘড়ি নিজের শাড়ির আঁচল টেনে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

সারা ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এল তাদের দিকে। সুপ্রভার ফ্যাকাশে মুখ জড়োসড়ো অবস্থা দেখে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে সুপ্রভার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল।দরদমাখা গলায় বলল,

“তুমি ঠিক আছো ভাবী?”

সারার মুখে ভাবী ডাক শুনে সুপ্রভার বুকের ভেতর টা কেমন জানি করে উঠল। অদ্ভুত এক ধরনের অনুভূতি হলো তার।ভাবী ডাকটা বড়‌ই মধুর শোনাল তার কানে।নোরা কখনোই তাকে ভাবী বলে সম্বোধন করেনি।তার নাম ধরে ডেকেছে।তাই তো ভাবী ডাকের মাহাত্ম্য ঠাহর করতে পারে নি সে।

সুপ্রভার থেকে রেসপন্স না পেয়ে হতাশ হলো সারা। পুনরায় বলল,

“তোমাকে অনেক ক্লান্ত লাগছে। মুখটাও কেমন শুকিয়ে গেছে! ভাইয়া কি রাস্তায় তোমার সাথে ঝগড়া করেছে? চল চল, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না, তাড়াতাড়ি ভেতরে চলো।”

সারাকে যতো দেখছে ততোই অবাক হচ্ছে সুপ্রভা।মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সুপ্রভার সাথে পরিচয় হয়েছে তার।অথচ তার কথাবার্তায় মনে হচ্ছে যেন কয়েক যুগ ধরে সুপ্রভাকে চেনে সে।

সারা সুপ্রভার হাতটা ধরে আলতো করে একটা টান দিল। মুখ কুঁচকে বলল,”কী হলো ভাবি? চলো ভেতরে চলো।”

সুপ্রভা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।সারা সুপ্রভাকে আগলে নিয়ে শেখ মঞ্জিলের সদর দরজার দিকে পা বাড়াল। সুপ্রভা একবার চোরা চোখে সিয়াদাতের দিকে তাকাল। সিয়াদাত পকেটে হাত দিয়ে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে।তবে তার দৃষ্টি এখনো সুপ্রভার ওপরই নিবদ্ধ। সুপ্রভা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারার সাথে পা মেলাল। নিজের অবাধ্য মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল সে।

শেখ মঞ্জিলের বিশাল কাঠের রাজকীয় দরজাটা ঠেলে সারা সবে সুপ্রভাকে নিয়ে অন্দরে প্রবেশ করতে যাবে, ঠিক তখনই ভেতর থেকে মেয়েলি ঝাঁঝালো গলা শোনা গেল, “ থামো সারা! কার অনুমতি নিয়ে তুমি ওই অপয়া অলক্ষ্মী মেয়েটাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসছো?”

সেই অনাকাঙ্ক্ষিত কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনে সুপ্রভার বুকটা কেঁপে উঠলো।তার পায়ের গতি রোধ হলো সহসা।অজানা আতঙ্ক গ্ৰাস করলো তাকে।সারাও থমকে গেল। তার মুখের চঞ্চল হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

মোহনা শেখ ত্বরিত গতিতে এগিয়ে এলেন। সুপ্রভাকে আপাদমস্তক ঘৃণার দৃষ্টিতে মেপে নিলেন। সারাকে উদ্দেশ্য করে আবার চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,

“সারা, তুমি কি ভুলে গেছ এই শেখ পরিবারের একটা মান সম্মান আছে? তোমার ভাইয়ার অবস্থান ভুলে গেছো কি? সমাজ যাকে অপয়া বিধবা বলে তকমা দিয়েছে, সেই ছোঁয়াচে মেয়েটাকে তুমি এই রাজপ্রাসাদে এনে তুলছ কোন সাহসে? আমি বেঁচে থাকতে এই কুলক্ষুণী মেয়ে শেখ মঞ্জিলের চৌকাঠ মাড়াতে পারবে না!”

মোহনা শেখের প্রতিটি কথা সুপ্রভার বুকে তীরের মতো বিঁধল। এতক্ষণ ধরে সিয়াদাতের সাথে যে মানসিক যুদ্ধ সে লড়ছিল, এই নতুন আক্রমণের সামনে সে একেবারে ভেঙে পড়ল। তার চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে পরাস্ত সৈনিকের ন্যায় মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরল।

মোহনা শেখ বিষাক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন সুপ্রভার দিকে। কর্কশ কণ্ঠে বললেন, “ আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে সারা।তুমি এই মেয়েকে এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে বল।”

মায়ের এমন রূঢ় ব্যবহারে সারা দমে গেল না। সে সুপ্রভার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে প্রতিবাদী গলায় বলল, “তুমি এসব কী বলছ মম? সুপভা ভাইয়ার বিয়ে করা ব‌উ।ওর অধিকার আছে এ বাড়ি …! সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই মোহনা শেখ সারাকে থামিয়ে দিলেন।

ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, “ আমার কথা কানে যায় নি তোমার? আমি বললাম না শেখ মঞ্জিলে ওই মেয়ের ঠাঁই হবে না।”

“তাহলে তো আমাকে‌ও শেখ মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে যেতে হবে মম‌।যে বাড়িতে আমার স্ত্রীর ঠাঁই নেই, সেই বাড়িতে আমি থাকি কী করে??”

চলবে??

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply